আমার স্কুলঃ রঞ্জন দাশগুপ্ত


আমার স্কুল

রঞ্জন দাশগুপ্ত


প্রথম যেদিন স্কুলে গিয়েছিলাম, তখনও আমি কোনও ক্লাসে ভর্তি হইনি। দাদা-দিদিদের স্কুল যাওয়া দেখে খুব ইচ্ছা হয়েছিল আমিও যাব। না জানি কী অপরূপ জায়গা সেটি! তাই আমাকে পুরনো একটি অ্যালুমিনিয়ামের স্কুল-বাক্স দেওয়া হল। তার ডালাটার একজায়গায় ফাটল। আর প্রচুর ছেঁড়াখোঁড়া বইখাতা আমি নিজেই জোগাড় করেছিলাম।
সে আমলে সরকারি স্কুলের নিয়মকানুন তেমন কড়া হত না। আর গার্জেনরাও বাচ্চাদের অতটা আতুপুতু করতেন না। তাই দিদির সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে বাঁকুড়া পুলিশ লাইন স্কুলে গিয়ে প্রথমের ক্লাসটাতেই বসে পড়লাম বেঞ্চে। দিদি বলে দিল, আমার ভাই। ইত্যাদি। বড়ো দাদাদের সঙ্গে একটা বেঞ্চের কোনায় গিয়ে বসেছিলাম। ক্লাসের সকলে তখন ভারি আমোদের হাসি মেখে আমার দিকেই তাকিয়ে।
মাস্টারমশাই ছিলেন বিখ্যাত মারকুটে রামেশ্বর-স্যার। মানবিকতার খাতিরেই হয়তো একবার আমাকে বললেন, “ভালো করে পড়াশোনা করতে হয়! বাক্সে কী নিয়ে এসেছ?”
মিহি গলায় আমি উত্তর দিলাম, “টিপিন।”
আসলে সেই মুহূর্তে ওটাই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল।
মাস্টারমশাই উৎসাহের ভঙ্গিতে বললেন, “বাহ্‌ বাহ্‌! কী টিফিন এনেছ?”
“শশা।” আমি নির্ভীকভাবে জানিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তে ক্লাস জুড়ে হা-হা-হি-হি!
সব ঠিকই চলছিল, কিন্তু হঠাৎই কী একটা সামান্য কারণে খেপে উঠে মাস্টারমশাই একধার থেকে সবাইকে বেতের বাড়ি মারতে শুরু করলেন। আমি চমকে উঠে দেখলাম সেই মার ক্রমশই নিকটবর্তী হচ্ছে। এটা আমার এস্টিমেটের মধ্যে ছিল না। তাই কাউকে আর কিছু না বলে আমি প্রাণভয়ে দৌড়তে শুরু করলাম। বাক্স খুলে মাঝে মাঝে বইখাতার বাণ্ডিল পড়ে যায়। কুড়িয়ে বাক্সে ভরে আবার ছুট দিই। এভাবে প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা পার করে হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়ি ফিরলাম। তারপর থেকে আর স্কুল যাওয়ার ইচ্ছেটা রইল না। তবে একদিন না একদিন তো যেতেই হয়!

কেজি ওয়ান বা কেজি টু থেকে ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত সেখানেই পড়েছি। তারপর বাঁকুড়া থেকে কুনুস্তোরিয়া কলিয়ারিতে বাবার কাছে চলে এলাম। রানিগঞ্জে, যে স্কুলটির নাম ‘পৌর বালিকা বিদ্যালয়’ (!), সেখানে ক্লাস টু-তে ভর্তি হয়েছিলাম।
আমাদের ক্লাসে ছিলেন নিশা দিদিমণি। আমাদের সাথে সাথে তাঁরও নতুন ক্লাসে প্রোমোশন হত। ছাত্রজীবনের অনেকটা ঋণ এই দিদিমণির কাছে রয়ে গেছে।
সে আমলে গ্রাম থেকে মোটামুটি পড়াশোনা জানা অনেক মানুষ কোনও না কোনও সূত্র ধরে বা বিনা সূত্রেই পেটের দায়ে চলে যেতেন অন্য জায়গায়। গৃহশিক্ষকতা করতেন। এরকম একজনের কথা মনে পড়ছে। কুনুস্তোরিয়াতে কোনও কোয়ার্টারের ভগ্নাংশে থাকতেন তিনি। বাবরি চুল। সব সময়েই কোট পরে থাকতেন। এই ভদ্রলোকের আসল নাম জানতাম না। তাঁর কাছে পড়িওনি আমি। বস্তুত গৃহশিক্ষক আমার কখনওই ছিল না। তবে এঁকে পাড়ার ছেলেপুলেরা বলত ডিস্কো মাস্টার।
একদিন দাদার সঙ্গে কোথা থেকে যেন আসছি। দেখি উনি একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছেন আর দু’হাতে ঢিল ছুড়ছেন। দূর থেকে অল্পবয়সী ছেলেপুলেরা তাঁকে ‘ডিস্কো মাস্টার, ডিস্কো মাস্টার’ বলে খেপাচ্ছে।

তবে হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার রোমাঞ্চ আলাদা। রানিগঞ্জ হাইস্কুলে ভর্তির জন্য আমাদের একটা পরীক্ষাও দিতে হয়েছিল। আমার নাম বোধহয় লিস্টের এগারো নম্বরে ছিল।
স্কুল জীবনের অজস্র গল্প আছে যা হয়তো আমার সঙ্গেই মুছে যাবে। সবগুলো অন্য কাউকে বলার মতোও নয়। তবে দুয়েকটা তো বলাই যায়। যেমন একবার, ক্লাস এইটে সম্ভবত, ছেলেরা দুটো ক্লাসের মাঝের সময়ে স্যারের টেবিলের কাছে জমা হয়ে প্রবল হট্টগোল করছে, এমন সময়ে একজন কমবয়সী ছেলে আমাদের ক্লাসে ঢুকে সকলকে চুপ করানোর চেষ্টা করছিল। আমাদেরই বয়সী হবে। তবে আমাদের ক্লাসের নয়। কে শুনবে তার কথা? ওর থেকে অনেক বড়সড় চেহারার, গালে তখনই গালপাট্টা, কুমোরবাজারের এক ছেলে ওর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “চোপ ব্যাটা!” তারপর আবার গল্প করতে লাগল। একটু পরে আমাদের ক্লাস-টিচার ঢুকতে চুপচাপ যে যার নিজের সিটে বসে পড়ল। তখন স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন, ছেলেটি আসলে ছাত্র নয়। স্কুলের নতুন স্যার! আমাদের পড়াবেন। কুমোরবাজারের ছেলেটি তখন একের পর এক হেঁচকি তুলছিল।
ক্লাস ফাইভে আমাদের ইতিহাস পড়াতেন আখতার সাহেব। লাল টুকটুকে গায়ের রং। ধবধবে সাদা চুল আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। তিনি একটা অদ্ভুত কাজ করিয়েছিলেন আমাদের দিয়ে। একটা করে চটি খাতা কিনে সেখানে ইতিহাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সাল তারিখ লিখে রাখতে হত লাল কালিতে। আমাদের পাঠ্য বইয়ের ইতিহাস তো কেবলমাত্র এখান ওখান থেকে খাপচা মেরে কয়েকটা সাল আর তারিখ লেখা! ইতিহাস পড়তে তাই ভালো লাগত না।
তবে ক্লাস নাইনে নিখিলবাবু অনেকটা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে ইতিহাস পড়াতেন। ভালো লাগত। অনেক পরে রমেশচন্দ্র মজুমদার, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনেশ সেন আর সুকুমার সেন প্রমুখের বই পড়ে ইতিহাসের বিষয়ে আগ্রহ জন্মায়। রোমিলা থাপার সামান্য পড়েছি। ইংরেজির জন্য অসুবিধা হত, তাই। তখনই বুঝেছিলাম ইতিহাস বই কোনও ভালো গদ্যকারকে দিয়ে লেখানো উচিত। সিলেবাসেও পরিবর্তন আনা দরকার।

সম্ভবত ক্লাস সেভেনে আমাদের ফিজিক্স পড়াতেন মোদকবাবু। উনি নিয়ম করলেন, ছেলেরা তাঁর পড়ানোর সময় ‘জল খাব, বাথরুম যাব (আমরা তাই বলতাম)’ ইত্যাদি বলে বিরক্ত করবে না। চুপচাপ চলে যাবে। সময়মতো ফিরে আসবে। আওয়াজ করবে না।
এতে অনেক ছেলেই খুব উৎসাহিত হল। তবে সবচেয়ে উৎসাহ বোধ করেছিল কুমারবাজারের অমিত। সে ওই স্যার ক্লাসে এলেই উঠে পড়ত। চুপচাপ বাইরে চলে যেত। একটু পরে ফিরেও আসত। শেষে একেবারে মেতে উঠল। নিজে তো নিয়মিত বেরোতই, তার সঙ্গে ইশারা করে অন্যান্য ছাত্রদেরও ডেকে নিয়ে যেত ক্লাস থেকে।
একবার ক্লাস ফাইভ সি-এর কতগুলো ছেলে বাইরে নিলডাউন দিয়ে বসেছিল। অমিত তাদের কান মুলে দিয়ে বলে গেল, “ছি ছি! ভালো করে পড়াশোনাও করিস না!”
গোটা স্কুল পরিক্রমা সেরে সাধারণত ক্লাসের শেষদিকটায় ঢুকত সে। ওকে দেখে অপেক্ষাকৃত নিরীহ ছাত্ররাও উৎসাহ পেতে লাগল।
সেরকমই দু’জন বন্ধুকে প্রথমবার সঙ্গী করে নিয়ে গেছে একদিন। অনেক পরে ক্লাসে ঢুকছে, স্যার বজ্রগম্ভীর স্বরে বললেন, “দাঁড়া!”
তারপর শুরু হল মার। শেষে টিফিন পর্যন্ত নিলডাউন। হেডস্যার পাঠকবাবু কী কাজে ওদিক দিয়েই পেরোচ্ছিলেন, ওদের দেখে যা নয় তাই বললেন। আমাদের স্কুলের একমাত্র দিদিমণি শীলা মাজি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “এত বুড়োধাড়ি ছেলেরা কান ধরে নিলডাউন দিয়ে আছ? লজ্জা করে না!”
ওই সুন্দর নিয়মটি এরপর বন্ধ হয়ে যায়। মানে স্যার বারণ করেননি। তবে কারুর আর সাহস ছিল না।

মদনবাবু ক্লাস নাইন এ-তে ইংরেজি পড়াতেন। রিডিং পড়তে দিতেন তিনি। একেকটা করে প্যারা পালা করে পড়ে যেতে হত। অনন্ত রিডিং পড়া শুরু করলেই তিনি তার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াতেন। অনন্তের পা কাঁপতে শুরু করত। কিছুতেই আর মুখ দিয়ে the বেরোত না। দিহি দিহি করত। মদনবাবু ধমকে উঠতেন, “দিহি আবার কী রে!” ও আরও ঘাবড়ে যেত।
টিঙ্কু তখন সবে আমাদের ক্লাসে এসেছে। আগে এক ক্লাস উপরে ছিল। সে একেবারে খাস বিলিতি উচ্চারণে পড়ত। যা খুশি তাই বলে যেত। যেমন ‘ফ্যাটারে খ্যাট আলিউকি ইনঢ্যাস ট্যান’ ইত্যাদি। মদনবাবু একবার দু’বার ‘কী কী’ করে উঠতেন। তবে ওকে বেশি ঘাঁটাতেন না।
মদনবাবু সম্ভবত ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। টিঙ্কুও একটি দুঃখজনক ঘটনার পরে আর নেই। কর্কেট বলে পাড়া-বেপাড়ার ক্রিকেট ম্যাচে ও কিছুদিন আমার বোলিং পার্টনার ছিল। তবে অনন্ত শুনেছি এখন নেতা।
এই সময়টায়, যখন টিঙ্কুর সঙ্গে খেলি, তখন আমাদের টিমের একজন সিনিয়র সদস্য ছিল অমলদা। অমল নন্দী। ডাকনাম বুড়ো। আমার থেকে বছর ছয়-সাতের বড়ো ছিল সে। ওর বাবা রেলের চাকুরে, আর অমলদা শিক্ষিত, বেকার, বড়ো ছেলে। পকেটমানির জন্য পাশের গ্রামে গৃহশিক্ষকতা করত। টিমে স্ট্যাটাস স্পিনার এবং ডেলিভারি স্টাইলে সামান্য সমস্যা ছিল। চাক করত।
সেই আমলে, সেই পিচে, মুরলিধরনের থেকেও বেশি বল ঘোরাত অমলদা। স্টেশনপাড়ার হয়ে তপসি গ্রামের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে ও প্রায় দু’হাত করে বল ঘোরাচ্ছিল। গ্রামের ব্যাটসম্যানেরা ছুঁতেই পারছিল না ডেলিভারিগুলো। তখন দর্শকদের মধ্যে কয়েকটি ছেলে ওকে স্লেজিং করতে শুরু করল। বল করতে গেলেই আওয়াজ আসে, “বুড়া মাস্টার, ছুড়া বল! বুড়া মাস্টার, ছুড়া বল!”

হাইস্কুলের বৈদ্যনাথবাবুর কথা বলি। ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন। চেন স্মোকার। শরীর খারাপ হওয়ায় সিগারেট নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবুও অভ্যাসবশে ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে না জ্বালানো একটি সিগারেট থাকত সবসময়। ইলেভেনের ক্লাসে বোর্ডে একটি অঙ্ক নিজে করে দিয়ে বলতেন, “করে এস।” তারপর চেয়ারে বসে পড়তেন।

স্কুলের অনেক শিক্ষকের কথাই বলা হল না। বাংলার দ্বারিকাবাবু, ইংরেজির মহম্মদ গণিবাবু, বায়োলজির বিপত্তারণবাবু। আমার কম্পিউটারের স্যার বিমান কুণ্ডুর কথাও বলিনি। সব লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।
আসলে সাদা চোখে দেখলে মনে হতে পারে, শিক্ষকেরা অন্যান্য চাকুরিজীবীদের থেকে আলাদা কিছু নন। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, সব প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে এই সময়ে। আগের আমল আর নেই, যখন গুরুর ঘরে বা আশ্রমে ছাত্ররা থাকত, খেত। প্রশাসক, ছাত্র, অভিভাবক আর শিক্ষক, সব ক্ষেত্রেই সমাজের ব্যাধিগুলি প্রকট হয়ে উঠেছে এখন। তবুও আমার মতো কিছু সাধারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি সময়টাতে শিক্ষকেরা থাকেন মধুর স্মৃতির আবশ্যক অঙ্গ হয়ে। এই অধিকারটা তাঁদের কাছ থেকে কেউ কোনওদিন কেড়ে নিতে পারবে না।

_____

No comments:

Post a Comment