অণুগল্পঃ সেবকঃ অরিন্দম দেবনাথ


আজ আমার প্রাণপ্রিয় সেবকের অপমৃত্যু ঘটিয়াছে।
এই সেবকটিকে আমি বহু বৎসর পূর্বে উড়িষ্যার পুরী শহর হইতে সংগ্রহ করিয়াছিলাম। উহা এক ব্যাক্তির স্কন্ধে চাপিয়া পরিভ্রমণ করিতেছিল। দূর হইতে উহাকে দেখিয়া আমার খুব মনে ধরে। যাহার স্কন্ধে ছিল, সে নিতান্তই দরিদ্র ব্যক্তি। সেবকটিকে আমি সঙ্গে লইয়া যাইতে চাহি শুনিয়া সে কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। কহিয়াছিল, “বাবু আমি দরিদ্র মানুষ। আমার থাকিবার নির্দিষ্ট কোনও স্থান নাই। উহাকে সঠিক মর্যাদা দিয়া লালন করিবার ক্ষমতাও আমার নাই। তাই কাঁধে করিয়া উহাকে লইয়া ঘুরিয়া বেড়াই। রৌদ্রের তাপে উহার স্বর্ণবর্ণ খানিক ম্লান হইয়াছে ঠিকই, কিন্তু উহাকে দেখিয়া আকৃষ্ট হইয়া আমার নিকট বহু মানুষ আসেন ও আমার নিকট হইতে যৎসামান্য পসরা খরিদ করেন। তাহাতেই আমার কায়ক্লেশে দিন চলিয়া যায়। উহাকে ছাড়িবার কোনও মনোবাসনা আমার নাই।”
খানিক অধিক অর্থের লোভ দেখাইয়া উহাকে সংগ্রহ করিয়া একরকম আমার স্কন্ধে চাপাইয়াই উহাকে গৃহে লইয়া আসিয়াছিলাম। ট্রেনে আসিবার পথেই উপলব্ধি করিয়াছিলাম যে ‘রতন’ চিনিতে আমার ভুল হয় নাই। পথিমধ্যে আমার শ্রান্ত গাত্রমর্দনে সে আমাকে সাহায্য করিল। গৃহে আনিবা মাত্র সবাই উহাকে নিজ-সেবক বানাইবার নিমিত্ত কোলাহল জুড়িয়া দিয়াছিল।
প্রথমদিন হইতেই সে আমার প্রিয় সেবকের স্থান দখল করিয়া লইল। আমি যতক্ষণ গৃহে থাকিতাম, সে প্রায় সর্বক্ষণ আমার আমার সাথে থাকিত। এই লইয়া আমাকে পরিবারের কাছ হইতে অনেক বিদ্রূপ ও গঞ্জনা সহ্য করিতে হইত। আমি মুখ বুজিয়া সব শুনিয়া লইতাম। অনেকেই উহার সেবা লইবার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু আমি অতি অত্যন্ত চতুরতার সহিত উহাকে অন্যকে সেবা দিবার হাত হইতে রক্ষা করিয়াছি।
কাহারও প্রতি মন-প্রাণের টান এমনিতে আসে না। গ্রীষ্মে যখন আমার সর্ব শরীর দিয়া দরদর করিয়া স্বেদ বহিয়া যাইত তখন সে পরম মমতায় তাহা মুছাইয়া দিত। বর্ষায় বাহির হইতে আদ্যান্ত ভিজিয়া যখন গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতাম তখন আমার প্রিয় সেবক আমাকে শুষ্ক করিয়া তুলিত। গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ চলিয়া গেলে সে ক্রমাগত দুই পার্শ্বে হেলিয়া আমাকে বাতাস করিত।
এই তো, গত সপ্তাহে এক তস্কর আমাদের গৃহে প্রবেশ করিয়াছিল। আমার সেবককে বাধ্য করিয়াছিল গৃহের অনেক তৈজস বহন করিতে। উপায়ন্তর না দেখিয়া আমার সেবক নিজেকে বিদীর্ণ করিয়া বর্তনের আওয়াজ তুলিয়া সকলকে জাগাইয়া তুলিয়া চোরকে পলায়নে বাধ্য করিয়াছিল। পরদিবস অতি প্রত্যূষে আমি আমার সেবককে লইয়া উহার ক্ষত নিরূপণ করায়াই লইয়া আসি।
নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন ধরিয়া ক্রমান্বয়ে সেবা করিতে করিতে উহার গাত্র কিঞ্চিত মলিন হইয়াছিল। আমারই দোষ, আমি উহার ঠিকমতো পরিচর্যা করি নাই। তস্কর হইতে গৃহ-সম্পদ রক্ষা করিবার পর উহাকে লইয়া আমার বাড়ির সকলের উদ্বেগ বৃদ্ধি পাইয়াছিল। উহার গ্লানি দূর করিতে আমার মাতা উহাকে নির্মল করিতে সাবান ঘষিয়া প্রক্ষালন করাইতেই, ক্রমাগত ধকল সহ্য করিতে থাকা সেবকের দেহ ছাড়িয়া গেল। আমাকে ছাড়িয়া অন্য লোকে চলিয়া গেল আমার বিশ্বস্ত সেবক, আমার প্রিয় গামছা।


_____

No comments:

Post a Comment