বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ ডিম নকল করার কারিগরঃ তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়

ডিম নকল করার কারিগর

তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়



কিছু পাখি অন্য পাখির বাসায় যেমন ডিম থাকে, ঠিক তেমনটি ডিম নিজে পেড়ে আসতে পারে সেই বাসায়! বিষয়টা বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত। পাখিদের ওপর তথ্য জোগাড় করে দেখা গেছে, ঠিক এমনটাই হয় বা হচ্ছে৷ কিছু পাখি অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, নিজেরা বাসা বানায় না; অন্য পাখির ঘরে নিজেদের সন্তান বড়ো করে নেয়৷ এদের পর-ভৃৎ (brood parasite) বংশের পাখি বলে (আমাদের পরিচিত পাখির মধ্যে যেমন কোকিল, পাপিয়া)৷ তারা যে পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, নিজেদের ডিমগুলো ঠিক সেইরকম যাতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখে৷ আবার কিছু পাখি দেখা যাচ্ছে অন্য পাখিরা যাতে তাদের বাসায় এসে ডিম পাড়লে যাতে তারা বুঝতে পারে, তার জন্যে নিজেদের ডিমের রঙ-নকশা বদলে ফেলছে অল্প দিনেই। তাতেও নিস্তার পাচ্ছে না, তাদের বাসায় কিছু পর-ভৃৎ বংশের পাখিরা নিজেদের ডিমটাকেও ওই বদলে যাওয়া ডিমের মতো রঙ-নকশা করে নিয়ে তাদের ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে৷
সরাসরি বিষয়টার ভেতর ঢোকার আগে আমরা একটু জেনে নিই পাখি কেন বিভিন্ন রঙ-নকশার ডিম পাড়ে, কীভাবে তাদের শরীরের ভেতর ডিমে রঙ ধরে৷ একসময় অনেকেই ভাবতেন ময়লা লেগে সাদা ডিমে ওরকম রঙ-নকশা তৈরি হয়ে যায়৷ তবে বিবর্তনের চোখে বিষয়টা নিয়ে প্রথম আলোচনা করেছিলেন আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস৷ এই বিখ্যাত নামটা আজ বিজ্ঞানের ইতিহাসে চাপা পড়ে আছে চার্লস ডারউইনের নামের তলায়৷ অথচ ১৮৫৮ সালের ১ জুলাই, একই দিনে একসঙ্গে লন্ডনের লিনিয়েন সোসাইটিতে ডারউইন আর ওয়ালেসের ‘বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’ পড়া হয়েছিল আর স্বীকার করা হয়েছিল৷
ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি। ‘বিউগল’ জাহাজে করে পৃথিবী ঘুরে এসে ডারউইনের মাথায় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে বিভিন্ন পরিবেশে বেঁচে থাকতে গিয়ে প্রাণীরা নিজেদের একটু একটু করে বদলে নিতে থাকে যে বদলের ফলে তারা বেঁচে থাকার জন্যে আরও উপযুক্ত হয়ে ওঠে। ১৮৪২ সালে ডারউইন নিজের খাতায় রীতিমতো ছবি এঁকে ‘বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’ লিখলেন, কিন্তু প্রকাশ করলেন না৷
ইতিমধ্যে ওয়ালেস সাহেব প্রাণী সংগ্রহের কাজ করছিলেন ইন্দোনেশিয়ায়৷ গ্যালাপাগোস দ্বীপের মতোই সেখানকার জীব-বৈচিত্র্য বিশাল৷ সেই নিয়ে কাজ করতে করতে ওয়ালেসও নিজের মতো করে বুঝতে পারলেন ‘বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সুদূর ইংল্যান্ডে এই মতবাদ দাঁড় করাতে হলে উপযুক্ত উকিল লাগবে৷ ওয়ালেস ছিলেন ডারউইনের ভক্ত৷ তিনি তাঁর বক্তব্য লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ডারউইনের কাছে৷ চিঠি পড়ে তো ডারউইনের মাথায় হাত। তাঁর এতদিনের কাজ বোধহয় মাঠে মারা গেল৷ তিনি কিন্তু চিঠিটা চেপে গেলেন না। পরামর্শ করলেন বন্ধু যোশেফ হুকারের সঙ্গে৷ তাঁরা ঠিক করলেন, দু’জনের তত্ত্বই একসঙ্গে প্রকাশ করাটা সঠিক হবে এবং তাই করা হয়েছিল৷ লিনিয়েন সোসাইটি সেদিন রায় দিয়েছিল, ‘এই নতুন তত্ত্ব প্রকাশ করার জন্যে দু’জনকেই অভিনন্দন দেওয়া উচিত, তবে প্রকাশ করা নথি থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে চার্লস ডারউইনই এই সিদ্ধান্তে প্রথম পৌঁছেছিলেন তাই বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের আবিষ্কারের কৃতিত্ব ডারউইনকেই দেওয়া হল৷ অনেক বিষয়ে ডারউইন আর ওয়ালেসের মত আলাদা ছিল, কিন্তু মূল ধারণাটা ছিল একই। ওয়ালেস সারাজীবন ছিলেন ডারউইনের ভক্ত৷ ডারউইন মারা যাবার পর তিনি একটা বই লিখেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘ডারউইনবাদ’ (Darwinism)৷
পাখির ডিমকে ওয়ালেস বিবর্তন আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটা হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন৷ পাখির বিবর্তন হয়েছে সরীসৃপ থেকে৷ সরীসৃপও ডিম পাড়ে, কিন্তু তারা ডিম পাড়ে গর্তের ভেতর, ঢাকা বাসায়। তাদের ডিমের খোলা সাদা হয়৷ যে পাখিরা সরীসৃপদের মতো গর্তে বা নিজেদের তৈরি করা বাসায় ডিম পাড়ে, তাদের ডিমের খোলা সাধারণত সাদাই হয় ৷ কিছু পাখি ডিম পাড়ে খোলা মাঠে বা পাথরের চাতালের ওপর, তাদের ডিমগুলো উজ্জ্বল আর নানা বর্ণের হয়৷ ওয়ালেস বলেছিলেন, পাখিদের ডিমের নানা রঙের বিবর্তন হয়েছে ডিম শিকারিদের থেকে নিজেদের ডিমকে বাঁচাতে৷ এ তত্ত্বটা তিনি নিয়েছিলেন পতঙ্গদের একধরনের বিবর্তন থেকে। কিছু পতঙ্গ আছে, যারা উজ্জ্বল আর রঙিন তবে খেতে বিস্বাদ; পতঙ্গভুকরা তাদের এড়িয়ে চলে, খেতে চায় না৷ অন্য বেশ কিছু স্বাভাবিক স্বাদের পতঙ্গও বিবর্তনের পথে নিজেদের উজ্জ্বল করে নিয়েছে, যাতে পতঙ্গভুকরা তাদের শিকার না করে।
ওয়ালেসর যুক্তি ফেলে দেবার মতো ছিল না। তবে পরে অনেক বিজ্ঞানী এ নিয়ে কাজ করে বুঝতে পেরেছিলেন যে খোলা জায়গায় পাখিদের ডিম রঙিন হয় নিজেদের ডিমটাকে চিনে নেবার জন্যে৷ ডিমের রঙের বৈচিত্র্যে সবচেয়ে ওপরে আছে ‘গিলিমট’ (Guillemot) নামের এক সামুদ্রিক পাখি। তারা সমুদ্রের ধারে খালি পাহাড়ি চাতালের ওপর ডিম পাড়ে, এক পাখির ডিম থেকে পাশেরটার দূরত্ব দু’-তিন ফুটের বেশি থাকে না। আবার মাঝে মাঝে ডিম গড়িয়েও যায়, কিন্তু তখনও গিলিমট তার নিজের ডিমটা চিনে নিতে পারে৷ এটা নিয়ে বিজ্ঞানী ৎশচানজ্ একটা খুব সাধারণ পরীক্ষা করেছিলেন। যখন কোনও পাখি তার বাসা ছেড়ে যেত, তখন তিনি পাখিটার একটা ডিম একটু দূরে গড়িয়ে দিতেন আর বাসার কাছে একটা অন্য ডিম রেখে দিতেন। তিনি দেখলেন পাখিগুলো কিন্তু ঠিক তাদের ডিম চিনে নিতে পারে৷
ঠিক এই সুবিধেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে পর-ভৃৎ বংশের পাখিরা। তাদের ডিমগুলো যে পাখির বাসায় তারা পাড়ে, ঠিক তাদের মতো হয়৷ না হলে পাখি তার বাসায় অন্য ধরনের ডিমে তা দেবে না, ফেলে দেবে৷ তবে প্রসঙ্গটায় যাবার আগে আমরা ছোটো করে বুঝে নিই পাখি তাদের ডিমের খোলায় রঙ করে কীভাবে৷ পাখির জননতন্ত্রে প্রথমে ডিমের কুসুম, তারপর সাদা অংশ, একদম শেষে ডিমের ওপরের পাতলা চামড়া (membrane) আর খোলাটা তৈরি হয়৷ ডিম তৈরি শেষ হওয়ার ঠিক আগে জননতন্ত্রের মুখে দেহের কিছু আভ্যন্তরীণ ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে পাখি নিজের শরীর থেকে রঙ ছিটিয়ে দেয় তার ডিমের চামড়া আর খোলার ওপর। তাই বেশির ভাগ সময়ে দেখা যায় ডিমের চামড়া আর খোলার রঙ-নকশা একদম এক৷
মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে আলোচনা করা যাক রঙ করতে পাখিরা কী কী রাসায়নিক ব্যবহার করে৷ ১৮৭০ দশকে হেনরি ফ্লিকটন সার্বি কাজটা শুরু করেছিলেন। তিনি ডিমের খোলাকে দ্রবণে নিয়ে তার ক্যালসিয়াম অংশ থেকে অন্য অংশ (যাতে রঙ থাকে) আলাদা করতে পেরেছিলেন৷ এবার সেই দ্রবণের ভেতর প্রিজমের ব্যবহার করে বিভিন্ন রঙের আলো পাঠিয়ে কোন কোন রঙ ওই দ্রবণ শুষে নিচ্ছে তা দিয়ে সনাক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন কী ধরনের রাসায়নিক আছে ডিমের খোলায়৷ বিজ্ঞানে রাসায়নিকের বর্ণ-বিশ্লেষণের তখন শৈশবকাল। তবুও এভাবে তিনি সাত ধরনের রাসায়নিকের কথা বলে গেছেন। নামগুলো দিয়েছিলেন অদ্ভুত– ওওরোডিন (oorhodin), দলবদ্ধ ওওসায়ান (banded oocyan), হলুদ ওওস্কানথাইন (yellow), পিঙ্গল ওওস্কানথাইন (rufous ooxanthine), অজানা লাল (unknown red) আর লিথো স্কানথাইন (litho xanthine)৷ সার্বি তাঁর অজানা এইসব রাসায়নিকের নামের আগে ‘ওও’ শব্দটা বসিয়েছিলেন ডিম বোঝাতে৷ আজকের বিজ্ঞান অবশ্য জানে, ডিমে রঙ হয় দু’ধরনের রাসায়নিক থেকে–প্রোটোপোরফাইরিন (protoprophyrine) আর বিলিভার্ডিন (biliverdin)। এই রাসায়নিক আমাদের শরীরেও আছে, কাজ করে হিমোগ্লোবিন তৈরি আর নষ্ট করতে৷

এবার আমরা এই লেখার মূল প্রসঙ্গে আসি৷
মেজর কোলব্রূক রবজেন ইংল্যান্ডের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে অনেক জায়গা ঘুরে জাম্বিয়াতে এসেছিলেন ১৯৬৩ সালে৷ ছোটো বয়েস থেকেই তাঁর ডিম সংগ্রহের বাতিক ছিল৷ ১৯৬৯ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আফ্রিকাতেই তামাক পাতার চাষ শুরু করেন। সঙ্গে চলল ডিম সংগ্রহের কাজ৷ তিনি লক্ষ করে অবাক হলেন, ওখানকার ছাতারে (babler) আর টুনটুনি (wabler) পরিবারের একই প্রজাতির বিভিন্ন পাখি এত ধরনের ডিম দিতে পারে (সঙ্গের ছবিতে এক একটা স্তম্ভে একেক প্রজাতির বিভিন্ন ডিমের ছবি দেওয়া হল)৷ তিনি এটাও খেয়াল করলেন কোকিল-ফিঞ্চ (cuckoo finch) প্রজাতির পর-ভৃৎ বংশের একটি পাখি এইসব পাখিদের বাসায় ডিম পাড়ে; আর সেই ডিমগুলো একেবারে বাসা বানানো পাখির ডিমের মতো হয়৷ তার মানে, কোকিল-ফিঞ্চ তার পছন্দ করা বাসার পাখিদের ডিম দেখে ঠিক সেইরকম ডিম পাড়তে পারে (সে যেন ডিমের জ্যান্ত কালার জেরক্স মেশিন)৷
বিষয়টা এখানেই শেষ হয়নি। প্রথমে রবজেন, পরে আরেক গবেষক ক্লারি তাঁদের নিজেদের সংগ্রহের চল্লিশ বছরের ডিম দেখে বুঝতে পারলেন, যে পাখিরা নিজেরা বাসা বানায়, তাদের ডিমের রঙ বদলে ফেলছে কোকিল-ফিঞ্চদের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে (যাতে তারা নিজেদের ডিমটা চিনতে পারে)৷ তার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কোকিল-ফিঞ্চদের ডিমও৷ চল্লিশ বছরটা বিবর্তনের চোখে খুবই অল্প সময়, তবুও এর মধ্যেই একটা চলমান বিবর্তনের প্রতিযোগিতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে৷
তবে এই অসাধারণ কাজের একটা পুরষ্কার পেয়েছিলেন রবজেন। ১৯৮৮ সালে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্তারা (সঙ্গে স্থানীয় মিউজিয়াম আর বন দফতরের কর্তারাও ছিলেন) অভিযান চালিয়েছিলেন রবজেনের বাড়িতে। পারমিট ছাড়া বেআইনিভাবে ডিম সংগ্রহের জন্যে অভিযুক্ত করা হয় তাঁকে৷ তবে সমস্ত পৃথিবীতে রবজেনের কাজের প্রশংসা দেখে আদালত তাঁকে বেকসুর বলে রায় দিয়েছিল। সঙ্গে সমস্ত দফতরকে আদেশ দিয়েছিল তাঁকে প্রয়োজনীয় পারমিট দিয়ে দেবার জন্যে৷ যদিও সে পারমিট তিনি কোনওদিন হাতে পাননি৷

তথ্যসূত্রঃ The Most Perfect Thing: Inside (and Outside) a Bird’s Egg – Tim Birkhead

1 comment:

  1. বাঃ, পড়েই পাখিদের রঙিন ডিম খেতে ইচ্ছে হচ্ছে

    ReplyDelete