গল্পঃ মঈষাসুরের ইক্কুলঃ অনুষ্টুপ শেঠ



তোমরা মঈষাসুরকে চেনো তো?
অ্যাঁ সে কি! চেনো না মানে! ওই যে বছর বছর দুগ্গা মায়ের সঙ্গে ত্রিশূলের খোঁচা খেতে আসে গো। ওই যে, সবুজ রঙের, মাথায় দুটো শিং?
সেই মঈষাসুর একদিন বায়না জুড়ল, সেও ইউনিফম পরে, কাঁধে ব্যাগ হাতে বোতল নিয়ে ইক্কুল যাবে। ফ্ল্যাটবাড়ির রিঙ্কু, সায়ন, মিঠাই, পাশের দোতলা বাড়ির ঝুমুদিদি আর রুমুদিদি, ওদিকের গলির মোহন সবাই যেমন যায়, তেমনি।
বললেই তো আর হয় না! কোথায় তেমন স্কুল যা মঈষাসুরের মতো ছাত্র পড়াতে পারবে? এদিকে তো সে ঘ্যান ঘ্যান করে করে দুগ্গা মা, লক্ষ্মী-সরস্বতী-কাত্তিক-গণুবাবা সবার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, আমি ইক্কুল যাবো, আমি ইক্কুল যাবোওওওওওও!
একদিন হল কী, দুগ্গা মা রান্না করছে আর মঈষাসুর পায়ে পায়ে ঘুরছে তার বায়না নিয়ে; এমন জ্বালাতন করেছে না, ভুল করে দুগ্গা মা ধোকার ডালনায় গরম মশলার বদলে শুক্তোর মশলা দিয়ে ফেলেছে! সে যে কী কেলেঙ্কারি ব্যাপার! তখন শিবশঙ্কর আর থাকতে না পেরে নন্দী-ভৃঙ্গীকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছেন, “যা তো রে, একে যেখানে যে স্কুলে জায়গা আছে দেখবি সেখানেই ভর্তি করে দিয়ে আয়।”
মঈষাসুরের তো মনে খুব ফুর্তি। ইক্কুল যাবো, টিপিং খাবো! তাড়াতাড়ি চান সেরে, চুল-টুল আঁচড়ে, সাদা জামা কালো পেন্টু পরে, মাথায় সবুজ টুপি দিয়ে তৈরি। টুপি কেন? বা রে, নইলে শিং দেখে বাকি ছেলেপিলেরা ভয় পাবে না? স্যার-দিদিমণিরাই বা কী বলবে!
এদিকে সরস্বতী ছোটোবেলার একটা স্কুল-ব্যাগ ঝেড়ে মুছে এনে তাতে মলাট দেওয়া সাদা খাতা, লাইন টানা খাতা, চৌকো খোপ কাটা খাতা, রাফ খাতা, ড্রইং খাতা সব গুছিয়ে দিয়েছে। কার্তিক তার প্রিয় পেন্সিল বক্সটাতে পেন্সিল রবার-কল সব ভরে দিয়েছে, রং পেন্সিলের নতুন বাক্সটাও দিয়ে দিয়েছে। দুগ্গা মা তাড়াতাড়ি করে টিফিন বাক্সে চাউমিন ভরে দিয়েছে। গণেশ আবার চুপি চুপি তার পাশে দুটো লাড্ডুও রেখে দিয়েছে। লক্ষ্মী জলের বোতল ভরে, ব্যাগে রুমাল আর স্কুলের পর হজমিগুলি কিনে খাবার জন্য পাঁচটা টাকা দিয়ে দিতেই সব রেডি। চলল মঈষাসুর নন্দী-ভৃঙ্গীর হাত ধরে ইক্কুল করতে।
কৈলাশ থেকে কলকাতা তো বহুদূর। আসতে আসতে হাঁপিয়ে গেছিল ওরা। তাই পিচ রাস্তা ছেড়ে নন্দী টপ করে একটা আম-কাঁঠালের বাগানের ছায়ায় ছায়ায় শর্টকাট করে নিয়ে যাচ্ছিল ওদের। ও মা, যেই না মস্ত বাগানটা পেরিয়ে আবার লালমাটির আঁকাবাঁকা রাস্তায় পা রেখেছে, অমনি দেখে সামনে একটা লম্বা একতলা সাদা বাড়ি। বাড়ির সামনের বড়ো সবুজ মাঠে স্লিপ, দোলনা, ঢেকুচকুচ, আর মাঠের ধার বরাবর কত রঙের যে ফুল ফুটেছে তার লেখাজোকা নেই। বাড়িটার লাল টুকটুকে জানালা-দরজা, সেসব জানালা দিয়ে গুনগুন করে পদ্যপাঠ কি নামতার সুর ভেসে আসছে, আর গেটের উপর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘সহর্ষপুর আদর্শ বিদ্যালয় – শিক্ষা সকলের জন্য’।
আর পায় কে! অমনি নন্দী আর ভৃঙ্গী মিলে সেই ইক্কুলের হেডস্যারকে ধরে মঈষাসুরকে ভর্তি করিয়ে দিল। কথাবার্তা বলে ঠিক হল, ক্লাস ফাইভে বসবে মঈষাসুর। সে ক্লাসের দিদিমণিকে ভারি গাবলু-গুবলু মিষ্টি দেখতে, ঠিক যেন একটা মাসিমণি। কিন্তু সব বেঞ্চিই তো ভর্তি, বসবে কোথায়?
দিদিমণি নিয়ে গেলেন ডানদিকের ধারের তিন নম্বর বেঞ্চিতে। দুটো টিংটিঙে ছেলেমেয়ে বসে ছিল সেটাতে। তাদের মধ্যিখানে জায়গা করে মঈষাসুরকে বসিয়ে দিয়ে দিদিমণি আবার পড়াতে শুরু করলেন। যদিও দিদিমণি খুব ভালোই পড়াচ্ছিলেন, মঈষাসুরের তো অভ্যেস নেই, সে যত চেষ্টা করছে মন বসাতে, তত চোখ আর মন চলে যাচ্ছে জানালার বাইরের গাছপালা পাখি-পাখলা আকাশের দিকে। কত্তখানি নীল রং!
ওদিকে জানালার বাইরের আরেকজনও কিন্তু মন দিয়ে মঈষাসুরকে দেখছিল। দেখছিল না বলে শুঁকছিল বলাই ভালো, কারণ যদিও আজ ইক্কুলে আসবে বলে সাফসুতরো হয়ে, মুখে সাবাং দিয়ে এসেছে, আসলে তো মঈষাসুর কৈলাসের হি-হি ঠাণ্ডায় আদ্ধেকের বেশি দিন চান করে না! খালি বাথরুমে জল ছিটিয়ে, গামছাটা পরিপাটি করে ভিজিয়ে পালিয়ে আসে। ঠাণ্ডায় ঘাম হয় না বলে কেউ টের পায় না, কিন্তু এইখানে সমতলে গরমে বেশ একটু ঘেমে যাচ্ছে কিনা, তাই তার মঈষাসুর-মঈষাসুর গন্ধটা জানালার ধারের পেয়ারাগাছটায় বসা কুবোপাখিটাকে খুব খিদে পাইয়ে দিচ্ছে।
নাহ্‌, আর থাকা গেল না। ঠিক জানালার সামনে ডানার ঝাপট মেরে কুবোপাখি উড়ে পালাল দূরের আমবাগানে। অমনি পেয়ারাগাছের আগে সে যে প্রাণভরে নদীর ধারের নাম না জানা আগাছার ক্ষেতে ঘুরে এসেছিল, তার ডানাভর্তি লেগে থাকা সেই আগাছার গুঁড়ো গুঁড়ো পরাগরেণু সোঁ করে জানালা দিয়ে ক্লাসের মধ্যে ঢুকে গেল একদম।
হ্যাঁয়াঁয়াঁয়াঁয়াঁচ্চচ্চছো!
মঈষাসুরের ডানদিকের ছেলেটা বিকট এক হাঁচি দিয়েছে রে। একদম মঈষাসুরের মুখের ওপর। ঈস! মুখ পুরো ঘুরিয়ে বসে মঈষাসুর। ছেলেটা দু’মিনিট পরপর হেঁচে যেতেই থাকে। দিদিমণি খুব বিব্রত হয়ে পড়েন। “ও অয়ন, তোর হল কী রে! শরীর খারাপ করছে নাকি?”
অয়ন উঠে দাঁড়িয়েও পরপর তিনটে হাঁচি দেয়, তারপর বলে, “হ্যাঁ দিদি, কীরকম সব হচ্ছে মনে হচ্ছে...”
কী মনে হচ্ছে সে আর জানা যায় না কারণ তারপর সে হাঁচতেই থাকে, হাঁচতেই থাকে। দিদিমণি অস্থির হয়ে ওঠেন। “না বাবা, তুই আজ বাড়ি চলে যা তাহলে।”
বলামাত্র অয়ন বইখাতা ব্যাগে পুরে দে দৌড়।
দিদিমণি সবে আবার পড়ানো ধরেছেন, অমনি ‘হিঁইইইচ্চো!’
এই দ্যাখো কাণ্ড, মঈষাসুরের বাঁদিকের মেয়েটাও হাঁচি শুরু করল যে! শুধু সে-ই নয়, মাঝের সামনের বেঞ্চের ছেলেটা আর পিছনের বাঁদিকের বেঞ্চের দুটো মেয়েও পাল্লা দিচ্ছে তার সঙ্গে।
“হিঁচ্চো!”
“হ্যাঁছছো!”
“ফিঁচ!”
দিদিমণি তাদেরকেও বাড়ি যেতে বললেন। তারপর আবার বোর্ডে ফিরে গিয়ে পরিবেশের উপর বনভূমির প্রভাব ধরলেন।
দু’পাশে দু’জন উঠে যাওয়ায় মঈষাসুর এখন মনের আনন্দে হাত-পা খেলিয়ে, বাবু হয়ে পা তুলে বসেছিল একদম। দিদির পড়ানো শুনছিল আর মন দিয়ে খাতায় একটা কেঠো কেঠো ডালপালাওলা জঙ্গল আঁকছিল। বেশ করে একটা ললিপপের মতো দেখতে গাছের গায়ে আঁকড়ি কাটছে, হঠাৎ দিদি তাকেই পড়া ধরে বসলেন যে!
“অ্যাঁ! মানে, আমি তো মানে, ইয়ে, হচ্ছে কী…”
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যখন ঘামছে আর তোতলাচ্ছে মঈষাসুর, তখনই ওর নাকের মধ্যে কেমন যেন সুড়সুড় করে উঠল। টাকরার কাছটা কেমন চুলকোতে লাগল। সারা গায়ে শিহরন খেলে যেতে লাগল। তারপর…
“আহ-হাহ-হ্যাঁঁচ্চ-চ্চোওওও!”
সে যে কী আসুরিক হাঁচি তোমায় কী বলব! সারা বাড়ি কেঁপে উঠল থরথর করে, ঘণ্টাটা ঢং করে বেজে গেল, জানালার কাচ পড়ল খসে, ব্ল্যাকবোর্ডে চিড় ধরে গেল।
তারপর আবার। আবার। আবার।
জলের স্রোতের মতো হাঁচি আসছে তো আসছেই! সারা স্কুল ধোঁয়ায় ভরে গেল।
মঈষাসুরের হাঁচির পালা থামলে, ধোঁয়া সরে গেলে দেখা গেল স্কুলবাড়ির ছাত-জানালা-দরজা সব খসে পড়ে গেছে, সব ব্ল্যাকবোর্ড ভেঙে চৌচির, ঘণ্টা দড়ি ছিঁড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর দিদিমণি-স্যাররা সব কেউ ছুটে পালিয়েছেন, কেউ টেবিলের নিচে ঢুকেছেন, ছেলেপিলেরা তো কখন পালিয়ে মাঠে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর হেডস্যার স্বয়ং অজ্ঞান হয়ে গেছেন।
অগত্যা স্কুল গেল অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি হয়ে যদ্দিন না আবার স্কুলবাড়ি সারানো হয়। সব্বাই যে যার বাড়ি চলে গেল। আর মঈষাসুরও নন্দী-ভৃঙ্গীর কাছে কানমলা খেতে খেতে কৈলাশ ফিরে চলল। তারপর যে কী হল তার, সে আবার পরের গল্পে বলব।

_____
অঙ্কনশিল্পীঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

1 comment:

  1. গল্পটার আগাপাঁচতলা এত কিউটনেসে ভরা যে আর কিছু বলার থাকে না। দারুণ লাগল। খুব মিত্তি গল্প।
    আঁকাটাও খুব সুন্দর।

    ReplyDelete