গল্পঃ ম্যান অব দ্য ম্যাচঃ সৌরভকুমার ভূঞ্যা


অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল তরুণ। তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে নীলেশরা বেশ ভয় পেয়ে যায়। সারা ঘরে এক অস্বস্তিকর থমথমে ভাব। যেন একটা শোকের পরিবেশ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাঠে নামার আগেই হেরে বসে আছে দলটা। ভাবনাটাও অমূলক নয়। দলের প্রধান খেলোয়াড় বাসবের কোনও পাত্তা নেই। বাসবকে ছাড়া মাঠে নামা মানে জেতার আশা ছেড়ে খেলতে নামা। ঈশ্বরপুর হাই স্কুলের মতো শক্ত টিমের বিরুদ্ধে জিততে গেলে বাসব ছাড়া যে স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয় সেটা নীলেশরা ভালো করেই জানে। গোটা দলটার মুষড়ে পড়ায় তাই অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়।
নীলেশের খুব খারাপ লাগছিল আবার রাগও হচ্ছিল। একে সে দলের ক্যাপ্টেন, তার ওপর বাসব তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। অথচ সেই তার ফোনই বাসব তুলছে না। দুপুর থেকে কতবার যে ফোন করেছে তার ঠিক নেই, কিন্তু নো রেসপন্স। এমন কেয়ারলেস বাসব হবে সে কল্পনা করতে পারেনি, তাও ফাইন্যাল ম্যাচের আগে। এখন মনে হচ্ছে ওকে ছাড়াটাই ঠিক হয়নি। বাড়িতে আনন্দ করতে গিয়ে ম্যাচের কথা মাথা থেকে উবে গেছে।
পায়চারি থামিয়ে তরুণ নীলেশের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। বিরক্তি আর ক্রোধ-মাখা সুরে বলে, “বাসবকে ফোন করেছিস?”
“অনেকবার করেছি, স্যার। রিং হচ্ছে, কিন্তু ও তুলছে না।” কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দেয় নীলেশ।
“ননসেন্স!”
“স্যার, হয়তো কোনও সমস্যা হয়েছে।”
“সেটা তো জানানো যায়।” একটু থেমে একরাশ বিরক্তির সুরে বলে, “কোনও সমস্যা নয়। বাড়িতে অনুষ্ঠান। তাতেই মজে গেছেন বাপু। খেলার কথা কি আর মাথায় আছে? আমারই বোকামি হয়েছে। ওকে যেতে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।”
রাগ, হতাশার পাশাপাশি একটা আফসোসও ঝরে পড়ে তরুণের গলায়।
তরুণের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইন্যাল ম্যাচে আজ ঈশ্বরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ। দলটা খুবই শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে জিততে গেলে বাসবকে দরকার। ফাইন্যাল ম্যাচের আগে তাকে কিছুতেই ছাড়ার ইচ্ছে ছিল না তরুণের। কিন্তু গতকাল বাসবের জন্মদিন ছিল। গত পরশু তার বাবা এসেছিলেন নিয়ে যাওয়ার জন্য। তরুণ প্রথমটা রাজি হয়নি। কিন্তু বাসবের বাবা কথা দেন, খেলার দিন সকাল সকাল বাসব স্কুলে চলে আসবে। অগত্যা না ছেড়ে কোনও উপায় ছিল না।
গজরাতে গজরাতে বাসবকে গালাগাল করছিল তরুণ। বাসব নীলেশের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাকে গালাগাল করায় নীলেশের খুব খারাপ লাগছিল। মিনমিন করে বলে, “স্যার, চিন্তা করবেন না। বাসব নেই তো কী হয়েছে। আমরা স্কুলকে জেতাব।”
কথাটা বললেও তার গলায় আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট বোঝা যায়। তরুণ ক্রুদ্ধ স্বরে বলে, “জেতাব! কী করে জেতাবি শুনি? গোল কে করবে? ফাইন্যাল পর্যন্ত ম্যাচে বাসব ছাড়া আর কেউ গোল করতে পেরেছিস?”
সত্যি তাই। তাদের দলে বাসব ছাড়া গোল করার লোকের অভাব। তাছাড়া বাসব একাই অর্ধেক লোড নেয়। সেটা কে নেবে? বাসব ছাড়া জেতা প্রায় অসম্ভব। নীলেশ কিছু বলতে পারে না। তরুণ গলায় আগের সুর বজায় রেখে বলে, “জিততে গেলে গোল তো চাই। গোলটা কে করবে? তুই? খেলিস তো ডিফেন্সে। গোল বাঁচালে তো আর ম্যাচ জেতা যাবে না! মুখে বড়ো বড়ো বাতেলা!”
স্যারের কথায় খুব খারাপ লাগে নীলেশের। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। সত্যিই তার ক্ষমতা নেই দলকে জেতানোর। তাই অপমানটা সহ্য করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। বাসবের ওপর খুব রাগ হয় তার। তার কারণেই সকলের সামনে এমন কথা শুনতে হল। স্থির করে বাসব ফিরলে ওকে আচ্ছা করে শুনিয়ে দেবে। তরুণ গজগজ করতে থাকে।

ম্যাচ শুরু হতে সবে মিনিট কুড়ি বাকি। এমন সময় দেখা যায় হন্তদন্ত হয়ে বাসব আসছে। সবার মধ্যে খুশির শিহরন বয়ে যায়, কিন্তু তা ক্ষণিকের। বাসবের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে সবাই। দেখে তার মাথায় ব্যান্ডেজ।
“কী হয়েছে তোর?” রাগ ভুলে উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করে তরুণ।
“স্যার, বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লেগেছে। নার্সিংহোমে যেতে হয়েছিল। তাই সকালে আসতে পারিনি। কাউকে কোনও খবর দিতে পারিনি।”
“ভেরি স্যাড।”
“এখন ঠিক আছি স্যার। আমি খেলব।”
“মাথা খারাপ!” বাধা দেয় তরুণ। “এই অবস্থায় মাঠে নামা উচিত নয়।”
“আমি ঠিক আছি। আমার কোনও সমস্যা হবে না।”
“অসম্ভব। এই অবস্থায় তোকে আমি মাঠে নামাতে পারি না। তাতে যদি আমরা নাও জিততে পারি কোনও ক্ষতি নেই।”
বাসব খেলার জন্য জিদ করতে থাকে, কিন্তু তরুণ কিছুতেই রাজি হয় না। নীলেশের মন চাইছিল বাসব খেলুক। বাসব মাঠে থাকলে আলাদা একটা বল পাওয়া যাবে। কিন্তু তার অবস্থা দেখে স্যারের কথাই ঠিক মনে হয়। তাই বাসব তাকে স্যারকে বোঝানোর জন্য বললেও নীলেশ রাজি হয় না।
বাসবকে ছাড়াই নীলেশরা মাঠে নামে। বাসব মাঠের পাশে মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। প্রথমার্ধের খেলা গোল শূন্যভাবে শেষ হয়। পুরো খেলায় ঈশ্বরপুরের প্রাধান্য থাকলেও নীলেশরা দুটো সুযোগ পেয়েছিল গোল করার। নীলেশ নিশ্চিত বাসব মাঠে থাকলে ওর থেকে একটা গোল অবশ্যই হত।
দ্বিতীয়ার্ধের পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল খেয়ে যায় নীলেশরা। গোল খেয়ে তারা তেড়েফুঁড়ে আক্রমণ করতে থাকে। কিন্তু গোল-লাইনে গিয়ে সব খেই হারিয়ে যায়। একাধিক সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারে না। সময় গড়ায়। আর কুড়ি মিনিট খেলা বাকি। নীলেশ বোঝে বাসবকে দরকার। ওদিকে বাসবও মাঠে নামার জন্য ছটফট করছে। নীলেশ স্যারকে অনুরোধ করে, “স্যার, বাসবকে নামান। নাহলে আমরা জিততে পারব না।”
“কিন্তু…”
“স্যার, আমি পারব।” বাসব তাগাদা দেয়।
মন না চাইলেও শেষপর্যন্ত মত দেয় তরুণ।

আরও দশ মিনিট কেটে যায়। নীলেশদের ওপর আরও চেপে বসেছে বিপক্ষ দল। নীলেশ বুঝতে পারে আবেগের বশে সিদ্ধান্তটা একেবারেই ঠিক হয়নি। একেকবার মনে হয় এগারো জন নয়, তারা দশজনে খেলছে। আসলে বাসব কিছু করতে পারছে না। মনের জোরে মাঠে নামলেও শরীর সায় দেয় না। গোল করা দূরে থাক, ঠিকঠাক পায়ে বলই আনতে পারছে না। একটা এমন সহজ গোলের সুযোগ মিস করে যা কল্পনাও করা যায় না। শ্যামল বক্সের মধ্যে একটা পাস বাড়ায়। সামনে একা গোলকিপারকে পেয়েও পায়ে-বলে লাগাতে পারে না বাসব। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে। নীলেশ বোঝে আঘাতের জন্য মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না বাসবের। আড়চোখে একবার স্যারের দিকে তাকায় নীলেশ। বুঝতে পারে খুব রেগে আছেন। বাসবকে চেঞ্জ করার কথা বলবে কি না যখন ভাবছে তখনই বাসব দৌড়ে আসে তার কাছে।
“নীলেশ, প্রবলেম হচ্ছে। আমার পক্ষে গোল করা সম্ভব নয়।”
“স্যারকে বলব চেঞ্জ করে দিতে?”
“না না!” আঁতকে ওঠে বাসব। “ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি মাঠ ছাড়ছি না। একটা কাজ কর।”
“কী?”
“তুই ফরোয়ার্ডে যা। আমি তোর জায়গায় থাকছি।”
“আমি! ফরোয়ার্ডে! তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি পারব না। তার থেকে রজত বা শ্যামল কাউকে তুলে দে। তুই মিড ফিল্ডে থাক।”
“আমার তোকে দরকার।”
“মানে?”
“কী মানে মানে করছিস! যা বলছি তাই কর না। তুই লম্বা। তোর পায়ে জোরও আছে।”
“কিন্তু আমি কোনেওদিন ফরোয়ার্ডে খেলিনি।”
“কোনও সমস্যা হবে না। যা বলছি তা কর। না হলে আমরা জিততে পারব না।”
নীলেশ কিছুতেই ফরোয়ার্ডে খেলতে চায় না। কিন্তু বাসব একপ্রকার জোর করে তাকে পাঠিয়ে দেয়।
নিজের খেলায় নিজেই কেমন চমকে ওঠে নীলেশ। সবসময় সে ডিফেন্সে খেলে এসেছে। ফরোয়ার্ডেও যে সে এত ভালো খেলতে পারে তা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বাসবের থেকে কোনও অংশে খারাপ খেলে না সে। বাসবের অভাব বুঝতে দেয় না। তার অসাধারণ ড্রিবলিং, পাসিং-এ বিপক্ষের বক্সে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়ছে বিপক্ষের বক্সে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অসাধারণ হেডে গোল করে নীলেশ। বাসব সাবাশি জানায়। নীলেশের মধ্যে অদ্ভুত একটা শক্তি ভর করে যেন। সহসা মনে পড়ে স্যারের খোঁচাটা, ‘কে গোল করবে? তুই?’ নীলেশের চোয়াল দৃঢ় হয়।
মাঠে উত্তেজনা। দু’দলের মধ্যে চিন্তা, কী হয়, কী হয়। খেলা শেষ হওয়ার মিনিট দুই আগে একটা কর্নার পায় নীলেশরা। রজত কর্নার নেয়। ওদের গোলবক্স থেকে বল ক্লিয়ার হয়ে বেরিয়ে আসে। ছোটো বক্সের একটু উপরে দাঁড়িয়ে ছিল নীলেশ। ক্লিয়ার হওয়া বলটা এমন জায়গায় আসে যে ছুটে গিয়ে সেটা ধরা সম্ভব ছিল না নীলেশের পক্ষে। হাফ-চান্স এবং সম্ভবত শেষ সুযোগ। মরিয়া নীলেশ বাসবের কায়দায় শরীরটা শূন্যে ভাসিয়ে অসাধারণ একটা ব্যাক-ভলি মারে। তারপর সারা মাঠ ফেটে পড়ে উল্লাসে।
নীলেশ বেশ বিভ্রান্ত। জীবনে প্রথমবার এমন কিক মারল সে। এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। বেশ হতচকিত অবস্থা তার। একটু পরে খেলা শেষ হয়ে যায়। বন্ধুদের কাঁধে চেপে মাঠের বাইরে আসে নীলেশ।
তরুণের খারাপ লাগছিল। ছোট্ট করে ‘সরি’ বলে নীলেশকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আনন্দে নীলেশের চোখে জল এসে যায়। ম্যান অব দ্য ম্যাচের সম্মান পায় নীলেশ।

ড্রেসিংরুমে পোশাক বদলাচ্ছিল নীলেশরা। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে তরুণ ঢোকে। চোখে মুখে উত্তেজনা। “নীলেশ! বাসব...”
“ও বাথরুমে স্যার। ডেকে দেব?”
“কাকে ডাকবি?”
“মানে!” নীলেশ একটু বিভ্রান্ত।
“ঘন্টা দুই আগে বাসব মারা গেছে।”
ঘরের মধ্যে যেন বজ্রপাত হয়। এক নিষ্ঠুর নিস্তব্ধতা গ্রাস করে। ঘরে পিন পড়লেও শোনা যাবে। কেউই স্যারের কথা বিশ্বাস করতে পারে না। নিজেকে সামলে নীলেশ বলে, “স্যার আপনি কী বলছেন! আপনার কোনও ভুল হচ্ছে।”
“কোনও ভুল নয়। এইমাত্র বাসবের বাবা ফোন করেছিলেন। আজ সকালে বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় বাসব। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ডাক্তারদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ঘন্টা দুই আগে সে মারা যায়।”
নীলেশ থ। বাকি সবারও তাই অবস্থা। বিহ্বলতা কাটিয়ে বাথরুমের কাছে যায় নীলেশ। ব্যস্ত হাতে খুলে ফেলে দরজাটা। কিন্তু কোথায় বাসব! বাথরুম ফাঁকা। চমকে ওঠে নীলেশ। তার সারা শরীরে একটা ভয়ের শিহরন বয়ে যায়।
সহসা একটা ভাবনা উত্তেজিত করে তুলে নীলেশকে। শেষ পনেরো মিনিট সে যে খেলাটা খেলেছে সেটা পুরো বাসবের মতো। এখন বুঝতে পারে, সে নয়, খেলাটা আসলে বাসবই খেলেছে। বুঝতে পারে কেন বাসব তাকে জোর করছিল ওপরে ওঠার জন্য। সে বাসবের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাই তাকে দরকার ছিল বাসবের। অশরীরী হয়ে নিজে সরাসরি কিছু করতে পারেনি বাসব। তাই তার আত্মা নীলেশের মধ্যে ঢুকে খেলাটা খেলেছে।
অদ্ভুত একটা অনুভব গ্রাস করে নীলেশকে। বাসব শুধু স্কুলের কথাই ভাবেনি, পাশাপাশি স্যারের করা অপমান থেকে তাকে মুক্ত করেছে। নীলেশ বোঝে, সে নয়, আসল ম্যান অব দ্য ম্যাচ বাসব। ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় তার চোখদুটো ছলছল করে ওঠে।

_____

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment