গল্পঃ রূপকথাঃ সায়নদীপা পলমল



“জেঠিমা, স্যার আছেন?”
“যাবে কোথায়! ভেতরের ঘরে গিয়ে দেখ গে বুড়ো নির্ঘাত একগাদা কাগজপত্র নিয়ে বসে আছে।”
অন্যদিনের মতো আজ জেঠিমার কথা শুনে হাসল না তূর্য। নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে দেখল হ্যারিকেন জ্বেলে মেঝেভর্তি কাগজপত্র নিয়ে ডায়েরিতে কিছু লিখতে ব্যস্ত করুণাময়ী প্রাইমারি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক তীর্থঙ্কর সেন। বয়সের ভারে দৃষ্টি কমে এসেছে অনেকটাই। কারেন্ট না থাকলে ওই মোটা দুটো কাচের ফাঁক দিয়ে দেখতে অসুবিধা হয় ভালোই। কিন্তু তাও কাজে বিরাম নেই তাঁর।
তূর্য নরম গলায় ডাকে, “স্যার।”
“হুঁ। কে?” মুখ তুলে তাকান তীর্থঙ্করবাবু।
“স্যার, আমি।”
“ওহো, তূর্য! বল, কী খবর।”
“স্যার, বলছি যে বইঘর থেকে রূপকথার এবারের কপি ফেরত এসেছে।”
“ক’টা?”
“উম… প্রায় সবগুলোই, স্যার। সর্বসাকুল্যে মোটে পাঁচটা কপি বিক্রি হয়েছে এবারে।”
“ওহ্‌, রেখে যা ওদের।”
বেরিয়ে যাওয়ার আগে হ্যারিকেনের হলদে আলোয় তূর্যর মনে হল ওই তীক্ষ্ণ চোখদুটোকে আড়াল করে রাখা কাঁচদুটো যেন ঝাপসা হয়ে গেল আচমকাই।
তূর্যর রেখে যাওয়া ব্যাগটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তীর্থঙ্করবাবু। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে সেই কলেজ জীবন থেকে ইচ্ছে ছিল ছোটোদের জন্য মনের মতো একটা পত্রিকা বের করবেন। সেই ইচ্ছেরই রূপান্তর ‘রূপকথা’। চাকরি পাওয়ার পর ইচ্ছেটা অবশেষে পূরণ হয়েছিল। টানাটানির সংসারে শত গঞ্জনা সহ্য করেও পত্রিকা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সবদিন তো আর সমান যায় না, রিটায়ারমেন্টের পর একদিকে রোজগার কমলেও অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ছাপার কালি আর কাগজের খরচ। তবুও তখন দমে যাননি তীর্থঙ্করবাবু। কিন্তু পাঠক যখন বিমুখ তখন সম্পাদক আর কী বা করতে পারে! ছোটো ছোটো শিশুগুলোর মোটা মোটা পড়ার বই সঙ্গে স্মার্ট ফোনের আভিজাত্যের কাছে আর যেন এঁটে উঠতে পারছে না রূপকথা।


সারারাত ধরে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছেন তীর্থঙ্করবাবু। তাঁর রূপকথার রঙিন পৃথিবীটা এসে গ্রাস করছে একটা ধূসর দানো, কিন্তু রাজা হয়েও তিনি কিছুতেই ওই দানোকে হত্যা করে বাঁচাতে পারছেন না তাঁর সাধের রাজ্যকে।
সকাল হতেই রূপকথা-ভর্তি ভারী ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তীর্থঙ্করবাবু। তাঁর মানসকন্যা আজ মৃতা। সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। কিচ্ছু করার নেই আর।
“এই যে মাস্টারমশাই, ভালো হল আপনাকে পেয়ে গেলাম। আপনার দুটো চিঠি এসেছিল কাল, দিতে আসতে পারিনি।”
স্থানীয় পোস্ট অফিসের পিওনের হাত থেকে খামদুটো নিলেন তীর্থঙ্করবাবু। কী মনে হতে হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে ওখানেই খুললেন খামদুটো। প্রথমটা রূপকথার প্রতি অকুন্ঠ ভালোবাসা জানিয়ে লেখা একটা চিঠি, সেই সাথে পরের সংখ্যা সময়মতো পাঠানোর আবদার আর অন্যটা রূপকথার জন্য পাঠানো একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি। বিগত দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে নিয়মিত আসে এই চিঠি দুটো। প্রেরকদের কোনোদিনও দেখেননি তীর্থঙ্করবাবু, তারাও দেখেনি এই প্রবীণ সম্পাদককে, কিন্তু তবুও তারা চেনেন পরস্পরকে। তিনজনেই যে একই রূপকথার রাজ্যের বাসিন্দা।
সকাল থেকে আকাশটা কেমন মেঘলা করে ছিল। এতক্ষণে মেঘ সরে গিয়ে উঁকি দিল সূর্যটা। আর সেই সঙ্গে কোন গাছের ওপর থেকে একটা পাখি শিস দিয়ে উঠল আনন্দে। চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল বৃদ্ধ সম্পাদকের। খোলা খামদুটো বুকের কাছে চেপে ধরলেন তিনি। নিজের হৃদয় দিয়ে আজ আবার নতুন করে অনুভব করতে পারলেন রূপকথার হৃৎস্পন্দন।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment