গল্পঃ উত্তরঃ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ



চিকিদের বাড়িটা বড়ো রাস্তা থেকে একটু ভেতরে। গলিটা চওড়া হলেও ওদের স্কুল বাস ঢোকে না। প্রায় একটা বাজতে যায়। চারদিক রোদের তাপে ঝলসে যাচ্ছে। পৃথিবীটা যেন একটা জ্বলন্ত উনুনের ওপর বসে আছে। পথেঘাটে লোকজন নেই বললেই চলে। চিকি দেখল, কেকাপিসি তাকে নিতে আসেনি। যদিও ক্লাস এইটে পড়া চিকির পক্ষে এইটুকু দূরত্ব একলা যাওয়া কোনও ব্যাপার নয়, তাও তার অবাক লাগল। এরকম তো কখনও হয় না। দাদু-ঠাম্মি বাড়ি থাকলে দাদুই আসেন তাকে নিতে, না হলে কেকাপিসি এসে নিয়ে যায়। চিকির জন্মের আগে থেকে কেকাপিসি ওদের বাড়িতে কাজ করে। খুব ভালোবাসে চিকিকে। চিকির বাবা-মা দু’জনেই চাকরি করেন সরকারি অফিসে, তাই দুপুরবেলা বাড়িতে চিকি, ওর ভাই চিন্টু আর দাদু-ঠাম্মি থাকে। দাদু-ঠাম্মি কোথাও গেলে সেদিনগুলোতে চিকি আর চিন্টুর দেখাশোনার জন্য কেকাপিসি থেকে যায়। আজও কেকাপিসির থাকার কথা, কারণ দাদু-ঠাম্মি গতকালই জেঠুর কাছে ভুবনেশ্বর গিয়েছেন।
দুয়েক মিনিট অপেক্ষা করে চিকি বাড়ির পথে হাঁটা লাগাল। কোনও কারণে হয়তো কেকাপিসির বেরোতে দেরি হয়েছে। চিন্টু হয়তো কোনও কাণ্ড ঘটিয়েছে। যা দুষ্টু, হয়তো কেকাপিসির সাথে দিদিকে আনতে আসবে বলে বায়না জুড়েছে, আর এই গরমে পিসি আনতে চাইছে না। চিকি পা বাড়াল। রাস্তাতেই চিকির কেকাপিসির সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে।
“দিদিভাই, শুনছো? ও দিদিভাই, একটু শুনবে?”
উপর্যুপরি ডাকে ঘুরে তাকাল চিকি। একজন বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন চিকির থেকে একটু দূরে। হাতে লাঠি, পরনে মলিন সাদা শাড়ি, কাঁধে একটা ঝোলামতন ব্যাগ। চোখগুলো ঘোলাটে।
“আমাকে কিছু বলছেন?”
“হুম, আমায় পৌঁছে দেবে একটা ঠিকানায়?” ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন তিনি।
চিকি একটু ইতস্তত করল। ফাঁকা রাস্তা, কেউ কোথাও নেই। ভদ্রমহিলার কাছে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না।
“পৌঁছে দাও না, দিদিভাই! এটাই আমার শেষ ঠিকানা।” ঘড়ঘড়ে গলায় কাতর অনুরোধ ভদ্রমহিলার।
চিকি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। বৃদ্ধার ডাক সে উপেক্ষা করতে পারল না। ভদ্রমহিলা একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন। ঠিকানাটা চিকির চেনা। দুটো গলির পরেই বাড়িটা।
“তুমি জানো এই ঠিকানা?”
“হুম।” সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় চিকি।
“পৌঁছে দেবে আমায় আমার শান্তির আশ্রয়ে?” ঝাপসা চোখ নিয়ে চিকির দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
বৃদ্ধার মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার আছে যে ওঁকে উপেক্ষা করা চিকির পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। মনের মধ্যে চিন্তাও হচ্ছে দেরি দেখে কেকাপিসি চিন্তা করবে তো। শেষমেশ চিকি বৃদ্ধাকে সাহায্য করাই মনস্থির করে।
“আপনার হাতে চোট লাগল কী করে?”
“ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। একলা তো কোনওদিন কোথাও যাইনি। তাও যে লোককে জিজ্ঞেস করে করে এই পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছি, তারপর তোমার মতো ভালো মেয়ের দেখা পেয়েছি, সবই আমার ভাগ্য।”
“আপনি এই বয়সে একলা এসেছেন কেন?” চিকি প্রশ্ন করে।
“সবই আমার কপাল, দিদিভাই। তোমার দাদু ভারি একগুঁয়ে, রগচটা মানুষ ছিলেন। বছর পাঁচেক আগে বড়োছেলের সাথে মনোমালিন্য হয়ে তার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করলেন। আমাকেও দিব্যি করিয়ে নিলেন যে সারাজীবন খোকার সাথে যোগাযোগ রাখব না। অথচ বিশ্বাস করো, আমার খোকার মতো ছেলে হয় না। আমি তাকে জন্ম দিইনি, কিন্তু কোনওদিন বুঝতে পারিনি যে আমি তার সৎমা। বৌমা আর নাতি-নাতনিও ভারি ভালো, কিন্তু তোমার দাদুর অকারণ জেদ। উনি তো চলে গেলেন তিন বছর আগে। তারপর থেকে শুরু হল আমার দুর্দশা। মনা, মানে আমার ছোটোছেলে আর বৌমা, তারা তো আমি মরলে বাঁচে। নিজের পেটের ছেলে বলে ওকে মানতে আমার কষ্ট হয়। কী অত্যাচার যে আমি সহ্য করেছি সে আমিই জানি। খোকার কাছে আসতে লজ্জা হত। কী ভাববে ছেলেটা, ওর বাবার কথা মান্য করে এতদিন ওর সাথে যোগাযোগ রাখিনি। কিন্তু আর পারলাম না, দিদিভাই। লুকিয়ে পালিয়ে এসেছি। আমার এক আত্মীয়কে দিয়ে একসময় এই কাগজে খোকার ঠিকানাটা লিখে রেখেছিলাম। জানো তো, আমার খোকা অনেক বড়ো চাকরি করে।” টেনে টেনে বললেন বৃদ্ধা।
চিকি আড়চোখে দেখল, বৃদ্ধার কপালটাও ফোলা, রক্ত জমাট বেঁধে আছে। বস্তুত বৃদ্ধার শরীরের যতটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে সব জায়গাতেই আঘাতের চিহ্ন। খুব আস্তে আস্তে হাঁটছেন বৃদ্ধা। পায়েও সমস্যা আছে বোধহয়। চোখদুটো কেমন যেন। দৃষ্টি বোঝা যায় না। দুটো গলির পরে একটা মস্ত দোতলা বাড়ির সামনে এসে চিকি বলল, “এই আপনার ঠিকানা। আমি এবার আসি। বাড়িতে চিন্তা করবে।”
কলিং বেলটা বাজিয়ে চিকি চলে গেল। বৃদ্ধা ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভালো থেকো।”

“আমার দিদিভাইয়ের চোখদুটো ছলছল কেন?”
ঠাম্মির প্রশ্ন শুনে তোতা এগিয়ে এসে ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরে। লতাদেবীও নাতনিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। কতদিন পরে আবার তিনি সুখশান্তির মুখ দেখেছেন। বড়োছেলে আর তার পরিবার সসম্মানে লতাদেবীকে কাছে টেনে নিয়েছে। বস্তুত তাঁর এই দুর্দশা দেখে তারা তো স্তম্ভিত হয়ে গেছে।
“বললি না তো, তোর মন খারাপ কেন।”
“জানো ঠাম্মি, আজ থেকে একবছর আগে আমরা তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সুবর্ণা আজকের দিনে মারা যায়।”
“সে কি রে! ওইটুকু মেয়ের কী হয়েছিল?” বিস্মিত প্রশ্ন লতাদেবীর।
“সেদিন স্কুল বাস বড়ো রাস্তার ওপরে সুবর্ণাকে ড্রপ করে দেয় বেলা একটার দিকে। কিন্তু ওদের কাজের মাসির ওকে আনতে আসতে দেরি হয়ে যায়। রাস্তাঘাট নির্জন ছিল। সেইসময় একজন বৃদ্ধ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যান। সুবর্ণা ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। কিন্তু ও বুঝতে পারেনি যে ওটা ছেলেধরাদের ফাঁদ ছিল। লোকটা আসলে কমবয়সী। মেক-আপ নিয়েছিল। ওর আরও সঙ্গীসাথী ছিল আশেপাশে। সুবর্ণাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে একটা গাড়িতে তুলে দূরে কোথায় একটা নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। সুবর্ণার জ্ঞান ফিরতেই ও হাত-পা ছুড়ে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। ও অজ্ঞান ছিল বলে ওরা ওর মুখ-হাত বাঁধেনি। বিপদ বুঝে ওদের একজন পিস্তলের বাঁট দিয়ে সুবর্ণার মাথায় খুব জোরে মেরে বসে। ওরা বুঝতে পারেনি যে এর ফলে রক্তক্ষরণ হয়ে সুবর্ণা মারা যাবে। এদিকে তো সুবর্ণা বাড়ি না ফেরার খোঁজাখুঁজি, থানা-পুলিশ শুরু হয়ে যায়। শেষমেশ লোকগুলো ধরা পড়ে। সবকিছু জানা যায়, কিন্তু ততক্ষণে সুবর্ণা শেষ হয়ে গেছে।”
তোতার গলা কান্নায় বুজে আসে। লতাদেবী সস্নেহে নাতনিকে কাছে টেনে নেন।

“ঠাম্মি, দ্যাখো। এটা আমার গতবছরের জন্মদিনের ছবি।” তোতা একটা অ্যালবামের পাতা মেলে ধরেছে।
“এই মেয়েটা তোর বন্ধু?” উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন লতাদেবী।
“খুব ভালো মেয়ে। এই তো আমাকে এ-বাড়িতে পৌঁছে দিল। না হলে আমি তো খুঁজেই সারা হচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, শেষপর্যন্ত তোদের আর খুঁজে পাব না বোধহয়।”
“এ তুমি কী বলছ, ঠাম্মি! এ তো সুবর্ণা! এর কথাই তো তোমাকে বলেছিলাম। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।” অবাক হয়ে বলে তোতা।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে লতাদেবী বলেন, “না রে দিদিভাই, আমি ভুল করছি না। এই সেই মেয়ে। কোনও কারণে ওর আত্মা শান্তি পায়নি, তাই নিজের মৃত্যুদিনে ও আবার ফিরে এসেছিল।”
তোতা হতবাক হয়ে ঠাম্মির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাত প্রায় বারোটা। অর্ধতন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় লতাদেবীর মনে হল কেউ এসে তাঁর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
“তুমি তোতার ঠাম্মি, তাই আমিও ঠাম্মি বলছি। জানো ঠাম্মি, মারা যাওয়ার পর আমি মুক্তি পাইনি। প্রতিমুহূর্তে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমি তো এক অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম। সেটা কি এত ভুল ছিল যে আমার জীবনটাই অকালে চলে গেল? ছোটো থেকে তো এই শিক্ষাই পেয়েছি যে অসহায়, আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে কেন আমার সাথে এমন হল? আমার শিক্ষা কি ভুল ছিল? অতৃপ্তি নিয়ে বড়ো কষ্টে ছিলাম। ইহলোক ছেড়ে গেলেও ওপারে যেতে পারছিলাম না। হয়তো ঈশ্বর আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই আমাকে সেই একই দিনে একই সময়ে একই জায়গায় প্রায় একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি সেই একবছর আগের দুপুরেই দাঁড়িয়ে আছি। অদ্ভুতভাবে আমার মতো অশরীরী তোমার চোখে ধরা দিল। তুমি আমাকে দেখতে পেলে। আমার সাহায্যে তুমি তোমার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে পৌঁছে গেলে। তোমার সব দুঃখের অবসান হল। আমার প্রশ্নের জবাব আমি পেয়ে গেলাম। আমি ভুল ছিলাম না। ভুল ছিল না আমার শিক্ষা। ভুল ছিল ওই দুষ্টু লোকগুলো। হয়তো ভুল ছিল সেদিনের সময় বা আমার ভাগ্য। আজ আমি শান্তি পেলাম। এবার আমার মুক্তি।”
আচ্ছন্ন অবস্থায় লতাদেবী দেখলেন, এক স্বর্গীয় আলোর মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে একটি তেরো-চোদ্দ বছরের মেয়ের অবয়ব।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

1 comment: