বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ অতিপরিবাহিতাঃ নীলোৎপল ঘোষ



পদার্থকে ঠাণ্ডা করলে কী হয় এটা একটা মজার প্রশ্ন। সবচেয়ে কম তাপমাত্রা কত হতে পারে? উত্তরটা অবশ্য ১৮৪৮ সালে পাওয়া গিয়েছিল, -২৭৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (0 ডিগ্রি কেলভিন/ 0K, লর্ড কেলভিন-এর নামানুসারে)। সেই তাপমাত্রায় পদার্থকে নিয়ে গেলে কী হবে? অনেকে এটা নিয়ে নানারকম ভাবনাচিন্তা করেছেন। আমরা জানি যে পদার্থকে ভাঙলে প্রথমে অণু (মলেকুল) তারপর পরমাণু (অ্যাটম), আরও ভাঙলে নিউক্লিয়াস পাওয়া যায়। তার মধ্যে থাকে নিউট্রন আর প্রোটন, আর বাইরে ঘোরে ইলেকট্রন। এমন কী হতে পারে যে, ঠাণ্ডা হলে অ্যাটমের মধ্যে ইলেকট্রনগুলো নিজেদের কক্ষে ঘোরা বন্ধ করে থেমে যাবে?
সামান্য ছোট্ট কণা ইলেকট্রন, অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে—কখনও একা, কখনও বা জোট বেঁধে। ইলেকট্রনের গতিবিধির উপর পদার্থের পরিবাহিতা ধর্ম নির্ভর করে। আমাদের চারপাশে নানারকম পদার্থ  আছে—কেউ সুপরিবাহী (conductor), কেউ অর্ধপরিবাহী (semi-conductor), আবার কেউ অপরিবাহী (insulator)। তাপমাত্রার সাথে এদের পরিবাহিতার পরিবর্তন হয়। কিন্তু অতি নিম্ন তাপমাত্রায়, 0K-এর কাছাকাছি কী হবে? প্রায় ১০৮ বছর আগে, এই প্রশ্নর উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন  হাইকে ক্যামেরলিং ওঁনস (Heike Kamerlingh Onnes), প্রফেসর অফ ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট, লেইদেন (Leiden) ইউনিভার্সিটি, নেদারল্যান্ডস, ১৯১১ সালে। ওই সময় তিনি তাঁর ল্যাবরেটরিতে এত কম তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি আর তাঁর ছাত্ররা বিভিন্ন পদার্থকে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় নিয়ে গেলে পরিবাহিতার কী পরিবর্তন হয়, তা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। একদিন তাঁর এক ছাত্র পারদের (Mercury) পরিবাহিতা (conductance) মাপতে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, 4K-এর কম তাপমাত্রায় পারদের পরিবাহিতা অসম্ভব বেড়ে যায়। অথবা বলা যায় যে ওই তাপমাত্রায় পারদের রোধ (resistance) হঠাৎ প্রায় ২০০০০ ভাগ কমে যায়। এই ঘটনাটা ছিল আকস্মিক। হয়তো কোনও  শর্ট সার্কিট হয়েছে, এরকমই ভেবেছিল সবাই। কিন্তু এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে ওঁনসকে নোবেল প্রাইজ এনে দেয়, কারণ সেটা ছিল অতিপরিবাহিতার (superconductivity) জন্ম।
এই ঘটনাটাকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য ওঁনস পারদের একটা রিং নিয়ে তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত করে দেখেন। স্বাভাবিকভাবে কিছুক্ষণ বাদে তড়িৎপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবার কথা, কারণ  ধাতুর রোধ সবসময় তড়িৎপ্রবাহে বাধা দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে, যতক্ষণ পারদের তাপমাত্রা কম ছিল, তার ভেতর দিয়ে তড়িৎপ্রবাহে কোন বিঘ্ন ঘটেনি। এটা আরেকটা অসাধারণ ঘটনা, যার ব্যাখ্যা সেই সময় বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। সাধারণভাবে মনে করা হত যে ইলেকট্রনের গতির জন্য পদার্থর মধ্যে তড়িৎ প্রবাহিত হয়। এই সময় ইলেকট্রনের সাথে পদার্থের মধ্যে থাকা পরমাণুগুলোর ঘর্ষণ হয়, যার কারণে বাধার সৃষ্টি হলে পরিবাহিতা কমে যায়, অর্থাৎ রোধাঙ্ক বাড়ে। কিন্তু কম তাপমাত্রায় পারদের মধ্যে দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন এই তড়িৎপ্রবাহ, তৎকালীন প্রচলিত কোনও থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেল না। তবে এই আবিষ্কার এরপর আরও অন্যান্য ধাতু নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। দেখা যায় একটা নির্দিষ্ট  সঙ্কট তাপমাত্রার (Critical Temperature, TC) নিচে অনেক পদার্থ অতিপরিবাহিতা দেখায় (নিচের টেবিল দেখো)।


মৌল (Element)
Tc (K)
যৌগ( compound)
Tc (K)
Hg 
Nb
Pb
Tc
Pb
Al
Sn
In
4.15
9.10
7.19
11.20
7.19
1.2
3.7
3.4
Nb3Ge
V3Si
Nb3Sn
ZrV 2
YNi2B2C
YBa2Cu3O7
(Ba,K)Fe2AS
SmFeAS(O,F)
23.2
17.10
18.05
11.0
15.5
90
38
55


এরপর অতিপরিবাহিতা নিয়ে অনেক গবেষণা চলতে থাকে, কিন্তু জুতসই থিওরি পাওয়া বেশ কঠিন বলে পরিগণিত হয়। এর মধ্যে (১৯৩৩) আরেকটা নতুন আবিষ্কার করে ফেলেন মেইসস্নের (Meissner) এবং অকশেনফেলদ (Ochsenfeld) নামের দুইজন বিজ্ঞানী। এই ব্যাপারটা অতিপরিবাহিতা (superconductivity) এর চুম্বকত্ব (magnetism) ধর্মের সাথে যুক্ত।
তোমরা লোহার চুম্বকত্ব সম্বন্ধে সবাই জানো। চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে। যদি কোনও লোহার টুকরোকে চুম্বকের কাছে রাখা যায়, সমস্ত বলরেখাগুলো লোহার মধ্যে দিয়ে যায়। সেইজন্য লোহাকে electromagnet হিসাবে অনেক সময় ব্যবহার করা হয়। অতিপরিবাহকের ধর্ম ঠিক বিপরীত। এর কাছে কোনও চুম্বক আনা হলে, বলরেখাগুলো অতিপরিবাহকের থেকে দূরে সরে যায়। এটাকে বলা হয় diamagnetism। এই ঘটনা পরবর্তীকালে মেইসস্নের এফেক্ট (Meissner Effect) নামে পরিচিত হয়। ১৯৩৫ সালে ফ্রিত্‌য লন্ডন (Fritz London)  এবং তাঁর ভাই হেইনয (Heinz) অতিপরিবাহিতার ব্যাখ্যা করতে তাত্ত্বিকভাবে খানিকটা অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁদের অঙ্কের হিসাবনিকাশ থেকে মেইসস্নের এফেক্ট (Meissner Effect) এবং নিরবিচ্ছিন্ন তড়িৎপ্রবাহ (Persistence current) যে বিশেষভাবে সম্পর্কিত, সেটা বোঝা সম্ভব হয়। ঐ সময় আরেকটা আবিষ্কার অতিপরিবাহিতা ব্যাখ্যা করতে দারুণ সাহায্য করেছিল, যা পরবর্তীকালে আইসোটপ এফেক্ট ( Isotope Effect) নামে পরিচিত হয়। তোমরা জানো যদি দুটি পদার্থের নিউক্লিয়াসের ওজনের পার্থক্য থাকে, তাদের আইসোটপ বলা হয়। পারদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে আইসোটপের নিউক্লিয়াসের ওজন বেশি, তার নির্দিষ্ট সঙ্কট তাপমাত্রা (Critical Temperature, TC) কম। ১৯৫০ সালে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন প্রায় একই সাথে দুটি গবেষকের দল, দুটি ভিন্ন জায়গায়—Rutgers University এবং (National) Bureau of Standards। এখান থেকে এটা বোঝা গিয়েছিল যে অতিপরিবাহিতার সাথে নিউক্লিয়াসেরর ওজনের (তথা পরমাণুর) কোনও সম্পর্ক আছে। এরপর আরও প্রায় ৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল অতিপরিবাহিতার সঠিক ব্যাখ্যা পেতে, যেটা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ত্রয়ী বারদিন (Bardeen), কুপার (Cooper) এবং  শ্রীফার (Schrieffer)। তারা প্রমাণ করে দেখান সুপরিবাহীর মধ্যে যে পরমাণুর কম্পন স্বাভাবিকভাবে ইলেক্ট্রনের গতির বাধার কারণ হয়, সেই পরমাণুর কম্পন অতিপরিবাহীর ইলেক্ট্রনদের বাধাহীনভাবে চলতে সাহায্য করে। তারা ইলেক্ট্রনের জোড় বাঁধার (pair formation) এবং জোট বেঁধে চলার কথা বলেন, যেমন কোনও নৃত্যশালায় অসংখ্য দম্পতি-নৃত্যশিল্পী যদি একসাথে নৃত্য সঞ্চালন করেন। এই ব্যাখ্যার জন্য বারদিন (Bardeen), কুপার (Cooper) এবং শ্রীফার (Schrieffer) নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭২ সালে।
অতিপরিবাহিতা আবিষ্কারের সাথে সাথে পদার্থর এই ধর্মের প্রযুক্তিগত এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। যেহেতু অধিকাংশ ধাতুর সঙ্কট তাপমাত্রা বেশ কম, সংকরধাতু নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ১৯৬২ সালে প্রথম অতিপরিবাহী তার দিয়ে ইলেক্ট্রোম্যাগনেট (Electromagnet) বানানো সম্ভব হয়েছিল Westing House Research Laboratory, Pennsylvania-তে। এই ধরনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেট MRI (Magneto resonance Imaging) এর জন্য ব্যাবহার হয়। ১৯৮৬ সালে বেদনরজ (Bednorz) এবং মুলার (Mueller) নামে দুই বিজ্ঞানী এক নতুন কপার-ভিত্তিক (Copper based)  পদার্থ আবিষ্কার করেন, যেটি সাধারণভাবে অপরিবাহী, কিন্তু তার সঙ্কট তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি কেলভিন। এটা ছিল উচ্চ-সঙ্কট তাপমাত্রা অতিপরিবাহিতার (High-TC Superconductivity) জন্ম, আরেকটা যুগান্তকারী আবিষ্কার, যার জন্য তাঁরা নোবেল পেয়েছিলেন একবছর বাদে। এরপর  উচ্চ-সঙ্কট তাপমাত্রা অতিপরিবাহিতাকে বোঝার জন্য অনেক কাজ হয়েছে এবং এখনও গবেষণা চলছে।
এই প্রসঙ্গে বলা যায়, ২০০৬ এবং ২০০৮ সালে লৌহ-ভিত্তিক কিছু নতুন পদার্থের মধ্যে অতিপরিবাহিতা দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান লেখক এই বিষয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। সম্প্রতি জার্মানিতে, ল্যানথানাম সুপারহাইডরাইড নামে একটি পদার্থে উচ্চ চাপে অতিপরিবাহিতা আবিষ্কার হয়েছে ২৫০ ডিগ্রি কেলভিন (-২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) তাপমাত্রায়। ভারতে বিজ্ঞানের এই শাখায় গবেষণা এখন বেশ অগ্রগামী। এর মধ্যে অনেক গবেষণাপত্র ‘নেচার’, ‘সায়েন্স’ ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। বেঙ্গালুরুর একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ঘরের তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতা নিয়ে ব্যাপক কাজ চলছে। পাশাপাশি চলছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে গবেষণা। অতিপরিবাহিতা আর ক্যুবিট (Qubit)  নিয়ে সারা বিশ্ব তথা ভারতে অনেক কাজ হচ্ছে। ভারত সরকার এইসব বিষয়ে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করছেন। তাই অদূর ভবিষ্যতে আমরা অতিপরিবাহিতার প্রযুক্তিগত প্রয়োগের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী।


কৃতজ্ঞতা : Superconductivity - Moments of Discovery (ইন্টারনেট)

2 comments:

  1. An excellent synopsis of historical developments in super conductivity told in a language easily understandable by the uninitiated. Thanks to the author

    ReplyDelete
  2. Thanks to Dr Nilotpal Ghosh , for explaining superconductivity very simplified way.

    ReplyDelete