গল্পঃ রূপকুমারঃ মৃণালকান্তি সামন্ত




ভূতের নাম রূপকুমার! তাই কখনও হয়? কিন্তু মধুমতীর ভূতের নাম তো সেটাই। অনেক আগে ঠাম্মার কাছে রাজারানি থেকে রূপকুমার কাঞ্চনকুমারী অনেকরকম গল্পই শুনেছে মধুমতী। বড়ো মাসিমণির কাছেও দুয়েকটা। আবার টিভিতেও ক’টা। সেখানে রাজার ছেলের নাম রূপকুমার। বিশাল রাজপ্রাসাদে আদরে আহ্লাদে তাদের বেড়ে ওঠা। রাজা মারা গেলে সিংহাসনে বসা থেকে পটাপট আশেপাশের রাজ্যজয়। অপরূপ সুন্দরী রাজকুমারী আসে সে রাজকুমারের জন্য। রাজকুমারীর চুল বাঁধা থেকে সবরকম সাজানোর দায়িত্বে থাকে দাসদাসী। রংতুলি দিয়ে কাগজে ছবি আঁকার মতো গল্পের কথারা যেন ছবি এঁকে দিয়েছে মধুমতীর ভিতর। কিন্তু ভূতের নাম যে কীভাবে রূপকুমার হয়ে গেল, নিজেই তো জানে না মধুমতী।
রাত তখন কতটা গভীর কে জানে! খুট করে একটা শব্দে বোধহয় ঘুমটা ভেঙেই গেল। চোখ খুলতেই চমকে উঠল মধুমতী। ওর পায়ের দিকে খাটের কিনারা-ছোঁয়া আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূর্তি! ভয়ে চোখ বুজেই ফেলল। কিন্তু কতক্ষণ না দেখে থাকবে? সরু ফালি করে চোখ খুলে ফেলল আবার। নাইট ল্যাম্পের আলোয় পিটপিট করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
মূর্তিটা মানুষের মতোই। কিন্তু পুরোপুরি মানুষও নয়। আধা-মানুষ বলা যেতে পারে। টিঙটিঙে রোগা লম্বা। জীর্ণশীর্ণ। তবুও সুন্দর মুখখানি। টানা টলটলে চোখ। টিকালো নাক। পুরুষ্টু গোঁফ। গায়ে আবার ঝকঝকে রাজপোষাক! কপালে রাজতিলক। কোমরের খাপে তরবারি। মাথায় মুকুট। কোনও যাত্রা-ফাত্রায় পার্ট করতে করতে পালিয়ে আবার চুরি করতে এসেছে নাকি? নিশ্চয়ই ওদের বাড়ির রেন-পাইপ বেয়ে দোতলায় উঠে এসেছে। আশ্চর্য! ভয়টা একটু একটু করে যেন ছেড়ে গেল মধুমতীকে। তখন চোখ পুরোপুরি খুলে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল। কিন্তু এই অবস্থায় ওর কী করণীয় সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। লোকটা চোর নাকি ভূত, সেটাই ঠিক করে উঠতে পারছে না। যেটাই হোক, বাড়ির দরজা-জানালার বাধা সরিয়ে লোকটা আলমারির সামনে চলে এসেছে? আর যাই করুক, ওকে মোটেই ছেড়ে কথা বলবে না মধুমতী। উচিত শিক্ষা দিতেই হবে ব্যাটাকে। পাশ ফিরে ঠাম্মাকে ডাকতে যাচ্ছিল। কিন্তু মুখে হিস হিস শব্দ করে উঠল মূর্তিটা। ঠোঁটের উপর চুপ করানোর আঙুল। হতবাক মধু। গুপি-বাঘার গানের মতো ওর হাবভাবে আর নড়তে পারল না। এড়াতে পারল না সে ইশারাটাকে। অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল তার। সাহস তো কম নয় ওর! আবার হাত নেড়ে ডাকছে মধুকে! কিন্তু সে যে বিছানা ছেড়ে নড়তেই পারছে না। কিছুক্ষণ পর ও নিজেই চলে এল মধুর কাছে। কানের কাছে এসে চুপি চুপি বলল, “ভয় পেও না মধুমতী। চোর-ডাকাত নই। ভূতও নই। আমি রূপকুমার। তোমায় গল্পের দেশে নিয়ে যেতে এসেছি।”
আজব ব্যাপার! ওর নামটা সে জানল কেমন করে? গলার স্বরও ওর কী অপূর্ব! বড্ড আন্তরিকও। যেন কতদিনের চেনা। এগুলোই সাহস জোগাল মধুর ভিতর। এমন মানুষকে ভয় পেয়েছিল ভেবে এখন আবার লজ্জা লাগল তার। উঠে বসল মশারির মধ্যে। বলে ফেলল, “কোথায় যাব, রূপকুমার?”
রূপকুমার বলল, “যেখানে চাঁদ এসেছে তোমাদের ফ্লাটের ব্যালকনিতে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, চলো সেইখানে। দেখবে সে এক আলাদা জগত।”
দু’বার ভাবল না মধু। বাধ্য মেয়ে হয়ে মশারির ভিতর থেকে নেমে এল। রূপকুমারের হাত ধরে চলে গেল ব্যালকনিতে। গভীর রাতের চাঁদের আলোও যে এত গভীর, জানতই না সে। ছোট্ট ব্যালকনিতে যেন বান ডেকেছে জ্যোৎস্না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল মধু। কী যে ভালো লাগছে তার! আকাশ থেকে খানিকটা রূপো গলিয়ে বুঝি পাঠিয়ে দিয়েছে কেউ। মুগ্ধ চোখে তাকাল উপরে। মেঘের কোলে ভেসে রয়েছে আশ্চর্য এক চাঁদ! এমন চাঁদ সে দেখেইনি কোনওদিন। এই আকাশের নিচেই তো প্রতি সন্ধে থেকে বিছানায় না যাওয়া পর্যন্ত থাকে সে। ব্যালকনি থেকে আকাশ দেখাও খুব কষ্টের নয়। তাহলে সে দেখেনি কেন? ইলেকট্রিকের আলোয় বই, খাতা, কম্পিউটার আর টিভি কিংবা বড়োজোর মায়ের মোবাইল ফোনে চোখ ফেলতেই সময় চলে গেছে। কখনও রাতের ব্যালকনির আকাশে চোখ গেলেও চাঁদকে তেমন করে দেখাই হয়নি। আজ তাই কি রূপকুমার এসেছে তাকে এসব দেখাতে? কে জানে! এমন সুন্দর পরিবেশে এসব নিয়ে রূপকুমারকে প্রশ্ন করতেও ইচ্ছে করল না। চোখের সামনে মেঘ আর চাঁদ মিলেমিশে যেন স্বপ্ন এঁকেছে আকাশের পাতায়। চাঁদের দু’পাশ আর মুখের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে চাপ চাপ ধোঁয়া-মেঘ। রূপকুমার বলল, “আকাশকে দেখতে দেখতেই আমার কথা শোনো। তারপর যদি ইচ্ছে হয় তো আমার সঙ্গে যাবে। না’লে ফিরেই যেও ঠাম্মার পাশে।”
মধু তখন লক্ষ্মী সোনামণি। চোখ থেকে উবে গেছে ঘুম। পুরোপুরি ভ্যানিশ ভয়ও। সবটা যেন মস্ত এক ম্যাজিক। জিজ্ঞেস করে ফেলল, “আচ্ছা, তুমি কে বলো তো রূপকুমার?”
রূপকুমার বলল, “সেই কথাই তো তোমাকে এখন বলব মধু সোনামণি। আমি রূপকথার দেশের রাজকুমার। কয়েকশো বছর ধরে আমি আটকে রয়েছি গল্পের ভিতর। তবুও আমার কোনও দুঃখ নেই। আসলে ওটাই আমার বেঁচে থাকার জায়গা কিনা।”
রূপকুমারের এমন অবাক করা বেঁচে থাকার কথায় মধুর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। বলে ফেলল, “এত বছর কেউ আবার বাঁচে নাকি! তাও কিনা গল্পের বইয়ের ভিতর?”
“একদম ঠিক বলেছ। কিন্তু তোমার ওই বাঁচার নিয়ম তো মানুষের জন্য। আমাদের রূপকথার গল্পের জগতটাই যে আলাদা। সেখানে শুধুই গল্প আর গল্প। গল্পের জন্যই সবকিছু। সে তুমি নিয়ম বলো বা কল্পনাই বলো। সেখানকার আলো রোদের মতো কড়া নয়, বরং রাতের এই জ্যোৎস্নার মতোই নরম। এই তো কিছু বছর আগেও রাতের বিছানায় ঠাম্মারা তোমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে নামিয়ে নিয়ে আসতেন আমাদের। সঙ্গে রাজারানি, রাজকুমারী, দাসদাসী, রাক্ষস-খোক্ষস, প্রাণভোমরা, জিয়নকাঠি-মরণকাঠি আরও কত কী! চোখ বড়ো বড়ো করে তোমরা শুনতে আর স্পষ্ট দেখতে পেতে আমাদের। কতদিন মাঠে-ঘাটে, এমনকি স্কুল যাবার সময়ও আমরা ছবির মতো থাকতাম তোমাদের মনের একেবারে ভিতরে। কিন্তু এখন সেসব আর নেই। দিনকাল সব কেমন পালটে গেছে। গল্পেরা ঠাম্মাদের ঝুলি থেকে আর বেরোয় না। তার বদলে এসে গেছে কার্টুন, ভিডিও গেম, কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাব। সবেতেই কত কত গেম। আর মোবাইলে তো গেম ছাড়াও কত কিছু। ছবি ছাপা, হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক, ইন্টারনেট। সেসবে হু হু করে ঢুকে গেলে তোমরা। আমাদের গল্পেরা সব হারিয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের গল্পেরা যদি তোমাদের মধ্যে বেঁচে না থাকে, আমরাও যে মরে যেতে থাকব একটু একটু করে। তোমরা সঙ্গে না থাকলে আমাদের বেঁচে থাকার আর রাস্তা কোথায়? কিন্তু এ নিয়ে দেখি তোমাদের কিংবা বড়োদের কারও কোনও মাথাব্যথাই নেই। তোমাদের ঠাম্মাদেরও না। ওঁরা তো সন্ধে থেকে টিভি-সিরিয়ালে চোখ গুঁজে থাকেন। আমাদের কথা আর ভাবেনই না। আধমরা আমরা তাই রাতের বেলা চোরের মতো এভাবেই চলে আসি। সবার কাছে অবশ্য আসতে পারি না। অনেকে তো আমাদের চেনেই না। তুমি বরং আর একটু ছোটো থাকার সময় ঠাম্মার কাছে আমাদের কথা একটু আধটু শুনেছ। কোনও কোনও বিকেলের রঙিন আকাশে তুমি খুঁজে পাও হোলি খেলা মেঘেদের। লেবুগাছের টুনটুনির সঙ্গে মনে মনে অনায়াসে উড়ে যেতে পারো দূরে, বহুদূরে। তোমার কাছে আমাদের দুঃখ জানানোর জন্য আসা যেতেই পারে। তাই চলে এলাম। আরেকটা কথা। অনেকদিন তো তুমি ঠাম্মার কাছ থেকে আমাদের গল্প শোনোনি। আজ গল্প নয়, চলো বরং তোমায় একবার ঘুরিয়েই নিয়ে আসি আমাদের ঘরবাড়ি থেকে। আমার পিঠে চড়ে যাবে নাকি একবার রূপকথার জগতে?”
দু’বার ভাবল না মধু। খুশি মনে ঘাড় হেলিয়ে দিল। উঠে পড়ল রূপকুমারের পিঠে। ডানা নেই, তবুও পাখির মতো সোঁ সোঁ করে বাতাস কেটে উড়ে যেতে লাগল রূপকুমার। আশ্চর্য! একটুও ভয় করছে না মধুর। বরং বেশ আনন্দই হচ্ছে।
রূপকুমারের জগতে নেমে মুগ্ধ মধু। মাথায় মানিক নিয়ে ঘুরছে সাপ। হাজির রাজারানি, রাজকুমারী, রাক্ষস-খোক্ষস সবাই। মুনি-ঋষিরা বসেছেন সাধনায়। পরিরা উড়ছে পাখা মেলে। চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল অথচ নরম আলো। বসন্তের মতো মনোরম আবহাওয়া। রঙিন মেঘেরা ভাসছে হাতের নাগালে! ফুল-ফলের গাছগাছালিতে ভর্তি চারদিক। খুঁজে পেয়ে গেল মুক্তোদানার মতো প্রচুর জোনাকিকেও।
জোনাকি ভীষণ প্রিয় মধুমতীর। অমাবস্যার অন্ধকারে ওদের ফ্লাটের ব্যালকনি থেকে কতবার ওদের দেখেছে। কী মিষ্টি আলো! ঠাম্মা বলে, ওরা আঁধারমানিক। সাতরাজার ধন মানিক থেকে নাকি আলো নিয়ে আসে। তবে মধুর কিন্তু বহুবার মনে হয়েছে জোনাকি আলোটা আর একটু বেশি করে নেয় না কেন? তাহলে হয়তো বারবার তা নেভানোর দরকার হত না। বাবাকে কথাটা জিজ্ঞেসও করেছে। বাবা বলেছে, “যার যতটা দরকার ততটাই থাকবে। কমবেশি আবার কী! ঠিক আছে, নেট থেকে ব্যাপারটা নাহয় একবার দেখে দেব।”
নেট থেকে বাবা আর দেখে দেয়নি। কিন্তু এখানে কথাটা জানার সুযোগ একেবারে সামনাসামনি। সরাসরি জোনাকিকেই প্রশ্নটা করে বসল মধু।
জোনাকি বলল, “কথাটা আমরাও ভেবেছি। কিন্তু মানিক তো ভীষণ দামি। পাওয়াও যায় খুব কম। তাই হয়তো এটুকুর বেশি দেয় না। এ নিয়ে আমরা আরও একটা ব্যাপার করেছিলাম। চাঁদের আলো সারা পৃথিবী ছড়ানো। পরিমাণও দেদার। আলোর দাবি নিয়ে আমরা অনেকে মিলে একদিন চলে গেলাম চাঁদের কাছে। চাঁদ আমাদের কথাটার যুক্তিটা মেনে নিল। কিন্তু এক কণা আলোও তার না দিয়ে উলটে কী বলল জানো? বলল, ‘তোমাদের আলো সামান্য হোক, কিন্তু তা যে একবারে তোমাদের নিজের। তাতে মিশে আছে গর্ব আর অহংকার। কিন্তু আমারটা তো অন্যের কাছে থেকে নেওয়া। তাতে মিশে আছে শুধু লজ্জা আর অসম্মান।”
মধু বলল, “জানি। সূর্যের থেকে ধার করা।”
জোনাকি বলল, “তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু চাঁদ বলল যে কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। ধার তো একদিন শোধ দিতে হয়। হয় কি না বলো? কিন্তু এ তো শুধুই হাত পেতে নেওয়া। চাঁদ শোধ দেবে কীভাবে? সে কি সম্ভব?”
মাথা খাটিয়ে ভাবল মধু। কথাটা তো ঠিকই। একটুখানি মানিকজ্বলা আলোই জোনাকির গর্ব আর অহংকারের। জোনাকির বেশি আলোর কথাটা আর বোধহয় তার মনে হবে না কোনওদিন।


সকালে নিজেকে বিছানাতেই আবিষ্কার করল মধু। তবুও দিনের এই আলোর মতোই সত্যি কাল রাতের ঘটনা। তার থেমে থাকা প্রশ্নটার উত্তরটা সে পেয়ে গেছে সে সেখানেই। আর সঙ্গে সঙ্গে পালটে গেছে সে নিজেও। ড্রয়িং ক্লাসে আর তৃণার থেকে কপি করে সে ছবি আঁকবে না। নিজের চোখ দিয়ে দেখা রূপকথার ছবি আঁকবে এবার থেকে। জাগিয়ে তুলবে মনের আলো। সেটাই যে তার নিজস্ব। সেটাই তার গর্ব আর অহংকার।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

No comments:

Post a Comment