উপন্যাসঃ কেমিক্যাল বিভ্রাটঃ সিদ্ধার্থ সিংহ




এক


দরজা খুলতেই ঔপমানব দেখলেন আঠারো-উনিশ বছরের একটা গাট্টাগোট্টা ছেলে তাঁর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাকে চাই? জিজ্ঞেস করার আগেই ছেলেটি জানতে চাইল, “আপনার নাম কি ঔপমানব?”
ঔপমানব হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়তেই সে বলল, “আপনি বোধহয় বাজারের এই ব্যাগদুটো রাস্তার উপরে রেখে এসেছিলেন, তাই নিয়ে এলাম। বেশ ভারী কিন্তু। আপনি কি ভিতর অবধি বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? না, আমিই পৌঁছে দিয়ে আসব?”
না না, পারব, পারব। থ্যাঙ্ক ইউ।”
“এতে আবার থ্যাঙ্ক ইউ বলার কী আছে? আপনাকেই তো আমার থ্যাঙ্ক ইউ জানানো উচিত। আপনি যদি এই চিরকুটে নামঠিকানা লিখে আনাজপত্রের এই ব্যাগের উপরে মানিব্যাগ দিয়ে চাপা দিয়ে রেখে না আসতেন, তা হলে আপনাকে খুঁজে বার করতে আমাকে কত হয়রানি হতে হত, একবার ভাবুন তো।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা অবশ্য ঠিক। আমি অস্বীকার করছি না। তবুও... থ্যাঙ্ক ইউ বাবা, থ্যাঙ্ক ইউ।”
“আবার থ্যাঙ্ক ইউ?”
“না না, ঠিক আছে, ঠিক আছে।”
গতকালই পুরী থেকে ফিরেছেন ঔপমানব। দুয়েক বছর পরপরই যান। আবার কখনও-সখনও বছরে দু’বারও হয়ে যায়। কিন্তু এবার তাঁর একদম অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। অন্যান্যবার দেখেছেন, অনেকেই, বিশেষ করে ইসকনের লোকেরা জলে নামার আগে তাঁদের মানিব্যাগ, চশমা, ঘড়ি-টরি রুমালে জড়িয়ে সি-বিচের বালির নিচে পুঁতে তার উপরে কোনও কিছু দিয়ে একটা চিহ্ন রেখে দেন। কিন্তু এবার দেখলেন, শুধু ওসবই নয়, তার সঙ্গে দামি মোবাইলও বালি-টালি না খুঁড়েই খোলা আকাশের নিচে সি-বিচের উপরে রেখেই অবলীলায় নেমে এলেন সমুদ্রে। সেদিকে একবার ফিরেও তাকালেন না।
শুধু তাই-ই নয়, জল বাড়তে বাড়তে আর একটু হলেই ঢেউ যখন ওগুলোকে ছুঁয়ে ফেলল বলে, তখনও তাঁর সে দিকে হুঁশ নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে বাচ্চাদের মতো ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করে যাচ্ছেন। ঔপমানব যখন ভাবছেন, এই রে, ঢেউ তো এবার ওগুলোকে ভিজিয়ে দেবে। টাকাপয়সা না হয় শুকিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু ঘড়ি বা মোবাইল? মোবাইলে জল ঢুকলেই তো গেল... ঠিক তখনই দেখলেন, সমুদ্রে নামতে আসা একজন লোক ওগুলোকে তুলে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখলেন।
ঔপমানব অবাক। এরকম আবার হয় নাকি! শুধু পুরীর সমুদ্রসৈকতেই নয়, খোদ পুরীর মন্দির প্রাঙ্গণেও ঘটে গেল আরও একটি ঘটনা। সন্ধের আগেই মন্দিরের লাগোয়া চাতালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বউ-ছেলে নিয়ে তিনি যখন চূড়ায় ধ্বজা বাঁধা দেখার জন্য উপর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন, দেখছেন, কোমরে এক গাদা ধ্বজা নিয়ে মন্দিরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে হনুমানের চেয়েও দ্রুত কী সুন্দর তরতর করে উঠে যাচ্ছেন এক সেবাইত। ভাবছেন, নতুনগুলো লাগিয়ে আগের ধ্বজাগুলি নিয়ে নামলেই তাঁর কাছ থেকে ধ্বজার একটা টুকরো কিনবেন। গতবারও একশো টাকা দিয়ে একটা কিনেছিলেন। পরে শুনেছিলেন, ওগুলো নাকি আসল নয়। নামার সময় অত্যন্ত কৌশলে অন্য কতগুলো কাপড়ের টুকরো নিয়ে এসে সেবাইত এমন ভান করেন, যেন এক্ষুনি এগুলি পেড়ে আনলেন। পুরীর মন্দিরের ধ্বজা বলে কথা! বহু লোক বিশ্বাস করেন, এগুলো বাড়িতে রাখলে সমস্ত বিপদ-আপদ কেটে যায়। ঘরে শান্তি ফিরে আসে। সন্তানসন্ততিদের মঙ্গল হয়। তাই অনেকেই টপাটপ করে একটা নয়, দুটো-তিনটে-চারটেও কিনে নেন। অথচ স্থানীয়রা বলেন, আসল ধ্বজাগুলো নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই ওঁরা নাকি হাত সাফাই করে সরিয়ে ফেলেন। পরে সেগুলোই লোক বুঝে অনেক চড়া দামে বিক্রি করেন। আবার যেদিন কেনার লোক অনেক বেশি থাকে, সেদিন নাকি সুযোগ বুঝে কখনও-সখনও নিলামও করেন। তখন যে বেশি দাম হাঁকেন, তখন নাকি তিনিই সেটা পান। যদিও গতবার যেটা কিনেছিলেন সেটা যে একশো শতাংশ খাঁটি, তার প্রমাণ স্বরূপ তাতে কিন্তু সিলমোহর মারা ছিল।
কিন্তু যেহেতু মনের মধ্যে একবার খটকা লেগেছে, তাই ওটা বাড়ি নিয়ে এলেও পাশের বাড়ির জয়া বউদি যখন বললেন, আমি তো কখনও পুরী যাইনি, আর এতদিনেও যখন হয়নি, আর কোনও দিন যাওয়া হবে বলেও আমার মনে হয় না। তুমি যদি এটা আমাকে দাও, তাহলে খুব ভালো হয়। আমি ঠাকুরের আসনে রাখব। তুমি যে দাম দিয়ে এটা কিনে এনেছ, সেই একশো টাকা না হয় আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। তুমি তো মাঝে মাঝেই পুরী যাও, আবার যখন যাবে, তখন না হয় কিনে নেবে।
ঔপমানব আর কথা বাড়াননি। ধ্বজাটা তাঁকে দিয়ে দিয়েছিলেন। জয়া বউদি খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু খুশি হননি তাঁর বউ জবালা। বলেছিলেন, “সাধ করে কোনও কিছু কিনে এনে এভাবে কি কেউ ঠাকুরের জিনিস কাউকে দেয়? একটা মঙ্গল-অমঙ্গল বলে কথা আছে তো, নাকি!”
ঔপমানব বলেছিলেন, “উনি যেভাবে বললেন, তারপরেও কি কাউকে না বলা যায়, বলো? ঠিক আছে, তোমাকে কথা দিলাম, এরপরে যখন যাব, তখন এর চেয়েও ভালো একটা নিয়ে আসব। কেমন? কী? এবার শান্তি তো?”
সেইমতো মনে মনে যখন ভাবছেন, ওই সেবাইত নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে ছেঁকে ধরার আগেই চট করে গিয়ে তিনি একটা ধ্বজার টুকরো কিনে নেবেন, সেজন্য আগেই হাতের মধ্যে রেডি করে রেখেছেন একটা একশো টাকার নোট।
কিন্তু কোথায় সেই সেবাইত? উনি তো নামলেন। কিন্তু গেলেন কোথায়? এখনও আসছেন না কেন? পায়ের সামনের আঙুলের উপরে ভর দিয়ে গোড়ালি উঁচু করে যতটা পারা যায় টানটান হয়ে সামনের কালো কালো মাথাগুলির ওপারে যখন ইতিউতি তাকাচ্ছেন, হঠাৎ খেয়াল করলেন, পিছন থেকে কে যেন তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে ডাকছেন। কে ডাকছেন? পিছন ফিরতেই দেখেন, একজন সেবাইত। চুপিচুপি তাঁর দিকে একটা ধ্বজা এগিয়ে দিয়ে সেই সেবাইত বললেন, “আগে মউ পাখুরু যৌটা কিনেথিলু, সেটা অরজিনাল নোহ্। এটা আসল। এই সাঙ্গে সাঙ্গে ঘিনিআসলি। উপরু তুমকু দেখি চিনি পারিলি। কাউকে কিছু কহিবা দরকার নাহি। নেই যা।”
ঔপমানব বুঝতে পারলেন, উনি বলতে চাইছেন, গতবার আমার কাছ থেকে যেটা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা অরজিনাল ছিল না। এটা আসল। এইমাত্র নামিয়ে আনলাম। উপর থেকে দেখেই আপনাকে চিনতে পেরেছি। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। নিয়ে যান।
তাই আগে থেকেই মুঠো করে রাখা একশো টাকার নোটটা তাঁর দিকে ঔপমানব বাড়িয়ে দিলেন। সেটা দেখে উনি বললেন, “না না, পয়সা লাগিবনি। আপনও গত থরও পয়সা দেইথিলে। যা। নেই যা এইটা।”
ঔপমানব খুব ভালো ওড়িয়া ভাষা না জানলেও স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, উনি বলছেন, না না, টাকা লাগবে না। আপনি তো গতবারই টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। যান, এটা নিয়ে যান।
অবাকের পর আবার অবাক। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই যে আরও একটা বড়ো অবাকের মুখোমুখি হবেন, উনি তা জানতেন না। গতবারের আগেরবার এই জগন্নাথ এক্সপ্রেসে করেই ফিরছিলেন তিনি। সেবার একাই গিয়েছিলেন। জবালা নাকি মানত করেছিলেন, ছেলে যদি মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করে তাহলে পুরীতে গিয়ে পুজো দিয়ে আসবেন। না। খুব ভালো নয়। তার চেয়েও ভালো রেজাল্ট করেছিল তাঁদের একমাত্র ছেলে অভিমন্যু। নাইন্টি এইট পার্সেন্ট মার্কস পেয়ে সেরার সেরা কলেজে সরাসরি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল বিজ্ঞান বিভাগে।
কিন্তু জবালা কিছুতেই ছুটি পাচ্ছিলেন না তাঁর স্কুল থেকে। তাই প্রায় জোর করেই ঔপমানবকে ঠেলে উনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পুরীতে। ফেরার সময় ঔপমানব সিট পেয়েছিলেন আপার বাঙ্কে। গাড়ি ছাড়ার পরেও আরও অনেকের মতো নিচের বাঙ্কেই বসে ছিলেন তিনি। রাতে খাওয়াদাওয়ার পরে কথা বলতে বলতে উলটোদিকের এক যাত্রী এমনভাবে তাঁর দিকে একটা গজা এগিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আর না করতে পারেননি। কাকাতুয়ার গজা বলে কথা! কিন্তু ওটা মুখে দেওয়ার খানিক পরেই তাঁকে যে কী কালঘুমে পেল, তিনি আর দু’চোখের পাতা খুলে রাখতে পারলেন না। যেখানে বসে ছিলেন, সেই সিটেই শুয়ে পড়লেন।
ওই সিটটা যাঁর ছিল, উনি নিশ্চয়ই তাঁকে অনেকবার ডাকাডাকি করেছিলেন। কিন্তু তিনি না ওঠায় বাধ্য হয়েই উনি বোধহয় উপরের সিটে গিয়ে শুয়েছিলেন। পরদিন যখন চোখ মেলে তাকালেন, দেখলেন, তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। ডাক্তাররা বললেন, আর.পি.এফের জোয়ানরা টহল দেওয়ার সময় তাঁকে নাকি অচৈতন্য অবস্থায় ট্রেনের মধ্যে থেকে উদ্ধার করেছেন। খানিক বাদে দু’জন পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, “কে কোথায় কখন আপনাকে কী খেতে দিয়েছিল? এত করে বারবার বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হচ্ছে, অচেনা-অজানা-অপরিচিত কোনও যাত্রীর দেওয়া কোনও খাবার কেউ কখনও খাবেন না, তবুও খেলেন? আপনারা শিক্ষিত মানুষেরা যদি এসব করেন, তাহলে বাকিরা কী করবেন বলুন?”
না। ঔপমানব বলতে পারেননি, দু’-চারজন খারাপ লোক কবে কাকে কী খাইয়ে অচেতন করে সর্বস্ব নিয়ে চম্পট দিয়েছে, তার জন্য পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে অবিশ্বাস করব? সন্দেহ করব? বলতে পারেননি, কারণ বলার মতো অবস্থায় তিনি তখন ছিলেন না।
তবুও ভালো, সুস্থ হতে তাঁর বেশিদিন লাগেনি। দু’দিন পরেই হাসপাতাল থেকে তিনি ছাড়া পেয়েছিলেন। শুধু পাননি লোয়ার বাঙ্কের নিচে রাখা তাঁর একমাত্র লাগেজটা। না, জামাপ্যান্ট বা টাকাপয়সার জন্য নয়, তিনি ভেঙে পড়েছিলেন ওই লাগেজের ভিতরে অতি যত্নে রাখা একটি গবেষণাপত্রের জন্য যেটা তাঁর বহুবছরের সাধনার ফসল। যেটার উপর তাঁর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইচ্ছে করেই তিনি তার কোনও ফোটোকপি করেননি। ওটা নিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনের ‘নেচার জার্নাল’-এ পাঠানোর আগে জগন্নাথদেবের চরণে একবার ছুঁইয়ে আনার জন্য।
এবার তাই ট্রেনে উঠেই তিনি সদাসতর্ক ছিলেন। তিনটে লাগেজের কোনওটাতেই সেরকম কোনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু না থাকলেও ঔপমানব ঠিক করেছিলেন, ছেলে বউ আর তিনি পালা করে করে ঘুমোবেন। কিন্তু নামার সময় তাঁর চক্ষু একেবারে চড়কগাছ। দেখেন, লোয়ার বাঙ্কের নিচে তাঁদের লাগেজগুলির সঙ্গে আরও একটা লাগেজ। আর সেই লাগেজটা অন্য কারও নয়, তাঁরই। যেটা দু’বছর আগে খোয়া গিয়েছিল, সেটা। তার হ্যান্ডেলে একটা ট্যাগ লাগানো। আর তাতে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে বড়ো বড়ো করে লেখা—সরি।
তো, আজ সকালে পুরী থেকে সপরিবার ফেরার পরে চা খেয়েই বাজারে বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি। এ ক’দিন ছিলেন না। ফলে না ফ্রিজে, না ঝুড়িতে, কোথাও কোনও শাকসবজি ছিল না। মাছ-মাংস তো দূরের কথা। একটা ডিমও ছিল না। এমনিতে সপ্তাহে দু’বার বাজারে যান তিনি। কিন্তু বাড়ি ফিরে হারানো লাগেজটা খুলে ইনট্যাক্ট সব কিছু দেখে, বিশেষ করে ওই গবেষণাপত্রটি পেয়ে তিনি এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, প্রচুর বাজার করে ফেলেছিলেন। বাজার থেকে বেরিয়ে দু’হাতে ঢাউস ঢাউস দুটো ব্যাগ নিয়ে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন কোনও রিকশা পেলেন না, তখন হঠাৎ তাঁর মনে হল, দামি দামি শুধু নয়, অমূল্য জিনিসও যখন অবলীলায় আজকাল ফেরত পাচ্ছি, তখন এ তো সামান্য বাজার। আমি যদি ইচ্ছে করেও ব্যাগদুটো রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যাই, আমার বিশ্বাস, কেউ না কেউ ঠিকই বাড়িতে এসে ওটা ফেরত দিয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় দেবে?
মাথার মধ্যে প্রশ্নটা উঁকি মারতেই জবালার লিখে দেওয়া বাজারের ফর্দর নিচের সাদা অংশটা ছিঁড়ে, যাতে আবার কিনে না ফেলেন, সেজন্য কেনার সঙ্গে সঙ্গে যেটা কেনা হল তার পাশে টিক মার্ক দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কলম দিয়ে নিজের নাম, ঠিকানা লিখে উপচে পড়া ব্যাগের মধ্যে রেখে যখন ভাবছেন, যা হাওয়া দিচ্ছে, কাগজটা আবার উড়ে যাবে না তো! তখন দেখেন, পাঞ্জাবির পকেটে রাখা টাকা-ভর্তি ব্যাগটা এত ভারী যে, তার জন্য তাঁর কাঁধ থেকে পাঞ্জাবিটা নেমে নেমে যাচ্ছে। তাই ওই মানিব্যাগটা বার করে চিরকুটটাকে চাপা দিয়ে রাখলেন। তারপর কারও যাতে যাতায়াতের অসুবিধে না হয়, সেজন্য রাস্তার একধারে ব্যাগদুটো রেখে তিনি বাড়ি চলে এসেছিলেন।
না, দশ মিনিটও হয়নি। তার আগেই কলিংবেলের শব্দ। দরজা খুলতেই আঠারো-উনিশ বছরের একটা গাট্টাগোট্টা ছেলে। কাকে চাই? জিজ্ঞেস করার আগেই ছেলেটি তাঁর নাম জানতে চাইল। তারপরে বলল, “আপনি বোধহয় বাজারের এই ব্যাগদুটো রাস্তার উপরে রেখে এসেছিলেন। তাই নিয়ে এলাম।”
ব্যাগদুটো নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই জবালা বললেন, “বাজারের সঙ্গে সঙ্গে মানিব্যাগটাও রেখে এসেছিলে?”
ঔপমানব বললেন, “কী করব? পাঞ্জাবির যেদিকের পকেটে ওটা রেখেছিলাম, মানিব্যাগের ভারে সেদিকটা যে বারবার কাঁধ থেকে নেমে আসছিল! তাই... কতবার তোলা যায়, বলো?”
ঔপমানবের বউ একেবারে তাজ্জব হয়ে গেলেন। তাঁর স্বামী না হয় এটা করতে পারেন। যে লোক বাজার করতে বেরিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে চলে যান, যে লোক চেকে সই করতে গিয়ে ভুলে যান তাঁর নাম কী, যে লোক ছেলেকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে গিয়ে নিজের ছেলে মনে করে ভুল করে অন্য একটা ছেলেকে বাড়ি নিয়ে আসেন, তাঁর পক্ষে এসব সম্ভব। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে? সবাই হঠাৎ করে তাঁর মতো হয়ে গেল কী করে! তাঁর মতো হল, না সত্যি সত্যিই সবাই ভালো হয়ে গেল! ভালো হলে তো ভালো কথা। কিন্তু হঠাৎ করে এত ভালো হল কী করে! কী করে! কী করে!


দুই


তিন-চারটে কেমো থেরাপি হয়ে গেছে বাবার। কতটা ইমপ্রুভ হয়েছে আজ ডাক্তারবাবু সেই রিপোর্ট দেবেন। ডাক্তারবাবুদের কাছে ইমপ্রুভ মানে যে কী, জবালা তা ভালো করেই জানেন। ওঁদের কাছে ইমপ্রুভ মানে তিন মাসের জায়গায় খুব বেশি হলে সাড়ে তিন মাস আয়ু। এই তো…
তাই বাবা খুব আম খেতে ভালোবাসেন বলে ঠাকুরপুকুর ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারে বাবাকে দেখতে যাবার আগে জবালা ঠিক করলেন, যত বাজার ঘুরতে হয় হোক। তিনি ঘুরবেন। দরকার হলে নিউ মার্কেট, এমনকি কোথাও পাওয়া না গেলেও যেখানে সমস্ত রকম ফলই পাওয়া যায়, সেই চাঁদনি চক মার্কেটেও ঢুঁ মারবেন। আর তো মাত্র কয়েকটা মাস। যেকোনও সময় একটা খারাপ খবর এসে পৌঁছতে পারে। সেই খবর শোনার জন্য নিজেকে ভিতরে ভিতরে তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। এই সময়েও যে ফল তাঁর বাবার সবচেয়ে বেশি প্রিয়, সেই ফল যদি তিনি তাঁর বাবাকে খাওয়াতে না পারেন, এর চেয়ে বড়ো দুঃখের আর কী হতে পারে! তাই হাতে প্রচুর সময় নিয়ে তিনি বেরিয়েছেন।
আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, প্রথমেই যাবেন গড়িয়াহাটায়। ওখানকার ফলের বাজারটা খুব ভালো। সেইমতো অটো থেকে যেই গড়িয়াহাট মোড়ে নেমেছেন, অমনি মুখোমুখি দেখা পয়মন্তর সঙ্গে। পয়মন্ত তাঁর খুব ছোটোবেলাকার বন্ধু। বিয়ে হওয়ার পরেও যে ক’জন বন্ধুর সঙ্গে তাঁর এখনও নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তার মধ্যে পয়মন্ত একজন। ওর বিয়ে হয়েছে তাঁর বিয়ের অনেক পরে। বাচ্চা হয়েছে আরও কয়েক বছর পরে। মাস কয়েক আগে কথায় কথায় জবালাকে ও বলেছিল, ওর বাচ্চাকে কলকাতার সবচেয়ে সেরা স্কুলে ও ভর্তি করাতে চায়। আর যেহেতু ও জানে, জবালার সঙ্গে ওই স্কুলের সেক্রেটারির খুব ভালো সম্পর্ক, তাই ও তাঁকে ধরেছিল, ওর বাচ্চার ভর্তির ব্যাপারে তিনি যদি ওই সেক্রেটারিকে একটু বলে দেন। জবালা সঙ্গে সঙ্গে ওর সামনেই ফোন করেছিলেন। শুধু বলেনইনি, রীতিমতো অনুরোধও করেছিলেন। শেষে আবদারের গলায় বলেছিলেন, “আমি কিছু জানি না। আপনাকে এটা করে দিতেই হবে।”
মুখে একথা বললেও জবালা জানতেন, ওই স্কুলে ভর্তি করানোটা খুব শক্ত ব্যাপার। বাচ্চাদের পরীক্ষা তো নেওয়া হয়ই, বাচ্চাদের বাবা-মায়েদেরও পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেখা হয় তাঁরা কী করেন, তাঁদের রোজগারপাতি কেমন, সামাজিক স্ট্যাটাস কীরকম, কত টাকা ডোনেশন দিতে পারেন, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের পরেও চলে অন্য খেলা। নেতা-মন্ত্রী থেকে উপরতলার লোকজনদের নানান রেকমেন্ডেশন। অথচ সেই আদ্যিকাল থেকেই প্লে-গ্রুপে সিট মাত্র ষাটখানা। সুতরাং হাজার মেরিট থাকলেও, সবকিছুতে উতরে গেলেও যতক্ষণ না অফিসিয়ালি কোনও বাচ্চা ভর্তি হচ্ছে, ততক্ষণ বলা যায় না ওই স্কুলে ও ভর্তি হচ্ছে।
সেই যে পয়মন্ত এসেছিল তারপর ওকে এই প্রথম দেখলেন জবালা। উনি জানতেন, ওই স্কুলের সেক্রেটারি মুখে যতই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলুন না কেন, কাজের সময় যা করার উনি তাই করেন। অবশ্য ওঁকে দোষ দেওয়া যায় না। উপর মহল থেকে এত চাপ থাকে যে, ইচ্ছে থাকলেও উনি অনেক সময়ই অনেক কিছু করে উঠতে পারেন না।
পয়মন্তদের যা অবস্থা, তাতে ওর ছেলে যে ওখানে ভর্তি হতে পারবে না জবালা তা জানতেন। উনি ভেবেছিলেন, সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলার পরে পয়মন্ত নিশ্চয়ই সেটা বুঝতে পেরেছে। আর সেজন্যই বুঝি, যে প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত দু’বার করে তাঁকে ফোন করত, অকারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করে যেত, তাঁকে প্রায় কথাই বলতে দিত না, সে নিজে থেকেই গত দু’-তিন মাস ধরে একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে। কোনও সাড়াশব্দ করছে না। তাঁর বাড়ি এসে আড্ডা দেওয়া তো দূরের কথা!
পয়মন্ত কি তা হলে তাঁকে ওরকম ভেবেছে! আসলে কোন লোক যে কেমন বোঝা মুশকিল। জবালার বেশ মনে আছে, উনি যে স্কুলে পড়ান, সেই স্কুলেরই কী একটা ব্যাপারে এক মন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি। ওই মন্ত্রী শুধু জবালার প্রতিবেশীই নন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে ওঁদের পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মন্ত্রী হওয়ার পরেও যখন যেখানে দেখা হয়েছে, নিজে থেকেই উপযাজক হয়ে উনি তাঁদের কুশল সংবাদ নিয়েছেন। বাবার শরীর কেমন আছে, তা জানতে চেয়েছেন। তাই তাঁকে ওঁদের স্কুলের সমস্যাটা জানিয়ে তার সমাধানের একটা ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন তিনি। উনি জানতেন, মন্ত্রী যদি একটা ফোন করে দেন কিংবা দু’ছত্র চিঠি লিখে দেন, তাহলেই কেল্লাফতে।
মন্ত্রী কোনও অজুহাত দেখাননি। নানা রঙের দামি দামি কলমভর্তি সামনের কলমদানি থেকে একটা কলম তুলে নিজের প্যাডেই খসখস করে লিখে দিয়েছিলেন চিঠি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, সেই চিঠি দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। জবালা পরে জেনেছিলেন, ওই মন্ত্রীর নাকি সর্বত্র ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আছে, আমি যাকেই যা লিখে দিই না কেন, সবুজ কালি ছাড়া অন্য কোনও কালিতে লেখা চিঠিকে কেউ যেন কোনও গুরুত্ব না দেয়। উনি জবালাকে কালো কালিতে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন।
কথায় কথায় সেকথা একদিন পয়মন্তকেও উনি বলেছিলেন। তাই পয়মন্ত কোনও ফোন করছে না বলে তাঁর মনে হয়েছিল পয়মন্ত বোধহয় তাঁকেও ওইধরনের লোক ভেবেছে। ভেবেছে, ওর সামনে সেক্রেটারিকে ফোন করেছে ঠিকই, কিন্তু ও চলে যেতেই ফের তাঁকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে, একটু আগেই যেটা বললাম, সেটা করার কোনও দরকার নেই। আসলে যে বাচ্চাটির কথা বললাম, তার মা আমার পরিচিত। এমনভাবে ধরেছে, মুখের উপরে ‘না’ করতে পারলাম না। কী করব! তাই ওর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই… ও সামনে ছিল বলে ওর সামনেই আপনাকে ফোন করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিছু মনে করবেন না। কেমন?
হ্যাঁ। ও এটা ভাবতেই পারে। জবালা আরও জানেন, এইরকম ছোটোখাটো অনেক ঘটনা অনেক সময়ই অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে। দু’জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ফলে যত তাড়াতাড়ি এসব মিটিয়ে নেওয়া যায়, ততই ভালো। তাই অটো থেকে নেমেই জবালা যখন পয়মন্তকে দেখতে পেলেন, নিজে থেকেই বললেন, “কী রে, তুই এখানে? কী ব্যাপার?”
পয়মন্ত বলল, “তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে খুব ভালো হয়েছে। তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। ও ভর্তি হয়ে গেছে।”
“কে?”
কে আবার? আমার ছেলে।”
“কোথায়?”
“কোথায় মানে? তোর মনে নেই? তুই-ই তো ফোন করে দিয়েছিলি ওদের স্কুলের সেক্রেটারিকে!”
“ও-ওখানে ভর্তি হয়ে গেছে?”
“এই তো ওদের স্কুলের ভর্তি ফি আর একবছরের মাইনে ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে এলাম।”
“একসঙ্গে? সে কী রে, সে তো প্রচুর টাকার ব্যাপার! ওদের স্কুলের মাইনে তো…”
“না না। ওহো, তোকে তো বলাই হয়নি। জানিস, এবছর থেকে ওরা খুব ভালো একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। যাঁদের বাৎসরিক আয় ছ’লক্ষ টাকার নিচে, তাঁদের ছেলেমেয়েদের কোনও মাইনে দিতে হবে না। আর স্কুলের ভর্তি ফিও যৎসামান্য।”
“যৎসামান্য!”
“হ্যাঁ। সামান্যই তো। ওখানে ভর্তি হতে গেলে যেখানে অন্যদের আশি-নব্বই হাজার টাকা লাগে, সেখানে আমাদের লাগল মাত্র একশো এক টাকা। আর মান্থলি ফি? বারো টাকা করে।”
“বারো টাকা! তুই বোধহয় ভুল শুনেছিস। ওদের স্কুলের মাইনে তো বারো হাজার টাকা।”
“হ্যাঁ। বারো হাজার টাকা করেই তো। তবে যাঁদের আয় বাৎসরিক ছ’লক্ষ টাকারও বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে। তিন মাস অন্তর অন্তর তাঁদের ছত্রিশ হাজার টাকা করে দিতে হয়। সেখানে আমাদের দিতে হবে সারা বছরেরটা একসঙ্গে। মাত্র একশো চুয়াল্লিশ টাকা।”
“বলিস কী রে?”
“তাহলে আর বলছি কী? আর তার থেকেও বড়ো কথা কী বল তো?”
“কী?”
“যাঁদের আয় বছরে ছ’লক্ষ টাকার কম, তাঁদের ছেলেমেয়েদের ওরা স্কুল থেকেই বিনে পয়সায় টিউশন দেবে। দরকার হলে বই, খাতা, কলমও ফ্রিতে দেবে।”
“অ্যাঁ?”
“অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। আর তার থেকেও বড়ো কথা কী বল তো? এবছর যারা ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল, ওদের স্কুল তাদের সবাইকেই ভর্তি নিয়ে নিয়েছে।”
“সে কী রে? ওদের তো মাত্র ষাটটা সিট!”
“না। ওরা নাকি আশেপাশে আরও অনেকগুলো বিল্ডিং নিয়েছে। ঠিক করেছে, প্রয়োজন হলে একেকটা স্কুলে শুধু একেকটা ক্লাস করাবে। সেরকম হলে, একেকটা সেকশন একেকটা বিল্ডিংয়ে। আমি অবশ্য আগেই এটা কানাঘুষোয় আঁচ করেছিলাম। কিন্তু সত্যি-সত্যিই যে এরকম হতে পারে, সেটা ভাবিনি। তাই ফালতু আমি তোকে ডিসটার্ব করতে চাইনি। তোর বাবার ব্যাপারটা তো আমি জানি। মেসোমশাই এখন কেমন আছেন রে?”
“ভালো নেই রে। একদম ভালো নেই। এই তো ওখানেই যাচ্ছি।”
“ওখানে যাচ্ছিস, তাহলে এদিকে?”
“বাবার জন্য একটু আম নেব রে।”
“এই সময়ে আম!”
“দেখি যদি পাই।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, যা যা, যা। আমি তোকে পরে ফোন করব।”
পয়মন্তর খবরটা শুনে মন ভালো হয়ে গেল জবালার। যদিও পয়মন্তর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর অনেকটা সময়ই নষ্ট হল। সেই সময়টা সামাল দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি পা চালালেন জবালা। এখানে আম না পেলে ফের কোন বাজারে যাবেন, সেটা ভাবতে ভাবতে রাস্তা পার হয়ে গড়িয়াহাট বাজারের ফল পট্টিতে ঢোকার আগেই জবালা একেবারে চমকে উঠলেন। এই অসময়ে আমের এমন ম ম গন্ধ! ওঁর মনে হল অসময়ে নয়, আমের মরশুমেই উনি আমের পট্টিতে ঢুকেছেন।
ক’পা এগোতেই দেখলেন, যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকেই কেবল আম আর আম। শুধু আম নয়, নানান জাতের আম। একেবারে রসালো। টইটম্বুর।
নাহ্‌। দিনটা যে আজ এত ভালো যাবে উনি তা ভাবতে পারেননি। বাবা ক’টা খেতে পারবেন উনি জানেন না। তবে এরকম আম শুধু চোখের দেখা দেখতে পেলেই যে বাবার মন ভরে যাবে, উনি তা খুব ভালো করেই জানেন।
তাই হাসপাতালে ঢুকেই বড়ো বড়ো পা ফেলে বাবার কাছে চলে গেলেন তিনি। “এখন কেমন আছ?” জিজ্ঞেস করতে করতে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কালো পলিপ্যাক থেকে একটা আম বার করে বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দ্যাখো, তোমার জন্য কী এনেছি।”
ওঁর বাবা সেটা হাতে নেওয়ার আগেই বালিশের তলা থেকে একটা খাম বার করে জবালার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, “ডাক্তারবাবু দিয়ে গেছেন।”
জবালা অবাক হয়ে বললেন, “কী এটা?”
“দ্যাখ না কী।”
“রিপোর্ট?”
জবালা জানেন, এই হাসপাতালটা অত্যন্ত আধুনিক। শুধু চিকিৎসাই যে ভালো হয়, বিশাল বিশাল ডিগ্রিধারী সেরা ডাক্তাররাই যে এখানে আছেন তা নয়, এই হাসপাতালে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষার দারুণ ব্যবস্থা আছে। তবে হ্যাঁ, এরা কোনও রিপোর্টই কোনও রোগীর হাতে কখনও দেয় না। দেয় বাড়ির লোকের হাতে। তাহলে এই রিপোর্টটা বাবার কাছে দিয়ে গেল কে! ভাবতে ভাবতে খামটা খুলে ভাঁজ করা কাগজটা বার করে চোখের সামনে মেলে ধরতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন জবালা। দেখলেন, লাল কালি দিয়ে রিপোর্টে লেখা রয়েছে—ইউ আর নাউ ক্যানসার ফ্রি।


তিন


অভিমন্যু একেবারে হতবাক। টিউশন নিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে। তাদের বাড়িটা একটা গলির মধ্যে। ঠিক গলি নয়, কানাগলি। সেটা চার-পাঁচটা বাঁক নিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটা দশাসই বাড়ি মাথা তুলে আছে। গলিটা ওখানেই শেষ। মানে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই। তাছাড়া গলিটা এত সরু যে, তার মধ্যে একটা ছোটো অ্যাম্বুলেন্স কোনওরকমে একটা দুটো বাঁক পেরিয়ে খানিকটা ঢুকে যাবে ঠিকই, কিন্তু বেরোতে পারবে না। কারণ, গলির ভিতরে গাড়ি ঘোরানোর মতো কোনও জায়গা নেই। তার জন্য কেউ কখনও অসুস্থ হলে, হয় রোগীকে স্ট্রেচারে করে মূল রাস্তা অবধি নিয়ে আসতে হয়, কিংবা যতটা পারা যায় ব্যাক করে অ্যাম্বুলেন্সকে ঢুকতে হয়। ফলে এ-পাড়ায় যে গুটিকতক লোকের গাড়ি আছে, সেগুলো থাকে খানিক দূরের একটা পেট্রল পাম্পে কিংবা ক’হাত দূরের সি.আই.টি বিল্ডিংয়ের প্রশস্ত খোলা মাঠে। অথবা আশেপাশের কারও বাড়ির গ্যারেজে। সেজন্য অবশ্য প্রত্যেক মাসে ট্যাঁকের কড়ি গুনতে হয় তাদের।
এই পাড়ায় যারা সবচেয়ে আগে বাড়ি করেছিল, গলিতে ঢুকে প্রথম বাঁক নিলেই ডানহাতের দ্বিতীয় বাড়িটা তাদের। ও যখনই ওখান থেকে যায়, অভ্যাসবশত ওর চোখ ঠিক চলে যায় ওই বাড়ির নিচের তলার জানালায়। জানালাটা রাস্তার গা বরাবর। না, ওদের গাড়ি আছে বলে নয়। আসলে ও-বাড়িতে সুস্মিতা থাকে বলে। সুস্মিতা দেখতে শুনতে খুব সুন্দর। ক্লাস নাইনে পড়ে। মমতা শঙ্করের কাছে নাচ শেখে। এই নাচ দেখেই ওকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল তার।
ওদের গলির উলটোদিকে যে বিশাল গ্যারেজটা আছে, সেটার মালিক শর্মাকাকুরা। ওদের পাড়াতেই থাকেন। একদম শেষ বাড়িটায়। কত পুরুষ ধরে যে এখানে আছেন কে জানে। জাতে মাড়োয়ারি হলে কী হবে, ওঁরা এখন পুরোপুরি বাঙালি হয়ে গেছেন। তাই হোলির দিনে নয়, হোলির ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ দোলের দিনই ওই গ্যারেজের মধ্যে আশেপাশের লোকজনদের নিয়ে প্রতিবছর খুব ধুমধাম করে ওঁরা দোল উৎসবের আয়োজন করেন। সকাল ন’টা সাড়ে ন’টার মধ্যেই শুরু হয়ে যায় অনুষ্ঠান। নাচ, গান, আবৃত্তি—মূলত এপাড়া ওপাড়ার লোকেরা মিলেই করে। মঞ্চের দু’পাশে বিশাল বিশাল দুটো কাঁসার থালায় আবির রাখা থাকে। লাল, গোলাপি, সবুজ। যারা এখানে আসে তারা ওই থালা থেকেই আবির নিয়ে একে ওকে দেয়। গ্যারেজের পেছন দিকে অনেকটা খোলা জায়গা। যেখানে অন্য সময় গাড়ি থাকে, সেখানে সামিয়ানা টাঙিয়ে সকাল থেকেই একনাগাড়ে ভাজা হয়ে থাকে আলুর চপ, পেঁয়াজি, বেগুনি। ট্রেতে করে সাজিয়ে নিয়ে সারি বেঁধে চেয়ারে বসে থাকা দর্শকদের মধ্যে সেগুলো বিলি করতে থাকে চার-পাঁচজন ছেলে। যার যত ইচ্ছে নিতে পারে। ঘন ঘন চায়েরও ব্যবস্থা থাকে।
আশেপাশের বড়োরা যেমন সকাল সকাল ওখানে গিয়ে হাজির হয়, হাজির হয় ছোটোরাও। অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বেলা দেড়টা-দুটো বেজে যায়। ফের শুরু হয় সন্ধ্যা ছ’টা সাড়ে ছ’টা নাগাদ। তখন ভিড় হয় আরও বেশি। মূল আকর্ষণ থাকে নাটক। সঙ্গে একজন কি দু’জন বিখ্যাত গায়ক। পাশাপাশি বাছাই করা কয়েকজনের গান, আবৃত্তি এবং নাচ।
সেবার সুস্মিতার নাচ তাকে চমকে দিয়েছিল। নাচ, নাকি ওর সাজগোজ, নাকি বন্ধুদের সঙ্গে ওর খলবল করে কথা বলা, নাকি অন্য কিছু সে জানে না। আগে যাতায়াতের পথে ওকে অজস্রবার দেখলেও সেদিনই যেন সে ওকে নতুন করে দেখেছিল। তাই তারপর থেকে ওকে আবার, আবার, আবার দেখার জন্য সে যখনই ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেত, ওদের জানালাটার দিকে তাকাত। যদি একবার ওকে দেখা যায়! দেখেওছে বেশ কয়েকবার।
কিন্তু জানালার কাছে ও না থাকলে ওকে দেখাই যায় না। কারণ, জানালাটা একটু উঁচুতে। তাই সেবারই সে তার মায়ের কাছে বায়না করে একটা রেসিং-সাইকেল কিনেছিল। সাইকেলের সিটে বসে খুব ধীরে ধীরে ওদের বাড়ির গা ঘেঁষে যাওয়ার সময় ওই জানালার দিকে এক ঝলক তাকালেই দেখে নেওয়া যেত ও আছে কি না।
কিন্তু এক ঝলকে আর কতটুকুই বা দেখা যায়! তাই শীতের মরসুমে প্রতিবছরের মতো ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য আর নিজেদের বাড়ির সামনে নয়, পাড়ার দু’-চারজন বন্ধুকে জুটিয়ে সে চলে যেত ওদের জানালার সামনে। ওখানেই ব্যাডমিন্টন খেলত। কখনও-সখনও ক্রিকেটও। যাই খেলুক না কেন, জানালা ফাঁকা থাকলে তার লক্ষ্যই থাকত সুযোগ পেলেই কক বা বলটাকে ওদের জানালার শিকের ভিতর দিয়ে গলিয়ে দেওয়ার। দিয়েওছে দুয়েকদিন। আর যতবারই ওই জানালা গলে তাদের কক বা বল ঢুকে গেছে ওদের ঘরে, ততবার ওই সুস্মিতাই জানালা দিয়ে সেটা ছুড়ে দিয়েছে। আর সেটা ছুড়ে দিয়েছে অন্য কারও দিকে নয়, একমাত্র অভিমন্যুর দিকেই। কিন্তু না। ওর সঙ্গে কোনওদিন কোনও কথা হয়নি তার।
কথা না হোক, তার দিকে তাকিয়ে ও যাতে ফিক করে অন্তত একবার হেসে ওঠে, সেজন্য কী না করেছে সে! অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সুস্মিতা যখন তার দিকে বল ছুড়ে দিয়েছে, আগে থেকে ভেবে রাখা কৌশলমতো সে সেটা ধরতে গিয়ে ইচ্ছে করেই পিছলে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু না। তখনও হাসেনি ও। শুধু ‘এ মা’ বলে জিভ কামড়ে জানালা থেকে সরে গিয়েছিল।
আর একবার সুস্মিতা যখন জানালার সামনে শিক ধরে দাঁড়িয়ে ওদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল, সে তখন প্রতিটি বল এমন সাবধানে মারছিল যাতে একটা বলও ওদের জানালার ধার-কাছ দিয়েও না যায়। গেলে যদি বাইচান্স লেগে যায় কিংবা ওভাবে বল আসছে দেখে ও যদি ভয় পেয়ে চলে যায়! তাই শুধু নিজেই নয়, যারাই ব্যাট করতে নামছিল, সে তাদের পইপই করে আগেই বলে দিচ্ছিল, “দেখে খেলিস। ও কিন্তু জানালায় আছে। লাগে না যেন।”
একবার ইচ্ছে করে বেশ জোরেই বলেছিল যাতে ও শুনতে পায়। নিশ্চয়ই শুনেছিল। কারণ, সে আড়চোখে দেখেছিল, তখনই তার দিকে মুখ ভেংচিয়ে ওখান থেকে ও ঝট করে সরে গিয়েছিল।
সরে গিয়েছিল সেদিনও যেদিন ‘চোর চোর’ খেলায় সে চোর হয়েছিল। অথচ অনেক খুঁজেও সে যখন কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না, বুঝতেই পারছিল না ওরা কোথায় লুকিয়েছে তখন কোনও উপায় না দেখে জানালায় ওকে দেখতে পেয়ে ওর দিকে চোখের ইশারায় সে জানতে চেয়েছিল, ওরা কোথায় লুকিয়েছে। ও তখন তার মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু মুখে তো নয়ই, ইশারা করেও বলেনি ওরা কোথায় লুকিয়েছে। কিন্তু কেন? ও কি জানত না! নাকি ওর আশেপাশে কেউ ছিল? থাকতে পারে। বাইরে থেকে তো দেখা যায় না। তাহলে কি কেউ না থাকলে ও কথা বলত? আচ্ছা, ওকে একা পাওয়া যায় কী করে?
তাই যেন তেন প্রকারেণ ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য সে কম চেষ্টা করেনি। খোঁজখবর নিয়ে সে জেনেছিল, ও কখন স্কুলে যায়, কখন ওকে নামিয়ে দিয়ে যায় ওর স্কুল-বাস, ওকে নেওয়ার জন্য কে দাঁড়িয়ে থাকে গলির মুখে, ও কবে কবে নাচ শিখতে যায়, কার সঙ্গে, ফেরে কখন। সেইমতো কতদিন যে একেবারে ঘড়ি ধরে সে গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কতদিন কোথাও একটা যাচ্ছে এমন ভান করে ওর মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু না, কোনও লাভ হয়নি। ও যেমন, তেমনই মাথা নিচু করে পাশ দিয়ে চলে গেছে। ফিরে দেখা তো দূরের কথা। একবার আড়চোখেও তাকায়নি। সে খেয়াল করে দেখেছে।
ও পায়ে নূপুর পরত। হাঁটলে খুব সুন্দর ঝুম ঝুম করে একটা শব্দ হত। মনে হত, রিমঝিম করে কোথাও বুঝি বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু স্কুল-বাস থেকে যখন নামত, গাড়ি-টারির শব্দে সেটা ঢাকা পড়ে যেত। শোনা যেত গলির ভিতরে খানিকটা ঢুকলে। ওখানটা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক নির্জন। অথচ যে ক’দিন সে ওকে স্কুল-বাস থেকে নামতে দেখেছে, সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে ওর পায়ের নূপুরের শব্দই যেন তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। আর তখনই তার মনের মধ্যে বেজে উঠেছে সন্তুর। গুনগুন করে গেয়ে উঠেছে, ক’দিন আগে টিভিতে ডিডি বাংলায় শোনা পুরনো দিনের একটা গান—রোদ জ্বলা দুপুরে / সুর তুলে নূপুরে / বাস থেকে তুমি যবে নামতে / একটি কিশোর ছেলে একা কেন দাঁড়িয়ে / সে কথা কি কোনও দিন ভাবতে... যদিও সময়টা রোদ-জ্বলা দুপুর মোটেও নয়, তবুও তার মনে হত গানটা যেন তার কথা ভেবেই লেখা।
শুধু কি নূপুরের শব্দ! ওর বুকের ঢিপঢিপ শব্দ, এমনকি ওর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসও যেন শুনতে পেত সে। শুনতে পেত ওর না বলা অনেক কথা। মনে মনে সেই কথার উত্তরও দিত। আর সে সময় সে যেন একটা অন্য জগতে চলে যেত। ভেসে যেত মেঘের ভেলা করে। যেখানে শুধু পাখিদের কলকাকলি, রংবেরঙের প্রজাপতির ওড়াওড়ি আর চারদিকে শুধু ফুলেদের খিলখিল করে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে ঢলে পড়া।
অথচ দরজা ঠেলে বাড়ির ভিতরে ও ঢুকে গেলেই সবকিছু যেন ভোঁ ভাঁ। খা খা। শুনশান। শুধু মরুভূমি আর মরুভূমি। কিচ্ছু ভালো লাগত না তার।
একদিন নয়, দু’দিন নয়, দিনের পর দিন এভাবে ব্যর্থ হয়ে হয়ে শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিল অভিমন্যু। ঠিক করেছিল, আর নয়। তাই বেশ কয়েকদিন ধরে সে আর ওর জন্য গলির মুখে এসে দাঁড়ায়নি। সাইকেল নিয়ে ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে উঁকি মারেনি জানালায়। হঠাৎ মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলেও ওকে যেন দেখতে পায়নি এমন ভান করে চলে গেছে।
অথচ আজ! অভিমন্যু একেবারে হতবাক। তার খেয়ালই ছিল না এটা ওর স্কুল থেকে ফেরার সময়। এমনিই বড়ো রাস্তার মুখের মিষ্টির দোকান থেকে টক দই কিনতে যাচ্ছিল সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার শেষ বাঁকটা ঘুরতেই হঠাৎ দেখে গলির মুখ আগলে দাঁড়িয়ে আছে ওদের স্কুল-বাস। ও নামছে।
ও নামতেই ওদের কাজের মাসি ওর কাছ থেকে বইয়ের ঢাউস ব্যাগটা নিয়ে ফিরে আসছিল পাড়ার ভিতরে। ওদের বাড়ির দিকে। সঙ্গে ও-ও। না দেখার ভান করে অভিমন্যু মাথা নিচু করে পাশ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আচমকা খেয়াল হল, না, দু’জন নয়, তার পাশ দিয়ে একজন হেঁটে যাচ্ছে। একজন! হ্যাঁ, একজনই তো! মাটিতে পড়া লম্বা ছায়া তো সেকথাই বলছে। কিন্তু সেই একজনটা কে? ও? নাকি ওদের কাজের মাসি? তাই যদি হয়, তাহলে ও কোথায়?
চোখ তুলতেই বুঝতে পারল, বাস থেকে নামার পর কাজের মাসির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটলেও তার কাছাকাছি এসে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে হাঁটার গতি কমিয়ে ইচ্ছে করেই দু’পা পিছিয়ে গেছে ও। কিন্তু কেন? ভাবার আগেই দেখল, তার পাশ দিয়ে যাবার সময় গোল্লা পাকানো একটা কাগজের দলা টুক করে ছুড়ে দিল তার পায়ের সামনে।
ও ওটা ছুড়ে দিতেই ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল সে। আর তখনই চোখের ইশারায় সুস্মিতা বলল ওটা তুলে নিতে।
সে তুলল ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারল না এটা কী। স্যার না থাকলে বা টিফিনের সময় ওরাও খাতার পাতা ছিঁড়ে এরকম গোল্লা পাকিয়ে ক্লাসের মধ্যে এর ওর দিকে ছুড়ে মারে। কিন্তু এটা তো ক্লাস রুম নয়। তাহলে?
ভাবতে ভাবতে গলির মুখ দিয়ে বেরিয়ে ডানহাতে মিষ্টির দোকানের দিকে বাঁক নিতেই কী যেন মনে হল তার। সঙ্গে সঙ্গে ওই দলা পাকানো কাগজটা আস্তে আস্তে খুলে টান টান করে সে দেখল, তাতে লেখা রয়েছে— কাক ডিম পাড়ে কোকিলের বাসায় / আমি আছি তোমার চিঠির আশায়।
হ্যাঁ, এর আগে এই লাইনটা সে যেন কোথায় শুনেছে। কিন্তু কোথায়? কিছুতেই মনে করতে পারল না। মনে করতে পারল না, লাইনটা হুবহু এইরকমই ছিল, না একটা দুটো শব্দ অন্যরকম ছিল। কে জানে! অন্যরকমও হতে পারে। ও হয়তো নিজের মতো করে পালটে দিয়েছে। হতে পারে। হতেই পারে। সেটা বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হল, সে যে এধরনের কোনও চিঠি ওর কাছ থেকে কোনওদিন পেতে পারে, এটা তার ধারণাই ছিল না। অভিমন্যু একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল। যে মেয়েটা কোনওদিন তার সঙ্গে কথা বলেনি, একবার ফিরেও তাকায়নি, ইঙ্গিতও দেয়নি কোনও কিছুর, সে আজ একেবারে সরাসরি তাকে এরকম একটা চিঠি দিয়ে দিল! হঠাৎ কী হল ওর? কী?


চার


তখন মধ্যরাত। চারদিক শুনশান। ঔপমানব হঠাৎ ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। ঘামে সারা শরীর জ্যাবজ্যাব করছে। চোখেমুখে আতঙ্ক। উনি হাঁপাচ্ছেন।
আবার সেই স্বপ্ন!
মাঝে মাঝেই উনি এই স্বপ্নটা দেখেন। দেখেন, মোবাইল থেকে, কম্পিউটার থেকে, ফ্রিজ থেকে একটা রে বেরিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। আগে নাকি টের পাওয়া গেলেও চোখে দেখা যেত না। কিন্তু এই রে দিনকে দিন এত ঘন হয়ে উঠছে যে, এখন সেটা খালি চোখেও স্পষ্ট দেখা যায়। বোঝা যায়, এই রে মানুষের শরীরে চুপিচুপি ঢুকে পড়ছে। ঢুকে শুধু শরীরই নয়, মানুষের মনটাকেও কুরে কুরে খাচ্ছে। উনি বুঝতে পারছেন, এভাবে চললে সেদিন আর বেশি দূরে নেই, যেদিন চল্লিশ বছর হওয়ার আগেই মানুষের দেহ ন্যুব্জ হয়ে পড়বে। তার আগেই মস্তিষ্ক থেকে লোপ পেয়ে যাবে যাবতীয় বিচারবুদ্ধি। যুবক হওয়ার আগেই ছেলেরা হারিয়ে ফেলবে বাবা হওয়ার ক্ষমতা। পুতুল খেলার বয়স পেরোতে না পেরোতেই মেয়েরা খোয়াবে তাদের মা হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা। তখন আর ষাট বছরে নয়, অফিস-কাছারিতে অবসরের বয়স বরাদ্দ হবে খুব বেশি হলে ছত্রিশ কি আটত্রিশ বছর। কারও বয়স বিয়াল্লিশ ছুঁলেই অত বছর বেঁচে থাকার জন্য আলোচনার শিরোনাম হয়ে উঠবেন তিনি। তাঁর থুত্থুড়ে ছবি ছাপা হবে বিভিন্ন সংবাদপত্রে। ফলাও করে দেখানো হবে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে।
যতই নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার করে এই বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, কোনও উদ্যোগই সফল হবে না। মানুষ যখন বুঝতে পারবে নদীকে যত্ন করলে, গাছপালাকে ঠিকমতো লালনপালন করলে, কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ থেকে বাতাসকে একটু আগলে রাখতে পারলে তারাই এই বিষ পান করে রক্ষা করতে পারত এই অনিবার্য পরিণতি, যখন মানুষ এটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করবে, তখন আর কিছুই করার থাকবে না। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সবকিছুই মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
উনি তাই ঠিক করেছিলেন, ওই ভয়ানক দিন আসার আগেই তাঁকে এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে আর ওই দিনের মুখোমুখি হতে না হয়। সেজন্য কম চেষ্টা করেননি তিনি। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল আঁকার প্রতি। না, ঠিক আঁকার প্রতি নয়। রঙের প্রতি। খুব ভালো যে আঁকতে পারতেন তাও নয়। তবে যাই আঁকতেন, তাতে কমবেশি করে এই রং, ওই রং, সেই রং মিশিয়ে মিশিয়ে এমন একেকটা অভিনব রঙের জন্ম দিতেন যে, ওটা দিয়ে তুলির একটা সামান্য আঁচড় টানলেও বন্ধুবান্ধবেরা একেবারে হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকত।
পরে, আরও পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় আর রং নয়, তিনি মেতে উঠলেন নানা রঙের তরল নিয়ে। যাকে সহজ ভাষায় বলে কেমিক্যাল। বিভিন্ন অনুপাতে এই কেমিক্যাল, ওই কেমিক্যাল, সেই কেমিক্যালের মিশ্রণ ঘটিয়ে ঘটিয়ে উনি সৃষ্টি করতে লাগলেন তাক লাগানো একেকটা আবিষ্কার।
এভাবেই একদিন লিখেছিলেন, টেবিলের উপরে রাখা পার্সটা সকাল থেকেই তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। না, সেদিন বাইরের কেউই তাঁর ঘরে ঢোকেনি। তাহলে কোথায় গেল! তাঁর বাড়ির বহুদিনের পুরনো কাজের লোক হরিহর আবার তুলে রাখেনি তো! এটা মনে হতেই হরিহরকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার পার্সটা দেখেছ নাকি?”
সঙ্গে সঙ্গে হরিহর বলেছিল, “কই, না তো। আমি তো দেখিনি। দ্যাখেন, কোথায় রেখেছেন। আপনার যা ভুলো মন।”
সেদিনই অসাবধানতাবশত হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল একটা টেস্ট টিউব। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। টেস্ট টিউবের তরল কেমিক্যালটা হাওয়ার সঙ্গে মিশে মুহূর্তের মধ্যে উবে গিয়েছিল। ওটা উবে যেতেই অদ্ভুত একটা নোনতা নোনতা বিদঘুটে গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। পৌঁছে গিয়েছিল পাশের ঘরেও। আর তখনই সেই হরিহরই ও-ঘর থেকে পড়ি কি মরি করে ছুটে এসে বলেছিল, “দাদাবাবু, টেবিলের উপর থেকে আপনার মানিব্যাগটা কিন্তু আমিই নিয়েছি।”
কথাটা উনি শুনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওই ভেঙে যাওয়া টেস্ট টিউবটা নিয়ে উনি এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, ওসব পার্থিব জিনিস নিয়ে কথা বলার মতো অবস্থায় তিনি তখন আর ছিলেন না।
ওসব মিটে যাওয়ার পরে যখন তাঁর মনে পড়ল হরিহরের বলা সেই কথাটা, উনি তখন হরিহরকে ডেকে পাঠালেন। তাকে বললেন, “নিয়েছ, ঠিক আছে। কিন্তু বলে নেবে তো। তাহলে শুধু শুধু খুঁজতে গিয়ে আমার অতটা সময় নষ্ট হত না।”
তখন সঙ্গে সঙ্গে একেবারে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে হরিহর বলেছিল, “কী বাবু? কী নিয়েছি?”
অবাক হয়ে ঔপমানব বলেছিলেন, “কেন, আমার মানিব্যাগটা!”
“আপনার মানিব্যাগ! আমি! কেন নেব বাবু? আপনি কি আমাকে কিছু কম দেন? যখন দরকার হয়, আপনার কাছে চাইলেই তো পাই।”
না। সেদিন হাজার চেষ্টা করেও উনি হরিহরকে দিয়ে আর স্বীকার করাতে পারেননি খানিকক্ষণ আগে ও যে কথাটা নিজে থেকে এসে বলে গিয়েছিল সেই কথাটা। কিন্তু তারপর থেকেই ঔপমানবের মনের মধ্যে বারবার টোকা দিয়ে যাচ্ছিল সেই ঘটনাটা। উনি তো ওকে জিজ্ঞেস করেননি, ও নিজে থেকেই এসে বলেছিল! অথচ ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, ও তখন অস্বীকার করল কেন? কেন? কেন? কেন? তখনই তাঁর মনে পড়ে গেল, খানিক আগে তাঁর হাত ফসকে পড়ে যাওয়া টেস্ট টিউবের কথাটা। তাহলে কি ওই কেমিক্যালটা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন কোনও বিক্রিয়া ঘটেছিল, যার গন্ধ ছিল নোনতা নোনতা, স্বাদ ছিল নোনতা নোনতা, সেই বিক্রিয়া ওর নাকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিংবা ওর শরীরের ত্বক ছোঁয়ামাত্রই ওর মনের মধ্যে এমন একটা কিছু ঘটেছিল যার জন্য হরিহর নিজে থেকে এসে তার অপরাধ স্বীকার করে গিয়েছিল? দোষ কবুল করেছিল! এই সম্ভাবনাটা উনি তাঁর ডায়েরিতে নোট করে রেখেছিলেন।
তারপর আরও একদিন। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া তাঁদের পাড়ারই এক বৃদ্ধ বহুদিন পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একটা কেমিক্যালের ফ্লাস্কে অন্য একটা কেমিক্যাল ড্রপারে তুলে একফোঁটা একফোঁটা করে মোট পাঁচ ফোঁটা ফেলতে গিয়ে ভুল করে ছ’ফোঁটা ফেলে দিতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো সারা ঘর আলোর ঝলকানিতে দপ করে জ্বলে উঠেছিল। আর সেটা দেখে ঔপমানব ‘যাহ্‌’ বলতেই বৃদ্ধ বলেছিলেন, “না বাবা, আমি থাকলেই তুমি কথা বলবে। আর কথা বলতে বলতে কাজ করতে গেলেই ভুল হবে। তাতে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি হবে। না, আমি বরং আজ উঠি। অন্যদিন আসবখ’ন। কেমন?”
বলেই না যেভাবে এসেছিলেন সেভাবে ঝুঁকে নয়, একজন তরতাজা যুবকের মতোই শিরদাঁড়া টানটান করে লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
বৃদ্ধের হাঁটা দেখে চমকে উঠেছিলেন ঔপমানব। তাহলে কি এটাও পাঁচ ফোঁটার জায়গায় ছ’ফোঁটা কেমিক্যাল মেশানোর ফল? উনি তখনই ডায়েরিতে নোট রেখেছিলেন সেটা।
এর ক’দিন পরে আরও একটা ঘটনা তিনি লিখে রেখেছিলেন। শুধু লেখেনইনি, লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইনও করে রেখেছিলেন। তিনি শুনেছিলেন, তাঁর এক ছাত্র ভয়ানক মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বড়ো বড়ো ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। তবুও হাল ছাড়তে চাইছেন না তার বাবা-মা। যে যেখানে যেতে বলছে, সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন। এই মসজিদের পীরবাবাকে দিয়ে ঝাড়ফুঁক করাচ্ছেন। ওই মন্দির থেকে চরণামৃত এনে খাওয়াচ্ছেন। সেই থানে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকছেন। একের পর এক মানত করে যাচ্ছেন।
হাতে তো আর বেশিদিন সময় নেই। স্যারও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। উনি যখন আসতে পারছেন না, আমি তো এখনও বিছানায় পড়ে যাইনি। যথেষ্ট হাঁটাচলা করতে পারি। যাই, আমিই গিয়ে বরং দেখা করে আসি। এটা ভেবে যেদিন সেই ছাত্র তাঁর কাছে এল, সেদিনই আবার একটা ভুল করে বসলেন ঔপমানব। যে কাচের ফ্লাস্কটায় একশো ডিগ্রি উত্তাপ দেওয়ার কথা, পাশাপাশি ওই একই মাপের, একইরকম দেখতে অন্য একটা ফ্লাস্কে একই রঙের প্রায় সমপরিমাণ কেমিক্যাল থাকার ফলে সম্ভবত অন্যমনস্কতার জন্য সেটাতেই উত্তাপ দিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যখন ভুল ভাঙল, তার আগেই ঘটে গেল একটি ছোট্ট ঘটনা। উত্তাপ পেয়েই ওই ফ্লাস্ক থেকে হলুদ রঙের একটা ধোঁয়া হু হু করে বেরিয়ে কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশে। না, তাঁর ঘরে ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রের বাবা-মা থাকলেও অন্য কেউ নয়, শুধুমাত্র ওই ছাত্রটাই কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন তার নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করার কথা ছিল। সেগুলি করেওছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট দেখে ডাক্তারেরা তো একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। মুখ ফসকে একজন তো বলেই ফেললেন, “একেই বলে মিরাক্যাল।” না, মারণ রোগ তো নয়ই, তার শরীরে সামান্য কোনও সর্দি-কাশিও নেই।
এই খবর শুনে থমকে গিয়েছিলেন ঔপমানব। তাহলে কি ভুল করে ওই কেমিক্যালে উত্তাপ দেওয়ার জন্যই এটা ঘটল! ওই কেমিক্যালে উত্তাপ দেওয়ার ফলে হয়তো সামান্য একটু ঝাঁঝ বেরিয়েছিল। কিন্তু অন্য কেউ তো কাশেনি। তাহলে কি যার শরীরে মারণ রোগ বাসা বেঁধেছিল, ওই ঝাঁঝের গুণে শুধু সেই কাশতে কাশতে ওই রোগটাকে ঝেড়ে ফেলে দিল!
পরপর এরকম একেকটা বিচিত্র ঘটনা ঘটার পর তাঁর মনের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, হিসেবনিকেশ করে কিচ্ছু হয় না। যা হবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা ভুল করেই হয়। তাই বিভিন্ন ফ্লাস্ক, বিকার আর টেস্ট টিউবের মধ্যে নানারকম কেমিক্যাল রেখে দিতেন তিনি। আর যে-ই তাঁর সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসত, কেমিক্যাল সম্বন্ধে যার কোনও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, উনি তাদেরও বলতেন, “যাও তো, ও-ঘরে গিয়ে তোমার যে রংটা পছন্দ হয় সেই রঙের তরল অন্য যেকোনও রঙের কেমিক্যালের পাত্রে যে ক’ফোঁটা বা যতটা ঢালতে ইচ্ছে করে একটু ঢেলে এসো তো।”
এটা করতে গিয়ে তাঁর ল্যাবরেটরিতে কম অঘটন ঘটেনি। কখনও দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে। কখনও ঝাঁঝালো গ্যাসে শুধু ওই ঘরই নয়, গোটা বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাঁকে। কখনও এমন কটু গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে যে, নাক রাখা দায় হয়ে উঠেছে। তবুও, তবুও তিনি তাঁর এই খামখেয়ালিপনা বন্ধ করেননি। বন্ধ করার কোনও সম্ভাবনাও দেখা যায়নি।
বাইরের লোককে বললেও ঔপমানব কিন্তু কখনও তাঁর স্ত্রী কিংবা তাঁর ছেলেকে একথা কোনওদিন বলেননি। আর তাতেই মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছিল অভিমন্যু। তাই একদিন তার বাবা যখন টানা তিনদিন তিন রাত ল্যাবরেটরিতে কাজ করে সকালবেলায় পাশের ঘরে এসে শুয়েছেন, শোয়ার আগে বালিশের ঢাকনা চার ভাঁজ করে চোখের উপরে মেলে দিয়েছেন যাতে দিনের আলো তাঁর ঘুমের কোনও ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে, তখন চুপিচুপি পা টিপে টিপে ল্যাবরেটরিতে ঢুকে সামনের টেবিলে থাকা গোলাপি রঙের তরল ভরা একটা ফ্লাস্কের মধ্যে ওপাশের তাক থেকে একটা টেস্ট টিউব তুলে এনে তার মধ্যে থাকা সবুজ রঙের একটা তরল আলতো করে খানিকটা ঢেলে দিয়েছিল অভিমন্যু। আর সেটা ঢালামাত্রই বুদবুদ করে ফুটতে শুরু করেছিল সেটা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গুঁড়ো সাবানের ফেনার মতো বগবগ করে উথলে উঠেছিল। ভয় পেয়ে টেবিলের উপরেই টেস্ট টিউবটা কোনওরকমে রেখেই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল ও। দেখেছিল, সেই ফেনা ছোটো ছোটো বলের আকার নিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে কেমন ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
ও যেন কিচ্ছু জানে না এমন ভান করে চুপচাপ পড়ার টেবিলে গিয়ে বই খুলে বসেছিল। কিন্তু পড়বে কী! ও শুধু উসখুস করছিল আর মনে মনে ভাবছিল, বাবার ঘুম ভাঙার আগেই ওগুলি ফেনা হয়ে সব উবে যাবে তো! বাবা টের পাবে না তো! ভাগ্যিস মা এখন স্কুলে। নইলে যে কী হত! বাবার হাত থেকে রক্ষা পেলেও মায়ের হাত থেকে কি রেহাই পাওয়া যেত? কে জানে।


পাঁচ


বাপের বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রায় দিনকার মতোই বাস থেকে নামলেন জবালা। আজ তাঁদের বাসটা একই রুটের অন্য একটা বাসের সঙ্গে রেষারেষি করতে গিয়ে এত স্পিড নিয়ে ফেলেছিল যে, ঠিক সময়ে ব্রেক কষেও স্টপেজে দাঁড়াতে পারেনি। স্টপেজ ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। তাও কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তার মধ্যেই পাদানি থেকে উনি কোনওরকমে তড়িঘড়ি রাস্তায় পা রাখতেই ফের রুদ্ধশ্বাসে ছুট লাগিয়েছিল বাসটা। তাই কন্ডাক্টরকে দু’কথা শোনানোর ইচ্ছে থাকলেও কোনও উপায় ছিল না। যেদিক দিয়ে বাসটা এসেছিল, পিছন ফিরে সেদিকেই হাঁটা শুরু করেছিলেন জবালা। আজ তাঁকে একটু বেশিই হাঁটতে হবে।
ক’পা হাঁটতেই রোজকার মতো চোখ পড়ল ছাউনি দেওয়া ঝাঁ-চকচকে বাস-স্টপেজটা। ভিতরে পুরো দেওয়াল জুড়ে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছবি। পাশে বড়ো বড়ো করে লেখা, দাঁড়াও পথিক বর জন্ম তব যদি বঙ্গে…
যেতে যেতে এই দু’লাইনের বেশি ওঁর কোনওদিনই পড়া হয়ে ওঠে না। কিছুদিন আগেই স্থানীয় বিধায়কের এলাকা উন্নয়নের তহবিল থেকে এটা বানানো হয়েছে। এখনও এক্কেবারে নতুন। তবে ভিতরে কবির নাম যত বড়ো করে লেখা, তার চেয়েও বড়ো বড়ো হরফে সেই বিধায়কের নাম এই স্টপেজের মাথায় মেটেল দিয়ে উঁচু করে ফলাও করে লেখা।
এই বাস-স্টপেজের গায়েই ভ্যান-রিকশার উপরে ডাই করে রাখা ডাবগুলির দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলেন তিনি। এত নিটোল, গোলগাল, উজ্জ্বল সবুজ তরতাজা ডাব তিনি বহুদিন দেখেননি। দেখে মনে হল কেউ বুঝি সদ্য রং করে রেখেছে।
এখন শুধু শাকসবজি, খাবারদাবারেই নয়, মশলাপাতিতেও রং মেশানো হচ্ছে। রং করা হচ্ছে ফুলেও। খানিক পরেই সাদাটে ভাব ফিকে হয়ে কেমন লালচে লালচে হয়ে যায়। তাই দোকানিরা রজনীগন্ধার বড়ো বড়ো মালা একটু পরে পরেই নীল রঙে চুবিয়ে খদ্দেরদের জন্য সাজিয়ে রাখেন। ওই রং দেখেই খদ্দেরদের মনে হয়, ফুলগুলো বুঝি এক্ষুনি গাছ থেকে তুলে আনা।
কানকো দেখে অনেকে মাছ কেনেন বলে নাকি আজকাল মাছ বিক্রেতারাও বড়ো বড়ো মাছের কানকোতে একধরনের লাল রং লাগিয়ে রাখেন। আসলে গন্ধ বা সাধ তো অনেক পরের ব্যাপার। চোখ টানার প্রথম ধাপই হল—রং।
তাই পাত্র বা পাত্রী দেখতে গেলেও বাবা-মায়েরা প্রথমেই দেখেন যাকে দেখতে গেছেন তার গায়ের রং কেমন। স্কুলের গেটের সামনে কিংবা যেকোনও মেলায় বরফ-জল কেনার সময় বাচ্চারাও দেখিয়ে দেয় কোন রংটা তার চাই। কিশোর-কিশোরীরাও বিশেষ কোথাও যাবার দিন নিজের সবচেয়ে প্রিয় রংয়ের পোশাকই পরতে ভালোবাসে। জন্মদিনে বা ভাইফোঁটায় কিংবা এমনিই কাউকে কোনও জামাপ্যান্ট অথবা কোনও শাড়ি উপহার দেওয়ার সময় সবাইকেই মাথায় রাখতে হয় কোন রংটা তাকে মানাবে কিংবা কোন রংটা তার প্রিয়। তার উপর যাচাই করে দেখতে হয় সেই রংটা পাকা না কাঁচা। তাই যাঁরা একটু সচেতন কিংবা যাঁদের একটু অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরাই কেবল রং দেখে বুঝতে পারেন কোন অলঙ্কারে কতটা খাদ মেশানো আছে।
রং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। তাই জ্যোতিষীরা ভাগ্য ফেরানোর জন্য কাকে কোন রংটা সুট করবে, সেইমতো ভিন্ন ভিন্ন লোককে ভিন্ন ভিন্ন রঙের পাথর পরার জন্য পরামর্শ দেন। যেকোনও আঁকাই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এই রঙের গুণেই। মাথার চুল সাদা হয়ে গেলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় সকলেই কলপ করেন চুলে। নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যই ঠোঁটে রং লাগায় বহু মেয়ে। রঙের বাহার আছে বলেই মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে ময়ূরের পেখমের দিকে। আবার এই রংই অত্যন্ত ক্ষতিকারক বলে প্রশাসনিক দফতর থেকে মাঝে মাঝেই হানা দেয় বাজার-হাটে। খুঁজে বার করার চেষ্টা করে কোনও বিক্রেতা আনাজপত্রে রং করে বিক্রি করছে কি না।
তাহলে কি আজকাল ডাবওয়ালারাও ক্রেতাদের নজর কাড়ার জন্য ডাবগুলিকে সবুজ রঙে ডোবাচ্ছে! সে নয় ডোবাল। কিন্তু ডাবগুলোর চেহারা এত নিটোল-নিখুঁত হল কী করে?
ক’দিন আগেই তাঁর বাবা ‘ক্যানসার-ফ্রি’ হয়ে গেছেন। কিন্তু তারপর থেকেই হঠাৎ শুরু হয়েছে অন্য একটা সমস্যা। শরীরে জোর পাচ্ছেন না। ঘরের মধ্যে দু’পা হাঁটলেই মনে হচ্ছে, আর পারা যাচ্ছে না, এবার একটু না বসলেই নয়। মাথায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। সবকিছু কেমন যেন ভুলে যাচ্ছেন। মুখ ধুতে যাবার আগে চশমাটা যে কোথায় রেখে গেছেন, ওয়াশ-রুম থেকে বেরিয়ে সেটা আর কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। খাবার ঠিক আগেই যে ওষুধটা খাবার কথা, প্রথম গ্রাস মুখে নিয়েই মনে করার চেষ্টা করছেন তিনি আদৌ ওষুধটা খেয়েছেন তো! একই প্রশ্ন চারবার করার পরেও একঘণ্টার মধ্যেই ফের সেই একই প্রশ্ন পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, এমনকি অষ্টম বারও করে বসছেন স্ত্রীর কাছে। অথচ পাঁচ বছর আগে কী ঘটেছিল, দশ বছর আগে তাঁর সামনে কে কাকে কী বলেছিল অথবা কুড়ি বছর আগে ঘটা অত্যন্ত ছোটোখাটো অবাঞ্ছিত ব্যাপারও তিনি অবলীলায় বলে যাচ্ছেন।
কেন এমন হচ্ছে? জবালা তাঁর বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক প্রথিতযশা ডাক্তারের কাছে। কয়েকটা পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু জানিয়েছিলেন, ওঁর সোডিয়াম কমে গেছে। পটাসিয়ামও। ওঁকে ভাতের সঙ্গে রোজ বেশ কিছুটা করে লবণ খেতে হবে। ওভাবে খেতে না পারলে ভাতের গোল্লা পাকিয়ে তার মধ্যে যতটা পারা যায় লবণ ভরে জল দিয়ে টুক করে গিলে ফেলতে হবে। কিংবা উনি যখন জল খাবেন তখন জলের সঙ্গে লবণ গুলে খেতে হবে। তার সঙ্গে আরও বলেছিলেন, নিয়মিত অন্তত দুটো করে ডাব খেতে। কারণ, মানুষের শরীরে সোডিয়াম আর পটাসিয়ামের ঘটতি রোধে ডাবের জলই নাকি খুব ভালো কাজ করে। তাই মাঝে মাঝেই স্কুল থেকে ফেরার পথে বাপের বাড়িতে ঢুঁ মারেন জবালা। যাবার সময় বাস-স্টপেজের গায়ের এই ডাবওয়ালার কাছ থেকেই রিকশা করে নিয়ে যান বেশ বড়ো বড়ো মাপের কখনও চারটে, কখনও ছ’টা, আবার কখনও আটটা করে ডাব।
কিন্তু ডাব বাছতে বাছতে জবালার দম বেরিয়ে যায়। কোনও ডাবই তাঁর পছন্দ হয় না। ডাবের গাগুলি কেমন যেন পোড়া পো়ড়া। ফাটা ফাটা। শুকনো শুকনো। দেখলেই মনে হয়, ভিতরে একফোঁটাও জল হবে না। গাছ থেকে পাড়ার পর বোধহয় বহুদিন কোথাও ফেলে রাখা হয়েছিল। এমন চেহারা যে নিতেই ইচ্ছে করে না। কিন্তু না নিয়েই বা উপায় কী! ডাক্তার বলেছেন। তাই ডাবগুলোকে দেখে একটু বিরক্ত হয়েই এই ডাবওয়ালাকেই উনি একদিন বলেছিলেন, “ভালো ডাব আনতে পারো না? ডাবগুলি এরকম মড়া মড়া কেন গো?”
তখন ডাবওয়ালা বলেছিলেন, “মড়া মড়া কি এমনি হচ্ছে? আপনারা যে মোবাইল ব্যবহার করেন, তার টাওয়ারের জন্যই তো এসব হচ্ছে। এই তো সেদিন কে যেন বলছিল, মোবাইল থেকে যে রে বেরোয়, তার জন্য নাকি এগুলো হচ্ছে। উনিই বলেছিলেন, এখন ডাবের গায়ে হচ্ছে। এরপর আম-জাম-কাঁঠালের গায়ে হবে। তারপর মানুষের শরীরে। আস্তে আস্তে দেখবেন এই রে-র প্রভাব আরও নিচে নেমে আসবে। তখন বেল-জুঁই-দোপাটিও বাদ যাবে না।”
ডাবওয়ালার কথা শুনে জবালা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে ছিলেন। বাবা, এরাও এখন রে-ফে বলতে শিখে গেছে! আর ক’দিন পর তো গামা-রে, এক্স-রে, হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েবলেন্থও বলতে শুরু করবে! উনি জানেন, উনিশশো আশি সালে যখন সেলুলার ফোন চালু হয়, তখন এসব সাইড এফেক্ট নিয়ে কেউ অত মাথা ঘামায়নি। এর ক্ষতিকারক দিক যে কত ভয়ানক হতে পারে, কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, নিশ্চয়ই কেউ তা কল্পনাও করতে পারেনি। তাই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই কোনও সেফটি টেস্টিং ছাড়াই এই ফোন বাজারে ছাড়া হয়েছিল।
লোকে এখন বুঝতে পারছে এই মোবাইল টাওয়ারের জন্য কত বিপত্তিই না ঘটছে। বন্যপ্রাণীরা তো আক্রান্ত হচ্ছেই, মোবাইল টাওয়ার থেকে বেরোনো ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন, সংক্ষেপে ই.এম.আর-এর জন্য দিনকে দিন কমে যাচ্ছে চড়াই পাখিও। নাগপুর, ভূপাল, জব্বলপুর আর উজ্জয়িনীতে চড়াই পাখির সংখ্যা তালানিতে এসে ঠেকেছে। কমে যাচ্ছে মৌমাছিরাও। কারণ, এই রেডিয়েশনের প্রভাবেই মৌমাছিরা বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ভুলভাল পথে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। তাছাড়া তাদের ডিম ধারণ করার ক্ষমতাও প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। যে ক’টা পারছে, তার সংখ্যা এবং গুণগত মানও অত্যন্ত দ্রুত হারে কমছে। ফলে বেশিরভাগ ডিমই বাচ্চা হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত মারাত্মক ব্যাপার। কারণ, উনি জানেন, বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বহুবছর আগেই একবার এক আলোচনাচক্রে মানবজাতির বিলুপ্ত হওয়ার নানা কারণ বলতে গিয়ে খুব জোর দিয়েছিলেন এই মৌমাছিদের উপরে। উনি বলেছিলেন, পৃথিবী থেকে যদি সমস্ত মৌমাছি লুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে তার ঠিক চার বছরের মাথায় এই পৃথিবী থেকে গোটা মনুষ্য-জাতিটাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এখন তো ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনও বলছে, মোবাইল টাওয়ার থেকে যে রেডিয়েশন বেরোচ্ছে, তা থেকে মানুষের শরীরে ক্লাস টু বি কার্সিনোজেন রোগের প্রকোপ ভীষণভাবে দেখা দিচ্ছে। এটা একধরনের ক্যানসার। তাই সম্প্রতি গুরগাঁওয়ের ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই দুশো আটানব্বইটি সেল টাওয়ার তুলে ফেলা হয়েছে। সরকারের কাছে জমা দেওয়া অধ্যাপক গিরিশকুমারের পঞ্চাশ পাতার একটি গবেষণালব্ধ রিপোর্টকে গুরুত্ব দিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে টাওয়ার বসানো আছে তার এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন করে সেখানে আর কোনও টাওয়ার বসানো হবে না। বসানো হবে না স্কুল এবং হাসপাতাল চত্বরের কাছাকাছি কোনও জায়গায়ও। টাওয়ার বসানোর আগে দেখে নিতে হবে সেই এলাকায় কতজন ক্যানসার রোগী আছেন। কারণ, দু’হাজার তেরো সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে শুধু এদেশেই একশো কোটির উপর লোক মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং প্রত্যেকদিনই তার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
কিন্তু... না। এসব তো এই ডাবওয়ালার জানার কথা নয়। জানার কথা নয় এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের জন্যই কতরকমের মারণ রোগ মানুষের শরীরে চুপিচুপি ঢুকে পড়ছে। সৃষ্টি করছে নার্ভাস ডিসঅর্ডার। জানার কথা নয় সেই সমীক্ষার কথা যে সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই মৌমাছিদের বদন্যতাতে শুধু মার্কিন মুলুকেই বছরে কমপক্ষে চোদ্দো বিলিয়ন ডলারের বীজ উৎপন্ন হয়। না, এগুলো এঁর জানার কথা নয়। এরমধ্যেই ইনি যেটুকু জেনেছেন সেটাই অনেক। এরপর কিছু বলতে গেলে ইনি হয়তো এমন কিছু বলে বসবেন, যা তাঁকে চমকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যা হয়তো উনি নিজেও জানেন না।
তাই উনি আর কথা বাড়াননি। শুধু বলেছিলেন, “ধুস, এত দাম দিয়ে এই ডাব খাইয়ে কী হবে? এতে না আছে জল, আর যে দু’-চার ফোঁটা আছে, তাতে না আছে কোনও স্বাদ। না আছে কোনও গুণ। এরকম ডাব আনলে আমি কিন্তু এরপর থেকে আর নেব না।”
সেদিন ও-কথা বলেছিলেন দেখেই কি দীর্ঘদিনের চেনা এই ডাবওয়ালা তাঁর জন্যই খুঁজে খুঁজে একেবারে বেছে বেছে এরকম সুন্দর ডাগরডোগর ডাব নিয়ে এসেছেন!
এসব ভাবতে ভাবতে তিনি যে কখন ডাবওয়ালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন জবালা নিজেও জানেন না। ডাবওয়ালা যখন বললেন, “আজ ক’টা দেব, দিদি?” তখন তাঁর ঘোর ভাঙল। কিন্তু সেই কথার উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, “এই ডাবগুলি তুমি কোথায় পেলে?”
“যেখান থেকে রোজ নিয়ে আসি, সেখানেই পেয়েছি। বাজারে তো এখন এই ক’দিন ধরে এইরকমই ডাব আসছে।”
ডাবওয়ালা একথা বলতেই অবাক হয়ে গেলেন জবালা। “এখন এইরকম ডাব আসছে! এত ফ্রেশ! দু’দিন আগে যখন ওই বাজে ডাবগুলো দিলে তখন যে বললে, সারা বাজার খুঁজলেও এর চেয়ে ভালো ডাব আমি আর কোথাও পাব না!”
“বলেছিলাম তো। এখনও তো সেই একই কথা বলছি। গোটা বাজার ঢুঁ মারলেও এরকম ঝকঝকে ডাব ছাড়া ওরকম ম্যাড়মেড়ে ডাব আপনি আর একটাও পাবেন না।”
“তার মানে?”
“মানে, চালানে যা আসবে আমরা তো তাই দেব। তার বাইরে তো কিছু দিতে পারব না!”
“তার মানে ডাবে এখন আর ওরকম কোনও দাগ-টাগ হচ্ছে না?”
“না। হচ্ছে না। তাই তো দেখছি।”
“তাহলে যে রে-ফে’র কথা বলেছিলে?”
“লোকের মুখে যা শুনেছিলাম, তাই বলেছিলাম।”
“তাহলে কি মোবাইল থেকে এখন আর কোনও রে-টে কিছু বেরোচ্ছে না?”
ডাবওয়ালা মুখে কিছু বলল না। চোখমুখ বেঁকিয়ে এমনভাবে ঠোঁট ওলটাল, যেন বলতে চাইল, কে জানে!


ছয়


বাপের বাড়িতে ঢুকে জবালা দেখলেন, সামনের ঘরে ছোকরামতো একটা ছেলে বসে আছে যাকে এর আগে কোনও দিন দেখেননি। তাই জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা কোথায়?”
সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “বাবা! কে বাবা?”
“সে কী! আপনি আমার বাবার বাড়িতে বসে আছেন, অথচ আমার বাবাকে চেনেন না! বলছেন, কে বাবা? আপনি কে?”
“আমি চোর।”
“চোর? মানে?”
“মানে আমি চোর। চুরি করি।”
এর কথা শুনে জবালার মনে হল ছেলেটা নিশ্চয়ই মজা করছে। সত্যিই যদি চোর হত, তাহলে এভাবে কখনও বলত না। নিশ্চয়ই বাবার পরিচিত। হয়তো আশেপাশে থাকে। বাবার কাছে এসেছে। সত্যিই, বাবাকে নিয়ে না আর পারা যায় না। কতদিন বলেছি, যতই পরিচিত হোক, হুটহাট করে কাউকে বাড়ির ভিতরে ঢুকিও না। কে কেমন মানুষ কিচ্ছু বলা যায় না। কত ঘটনা যে প্রতিনিয়ত ঘটছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে যাঁদের কোনও ছেলেপুলে নেই। থাকলেও একটা কি দুটো। তাঁরা এমনভাবেই মানুষ করেন, মেয়ে হলে এখানে যোগ্য পাত্র পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বিয়ে করে চলে যায় বহুদূরে কোথাও। কখনও-সখনও বিদেশেও। আর ছেলে হলে কর্মসূত্রে অন্য কোনও রাজ্যে, নয়তো অন্য কোনও রাষ্ট্রে। মা-বাবার থেকে অনেক দূরে। ফলে ঘরে থাকেন বুড়োবুড়ি। আর তার মধ্যে যদি একজন ইতিমধ্যেই গত হয়ে থাকেন তাহলে তো কথাই নেই। একেবারে একা। তাঁকে দেখাশোনার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা লোক রাখলেও দেখা গেছে, সেই লোকই এসবের পিছনে কলকাঠি নাড়ে। ফলে তাকে মারতে কতক্ষণ? তাই জবালা যখনই আসেন, বারবার করে বাবাকে বলে যান, দিন হোক বা রাত হোক, যতই কলিং বেল টিপুক, দরজা ধাক্কাক, নাম ধরে চিৎকার করে ডাকুক, চেনা স্বর হলেও দরজা খোলার আগে অন্তত একবার ঘুলঘুলি দিয়ে দেখে নেবে সে কে। তারপর খুলবে। আর এই ভরসন্ধের মুখে উনি কিনা হাট করে দরজা খুলে রেখেছেন! তাও সামনের ঘরে এমন একজনকে বসিয়ে রেখে গেছেন, যাকে তাঁর মেয়েও চেনে না। তার উপর উনি আবার বড়ো মুখ করে বলছেন, আমি চোর। সত্যিই, বাবাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
“বাবা কোথায়?”
ছেলেটার কোনও হেলদোল নেই। সে বলল, “ও, উনি? উনি তো আমার জন্য ব্যান্ড ডেট কিনতে গেছেন।”
“ব্যান্ড এইড? বাবা? মানে?”
জবালা আকাশ থেকে পড়লেন। যে বাবাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে বারণ করে গেছেন, যা লাগে দুয়েকদিন পরপর স্কুল থেকে ফেরার পথে নিজে এসে কিনে দিয়ে যান যাতে বাবার কোনও কষ্ট না হয়, সেই বাবা কিনা একটা বাইরের লোকের জন্য ওষুধের দোকানে গেছে! বাবার উপরে বিরক্ত হলেও ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি তো অদ্ভুত লোক! দেখছেন একজন বৃদ্ধ মানুষ। কোথায় তাঁর জন্য আপনি ওষুধ কিনতে যাবেন, তা নয়, উলটে তাঁকেই পাঠিয়েছেন ওষুধ কিনতে? ব্যাপারটা কী?”
“ব্যাপারটা কিছুই না। আমার হাঁটু আর কনুইয়ের কাছটা ছড়ে গেছে তো, সেটা দেখে উনি আর ঠিক থাকতে পারলেন না।”
ও একথা বলতেই জবালার চোখ চলে গেল ছেলেটার কনুইয়ের দিকে। হ্যাঁ, একটু ছড়ে গেছে বৈকি। রক্তও বেরোচ্ছে। হাঁটুটা দেখা যাচ্ছে না। টি-টেবিলে ঢাকা পড়ে আছে। হ্যাঁ, ও যখন বলছে, হাঁটুর কাছটাও ছড়ে থাকতে পারে। তা বলে কি একটু হাঁটা যায় না! ওষুধের দোকান তো আর সাতসমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে নয়। কিন্তু এ যখন বলছে বাবা গেছে, তার মানে বাবা নিজে থেকেই গেছে। কিন্তু কেন?
এই ‘কেন’টাই বলল সে। সে নাকি অনেকদিন এ-পাড়ায় আসেনি। তাই এখানকার লোকেরা একটু গা ছাড়া দিয়ে আছে। এই-ই সুযোগ। গতকাল সন্ধে গড়িয়ে যাবার পরেই ও চুপিচুপি এ-পাড়ায় ঢুকে পড়েছিল। পাড়ার ভিতরে যে রথতলাটা আছে, সেখানে একটা রথ থাকলেও বেশ কয়েক বছর ধরে সেটা বেরোচ্ছে না। বর্ষার সময় উপর থেকে জল পড়ে পড়ে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। রংটং তো উঠেইছে, কাঠও পচতে শুরু করেছে। এখন ভেঙে ভেঙে পড়ছে। ফলে ওর সামনে দিয়ে পাড়ার লোকেরা যাতায়াত করলেও কারও নজর সেখানে খুব একটা পড়ে না। তাই ও চারপাশটা ভালো করে দেখে নিয়ে তার মধ্যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। রাত যখন অনেক, তখন বেরিয়েছিল চুরি করতে। কিন্তু কে জানত সামনের বাড়ির দোতলার লোকটা অনিদ্রা রোগে ভোগে; লাইট-টাইট নিবিয়ে সারারাত ঝুলবারান্দায় বসে বসে তারা গোনে? অন্ধকার থেকে কীভাবে একটু একটু করে আলো ফোটে, সেটা দেখে। তা দেখুক, কিন্তু তাকে দেখল কেন! আর যদি দেখেও থাকে, হঠাৎ অত জোরে চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠল কেন? আর চিৎকার করলেও এ-বাড়িতে ও-বাড়িতে পটাপট আলো জ্বলে উঠল কেন? আলো জ্বললেও হুটহাট লোকজন বাইরে বেরিয়ে এল কেন? লোকজন বেরোলেও তাকে তারা দেখতে পেল কেন? দেখতে পেলেও ওভাবে তাড়া করল কেন?
তাড়া খেয়ে সে যখন পাঁচিল টপকে এ-বাড়িতে ঢুকল, আলতো করে ঠেলে দেখল ভিতর থেকে দরজা বন্ধ। তাই পাশের সরু প্যাসেজটায় ঢুকে জানালার গ্রিল দিয়ে উঁকি মেরে রাত-বাতির হালকা আলোয় দেখল, উনি অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। পিছনে তখন ওরা। যেকোনও মুহূর্তে এখানে চলে আসতে পারে। ওর মনে হল, বাড়ি সারানোর জন্য বহুদিন আগে নিশ্চয়ই ইট-বালি-সিমেন্ট কিনেছিলেন উনি। কয়েক বস্তা বালি হয়তো বেঁচে গিয়েছিল, সেগুলি আর ফেরত দেওয়া হয়নি। ওখানেই রেখে দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস রেখেছিলেন। তাই ওই বস্তাগুলির পাশে আরেকটা বস্তার মতোই ‘দ’ হয়ে ঘাপটি মেরে রইল সে।
কিন্তু ওরা ছাড়বার পাত্র নয়। পিছু পিছু এসে আশেপাশের বাড়িগুলিতে নক করতে লাগল অপরিচিত কেউ ঢুকেছে কি না। ও দেখল, এ বাড়িতেও দু’-তিনটে ছেলে এসে কলিং বেল টিপল। কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়ামাত্রই ঘরের ভিতরে লাইট জ্বলে উঠল। জ্বলল সদর দরজার মাথায় লাগানো লাইটটাও। সেই আলো ওর গায়ে পড়লেও পড়তে পারে ভেবে টানটান হয়ে ও শুয়ে পড়ল বস্তাগুলির আড়ালে।
ছেলেগুলো ওঁকে বলে গেল, “বাড়িতে কেউ ঢোকেনি তো? এদিকে একটা চোর এসেছে। একটু সজাগ থাকবেন।” বলেই অন্য বাড়ির দিকে ওরা চলে গেল। ওরা চলে যেতেই উনি বস্তাগুলির দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “এই যে বাছা, ভিতরে এসো। কতক্ষণ আর ওখানে শুয়ে থাকবে! ওরা দেখলে পেলে আর আস্ত রাখবে না।”
বহুদিন ধরে চুরি করছে সে। এরকম লোক জীবনে দেখেনি। বুঝতে পারল, ইনি আর পাঁচজনের মতো নন। চুপিচুপি এ-ঘরে ঢুকে পড়ল সে।
ভিতরে ঢুকতেই উনি লাইট নিভিয়ে দিলেন। বললেন, “লাইট জ্বললে ওরা সন্দেহ করতে পারে।”
ফলে নাইট ল্যাম্পের আবছা আলোয় আমরা কথা বলতে লাগলাম। উনি বললেন, “এত রাতে কেউ বেরোয়?”
আমি বললাম, “কী করব বাবু!”
“খেয়েদেয়ে বেরিয়েছিলি?”
“না। কখন খাব?”
“দাঁড়া, এখানে বস। আমি আসছি।” বলে ভিতর থেকে বড়ো একটা প্লেটে করে একগাদা খাবার নিয়ে এলেন তিনি। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী করিস?”
আমি বললাম, “চুরি করি।”
উনি বললেন, “চুরি করা যে খারাপ, সেটা জানিস?”
বললাম, “খুব ভালো করেই জানি। আর সেটা জানি দেখেই তো রাত্রিবেলায় বেরোই। নাহলে তো দিনেরবেলাতেই চুরি করতাম।”
উনি জানতে চাইলেন, “বাড়িতে কে কে আছে?”
বললাম, “মা, বউ, ছেলে আর একটা মেয়ে।”
শুনে তিনি খুব বকাঝকা করলেন। বললেন, “তুই যে চুরি করতে বেরোস, ওরা জানে?”
বললাম, “আগে কেউ জানত না। কিন্তু প্রথম যেদিন ধরা পড়লাম, গণধোলাই খেয়ে বাড়ি ফিরলাম, কে মেরেছে, কেন মেরেছে, রাস্তায় মারলেও কেউ কেন আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি, এসব প্রশ্নের যথাসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়ারও চেষ্টা করলাম। তাতে আমি কেন মার খেয়েছি সেটা বুঝতে না পারলেও মা আর বউ নিশ্চয়ই কিছু একটা সন্দেহ করেছিল। কিন্তু তার কয়েক মাস পরেই যখন চুরির দায়ে আমাকে পুলিশে ধরল তখন আর কোনও অজুহাত টিকল না। ধরা পড়ে গেলাম।”
উনি বললেন, “আজ যে চুরি করতে বেরিয়েছিস, ওরা জানে?”
আমি বললাম, “না। ওরা জানে আমি নাইট গার্ডের একটা চাকরি পেয়েছি। সেই কাজে বেরিয়েছি।”
ওঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে জানি না। ভোরের তেরছা আলো জানালা দিয়ে আসতেই উনি বললেন, “এ কী রে, তোর তো হাত ছড়ে গেছে! রক্ত বেরোচ্ছে!”
আমি বললাম, “ও কিছু না। এরকম কত হয়।”
উনি বললেন, “কত হয় মানে? না না, আমার বাড়িতে এসব চলবে না। দাঁড়া।” বলে উনি ভিতরে গিয়ে ডেটল, তুলো আর গজ নিয়ে এলেন। কিন্তু ডেটল দেখেই আমি আঁতকে উঠলাম।
উনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”
আমি বললাম, “না না, ডেটল লাগাব না। ভীষণ জ্বালা করে।”
তখন উনি বললেন, “এছাড়া তো আমার কাছে আর কিছু নেই। ঠিক আছে দাঁড়া, দোকান খুলুক, আমি ব্যান্ড এড নিয়ে আসব।”
আমি বলেছিলাম, “দরকার নেই। আর আপনি যদি একান্তই জোরাজুরি করেন, তাহলে নাহয় এখান থেকে বেরিয়ে আমিই কিনে লাগিয়ে নেবখ’ন।”
কিন্তু উনি আমার কথা শুনলেন না। বললেন, “কাল রাতে কেউ যদি তোকে দেখে থাকে, বেরোলে ওরা যদি তোকে চিনতে পারে, তখন?”
ছেলেটা কথাগুলি বলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার কথা জবালার বিশ্বাস হচ্ছে না। যে বাবা ছোটোখাটো অন্যায় দেখলেও একদিন রুখে দাঁড়াতেন, তিনি আজ কিনা একটা চোরের জন্য ব্যান্ড এইড আনতে গেছেন! এটা কি বিশ্বাস করা যায়? না এটা সম্ভব? নাকি বয়স হলে মানুষ এরকমই হয়ে যায়? যখন তাঁর চোখে-মুখে একটা গভীর সন্দেহ দানা বেঁধে উঠছে, ঠিক তখনই তিনি দেখলেন, তাঁর বাবা চৌকাঠ ডিঙিয়ে এঘরে ঢুকছেন। হাতে মেডিকেল শপের একটা ঢাউস ক্যারিব্যাগ। আর তার ভিতর থেকে উঁকি মারছে ইয়া বড়ো একটা হরলিক্সের বোতল। কিন্তু প্যাকেটটার ফুলো ফুলো চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, তার মধ্যে শুধু ওটাই নয়, আরও অনেক কিছু আছে। কিন্তু ব্যান্ড এইড ছাড়া যে আর কী কী আছে, জবালা তা বুঝতে পারলেন না। বাবার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।


সাত


সক্কালবেলায় চোখ খুলতেই ঔপমানব দেখলেন চোখের সামনে কতগুলো সাংকেতিক চিহ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে। চিহ্নগুলো ভারি অদ্ভুত আকারের। না গোল, না চৌকো, না ত্রিকোণ। প্রত্যেকটার থেকে প্রত্যেকটা আলাদা। কেমন যেন এবড়োখেবড়ো। এগুলো যে কীসের চিহ্ন খুব ভালো করে দেখেও উনি তা বুঝতে পারলেন না।
আগেও এরকম হত। আগে মানে অনেক আগে। এত আগে যে মাঝে মধ্যেই ওঁর মনে হয়, এ জন্মের নয়, ওটা গত জন্মের বা তারও আগের কোনও জন্মের ঘটনা। ওঁর বয়স তখন কত হবে! খুব বেশি হলে দু’-আড়াই কি তিনবছর। ওঁর বাবা ওঁকে বলেছিলেন, “প্রত্যেকদিন স্নান করে উঠে আগে সূর্যদেবকে প্রণাম করবি। তার পর বাকি সব কাজ।”
বাবার সেই কথামতো প্রথম যেদিন উনি প্রণাম করতে গেলেন, দেখলেন সূর্যের রশ্মি থেকে কতগুলো চক্করবক্কর নাচতে নাচতে তাঁর সামনে এসে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। কখনও লাফাচ্ছে তো কখনও ডিগবাজি খাচ্ছে। কখনও আবার জিমন্যাস্টিক দে‌খাচ্ছে। উনি বুঝতে পারলেন না ওগুলো কী। কী করেই বা বুঝবেন, তখনও যে তাঁর হাতেখড়ির বয়সও হয়নি।
পরে তাঁর বাবা তাঁকে স্লেট-পেন্সিল কিনে এনে দিলেন, বড়ো বড়ো করে অ আ ই ঈ লিখে দিলেন হাত বোলানোর জন্য। দিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য ভিতর ঘরে তৈরি হতে যেতেই সেই অক্ষরগুলির দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রথমেই জল-ন্যাকড়া দিয়ে সেই অ আ ই ঈ মুছে দিলেন তিনি। তারপর যে চিহ্নগুলি তাঁর চোখের সামনে এসে নানারকম কসরত করে, লাফায়-ঝাঁপায়, সেই চিহ্নগুলোর আদল মনে করে করে আঁকাবাঁকা হাতে স্লেটের উপরে মোটামুটি একটা এঁকে ফেললেন তিনি।
ওঁর মার আর বাবার স্কুল একই সময়ে শুরু হলেও যেহেতু মায়ের স্কুলটা একটু দূরে, তাই ওঁর বাবা বেরিয়ে যাওয়ার খানিকক্ষণ আগেই উনি বেরিয়ে যান। এই সময় দু’জনেই এত ব্যস্ত থাকেন যে, কেউ কারও সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার মতো ফুরসতও পান না। যাঁর যখন সময় হয়, তিনি তাঁর মতো তৈরি হয়ে বেরিয়ে যান। তাঁদের অন্তত একজন না ফেরা পর্যন্ত শুধু তাঁদের একমাত্র ছেলে ঔপমানবকেই নয়, গোটা সংসারটারই পুরোদস্তুর দেখভাল করেন তাঁদের বহুদিনের পুরনো এক কাজের মাসি। বলতে গেলে এই সংসারের হাল তিনিই ধরে রেখেছেন।
বেরোবার আগে একেবারে বাঁধাধরা গতে প্রত্যেকদিন দোরগোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে যিনি পরে বেরোন তিনি কাজের মাসির উদ্দেশে হাঁক পেড়ে বলে যান, “আসছি গো, দরজাটা দিয়ে দিও।”
কাজের মাসি কিছুতেই বুঝতে পারেন না, একই কথা এভাবে রোজ রোজ বলার কী আছে! ওঁদের এই গা ছাড়া ভাব দেখে তাঁর মনে হয়, ওঁরা সংসার করছেন ঠিকই, কিন্তু সংসারের প্রতি তাঁদের সেরকম কোনও মন নেই। ভীষণ উদাসীন। দু’জন দু’ঘরে বসে সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে কী যে এত পড়ে, কে জানে! আমি তো জানতাম ছোটোরা পড়াশোনা করে। বিয়ে-থা করার পর, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর, খবরের কাগজ ছাড়াও যে লোকে পড়াশোনা করে, এ-বাড়িতে না এলে তো জানতেই পারতাম না!
দরজার কাছে গিয়ে মাসির উদ্দেশে হাঁক পাড়ার আগে কী মন হল ওঁর বাবার, ফের ঘরে ঢুকে ছেলে যে খাটের উপর বসে স্লেট-পেন্সিল নিয়ে লিখছিল, তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আর দাঁড়ানো মাত্র যেন আকাশ থেকে পড়লেন তিনি। ছেলে তাঁর কথা বিন্দুবিসর্গ বুঝবে না জেনেও বললেন, “কী রে, আমি যেগুলি লিখে দিয়ে গেলাম হাত বোলানোর জন্য, সেগুলো কোথায়? নিশ্চয়ই তোর মা ওগুলি মুছে দিয়ে এগুলি লিখে দিয়ে গেছে, না? অঙ্কের মাস্টারনি তো, অঙ্ক ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। ভাবে অঙ্কই সব। আরে বাবা, শব্দ হল ব্রহ্ম। আগে ওটা শিখতে হয়। স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ না শিখলে কিচ্ছু হবে না। নাহ্‌, তোর মাকে নিয়ে আর পারা যায় না! কিন্তু তোকে নিয়ে যে এখন বসব, তারও উপায় নেই। আজ আবার প্রথম পিরিয়ড থেকেই আমার ক্লাস। ঠিক আছে, তোর মা যখন দিয়ে গেছে, ওটাই শেখ।”
ওঁর বাবা যখন একা একা বকবক করছেন, ঔপমানব তখন স্লেটের উপরে আঁকা ওই চিহ্নগুলির উপরে ছোটো ছোটো হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছেন, আর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে চাইছেন। সেটা দেখে ওঁর বাবা ঝপ করে ওঁর পাশে বসে ওই চিহ্নগুলির উপর আঙুল রেখে রেখে বলতে লাগলেন, “এটা যোগ চিহ্ন, এটা ভাগ চিহ্ন, এটা গুণ চিহ্ন আর এটা বিয়োগ চিহ্ন।” তারপর ওঁর গাল আলতো করে টিপে বললেন, “এগুলো সব তোমার মায়ের ডিপার্টমেন্ট, বুঝেছ? মা স্কুল থেকে ফিরলে তাঁর কাছ থেকেই শিখে নিও, কেমন?”
এক দুই শেখার আগেই অঙ্কের এই চিহ্নগুলো খুব ভালো করে চিনে গিয়েছিলেন ঔপমানব। কিন্তু পরে যখন তাঁকে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ শেখানো হতে লাগল, তিনি তখন বুঝেই উঠতে পারলেন না দুই আর দুইয়ে কেন চার হয়, পাঁচ হয় না কেন! ছয় হলেই বা ক্ষতি কী!
না। অঙ্ক তাঁর মাথায় ঢুকত না। তাঁর মাথার মধ্যে তখন আর ওই চিহ্নগুলি নয়, শুধু ছোটোবড়ো নানা মাপের অসংখ্য শূন্য ছোটাছুটি করছে। কখনও সেগুলি দলবেঁধে আবার কখনও-সখনও দলছুট হয়ে একা একাই বসে পড়ছে নয়, সাত, পাঁচের একেবারে গা ঘেঁষে।
উনি এসবের কিছুই বুঝতে পারতেন না। ক্লাস ওয়ানে তিনি যখন পরীক্ষা দিলেন, তাঁর মা-বাবা ভেবেছিলেন, তিনি এবার পরীক্ষায় নির্ঘাত ইয়াব্বড় একটা গোল্লা পাবেন। কারণ, পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই খাতা জমা দিয়ে উনি হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁকে ওভাবে বেরিয়ে আসতে দেখে অন্য ছাত্রছাত্রীর অভিভাবকেরা, বিশেষ করে ওঁর সহপাঠীর মায়েরা ঠোঁট টিপে টিপে হেসেছিলেন। নিজেদের মধ্যে গুজগুজ ফুসফুস করেছিলেন। বলেছিলেন, “বাবা-মা দু’জনেই স্কুল-মাস্টার, আর তাঁদের ছেলেকে দ্যাখো, মনে হচ্ছে সাদা খাতা জমা দিয়ে এসেছে।”
অথচ সবাইকে চমকে দিয়ে সেবার অঙ্কে তিনি একশোয় একশো পেলেন। শুধু তাঁর বাবা-মাই নন, অবাক হয়ে গেলেন তাঁর ক্লাস টিচাররাও।
তার বছর তিনেক পর আর ওসব চিহ্ন নয়, ক্লাস ফোরে উঠতেই যে চিহ্নগুলো ওঁর চোখের সামনে ভাসতে লাগল, সেগুলো একদম অন্যরকমের। ওগুলি কী, তা জানার জন্য সাদা পাতার উপরে ওগুলির অবিকল চেহারা এঁকে এক শিক্ষককে দেখাতেই তিনি বলেছিলেন, “এগুলো দিয়ে তুমি কী করছ? এগুলো শিখতে তো তোমার এখনও ঢের বাকি। এগুলি হল সাইন, কস, ট্যান, লগ, স্কোয়ার রুট। এগুলো অনেক কঠিন ব্যাপার। আরও বড়ো হও, আরও উঁচু ক্লাসে ওঠো, তার পর শিখবে।”
মনে হয় ওই শিক্ষক টিচার্স রুমে গিয়ে এ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। না হলে ওঁদের ক্লাসেরই এক অঙ্কের শিক্ষক ওঁকে ডেকে কেন বলবেন, “এগুলো মাথা থেকে হঠাও। যে বয়সে যেটা শেখার, সেটা সেই বয়সেই শেখা উচিত। অল্প বয়সে সব শিখে ফেললে মহাবিপদ।” বলেই, একটা গল্প বলেছিলেন তিনি।
বলেছিলেন উইলিয়াম সিডিস-এর কথা। তিনি নাকি এক আশ্চর্য প্রতিভাধর মানুষ ছিলেন। জন্মেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মাত্র ছ’মাস বয়সেই বর্ণমালার পাঠ শেষ করে ফেলেছিলেন। দু’বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যাকরণ ও তার নিয়মকানুনগুলো এমন নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে, তিনি যখন কোনও কিছু লিখতেন, তাতে একটা বানানও ভুল থাকত না। উলটোপালটা জায়গায় বসত না দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনও। শুধু তাই-ই নয়, মাত্র চার বছর বয়সেই দু’-তিনটে ভাষায় বেশ গড়গড় করেই অনর্গল কথা বলতে পারতেন তিনি। লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলের গণ্ডিও টপকে গিয়েছিলেন খুব সহজে। তখন এরকম নিয়ম ছিল। যদি শিক্ষকেরা বুঝতেন, যে ক্লাসে ছাত্র পড়ছে সে তার থেকে দু’ক্লাস উপরে পড়ার উপযোগী, তাহলে তাকে আর পরের দুটো ক্লাস পড়তে হত না। সরাসরি ওই ক্লাসে গিয়ে পড়তে পারত। সিডিস-এর ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। পরপর বেশ কয়েকবার। ফলে অর্ধেকেরও কম সময়ে স্কুলের পাট চুকিয়ে উনি ভর্তি হয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানেও অদ্ভুত কাণ্ড ঘটালেন তিনি। কোর্সটা ছিল চার বছরের। কিন্তু সেই কোর্স মাত্র ছ’মাসেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শেষ করে ফেললেন। ভর্তি হলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং প্রতিবারের মতো এবারেও অকল্পনীয়ভাবে সবার থেকে বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন তিনি। এত নম্বর পেলেন যে, আর কোনও পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা দিতে হল না তাঁকে। দরখাস্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই শুধুমাত্র মার্কসিটের ওই নম্বরের ভিত্তিতেই ওই বছরই ওখানকার সবচেয়ে বড়ো কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক হয়ে গেলেন তিনি। বয়স তখন সবেমাত্র কুড়ি বছর। তার আগে এবং তার পরেও এত কম বয়সে আর কেউ ওই কলেজে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হননি। উনি যখন ক্লাসে পড়াতে ঢুকতেন, বোঝাই যেত না তিনি ছাত্র না অধ্যাপক। কিন্তু তরতর করে এভাবে এগোলেও অধ্যাপক-জীবন শুরু করার মাত্র একবছর পর, যখন তাঁর বয়স সবেমাত্র একুশ, তখন থেকেই তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে শুরু করল। বহু ডাক্তার-কবিরাজকে দেখানো হল। নানান টোটকা প্রয়োগ করা হল। কিন্তু না। কিছুতেই কিছু হল না। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা-অভিজ্ঞতা বেমালুম ভুলে গেলেন। তিনি যে কোনওদিন লেখাপড়া করেছেন বা স্কুল-কলেজে গেছেন, সেটাও একদম ভুলে গেলেন। হাজার চেষ্টা করেও তাঁকে আর পুরনো দিনের কথা মনে করানো গেল না। আর তার র? সে তো আরও দুর্বিষহ, আরও করুণ কাহিনি। সব ছেড়েছুড়ে সিডিস চলে যান নিউ ইয়র্কে। শুধুমাত্র দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জন্য কোনওরকমে জোগাড় করে নেন একটা মেকানিকের কাজ। অধ্যাপক থেকে অতি সামান্য এক মেকানিক। দিন আনা দিন খাওয়া। এরপরেও তিনি বহুবছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্মৃতি আর ফিরে আসেনি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একজন সাধারণ, অতি সাধারণ মিস্ত্রি হিসেবেই জীবন কাটিয়ে ছিলেন।
“তাই বলছি, যেটা যে বয়সে শেখা উচিত, সেটা সেই বয়সেই শেখো। তাতে তোমারও মঙ্গল। আমাদেরও মঙ্গল। পরিবারের পক্ষে তো বটেই।”
অঙ্কের মাস্টার এটা বললেন ঠিকই, কিন্তু যার চোখের সামনে এসব সাত-পাঁচ সাংকেতিক চিহ্ন ভেসে বেড়ায়, সে কী করবে! শুধু দেখেই যাবে? ধরার চেষ্টা করবে না? কাউকে বলবেও না!
না। তিনি ঠিকই করে নিয়েছিলেন, তিনি কী দেখছেন তা আর কাউকে বলবেন না। তাঁর বন্ধুরা যখন অন্য বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন, ব্যাডমিন্টন খেলতেন, দাবা খেলতেন, তিনি তখন অন্য কারও সঙ্গে নয়, ওসব চিহ্নের সঙ্গেই কেবল খো খো খেলতেন। হাডুডু খেলতেন। কখনও কোনও চিহ্নকে জাপটে ধরতেন। কখনও কোনও চিহ্নকে নিয়ে লোফালুফি খেলতেন। আবার কখনও-সখনও ওসব চিহ্নরা তাঁকে ছেঁকে ধরত। তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে তাঁর শরীরের মধ্যেই মিলিয়ে যেত। আর যত চিহ্ন তাঁর শরীরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেত, ততই তাঁর মাথার মধ্যে কে যেন ঘণ্টা বাজাত—ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং…
এসব বহুদিন আগের কথা। তারপর যখন স্কুল-শিক্ষকের চাকরি পেলেন, তখন স্কুলেরই এক অঙ্ক শিক্ষকের কাছে জানতে পারলেন, ছোটোবেলা থেকে তাঁকে যে চিহ্নগুলি তাড়া করে বেড়াচ্ছে সেগুলি আসলে কোনও আঁকিবুঁকি নয়, বড়ো বড়ো জটিল অঙ্কের খুব সহজ সমাধানের একেকটা সাংকেতিক চিহ্ন। সেই চিহ্নগুলি সম্পর্কে সড়গড় হতেই তাঁর বাড়ি থেকে যখন তাঁকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া শুরু হল, তিনি প্রথমেই বললেন, “আমি বিয়ে করতে রাজি আছি। তবে একটা শর্ত আছে। আর তা হল, তাঁকে দেখতে শুনতে যেমনই হোক না কেন, সে যেন অঙ্ক জানে। অঙ্ক বোঝে এবং অঙ্ককে ভালোবাসে।”
হ্যাঁ, সেরকমই একটা মেয়ে পাওয়া গিয়েছিল যে অঙ্ক ছাড়া আর কিছু বোঝে না। অঙ্ক বলতে একেবারে পাগল। তিনি তাঁকেই বিয়ে করেছিলেন। যিনি ইচ্ছে করলে শুধু কলেজেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হতে পারতেন। তার জন্য যা যা লাগে, তাঁর সবই ছিল। কিন্তু কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গেলে যে সময় দিতে হয়, যে ঝক্কি সামলাতে হয়, তিনি সেসব থেকে শত হাত দূরে সরে থাকতে চেয়েছেন। তিনি কেবল চেয়েছেন অঙ্ককে আরও বেশি করে সময় দিতে। অঙ্কের মধ্যে ডুবে থাকতে।
ফলে তাঁর সঙ্গে শেষপর্যন্ত তিনি যখন গাঁটছড়া বাঁধলেন, তখন এক এক করে সবক’টা চিহ্নের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় হয়ে গেল। উনি এখন মোটামুটি অঙ্কের প্রায় সবগুলি চিহ্নকেই চেনেন। কিন্তু গত ক’দিন ধরে যে চিহ্নগুলি তাঁর সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে, সেগুলি যে কীসের সাংকেতিক চিহ্ন, উনি সেটাই বুঝতে পারছেন না।
না। এগুলো বোধহয় অঙ্কের নয়। তবে কি বিজ্ঞানের কোনও সাংকেতিক সূত্র! হলেও হতে পারে। নাকি অন্য কোনও কিছুর? তাই যদি হয়, তাহলে কীসের?
লোকে তাঁকে বিজ্ঞানী বলে। দেশবিদেশের বড়ো বড়ো নানা সেমিনারে তাঁকে বক্তব্য রাখার জন্য উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর তিনি কিনা বুঝতে পারছে না এটা কীসের চিহ্ন! কেন? কেন? কেন? 
মনের মধ্যে যখন এই প্রশ্নটা বারবার উঁকি মেরে তাঁকে অস্থির করে তুলেছে, ঠিক তখনই আবার তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই চিহ্নগুলি। আর সেটা দেখেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই ‘কেন’র খোঁজেই ওই চিহ্নগুলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তাকিয়েই রইলেন। এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরালেন না। শুধু খুঁজতে লাগলেন এই চিহ্নগুলির সঙ্গে কোন চিহ্নের সামঞ্জস্য আছে। কোন চিহ্নের?


আট


সবাই তাজ্জব। এটা কী করে সম্ভব! তিনমাস আগে বুক করতে গিয়েও যে ডাক্তারদের ডেট পাওয়া যায় না, সেই ডাক্তারদের চেম্বারও বেশ কিছুদিন ধরে একেবারে খা খা করছে। সাধারণ হাসপাতাল তো বটেই, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালও একদম শুনশান। যারা কাজের চেয়ে নামে কাটে বেশি, শুধুমাত্র সেসব পাঁচ তারা হোটেলের মতো তাবড় তাবড় বেসরকারি নার্সিংহোমগুলিতেও হাতে গোনা মাত্র গুটিকতক লোক। তাও যাঁরা আসছেন, তাঁদের কেউই চিকিৎসার জন্য আসছেন না। আসছেন রুটিন চেক-আপ করাতে কিংবা অসুখ নিয়ে যাঁরা বিলাসিতা করেন, তাঁরা।
তবু তাঁদের যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করার পরেও রোগ তো নয়ই, রোগের সামান্যতম লক্ষ্মণও দেখা যাচ্ছে না। খরিদদার নেই দেখে ক’দিন যাবত বন্ধ হয়ে পড়ে আছে রাজ্যের প্রায় সমস্ত ওষুধের দোকান।
মুখ ব্যাজার করে ঘরে বসে রিমোটের বোতাম টিপে টিপে একের পর এক খবরের চ্যানেল দেখে যাচ্ছেন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা, তাঁদের কোনও খবর আছে কি না জানার জন্য।
প্যাথোলজিগুলি ফিফটি পার্সেন্ট, সিক্সটি পার্সেন্ট, কোথাও কোথাও সেভেন্টি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিয়েও কোনও রোগী পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে লাগুক না লাগুক চিকিৎসকরা যাতে নানা টেস্টের জন্য তাঁদের কাছেই রোগীদের রেফার করেন, সেজন্য নানারকম উপঢৌকন এবং চোখ ধাঁধানো ভেট পাঠাচ্ছেন প্যাথোলজির কর্ণধারেরা। তবুও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। যেন কোনও এক মন্ত্রবলে এই রাজ্য থেকে উবে গেছে যাবতীয় অসুখ-বিসুখ।
এই অবস্থা দেখে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাড়াতাড়ি সেজেগুজে টিভি চ্যানেলগুলির সামনে হাসি হাসি মুখে গদগদ হয়ে বলেছেন, “আমি যদিও ওদের মতবাদকে বিশ্বাস করি না, তবুও মাও সে তুংয়ের মতো আমিও একদিন মনে মনে বলতাম, আমাদের দেশের ডাক্তাররা যেদিন খেতে পাবে না, সেদিন জানব, আমাদের দেশের লোকেরা সুস্থ আছে। সেটা যে এত তাড়াতাড়ি ফলে যাবে আমি ভাবতেই পারিনি। তবে হ্যাঁ, সেজন্য ধন্যবাদ দিতেই হবে পুরসভাকে। কারণ, ওরা যেভাবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ডেঙ্গির মোকাবিলা করছে, তাতে আমি অভিভূত। ওরা যে সম্প্রতি পরিশুদ্ধ জল সরবরাহ করছে, তার জন্যও রোগভোগ অনেকটাই কমে গেছে। আর ওরা যেভাবে চারদিকে গাছপালা লাগিয়েছে, সন্তান স্নেহে লালনপালন করেছে, গভীর রাতে রাজ্যের লোক যখন ঘুমিয়ে কাদা, তখন পুরসভার লোকেরা রাতের পর রাত জেগে চারাগাছগুলোতে জল দিয়ে তাদের মহীরুহ করে তুলেছে। সেজন্য তাঁদেরকেও আমি ধন্যবাদ জানাই। আর তার থেকেও বড়ো কথা, তাদের তদারকিতে রাস্তাঘাট এখন একেবারে ঝকঝকে তকতকে। কোথাও এতটুকু ময়লা জমতে পারে না। ফলে জলবাহিত রোগও প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। পাশাপাশি আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে পথেঘাটে কাটা ফল বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। ফুচকাওয়ালারা পর্যন্ত কলের জলের বদলে এখন যে মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করছেন, হাতে মেডিকেটেড গ্লাভস পরে ক্রেতাদের ফুচকা দিচ্ছেন, সেজন্য তাঁদেরও আমি সাধুবাদ জানাই। তবে হ্যাঁ, আমি এটাও আপনাদের আশ্বস্ত করছি, চিকিৎসা জগতের এই মন্দা পরিস্থিতি আর বেশিদিন চলবে না। আমরা চলতে দেব না। তবুও যতদিন না সবকিছু আগের মতো হচ্ছে, আবার রোগ থাবা বসাচ্ছে লোকজনের উপরে, অন্তত ততদিন চিকিৎসার সঙ্গে সামান্যতম হলেও যাঁরা এতদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, এটাই ছিল যাঁদের একমাত্র রুটিরুজি, এই মুহূর্তে একটু বিপাকে পড়েছেন, তাঁদের আগাম জানিয়ে রাখছি, সত্যিই যদি এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলে, তবুও আপনাদের ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমরা আপনাদের ক্ষতিপূরণ দেব। ভর্তুকি দেব। আপনাদের গোটা পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে আমাদের রাজ্য সরকার। দরকার হলে আপনাদের ছেলেমেয়েরা যে যেখানে পড়াশোনা করছে, তা ফ্রি করে দেওয়া হবে। পরিবার পিছু বিশেষ দৈনিক রেশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। বাসে-ট্রেনে যাতায়াতের জন্য ফ্রি পাস দেওয়া হবে। বছরে অন্তত দু’বার জামাকাপড়় বিলি করা হবে। আরও কী কী করা যায়, তা আমরা রাজ্যসভায় মন্ত্রীদের নিয়ে আলোচনা করে স্থির করব।”
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা শুনে আই.এস, আই.পি.এস, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক থেকে শুরু করে নানা পেশার তাবড় তাবড়় সফল ব্যক্তিরা পর্যন্ত আফসোস করছেন, কেন যে ডাক্তারিটা পড়়লাম না! তাহলে সবকিছুই ফ্রিতে হয়ে যেত। তাঁদের দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস।
সারা রাজ্যে এখন এই একটাই খবর। শুধু খবরের কাগজ বা নিউজ চ্যানেলেই নয়, বাসে-ট্রামে, রাস্তাঘাটে, বাজার-হাটে, অফিস-কাছারিতে, চায়ের দোকানে লোকের মুখে মুখে এখন শুধু এই একটাই আলোচনা।
ঔপমানবের কাছে যাঁরা আসছেন, তাঁরাও এই একই বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। সবার একটাই প্রশ্ন, কী এমন হল যে, একদিনের মধ্যেই এরকম অভাবনীয় একটা ঘটনা ঘটে গেল!
যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানতেন, কিছুদিন আগে এদেশের সবক’টা রাজ্যে দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, কোন রাজ্যে দূষণের পরিমাণ কতটা ভয়াবহ, তা পরীক্ষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি-সহ ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছিল বেশ কয়েকজন দক্ষ পরিবেশবিদকে। তাঁদের দলের একজন নাকি ভুল করে একদিন ওদেশ থেকে আনা মাস্ক আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে এখানকার এক দোকান থেকে স্থানীয় একটা মাস্ক কিনে আর পাঁচজন কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডালহৌসির মোড়ে। কিন্তু তারপরেই বিপত্তি। আধঘণ্টা থাকার পরেই গাড়ির কালো ধোঁয়ায় তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, তড়িঘড়ি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হল। পরে দেশ ছাড়ার আগে তাঁরা লিখিত জানিয়ে গেলেন, কলকাতা শহরের মতো এমন দূষিত, বিপজ্জনক শহর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
কিন্তু মাত্র ক’মাসের মধ্যেই এমন কী ঘটল যে, শুধু মাত্রাতিরিক্ত দূষণই নয়, দূষণের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত রোগও এ রাজ্য থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে একেবারে ভোঁ ভা হয়ে গেল! এটা জানার পরে শুধু ওই দেশের ওই পরিবেশবিদরাই নন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পরিবেশবিদরাও রাতারাতি ছুটে এলেন। তাঁদের বিশ্বাস, এখানে নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে, যার জন্য এটা হয়েছে। কিন্তু সেটা যে কী, কেউই তা আন্দাজ করতে পারলেন না।
কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলেন, এখানে হয়তো এমন কোনও বিচিত্র গাছ জন্মাতে শুরু করেছে, যারা সমস্ত রোগভোগ শুষে নিয়ে গোটা রাজ্যটাকেই রোগহীন জোন করে দিয়েছে। সেকথা শুনে কেউ কেউ আবার বললেন, তাই যদি হয়, তাহলে সেই গাছটাকে চিহ্নিত করতে হবে। অন্যান্য দেশে নিয়ে গিয়ে দেখতে হবে, ওসব দেশের জল, বায়ু, মাটি আর আবহাওয়াতেও ওই গাছ টিকে থাকতে পারে কি না এবং এই একইরকমভাবে কাজ করে কি না। যদি করে তাহলে আর চিন্তা নেই। একেবারে কেল্লাফতে। এই গাছের পেটেন্ট পেয়ে যাবে এই দেশ। আর সেই সুবাদে এই রাজ্য তথা দেশ মাত্র একবছরে যে অর্থ উপার্জন করবে, আমার ধারণা, সারাজীবন পেট্রল বিক্রি করে গোটা আরব দুনিয়াও তা আয় করতে পারবে না।
কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বললেন, বড়ো বড়ো হাইরাইজ বিল্ডিং তোলার জন্য এ রাজ্যে যেভাবে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে, বলা যায় না, হয়তো এমন কোনও জায়গায় ঘা পড়েছে, সেখান থেকে হু হু করে বেরিয়ে এসেছে এতদিন বদ্ধ হয়ে থাকা এমন এক অজানা গ্যাস, যার সন্ধান আমরা এখনও পাইনি। গন্ধ এবং রংহীন দেখে যাঁরা খোঁড়াখুঁড়ি করছিলেন, তাঁরাও টের পাননি। সেই গ্যাসের সঙ্গে বাতাসের বিক্রিয়া ঘটার ফলেই হয়তো এমন এক ‘অ্যান্টি অল ডিজিজ’ গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে, যার দরুন এখানকার সমস্ত রোগ এবং রোগের যাবতীয় উৎস একেবারে গোড়া থেকে নির্মূল হয়ে গেছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সেরকম কোনও সূত্র তাঁরা খুঁজে পেলেন না।


সারা রাজ্য থেকে রোগ উধাও হয়ে গেছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ খুশি হলেও চিন্তিত বিদগ্ধজনেরা। আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগী যখন ভালো হতে শুরু করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিপর্যয় কিন্তু তখনই ঘটে। সেরকমই, এটা আবার খুব খারাপ কিছু ঘটার প্রাক মুহূর্তে ভালো কিছু করে লোককে খুশি করা নয় তো!
চিন্তিত অনেকেই। চিন্তিত ঔপমানবও। কিন্তু হাতেনাতে তেমন কোনও প্রমাণ না পেলে তিনি কিছু বলেন কী করে! তাই মুখই খুললেন না তিনি। যে যা বললেন চুপচাপ শুধু শুনে গেলেন। তারপর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ঢুকলেন। কিন্তু না। এক মুহূর্তও সেখানে থাকলেন না। সঙ্গে সঙ্গে ঝট করে বেরিয়ে এলেন। তারপর রুদ্ধশ্বাসে বড়ো বড়ো পা ফেলে সোজা ভিতর ঘরে চলে গেলেন।
জবালা তখন সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছেন। কাঁধের ব্যাগটা পর্যন্ত নামাননি। হন্তদন্ত হয়ে ঔপমানব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার ল্যাবরেটরিতে লাস্ট কে ঢুকেছিল?”
জবালা বললেন, “কই, কেউ আসেনি তো।”
“আসেনি বললে হবে?”
“সত্যিই কেউ আসেনি।”
“না এলে সামনের টেবিলে থাকা গোলাপি রঙের কেমিক্যাল ভরা জারের মধ্যে ও পাশের তাকের টেস্ট টিউবে রাখা সবুজ রঙের কেমিক্যালটা মেশাল কে?”
“কই, কাউকে তো ল্যাবরেটরিতে ঢুকতে দেখিনি।”
গলা চড়ালেন ঔপমানব, “দেখোনি! একটা লোক ল্যাবরেটরিতে ঢুকে একটা কেমিক্যালের সঙ্গে আরেকটা কেমিক্যাল মিশিয়ে চলে গেল, আর তুমি বলছ কিনা দেখোনি? কী, করো কী সারাদিন?”
“আমি তো স্কুলে গিয়েছিলাম।”
“অ।”
ঔপমানব একটু দমে গেছেন দেখে জবালা প্রশ্ন করলেন, “তুমি কোথায় ছিলে?”
“শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে আমি দুপুরবেলায় এ ঘরে এসে একটু চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিলাম। কখন যে চোখদুটো লেগে এসেছিল…”
“ও। অভি ছিল না?”
“ছিল তো।”
“ও কাউকে দেখেনি?”
“কে জানে।”
“তুমি তো শোনো না। তোমাকে কতদিন বলেছি, তুমি যখন ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে আসবে, দরজাটা ভালো করে আটকে আসবে। আমার কোনও কথা শোনো?”
“ধ্যার বাবা, আমি মরছি আমার জ্বালায়…”
ঔপমানবের কথা বলার ধরন দেখে জবালা একটু অবাক হলেন। কারণ, জবালা কেন, উনি কারও সঙ্গেই সচরাচর এভাবে কথা বলেন না। এভাবে বলছেন মানে ব্যাপারটা নির্ঘাত গুরুতর। তাই জবালা জানতে চাইলেন, “কেন? কী হয়েছে?”
“যে ঢুকেছিল, তাকে আমার ভীষণ দরকার।”
“কেন?”
ঔপমানব বললেন, “আমি তার কাছে জানতে চাই, গোলাপি রঙের কেমিক্যাল ভরা জারটার মধ্যে সে ক’ফোঁটা সবুজ রঙের কেমিক্যাল মিশিয়েছিল।”
“কেন? তোমার কাছে হিসেব নেই?”
“আমি মিশিয়েছি নাকি?”
গলার স্বর খাদে নামিয়ে জবালা বললেন, “তুমি মেশাওনি আমি জানি। আমি তা বলছি না। বলছি, তুমি কোথায় কতটা কোন কেমিক্যাল রাখো, সেটা তো তোমার হিসেব থাকে।”
“থাকে তো।”
“তাহলে?”
ঔপমানব বললেন, “গোলাপি কেমিক্যালটার হিসেব আমার কাছে আছে।”
“সবুজটার নেই?”
“থাকবে না কেন? সেটাও নোট করা আছে।”
তাহলে তো হিসেব মিলেই গেল। এটা ভেবে জবালা বললেন, “তবে?”
“আরে বাবা, যে ওটা মিশিয়েছে, আমার মনে হয় জারের মধ্যে সবুজ কেমিক্যালটা মিশিয়ে টেবিলের উপরে তাড়াতাড়ি রাখতে গিয়ে অসাবধানতাবশত টেস্ট টিউবটা এমনভাবে রেখেছে যে, ওটা কাত হয়ে পড়ে গেছে। সেটা বোধহয় ও আর খেয়াল করেনি। ফলে টেস্ট টিউবে থাকা বাকি কেমিক্যালটা পড়ে গেছে। যেটা পড়েছে, টেবিলের কাঠ সেটার বেশ কিছুটা শুষে নিয়েছে। কিছুটা আবার টেবিল থেকে গড়িয়ে নিচে মেঝের উপরে পড়ে শুকিয়ে গেছে। ফলে সেদুটো দেখে চুলচেরা হিসেব কষে, যা ছিল তার থেকে সেটা বাদ দিয়ে যে মিশিয়েছে, সে ক’ফোঁটা মিশিয়েছে, সেটা একেবারে অ্যাকিউরেট বার করা সত্যিই সময়সাপেক্ষ। শুধু সময়সাপেক্ষই নয়, খুব মুশকিলও।”
“কেন? কী হয়েছে?”
খুব ধীর-স্থির ভঙ্গিতে আশেপাশে কেউ নেই জেনেও, এদিকে ওদিকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে খুব নিচু গলায় ঔপমানব বললেন, “আমার মনে হয়, ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটের ফলেই এটা হয়েছে।”
উৎসুক হয়ে জবালা জিজ্ঞেস করলেন, “কোনটা?”
ঔপমানব বললেন, “যেটা নিয়ে গোটা দেশ উত্তাল, সেটা।”
“সেটা কী?”
“সত্যিই, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। অঙ্ক ছাড়া আর কিচ্ছু তোমার মাথায় ঢোকে না, না? এ ক’দিন ধরে কী, শুনছ কী?”
“কী?”
বিরক্তি মেশানো গলায় ঔপমানব বললেন, “শোনোনি, এই রাজ্য থেকে সমস্ত রোগ উধাও হয়ে গেছে!”
“হ্যাঁ, শুনেছি তো।”
“তাহলে?”
“তাহলে মানে? তোমার কি মনে হয় সেটা ওই দুটো কেমিক্যাল মেশানোর জন্য হয়েছে?”
“মনে হয় নয়, আমার দৃঢ়় বিশ্বাস, ওই জন্যই হয়েছে।”
পাশের ঘর থেকে এ-ঘরে আসতে গিয়ে বাবার কথা শুনে চৌকাঠের ওপারেই থমকে দাঁড়াল অভিমন্যু।


নয়


ফোনের ঠেলায় একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে উঠেছেন জবালা। না, মোবাইলে নয়। যত দরকারই থাক, রাত দশটা বাজলেই তিনি নিজেরটা তো বটেই, স্বামীর মোবাইলটাও অফ করে দেন। ওঁরা মনে করেন, ওঁরা অতটা ভি.আই.পি নন যে রাতদুপুরেও ওঁদেরকে কেউ ফোন করবে। তাছাড়া ফোন খোলা রাখলে ফোন আসবেই। আর ওঁরা ফোন খোলা রাখছেন, এটা চেনাজানাদের মধ্যে একবার জানাজানি হয়ে গেলে নিস্তার নেই। ফোন আসতেই থাকবে।
ফোন কেনার পর প্রথম প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা খোলা রেখে দেখেছেন, যত না কাজের ফোন আসে, তার থেকে বেশি আসে ফালতু ফোন। ধরলেই খোশগল্প শুরু করে দেয়। আর তার প্রত্যুত্তরে কোনও কিছু বললে তো হয়েই গেল। সারারাত কাবার হয়ে যায়। উনি আরও দেখেছেন, ইদানীং গল্পের চেয়েও লোকে বেশি ফোন করে পরনিন্দা পরচর্চা করার জন্য।
আজকাল লোকেদের বুঝি ঘুমই আসে না। সারাক্ষণ টকাটক টকাটক কী যে এত মোবাইলের বোতাম টেপে কে জানে! নিজের ঘুম না এলেই যে অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে হবে, এটা কে বলেছে! যাকে ফোন করছে, ঘুম ছাড়া তারও তো অন্য কাজকর্ম থাকতে পারে। দিনেরবেলায় বেশিরভাগ লোকই কাজে ব্যস্ত থাকে। নিজের মতো কাটানোর জন্য হাতে থাকে শুধু রাতটুকু। সে সময় পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে তারও তো কথা বলতে ইচ্ছে করতে পারে। সারাক্ষণ যদি ফোনই ধরতে হয়, তাহলে অন্য কাজটা করবে কখন শুনি?
জবালার মাঝে মাঝেই মনে হয়, এই প্রজন্মটাকে ‘কোথায়’ প্রজন্ম বলা উচিত। কারণ, এরা বন্ধুবান্ধবদের ফোন করেই হ্যালো-ট্যালো নয়, প্রথমেই যেটা জিজ্ঞেস করে সেটা হল—কোথায়? যেন কারওরই বাড়ি থাকার কথা নয়। আর যাকে ফোন করছে, সে যদি বা়ড়িতেও থাকে, কেন বলছে সে হয়তো নিজেও জানে না, তবুও বলে ওঠে—একটু বাইরে আছি রে। বাইরে মানে পাড়ার রকে নয়। রক কালচার তো অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। এমনকি চায়ের দোকানের আড্ডাও উঠব উঠব করছে। বাইরে মানে সে যদি গড়িয়ায় থাকে তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনফিডেন্সের সঙ্গে সে অনায়াসে বলে দেয়—এই তো দমদমে।
কিছুদিন আগে জবালা তাঁর এক পুরনো বান্ধবীর কাছে গিয়েছিলেন। সেই বান্ধবীটি কাজ করেন শিক্ষা দফতরে। গুরুত্বপূর্ণ পদে। ওঁর কাছেই নাকি আটকে আছে তাঁদের স্কুলের একটি ফাইল। প্রধান শিক্ষক তাঁদের সম্পর্কটা জানেন। তাই জবালাকেই দায়িত্ব দিয়েছেন কাজটা দ্রুত করিয়ে আনার জন্য। উনি আরও বলেছেন, “দরকার হলে একটু বসবেন। না হয় কাল একটু দেরি করেই স্কুলে আসবেন।”
সেজন্যই জবালা গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, দু’মিনিটেরও তো কাজ নয়, যাবেন আর আসবেন। কিন্তু গিয়ে দেখলেন উনি ফোনে ব্যস্ত। ওঁকে দেখে যেন আরও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। কথাবার্তা শুনে জবালা বুঝতে পারলেন, অফিসিয়াল তো নয়ই, এমনকি কোনও জরুরি কথাও নয়। পিসির খুড়তুতো বোনের মেয়ে কেমন আছে? তাঁর শালার ঠাকুমার শরীর কেমন? এবার পুজোয় কোথায় বেড়াতে যাচ্ছিস? এধরনের সব খেজুরে কথাবার্তা।
শুধু সেই ফোনটাই নয়। ওই ফোনটা রাখতে না রাখতেই আবার ফোন। আর যে ফোনই আসছে, কোনওটাই আধঘণ্টার আগে শেষ হচ্ছে না। অথচ ওঁর হাতে সময় নেই। ‘না হয় কাল একটু দেরি করেই স্কুলে আসবেন’ প্রধান শিক্ষক বলেছেন দেখেই কি দিন কাবার করে স্কুলে যাওয়া যায়! উনি তো ভাবতেই পারেন, কাজ মিটে যাওয়ার পরে আমি অন্য কোথাও গিয়েছিলাম। তাই বারবারই উসখুস করছিলেন জবালা। আর যতবারই উসখুস করছিলেন, ততবারই ওই বান্ধবী হাত দেখিয়ে ওঁকে ইশারা করছিলেন, আর একটু, আর একটু…
জবালা বুঝতে পারলেন, ও তাঁর কাছে ব্যস্ততার ভান করছে। অগত্যা আর উসখুস নয়, উনি রেডি হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন ফোন শেষ হয়। যেই শেষ হল, অমনি আর কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গেই উনি রিং করলেন ওই বান্ধবীকে। নম্বর দেখে ওই বান্ধবী একেবারে হতবাক। উনি বুঝতে পারলেন না সামনে বসে তাঁর বন্ধু কেন তাঁকে ফোন করছে! তাই ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হল? তুই ফোন করছিস?”
জবালা তার উত্তর না দিয়েই বললেন, “ধর।”
পাশে বসেও মুখোমুখি নয়, সেদিন দু’জনে কথা বলেছিলেন ফোনে। কথা বলা শেষ হওয়ার পরে ওই বান্ধবী ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এসেইছিস যখন এই কথাগুলি তো সামনাসামনিই বলতে পারতিস। ফোন করলি কেন?”
জবালা বলেছিলেন, “আমি ফোন না করলে অন্য কেউ তোকে ফোন করত। আর তুই তখন তার সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে যেতিস। ফলে আমাকে এখনও বসে থাকতে হত। তাই ফোন করলাম।”
বাসে-ট্রামে, এমনকি এমনিও নেমন্তন্ন বাড়িতে উনি লক্ষ করে দেখেছেন, সবাই সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও কেউই কারও সঙ্গে কথা বলছে না। সবাই কথা বলছে ফোনে। অন্য কারও সঙ্গে। বারেবারেই তাঁর মনে হত, আরে বাবা, যার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিস, তার সঙ্গে তো পরেও কথা বলতে পারিস, নাকি? যাকে সামনে সরাসরি দেখছিস, তার সঙ্গে কথা বলবি না? কানে ফোন ধরে কথা বলতে বলতে চেনা দেখে সৌজন্যবশত শুধু একটু মেকি হেসে মাথা কাত করবি? ভান করবি, যেন জানতে চাইছিস, ভালো তো?
এই ব্যাপারটা বড়ো অদ্ভুত লাগে জবালার। আরও অদ্ভুত লাগে ল্যান্ড ফোন থাকলেও কেউই আজকাল সচরাচর সেখানে ফোন করে না। করে মোবাইলে। এক চান্সে পাবার জন্য। তাই রাত দশটা বাজলেই জবালা তাঁর মোবাইলের সুইচ অফ করে দেন। অফ করে দেন ঔপমানবের ফোনও।
ঔপমানবের অবশ্য ফোন নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। নিজের কাজ নিয়ে সারাক্ষণ এত ডুবে থাকেন যে, কানের পাশে একটানা ফোন বেজে গেলেও তিনি শুনতে পান না। শুনতে পেলেও ধরেন না। ফোন ধরায় তাঁর যেন অ্যালার্জি আছে। তবুও মোবাইলটা কিনেছিলেন। কিনেছিলেন কল ধরার জন্য নয়, শুধুমাত্র কল করার জন্য। আসলে তাঁদের ল্যান্ড ফোনটা ওদিককার ঘরে। অত দূরে গিয়ে ফোন করা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর। আর ল্যাবরেটরিতে প্যারালাল ফোন ঢোকানোয় তাঁর ছিল ঘোরতর আপত্তি। তাই খুব দরকার হলেও অনেক সময় তাঁর ফোন করা হত না। ফলে এই মোবাইল নেওয়া। তাই কাউকে ফোন করতে গেলে উনি দেখেন কখনও আটটা, কখনও সাঁইতিরিশটা, কখনও আবার তারও চেয়ে বেশি মিসড কল হয়ে আছে। মেসেজের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
কিন্তু না। তিনি কোনও মেসেজ তো পড়েনই না, কাউকে রিং-ব্যাকও করেন না। কারণ, উনি কারও নম্বরই সেভ করে রাখেন না। এমনকি জবালার নম্বরটাও সেভ করা নেই। উনি মনে করেন, ফোন ধরতে পারিনি তো কী হয়েছে, দরকার তো আমার নয়। যাঁর দরকার হবে, প্রয়োজন হলে তিনি আবার করবেন। যদি একশো বারও না ধরি উনি একশো একবার করবেন।
দরকার ছাড়া এমনিতে খুব একটা কথা হয় না স্বামী-স্ত্রীতে। কিন্তু এই ফোন করা নিয়ে ঔপমানবের সঙ্গে জবালার একদিন কথাও হয়েছিল। কারণ, তাঁর ছেলেও নাকি একদম বাবার মতো। হুবহু জেরক্স কপি। মুখের সামনে এগিয়ে না দিলে কিচ্ছু খায় না। তাই ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে যাতে ফ্রিজ থেকে বার করে পুডিংটা খেয়ে নেওয়ার কথা ছেলেকে মনে করে তিনি বলে দেন, সেটা ঔপমানবকে জানানোর জন্য বারবার ল্যান্ড ফোনে ফোন করেছিলেন জবালা। কিন্তু অত বার ফোন করেও উনি যখন ঔপমানবকে পেলেন না, তখন তাঁর মোবাইলে ফোন করেছিলেন। একবার নয়, দু’বার নয়, আট-ন’বার। কিন্তু উনি ফোন ধরলে তো।
ফোনের আওয়াজ তিনি নাই শুনতে পারেন, কিন্তু ফোন করতে গেলেই তো দেখতে পাওয়ার কথা, কে ফোন করেছিল। আর সারাদিনে উনি কাউকে ফোন করেননি, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
জবালা অভিমান করে বলেছিলেন, “রাস্তাঘাটে আমার যদি কোনও বিপদ-আপদ ঘটে কিংবা ছেলেরই যদি কিছু হয়, আমি যদি তোমাকে সেটা জানানোর জন্য বারবার ফোন করি, তুমি তো সেটাও ধরবে না!”
“আরে বাবা, আমি খেয়াল করিনি।”
“কিছুই খেয়াল করবে না! আমি মরে পড়ে থাকলেও খেয়াল করবে না, আমি মরে গেছি না বেঁচে আছি?”
“বাজে কথা বোলো না।”
“ও, আমি যা বলি সবই বাজে কথা, না? আর তুমি যা বলো সবই কাজের কথা?”
“কী বললে? কাজের কথা? বাহ্‌, এই ‘কাজের কথা’ শব্দ দুটো বলে তুমি একটা ভালো কথা মনে করিয়ে দিলে।”
“কী?”
“বলছি।”
“বলছি না, আগে বলো কী বলতে যাচ্ছিলে। এক্ষুনি আবার ভুলে যাবে।”
“না না, মনে আছে।”
“কী?”
“আরে, খানিকক্ষণ আগেই ভাবছিলাম, আমাকে বলব এক কাপ চা দেওয়ার কথা। ভুলেই গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস মনে করালে, এক কাপ চা দিও তো।” 
“উফ্, এটা তোমার কাজের কথা? সত্যিই, তোমাকে নিয়ে না…”
সেদিন চা খেতে খেতে জবালাকে কথা দিয়েছিলেন ঔপমানব। “ঠিক আছে, এবার থেকে মনে করে মাঝে মাঝেই মোবাইলটা চেক করে দেখে নেব তুমি ফোন করেছ কি না। হয়েছে?”
জবালা বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করে দেখেছেন, উনি কথা দিলেও কথা রাখেননি। কারণ তারপর পরপর দু’দিন ওঁর মোবাইলে উনি ফোন করেছিলেন। কিন্তু না। কোনও সা়ড়া পাননি। রিং-ব্যাকও করেননি উনি। তাই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন স্কুল থেকে ফিরে স্বামীর মোবাইল নিজেই চেক করে দেখে নেন, কোনও ইম্পর্ট্যান্ট কল বা মেসেজ এসেছে কি না। রাতে শোওয়ার আগে নিজেরটা তো বটেই, স্বামীর মেলটাও খুলে দেখে নেন কোনও গুরুত্বপূর্ণ মেল এসেছে কি না।
না। সকাল দশটার আগে জবালা কখনও মোবাইল খোলেন না। ঔপমানবেরটাও না। কিন্তু মোবাইলের যন্ত্রণা আজ বুঝি সবটাই আছড়ে পড়়েছে তাঁদের ল্যান্ড ফোনে। একের পর এক ফোন। প্রথমেই ফোন করেছিল বন্দনা। খুশিতে ডগমগ হয়ে সে বলল, “একটা শুভ খবর আছে। সেটা জানানোর জন্যই ফোন করলাম।”
জবালা জিজ্ঞেস করলেন, “কী?”
সে বলল, “আমার ছেলে এবার জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ফার্স্ট হয়েছে।”
“ফার্স্ট? সে কী রে, এ তো দারুণ খবর! শুধু মুখে তো হবে না। মিষ্টি কোথায়?”
সেই ফোন রাখতে না রাখতেই তৃণার ফোন। বিশ্বজয়ের আত্মতৃপ্তি তাঁর স্বরে। তিনি বললেন, “শুনেছিস?”
“কী?”
“আমার মেয়ে জয়েন্টে প্রথম হয়েছে।”
জবালা অবাক। বাবা, এ তো রেয়ার ঘটনা। হ্যাঁ, জয়েন্টে যৌথভাবে দু’জন ফার্স্ট হতেই পারে। কিন্তু সেই দু’জনই যে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধুর ছেলেমেয়ে এবং সেই দু’টি ছেলেমেয়েকেও যে তিনি চেনেন, এটা সত্যিই খুব কাকতালীয়।
তৃতীয় যে ফোনটা এল, সেটা ধরতেই জবালার ভ্রূ কুঁচকে গেল। এটা আবার হয় নাকি? তিনি ঠিক শুনছেন তো! লেখনীর ওই হাবাগোবা, প্রতিবছর ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়ে টেনেটুনে কোনওরকমে ক্লাসে ওঠা ছেলেটাও জয়েন্টে প্রথম হয়েছে! তিনি ঠিক শুনছেন তো!
তিনি যে ঠিক শুনছেন, সেটা তার পরের, তার পরের এবং তারও পরের ফোনটা পেয়েই নিশ্চিত হয়ে গেলেন জবালা। কারণ, যে ক’টা ফোন পেলেন তাঁরা প্রত্যেকেই জানালেন, তাঁদের ছেলে বা মেয়ে এবার জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ফার্স্ট হয়েছে।
তবুও হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনফার্ম হওয়ার জন্য যিনি কখনও সকালে টিভি খোলেন না, সেই জবালাই খবর-চ্যানেল খুলে বসলেন এবং শুনলেন—অভূতপূর্ব ঘটনা। এবার জয়েন্ট এন্ট্রান্সে যে বারো লক্ষ সাতাশি হাজার আটশো বাহান্ন জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই একই নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। কী করে এটা সম্ভব হল, এটা কী সত্যিই হয়েছে, না যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য এই ফলাফল, এটা জানার জন্য আমরা যোগাযোগ করেছিলাম…
না, আর দেখেননি তিনি। এরপর দেখতে গেলে তাঁর স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে। তাই টিভি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মনের ভিতর খচখচ করতেই লাগল, তাহলে কি তাঁর স্বামীর কথা অনুযায়ী সত্যিই ওই দুটো কেমিক্যাল বিভ্রাটের ফলেই এসব হচ্ছে! শুধু রোগ বা রোগের লক্ষ্মণই নয়, এ রাজ্য থেকে অশিক্ষাও দূর হয়ে গেছে! সবাই একই নম্বর পেয়েছে মানে তো সবাই সমান। তবে কি এ দেশে যথার্থ সমাজতন্ত্র গঠন হতে চলেছে! ভাবতে ভাবতেই স্কুলে যাবার জন্য রাস্তায় পা রাখলেন জবালা।


দশ


রোল কল করতে গিয়ে জবালা অবাক হয়ে গেলেন। এ কী!
টিচার্স রুম থেকে নাম ডাকার খাতা নেওয়ার সময় অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকার মতো তিনিও অবাক হয়েছিলেন। তাঁর জীবনে আজ পর্যন্ত যা হয়নি, তাই হয়েছে। সাধারণত সেশন শুরু হওয়ার সময় নাম ডাকার যে খাতাটা তৈরি হয়, কোনও কারণবশত ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে না গেলে সেটাই বছরভর চলে। কিন্তু গতকাল অবধি যে খাতাটা নিয়ে উনি রোল কল করেছেন, একেকটা সংখ্যা শুনে ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ‘উপস্থিত’, ‘ইয়েস ম্যাডাম’, কিংবা ‘প্রেজেন্ট প্লিজ’ বলে নিজেদের হাজিরা জানান দিয়েছে, সেই খাতাটা নিতে গিয়ে দেখেন, শুধু ওটাই নয়, খাতা রাখার জায়গায় সবক’টাই একেবারে ঝকঝকে নতুন খাতা।
তখনই শুনেছিলেন, কাল স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে শিক্ষা দফতর থেকে নাকি একটি জরুরি নির্দেশ এসেছিল। আর সেই নির্দেশ অনুসারেই, কেবল তাঁদের স্কুলেই নয়, গোটা রাজ্যের সমস্ত স্কুলে অফিস-ক্লার্কদের চমকে দেওয়া ওভার টাইম দিয়ে একরাতের মধ্যেই তৈরি করানো হয়েছে এই খাতা।
জবালা ভেবেছিলেন, রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীরা যেভাবে নতুন নতুন কর্মসূচি নিয়ে কাট মানি পাওয়ার জন্য কাউকে কাউকে সেই কর্মসূচির সরকারি বরাত পাইয়ে দেন, এটা হয়তো সেরকমই কোনও উদ্যোগ। না হলে, যখন বলা হচ্ছে সরকারি কোষাগার প্রায় শূন্য, মাসের পর মাস বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা চা-শ্রমিকেরা অনাহারে অবহেলায় সকালে সন্ধ্যায় মারা যাচ্ছে, সেই মৃত্যু-মিছিল দেখেও টাকার অভাবে সরকার যখন তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারছে না, তখন ভালো অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও কেন পুরনো রেলিং উপড়ে ফেলে নকশা-করা নতুন রেলিং দিয়ে পার্কগুলিকে ঘেরা হচ্ছে! টাকার জোগান নেই বলে যখন সরকারি হাসপাতালে মিলছে না সামান্য তুলো, ব্যান্ডেজ, ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, তখন সৌন্দর্যায়নের নামে কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে নদীর পাড় সাজানো হচ্ছে! ক্লাব-ঘরে বসে সন্ধ্যার সময় যে ক্লাবের ছেলেরা শুধু গুলতানি মারে আর তাস খেলে, হাতে রাখার জন্য খেলাধুলো করার নামে প্রতিবছর তাদের পকেটে কেন ভরে দেওয়া হচ্ছে দু’লাখ চার লাখ করে টাকা! আর সেই তালিকায় বছর বছর কেন যোগ করা হচ্ছে রাজনৈতিক দাদা-দিদিদের মদতে নিত্যনতুন গজিয়ে ওঠা একের পর এক ক্লাব!
সেটা বুঝতে পারি না। বুঝতে চাইও না। কিন্তু কথা হচ্ছে, যেখানে নতুন খাতা হয়েছে তিনমাসও হয়নি, বলতে গেলে প্রায় নতুনই রয়েছে, সেখানে ফালতু এতগুলো পয়সা খরচ করে এগুলো পালটানোর মানে কী! হোক গোটা রাজ্যের সমস্ত স্কুল। তাতে কত খাতা সরবরাহ করার বরাত দিতে পারবে ওরা! কত টাকা কাট মানি পাবে! সামান্য ক’টা টাকা পাওয়ার লোভে ওভার টাইম বাবদ যে কত টাকা সরকারি তহবিল থেকে বেরিয়ে যাবে, সেটা একবারও ভেবে দেখেছে! তাছাড়া যাঁরা ওভার টাইম করেছেন, তাঁরা তো সবাই আর তাঁদের দলের লোক নন। নাকি অন্য দলের লোককেও এভাবে টাকা পাইয়ে দিয়ে নিজেদের দিকে টানার অদম্য চেষ্টা!
কী জানি! এসব খেলা বুঝি না বাপু! নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন জবালা।
এতদিন নিতে নিতে খাতাটা এত পরিচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাঁকে আর খুঁজতে হত না। কিন্তু নতুন খাতাগুলির চেহারা এবং রং প্রায় একইরকমের হওয়ায় তাঁকে ধন্ধে পড়তে হল। সেলফে পর পর দাঁড় করিয়ে রাখা বাঁধানো লম্বা খাতাগুলির ভিতর থেকে একটা একটা করে টেনে বার করে মলাটের উপরে লেখা যে ক্লাস নিতে যাবেন, সেই ক্লাস আর সেকশন দেখে তারপর নাম ডাকার খাতাটা নিয়ে উনি ক্লাসে চলে এসেছিলেন।
কিন্তু এ কী! রোল কল করতে গিয়ে দেখলেন, রোল নম্বরের আগে ছাত্রছাত্রীদের নাম আছে ঠিকই, কিন্তু নামের পাশে কারও কোনও পদবি লেখা নেই। তাহলে কি তড়িঘড়ি করে করতে হয়েছে দেখে সময়ের অভাবে আপাতত শুধু নামটাই লিখেছে! পদবিগুলো পরে সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে লিখবে?
হতে পারে। কিন্তু... শুধু নাম লিখলে কী করে হবে! তার এই ক্লাসে যে একই নামের তিনজন ছাত্রী আছে। দেখি তো তাদের আলাদা করার জন্য কর্মকর্তারা কোন পন্থা নিয়েছেন।
জবালা সেটা দেখতে গিয়ে দেখলেন, প্রথম জনের নামের পাশে কিছু লেখা নেই ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয় জনের পাশে ব্র্যাকেট দিয়ে লেখা—‘অ’। আর তৃতীয় জনের পাশে ওই একইভাবে ব্র্যাকেট দিয়ে লেখা—‘আ’।
ও, তাহলে ‘অ’, ‘আ’, ‘ই’ করে পৃথক করা হয়েছে একই নামের ছাত্রছাত্রীদের! সব সেকশনেই কি এভাবে করা হয়েছে? দেখতে হবে তো।
ঘণ্টা পড়ার পর টিচার্স রুমে গিয়ে জবালা দেখলেন সব শিক্ষক-শিক্ষিকাই এই নিয়ে আলোচনা করছেন। কিন্তু সেই আলোচনায় তিনি যোগ দিলেন না। সোজা ওই সেলফের কাছে গিয়ে একটা একটা করে নাম ডাকার খাতা খুলতে লাগলেন আর দেখতে লাগলেন অন্যান্য ক্লাস বা সেকশনের একই নামের ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে আলাদা করা হয়েছে।
না। তাঁর এখন কোনও ক্লাস নেই। দ্বিতীয় পিরিয়ডটা অফ। তাই খুব ধীরেসুস্থে তিনি পাতা ওলটাতে লাগলেন। দেখলেন, না। সব জায়গায় এক নিয়ম মানা হয়নি। তার মানে শিক্ষা দফতর থেকে নামের এই পৃথকীকরণের কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি। তাই যে ক্লার্ক যেভাবে পেরেছেন, পদবির ভিন্নতা দেখে নিজের মতো করে একই নামের ছাত্রছাত্রীদের আলাদা করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ পৃথক করেছেন নামের পাশে ১, ২, ৩ সংখ্যা বসিয়ে। কেউ করেছেন ‘ছোটো’, ‘বড়ো’, মেজো’ লিখে। আবার কেউ করেছেন নামের পাশে সেই ছাত্র বা ছাত্রীর বাবা কিংবা মায়ের নাম লিখে।
এটা দেখে একেবারে চমকে উঠলেন জবালা। তাঁর মনে হল, তাহলে কি আমরা অতীতে ফিরে যাচ্ছি! আগে তো এরকমই ছিল। কারও কোনও পদবি-টদবি ছিল না। বেদ, পুরাণ, জাতক বা কথাসরিতের পাতা তন্নতন্ন করে খুঁজলেও সেখানে কারও কোনও পদবির টিকি দেখা যাবে না।
আসলে আগে ছেলেমেয়েদের নামকরণের সময় লোকে শুধু নামটাই রাখত। আর সেটা দু’অক্ষর, তিন অক্ষর, চার অক্ষর, পাঁচ অক্ষর, এমনকি কখনও-সখনও তারও বেশি সংখ্যক অক্ষর দিয়ে। বড়ো সংখ্যার নাম হলে উচ্চারণের সময় সেটা দুটো বা তিনটে শব্দের মতো শোনাত। কিন্তু অন্যদের থেকে আলাদা করার জন্য নিজের ছেলেমেয়েদের নাম আর কত বড়ো রাখা যায়! ফলে জনসংখ্যা যখন বাড়তে শুরু করল, তখন কে কবে কার নাম কী রেখেছে সেসব খোঁজখবর নিয়ে সেই নাম বাদ দিয়ে অন্যরকম নাম রাখার প্রচেষ্টা করা হলেও সবসময় তা সফল হত না। ক’দিন পরে আচমকা আবিষ্কার হত, আরে, এই নামটা অমুকের দিদির ছেলের না! কিংবা তমুকের দেওরের মেয়ের না! তখন এর হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁদের মতো তাঁদের ছেলেমেয়েদের যাতে কোনও অসুবিধেয় পড়তে না হয়, সেজন্য পরে কেউ কেউ অন্যদের থেকে আলাদা করার জন্য নিজেদের নামের পাশে তিনি কোন জায়গার লোক বা তাঁর জীবিকা কী অথবা তাঁর শিক্ষাদীক্ষা কতখানি কিংবা তিনি কার সন্তান— এসবের যেকোনও একটা উল্লেখ করতে লাগলেন। যেমন, যিনি ঘোশাল গ্রামে থাকতেন, তিনি তাঁর নামের পাশে লিখতে শুরু করলেন ‘ঘোষাল’। মুকটি গ্রামের লোকেরা তাঁদের নামের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন ‘মুখটি’। নামের পাশে কেউ কেউ লিখে দিতে লাগলেন তাঁর জীবিকা। ফলে নামের সঙ্গে জুড়ে যেতে লাগল উকিল, স্বর্ণকার, মালাকার, ঘটক, কবিরাজ-এর মতো সব শব্দ।
তখন যাঁরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতেন, তাঁদের বলা হত উপাধ্যায়। এটা ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পদ। ফলে তাঁরা নামের পাশে ‘উপাধ্যায়’ লেখা শুরু করলেন। আগের প্রজন্মে যাঁরা নামের সঙ্গে অন্য কিছু লিখতেন, তাঁদের পরিবারের কেউ উপাধ্যায় হওয়ার পরে তাঁরা অনেকেই তাঁরা যে ওই সম্মানিত ব্যক্তিরই উত্তরসূরি, তা জাহির করতে চাইলেন। অথচ এতদিন ধরে বহন করে আসা পদবিটাও হুট করে এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে দিতে পারতেন না। ফলে আগে ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে তাঁরা এই উপাধ্যায় যোগ করে নতুন একটি শব্দ তৈরি করে নিতে লাগলেন। মুখটিরা যেমন উপাধ্যায় যুক্ত করে মুখোপাধ্যায় হলেন, তেমনি চট্টগ্রামের চট্টোরা উপাধ্যায় যোগ করে হয়ে গেলেন চট্টোপাধ্যায়।
বিশেষ কোনও কাজের জন্য গ্রাম-সমাজে তখন নানারকম সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার প্রচলন ছিল। যেমন গুণাকর, রায়, সরকার, চৌধুরী, মণ্ডল। পরে দেখা গেল এগুলিও কেউ কেউ তাঁদের নামের পাশে বসাতে শুরু করেছেন। শুধু তাই-ই নয়, যে যে-পোষ্যকে ভালোবাসতেন, নিজের নামের পাশে তাদের নামও যোগ করে দিতে লাগলেন অনেকে। ফলে বহু নামের পাশে দেখা যেতে লাগল সিংহ, হাতি, নাগ, বাঘ, কোয়েল, হংস-র মতো জীবজন্তুদের নাম। কেউ কেউ আবার নিজের নামের পাশে বসাতে শুরু করলেন বাবা বা মায়ের নাম। কিংবা লিখে দিতে লাগলেন তাঁরা কার ছেলে। যেমন, উদ্দালক আরুণি। উদ্দালক তাঁর নাম। আর আরুণি মানে অরুণের ছেলে। অর্থাৎ বাবার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এখানে। ঠিক সেই একইরকমভাবে মায়ের ছেলে হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন সত্যকাম জাবালি। সত্যকাম তাঁর নাম। আর জাবালি মানে জবালার ছেলে।
তখন বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলে কিংবা ওই ধরনের কোনও কাজের ক্ষেত্রে এখনকার মতো অভিভাবক হিসেবে শুধু মায়ের নাম লিখলেই হত না। সব জায়গায় বাবার নাম দরকার হত। সুতরাং সে সময় ছেলেদের পদবিকেই গুরুত্ব দেওয়া হত। মেয়েদের পদবি নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামানোর আরেকটা কারণ ছিল, বিয়ের পরেই তাঁরা স্বামীর পদবি ব্যবহার করতেন। ফলে ওটা অত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যদিও সেই সময় বহু মেয়েই অন্য পদবির কাউকে বিয়ে করলেও বাবার পদবি ছাড়তেন না।
তাতে সুবিধের চেয়ে অসুবিধেই হচ্ছিল বেশি। রঙ্গিনীর বাবার পদবি মজুমদার হলেও তিনি যদি পুরকায়স্থকে বিয়ে করতেন, সেক্ষেত্রে তাঁর নাম হয়ে যেত রঙ্গিনী মজুমদার পুরকায়স্থ। আবার তাঁর মেয়ে নবীনা মজুমদার পুরকায়স্থ যদি তাঁরই মতো দুটো পদবিধারী কোনও গঙ্গোপাধ্যায় চক্রবর্তী পদবির কাউকে বিয়ে করতেন, তাহলে তাঁর নাম হয়ে যেত নবীনা মজুমদার পুরকায়স্থ গঙ্গোপাধ্যায় চক্রবর্তী।
এভাবে পরের প্রজন্মগুলিতে চারটে থেকে আটটা, আটটা থেকে ষোলোটা, ষোলোটা থেকে বত্রিশটা এবং এভাবে বাড়তে বাড়তে একেকজনের পদবির সংখ্যা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াত বলা মুশকিল। ফলে কয়েকজন মেয়ে ওটা শুরু করলেও অঙ্কুরেই তা বিনাশ হয়ে গিয়েছিল।
তবে হ্যাঁ, নামের পাশে যে যেটাই লিখুন না কেন, কেউ একবার কিছু লিখতে শুরু করলেই হল, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও নিজেদের নামের পাশে সেটাই লিখতে শুরু করে দিত। ফলে সে কোন বংশের সন্তান, তা ওটাই জানিয়ে দিতে লাগল। আর এভাবেই শুরু হয়ে গেল নামের সঙ্গে সঙ্গে তার শিকড়ের পরিচয়ও। আর সেটা প্রথম শুরু হয়েছিল আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ, চিনে।
যদিও পরবর্তীকালে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, উচ্চারণ দোষে, স্থান ভেদে, এমনকি দুই পদবিধারীর বিবাহের পরে ওই দুই পদবির সংমিশ্রণে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপভ্রংশ হতে হতে এমন একেকটা শব্দের সৃষ্টি হতে লাগল, যার মূল খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
পদবির দরকার ছিল ঠিকই। কিন্তু পরের দিকে এই পদবিই মানুষের মধ্যে নানারকম বিভেদের সৃষ্টি করতে লাগল। শুরু হয়ে গেল জাতপাতের বিভেদ এবং বিরোধ।
শহরের মধ্যে খুব একটা না হলেও গ্রাম এবং গ্রামান্তরে কিন্তু এখনও, এই এত বছর পরেও এর প্রভাব প্রচুর। এক জাতের লোক অন্য জাতের কুঁয়ো থেকে খাবার জল নিতে পারেন না। এক জাতের লোক আরেক জাতকে সহ্য করতে পারেন না।
আর এই বিরোধের মূলই হল পদবি। তাহলে কি এই পদবি তুলে দেওয়ার পিছনে আসল উদ্দেশ্য অন্য কিছু? জাতপাতের বিরোধ দূর করা? মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্ক আরও মজবুত করা? হ্যাঁ। আমরা যখন মিলেমিশে একসঙ্গে আছি, তখন পৃথিবীতে তো একটাই জাত হওয়া উচিত। নাকি? আর সেটা হল, মনুষ্য-জাতি।
কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন ঘটল যে, এতদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই পদবি ব্যবহারের চল একরাতের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল! তবে কি এটাও তাঁর স্বামীর কথা অনুযায়ী সেই কেমিক্যাল বিভ্রাটেরই ফল! কে জানে!
না। এ নিয়ে আর ভাবা যাবে না। ওই তো ঘণ্টা পড়ার শব্দ। তার মানে দ্বিতীয় পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। এখন তাঁকে ফের ক্লাস নিতে যেতে হবে। তৃতীয় পিরিয়ডের ক্লাস।


এগারো


স্কুল-বাস থেকে নামার পর রোজকার মতো কাজের মাসির পিছু পিছু বাড়ি ফিরছিল সুস্মিতা। তখন হঠাৎই সামনে থেকে অভিমন্যুকে আসতে দেখে হাঁটার গতি খানিকটা কমিয়ে কায়দা করে কাজের মাসির থেকে বেশ কয়েক পা পিছিয়ে টুক করে তার পায়ের কাছে দলা পাকানো একটা চিরকুট ছুড়ে দিয়েছিল সে।
কী ছুড়ল? অভিমন্যু চোখ তুলতেই চোখের ইশারায় ও বলেছিল ওটা তুলে নিতে।
ওই চিরকুটটা নিয়ে আর কোনও দিকে তাকায়নি সে। সোজা বাড়ি চলে এসেছিল। মা তখন প্রতিদিনকার মতো স্কুলে। বাবাও ল্যাবরেটরিতে। এই সময় কেউ আসবে না একশো শতাংশ নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও সে কিন্তু কোনও রিস্ক নেয়নি। জানালা দিয়ে এদিক ওদিক খুব ভালো করে দেখে নিয়ে ভিতর থেকে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিলেও কীসের একটা ভয় যেন তাকে কুরে কু়রে খাচ্ছিল। বুকটা ধক ধক করছিল। তাই ঘরের মধ্যে নয়, চিঠিটা নিয়ে বারবার বাথরুমে যাচ্ছিল সে। আর প্যান্টের লুকোনো পকেট থেকে দু’লাইন ছড়া লেখা চিরকুটটা বের করে কখনও রুদ্ধশ্বাসে, কখনও আবার থেমে থেমে সময় নিয়ে পড়ছিল। আর যত পড়ছিল, ততই যেন উত্তেজনায় সে টগবগ করে ফুটছিল। সেই চিরকুটটায় লেখা ছিল—কাক ডিম পাড়ে কোকিলের বাসায় / আমি আছি তোমার চিঠির আশায়।
তাহলে কি ও তার ফিলিংসটা এতদিনে বুঝতে পেরেছে! সে যে মনে মনে ওকে চায়, সেটা টের পেয়েছে! আর সেটা যদি টেরই পেয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এটাও বুঝতে পেরেছে যে, সে তাকে যতই ভালোবাসুক না কেন, সেটা আকার-ইঙ্গিতে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক না কেন, মুখ ফুটে সেকথা সে কিছুতেই বলতে পারবে না। তাই কি ও নিজেই সাহস করে এগিয়ে এসে এই দু’লাইনের ছড়ার মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছে, ও তার চিঠির আশায় বসে আছে!
নিশ্চয়ই বলতে চেয়েছে। না হলে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে একথা সে কিছুতেই লিখতে পারত না। একটা মেয়ে হয়ে ও এতটা এগিয়ে এসেছে, আর সে একটা ছেলে হয়ে চুপচাপ বসে থাকবে! না। এটা হতে পারে না।
সেও খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়েছিল চিঠি লিখতে। বসে তো ছিল। কিন্তু শুরুই করতে পারছিল না। কী সম্বোধন করবে তাকে! প্রিয়া, প্রিয়তমা, নয়নের মণি, নাকি অন্য কিছু?
লিখেও ছিল। কিন্তু লেখার পরেই মনে হয়েছিল, না, এটা নয়, এটা যেন একটু কেমন কেমন। অন্য কিছু লিখতে হবে। অন্য কিছু। কিন্তু কী! না। কিছুতেই সেটা আর ঠিক করে উঠতে পারেনি সে। শেষে ঠিক করেছিল, আগে তো চিঠিটা গুছিয়ে লিখি, তারপর না হয় ভেবেচিন্তে সম্বোধনটা লেখা যাবে।
সে-চিঠি লিখতে গিয়েও পদে পদে হোঁচট খেয়েছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে। এক-আধ লাইন লেখার পরেই সেটা ছিঁড়ে নতুন করে আবার লিখতে শুরু করেছে। এভাবে একটার পর একটা পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ষোলো নম্বর নতুন বাঁধানো খাতাটার পাতা যখন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে, তখন চিঠিটা কাউকে দেওয়ার মতো মোটামুটি একটা পদের হল।
চিঠি তো লেখা হল। কিন্তু ওকে দেবে কীভাবে! সরাসরি গিয়ে মুখের সামনে দাঁড়িয়ে তো আর বলা যায় না, এই নাও চিঠি। বিশ্বস্ত কারও হাত দিয়ে পাঠাতে হবে। কিন্তু কাকে বিশ্বাস করে এরকম একটা গুরুদায়িত্ব দেবে সে! কাকে? নাকি বাচ্চা কোনও ছেলেকে আইসক্রিম কিংবা বেলুনের লোভ দেখিয়ে কাজটা হাসিল করবে? নাকি ওর মতো সেও, ও যখন স্কুল থেকে ফিরবে, তখন এটা দলা পাকিয়ে ওর পায়ের কাছে ছু়ড়ে দেবে? তারপর ওর মতোই চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেবে, ওটা তুলে নিতে?
সেটা ভেবেই অতিযত্নে চিঠিটা পকেটে পুরে নিয়ে পরদিন দুপুর হওয়ার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। তারপর গলির মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুতেই যেন সময় কাটছিল না তার। অস্থির হয়ে উঠছিল। গলির মুখ থেকে সুস্মিতাদের বাড়ির জানালা অবধি কতবার যে পায়চারি করেছিল তার মনে নেই। তার কাছে তখন একেকটা সেকেন্ড যেন একেকটা ঘণ্টা। কখনও কখনও মনে হচ্ছিল, এক সেকেন্ড কোথায়, এই তো একটা পুরো দিন পেরিয়ে গেল! না হলে পা এত টনটন করছে কেন? কই, ও তো এল না!
না। শুধু ও নয়, সেদিন ওর স্কুল-বাসও আসেনি। আসেনি! নাকি এসেছিল! বাস থেকে ও নেমেও ছিল এবং তার পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে অন্যান্য দিনের মতো চলেও গেছে, সে টের পায়নি!
না। এটা হতে পারে না। যতই সে গলির মুখ থেকে ওদের জানালা অবধি পায়চারি করুক, যতই ওর কথা ভেবে ভেবে অন্যমনস্ক হয়ে যাক, যার জন্য অপেক্ষা করছে, সে গেলে ও তাকে দেখতে পাবে না? এটা হয়! তবুও আরও সতর্ক হয়ে গেল সে। না, আর পায়চারি নয়, পরদিন ও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল গলির মুখে। নিজে তো একচুল সরলই না, চোখও সরাল না এদিক ওদিক। আর এত করেও শেষপর্যন্ত দেখল, সময় গড়িয়ে গেল, তবুও না, সত্যিই ওর স্কুল-বাস এল না।
তাহলে কি ওর স্কুল ছুটি? নাকি ও স্কুলেই যায়নি? নাকি কোনও কারণে স্কুল-বাস আসছে না? সার্ভিসে গেছে। হয়তো অন্য কিছু করে যাতায়াত করছে। কত কিছুই হতে পারে। সে হোক। আরে বাবা, ও যাতে করেই আসুক, সে তো গলির মুখেই দাঁড়িয়ে আছে, নাকি! তার চোখ এড়িয়ে ও যাবে কী করে? নাকি ওর শরীর খারাপ? স্কুলেই যাচ্ছে না!
ও যখন স্কুলে যায়, সে সময় দেখতে পারলে হত ও স্কুলে যাচ্ছে কি না। না, তখন চিঠি দেওয়া ঠিক হবে না ঠিকই, তবুও জানা তো যেত। কিন্তু ওর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। কারণ, তখন ওর বাবা ল্যাবরেটরিতে চলে গেলেও, মা তো বাড়িতে থাকেন! মায়ের সামনে কি বিনা কারণে বেরোনো যায়? জিজ্ঞেস করলে কী বলবে? তাই তার পরদিন আর ওভাবে নয়, শেষ চেষ্টা হিসেবে গলির মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অভিমন্যু দেখতে লাগল ওদের গলির সামনে দিয়ে যাতায়াত করা প্রত্যেকটা গাড়িকে। বিশেষ করে নজর রাখতে লাগল ওদের স্কুলের হলুদ রংয়ের লাক্সারি বড়ো বাসটা যায় কি না।
হ্যাঁ, ওই তো! হঠাৎ ওর চোখে পড়ে গেল ওদের স্কুল-বাসটা। হ্যাঁ, ওই তো, এদিকেই আসছে। কিন্তু না। ওটা তাদের গলির সামনে এসে দাঁড়াল না। যেভাবে আসছিল, সেভাবেই চলে গেল প্রতিদিন ওকে নামিয়ে দিয়ে যে দিকে যায়, সেই দিকে।
অভিমন্যুর মন ভেঙে গেল। নাহ্‌, আজও চিঠিটা ওকে দেওয়া হল না! বাড়ি ফিরে আবার চিঠিটা নিয়ে বসল। এই তিনদিন ধরে একইভাবে পকেটে ঘুরতে ঘুরতে চিঠিটা কেমন যেন ময়লা ময়লা হয়ে গেছে। একটু তুবড়ে-তাবড়েও গেছে মনে হচ্ছে। এত নরম হয়ে গেছে যে, ঝটপট খুলতে গেলে ভাঁজ থেকে হয়তো ছিঁড়েও যেতে পারে। তাই আবার নতুন করে চিঠিটা কপি করতে বসল সে। কপি করতে গিয়ে বদলে গেল অনেক শব্দ। অনেক লাইন। অনেক কথার মানেও।
নাহ্‌, আর পাড়ার মুখে গিয়ে দাঁড়ানো যাবে না। রোজ রোজ দাঁড়ালে লোকে সন্দেহ করতে পারে। যদিও তাদের পাড়ার কেউই কারও কোনও ব্যাপারে থাকে না। আগ বাড়িয়ে কোনও কিছুতে নাকও গলায় না। তবুও… কার মনে কী আছে, কিছু তো বলা যায় না। যেমন গতকাল ও যখন দাঁড়িয়ে ছিল, তখন তাকে দেখে ফেলেছিল লালিদি। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গলির ভিতরে ঢুকেও বারবার ফিরে ফিরে তাকে দেখছিল। ডানদিকে বাঁক নেওয়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য যেন দাঁড়িয়েও পড়েছিল। হয়তো ভেবেছিল, যে ছেলেটা কোনওদিনও ওভাবে দাঁড়ায় না, আজ হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে আছে কেন!
লোকে বলে, লালিদি নাকি সব ব্যাপারেই কানাঘুষো করে। এর কথা তার কাছে, তার কথা ওর কাছে লাগায়। তিলকে তাল করে ছাড়ে। এই নিয়ে অশান্তিও হয়। তবুও তার স্বভাব যায় না। অবশ্য ফিরে ফিরে দেখছিল মানে যে তাকেই দেখছিল, সেটা নাও হতে পারে। আসলে তার নিজের মনের মধ্যেই ‘কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে’ ভয় আছে বলেই হয়তো তার এসব মনে হচ্ছে।
সে যাই হোক। অভিমন্যু মনে মনে ঠিক করল, সে আর গলির মুখে গিয়ে ওর জন্য হা-পিত্যেশ করে অপেক্ষা করবে না। কক্ষনও না। তার চেয়ে বরং…
হ্যাঁ, রিকি তার খুব ন্যাওটা। রিকিকে ও-ও খুব ভালোবাসে। সে দেখেছে, রিকিকে দেখলেই রিকির তুলতুলে গালদুটো ও খুব করে চটকায়। আদর করে। চুমু খায়। বাড়িতেও নিয়ে যায়।
অভিমন্যু ঠিক করল, হ্যাঁ, ওর হাত দিয়ে সুস্মিতার কাছে চিঠিটা পাঠাবে। তবে... ও তো একটু ছোটো। সবে ফোরে পড়ে। ওকে পইপই করে বলে দিলেও ও যদি সুস্মিতাকে না পেয়ে ওদের বাড়ির অন্য কারও কাছে চিঠিটা দিয়ে দেয়! কিংবা সবার সামনেই যদি সুস্মিতার হাতে দিয়ে বলে, “এই নাও, এটা অভিদা পাঠিয়েছে।” তাহলে কেলেঙ্কারির একশেষ। একটা মারও আর বাইরে পড়বে না। বলা যায় না, ওদের বাড়ির বড়োরা এসে হয়তো তার বাবা-মাকেও বলে যেতে পারে, তাঁদের একমাত্র ছেলের এই কেলোর কীর্তির কথা।
তখন? তখন একটাই উপায়। সঙ্গে সঙ্গে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে চিঠির কথা বেমালুম অস্বীকার করা। এমন ভান করা, যেন এটা শুনে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল সে। মুখের উপরে সরাসরি বলে দেওয়া, ওটা আমার লেখাই নয়!
আর সেটা করতে গেলে প্রথমেই যেটা করতে হবে, তার লেখা চিঠিটা অন্য কাউকে দিয়ে কপি করাতে হবে। যাতে ওই চিঠির সঙ্গে তার হাতের লেখা মেলাতে গেলেও অতি সাধারণ লোকও বলে দেয়, না। এই দুটো হাতের লেখা এক নয়। আর ওটা করার পাশাপাশি তার নিজের হাতে লেখা চিঠিটাও কুটিকুটি করে ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দিতে হবে। না। যাকে পাঠাচ্ছি, তার নাম তো নয়ই, কোনও সম্বোধনই লেখা যাবে না। এমনকি, কে পাঠাচ্ছে, তার নামও নয়। ও যেমন তাকে পাঠানো দু’লাইনের চিরকুটটায় কে পাঠাচ্ছে, কাকে পাঠাচ্ছে কিছুই লেখেনি, সেও সেভাবেই লিখবে।
পরদিন টিফিন পিরিয়ডে তার সমস্ত টিফিনই শুধু নয়, সদ্য কেনা দুটো সুগন্ধি ইরেজার আর চোখ ধাঁধানো বারোটা রঙিন জেল পেনের পুরো সেটটাই তার ক্লাসেরই শান্তশিষ্ট মেধাবি ছাত্র শিমুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই নে।”
অভিমন্যুর কাণ্ড দেখে শিমুল একেবারে অবাক। আজ পর্যন্ত যে তাকে কোনওদিন কিচ্ছু দেয়নি, তার হঠাৎ এমন কী হল যে, একটা দুটো নয়, একেবারে তিন-তিনটে জিনিস একসঙ্গে নিজে থেকেই তাকে যেচে দিচ্ছে!
ওকে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অভিমন্যু ফের বলল, “নে, ধর! তোর জন্য এনেছি।”
“আমার জন্য! সবগুলি?” যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না তার। তবুও হাত বাড়িয়ে সবক’টাই নিয়ে নিল সে। তারপর বলল, “তুই খাবি না?”
অভিমন্যু বলল, “না রে, গা-টা কেমন গুলোচ্ছে।”
“ও, তাই বল। কিন্তু খাবারের সঙ্গে এগুলো! আজ কি তোর জন্মদিন নাকি?”
“না তো! কেন?”
“না, পুরো এক প্যাকেট পেন দিচ্ছিস, ইরেজার দিচ্ছিস, তাই…”
অভিমন্যু বলল, “কেন? আমি তোকে দিতে পারি না? আমি তোর বন্ধু নই?”
“না, সে তো ঠিক আছে। আসলে… হঠাৎ…”
“নে নে, তাড়াতা়ড়ি খা।”
শিমুল বলল, “সবে তো টিফিনের ঘণ্টা পড়ল!”
অভিমন্যু বলল, “হ্যাঁ, জানি তো।”
“তবে?”
“না। বলছিলাম কী, তোর হাতের লেখা তো খুব সুন্দর, তাই তুই যদি একটা চিঠি লিখে দিস…”
“চিঠি? আন্টিকে? গার্জিয়ান হয়ে? মাফ কর বাবা। এই নে, সবটা এখনও খাইনি।”
“আরে না রে, এমনিই। অন্য চিঠি।”
“ও, প্রেমপত্র লিখে দিতে হবে?”
“লিখতে হবে না। আমি লিখেছি। তুই শুধু দেখে দেখে কপি করে দে, তাহলেই হবে।”
“তাই তো বলি! ঠিক আছে, দাঁড়া। খেয়ে নিই।”
টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়ার আগেই একটা অক্ষরও কাটাকুটি না করে পুরো চিঠিটাই খুব সুন্দরভাবে ধরে ধরে কপি করে দিল শিমুল।
সেটা জ্যামিতি বক্সের মধ্যে তড়িঘড়ি ভরে নিল অভিমন্যু। তারপর স্কুল থেকে ফেরার সময় জানালার ধারের সিটে বসে তার নিজের হাতে লেখা চিঠিটা একটু একটু করে ছিঁড়ে চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিতে লাগল রাস্তায় হাজার চেষ্টা করেও তার ফেলা সবক’টা টুকরো কেউ যাতে জোগাড় করতে না পারে। পারলেও, তেরা-বাঁকা করে ছেঁড়া টুকরোগুলো পর পর সাজিয়ে, জোড়া লাগিয়ে তার চিঠিটা যাতে কেউ পড়তে না পারে।
বাবা তো সারাদিনই ল্যাবরেটরিতে পড়ে থাকেন। মাকে নিয়েই যা একটু ভয়। পরদিন মা স্কুলে বেরিয়ে যেতেই রিকিদের বাড়ি থেকে রিকিকে ডেকে নিয়ে এল অভিমন্যু। বারবার করে বুঝিয়ে দিল কীভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠিটা সুস্মিতার হাতে দিতে হবে। সবার চোখ এড়িয়ে। আর সতর্ক থাকতে হবে, ওদের বাড়ির কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। আর তার থেকেও বড়ো কথা, ধরা পড়ে গেলে ভুল করেও যেন সে তার নাম কিছুতেই না বলে। জোরাজুরি করলে যেন বলে, এটা তোমাদের বাড়ির সামনেই রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি। তাই সুমিদিকে দিলাম যদি তোমাদের কারও হয়!
সব শুনে রিকি বলল, “বুঝেছি বুঝেছি, অত বলতে হবে না। অত বোঝালে সব গুবলেট হয়ে যাবে। তোমার কোনও চিন্তা নেই। চাপ নিও না। কাজ হয়ে যাবে। কী খাওয়াবে বলো।”


বারো


ঔপমানব এমনিতেই কম কথা বলেন। বাড়ি থাকলে আরও কম। আর যেটুকু বলেন, হয় ছেলের সঙ্গে নয়তো কাজের মাসির সঙ্গে। বউয়ের সঙ্গে তো কথা প্রায় হয়ই না। সেই ঔপমানবই সক্কালবেলায় পড়ার টেবিলে বসে কী একটা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ হাঁক পাড়লেন জবালার উদ্দেশে, “একটু শোনো তো।”
তলব পেয়ে পাশের ঘর থেকে তড়িঘড়ি ছুটে এলেন জবালা। “কী হয়েছে?”
“না। সেরকম কিছু নয়। বলছি, তুমি কি কুড়ি তারিখে ফাঁকা আছ?”
“কখন?”
“সকালের দিকে।”
জবালা এক মুহূর্ত কী একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “সকালে? ও বাবা, কী করে হবে? স্কুল আছে না!”
“রবিবারে আবার স্কুল কী?”
“ও, রবিবার? তাহলে ঠিক আছে। কেন? কী আছে ওদিন?”
স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে ঔপমানব বললেন, “ওই দিনটা চড়াই দিবস।”
“চড়াই দিবস!”
“হ্যাঁ, ওই বেঙ্গালুরুর বার্ড লাভার গো, মহম্মদ দিলওয়ার। তিনি তো গত আট বছর ধরে চড়াই পাখিদের টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। তা, ওঁর সেই উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিতেই মার্চ মাসের কুড়ি তারিখটাকে তো বিশ্বব্যাপী চড়াই পাখি দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।”
“তাই নাকি?”
“তুমি জানতে না?”
জবালা বললেন, “না তো।”
“জানবেই বা কী করে? সারাক্ষণ মাথার মধ্যে অঙ্ক ঘুরে বেড়ালে এগুলো জানা যায় না।”
“তা হঠাৎ করে চড়াই দিবস কেন?”
“হঠাৎ করে নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই এটা পালন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য একটাই, জনসাধারণকে সচেতন করা।” 
“কী ব্যাপারে?”
“এই চড়াই নিয়ে। আসলে কয়েক দশক আগেও প্রচুর চড়াই পাখি দেখা যেত। ওরা বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াত। খুঁটে খুঁটে খাবার খেত, আর সারাক্ষণ কিচিরমিচির করত।”
“হ্যাঁ, জানি তো। তাতে কী হয়েছে?”
“সেটাই তো বলছি। এখন আর ওদের সেভাবে দেখা যায় না। বিশেষ করে শহরের দিকে। তাই পক্ষী বিশেষজ্ঞেরা সন্দেহ করছেন, এদের অবস্থাও হয়তো হাড়গিলেদের মতো হবে।”
“হাড়গিলে মানে? হাড়গিলে পাখি?”
“হ্যাঁ।”
“তাদের আবার কী হল?”
“একসময় এই কলকাতাতেও তাদের প্রচুর দেখা যেত। এখন আর তারা নেই। হারিয়ে গেছে। পাখিপ্রেমীদের ধারণা, এভাবে চললে আর ক’দিন পরে চড়াই পাখিরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন শুধু বইয়ের পাতাতেই তাদের ছবি দেখে ক্ষান্ত হতে হবে। অথবা ছুটতে হবে মিউজিয়ামে।”
“সে কী গো!”
“তাহলে আর বলছি কী? তুমি হয়তো জানো না, সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন জাতের পাখিদের সংখ্যা এখন খুব দ্রুত হারে কমছে। বিভিন্ন দেশের গণনা থেকে জানা গেছে, গত বারো বছরে চড়াইয়ের সংখ্যা প্রায় আশি শতাংশ কমে গেছে। এ নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়েই তোলপাড় হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে। উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেরকম জোরদার কোনও উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত চোখে পড়ছে না।”
জবালা বুঝতে পারলেন, তাঁর স্বামী শুধু রঙবেরঙয়ের কেমিক্যাল নিয়েই চিন্তিত নন, চিন্তিত শুধু পরিবেশ নিয়েও নন, চিন্তিত এমন একটা পাখি নিয়ে, যে কোকিলের মতো কুহু কুহু করে ডাকতে পারে না। ময়ূরের মতো পেখম তুলে নাচতে পারে না। দেখতেও এমন আহামরি নয় যে, তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবুও তাদের নিয়েই ভাবিত তাঁর স্বামী। আর তাঁর স্বামী যখন ভাবছেন, সেটা নিয়ে তো তাঁকেও ভাবতে হবে, নাকি! তাই জবালা জানতে চাইলেন, “তাহলে খতিয়ে দেখতে হবে ওদের সংখ্যা এভাবে কমে যাচ্ছে কেন।”
ঔপমানব বললেন, “দেখা হয়ে গেছে। শুধু চোখের দেখা নয়, একেবারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। আর তাতে জানা গেছে একটা দুটো নয়, ওদের এই বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। তবে মূল কারণ হল আমাদের প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এই আধুনিক জীবনযাত্রা।”
“আমাদের জীবনযাত্রা?”
“হ্যাঁ। আমাদের জীবনযাত্রা। একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবে, গত ষাট-সত্তর বছর আগেও এখানে এরকম ফ্ল্যাট-কালচার ছিল না। বেশিরভাগই ছিল একতলা কিংবা দোতলা বাড়ি। হাতে গোনা যেত তিনতলা অথবা চারতলা বাড়ি। কিন্তু এই শহরে রুজি-রোজগারের জন্য যখন ভিড় বাড়তে শুরু করল, তখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল বাসস্থানের চাহিদাও। সেই চাহিদার জোগান দেওয়ার জন্যই নতুন নতুন বাড়িঘর করার জন্য শুরু হল গাছ কাটা। জলাশয় ভরাট করা। পুরনো একতলা দোতলা বাড়িগুলো ভেঙে তৈরি করা শুরু হল আকাশ ছোঁয়া একেকটা অট্টালিকা।”
“তার সঙ্গে চড়াই পাখি কমে যাওয়ার সম্পর্ক কী?”
“সম্পর্ক নেই? আগেকার বাড়ির সঙ্গে এখনকার বহুতল বাড়ি তৈরির শৈলীতেই তো আকাশপাতাল ফারাক। আগেকার বাড়িগুলিতে থাকত নানাধরনের ফাঁকফোকর, ঘুলঘুলি, কড়িবরগা, চিলেকোঠা, এমনকি জিনিস রাখার জন্য ঘরের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে লাগানো হত ছোটোবড়ো নানা মাপের কাঠের তাক। সেই জায়গাগুলিই চড়াই পাখিরা বেছে নিত বাসা করার জন্য। সেখানে ডিম পাড়ত। ছানারা বড়ো হত। আর উড়তে পারলেই তারা ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। এই দৃশ্য বছরভর দেখা যেত। এখন কি আর দেখতে পাও?”
“না, সত্যিই তো, এখন আর দেখতে পাই না।”
“দেখবে কী করে? ওরা কি আর আছে! যে গুটিকতক আছে, তারাও আর বেশিদিন থাকবে না।”
“কেন?”
“কারণ, এই নতুন নতুন আকাশছোঁয়া বাড়ি।”
“একথা বলছ কেন! সবাই কি আর আকাশছোঁয়া বাড়ি বানাচ্ছে? একতলা দোতলা বাড়িও তো হচ্ছে।”
“হবে না কেন? হচ্ছে। তবে যত ছোটোই হোক না কেন, কোনও বাড়িতেই আর কড়িবরগা লাগানো হচ্ছে না। তার বদলে ঢালাই করা হচ্ছে। দেওয়ালগুলিও হচ্ছে ভরাট এবং মসৃণ। কোনও ফাঁকফোকর থাকছে না। ঘুলঘুলি রাখার কথা তো এখনকার স্থপতিরা কল্পনাও করতে পারেন না। তাও কোনও চড়াই পাখি যদি বাসা তৈরি করার জন্য কারও ফ্ল্যাটে খড়কুটো নিয়ে ঢোকে ঘর নোংরা হচ্ছে বলে শুধু ঘরের গৃহিণীরাই নন, কর্তা, এমনকি ঠিকে কাজের লোকেরাও সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে যান। ওদের তাড়িয়ে দেন। সুতরাং বাসাই যদি বাঁধতে না পারে, তাহলে ওরা ডিম পাড়বে কোথায়?”
“অন্য জায়গা বেছে নিক! পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের পালটে নিক। গত তিন লক্ষ বছর ধরে আরশোলারা যেমন পৃথিবীর বদলে যাওয়া নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির সামনে পড়ে নিজেদের একটু একটু করে বদলে নিয়েছে, সেভাবে ওরাও নিজেদের পালটে নিক।”
“কত পালটাবে? শুধু তো বাসা বাঁধার জায়গার অভাব নয়। খাবারেও টান পড়ছে প্রতিনিয়ত। বেড়ে ওঠার সময় চড়াই ছানাদের প্রচুর প্রোটিনের দরকার হয়। আর তা আসে নানা পোকামাকড় থেকে। ফলে সে সময় ওদের প্রধান খাদ্যই হল নানা জাতের পোকা যে পোকাগুলো মূলত গাছেই জন্মায়। কিন্তু চড়াই দম্পতি সারাদিন নিজেরা কোনওরকমে এখানে ওখানে খুঁটে খুঁটে খেলেও ছানাদের খাবার সেভাবে আর জোগাড় করতে পারছে না।”
“কেন?”
“কেন কী? পোকা পাবে কোথায়? গাছই নেই তো পোকা। যাও বা আছে, বেশিরভাগই বিদেশি গাছ। বাহারি গাছ। যেগুলির সিংহভাগই বাগানে নয়, হয় টবের মধ্যে। আর টবের মধ্যে হয় বলেই ওসব গাছে পোকা প্রায় হয়ই না। এরপরেও যে ক’টা দেশি গাছ আছে, সেগুলি তাড়াতাড়ি বড়ো করে তোলার জন্য নানারকম সার তো বটেই, গাছের উপরেও স্প্রে করা হয় যথেচ্ছ কীটনাশক। ফলে সব পোকাই মরে যায়।”
উদাস হয়ে নিজের মনেই জবালা বললেন, “হ্যাঁ, কীটনাশক দিলে তো মরবেই।”
“তার উপরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গাড়িঘোড়া। দূষণ। পাশাপাশি রাস্তার ল্যাম্প-পোস্টগুলিতে লাগানো হচ্ছে তীব্র আলোর বাতি যা নিকটবর্তী গাছেদের বিশ্রামের ব্যাঘাত তো ঘটাচ্ছেই, চড়াইদের টিকে থাকার পক্ষেও হয়ে উঠছে অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
“তাই নাকি?”
“শুধু তাই-ই নয়। এখন তো অনেকে আবার বলছেন, মোবাইল ফোনের সূক্ষ্ম তরঙ্গই নাকি চড়াই পাখিদের বিলুপ্ত হওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ। এই তরঙ্গ নাকি প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার চড়াইকে নিঃশব্দে হত্যা করে চলেছে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, যে হারে মোবাইলের ব্যবহার প্রতিদিন বেড়ে চলেছে, তাতে এই ছোট্ট নিরীহ পাখিটি অচিরেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
“তাহলে কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আর চড়াই পাখি দেখতে পাবে না?”
“যাতে পায়, সেজন্যই তো পক্ষীপ্রেমীরা এখন উঠে পড়ে লেগেছেন।”
“পক্ষীপ্রেমী বলতে তো তোমাদের এই একজনই, মহম্মদ দিলওয়ার। তাই তো?”
“না না। তা কেন? ওঁর মতো আরও অনেকেই আছেন। অন্য দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের এই দেশের গাড়োয়াল হিমালয়ের উখিমঠের যশপাল সিং নেগি তো ঠিকই করে ফেলেছেন, তাঁর সঞ্চিত সমস্ত টাকা দিয়ে শুধুমাত্র চড়াই পাখিদের জন্যই একটা বিশাল বাড়ি বানাবেন। পাথরের তৈরি সেই বাড়িতে থাকবে চড়াই পাখিদের বাসা বাঁধার উপযোগী অসংখ্য ফাঁকফোকর এবং ঘুলঘুলি। সেই বাড়িটির নামও তিনি ঠিক করে ফেলেছেন।”
“কী নাম?”
ঔপমানব বললেন, “চড়াই ভবন।”
“বাহ্‌, বেশ সুন্দর নাম তো!”
“সুন্দর তো হবেই। চড়াই পাখিদের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এরকম নামকরণ কেউ ভাবতে পারে?”
“সে যা বলেছ। কিন্তু তুমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে কেন, আমি কুড়ি তারিখে ফাঁকা আছি কি না?”
“করলাম এই জন্য যে, আমাদের এক বন্ধু চড়াই পাখিদের এই করুণ কাহিনি শুনে তার ছ’তলা বাড়িটার সারা গা জুড়ে অসংখ্য ছোটো ছোটো হাঁড়ি লাগাচ্ছেন। তাতে খড়কুটো ভরে দিচ্ছেন। যাতে চড়াই পাখিরা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে। আর প্রায় গোটা ছাদ জুড়ে পুরু মাটি ফেলে দেশি ফুলগাছের চারা বসাচ্ছেন। যাতে সেখানে পোকামাকড় জন্মাতে পারে।
“চড়াইদের খাবার জন্য?”
“ঠিক তাই।”
“মানে একটা প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরেকটা প্রাণীকে তৈরিই করা হচ্ছে শুধু মারার জন্য?”
“হ্যাঁ, এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। একটা চড়াই পাখি জীবনধারণের জন্য ক’টা পোকা খাবে শুনেই তুমি একথা বলছ? একবারও কি ভেবে দেখেছ প্রতিদিন কত প্রাণী হত্যা করে আমরা খাই? শুধু আমরা কেন, যাঁরা বৈষ্ণব, ভুল করেও যাঁরা কখনও কোনও প্রাণী হত্যা করেন না, তাঁরা যখন জানতেন না, জানতেন না। যখন জানলেন তাদেরও প্রাণ আছে, জানার পরেও, যারা আমাদের কোনও ক্ষতি করে না, যেভাবে খুশি কুচি কুচি করে কাটলেও যারা সামান্যতমও প্রতিরোধ করে না, উলটে প্রতিমুহূর্ত আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন জুগিয়ে যায়, সেই গাছপালা, শাকসবজি তো বটেই, এমনকি তাদের হবু বংশধর, যারা এখনও জন্মায়ইনি, সেই ফলমূল পর্যন্ত খেয়ে সাবড় করে দিচ্ছে। এটা কখনও ভেবে দেখছ? ভাবোনি তো? কেউই ভাবে না। এটাই স্বাভাবিক। তুমি হয়তো জানো না, এই পৃথিবীটা টিকে আছে শুধুমাত্র খাদ্য আর খাদকের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। বড়ো প্রাণী সবসময় ছোটো প্রাণীকে খাবে। এটাই নিয়ম। না হলেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে জীবকূল। আর জীব না থাকলে, অক্সিজেন নিয়ে জীব যেটা ছাড়ে, সেই নাইট্রোজেনের অভাবে উদ্ভিদ জগতও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
“হ্যাঁ, সেসব জানি। যেটা জানি না, সেটা বলো। তোমার সেই বন্ধু আর কী করছেন?”
“ওই বাড়ির ছাদের একটা অংশে তৈরি করছেন বিরাট বড়ো একটা চৌবাচ্চা। যাতে চড়াই ছাড়াও অন্যান্য পাখিরাও সেখানে জল খেতে পারে।”
“বাহ্! খুব ভালো কথা।”
“ভালো কথা তো বটেই। আর সেই বাড়িটা উনি নতুন করে দ্বারোদ্ঘাটন করতে চান এই চড়াই দিবসেই। মানে কুড়ি মার্চ।”
“সে নয় ঠিক আছে। কিন্তু হঠাৎ করে আমাকে নিমন্ত্রণ করতে গেলেন কেন?”
“কারণ, উনি নাকি দেখেছেন, যত লোক চড়াই পাখিদের অপছন্দ করেন, তার মধ্যে বেশিরভাগই নাকি মহিলা। ঘরের কোনও খাঁজে চড়াই পাখিরা বাসা বাঁধলে তারাই নাকি পরিষ্কার করার নামে তাদের বাসাগুলি ভেঙে দেন। ঘরের কোথাও খড়কুটো জমতে দেখলেই ফেলে দেন। তাই তিনি চাইছেন তাঁর এই কর্মযজ্ঞে বেশি বেশি করে মহিলারা আসুক। তাই উনি চাইছেন তুমিও যাও।”
“সে তো খুব ভালো কথা। আমি যাব। অবশ্যই যাব। আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“জিজ্ঞেস করার কী আছে? করো।”
“বলছিলাম কী, চড়াইদের জন্য কি আমরা কিছু করতে পারি না?”
“কী?”
“ধরো, আমারা কি জানালা থেকে তার দিয়ে বেঁধে বেশ কয়েকটা হাঁড়ি খড়-টর ভরে ঝুলিয়ে দিতে পারি না? ছাদে ক’টা গাছ লাগাতে পারি না? রাখতে পারি না এক গামলা জল?”
“সে তো পারিই। কিন্তু কথা হচ্ছে সেটা করবে কে?”
“কেন? আমি।”
জবালার কথা শুনে ঔপমানব একটু অবাকই হলেন। মনে মনে ভাবলেন, বাব্বা, অঙ্ক ছাড়া যে কিচ্ছু বোঝে না, নিন্দুকেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যার সম্পর্কে বলে, ও ভীষণ হিসেবি, সে বলছে এই কথা! না না, এগুলি ও বলছে না। বলছে ওই কেমিক্যাল বিভ্রাট। কেমিক্যালের কারিকুরি।


তেরো


“তোমাকে সেদিন বলছিলাম না, আমাদের স্কুলে নতুন একজন অঙ্কের মাস্টার এসেছেন, তিনি আজ রেগে গিয়ে ক্লাস সেভেনের একটা ছেলেকে ডাস্টার দিয়ে এত জোরে মাথায় মেরেছেন যে, তার মাথা ফেটে গলগল করে সে কী রক্ত। জামাটামা ভিজে একেবারে জ্যাবজ্যাব করছিল।”
খাবার টেবিলে বসে জবালা একথা বলতেই উদ্বিগ্ন হয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন ঔপমানব। “তাই নাকি? তারপর?”
“তারপর আবার কী? ছেলেটাকে ধরাধরি করে আমরা টিচার্স রুমে নিয়ে এলাম। ফার্স্ট এড লাগালাম। গরম দুধ-টুধ খাওয়ানোর পরে সে যখন একটু ধাতস্থ হল, তখন তাকে আমাদের স্কুলের সুধাবাবুকে দিয়ে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। এখন দেখি কী হয়। সবাই তো খুব প্যানিক করছে। যা দিনকাল পড়েছে, ওর বাবা-মা যদি থানাপুলিশ করে তো হয়ে গেল।”
“ওঁকে তোমরা কিছু বলোনি?”
“বলিনি আবার?”
“উনি কী বললেন?”
বিরক্ত মেশানো গলায় জবালা বললেন, “রাখো তো! ওঁর যতসব উলটোপালটা কথা। একশো বছর আগেকার মাস্টারদের মতো বলছেন, ‘মা-বাবারা যদি ছেলেমেয়েদের গায়ে হাত তুলতে পারে, তাহলে শিক্ষকেরা কেন পারবে না? ছাত্রছাত্রীরাও তো শিক্ষকদের কাছে সন্তানের মতোই, নাকি! আমরা যখন ছোটো ছিলাম, তখন যে ঘরে গৃহশিক্ষকেরা আমাদের পড়তেন, সেই ঘরে আমাদের বাবা-মায়েরা একটা করে বেত রেখে দিতেন। যাতে আমরা পড়ালেখা না পারলে কিংবা কোনও দুষ্টুমি করলে তাঁরা আমাদের ওই বেত দিয়ে উচিত শিক্ষা দিতে পারেন। আর মারতে মারতে সেটা ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বেত বের করে দিতেন। মানে মা-বাবারা ঘরের মধ্যেই বেত মজুত করে রাখতেন। আর একই সঙ্গে বাবা-মায়েরা তাঁদের বলেই দিতেন, যদি আপনার কথা না শোনে, তাহলে মেরে পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেবেন। আমাদের শুধু হাড় ক’টা পেলেই চলবে।”
নির্লিপ্ত গলায় ঔপমানব বললেন, “সে তো আমাদের বাবা-মাও বলতেন।”
“আর বোলো না। উনি এখন, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যখন কোনও শিক্ষক সামান্য একটা চড় মারলেও বাবা-মায়েরা মানবাধিকার কমিশনের কাছে ছুটে যান, সেই সময় দাঁড়িয়ে উনি বলছেন, ‘শিক্ষকরা তো আমাদেরও মারতেন। কেবল গৃহশিক্ষকেরাই নন, স্কুলের শিক্ষকেরাও। অনেক বড়ো বয়সেও কোনও কোনও শিক্ষকমশাই এমনভাবে মারতেন যে, গায়ে কালশিটে দাগ পড়ে যেত। কিন্তু তার জন্য আমাদের বাবা-মায়েরা তাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করা তো দূরের কথা, কোনও দিন মুখ ফুটেও জিজ্ঞেস করেননি, ওকে মারলেন কেন? আর আমি একটু ডাস্টার দিয়ে…”
“উনি কি খবর-টবর দেখেন না, নাকি? না, নতুন নিয়মকানুন কী হয়েছে কিছুই জানেন না?”
জবালা বললেন, “জানেন জানেন, সবই জানেন।”
“তাহলে?”
“সেটাই তো হচ্ছে কথা। আসলে সামান্য ব্যাপারে উনি এত উত্তেজিত হয়ে যান, নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারেন না। প্রেশারের রোগী তো।”
“সেটা তো ছাত্রের বাবা-মায়েরা বুঝবেন না। তুমি একটা কাজ করো, আমার বিছানার মাথার কাছে নতুন একটা সায়েন্স ম্যাগাজিন আছে। ওটা নিয়ে ওঁকে দিও।”
“কী আছে ওতে?”
ঔপমানব খাওয়া থামিয়ে বললেন, “ওরা এমাসে খুব সুন্দর একটা বিষয় নিয়ে কভার স্টোরি করেছে।”
“কী নিয়ে?”
“ভালো এবং খারাপ ব্যবহার অন্যের উপরে কীরকম প্রভাব ফেলে, সেটা নিয়ে।”
জবালা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি পড়েছ?”
“না পড়লে বলছি কী করে?”
“কী বলেছে ওটায়?”
রুটি চিবোতে চিবোতে ঔপমানব বললেন, “উনি কিছুই বলেননি। শুধু লিখেছেন, উনি কীভাবে গবেষণা করেছেন এবং তার থেকে কী ফলাফল বেরিয়ে এসেছে, সেটা।”
উৎসুক হয়ে জবালা জিজ্ঞেস করলেন, “কী বেরিয়ে এসেছে?”
“সামান্য ক’টা কটু কথা, না, মানুষ নয়, অন্য প্রাণীদের মনেও কীরকম ভয়ংকর প্রভাব ফেলে।”
“তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।”
ঔপমানব বললেন, “এটা বুঝতে পারছ না! তুমি তো নিশ্চয়ই জানো যে, আফ্রিকার মাদাগাসকারে একধরনের লতানো জংলি গাছ আছে যেগুলি একফোঁটা জল না পেলেও একদম রুক্ষ পাথুরে জমিতেও তরতর করে বেড়ে ওঠে এবং হু হু করে বংশবিস্তার করে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের গাছগুলিকেও আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে কাবু করে দেয়। আর অসতর্কতাবশত গৃহস্থের চোখ এড়িয়ে যাঁদের বাগানে ওই গাছের অন্তত একটা বীজ কোনওরকমে অঙ্কুর হয়ে একটু মাথা তুললেই বাগানের মালিকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কারণ যে বাগানে একবার ওই গাছ হয়, সেই গাছ মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই পুকুরের কচুরিপানার মতো বড়ো বড়ো বাগানকেও একেবারে ছেঁকে ধরে। আর এমনভাবে ধরে যে, বাকি সমস্ত ফলের গাছই তাদের কবলে পড়ে হাঁসফাঁস করে। মারা যায়। কিন্তু না, কোনও চাষিকেই ওই গাছ কষ্ট করে কাটতে হয় না।”
“কেন?”
“কারণ, একটা কৌশল আছে। ওটা প্রয়োগ করলেই ওই জংলি গাছগুলি কিছুক্ষণের মধ্যেই এমনি এমনিই মারা যায়।”
“তাই নাকি? কীভাবে?”
“সেরকম কিছুই নয়। সূর্য ওঠার সময় ওই গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু কয়েকটা গালাগালি দিয়ে হয়। গালাগালি দিতে রুচিতে বাধলে ‘দূর হ’, ‘মরে যা’, ‘আপদ কোথাকার’, ‘এক লাথি মারব’-র মতো কটূক্তি করলেও নাকি গাছগুলির পাতা টপাটপ টপাটপ করে খসে পড়তে থাকে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা গাছটাই একেবারে ন্যাড়া হয়ে যায়। দেখতে দেখতে চোখের সামনেই একদম মরা কাঠ হয়ে যায়। আর তুমি তো জানোই, পাতাহীন গাছ কখনও বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না…”
ঔপমানবের মুখের কথা শেষ হল না। তার রেশ টেনে সঙ্গে সঙ্গে জবালা বললেন, “শুধু গাছ কেন? আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম, সুন্দরবনের একটা গ্রামে কয়েক বছর পরপরই নাকি একটু বড়ো মাপের ধেড়ে ইঁদুরের ভয়ংকর উৎপাতে গ্রামের লোকেরা একদম অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তারা শুধু খামারের মজুত ধানই খায় না, বীজধানও খেয়ে সাবাড় করে দেয়। যেখানে সেখানে মাটি তোলে। জামাকাপড় কেটে একশা করে।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। কিন্তু ওখানকার লোকেরা তাদের মারার জন্য কখনও রুটিতে বিষ মাখিয়ে তাদের যাতায়াতের পথে টোপ হিসেবে ফেলে রাখে না। ইঁদুর ধরার কলও পাতে না।”
ঔপমানবের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “তাহলে?”
“মাদাগাসকারের চাষিরা ওই জংলি গাছগুলির সামনে দাঁড়িয়ে যা করে, ওই গ্রামের লোকেরাও তাই করে। তেড়ে শুধু গালাগালি দেয়। ব্যস। তাতেই নাকি কাজ হয়ে যায়। পরদিন সকালে দেখা যায় আশেপাশের পুকুরে গাদা গাদা ইঁদুর মরে ভাসছে। হাইওয়ের রাস্তায় চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে মরে পড়ে আছে ছোটো থেকে বড়ো নানা মাপের সার সার ইঁদুর।”
“তাই নাকি?”
জবালা বললেন, “হ্যাঁ। লোকে বলে গালাগাল শুনে তারা নাকি অপমান বোধ করে এবং লজ্জায় অভিমানে ‘মানুষ হয়ে ওরা এসব কথা বলছে! ধুর, এ জীবন আর রাখবই না’ মনে মনে ঠিক করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। হাইওয়ে দিয়ে ছুটে আসা গাড়ির তলায় ঝাঁপ দেয়। পুকুরে লাফ মারে।”
“সে কি!”
“শুধু তা-ই নয়। বহু ইঁদুর নাকি শুধুমাত্র উপোস করেও মৃত্যুকে বরণ করে।”
ঔপমানব বললেন, “তাহলে কি ওরা মানুষের ভাষা বোঝে!”
“গাছ যদি বুঝতে পারে…”
“সেটা কী করে হয়! মাদাগাসকারের লোকের ভাষা আর আমাদের সুন্দরবনের লোকের ভাষা তো এক নয়। আমার মনে হয়, শব্দতরঙ্গ। গাছ হোক বা প্রাণী, ওদের ভিতরে এমন একটা জায়গায় গিয়ে আঘাত করে... শুধু শব্দতরঙ্গ বোধহয় নয়। না হলে কে যেন বলেছিল? বলেছিল, না পড়েছিলাম এখন আর মনে নেই। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গেরই কোথায় নাকি বহু শুশুক শুধুমাত্র শোক কিংবা মনোকষ্ট সহ্য করতে না পেরে ডাঙায় উঠে এসে প্রখর রোদে পড়ে থেকে থেকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে।”
অবাক হয়ে জবালা বললেন, “অদ্ভুত তো!”
ঔপমানব বললেন, “তবে এই জার্নালে দেখলাম, প্রাণী নয়, যা না হলে প্রাণী কেন, কোনও উদ্ভিদও বেঁচে থাকতে পারবে না, সেই জলের উপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন এক চিনা গবেষক।”
খেতে খেতেই প্রশ্ন করলেন জবালা, “কী তথ্য?”
“উনি প্রথমে বিভিন্ন জায়গার জল সংগ্রহ করেছিলেন। যেমন সমুদ্রের জল, পুকুরের জল, এঁদো কুয়োর জল, বৃষ্টির জল, ঝরনার জল, নালার জল, বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার, এমনকি চোখের জলও। প্রথমে সমুদ্রের জলকে একইরকম বারোটা পাত্রে সমানভাবে একই পরিমাণে রেখেছিলেন। তারপর অন্যান্য জলকেও সমুদ্রের জলের মতোই ওই একইরকমভাবে বারোটা পাত্রে রেখেছিলেন।”
“তার পরে?”
ঔপমানব বলতে থাকলেন, “তারপর প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা জলের বারোখানা পাত্র থেকে একেকটা করে পাত্র নিয়ে সবরকম জলের একেকটা পাত্রগুচ্ছ তৈরি করেছিলেন। আর প্রত্যেকটা পাত্রগুচ্ছের পৃথক পৃথক নামকরণ করেছিলেন। তারপর সেই নাম অনুযায়ী একেকটা পাত্রগুচ্ছকে বেশ খানিকটা দূরে দূরে ভিন্ন ভিন্ন ঘরে রেখে দিয়ে এসেছিলেন। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে ঘড়ি দেখে কোনও ঘরে গিয়ে ওই পাত্রগুচ্ছের সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন, ধন্যবাদ। কোনও ঘরে গিয়ে বলতেন, বাহ্‌, তুমি কী সুন্দর গো! আবার কোনও ঘরে গিয়ে বলতেন, তুই একটা বদমাশ।
“এর কিছুদিন পরে ভিন্ন ভিন্ন নামের ওই সবক’টা পাত্রগুচ্ছকে উনি একটা হিমশীতল জায়গায় রেখে জমাট বাঁধালেন। আর বিস্ময়কর ব্যাপার হল, উনি দেখলেন, যে জলের পাত্রগুচ্ছকে উনি ধন্যবাদ বলেছিলেন, সেগুলির কেউ সমুদ্রের বিশাল জায়গার জল হলেও, পুকুরের মতো ছোট্ট জায়গার জল হলেও, নালার মতো নোংরা জায়গার জল হলেও ‘ধন্যবাদ’ শুনে শুনে ওই জলগুলি জমাট বাঁধার পরে প্রত্যেকেই পদ্মফুলের মতো আকার নিয়েছে।
“দুঃখ-কষ্ট পেয়ে পেয়ে গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জল হলেও, এঁদো কুয়ো থেকে তুলে আনা দুর্গন্ধযুক্ত জল হলেও প্রতিদিন ‘বাহ্‌, তুমি কী সুন্দর গো’ শুনে শুনে ওই জলগুলি জমাট বাঁধার পরে সুগন্ধী হাসনুহানা ফুলের মতো দেখতে হয়েছে।
“পাশাপাশি, উপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ঝরলেও, পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে ঝরনা হয়ে আছড়ে পড়লেও ‘তুই অত্যন্ত বাজে’, ‘তোকে একেবারে চাবকে মেরে ফেলব’ শুনতে শুনতে ওই জলগুলি জমাট বাঁধার পরে রাগী দানবের মতো কীরকম যেন হিংস্র চেহারা নিয়েছে। দেখলেই ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়। মনে হয় এই বুঝি আক্রমণ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল।”
“তাতে কী প্রমাণ হয়?” জবালা জিজ্ঞেস করতেই ঔপমানব বললেন, “এটাও বুঝতে পারলে না? সামান্য জল, সে যেখান থেকেই আসুক না কেন, তার জন্ম যেভাবেই হোক না কেন, সে যদি ভালো কথা শোনে, ভালো ব্যবহার পায়, আদর-যত্ন পায়, স্নেহ পায়, মমতা পায়, তাহলে সেও আনন্দে থাকে। খুশিতে থাকে। খারাপ মানসিকতার হলেও ভালো হয়ে যায়। আবার তারাই দিনের পর দিন খারাপ কথা শুনতে শুনতে কদাকার বিতিকিচ্ছিরি দেখতে হয়ে যায়।”
“সে নয় বুঝলাম। কিন্তু এর সঙ্গে ক্লাস সেভেনের ওই ছাত্রটাকে আমাদের স্কুলের এই নতুন শিক্ষকের ডাস্টার দিয়ে মারের সম্পর্ক কী?”
“সম্পর্ক নেই?”
বুঝতে  না পেরে  আমতা আমতা করে জবালা বললেন, “না, মানে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না…”
“না বোঝার তো কিছু নেই। এটা তো সহজ ব্যাপার। ভালো কথা শুনলে, ভালো ব্যবহার পেলে সামান্য জলও যদি সুন্দর আকার নিতে পারে, তাহলে যার প্রাণ আছে, যার মন এখনও সেভাবে পরিপক্ব হয়ে ওঠেনি, তাকে ভালো কথা বললে সে ভালো হবে না? হবেই। হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, পড়ার সঙ্গে মারের কোনও সম্পর্ক নেই। তোমার কোনও ছাত্র পড়া পারছে না মানে, তুমি তাকে ঠিকমতো বোঝাতে পারছ না। সেটা তোমার অযোগ্যতা। তোমার অযোগ্যতার জন্য সে মার খাবে কেন? আমার তো মনে হয়, পরীক্ষায় কোনও ছাত্র ফেল করা মানে, সেই অকৃতকার্য হওয়াটা তার নয়, শিক্ষকের।”
“এ কী বলছ?”
ঔপমানব জোর দিয়ে বললেন, “ঠিকই বলছি।”
“কিন্তু দুষ্টুমি করলে?”
“বাচ্চারা দুষ্টুমি করবে না তো কি বড়োরা করবে? কিন্তু তার থেকেও বড়ো কথা, কোনটা দুষ্টুমি আর কোনটা দুষ্টুমি নয়, সেটা বিচার করবে কে?”
জবালা খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন, “কেন? বাড়িতে করলে অভিভাবকেরা, আর স্কুলে করলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা।”
“না। একদম নয়।”
“তবে?”
ঔপমানব বললেন, “ওরাই করবে।”
“ওরা?”
“হ্যাঁ, ওরা। তবে তার জন্য ওদের সঙ্গে শুধু ভালো ব্যবহার করতে হবে। ব্যস, তাহলেই কেল্লাফতে।”
বিস্ময়ভরা চোখে জবালা বললেন, “তাই!”
“তাই নয়, তা-ই। বুঝেছ?”
হাসতে হাসতে জবালা বললেন, “তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছি। এটাও শিখলাম।”
ঔপমানব হো হো করে হেসে উঠলেন।


চোদ্দ


লিলিপুলের ঝুলন্ত সাঁকোটার ওপরে কখনও এখানে কখনও ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ ধরে যে অভিমন্যু জলের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে, ওর খেয়াল নেই। ও শুধু তন্ময় হয়ে দেখছে, উপর থেকে এর তার ফেলা মুড়ি খাওয়ার জন্য বড়ো বড়ো মাছগুলি কীভাবে ঝাঁক বেঁধে বেঁধে আসছে। কখনও কখনও জলের মধ্যে ডিগবাজি খাচ্ছে। খেয়াল হল, যখন আরও কয়েকটা ছেলে ওপাশ থেকে উঠে সাঁকোটাকে জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগল। যারাই এখানে আসে, বিশেষ করে কমবয়সী ছেলেমেয়েরা, সাঁকোটায় উঠেই যার উপরে সাঁকোটা দাঁড়িয়ে আছে, এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত সেই মোটা তারগুলির যেকোনও একটাকে ধরে একটু ঝাঁকিয়ে নেয়। আর ঝাঁকালেই সাঁকোটা দোলে ওঠে। ও-ও তাই করেছিল।
এই লিলিপুলটা ঢাকুরিয়া লেকের মধ্যেই পড়ে। দেশপ্রিয় পার্ক থেকে সোজা লেক স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে লেক গার্ডেন্সের দিকে, এটা তার বাঁহাতে। রোয়িং ক্লাবের গা ঘেঁষে মোরাম বিছানো সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকলেই এই সাঁকো। সাঁকোর ওপাশে ছোট্ট দ্বীপের মতো একখণ্ড জায়গায় একটা মসজিদ।
যারা নতুন প্রেম-ট্রেম করে তারাই সাধারণত এখানে আসে। অভিমন্যুও এসেছে। কারণ, আজ এখানে ওর সঙ্গে সুস্মিতার দেখা করতে আসার কথা।
সেদিন যখন রিকিকে ও চিঠিটা দিয়েছিল সুস্মিতাকে চুপিচুপি দেওয়ার জন্য, যতই ও মুখে বলুক, ‘তোমার কোনও চিন্তা নেই। চাপ নিও না। কাজ হয়ে যাবে।’ তবুও ওর যথেষ্ট সংশয় ছিল, শেষপর্যন্ত কাজটা ও ঠিকঠাক করতে পারবে কি না। কিন্তু ও যে পেরেছিল, সেটা তার পরদিনই ও নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যখন রিকি এসে বলেছিল, “সুমিদি তোমাকে বৃহস্পতিবার দিন লিলিপুলের সামনে দেখা করতে বলেছে।”
সুস্মিতা দেখা করতে বলেছে শুনে আনন্দে ও দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। উদ্দাম নাচতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল রিকিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। এরকম হাজার একটা আবেগ মুহূর্তের মধ্যে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলেও ও নিজেকে কোনওরকমে সামলে নিয়েছিল। মনে মনে বলেছিল, নাহ্‌। রিকিটার সত্যিই এলেম আছে!
তখনই রিকি তাকে বলেছিল, “ভুলো যেও না কিন্তু। বৃহস্পতিবার। আর ক’টার সময় জানো তো?”
“ক’টায়?”
রিকি বলেছিল, “ঠিক তিনটের সময়। তবে একটু দেরি হলেও চলে যেও না কিন্তু, বুঝেছ?”
অভিমন্যু জানে, তিনটে বললেও ও ঠিক তিনটের সময় কিছুতেই আসতে পারবে না। আর বৃহস্পতিবার বলেছে মানে, যেহেতু বৃহস্পতিবার-বৃহস্পতিবার ও বাণীচক্রে গান শিখতে যায়। ও ক্লাস কেটে আসবে। অভিমন্যু জানে, তিনটের সময় ওর গানের ক্লাস। তাই তিনটে বলেছে। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেনি, ওদের ড্রাইভার ওকে বাণীচক্রের সামনে নামিয়ে দিয়ে যতক্ষণ না দেশপ্রিয় পার্কের দিকে গাড়ি রাখতে চলে যাচ্ছে, ততক্ষণ ও ওখান থেকে বেরোতেই পারবে না। আর তাছাড়া, যাতে করেই আসুক, ওখান থেকে এখানে আসতেও তো বেশ কিছুটা সময় লাগবে, নাকি!
আর এখানে আসতে ওর যত দেরি হবে, ঠিক ততটাই কম সময় সে ওকে কাছে পাবে। কারণ, ওকে নামিয়ে যাওয়ার ঠিক দু’ঘণ্টা পরেই ওদের ড্রাইভার ফের ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রত্যেক বৃহস্পতিবারের মতোই আজও নিশ্চয়ই বাণীচক্রের সামনে গিয়ে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে।
সুস্মিতা আজ তার সঙ্গে দেখা করতে আসছে। এটা যতবার অভিমন্যুর মনে হয়েছে, ততবারই সে শিহরিত হয়েছে। তাই গতকাল রাতে সে ঠিকমতো দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সারাক্ষণ ভেবেছে, কখন সকাল হবে, কখন সকাল হবে। সকাল হওয়ার পর ভেবেছে, ওকে কীভাবে প্রোপজ করবে। কীভাবে বলবে, আই লাভ ইউ।
একটা পর একটা ভেবেছে, আর পরক্ষণেই তা বাতিল করে আবার নতুন করে আরেকরকমভাবে ভেবেছে। কীভাবে গুছিয়ে, খুব সুন্দরভাবে তার ভালোবাসার কথাটা বলবে। কিন্তু কিছুতেই মনোমতো জুতসই একটা বাক্যও খুঁজে পায়নি সে। তারপর শেষ অবধি ভেবে ভেবে যখন আর কোনও কূলকিনারা খুঁজে পায়নি, হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে, তখন ভেবেছে, অত ভেবে লাভ নেই। যা হবার হবে, আগে তো যাই। মুখোমুখি দেখা হলে তখন যা মনে হবে, না হয় সেটাই বলব।
কিন্তু তিনটে তো বেজে গেছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। তাহলে কি ওদের ড্রাইভার ওকে শুধু বাণীচক্রের সামনে নামিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ছোটোবেলাকার মতো একেবারে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে? তাই ও আর বেরোতে পারেনি? তাহলে কি ক্লাস শেষ করে ড্রাইভারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ও তার কাছে আসবে? নাকি ড্রাইভারকে কোনও ভুজুং ভাজুং দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে? বলবে, ‘আজ এক্সট্রা ক্লাস নিচ্ছেন স্যার। দেরি হবে। কতক্ষণ লাগবে বুঝতে পারছি না। তুমি বরং বাড়ি চলে যাও। কেউ যদি আবার বেরোয়! গাড়ি না হলে অসুবিধে হবে। শুধু শুধু এখানে গাড়ি আটকে রেখে লাভ নেই। আমাদের বাড়ির ওদিকে তো আমার ক্লাসের আরও অনেক থাকে। আমি ওদের সঙ্গেই না হয় অটো করে চলে যাব। আর তুমি যদি একান্তই যেতে না চাও ঠিক আছে, এখানে তো গাড়ি রাখতে দেবে না, যেখানে গাড়ি রাখো, সেখানে গিয়ে রাখো। কেমন? দু’-আড়াই ঘণ্টা পরে না হয় এসো।’
আচ্ছা, ওদের গাড়ির চালককে ও ঠিক ম্যানেজ করতে পারবে তো?
ওর নানারকম সমস্যা থাকলেও তার কিন্তু কোনও অসুবিধে নেই। সে তো ঠিকই আছে। সক্কালবেলায় উঠেই তৈরি হয়ে নিয়েছে। মাথায় শ্যাম্পু দিয়েছে। অতি সন্তর্পণে নখ কেটেছে। আলমারি থেকে খুঁজে খুঁজে জামাপ্যান্ট বার করেছে। জুতো পালিশ করেছে। বলতে গেলে, সেভাবে দাড়িই ওঠেনি তার। রেখা উঠেছে মাত্র। এর আগে কোনওদিন দাড়িও কাটেনি সে। তবুও আজ এই প্রথমবার সুস্মিতার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে দেখে বাবার রেজার দিয়ে খুব মোলায়েম করে দাড়ি কেটেছে সে।
বেরোবার আগে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে ভক্তিভরে বারবার প্রার্থনা করেছে, যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছে তা যেন সফল হয়। যদিও সে জানে, এসব করার কোনও দরকারই নেই। বাবার কথা অনুযায়ী, ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটের পর থেকেই আজকাল যা হচ্ছে, সবকিছু ভালোই হচ্ছে। এটাও নিশ্চয়ই ভালোই হবে। তবুও মানুষের মন তো! তাই…
সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এটা কী হল! সে তো দুটো বাজার আগেই এখানে চলে এসেছে। আর এখন সাড়ে তিনটে বাজতে চলল, ওর কোনও পাত্তাই নেই! তাহলে কি ক্লাস করার পরেই আসবে? ঠিক আছে, তাই আসুক। না আসার চেয়ে ওটা অনেক ভালো। ও যতক্ষণ না আসে ততক্ষণ না হয় তাকে একটু টেনশনে থাকবে হবে, এই যা। ঠিক আছে। তাই আসুক।
নাহ্‌। রিকির হাতযশ আছে বলতে হবে। কে বলল, ও ওইটুকু ছেলে! ও যে কাজ করেছে, তাতে ও প্রমাণ করে দিয়েছে, ও ছেলে নয়, ছেলের বাবা। মুখে যা বলেছিল, কাজেও তাই করে দেখিয়েছে।
চিঠিটা পাওয়ার পরে সুস্মিতা নাকি রিকির সামনেই ঘরের দরজা বন্ধ করে বারবার পড়েছিল। আর যত পড়ছিল, ততই নাকি খুশিতে ওর চোখমুখ জ্বলজ্বল করছিল। তারপর স্কুলের ব্যাগে চিঠিটা লুকিয়ে রেখে তাকে জানানোর জন্য রিকিকে বলে দিয়েছিল এই দেখা করার দিনক্ষণ।
তাকে দেখা করতে বলেছে মানে সুস্মিতা যে তাকেও মনে মনে চায়, ভালোবাসে, এটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু ও যে এক চিঠিতেই তার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়ে যাবে অভিমন্যু তা কল্পনাও করতে পারেনি। তাই সে আনন্দে আটখানা হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন যেহেতু অত্যন্ত কনফিডেন্সের সঙ্গে রিকি বলেছিল, ‘তোমার কোনও চিন্তা নেই। চাপ নিও না। কাজ হয়ে যাবে। কী খাওয়াবে বলো?’ তাই রিকিকে ও প্রায় জোর করেই টানতে টানতে মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়েছিল। খাইয়েছিল আইসক্রিম, সন্দেশ, সফট ড্রিঙ্ক।
দেখতে দেখতে চারটে বাজতে চলল। কতক্ষণ আর মাছ দেখা যায়! মাছের মুড়ি খাওয়া দেখা যায়! মাছের ডিগবাজি খাওয়া দেখা যায়! যদিও হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেদিকে তাকাচ্ছে, সেদিকেই শুধু সবুজ, সবুজ আর সবুজ। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। উপরে নীল ঝকঝকে আকাশ। এতে মন একেবারে ভালো হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু ওর যেন কিছুই ভালো লাগছে না। বারবার চোখ চলে যাচ্ছে সাঁকোর ওদিকে যেখান থেকে সবাই এখানে ঢোকে।
হঠাৎ ওর মনের মধ্যে কেমন যেন একটা সংশয় উঁকি দিয়ে উঠল। আচ্ছা, ও এই লিলিপুলের কথাই বলেছিল তো? নাকি এই নামে আর অন্য কোথাও কোনও লিলিপুল আছে? না। অন্য কোনও বার নয়, তার স্পষ্ট মনে আছে, রিকি তাকে বৃহস্পতিবারের কথাই বলেছিল। হ্যাঁ, বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার বলেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা এই বৃহস্পতিবারই তো? নাকি সামনের বৃহস্পতিবার? না না, এই বৃহস্পতিবারই। এই বৃহস্পতিবার। আর সময়? যতদূর মনে পড়ছে, হ্যাঁ, ও তো তিনটেই বলেছিল। হ্যাঁ, তিনটেই। তিনটেই তো!
সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তার। এখন মনে হচ্ছে, সেদিন রিকি যখন বলেছিল তখন লিখে রাখলে ভালো হত। তাহলে এখন আর এত ধন্দে পড়তে হত না।
সে যখন এসব ভাবছে, ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এল আজান। সাঁকোর ওই প্রান্তে দ্বীপের মতো ছোট্ট জায়গাটায় যে মসজিদটা রয়েছে, সেদিকে চোখ চলে গেল তার। তার মানে এখন চারটে বাজে!
সে এখানে এসেছে একঘণ্টারও বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু কেন জানি তার বারবারই মনে হচ্ছে, দুয়েক ঘণ্টা নয়, এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে অনেক অনেক অনেক ঘণ্টা। আরও কতক্ষণ সুস্মিতার জন্য যে তাকে অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!
যত দেরিই হোক, সে অপেক্ষা করবে। কারণ, সুস্মিতার জন্য আর্চিজ গ্যালারি থেকে ‘আই লাভ ইউ’ লেখা যে গ্রিটিংস কার্ডটা বড়ো সাধ করে সে নিয়ে এসেছে, সেটা নিয়ে ও আর বাড়ি ঢুকতে পারবে না। যদি মা কোনওরকমে একবার দেখে ফেলে, তাহলে আর রক্ষে নেই। আবার বাড়ি ঢোকার আগে যে সে কোথাও ফেলে দেবে বা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে উড়িয়ে দেবে, তাও প্রাণে ধরে সে কিছুতেই করতে পারবে না। তাহলে!
কিন্তু আর কতক্ষণ? তিনটেয় আসবে বলেছিল। ওকে নামিয়ে ড্রাইভার চলে যাওয়ার পরপরই ও যদি সত্যিই ক্লাস ডুব মেরে রওনা দিত, না, অটো-টটো করে নয়, যদি হাঁটাও দিত, হাঁটা কেন? যদি পিঁপড়ের মতোও গুড়িগুড়ি পা ফেলে আসত, তাহলেও এতক্ষণ অন্তত দশবার ওর এখানে আসাযাওয়া হয়ে যেত। আচ্ছা, রিকিকে ও বলেছে ঠিকই, কিন্তু শেষপর্যন্ত ও আবার সিদ্ধান্ত বদলায়নি তো? ও আসবে তো?
ও আসছে কি না দেখার জন্য সে আবার সাঁকোর ওদিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্র যেন ভূত দেখল সে। দেখল, ওদের পাড়ারই চার-পাঁচজন ছেলে সাঁকোর উপর দিয়ে তার দিকেই হেঁটে আসছে। ও তখন সাঁকোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা সাঁকোয় উঠেছে মানে ওরা ওকে নির্ঘাত দেখেছে। না। এখন চেষ্টা করলেও সরে যাওয়ার কোনও পথ নেই। না এদিকে, না ওদিকে। সরতে গেলেই আরও বেশি করে ওদের নজরে পড়ে যাবে সে। তাই ওদের না দেখার ভান করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল অভিমন্যু। এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল, যেন একমনে মাছ দেখছে সে। আর আড়চোখে দেখার চেষ্টা করতে লাগল, ওরা ওর পিছন দিয়ে ওই মসজিদের দিকে চলে যায় কি না। ও ঠিক করল, ওরা গল্প করতে করতে ওদিকে চলে গেলেই এখান থেকে টুক করে কেটে পড়বে সে।
কিন্তু এতকিছু করেও কোনও লাভ হল না। ওই ছেলেগুলোর মধ্যে থেকে হঠাৎই একজন পিছন থেকে ওর পিঠে টোকা মেরে বলল, “কী রে অভি, তুই এখানে?”
সঙ্গে সঙ্গে ও-ও পিছন ফিরে তাকাল। “ও, তোরা! এখানে? কোথায় যাচ্ছিস?”
“আমরা তো এদিকে প্রায়ই আসি। আজকে স্টেডিয়ামে এসেছিলাম। খেলা ছিল তো। তা, ওরা বলল, চল, এতটা এসেছি যখন লিলিপুলটা একবার ঘুরে যাই। তাই... তা, তুই এখানে কী করছিস?”
“আমি? আমি... মানে, এমনিই। মাছ দেখতে এসেছি।”
ওদের মধ্যে থেকে অন্য আরেকজন বলে উঠল, “মাছ দেখতে, না মছলি দেখতে?”
ওরা দলবেঁধে এখানে এসেছে, এসব কথা বলছে, তাহলে কি ওরা কিছু আঁচ করেছে? কিন্তু ওরা কী বলতে চাইছে ঠিক বুঝতে না পেরে কোনওরকমে ঢোঁক গিলল অভিমন্যু। বলল, “মানে?”
ওর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে ‘মানে’ শব্দটা শুনেই ওরা হো হো করে হেসে উঠল। তারপর একজন প্যান্টের হিপ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে ওর দিকে এগিয়ে দিল। ও সেটা নিয়ে খুলে দেখল, রিকির হাত দিয়ে যে চিঠিটা ও সুস্মিতাকে পাঠিয়েছিল, এটা সেই চিঠি। অবাক হয়ে গেল অভিমন্যু। এটা ওদের হাতে এল কী করে! তাহলে কি সুস্মিতা এই চিঠিটা ওদের দিয়েছে? সর্বনাশ! ওদের হাতে পড়েছে মানে ওরা তো পড়েইছে, পাড়াপ্রতিবেশীরাও কেউ আর বাকি নেই। এর মধ্যে না হলেও, খানিকক্ষণের মধ্যেই তার মাও নিশ্চয়ই জেনে যাবে তার এই কুকীর্তির কথা। এখন উপায়?
অভিমন্যু যখন এসব ভাবছে, তখন ওদের ভিতর থেকেই অন্য আর একটি ছেলে বলে উঠল, “সুস্মিতাও এসেছে।”
সুস্মিতার নাম শুনে এরকম পরিস্থিতিতেও ওর চোখমুখ চকচক করে উঠল। যেন বলতে চাইল, কোথায়? কিন্তু ওকে আর নিজের মুখে কিচ্ছু বলতে হল না। তার আগেই, যেদিক দিয়ে ওরা এসেছে, সেদিকে তাকিয়ে ওই ছেলেটিই চিৎকার করে উঠল, “অ্যাই সুস্মিতা, সুস্মিতা! এদিকে আয়।”
সুস্মিতা! সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে তাকাল অভিমন্যু। দেখল, ঝুলন্ত সাঁকোর উপর দিয়ে হাসতে হাসতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে রিকি।
ও বুঝতে পারল, সেদিন রিকিকে বিশ্বাস করে কত বড়ো ভুল করেছে সে। তার মানে, রিকি নিশ্চয়ই ওই চিঠিটা সুস্মিতাকে দেয়নি। দিয়েছিল এদের হাতে। তারপর এদের পরামর্শমতোই তাকে এসে বানিয়ে বানিয়ে বলেছিল, সুস্মিতা তাকে লিলিপুলে দেখা করতে বলেছে।
ছিঃ। রিকি তার সঙ্গে এত বড়ো বিট্রে করল! এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা! লজ্জায়, দুঃখে, ঘেন্নায় তার মনে হল, এ জীবন সে আর রাখবে না। কিছুতেই রাখবে না। এক্ষুনি এই লিলিপুল থেকেই জলে ঝাঁপ দেবে সে। দেবেই। কিন্তু তার পরেই মনে হল, এতগুলো ছেলের সামনে সে ঝাঁপ দেবে কী করে? কী করে? কী করে?


পনেরো


সক্কালবেলায় নিশিকান্ত এসে ঔপমানবকে বললেন, “কী গো ঔপমানবদা, এখন কেমন আছ? জ্বর ছেড়েছে?”
ঔপমানব পিঠের তলায় বালিশ গুঁজে আধশোয়া অবস্থায় বললেন, “তা ছেড়েছে। তবে একদম কাহিল হয়ে গেছি রে। গায়ে কোনও জোরই পাচ্ছি না। একদিনের জ্বরেই কেমন যেন কাবু করে দিয়েছে। তা, কাল কি গিয়েছিলি?”
“যাব না? উফ্, কাল যা হল! আমার মনে হয়, এরপর কোথাও কোনও অনুষ্ঠান করার আগে কাকে কাকে আমন্ত্রণ জানাবেন তার তালিকা তৈরি করার সময় এই সংগঠনের উদ্যোক্তারা অন্তত হাজার একবার ভাববেন। শুধু ভাববেনই না, তাঁদের ঠিকুজি-কুষ্ঠি জেনে তবেই আমন্ত্রণ পাঠাবেন।”
“কেন রে? কাল আবার কী হল?” ঔপমানব উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন ব্যাপারটা।
একটানা কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে তাঁরও মাঝে মাঝেই বড়ো একঘেয়েমি লাগে। তখন মনে হয়, নাহ্‌, এবার একটু রিল্যাক্সেশন দরকার। আর তাঁর রিল্যাক্সেশন মানে সিনেমা, টিভি বা খেলা দেখা নয়। কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ চুটিয়ে আড্ডা মারা, গল্প করা কিংবা তাঁর সাবজেক্টের বাইরে একেবারে অন্য কোনও বিষয় নিয়ে হালকা আলোচনা করা।
আসলে দিন কতক আগেই প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের চিঠি পেয়েছিলেন ঔপমানব। প্রাণোপ্রিয়া তাঁর খুব ছোটোবেলাকার বন্ধু। এখন ভোল পালটে সবার কাছে প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ হয়ে উঠলেও ওঁর আসল নাম ছিল প্রাণগোপাল নন্দী। মাঝখানে বহুদিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। তবে মাঝে মাঝেই এর তার কাছে খবর পেতেন, উনি এখন গোটা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে জোরদার প্রচার চালাচ্ছেন। যখন তখন উড়ে যাচ্ছেন আমেরিকা, চিন, জাপান, ইংল্যান্ড। ধন্য ধন্য পড়ে যাচ্ছে চারদিকে। যেখানেই উনি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন, সেখানেই শ্রোতারা নাকি ওঁর কথা শুনে এতটাই মোহিত হয়ে যাচ্ছেন যে, আমিষ ছাড়া যাঁদের মুখে এতদিন কিছুই রুচত না, তাঁরাও সেসব ছেড়েছুড়ে ঘাসপাতা খেতে শুরু করে দিচ্ছেন।
ঔপমানব এসব যত শোনেন, ততই অবাক হন। কারণ, প্রাণগোপালকে উনি খুব ভালো করেই চেনেন। তাঁর মনে পড়ে যায় সেসব দিনের কথা।
তখনও ওঁরা হায়ার সেকেন্ডারি দেননি। এই প্রাণগোপালই একবার কালীপুজোর আগের রাতে, যেখানে ওঁরা আড্ডা মারতেন, সেই পোড়ো শিবমন্দিরে বড়ো একটা মুখ বন্ধ চটের ব্যাগ নিয়ে এসে হাজির। ব্যাগের ভিতরে কী যেন খানিক বাদে-বাদেই ছটফট করছিল। জিজ্ঞেস করতেই উনি বলেছিলেন, “পাশের পাড়ার অবনীদা বাড়ি ছিলেন না। সেই সুযোগে পাইপ বেয়ে তাঁর বাড়ির ছাদে উঠে খোপ খোপ করা কাঠের পেটির ছিটকিনি খুলে তাঁর পোষা কতগুলো পায়রাকে চুরি করে নিয়ে এসেছি। আজ রাতে আমরা সবাই মিলে এগুলো রান্না করে খাব।”
“কিন্তু কাটবে কে?” বলতেই উনি বলেছিলেন, “এগুলো আবার কাটার কী আছে? আমি তো আছি।”
সেই রাত্রেই ওই পায়রাগুলোর ঘাড় মটকে, ছাল ছাড়িয়ে ছোটো ছোটো টুকরো করে উনিই কেটে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ হাত লাগালেও মূলত রান্নাটা উনি একাই করেছিলেন। সেদিন এত আনন্দ হয়েছিল যে, সেই রাতের চড়ুইভাতির কথা এখনও ভোলেননি তিনি।
আরেকবার মূলত ওঁরই পাল্লায় পড়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে ‘আমরা বড়ো হয়ে গেছি’ প্রমাণ করার জন্য শুধু সিগারেট ফুঁকেই ওঁরা ক্ষান্ত হননি, এর ওর পকেট হাতড়ে যা জোগাড় হয়েছিল, তাই দিয়েই কয়েক ক্রোশ দূরের হাইওয়ের ধারের একটা পাতি হোটেলে ঢুকে ‘আমরা ওসব জাতপাত মানি না’ জাহির করার জন্য ঘটা করে হাতরুটি আর গরুর মাংস খেয়েছিলেন।
দিনের পর দিন রঙবেরঙয়ের প্রজাপতি ধরে একটা কাচের বয়ামে ভরে রাখতেন প্রাণগোপাল। দিনকতক পরে ওগুলো মরে গেলে সেগুলি ফেলে দিয়ে ফের প্রজাপতি ধরে মরে যাবে জেনেও সেই বয়ামে ভরে রাখতেন।
যিনি এরকম একের পর এক কাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেই প্রাণগোপালই কিনা এখন প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন! আর তাঁর কথা শোনার জন্য পড়াশোনা জানা সমাজের বিদগ্ধ লোকেরা সেখানে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন! কী, হল কী দেশটার!
তাঁর ছেলেবেলাকার বন্ধু সেই প্রাণগোপাল, থুড়ি, প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ বলতে গেলে গোটা পৃথিবী জয় করে দিনকতক আগে দেশে ফিরেছেন। ফিরেছেন এই কলকাতায়। জীবনে সেভাবে কিছুই করতে পারেননি উনি। না ছিলেন লেখাপড়ায় ভালো, না জোটাতে পেরেছিলেন ভদ্রস্থ কোনও চাকরি। তারপর হঠাৎ করেই কোথা থেকে যে কী হল, কাউকে কিছু না জানিয়েই হুট করে উধাও হয়ে গেলেন উনি।
লোকমুখে ঔপমানব শুনেছিলেন, উনি নাকি মাঝেমধ্যেই দেশে ফেরেন। দু’-চারদিন থাকেনও। তারপরেই আবার পাড়ি দেন ভিনদেশে। গোটা বিশ্ব জুড়েই নাকি তাঁর ভক্ত ছড়িয়ে আছে। তা, এতদিন পরে দেশে ফিরে ওঁর বুঝি তাঁর কথা মনে পড়েছে, তাই ঠিকানা জোগাড় করে ওভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু গবেষণা নিয়ে ঔপমানব এখন এতটাই মশগুল হয়ে আছেন যে, তাঁর পক্ষে কোথাও যাওয়া মানেই কাজে বিঘ্ন ঘটা। তাই উনি যেতে পারেননি।
কিন্তু যেহেতু প্রত্যেকের নামে নামে আসন সংরক্ষিত করা, তাই উনি আমন্ত্রণপত্রটা নষ্ট করতে চাননি। দিয়ে দিয়েছিলেন এসব ব্যাপারে যার ভীষণ আগ্রহ, তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন, বিশিষ্ট উদ্ভিদপ্রেমী নিশিকান্ত সামন্তকে।
কার্ডে উল্লেখিত অনুরোধ অনুযায়ী অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক পনেরো মিনিট আগেই প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে পড়েছিলেন নিশিকান্ত। ঢুকেই বুঝেছিলেন, আমন্ত্রণপত্রের অনুরোধ শুধু তিনিই নন, তাঁর মতো সকলেই মেনেছেন এবং আমন্ত্রণপত্রের নির্দেশ অনুসারে কেউই বারো বছরের নিচের কোনও বাচ্চাকে সঙ্গে করে আনেননি। আর যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সম্ভবত সোজা বাড়ি থেকেই এসেছেন। একেবারে ধোপদুরস্ত পোশাকে। যাঁরা এসেছেন, তাঁরা কেউই এলিতেলি নন, প্রত্যেকেই জ্ঞানীগুণী, সমাজের বিশিষ্ঠ একেকজ কেউকেটা। গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে অদ্ভুত এক সুগন্ধি ম ম করছে। ফুলে ফুলে সাজানো চারদিক।
ঠিক ছ’টায় প্রেক্ষাগৃহের সমস্ত আলো নিভে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পর্দাও উঠে গেল। মঞ্চে তখন কারুকাজ করা রাজসিক সিংহাসনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ।
তাঁকে দেখেই সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়ালেন নিশিকান্তও। কিন্তু না। কাউকেই এক মুহূর্তের বেশি দাঁড়াতে হল না। মহারাজের হাতের ইশারায় সবাই যে যাঁর আসনে বসে পড়লেন।
নেপথ্যে শুরু হল জলদগম্ভীর গলায় স্তোত্রপাঠ। তারপর মহারাজকে মাল্যদান। চন্দন পরানো। উত্তরীয় পরানোর পালা। পাশাপাশি তিন মন্ত্রী এবং পাঁচজন মাল্টি-মিলিওনিয়ার ব্যবসায়ীকে প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে ডেকে বরণও করে নেওয়া হল। তাঁদের মধ্যে থেকেই দু’-চারজন সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন। যার মূল বক্তব্য— প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ কত বড়ো মাপের মানুষ। তাঁর উদ্দেশ্য কত মহৎ এবং তিনিই যে স্বয়ং ঈশ্বরের দূত, তা কীভাবে বারবার প্রমাণিত হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
অবশেষে শুরু হল মূল অনুষ্ঠান। প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের ভাষণ। উনি বলতে লাগলেন, “প্রাণীহত্যা মহাপাপ। কেউ কখনও ভুল করেও প্রাণীহত্যা করবেন না। কারণ, এই পৃথিবীতে আপনার যেমন বেঁচে থাকার অধিকার আছে, একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীরও সমান অধিকার আছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার। দেখবেন, বন্যা বা দুর্যোগের সময় চারদিক যখন জলের তলায় তখন একই গাছের ডালে বিষাক্ত সাপ আর নিরীহ মানুষ কী সুন্দর পাশাপাশি অবস্থান করে। কেউ কাউকে উত্যক্ত করে না। ওভাবে থাকুন না। না, কেউ কাউকে হত্যা করবেন না। দুর্বল দেখে আপনি যদি কোনও প্রাণীকে হত্যা করেন, তাহলে আপনার চেয়ে শক্তিশালী কোনও প্রাণী এসে কিন্তু আপনাকে হত্যা করবে। সুতরাং, নো প্রাণীহত্যা। না, মাছ খাবেন না। মাংস খাবেন না…”
ঘোষক আগেই বলে দিয়েছিলেন, মহারাজের বক্তব্যের পরে যদি কারও মনে কোনও প্রশ্ন উঁকি মারে তাহলে তিনি সেটা সরাসরি মহারাজকে করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই অতি উৎসাহী এক শ্রোতা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ থেকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “মাছ খাব না! মাংস খাব না! তাহলে খাব কী?”
এতক্ষণ গোটা প্রেক্ষাগৃহ নিশ্চুপ ছিল। এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন প্রাণোপ্রিয়া মহারাজও। কয়েক মুহূর্তমাত্র। তারপরেই উনি বললেন, “কে বললেন? উঠে দাঁড়ান।”
উনি একথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে একটা হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল। সেই আলোয় চোখ ঘোরাতেই নিশিকান্ত দেখলেন, মাঝামাঝি রোয়ের একটি সিটের সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু ওঁরই নয়, সবার চোখই তখন তাঁর দিকে। কারণ, একটা তীব্র আলোর গোলক তাঁর উপরে পরে আর পাঁচজন থেকে তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। আর তাতেই, প্রশ্নটা যে উনিই করেছেন এবং মহারাজ যে তাঁকেই উঠে দাঁড়াতে বলেছেন, সেটা বুঝতে কারওরই কোনও অসুবিধে হল না।
মহারাজ বললেন, “ওঁকে মাইক্রোফোন দাও।”
কেউ এতক্ষণ খেয়ালই করেননি, গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়েই চার-ছ’টা রোয়ের পরপরই কর্ডলেস মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন উদ্যোক্তাদের লোকেরা। তাঁদেরই একজন তড়িঘড়ি করে তাঁর দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিলেন।
মহারাজ বললেন, “বলুন, কী বলছেন।”
অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে ‘কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না’ ভেবে অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু আলো ঝলমল প্রেক্ষাগৃহে, কানায় কানায় ভর্তি প্রেক্ষাগৃহে, বিশিষ্ট জ্ঞানীগুণীজনদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাওয়াটা যে কত কঠিন কাজ, সেটা বোধহয় এই প্রথম বুঝতে পারলেন উনি। তবুও মহারাজ বলেছেন দেখে বার কতক ঢোঁক গিলে, নিজেকে একটু সামলে নিয়ে লোকটি বললেন, “না, বলছিলাম, মাছ-মাংস যদি না খাই, তাহলে খাব কী?”
মহারাজ বললেন, “কেন? মাছ-মাংস ছাড়া কি আর কিছু খাবার নেই? ফল-মূল-আনাজপত্র ওসব খান!” বলতে বলতে উনি ধর্মের দিকে চলে গেলেন। বললেন, “আমাদের ধর্ম বলেছে, জীবহত্যা মহাপাপ। জীব মানে প্রাণী। প্রাণী মানে কিন্তু শুধু মানুষ নয়। গরু, ছাগল, ভেড়াও নয়। এমনকি আরশোলা, টিকটিকিও নয়। মনে রাখবেন, প্রাণী মানে যার প্রাণ আছে, সে-ই প্রাণী। অর্থাৎ, একটা পিঁপড়েও কিন্তু প্রাণী। সুতরাং, আইনে না বললেও, আমাদের ধর্ম কিন্তু বলেছে, একটা মানুষকে খুন করলে যে পাপ হয়, একটা পিঁপড়েকে খুন করলেও সেই একই পাপ হয়। তাহলে আপনারাই বলুন, অন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজেদের পেট ভরানোর জন্য আপনারা কি সেই পাপ করবেন? না, আমাদের ধর্ম মেনে নিরামিষ খাবেন?”
উনি আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের কথা শুনে লোকটা দমে গেলেও নিশিকান্ত আর স্থির থাকতে পারলেন না। উসখুস করতে লাগল। আর এত লোকের মধ্যেও সেটা নজর কাড়ল মহারাজের। তাই তাঁকে ওরকম করতে দেখে মহারাজ প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি কিছু বলবেন?”
নিশিকান্ত আশেপাশে তাকাতে লাগলেন। কাকে বলছেন একথা!
ঠিক তখনই মহারাজ বললেন, “আপনি আপনি, আপনাকে বলছি। আপনি কি কিছু বলবেন?”
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন নিশিকান্ত। দাঁড়ানো মাত্র সেই তীব্র আলোর গোলকটা ওই লোকটার উপর থেকে ঝট করে তাঁর মুখের উপরে এসে পড়ল। এতক্ষণে হালকা আলোয় চোখটা অনেকখানিই সয়ে এসেছিল। অল্প আলোতেও সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে তীব্র আলোর গোলকটা তাঁর চোখে এসে পড়তেই আশেপাশের সবকিছুই কীরকম যেন অন্ধকার হয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কে যেন তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন একটা মাইক্রোফোন। সেটা মুখের সামনে নিয়ে নিশিকান্ত সরাসরি প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের ধর্ম মানে কোন ধর্ম?”
“আমাদের ধর্ম তো একটাই—হিন্দুধর্ম।”
“ওটা কোনও ধর্মই নয়।”
“হিন্দুধর্ম কোনও ধর্মই নয়!”
মহারাজের মুখ থেকে বিস্ময়ভরা শব্দটা বেরিয়ে আসতেই দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। নিশিকান্তের কানে ভেসে এল টুকরো টুকরো নানা মন্তব্য। কেউ বললেন, লোকটা কে? কেউ বললেন, কে নিয়ে এসেছে একে? কেউ আবার বললেন, ইডিয়েট নাকি?
তবুও তারই মধ্যে নিশিকান্ত দৃঢ় স্বরে বললেন, “না। শুধু হিন্দু কেন? ধর্ম বলে গোটা পৃথিবীতে যা প্রচলিত আছে, সেগুলির কোনওটাই ধর্ম নয়।”
হলের মধ্যে গুঞ্জন আরও বাড়তে লাগল। পিছনের লোকেরা মাথা তুলে, উঁকিঝুঁকি মেরে তাঁকে যেমন দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন, তেমনি সামনের দিকে যাঁরা বসে ছিলেন, তাঁরাও সিটে বসেই যতটা পারা যায় শরীরটা বেঁকিয়ে তাঁকে দেখার জন্য হাঁকপাক করতে লাগলেন। তাঁদের কারও কারও চোখে তখন অপার বিস্ময়—উজবুকটা কে!
আশেপাশের লোকেরা তাঁর কথায় বিরক্ত হচ্ছেন বুঝতে পেরেও এতটুকুও দমলেন না নিশিকান্ত। উলটে মহারাজের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “ধর্ম বলতে আপনি কী বোঝেন?”
খুব ধীরস্থির ভঙ্গিতে মহারাজ বললেন, “ধর্ম মানে, ধৃ যুক্ত মন। মানে, যা ধারণ করে, সেটাই ধর্ম। ধর্মের মূল কথাই হল, সত্য কথা বলো। মানুষকে ভালোবাসো। পরের উপকার করো। বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করো। গুরুকে ভক্তি করো। গরিবদের সাহায্য করো। রোগীদের সেবা করো। মেয়েদের মায়ের মতো দেখো এবং ক্ষমা করো। অর্থাৎ মূল কথা হল— ভালো হতে গেলে একটা মানুষের মধ্যে যে যে গুণ থাকা দরকার, সেটাই ধর্ম। আর হ্যাঁ, এটা শুধু আমাদের ধর্মেরই কথা নয়, পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে, সব ধর্মেরই মূল কথা হল এটা। মানে, মানুষকে যা সঠিক পথে নিয়ে যায়, শান্তি দেয়, ভালো রাখে, সেটাই ধর্ম।”
নিশিকান্ত বললেন, “আমার মনে হয়, আপনি যা বললেন, সেটা শুধু যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিছক একটা কেতাবি বুলিমাত্র। এটা কোনও ধর্ম নয়। ধর্ম সম্পর্কে বহু ব্যবহৃত একটা ব্যাখ্যা মাত্র। আসলে ধর্ম কী জানেন?”
এটা জি়জ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে যিনি ওঁর দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ওই রোয়ের একেবারে ধার ঘেষে যতটা পারা যায় ঝুঁকে মাইক্রোফোনটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। সেটা দেখে মহারাজ বললেন, “নিও না। নিও না। ওঁকে বলতে দাও।”
কিন্তু মহারাজ বললে কী হবে, উদ্যোক্তাদের একজন ততক্ষণে মঞ্চে উঠে নিশিকান্তের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে দিয়েছেন, “আপনি কি জানেন, আপনি কার সঙ্গে কথা বলছেন? গোটা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ভক্ত ছড়িয়ে আছে এঁর। ইনি গোটা পৃথিবী অন্তত একশো বার ঘুরেছেন। ধর্ম নিয়ে প্রচার করেছেন। আর আপনি তাঁকে প্রশ্ন করছেন, ধর্ম কী জানেন! আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
হাতের ইশারায় তাঁকে থামতে বলে নিশিকান্তের উদ্দেশ্যে মহারাজ বললেন, “বলুন, আপনার কাছেই শুনি ধর্ম কী।”
নিশিকান্ত বলতে শুরু করল, “প্রত্যেকের ধর্মই আলাদা।”
“প্রত্যেকের ধর্মই আলাদা!” অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন মহারাজ। প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে আবারও গুঞ্জন শুরু হল। কেউ কেউ বুঝি ফিক করে হেসেও ফেললেন।
তবুও নিশিকান্ত বললেন, “হ্যাঁ। আলাদা। যেমন জলের ধর্ম নিচের দিকে নামা। আগুনের ধর্ম পোড়ানো। আর জীব জগতের ধর্ম হল—খাদ্য এবং খাদকের সম্পর্ক মেনে চলা।
“মানে?”
“মানে একটাই, বড়ো জিনিস সবসময় ছোটো জিনিসকে খাবে। এটাই ধর্ম। এতদিন ধরে যেটা হয়ে এসেছে, সেটাই স্বাভাবিক। এর ব্যতিক্রম হলেই সর্বনাশ। বিপর্যয় নেমে আসবে ধরাধামে। ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। আর তাতেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।”
মহারাজ এবার একটু গলা চড়ালেন। “তা বলে, আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হয়ে জন্মেও মানবধর্ম পালন করব না?”
“কেন করবেন না? করুন। যিনি যেমন তিনি তেমন ধর্ম পালন করুন।”
“কে ঠিক করবে, কার কী ধর্ম?”
“ঠিক করার তো কিছু নেই। যিনি যা, সেটাই তাঁর ধর্ম। যেমন, যোদ্ধার কাছে যুদ্ধই ধর্ম। সাধুর কাছে সন্ন্যাসটাই ধর্ম। ডাক্তারের কাছে রোগীকে সুস্থ করে তোলাটাই ধর্ম।”
“তা বলে অবলা প্রাণীকে আমরা রক্ষা করব না?”
নিশিকান্ত বললেন, “না। যে যেমন সে তেমনভাবেই নিজেকে রক্ষা করবে। এটাই ধর্ম।”
“তা বলে ওই খাদ্য আর খাদকের জোয়ারেই গা ভাসিয়ে দেব? তাদের খাব?”
“না খেলে কী খাবেন?”
মহারাজ বললেন, “কেন? ফলমূল-শাকসবজি…”
“গাছের প্রাণ আছে, এটা আবিষ্কার হওয়ার আগে এসব কথা বললে তাও নয় মানা যেত। কিন্তু এখন মানি কী করে?”
“কেন? না মানার কী আছে?”
নিশিকান্ত বললেন, “আপনি মাছ-মাংস খেতে বারণ করছেন। কাদের খেতে বারণ করছেন? না, যারা ইচ্ছে করলে পালালেও পালাতে পারে। আর কাদের খেতে বলছেন? যারা আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারাক্ষণ অক্সিজেন জুগিয়ে যাচ্ছে, যারা অসহায়, যারা হাজার চেষ্টা করলেও নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়তে পারবে না, তাদের! এটা কি মানা যায়? না, মানা উচিত?”
তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই মাইক স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার হয়ে গেল। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মেশিন বন্ধ হয়ে গেল। শোনা গেল, জেনারেটর খারাপ। চলবে না। গরমে হাঁসফাঁস করতে লাগলেন সবাই। সবক’টা দরজা জানালা হাট করে খুলে দেওয়া হল। কখন কারেন্ট আসবে কে জানে!
দল বেঁধে বেঁধে লোকজন প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে লাগলেন। বেরিয়ে এলেন নিশিকান্তও। নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন, “লোডশেডিং হওয়ার আর সময় পেল না!”
কিন্তু বাইরে বেরিয়ে দেখলেন টিকিট কাউন্টারে আলো জ্বলছে। পাখা চলছে। তার মানে লোডশেডিং নয়!
তখনই ওঁর মনে হল, ওঁর কথার পরিপ্রেক্ষিতে মহারাজ হয়তো যথাযথ কোনও উত্তর দিলেও দিতে পারতেন, কিন্তু উদ্যোক্তারা বোধহয় কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই বিদ্যুৎসংযোগ ছিন্ন করে ওই অপ্রীতিকর অবস্থাটার হাত থেকে অনুষ্ঠানটাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন ওঁরা।
নিশিকান্ত একথা বলতেই হো হো করে হেসে উঠলেন ঔপমানব। নিশিকান্তও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি হা হা করে হেসে উঠলেন।


ষোলো


না। লোকটাকে কিছুতেই বাঁচানো গেল না। দরজা ভেঙে পাড়ার ছেলেরা যখন মাস্টারমশাইকে শতরঞ্চিতে মুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখার ভিতর থেকে উদ্ধার করল, তখন তাঁর শরীরের প্রায় নব্বই শতাংশই পুড়ে গেছে। যদিও তাঁর প্রাণ তখনও ধুকপুক করছিল। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছনোর অনেক আগেই সেটা স্তব্ধ হয়ে গেল।
একটা হতদরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। ছেলেবেলায় দু’বেলা দু’মুঠো ঠিকমতো খেতেও পেতেন না। কিন্তু ওই বয়সেই বুঝেছিলেন, এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার পথ একটাই, আর সেটা হল পড়াশোনা। তাই যত কষ্টই হোক না কেন, বই কিনতে না পারলেও এর তার কাছ থেকে চেয়েচিন্তে বই নিয়ে এসে পড়তেন। পড়তেন খুব সকালে। ঘরে লাইট ছিল না। একটা পয়েন্ট নিলেও বাড়িওয়ালাকে তখন মাসে চার টাকা করে দিতে হত। তাতেও ইচ্ছেমতো লাইট জ্বালানো যেত না। সন্ধে ছ’টায় লাইট দিত। আবার সকাল ছ’টা বাজতে না বাজতেই বন্ধ করে দিত। সকালে বন্ধ করত মানে যে সারারাত জ্বালানো যেত, তা কিন্তু নয়। রাত এগারোটা বাজলেই বাড়িওয়ালা খ্যাচখ্যাচ করতেন, “আর কতক্ষণ লাইট জ্বালাবে গো?”
ফলে ওঁর বাবা লাইট ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই ক্লাস সিক্সে উঠেই তাঁদের বস্তিরই পাশের ঘরের ক্লাস টুয়ের দুটো ছেলেকে পড়ানো শুরু করেছিলেন তিনি। তাদের পড়িয়ে যা পেতেন, তা দিয়ে লাইটের ব্যবস্থা করেছিলেন। না, ভুল করেও কখনও কোনওদিন প্রাণে ধরে পাঁচ পয়সার বনকুলও কিনে খাননি। লাইটের টাকা মিটিয়ে যা থাকত সেটা দিয়ে শুধু খাতা পেন্সিল কিনতেন। না। পেন নয়, কারণ পেনে লিখলে মোছা যায় না। কিন্তু পেন্সিলে লিখলে কাজ মিটে যাওয়ার পরে রাবার দিয়ে মুছে সেটার উপরে আবার লেখা যায়।
বন্ধুবান্ধবেরা বলতেন, উনি ভীষণ কিপটে। হ্যাঁ, উনি একটু কিপটেই ছিলেন। এতটাই কিপটে ছিলেন যে, স্কুলে যখন শিক্ষকতার চাকরি পেলেন, তখনও যেটুকু খরচা না করলেই নয় শুধু সেটুকুই করতেন। বিলাসিতা করা তো দূরের কথা, ঠিকমতো খেতেনও না। তাঁর বারবারই মনে হত, যদি চাকরি চলে যায়! যদি ফের আগের মতো কপর্দকশূন্য হয়ে যান! তাই অন্য জন্যের তো নয়ই, নিজের জন্যও কখনও দুটো পয়সা খরচা করতেন না। সম্ভবত খরচের ভয়েই বিয়ে-থার দিকেও এগোননি। গাড়ি ভাড়া বাঁচানোর জন্য স্কুলের খুব কাছেই ঔপমানবদের ক’টা বাড়ির পরেই খুব সামান্য টাকায় একটা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন।
সেখানেই কোচিং খুলেছিলেন। সকাল থেকে যতক্ষণ পারা যায় একটার পর একটা ব্যাচ পড়াতেন। তারপর কোনওরকমে স্নান করে সোজা স্কুলে। বাড়ি ফিরেই আবার রাত দশটা অবধি টানা টিউশনি। না, তাঁর বাড়িতে রান্নাবান্নার কোনও বালাই ছিল না। তাঁর কাছে রান্নাবান্না করা মানেই তো বাজার করা। আনাজ কাটা। খাবার পরে এঁটো তোলা। বাসন মাজা। গ্যাস বুক করা। সে এক এলাহি ব্যাপার। একার জন্য ওসব করার কোনও মানেই হয় না। ওই সময় বরং এক্সট্রা দুটো ব্যাচ পড়ালে লাভ। বাড়তি ক’টা টাকা হাতে আসবে। আর রান্নাবান্না করতে গেলে যা খরচ, তার চার ভাগের এক ভাগ টাকাতেই দু’বেলা পেট পুরে খাওয়া যায়। তাঁর খাওয়া মানে তো সপ্তাহান্তে দুপুরে কোনও হোটেলে ডাল-ভাত-সবজি, খুব বেশি হলে ডিম-ভাত, নয়তো রোজই সেই ঘুগনি-পাউরুটি, আর তা না হলে আলুর দম-পাউরুটি। এই তো। আর রাতে? স্রেফ জল-মুড়ি।
আসলে ছোটোবেলা থেকে না খেতে খেতে নাকি তাঁর খাবার নাড়িটাই শুকিয়ে গিয়েছিল। না হলে যখন তিনি শুধু কোচিং চালিয়েই যেকোনও বড়ো চাকুরিজীবীর থেকেও বেশি টাকা রোজগার করছেন, তখন তিনি এভাবে জীবন কাটাবেন কেন?
শোনা যায়, তিনি নাকি ব্যাঙ্কে বিশ্বাস করতেন না। সব টাকা ঘরেই রাখতেন। জামাপ্যান্ট ময়লা হলে ধুতেন ঠিকই, কিন্তু কোনওদিন ইস্ত্রি করাতেন না। পাট পাট করে ভাঁজ করে বিছানার তলায় রেখে দিতেন। তবে হ্যাঁ, তিনি নাকি কোনওদিন বিছানার চাদর ধোননি। ময়লা হয়ে গেলে, সেটা আর তুলতেন না। নতুন একটা চাদর কিনে এনে তার উপরেই বিছিয়ে দিতেন। আর এভাবে একটার উপরে একটা চাদর পাততে পাততে সেটা তাঁর বিছানায় পাতা মোটা জাজিমের থেকেও বেশি মোটা হয়ে গিয়েছিল। আসলে কিছু না হলেও, বছরে অন্তত দুটো করে চাদর নিয়ম করে তিনি পাততেনই। কারণ, বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী মেঝের উপরে শতরঞ্চি বিছিয়ে বসলেও, কোনও কোনও ব্যাচে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এত বেশি হত যে নিচে আর কুলোত না। তখন তাদের কেউ কেউ খাটের উপরে গিয়ে বসত।
ঔপমানবের সঙ্গে তাঁর আলাপ দীর্ঘদিনের। প্রথম প্রথম উনি যেমন ঔপমানবের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন, ঔপমানবও মাঝে মধ্যেই যেতেন তাঁর বাড়িতে। একবার কথায় কথায় ঔপমানবকে মাস্টারমশাই বলেছিলেন, “আপনি তো বিজ্ঞানী। কেমিক্যাল-টেমিক্যাল নিয়ে কাজ করেন। কীসব আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন। তা, আমি বলি কী, আপনি এমন একটা কিছু করুন না যাতে বহু লোক আপনাকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেন।”
ঔপমানব হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “কী?”
মাস্টারমশাই বলেছিলেন, “দেখুন, সবাই-ই তো রোজগার করে। কিন্তু সবাই তো আর সব টাকা খরচ করে না। ভবিষ্যতের জন্য কিছু কিছু জমায়ও। সেই জমানো টাকা মৃত্যুর সময়ও কিছু কিছু থেকে যায়। অথচ সেই টাকা তিনি সঙ্গে করে পরপারে নিয়ে যেতে পারেন না। সেগুলি হয় তার বউ-ছেলেমেয়ে ভোগ করে অথবা নিকট আত্মীয়েরা লুটেপুটে খায়। কিন্তু যার কেউ নেই, তার টাকাগুলির কী হবে একবার ভাবুন তো!”
এ কী কথা বলছেন উনি! মাস্টারমশাইয়ের কথা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ঔপমানব। বলেছিলেন, “মানে?”
মাস্টারমশাই তখন বলেছিলেন, “মানে আমি বলতে চাইছি, এটা কেন হবে? যে সারাজীবন ধরে খেটেখুটে কৃচ্ছসাধন করে তিল তিল করে যা সঞ্চয় করলেন, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেটা তাঁর হাতছাড়া হয়ে যাবে কেন? মৃত্যুর সময় তিনি সেটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবেন না কেন?”
“মানে?”
“মানে, যেমন ধরুন, দূরে যারা বেড়াতে যান, তাঁরা তো এখন আর কেউ সঙ্গে করে ক্যাশ টাকা নিয়ে যান না। ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড নিয়ে যান। ওখানে গিয়ে যখন যতটা দরকার, সেইমতো এ.টি.এম থেকে তুলে নেন। কী? তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“কেউ কেউ আবার হাওলার মাধ্যমে এখানকার টাকা অন্য দেশের মুদ্রায় ট্রান্সফার করে সেই দেশে গিয়ে তোলেন।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে যাঁরা জীবনের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওপারে যাচ্ছেন, তাঁরা কেন ওখানে গিয়ে এরকম কোনও সুযোগ পাবেন না?”
ওঁর এরকম অবান্তর কথা শুনে ঔপমানব মজা করে বলেছিলেন, “ঠিক বলেছেন তো! এটা তো আগে ভেবে দেখিনি।”
“এখন ভাবুন। ভেবে একটা রাস্তা বার করুন। না হলে যাঁর তিনকুলে কেউ নেই, তিনি তো আর পরিশ্রমই করতে চাইবেন না। করলেও, যা রোজগার করবেন সবটাই উচ্ছৃঙ্খলভাবে জীবনযাপন করে ইহজীবনেই তা উড়িয়ে দিতে চাইবেন, তাই না?”
সায় দেওয়ার ভঙ্গিতে ঔপমানব বলেছিলেন, “হ্যাঁ, তাই তো।”
“তাহলে?”
ঔপমানব বলেছিলেন, “তাহলে তো এখন একটাই কাজ। ওরকম একটা রাস্তা বার করার জন্য উঠেপড়ে লাগা।”
মাস্টারমশাই সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, “বলছেন?”
ঔপমানব খুব গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “বলছি।”


ঔপমানব সেদিন মজা করেই কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু উনি যে এই কথাটাকে এভাবে সিরিয়াসলি নেবেন, উনি বুঝতে পারেননি। তবে শুনেছিলেন, তারপর থেকেই উনি নাকি কোচিংয়ের ব্যাচ আরও কয়েকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিনরাত এক করে খাটতেন। শুধু তাই-ই নয়, চাল-চিনি-গম লাগে না বলে শুধু এন্ট্রি করার জন্যই তাঁর পরিচিত রেশন দোকানে বছরের পর বছর ধরে যে রেশন কার্ডটা ফেলে রেখে দিয়েছিলেন, একদিন সেটাও নিয়ে নিলেন। শুধু কেরোসিন তেল ধরার জন্য। একটা কার্ডে আর কতটুকু তেল পাওয়া যায়! তবুও সেটাও নিয়ম করে তুলতেন এবং জমাতেন। পাঁচ লিটার হয়ে গেলেই চড়া দামে বিক্রি করে দিতেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, টাকার জন্য পাগলের মতো এভাবে ছোটা কেন?
এই ‘কেন’টাই তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল গতকাল সন্ধেবেলায়। অনেকদিন পর তাঁর বাড়িতে মাস্টারমশাই এসেছিলেন। চেহারা একদম ভেঙে গেছে। ঔপমানব তো প্রথমে চিনতেই পারেননি। দুয়েকটা কথার পরেই উনি বললেন, “কী? কিছু হল?”
ঔপমানব তাঁর কথা বুঝতে না পেরে বললেন, “কী ব্যাপারে বলুন তো!”
উনি বললেন, “ওই যে বলেছিলাম, এ.টি.এম-এর মতো, এখানে রেখে যাওয়া টাকাপয়সা মরার পরেও যাতে ওপারে গিয়ে পাই, তার একটা ব্যবস্থা…”
হো হো করে হেসে উঠেছিলেন ঔপমানব। বলেছিলেন, “সত্যিই, আপনি না…”
“হাসছেন? আপনি ওটা আবিষ্কার না করা পর্যন্ত যে আমি নিশ্চিন্তে মরা তো দূরের কথা, দু’দণ্ড ঠিকমতো ঘুমোতেও পারছি না।”
কথাটা উনি এমনভাবে বলেছিলেন, ঔপমানব বুঝতে পেরেছিলেন, উনি এটা নিয়ে সত্যিই খুব সিরিয়াস। তাই আমতা আমতা করে বলেছিলেন, “ওটার জন্য এখানে যা যা করার সেটার ব্যবস্থা না হয় আমি করলাম। মানে এ.টি.এম কার্ডের মতোই এমন একটা কিছু আপনাকে দিয়ে দিলাম যেটা দিয়ে এখানে রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি ওখানে গিয়ে আপনি তুলে নিতে পারেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি এখানকার ব্যবস্থা করে দিলেও ওপারে গিয়ে সেটা তুলবেন কী করে? ওখানে কি এ.টি.এম-এর মতো কোনও কিয়স্ক বা কাউন্টার আছে, না হাওলার মতো কোনও ব্যবস্থা আছে? আমি ওখানকার ব্যবস্থাও করে দিতে পারতাম। কিন্তু ওখানে তো আমার কোনও জানাশোনা নেই। আমি ওখানকার কাউকে চিনিও না। আপনার আগে আমি ওখানে গেলে না হয় সেটাও করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু আপনার আগে যদি আমি না যাই?”
“এতদিন পর এই কথা বলছেন! আর আমি কিনা আপনার উপরে ভরসা করে বসে আছি!” বিড়বিড় করে কথাটা কোনওরকমে বলে কেমন যেন গুম হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। থম মেরে অনেকক্ষণ বসে ছিলেন। একটিও কথা বলেননি। তারপর আস্তে আস্তে উঠে চুপচাপ হাঁটা দিয়েছিলেন বাড়ির দিকে।
না। তিনি নাকি বাড়ি ফিরে আর একটা ব্যাচকেও পড়াননি। দরজা দেওয়ার আগে একটা কাগজে বড়ো বড়ো করে লিখে দরজার ওপারে সেঁটে দিয়েছিলেন—আমার শরীর খারাপ। তাই আজ আর পড়াব না।
যেসব ছাত্রছাত্রী ওই নোটিশ দেখে ফিরে যাওয়ার আগে খোলা জানালা দিয়ে উঁকি মেরেছিল, তারা দেখেছিল, তাদের মাস্টারমশাই বিছানার উপরে চিত হয়ে শুয়ে আছেন।
উনি কতক্ষণ ওভাবে শুয়েছিলেন কেউ নাকি জানে না। তারপরেই এই কাণ্ড।
পুলিশ এসে ঘরে ঢুকে দেখে খাটের সামনে পড়ে আছে পাঁচ লিটারের একটা জার। তার ভিতরে যে ভর্তি কেরোসিন ছিল, তা স্পষ্ট বোঝা গেল। তখনও ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা চাদরগুলো তুলতে গিয়ে দেখা গেল, চাদরের তলায় পুরো খাট জুড়ে থরে থরে বিছানো টাকার বাণ্ডিল। পুড়ে কালো হয়ে গেলেও সেগুলি যে টাকাই, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
শোনা গেল, জানালা দিয়ে হু হু করে বেরোনো ধোঁয়া দেখেই এবাড়ি ওবাড়ি থেকে ফোন করেছিল দমকলে। কিন্তু দমকলের লোকেরা কখন আসবে তার জন্য অপেক্ষা না করেই পাড়ার ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বালতি বালতি জল নিয়ে। কিন্তু দরজা ভেঙে ওরা যখন ঘরে ঢুকল, বুঝতে পারল, না, আগুন লাগেনি। লাগানো হয়েছে। আর উনি এটা নিজেই লাগিয়েছেন। আর এটা নিছকই একটি আত্মহত্যার ঘটনা। কারণ, ওরা ঘরে ঢুকে দেখেছে, খাটের মাঝখানে উনি পদ্মাসন হয়ে চুপচাপ বসে আছেন। তাঁর সারা শরীর তখনও জ্বলছে। অথচ উনি নির্বিকার। একটু ট্যাঁ-ফুঁও করছেন না।
টুকরো-টুকরোভাবে নানাজনের কাছে শোনা দৃশ্যাবলী পরপর সাজিয়ে ঔপমানবের মনে হল, দোষটা তাঁরই। তিনি ওকথা ওঁকে বলেছিলেন বলেই ওঁর মন ভেঙে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলেন, এতদিন ধরে এত কষ্ট করে তিল তিল করে জমানো টাকাগুলির একটা কণাও মৃত্যুর পরে উনি সঙ্গে করে পরপারে নিয়ে যেতে পারবেন না। তার শোকে তিনি এতটাই পাথর হয়ে গিয়েছিলেন যে, কথা বলার মতো অবস্থাতেও ছিলেন না। হয়তো ভেবেছিলেন, আমি যখন ভোগ করতে পারব না, তখন অন্য কাউকে ভোগ করতেও দেব না। সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়ে যাব। অথবা এটাও হতে পারে, উনি হয়তো ভেবেছিলেন, মানুষ পুড়ে গেলে তো ধোঁয়া হয়ে যায়। টাকাও পুড়ে গেলে ধোঁয়া হয়। দুটো ধোঁয়াই মিলেমিশে এক হয়ে যায়। নিজেকে এবং টাকাগুলিকে যদি একসঙ্গে পোড়ানো যায়, তাহলে ধোঁয়া হয়ে আমি যেখানে যাব, টাকাগুলিও তো ধোঁয়া হয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই যাবে। তাই না? তাই এতদিন ধরে জমানো সমস্ত টাকা বার করে খাটের উপরে থরে থরে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকাগুলির উপরে একটা একটা করে সবক’টা চাদর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর খাটে উঠে বিছানার একদম মাঝখানে পদ্মাসন হয়ে বসেছিলেন। বিক্রি করার জন্য রাখা জার ভর্তি কেরোসিন থেকে কিছুটা নিয়ে বিছানার উপরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপর জার উপুড় করে নিজের মাথায় ঢেলে দিয়েছিলেন বাকিটা। জারিক্যানটা ঘরের ওদিকে ছুড়ে ফেলে খুব শান্ত মাথায় ধীরেসুস্থে দেশলাই জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন খাটে। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল সব।
ঔপমানব জানেন, সব ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাহলে কি তাঁর কেমিক্যাল বিভ্রাটের ফলে মানুষের জীবনে শুধু ভালোই নয়, তার পাশে পাশে এরকম দু’-চারটে খারাপ, অতি খারাপ ঘটনাও ঘটবে! ঘটবেই? একে কি আটকানোর কোনও পথ নেই? নাকি এরকমই একটার পর একটা গণ্ডগোল ঘটতেই থাকবে? কে জানে!


সতেরো


চমকে উঠলেন জবালা। এ কী শুনলেন তিনি! কিছুদিন আগেই ডাক্তার যাঁকে ক্যানসার-ফ্রি সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন, এই ক’দিনের মধ্যেই তাঁর আবার হুট করে সেই রোগ দেখা দেয় কী করে! ডাক্তার আবার অন্য কারও সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি তো? এরকম তো হামেশাই হয়। না, তখনও কোনও চিকিৎসক ভুল করলে তার জন্য তাঁর কাছ থেকে কোনও খেসারত আদায় করার আইনি ব্যবস্থা চালু হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় দু’হাত দূরে দূরে গজিয়ে ওঠেনি ভুঁইফোঁড় নার্সিংহোম। যে ক’টা ছিল, রোগীদের যত্ন করার জন্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যেও কি ফাঁকফোকর ছিল না? ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল না? ছিল। সেরকমই এক নার্সিংহোমে জবালার প্রিয় বন্ধু প্রিয়াঙ্কার স্বামীকে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রিয়াঙ্কার স্বামীর নাম ছিল নরনারায়ণ বসু। তাঁর ছিল হাই ডায়াবেটিস। রক্তে চিনির পরিমাণ এত বেড়ে গিয়েছিল যে, সেটাকে আয়ত্বে আনার জন্যই তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল।
আর ওই একই দিনে ওখানে ভর্তি হয়েছিলেন আরও একজন রোগী। কাকাতালীয়ভাবে তাঁরও নাম ছিল নরনারায়ণ। তবে বসু নন। বিশ্বাস। তাঁর ছিল হাইপোগ্লাইসোমিয়া। নরনারায়ণ বসুর ঠিক উলটো রোগ। তাঁর রক্তে চিনির পরিমাণ এত কমে গিয়েছিল যে, যেকোনও সময় উনি কোল্যাপস করে যেতে পারতেন। তাই তাঁকে ওই নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল যাতে ইঞ্জেকশন দিয়ে তাড়াতাড়ি তাঁর রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
দু’বাড়ির লোকেরাই তাঁদের রোগীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও ডাক্তারদের অসাবধানতায় ঘটে গেল এক ভয়ানক বিপর্যয়। পদবি আলাদা হলেও তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে শুধু নামের মিলের জন্যই, যাঁকে চিনির মাত্রা কমানোর জন্য ইনসুলিন দেওয়ার কথা, ডাক্তার ভুল করে তাঁকে দিয়ে দিয়েছিলেন চিনির মাত্রা বাড়ানোর ইঞ্জেকশন। আর যাঁকে চিনির মাত্রা বাড়ানোর জন্য ইঞ্জেকশন দেওয়ার কথা, তাঁকে দিয়ে দিয়েছিলেন চিনির মাত্রা কমানোর ডোজ। ফলে দু’জনের ক্ষেত্রেই উলটো ফল ঘটেছিল। কয়েক ঘণ্টার আগে পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন দু’জনেই।
ডাক্তারের ভুলে কী না হয়! পরে জানা গিয়েছিল, ডাক্তারদের সাহায্য করার জন্য ওই নার্সিংহোমে যেসব নার্স ছিলেন, তাঁরা ছিলেন আরও এক কাঠি উপরে। তাঁদের পাঁচ শতাংশের যদি নার্সিং ট্রেনিং নেওয়া থাকে, তো বাকি পঁচানব্বই শতাংশেরই সামান্যতম সচেতনতাও ছিল না।
পরে জবালার পরিচিত অন্য এক চিকিৎসক কথায় কথায় তাঁকে একবার বলেছিলেন ওসব নার্সিংহোমের ভিতরকার কথা। কলকাতা কাঁপানো এক নার্সিংহোমের ওই ডাক্তার নাকি একদিন এক নার্সকে একটা নিডল ওয়াশ করে আনতে বলেছিলেন। ডাক্তারি পরিভাষায় ‘ওয়াশ’ মানে স্পিরিট দিয়ে পরিষ্কার করা। এটা সবাই জানেন। কিন্তু ওই নার্স নাকি সেটাও জানতেন না। বেসিনের হাত ধোয়ার জলেই ওটা ধুয়ে নিয়ে এনেছিলেন। ভাগ্যিস ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন। না হলে রোগীর যে কী বিপত্তি হত, সেটা একমাত্র ভগবানই জানেন।
এই তো কিছুদিন আগের কথা। জবালার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তিরুপতিদার বাড়িতে তিরুপতিদার গ্রামেরই ছোটোবেলার এক বন্ধু এসেছিলেন তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। মেশিনে ধান ভানতে গিয়ে কী করে যেন সেই ছেলেটার চোখে ধানের কুড়ো চলে গিয়েছিল। ছেলেটা খুব একটা ছোটো না হলেও অতশত না বুঝেই করকর করছিল বলে চোখ ডলে ফেলেছিল। আর তাতেই ঘটে গিয়েছিল এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড। কুড়োটা নাকি গেঁথে গিয়েছিল তার চোখের মণিতে।
স্থানীয় চিকিৎসকেরা দিনকতক নাড়াচাড়া করে যখন বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা দিনকে দিন খুব খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে, তখন হার স্বীকার করে কলকাতার বড়ো কোনও চোখের ডাক্তারকে দেখাতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই জন্যই নাকি ওই বন্ধু তাঁর ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছেন তাঁর বাড়িতে।
এসে গ্রামের নানা গল্প করতে করতে তিনি বলেছিলেন, “গ্রামের অনেকেই বলছিল, বালিগঞ্জের ওখানে নাকি ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ নামে একটা জায়গা আছে। খুব কম পয়সায় থাকা যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে দিয়েছি, অন্য জায়গায় থাকতে যাব কেন? আমাদের গ্রামের তিরুপতি আছে না! ও তো কলকাতায় থাকে। ওর ঠিকানা আমার কাছে আছে। কলকাতায় গিয়ে আমি যদি অন্য কোনও জায়গায় গিয়ে উঠি, সেটা ওকে অপমান করা হবে না? আর তার থেকেও বড়ো কথা, ও যদি সেটা জানতে পারে, তাহলে কতটা আঘাত পারে বল তো? আমি যার কখনও কোনও উপকার করতে পারিনি, যেচে খামোকা তাকে দুঃখ দিতে যাব কেন? তাই হাওড়া স্টেশনে নেমেই সোজা তোমার কাছে চলে এসেছি। আমাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক না থাকতে পারে, কিন্তু এক গ্রামের লোক তো! একই জল-হাওয়ায় আমরা বড়ো হয়েছি। সে তো আপনার চেয়েও বেশি আপন। কুটুম্বর থেকেও বড়ো কুটুম্ব। তাই না?”
তিরুপতিদা কিছু বলতে পারেননি। অফিসে না গিয়ে সেদিনই তাদের নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতার এক স্বনামধন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে। তিনি নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করে চোখটা ব্যান্ডেজ করে দিয়ে বলেছিলেন, “ও যেন খুব ধীরেসুস্থে চলাফেরা করে। উঁচুনিচু জায়গায় হাঁটাচলা না করে। হোঁচট খেলে কিন্তু মহাবিপদ। তখন শুধু আমি নই, পৃথিবীর কোনও ডাক্তারই আর কিছু করতে পারবে না। আরেকটা কথা, ও যেন ভুল করেও সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা না করে। আর এই ব্যান্ডেজ যেন না খোলে।”
“কেন?” জিজ্ঞেস করতেই সেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ যা বলেছিলেন, তা শুনে শুধু ছেলেটার বাবারই নয়, তিরুপতিদারও চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল। চোখটার শিরাগুলি নাকি দুর্বল হয়ে গেছে। সেজন্য চোখটাও ঠিক আঁটসাঁট নেই। বেশি  নড়াচড়া করলে যেকোনও সময় কোটর থেকে চোখটা খুলে পড়তে পারে।
ডাক্তারের মুখে ওই কথা শুনে ছেলের বাবা তো মূর্ছা যান আর কী। আঁতকে উঠেছিলেন তিরুপতিদাও। ডাক্তারবাবু বলেন কী!
কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে কী করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। এত কম বয়সে একটা ছেলের চোখ এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? এটা কখনও মেনে নেওয়া যায়? চোখে সামান্য একটু ধানের কুড়ো পড়েছে, সেটা নিয়ে এত... না। চুপ করে বসে থাকা যায় না।
চোখ নিয়ে ছেলেখেলা করা যায় না। সে নিজেরই হোক আর অন্যের। তার উপরে ছেলেটা আবার তাঁর গ্রামেরই ছোটোবেলাকার এক বন্ধুর ছেলে যারা বংশপরম্পরায় অন্যের জমিতে ভাগচাষির কাজ করে আসছে। না আছে টাকাপয়সা, না আছে তেমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ। আর না আছে সেরকম কোনও বুদ্ধি। চোখ চলে গেলে খাবে কী? এমন বিপদের দিনে তাদের পাশে না দাঁড়ালে হয়! তাই তার পরদিনই সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগেই বিমানের টিকিট কেটে ছেলেটাকে নিয়ে তিরুপতিদা পাড়ি দিয়েছিলেন চেন্নাই।
ওখানে গিয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থা দেখে শ্রদ্ধায় তাঁর মাথা নত হয়ে গিয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার রোগী এসেছেন সেখানে। সবাই আউটডোরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, যত জনের পিছনে ওঁরা লাইন দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন, আজ তো নয়ই, ডাক্তারেরা শেযপর্যন্ত আজ যাঁদের দেখে উঠতে পারবেন না, তাঁদের যদি পরের দিন দেখানোর জন্য টোকেনও দেন, সেই টোকেনের যে নম্বর তাঁরা পাবেন, সেই নম্বর ধরে দেখাতে গেলেও কাল, পরশু, তরশু কেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেও তাঁদের ডাক আসবে কি না যথেষ্ট সন্দেহ।
তাই কলকাতার হাসপাতালগুলিতে যেসব চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বা দালালেরা টাকার বিনিময়ে আগে ডাক্তার দেখিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়, সেরকম অন্তত একজন দালালের খোঁজ করেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, সাতদিন না হোক, যা লাইন, তাতে যদি তাঁর তিনদিনও লাগে, সেই তিনদিন থাকতে গেলেও তো হেটেলে থাকা খাওয়া এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ-খরচা হবে। তার থেকে কাউকে কিছু টাকা দিয়ে যদি আজই দেখিয়ে নেওয়া যায়, তাতেও তাঁর লাভ।
তিরুপতিদা যখন এসব ভাবছেন, তখনই আউটডোরের গেট খুলে গিয়েছিল। না, একমিনিটও দেরি হয়নি। একেবারে কাটায় কাটায় আটটা তো আটটাই। তিরুপতিদা অবাক। গেট খুলেছে অথচ আগে যাওয়ার জন্য কোনও ধাক্কাধাক্কি নেই। কী ব্যাপার! গেটের মুখে কোনও জটলাও নেই। এমনকি কলকাতার মতো কেউ এসে চেষ্টাও করছেন না লাইনের ভিতরে ঢোকার।
উনি আরও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যখন দেখেছিলেন, গেট খোলার পর থেকেই কেউ আর দু’দণ্ড দাঁড়াতে পারছেন না। ধীরে ধীরে হলেও গুটিগুটি পায়ে একটু একটু করে ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছেন এবং মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই তাঁরা ঢুকে পড়লেন ভিতরে।
ঘর তো নয়, হলঘর। তার মধ্যে অজস্র খুপরি। প্রত্যেকটা খুপরিতেই একজন করে দক্ষ চিকিৎসক। আর দু’জন করে তাঁর সহযোগী। সহযোগী মানে নার্স নন, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীও নন, তাঁরাও বিলেত ফেরত একেকজন নামকরা ডাক্তার।
কোনও রোগীর চোখের সমস্যা ঘোরতর মনে হলেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই হলঘর লাগোয়া আরেকটি বড়ো ঘরে। সেখানে অপেক্ষা করছেন ছ’জনের একটা মেডিক্যাল টিম। তাঁরা শুধু চক্ষু বিশেষজ্ঞই নন, লোকজনেরা বলেন, তাঁরা নাকি চোখের জাদুকর। এমনি যাঁদের চোখ-টোখ খারাপ, তাঁদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। যাঁরা জন্ম থেকেই অন্ধ, ইচ্ছে করলে ওঁরা নাকি ছু-মন্তর করে সামান্য হাতের ছোঁয়াতেই তাঁদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারেন।
না। ওঁদের সেখানে যেতে হল না। ওরকমই খুপরির এক তরুণ ডাক্তার ছেলেটার চোখ দু’-তিন মিনিট দেখেই বাইরে বেরিয়ে এসে তাঁদের বললেন, “খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন। আর কয়েক ঘণ্টা পরে এলে এই চোখ আর ফিরিয়ে দিতে পারতাম না। পোকা ধরে যেত। ওয়াশ করে দিয়েছি। আর চোখের একটা ড্রপ লিখে দিয়েছি। ওটা একফোঁটা করে দিনে তিনবার চোখে দেবেন। টানা সাতদিন। ব্যস। তাহলেই হবে। আর কোনও ভয় নেই, যান।”
“তাহলে আবার কবে আসব?”
“কার জন্য?”
“ওর জন্য।”
“না। ওর জন্য আর আসতে হবে না।”
“আসতে হবে না!”
“না। ওর আর ডাক্তার দেখাবার দরকার নেই। অন্তত চোখের জন্য। তবে আপনাদের কারও দেখাবার দরকার হলে অবশ্যই আসতে পারেন।”
“এই একটা ড্রপেই সেরে যাবে!”
“নিশ্চিন্ত থাকুন।”
“তাহলে কি আমরা কলকাতায় ফিরে যাব?”
“ইচ্ছে না হলে এখানে ক’টা দিন থেকেও যেতে পারেন। জায়গাটা খুব ভালো।”
শুধু তিরুপতিদাই নন, ছেলেটা আর ছেলেটার বাবাও একেবারে হতবাক। কলকাতার ডাক্তারেরা শুধু চোখেরই নয়, খাওয়ারও ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন একগাদা। ওই প্রেসক্রিপশন দেখাতেই এই ডাক্তার ওটা বাতিল করে দিয়ে মাত্র একটা ড্রপ লিখে দিলেন!
ওষুধ কিনতে গিয়ে আরও একবার অবাক হলেন ওঁরা। ওই চিকিৎসক যে ড্রপটা লিখে দিয়েছেন, তার দাম মাত্র আট টাকা!


এই তো এখানকার ডাক্তার আর ওখানকার ডাক্তারদের তফাত। তাহলে কি তাঁর বাবাকে যে ডাক্তার দেখছেন, তিনি ভুল করছেন! একজনের রিপোর্ট আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন? 
জবালা যে অবস্থায় ছিলেন, সেই অবস্থাতেই তড়িঘড়ি ছুটে গেলেন নার্সিংহোমে। গত পরশু খুক খুক করে কাশছিলেন জবালার বাবা। শরীরটাও নাকি খুব দুর্বল দুর্বল লাগছিল। মুখে কোনও রুচি ছিল না। দিনকতক ধরে কিছুই ভালো লাগছিল না তাঁর। কথায় কথায় একথা বলতেই, জবালা বলেছিলেন, “কোনও ইনফেকশন-টিনফেকশন হয়নি তো! শরীরের কোথাও জ্বালা-টালা করছে না তো? সদ্য এত বড়ো একটা অসুখ থেকে উঠেছ। ডাক্তার তখনই বলেছিলেন, সামান্য কোনও সমস্যা হলেই যেন সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জানাই। কিন্তু উনি তো এখন শহরে নেই। কিন্তু উনি নেই দেখেই তো আর চুপচাপ বসে থাকা যায় না। দরকার হলে একটা-দুটো দিন নার্সিংহোমে থেকে না হয় আরও একবার থরোলি চেক-আপ করিয়ে নাও। কী থেকে কী হয় কিছুই বলা যা না। কী বলো?”
বাবা বলেছিলেন, “যেটা ভালো বুঝিস, কর।”
না, আর দেরি করেননি জবালা। সেদিনই বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলেন। গতকাল রাত্রেও সব ঠিকঠাক ছিল। ডাক্তারও গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “না। ভয়ের কিছু নেই।”
অথচ আজ! এ কী শুনছেন তিনি!
ক’দিন আগেই একজন প্রথিতযশা চিকিৎসক যাঁকে ক্যানসার-ফ্রি সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রেই কিনা আজ বলা হচ্ছে, ওই রোগ আবার তাঁর শরীরে ফিরে এসেছে! কী করে হয়!
তাহলে কী যে কেমিক্যাল বিভ্রাটের ফলে একের পর এক ভালো খবর আসছিল, সেই কেমিক্যাল বিভ্রাটের গুণ আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে? আর সেটা ফিকে হয়ে আসছে বলেই কি ওই বিভ্রাটের ফলে যেগুলি খারাপ হতে হতেও ভালো হয়ে উঠেছিল, সেগুলি ফের আগের মতো হয়ে যাবে?
তাহলে কি চড়াই পাখিকে কেউ আর বাঁচানোর চেষ্টা করবে না? ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ড কম্পিউটারের দোহাই দিয়ে এই ক’দিন আগে প্রকাশিত রেজাল্ট বাতিল করে ফের নতুনভাবে প্রকাশ করবে প্রকৃত ফলাফল? আবার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে উপচে পড়বে রোগীদের ভিড়? কারও বাড়িতে কেউ চুরি করতে গেলে গণধোলাইয়ের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর জন্য কেউ কি তাঁর বাবার মতো আর সদয় হবেন না? রাস্তায় কেউ যদি ভুল করেও কিছু ফেলে রেখে আসেন, তাহলে কি কেউ বাড়ি বয়ে এসে সেটা আর ফেরত দিয়ে যাবেন না? ছি ছি ছি!
হঠাৎই বুকের ভিতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল জবালার।


আঠারো


ঔপমানবের ঠোঁট নড়া দেখে একবার নয়, দু’বার নয়, তিন-তিনবার ‘কী গো শুনছ’ বলার পরেও ঔপমানবের যখন কোনও হেলদোল দেখা গেল না, তখন একটু গলা চড়িয়েই জবালা বললেন, “কী গো, কী বিড়বিড় করছ?”
এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন তিনি। তবুও যেহেতু জবালা সচরাচর ওরকম চড়া গলায় কথা বলেন না, তাই জবালার গলা শুনে থতমত খেয়ে ঔপমানব বললেন, “অ্যাঁ? কী? কী হয়েছে?”
“না। কিচ্ছু হয়নি। বলছিলাম, তখন থেকে কী বিড়বিড় করছ?”
“বিড়বিড়! না, ভাবছিলাম, মানুষ যা করে, যদি ভুল করেও করে, সেটা যদি একটু মনে করে রাখে, তাহলে... না। এই পৃথিবীটা আর এরকম হত না। আপাদমস্তক পালটে যেত।”
স্বামীর মুখে এরকম হেঁয়ালি-মার্কা কথা শুনে জবালা বললেন, “মানে?”
“মানে, সেদিন যিনি আমার ল্যাবরেটরিতে ঢুকে গোলাপি রঙের কেমিক্যালের জারটার মধ্যে সবুজ রঙের কেমিক্যালটা মিশিয়েছিলেন, তাঁকে যদি খুঁজেও পাই, আমার মনে হয়, তিনিও বলতে পারবেন না ঠিক কত ফোঁটা সবুজ কেমিক্যাল তিনি ওই কেমিক্যালটার জারে মিশিয়েছিলেন। না। পারবেন না। কিছুতেই পারবেন না।”
“কে কোন জারে কী মিশিয়েছে, সেটা নিয়ে এত ভাবছ কেন বলো তো? ওটা জানার আর কী দরকার? ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটের ফলে আমরা যে সুফল পাচ্ছি, সেটাই কি যথেষ্ট নয়?”
“না। যথেষ্ট নয়। কারণ, এই সুফলটা আমরা আর খুব বেশিদিন পাব না।”
“কেন?”
“কারণ, এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা জিনিসেরই একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে। শুধু জিনিসেরই নয়, এই যে পৃথিবী, এই যে চাঁদ-সূর্য, এগুলিরও একটা এক্সপায়ারি ডেট আছে। না। আমরা সেই দিনক্ষণ এখনও জানতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আমরা জানতে পারিনি দেখেই যে এক্সপায়ারি ডেট নেই, তা তো নয়, আছে। যেদিন এক্সপায়ারি ডেট অতিক্রম করে যাবে সেদিন কিন্তু এই পৃথিবী, চাঁদ, সূর্যই শুধু নয়, এসব জায়গায় যা যা আছে, বা যারা থাকে, তারাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যেমন এক্সপায়ারি ডেটের পর অকেজো হয়ে যায় ওষুধ। স্তব্ধ হয়ে যায় মানুষের জীবন। ঠিক তেমনি, ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটের কার্যকরণের মেয়াদকাল ফুরিয়ে গেলে তার থেকে পাওয়া কোনও সুফল আমরাও আর পাব না।”
“তাহলে তুমি একটা কিছু করো।”
খুব চিন্তিত গলায় ঔপমানব বললেন, “সেটাই তো ভাবছি। ভুল করে যেটা হয়েছিল, সেটাকে কোনওভাবে চার্জ দিয়ে দিয়ে যদি আরও কিছু কাল জিইয়ে রাখা যায়…”
“যদি না যায়?”
“যাওয়ার কথা নয়। তবুও চেষ্টা তো করতে হবে।”
“আমার কিন্তু মনে হয়, তুমি একটু চেষ্টা করলেই পারবে।”
“পারব?”
“অবশ্যই পারবে। তুমি একটা কাজ করো না! প্রথমে অনেকগুলো জার নাও। তারপর ওই জারটায় যতটা গোলাপি রঙের কেমিক্যাল ছিল বলে তোমার মনে হচ্ছে, তার থেকে খানিকটা কম একটা জারে ঢালো। তারপর একটু একটু করে বাড়িয়ে বাকি জারগুলির মধ্যে বিভিন্ন পরিমাণে গোলাপি রঙের কেমিক্যাল ঢালো। তারপর তোমার যতটা মনে পড়ছে, তার থেকে কম দিয়ে শুরু করে একফোঁটা একফোঁটা করে বাড়িয়ে প্রত্যেকটা জারে সবুজ কেমিক্যালটা মেশাও। দেখো না। আমার মনে হয়, একসময় না একসময় তুমি নিশ্চয়ই ওই মিশ্রণের ভাগটা পেয়ে যাবে।”
“সেটা হয়তো পাব। কিন্তু শুধু ওই অনুপাতটা পেলেই তো হবে না।”
“তাহলে?”
“জানতে হবে উনি কখন মিশিয়েছিলেন। ঋতুটা না হয় আমি জানি। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে জানতে হবে তখন আকাশের ঠিক কোন জায়গাটায় সূর্য ছিল। তখন জোয়ার ছিল, না ভাটা। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণটাই বা কত ছিল, ওই অনুপাত জানার সঙ্গে সঙ্গে এগুলি জানাও অত্যন্ত জরুরি।”
“ওগুলির সঙ্গে এগুলির কী সম্পর্ক?”
“সম্পর্ক আছে। গভীর সম্পর্ক আছে। প্রত্যেকটার সঙ্গে প্রত্যেকটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবগুলি একসঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না মিললে হবে না। কিছুতেই হবে না। যেমন চাবি। আপাতদৃষ্টিতে হুবহু একরকম দেখতে হলেও গাঁটের সামান্য একচুল উঁচুনিচুর জন্য সেটা দিয়ে যেমন অন্য তালা খোলে না। ঠিক তেমনই প্রত্যেকটি জিনিস, যত তুচ্ছাতিতুচ্ছই হোক না কেন হুবহু এক না হলে ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটের মতো মিশ্রণ কিছুতেই হবে না।”
“তাহলে উপায়?”
মায়ের কথা শুনে ঘাড় ঘোরাল অভিমন্যু। ঘরের ওদিকে বই নিয়ে সে চুপচাপ বসে ছিল। অথচ কান ছিল এদিকে। আজ তার মনমেজাজ একটু ভালো। নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছে তার। লেকের লিলিপুলের ওই ঘটনার পর তার মন একেবারে তিরিক্ষি হয়ে ছিল। রিকি যা করেছে, তার জন্য এ জীবনে সে ওকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবে না। ওই ঘটনার পর তার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, তার চিঠিটা রিকি নিশ্চয়ই সুস্মিতাকে দেয়নি। দিলে ও দেখা করতই। কাজের মাসির নজর এ়ড়িয়ে দলা পাকিয়ে ওরকম একটা চিঠি তার পায়ের সামনে ছুড়ে দিয়েছে যে, সে তার চিঠি পেলে আসত না!
সে না আসুক, কিন্তু তারপরেও তো যাতায়াতের পথে তার সঙ্গে ওর কতবার দেখা হয়েছে। কোথায়, ওই ব্যাপারে তো ও আর কোনও উচ্চবাচ্য করেনি! ওই প্রসঙ্গ তোলা তো দূরের কথা, একটা কথাও বলেনি তার সঙ্গে। কেন? কেন? কেন? কেন জানতে চায়নি ওই চিঠিটা আমি সেদিন আদৌ তুলেছিলাম কি না, নাকি যেতে যেতে পিছন ফিরে ও আমাকে চিঠিটা তুলতে দেখেছিল? কিন্তু তার পরেও আমার কাছ থেকে কোনও সাড়া পায়নি দেখে ও একদম চুপচাপ হয়ে গেছে! নাকি ভেবেছে, আমি অন্য কাউকে…
দিনকতক ধরেই মাথার মধ্যে এরকম নানান ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই আজ, একটু আগে ওর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হতেই এক বুক সাহস নিয়ে রাস্তার মধ্যে ওকে দাঁড় করিয়ে সে সরাসরি বলেছিল, “তুমি বোধহয় আমার চিঠিটা পাওনি, না?”
ভ্রূ কুঁচকে সুস্মিতা বলেছিল, “চিঠি?”
“হ্যাঁ, চিঠি। তুমি আমাকে যে চিঠিটা দিয়েছিলে, আমি কিন্তু তার উত্তর লিখে রিকির হাত দিয়ে তোমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ও বোধহয় তোমাকে দেয়নি, না?”
“চিঠি!” ওর চোখমুখ দেখে মনে হয়েছিল, সুস্মিতা যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“না। তুমি যে চিঠিটা আমাকে দিয়েছিলে…”
“আমি! চিঠি! তোমাকে! কবে!”
অভিমন্যু মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও ও কিছুতেই মনে করতে পারছিল না। তখন বাধ্য হয়ে সে বলেছিল, “ওই যে তুমি লিখেছিলে—কাক ডিম পাড়ে কোকিলের বাসায় / আমি আছি তোমার চিঠির আশায়…”
“এ মা! ওটা আমি লিখেছি নাকি? ওটা তো আমার ক্লাসের এক বন্ধুকে ওর কোচিংয়ের একটা ছেলে দিয়েছিল। ও এত ভিতু, ওটা পাবার পর থেকে ও থরথর করে কাঁপছিল। চিঠিটা কী করবে সেটা পর্যন্ত বুঝতে পারছিল না। তাই ভয় পেয়ে তখনকার মতো কোনওরকমে বইয়ের ব্যাগে লুকিয়ে ফেলেছিল। স্কুলে এনে আমাকে দেখিয়েওছিল।
“ওর বাবা ওকে স্কুলে দিয়ে যেত। নিয়ে যেত। ওর বাবা এত রাগী যে, কোনও ছেলে ওকে ওরকম চিঠি দিয়েছে জানতে পারলে শুধু ওই ছেলেটাকেই নয়, ওকেও নাকি একেবারে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। তাই ছলছল চোখে আমার কাছে পুরো ঘটনাটা বলেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, ওই চিঠিটাকে নিয়ে ও এখন কী করবে? তখন আমিই ওকে বলেছিলাম, আমাকে দে, আমি ফেলে দেব। কিন্তু স্কুল-বাসে উঠেই বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে এত মশগুল হয়ে গিয়েছিলাম যে, ওটা ছিঁড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দেবার কথাটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। গলির মুখে নামতেই মনে পড়ে গিয়েছিল ওই চিঠিটার কথা। কিন্তু কাজের মাসি সঙ্গে ছিল বলে ওটা আর ছেঁড়ার সময় পাইনি। ক’পা পিছিয়ে কোনওরকমে দলা পাকিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলেছিলাম।”
সুস্মিতার কথায় অভিমন্যু বুঝতে পেরেছিল, সেদিন সুস্মিতা তাকে খেয়ালই করেনি। অথচ ও যখন তার পায়ের সামনে ওই চিঠিটা ছুড়ে ফেলেছিল, তখন ওর চোখের দিকে তাকাতেই তার মনে হয়েছিল, ও বুঝি চোখের ইশারায় বলছে, ওটা তুলে নিতে। ছি ছি ছি... এরকমও হয়!
নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে আর কোনও কথা বাড়ায়নি। আমতা আমতা করে ওখান থেকে মানে মানে সরে পড়েছিল। মনে মনে বলেছিল, ভাগ্যিস তার লেখা চিঠিটা রিকি ওকে দেয়নি। বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছি। দিলে যে কী হত! ছি ছি ছি... নিজেরই নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছিল তার। ঠিক তখনই, মায়ের এই ‘তা হলে উপায়?’ কথাটা তার কানে গেল। আর তাতেই তার মনে হল, তার মা নিশ্চয়ই কোনও সমস্যায় পড়েছেন। যার থেকে বেরোনোর কোনও রাস্তা তিনি পাচ্ছেন না। তাই বাবার কাছে এসেছেন পরামর্শ নিতে। কিন্তু কী সেই সমস্যা? সেটা জানার জন্যই মায়ের দিকে তাকাল সে। কিন্তু বাবা যদি দেখে ফেলেন! তাই ফের বইয়ের দিকে ফিরল সে। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও কান খাড়া রাখল মা-বাবার কথার দিকে।
বাবা কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই হঠাৎ একজন দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “ক্যুরিয়ার আছে।”
ঔপমানব সই করে প্যাকেটটা খুলতেই তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘নেচার্স জার্নাল’। যাঁরা জানার তাঁরা জানেন, এটা পৃথিবী-বিখ্যাত একটি সায়েন্স ম্যাগাজিন। বিজ্ঞান নিয়ে যাঁরা কাজকর্ম করেন, তাঁরা এটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। ঔপমানব এটার গ্রাহক। যখনই এটা আসে, উনি খুলেই সঙ্গে সঙ্গে আগে সূচিপত্রে চোখ রাখেন। নতুন কী বিষয় নিয়ে নিবন্ধ বেরিয়েছে সেটা দেখেন। এটা ওঁর অনেক দিনের অভ্যাস।
কিন্তু আজ সূচিপত্রে চোখ রাখতেই উনি একেবারে চমকে উঠলেন। ওঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। মানুষের তৈরি করা নানারকম দূষণ থেকে এই জল, বায়ু আর যাবতীয় প্রাণকে আগলে রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে তিনি যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটা করতে গিয়ে তাঁর ল্যাবরেটরিতে যেসব ছোট্ট ছোট্ট ভুল হয়েছে, আর তার থেকে বেরিয়ে এসেছে একেকটা নতুন ফর্মুলা। সেগুলি তো তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। যেমন একদিন লিখেছিলেন, টেবিলের উপরে রাখা পার্সটা সকাল থেকেই তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। না, সেদিন বাইরের কেউই তাঁর ঘরে ঢোকেনি। তাহলে কোথায় গেল! তাঁর বাড়ির বহুদিনের পুরনো কাজের লোক হরিহর আবার তুলে রাখেনি তো! এটা মনে হতেই হরিহরকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার পার্সটা দেখেছ নাকি? সঙ্গে সঙ্গে হরিহর বলেছিল, কই, না তো। আমি তো দেখিনি। দ্যাখেন, কোথায় রেখেছেন। আপনার যা ভুলো মন…
সেদিনই অসাবধানতাবশত হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল একটা টেস্ট টিউব। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। টেস্ট টিউবের ভিতরে থাকা তরল কেমিক্যালটা হাওয়ার সঙ্গে মিশে মুহূর্তের মধ্যে উবে গিয়েছিল। ওটা উবে যেতেই অদ্ভুত একটা নোনতা নোনতা বিদঘুটে গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। পৌঁছে গিয়েছিল পাশের ঘরেও। আর তখনই, সেই হরিহরই ও-ঘর থেকে পড়ি কি মরি করে ছুটে এসে বলেছিল, দাদাবাবু, টেবিলের উপর থেকে আপনার মানিব্যাগটা কিন্তু আমিই নিয়েছি। ঔপমানব বুঝতে পেরেছিলেন, এটা আসলে উবে যাওয়া ওই কেমিক্যালটারই কারসাজি।
আরও একদিন ঘটেছিল এরকমই একটি ঘটনা। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া পাড়ারই এক বৃদ্ধ একদিন দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে। কথা বলতে বলতে একটা কেমিক্যাল ড্রপারে তুলে অন্য একটা কেমিক্যালের ফ্লাস্কে পাঁচ ফোঁটা ফেলতে গিয়ে কথায় কথায় ভুল করে ছ’ফোঁটা ফেলে দিয়েছিলেন। আর তাতেই বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো সারা ঘর আলোর ঝলকানিতে দপ করে জ্বলে উঠেছিল। আর তখনই বৃদ্ধ বলেছিলেন, নাহ্‌ বাবা, আমি থাকলেই তুমি কথা বলবে। আর কথা বলতে বলতে কাজ করতে গেলেই ভুল হবে। আমি বরং আজ উঠি। বলেই উনি হাঁটা দিয়েছিলেন। না। যেভাবে এসেছিলেন সেভাবে ঝুঁকে নয়, একজন তরতাজা যুবকের মতোই শিরদাঁড়া টানটান করে লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ঔপমানবের মনে হয়েছিল, ওই কেমিক্যালটা পাঁচ ফোঁটার জায়গায় ছ’ফোঁটা ফেলতেই এটা হয়েছে। তিনি সেটা লিখে রেখেছিলেন ডায়েরিতে।
আরও একদিন ভুল করেছিলেন ঔপমানব। সেদিন মরণাপন্ন তাঁর এক ছাত্র, যাকে ইতিমধ্যেই ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন, সে তার বাবা-মাকে নিয়ে এসেছিল তাঁর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে। এই বয়সেই ছাত্রের এরকম শোচনীয় অবস্থা দেখে উনি এতটাই মুষড়ে পড়েছিলেন যে, যে কাচের ফ্লাস্কটায় একশো ডিগ্রি উত্তাপ দেওয়ার কথা, পাশাপাশি ওরকমই দেখতে অন্য একটা ফ্লাস্ক থাকায় তাতেই তিনি উত্তাপ দিয়ে ফেলেছিলেন। যখন ভুল বুঝতে পারলেন, তার আগেই ঘটে গেল একটি ছোট্ট ঘটনা। উত্তাপ পেয়েই ওই ফ্লাস্ক থেকে হলুদ রঙের একটা ধোঁয়া হু হু করে বেরিয়ে কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশে। না, শুধু তিনি নন, তাঁর ঘরে ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রের বাবা-মা থাকলেও, কারও গলাতেই সামান্যতমও খুশখুশ করেনি। কেউ টেরও পাননি কোনও ঝাঁঝের। শুধুমাত্র ওই ছাত্রটাই কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। পরদিন তার নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষার করার কথা ছিল। করেওছিল। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় সেই রিপোর্ট দেখে ডাক্তারেরা তো একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। মুখ ফসকে একজন তো বলেই ফেললেন, একেই বলে মিরাক্যাল। না, মারণ রোগ তো নয়ই, তার শরীরে সামান্য কোনও সর্দি-কাশিও নেই। এই খবর শুনে থমকে গিয়েছিলেন ঔপমানব। তাহলে কি ভুল করে ওই কেমিক্যালে উত্তাপ দেওয়ার জন্যই এটা ঘটল! ওই উত্তাপ দেওয়ার ফলে হয়তো একটু ঝাঁঝ বেরিয়েছিল। তাঁরা টের না পেলেও যার শরীরে মারণ রোগ বাসা বেঁধেছিল, টের পেয়েছিল সে-ই। আর ওই ঝাঁঝের গুণে শুধু সে-ই কাশতে কাশতে ওই রোগটাকে তখনই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল!
ডায়েরিতে লেখা এরকম আরও অনেক ছোটো ছোটো ঘটনাকে দায়সারাভাবে লিখে নেচার্স জার্নালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ধরেই নিয়েছিলেন কস্মিনকালেও এটা ছাপা হবে না। কিন্তু ওরকম একটা জার্নালে তাঁর লেখা পাওয়ামাত্রই যে এত যত্ন করে ছাপা হবে, এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তাই জবালার দিকে তাকিয়ে ঔপমানব বললেন, “যতই কেমিক্যাল বিভ্রাটের সুফল ফিকে হতে হতে আবার খারাপ দিন ফিরে আসুক, কখনওই সবকিছু খারাপ হতে পারে না। তার মধ্যেও দু’-চারটে ভালো ঘটনা সবসময়ই ঘটবে। ঘটবেই।”
বলতে বলতে আরও বললেন, একদিন প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের মতো গুরুদেবদের সামনে সটান বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ খোলার সাহস দেখাবে নিশিকান্তের চেয়েও ছাপোষা, অতি সাধারণ মানুষ।
এ জন্মে তিল তিল করে জমানো টাকা একদিন হয়তো পরপারে গিয়ে তুলতে পারবেন মৃতব্যক্তিরা। তখন মাস্টারমশাইয়ের মতো আর কাউকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে না।
যে সাংকেতিক চিহ্নগুলি চক্করবক্কর হয়ে সেই কবে থেকে তাঁর চোখের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে, লাফালাফি করছে, উঁকি মেরে পালিয়ে যাচ্ছে, তিনি না পারলেও তাঁর মতো কেউ না কেউ একদিন ঠিকই ওগুলোকে ধরতে পারবে। পায়ে বেড়ি পরাতে পারবে।
“এই কয়েকটা দিনলিপির মাধ্যমে আমি শুধু খানকতক সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আমার বিশ্বাস, কেউ না কেউ এটাকে একদিন ঠিকই এগিয়ে নিয়ে যাবে। কেউ না কেউ নিজের অজান্তেই আবার এরকম আরেকটা কেমিক্যাল বিভ্রাট ঘটাবে। আবিষ্কার করবে নতুন নতুন অনেক কিছু। ভালো কিছু। সেই দিনটার জন্যই এখন শুধু হা-পিত্যেশ করে অপেক্ষা করা। হয়তো সেই দিনটা আমি দেখে যেতে পারব না। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ না কেউ তো দেখতে পাবে। এতেই আমি খুশি। এটা ছাড়া আমি আর কীই বা করতে পারি।” বলতে বলতে হঠাৎ জবালার চোখের দিকে তাকালেন তিনি। বললেন, “কী? চড়াইদের জন্য ছাদে জল দিয়ে এসেছ তো?”
জবালা বললেন, “সে তো অনেকক্ষণ আগেই দিয়ে এসেছি। কিন্তু…”
“কীসের কিন্তু?”
“না। বলছিলাম, তাহলে ওই কেমিক্যাল বিভ্রাটকে চার্জ দিয়ে দিয়ে আরও কিছুদিন জিইয়ে রাখার কী হবে?”
ঔপমানব বললেন, “কী আবার হবে! দেখি চেষ্টা করে। যদি কিছু করতে পারি।”
বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মা-বাবার কথা কান খাড়া করে শুনছিল অভিমন্যু। বাবার কথা শুনে সে মনে মনে বলল, হবে না। হবে না। হাজার চেষ্টা করলেও হবে না। গোলাপি রঙের কেমিক্যালের জারটায় সবুজ রঙের কেমিক্যালটা ছাড়াও আর যে কী কী মিশিয়েছিলাম, তা কি ছাই আমারই মনে আছে? না, মনে থাকার কথা? আমার মনে হয়, আরও অনেক বিভ্রাটের মতো এটাও আরেকটা বিভ্রাট হয়েই থাকবে। কেমিক্যাল বিভ্রাট।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

No comments:

Post a Comment