বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ যা দেখি, যা শুনি, তারই উত্তর খুঁজিঃ (৪র্থ পর্ব) - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়



চতুর্থ পর্ব



লজ্জাবতী গাছের পাতা ছুঁলে নুয়ে পড়ে কেন?


গাছটির বাংলা নাম লজ্জাবতী। আবার কেউ কেউ একে লাজুক লতা বলে। ভারি মজার গাছ। গাছের ছোটো ছোটো পাতাগুলি আলো পেলে খুলে যায়, অন্ধকারে বন্ধ হয়, কিন্তু হঠাৎ ছুঁলে পাতা নুয়ে পড়ে। কেন এমন হয়? কখনও ভেবেছ কি?
লজ্জাবতী গাছের পাতার গোড়ার দিকটা একটু ফোলা থাকে। এর কারণ, পাতার গোড়ায় দিকের কোষগুলি জলে ভর্তি থাকে। এর ফলে গাছের ডাঁটিগুলি সোজা থাকে। কিন্তু হঠাৎ পাতা ছুঁলে অতি মৃদু তড়িৎপ্রবাহ গাছের গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ‘অ্যাসিটাইল কোলিন’ জাতীয় একধরনের রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে এই তড়িৎ প্রবাহিত হয়। এই রাসায়নিক পদার্থ খুব দ্রুত এক কোষ থেকে আরেক কোষে যেতে পারে। এর প্রভাবে পাতার গোড়ার ওই ফোলা অংশ থেকে জল বেরিয়ে বোঁটার দিকে চলে যায়। পাতার কোষগুলিতে জলের ভাগ কমে যাওয়ায় তা কুঁচকে যায় এবং নুয়ে পড়ে। ফোলানো বেলুন থেকে হাওয়া বের করে নিলে হাওয়া-শূন্য বেলুনের যে অবস্থা হয় অনেকটা সেইরকম। লজ্জাবতী গাছের পাতা থেকে হাত সরিয়ে নিলে কিছুক্ষণ পরে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং পাতার গোড়ার দিকের কোষগুলিতে ধীরে ধীরে জল জমতে থাকে, গাছটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং পুনরায় সোজা হয়ে উঠে। যে পাতাটিকে ছোঁয়া হয়, এই প্রক্রিয়াটি শুধু যে তার মধ্যেই ঘটে তা নয়। আস্তে আস্তে তা উপর-নিচে সব পাতাতেই ছড়িয়ে যায় এবং এভাবে সব পাতা নুয়ে পড়ে।


বৃষ্টির জল ছাতার কাপড় ফুঁড়ে আমাদের গায়ে পড়ে না কেন?


ছাতার আচ্ছাদন হিসেবে সাধারণত ঘন বুননের সুতি বা নাইলনের কাপড় ব্যবহৃত হয়। সেই সঙ্গে ওই কাপড়ের গায়ে লাগানো হয় ‘জিঙ্ক সালফেট’ কিংবা সিলিকন যৌগের একধরনের জল নিরোধক জিনিস। তাছাড়া, ছাতার বিশেষ গড়নও আমাদের মাথাকে জলের হাত থেকে রক্ষা করে। ছাতার গড়নটা অনেকটা গম্বুজের মতো হওয়ায় বৃষ্টির জল লম্বভাবে ছাতার কাপড়ের উপর পড়ে না, তেরছাভাবে পড়ে এবং ঢালু গা বেয়ে জল গড়িয়ে যায়।
অনেকের মনে হতে পারে, জলরোধী আচ্ছাদন হিসেবে ছাতায় সুতি বা নাইলনের কাপড়ের পরিবর্তে প্লাস্টিক বা পলিথিনের চাদর ব্যবহার করা উচিত। এতে অনেক বেশি ভালো ফল পাওয়া যাবে। বিজ্ঞানীরা কিন্তু উলটো কথা বলছেন। তাঁদের মতে নিশ্ছিদ্র জিনিসের ভেতর দিয়ে বাতাস বা জলীয় বাষ্প চলাচল করতে পারে না। নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত বাতাসে যে জলীয় বাষ্প থাকে তা বাতাসের চেয়ে হালকা হয়। ফলে তা উপরের দিকে উঠতে চাইবে। সুতোর বুনোটে তৈরি কাপড়ে সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকায় ওই জলীয় বাষ্প ছাতার নিচে জমে না থেকে ছিদ্রপথে বাইরে বেরিয়ে যাবে। প্লাস্টিক বা পলিথিনের চাদরের আচ্ছাদন হলে সেটা হবে না। নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত জলীয় বাষ্প ছাতার নিচে জমতে থাকবে। ফলে ছাতার ভেতরটা উষ্ণ ও আর্দ্র বলে বোধ হবে এবং অস্বস্তি হতে থাকবে।


হাজারকে কখনও কখনও ইংরেজি বর্ণ ‘k’ দিয়ে লেখা হয় কেন?


হাজার টাকা বোঝাতে কেউ কেউ ইংরেজি ‘k’ অক্ষর ব্যবহার করে থাকেন। যেমন, বেতন যদি 35000 টাকা হয় তাহলে লেখা থাকে ‘35k’ টাকা। নিশ্চয়ই জানতে ইছে করছে হাজারের সঙ্গে ‘k’ অক্ষরটি জুড়ে গেল কীভাবে? গ্রিক ভাষায় হাজারের অর্থ বোঝাতে ‘কিলিওই’ ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থাৎ 1000 বোঝানোর জন্য গ্রিকরা ‘কিলিওই’ একক ব্যবহার করত। পরে এই এককটি ফরাসিরাও ব্যবহার করতে শুরু করে। ফারাসিদের হাতে গ্রিক শব্দ ‘কিলিওই’ বদলে হয়ে যায় ‘কিলো’। ক্রমে মেট্রিক সিস্টেমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে ফরাসিরা। কিলোকে 1000 হিসেবে লিখতে শুরু করে। পরবর্তীকালে 1000 লিটার, 1000 গ্রামের পরিবর্তে ক্রমে প্রচলিত হয়ে ওঠে কিলোলিটার, কিলোগ্রাম, কিলোটনের মতো নতুন নতুন শব্দ। কিন্তু দেখা গেল, কিলোলিটার, কিলোগ্রাম, কিলোটন শব্দগুলি বড়ো হওয়ায় সময় বাঁচাতে অনেকে হাজারের জায়গায় ইংরেজি অক্ষর ‘k’ ব্যবহার শুরু করেন। পরবর্তীকালে হাজারের পরিবর্তে ‘k’ লেখা সব দেশেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।



ভিজে গ্লাস কোনও চাকতির উপর রাখলে গ্লাস তোলার সময় সেটা তলায় আটকে থাকে কেন?


ভিজে গ্লাস যখন কোনও চাকতির উপর রাখা হয় তখন গ্লাসের তলা ও চাকতির উপরিতলের মধ্যে আটকে পড়া জল ওই অঞ্চলের সমস্ত বায়ু অপসারিত করে। ফলে চাকতির উপর শুধু ওই জলটুকুর চাপ ক্রিয়াশীল থাকে। চাকতির নিচের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ যদি চাকতিটি ও ওই জলস্তরের মিলিত চাপের (ওজন) চেয়ে বেশি হয় তাহলে চাকতিটি গ্লাসের সঙ্গে আটকে থাকবে। চাকতি একটু ভারী হলে মিলিত চাপ যদি চাকতির নিচের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের চেয়ে বেশি হয় তখন চাকতি গ্লাসের সঙ্গে উঠে আসবে না। এক্ষেত্রে চাকতিটি অত্যন্ত মসৃণ হতে হবে। না হলে, গ্লাস ও চাকতির মাঝখানে কিছু হাওয়ার বুদ্বুদ আটকে থাকবে। তখন চাকতি উঠে আসবে না।


ডিমের কুসুমের রং হলুদ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনও কখনও সেদ্ধ ডিমের কুসুমে কালচে-সবুজ রং দেখা যায় কেন?


কাঁচা অবস্থায় ডিমের কসুমের রং হলুদ। হাফ বয়েল বা পোচ-এর ক্ষেত্রেও কুসুমের রঙের কোনও পরিবর্তন হয় না। কিন্তু পুরো সেদ্ধ ডিমের কুসুমের রং অনেক সময় পালটে যায়। কিছু কিছু অংশ কালচে-সবুজ দেখায়। এর কারণ বেশি তাপ। তাপ বেশি হলে অ্যালবুমিনের অংশবিশেষ বিশ্লেষিত হয়। ফলে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙে যে সালফার ও হাইড্রোজেন বেরিয়ে আসে তা সালফিউরেটেড হাইড্রোজেন নামক যৌগ তৈরি করে। এই গ্যাস ঠাণ্ডা জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। ডিম যখন সেদ্ধ করা হয় তখন কুসুমের মাঝখানটা অন্যান্য অংশের তুলনায় ঠাণ্ডা থাকে। তাই উৎপন্ন গ্যাস সেখানে এসে জড়ো হয় এবং কুসুমে যে আয়রন আছে তার সঙ্গে বিক্রিয়া করে। এই বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন আয়রন সালফাইডের রং কালচে সবুজ। সেদ্ধ ডিমের কুসুমের রং কখনও কখনও কালচে-সবুজ হওয়ার এটাই কারণ।
এই সমস্যা এড়াতে হলে ডিম সেদ্ধ হওয়ার পরেই সেগুলো গরম জল থেকে তুলে ঠাণ্ডা জলে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে খোলাটা তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। এর ফলে কুসুমের তুলনায় খোলার নিচের দিকটা বেশি ঠাণ্ডা থাকবে। ফলে সালফিউরেটেড হাইড্রোজেন গ্যাস কুসুমের দিকে না গিয়ে খোলার নিচের দিকে জমা হবে। মাঝখানে ডিমের সাদা অংশ থাকায় এই গ্যাস কুসুমের আয়রন অণুর সংস্পর্শে আসতে পারবে না। কোনও বিক্রিয়া হবে না। কালচে-সবুজ রংও হবে না।


নিম্নচাপ কেন হয়?


আমরা জানি আমাদের এই গ্রহ অর্থাৎ পৃথিবী দু’ভাবে ঘুরছে – (১) সূর্যকে ঘিরে এবং (২) নিজের অক্ষের চারধারে। পৃথিবীর সঙ্গে উপরের বায়ুমণ্ডলও ঘুরছে। আমরা জানি কঠিন বস্তু সর্বত্র একই সঙ্গে এবং একইভাবে ঘোরে। কিন্তু তরল বা গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থ একই সঙ্গে এবং একইভাবে ঘোরে না। পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডল বায়বীয় হওয়ায় তা সর্বত্র সমানভাবে ঘুরছে না। এছাড়াও সূর্যের তাপের হেরফেরের জন্য বায়ুমণ্ডলের কোনও অংশ অত্যধিক প্রসারিত হয়, আবার কোনও অংশ ততটা হয় না। যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যের তাপ বেশি হওয়ায় সেখনকার বায়ুমণ্ডল বেশি প্রসারিত হয়, আর মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা কম হওয়ায় সেখানকার বায়ুমণ্ডল অপেক্ষাকৃত কম প্রসারিত হয়। এইসব নানা কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিশাল অংশ খণ্ডে খণ্ডে ভাগ হয়ে বিছিন্ন গতিতে পৃথিবীর সঙ্গে ঘুরতে থাকে। এই খণ্ডগুলির কোনোটা ঠাণ্ডা থাকে, কোনোটা গরম থাকে। এখন ঠাণ্ডা হাওয়ার ভাগ যদি গরম হাওয়ার ভাগের পিছনে থাকে তাহলে এই ভাগ দুটির সংযোগতলকে শীতল-অগ্রগামীতল (cold front) বলে। আর উলটোটা হলে অর্থাৎ, গরম বায়ুমণ্ডলের ভাগ যদি ঠাণ্ডা বায়ুমণ্ডলের ভাগের পিছনে থাকে তাহলে তাদের সংযোগতলকে উষ্ণ-অগ্রগামীতল (Warm front) বলে। এই ধরনের তল তৈরি হলে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়। সাধারণত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেই এইধরনের তল বেশি উৎপন্ন হয়ে থাকে। তাই নিম্নচাপের দরুন ঝড়-ঝঞ্ঝা এই অঞ্চলগুলিতেই বেশি হয়ে থাকে। শীতল-অগ্রগামী তল সাধারণত মেরুর দিক থেকে আসে। তাই এর সম্মুখকর্ষী তলকে অনেক সময় মেরু-আগততলও (Polar front) বলা হয়। কখনও কখনও একই সময়ে ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ-অগ্রগামীতল উত্তরদিকে সরতে থাকে। এবার এই দুটি বিপরীতমুখী বায়ুমণ্ডলীয় অংশের মধ্যে যদি সংঘর্ষ হয় তাহলে তাদের সংঘর্ষতল বরাবর আবর্তন গতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে সেই অঞ্চলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সাধারণত শীতল-অগ্রগামী তলের গতি উষ্ণ-অগ্রগামী তলের গতির চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তাই একসময় শীতল-অগ্রগামী তল উষ্ণ-অগ্রগামী তলকে অতিক্রম করে এবং তাকে ঘিরে ফেলে। এই অবস্থায় দুটি বায়ুমণ্ডলের অংশ ঘুরতে থাকে। মাঝখানে থাকে উষ্ণ-বায়ুমণ্ডলের অংশ আর তার চারপাশে থাকে শীতল বায়ুমণ্ডলের অংশ। এরকম অবস্থায় মাঝখানের উষ্ণ-বায়ুমণ্ডল কিছুটা উপরের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু চারপাশে শীতল বায়ু থাকায় ঐ উৎক্ষিপ্ত উষ্ণ বায়ু ঘনীভূত হতে শুরু করে। এর ফলে মেঘের সৃষ্টি হয়। পরে তা আরও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।


আকাশে মেঘ থাকলে বেশি গরম লাগে কেন?


গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে আমাদের চারপাশের আবহাওয়া যখন গরম হয়ে ওঠে তখন আমাদের অস্বস্তি হয়, গরমে হাঁসফাঁস করতে থাকি। আকাশে মেঘ করলে সূর্য মেঘের আড়ালে চলে যায়। সূর্যের প্রখর কিরণ এসে গায়ে পড়ে না। তখন স্বস্তি বোধ হওয়ার কথা। কিন্তু হয় উলটোটা। গরম যেন বেড়ে যায়। এর কারণ, দিনেরবেলায় সূর্যের যে তাপ মাটিতে এসে পড়ে প্রথমে মাটি তা শুষে নেয়। পরে নানা মাপের তরঙ্গের আকারে তা বিকিরণ করে। এটা চলতে থাকে বেশ রাত অবধি। আকাশে মেঘ থাকলে ওই বিকীর্ণ তাপের তরঙ্গগুলি ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের গায়ে ধাক্কা খায়। ছোটো মাপের তরঙ্গগুলি মেঘ ভেদ করে চলে গেলেও বড়ো মাপের তরঙ্গগুলি যেতে পারে না। সেগুলি পুনরায় মাটির দিকে ফিরে আসে। এই ফিরে আসা বিকীর্ণ তাপ মেঘ ও মাটির মধ্যেকার বায়ুমণ্ডলে আটকে থাকে। এর ফলে মাটির কাছাকাছি বায়ুর স্তর ঠাণ্ডা তো হয়ই না, বরং বেশ গরম হয়েই থাকে। এতে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার উষ্ণতা বেড়ে যায়। ফলে গরম বেশি লাগে।
বর্ষাকালে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। তখন শরীরের ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না। কারণ বায়ুতে আগে থেকেই অত্যাধিক জলীয় বাষ্প থাকায় নতুন করে আর বাষ্প ধারণ করতে পারে না। আমাদের দেহে যে তাপ উৎপন্ন হয় তা শরীর থেকে বের হয় ঘামের মাধ্যমে। যেহেতু এই সময় ঘাম বাষ্পীভূত হতে পারে না তাই শরীরের তাপও বের হতে পারে না। বর্ষাকালে বা আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে আমাদের অস্বস্তি লাগার এটাও একটা কারণ।


(চলবে)

No comments:

Post a Comment