চলো যাইঃ পাতাল শহর ডেরিনকুয়ুঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়



নির্জন প্রান্তরে এক গুহা-মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মনের ভিতর নানা প্রশ্নের ঝড় বইছে। কী আছে ওই গুহার ভিতর? সাতরাজার ধন? সেসব কি পাহারা দিচ্ছে দৈত্যদানোর দল, নাকি ভূতপ্রেতেরা? ভিতরে যাওয়া কি ঠিক হবে? ওরা ঘাড় মটকে দেবে না তো? পাতালঘরে বন্দি করেও তো রাখতে পারে! কোনও কল্পকাহিনি লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এলে এতক্ষণে রাজপুত্রের মতো হাতে তলোয়ার নিয়ে গুহায় ঢুকে যেতাম। কিন্তু আমি তো আর সেই কারণে আসিনি। এসেছি তুরস্কের নেভশেহির প্রদেশের কাপাডোশিয়ার এই গুহার রহস্য আর ইতিহাস জানতে।
ভূগোল বইয়ে তোমরা নিশ্চয়ই তুরস্ক দেশের নাম পেয়েছ। মানচিত্রে এর অবস্থান দেখার সময় খেয়াল করেছ কি দেশটা একই সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়া এই দুই মহাদেশেই রয়েছে? তবে বেশিরভাগটাই আছে এশিয়ায়, প্রায় ৯৭ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আনাতোলিয়া উপদ্বীপের সম্পূর্ণ অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের অংশবিশেষ নিয়ে এই দেশটি গঠিত। এশিয়ার অংশটি মূলত পাহাড়ে ঘেরা উঁচু মালভূমি। সমভূমি দেখতে পাওয়া যায় শুধুমাত্র উপকূল এলাকায়। দেশটির যে তিন শতাংশ এলাকা ইউরোপে রয়েছে তা ত্রাকিয়া বা থ্রেস নামে পরিচিত। দেশের প্রায় দশ শতাংশ মানুষই এখানে বাস করে। তুরস্ক নামের উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ ‘তুর্চিয়া’ থেকে। এর অর্থ তুর্কদের দেশ। এই অঞ্চলে তুর্কি জাতির বসবাস শুরু হয় সম্ভবত প্রারম্ভিক মধ্যযুগে। তুরস্কের ও গোটা ইউরোপের সবচেয়ে জনবহুল শহর ইস্তাম্বুল বা ইস্তানবুল এখানেই অবস্থিত। এই ইস্তাম্বুল থেকেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল ডেরিনকুয়ু পাতাল শহরের উদ্দেশ্যে। প্রায় ৭৫০ কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে গাইড আসার অপেক্ষায় এখন আমি ভূ-গর্ভস্থ শহরে ঢোকার একটি প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে।

ইস্তাম্বুল তুরস্কের অন্যতম প্রধান শহর। এর পুরনো নাম কন্সটান্টিনোপল। একসময় এটি বাইজান্টিয়াম নামেও পরিচিত ছিল। ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে কন্সট্যান্টাইন বাইজেন্টিয়ামকে রোমান সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং এর নাম পরিবর্ত করে রাখেন নতুন রোম। ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম থিওডসিয়াসের মৃত্যুর পর রোম সাম্রাজ্য বিভক্ত হলে এই নগরীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কন্সটান্টিনোপল এবং পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী করা হয়। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এখানে। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত তুরস্কের রাজধানীও ছিল ইস্তাম্বুল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজধানী স্থানান্তরিত হয় আংকারায়।
ইস্তাম্বুলের প্রধান আকর্ষণ বসফোরাস। এশিয়া ও ইউরোপকে একত্রে বলা হয় ইউরেশিয়া। এই দুটি মহাদেশকে ভাগ করে রেখেছে এই বসফোরাস প্রণালী। অনন্য সৌন্দর্যের নিদর্শন খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হাজিয়া সোফিয়া দেখতে হলে আসতে হবে এই শহরেই। এতটাই সাজানো-গোছানো শহর যে দেখে মনে হয় কোনও শিল্পীর তুলিতে আঁকা ত্রিমাত্রিক চিত্রশিল্প।

গাইড আসতেই ঢুকে পড়লাম ভূপৃষ্ঠ থেকে ৬০ー৮০ মিটার নিচে থাকা ডেরিনকুয়ু শহরে। যতই শহরের ভিতরে ঢুকছি ততই অবাক হচ্ছি এর স্থাপত্য-নকশা দেখে। আগ্নেয়শিলা দিয়ে তৈরি এই গুহা-শহরটি তৈরি হয়েছিল ৭মー৮ম খ্রিস্টপূর্ব সময়ের মধ্যে। এটি তৈরি করেছিল তুরস্কের কাপাডোসিয়া অঞ্চলের ফ্রিজিয়ান গোষ্ঠীর লোকেরা। মূলত লুটতরাজ ও শত্রুপক্ষের হামলা থেকে শহরবাসীদের বাঁচাতে তারা এধরনের একটি গুপ্ত আস্তানার পরিকল্পনা করেছিল। সেই সময় এখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে আরবের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। অনেকের ধারণা, আরব-বাজেনটাইন যুদ্ধের সময় স্থানীয় অধিবাসীরা দীর্ঘ সময়ের জন্য এই পাতাল শহরে আস্তানা গেড়েছিল।

এই পাতাল শহরে একসঙ্গে কুড়ি হাজার লোকের বসবাসের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ছিল। শহরে ঢোকার জন্য ছিল ছ’শোর মতো দরজা। সেগুলি এমনভাবে লুকানো থাকত যে শত্রুপক্ষ কোনওভাবেই তার হদিস পেত না। শত্রু সৈন্য শহরে ঢুকে দেখত সমস্ত বাড়িঘর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ধনসম্পদ নিয়ে মানুষজন রাতারাতি কোথায় উধাও হয়ে গেছে তা বোঝার আগেই অতর্কিত আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে তারা পালানোর পথ খুঁজত। সুষ্ঠু বায়ু চলাচলের জন্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় পঞ্চান্ন মিটারের মতো লম্বা বিশালাকার চিমনি প্রায় হাজার দেড়েক বসানো হয়েছিল। এগুলোও বসানো হয়েছিল এমনভাবে যে উপর থেকে এর হদিস পাওয়া কোনওমতেই সম্ভব ছিল না। জল সরবরাহেরও সুবন্দোবস্ত ছিল। শহরের ভিতরে যত ঢুকছি তত মনে হচ্ছে অসংখ্য সুড়ঙ্গ, রাস্তা ও  গলির বিন্যাস যেন এক গোলকধাঁধা। গাইড সঙ্গে না থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন কাজ।

একসময় চার-পাঁচতলা বাড়ি আমরা অবাক হয়ে দেখতাম। মনে মনে বলতাম, বাব্বা, কত বড়ো বাড়ি! এখন অবশ্য একশো-দেড়শো তলার বাড়িও আমাদের মনে তেমন আঁচড় কাটে না। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম যখন গাইড বলল, ডেরিনকুয়ু একটি বহুতল শহর। প্রথমে তার কথা বিশ্বাস না করলেও পরে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন সে একের পর এক তলায় নিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল কোন তলা কী কাজে ব্যবহার করা হত।
এই পাতাল শহরে একসঙ্গে কুড়ি হাজারের মতো লোক থাকতে পারত। প্রয়োজনে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাদের থাকতে হত। তাই পর্যাপ্ত খাদ্য ও জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী মজুত রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এক প্রকাণ্ড গুদামঘর। যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হত ঘোড়া। তাদের রাখার জন্য আস্তাবলও ছিল। ছিল স্কুল, গির্জা, তেলের ঘানি, ভোজন কক্ষ, প্রার্থনা কক্ষ ইত্যাদি। শহরের দ্বিতীয় তলা ব্যবহার করা হত প্রার্থনা এবং ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষার কাজে। এই তলাতেই খুঁজে পাওয়া গেছে কিছু সমাধি। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল লম্বা লম্বা নলাকৃতি রাস্তা।
বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। গাইডের কাছে শুনলাম, ডেরিনকুয়ু পাতাল শহরের আশেপাশে আরও বেশ কয়েকটি পাতাল শহরের খোঁজ পাওয়া গেছে। এই শহরগুলির প্রত্যেকটির সঙ্গে প্রত্যেকটির সুড়ঙ্গ পথে যুক্ত। এরকমই একটি শহর কায়ামাকলি বা ইনিগাপ। ডেরিনকুয়ু ও এই শহরের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য রয়েছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার লম্বা একটি সুড়ঙ্গ পথ।

১৪ শতাব্দীতে মঙ্গোলীয়দের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য খ্রিস্টানরা এই পাতাল শহরে লুকিয়ে থাকত। অটোম্যান সাম্রাজ্যের সময় মুসলিম শাসকেরা এই পাতালপুরীটি ব্যবহার করতেন শরণার্থী-শিবির হিসেবে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে তাঁরা এটিকে টর্চার সেল-এ পরিণত করেন। কাপাডোসিয়ান-গ্রিক অধিবাসীদের ধরে এনে তাঁরা এখানে নির্যাতন চালাতেন। ১৯২৩ সালে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। সেই মোতাবেক উভয় দেশের মধ্যে জনগণ বিনিময়ের সময়ে খ্রিস্টান অধিবাসীগণ চূড়ান্তভাবে ডেরিনকুয়ু পাতাল শহর ছেড়ে চলে যান।
এরপরে বেশ কয়েক বছর শহরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। অবশেষে এটি সংস্কার করে ১৯৬৯ সালে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এখন তোমরাও যেতে পার এই আশ্চর্য শহর দেখতে। তবে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে, শহরে ঘোরার সময় অতি সাবধানে অসংখ্য সিঁড়ি পার হতে হবে। এরপরেও পুরো শহর দেখা হবে না। অর্ধেক দেখেই ফিরে আসতে হবে। সংস্কার না হওয়ায় বাকি অর্ধেকে ‘প্রবেশ নিষেধ’ বোর্ড ঝোলানো রয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ
Wikipedia
https://en.wikipedia.org/wiki/Derinkuyu_underground_city
https://en.wikipedia.org/wiki/Derinkuyu
https://www.historicmysteries.com › Archaeology

https://www.britannica.com/place/Turkey

No comments:

Post a Comment