দুষ্টুমিষ্টি


বিশ্বাসঘাতক

সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়


কলকাতায় এক সুপ্রসিদ্ধ স্কুলের হস্টেলে আমরা পাঁচ বন্ধু একসাথে, একই ঘরে থাকতাম। আমি, মালিনী, পিউ, নন্দিতা ও মোনালি। তখন ক্লাস এইট। খাওয়া, শোয়া, পড়া সবই একসাথে। এমনকি একে অপরের পোশাক বদল করেও পরতাম।
​ঠিক হল, গরমের ছুটিতে সবাই চুল কেটে ন্যাড়া হয়ে আসবে। সবচাইতে বেশি উৎসাহিত হল মোনালি। সবাইকে ন্যাড়া হতে রাজি করাল। গরমের ছুটিতে যে যার বাড়ি চলে গেলাম।
​একমাস পর গরমের ছুটি শেষ। সবাই হস্টেলে ফিরে এলাম। আমি চুল খুব ছোটো করে কেটে ফেলেছিলাম, ন্যাড়া হইনি। দেখা গেল নন্দিনী ও মালিনীও ছোটো করে চুল কেটে এসেছে। পিউ তাঁর লম্বা চুল কেটে কাঁধ অবধি করে ফেলেছে। কেউ কথা রাখিনি বলে খুব হাসাহাসি চলল। এমন সময় দেখা গেল দূর থেকে ছুটে আসছে মোনালি। মাথায় বাঁধা স্কার্ফ। আমাদের দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর চিৎকার করে বলে উঠল, “তোরা কেউ কথা রাখিসনি! বিশ্বাসঘাতক! শুধু আমিই ন্যাড়া হয়ে গেলাম?”
​মাথার স্কার্ফটা খুলে দিতেই মোনালির ন্যাড়া মাথা দেখে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়লাম।
_____


লক্ষ্মীমেয়ে


শ্রাবণী গুপ্ত সরকার



বাড়িতে পরপর তিনটে ছেলে হওয়ায় সবাই হাঁপিয়ে উঠেছিল একঘেয়েমিতে। কাজেই যৌথ পরিবারে ছয় ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় জনের মেয়ে হওয়ায় সবাই খুব খুশি। টিকলি সবার আদরে বাঁদর না হলেও বেশ হ্যাংলা হয়েছে। বিভিন্ন ফল থেকে ঝাল কষা মাংস সবই চলে তার। দেখতেও মিষ্টি আর গুবলুগাবলু। সত্যনারায়ণ পুজোর দিন ওকে উঁচু খাটে বসিয়ে রাখা হয় যাতে নামতে না পারে। নাহলেই নাড়ু, ফল সবকিছু খেতে বসে যাবে—ঠাকুরমশাই বকা দেবেন সবাইকে।
ঠাকুরঘরে বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজোর ফল কাটতে বসেই ছোটো ঠাকুমা এক চিৎকার দিলেন। “আপেলের উপর স্পষ্ট দাঁতের দাগ—এক চাকলা নেইও!”
এই কলিযুগেও নিশ্চয়ই স্বয়ং মা লক্ষ্মী এইরকম অলক্ষ্মীমার্কা কাজ করবেন না, তা তাঁর যতই খিদে পাক না কেন। পাশের ঘরে ইউনিভার্সিটির পড়া করছিল রাকা, শুনতে পেয়ে উত্তর দিল “কাকিমা, টিকলি নয় তো?”
খোঁজ করে দেখা গেল, হ্যাঁ। ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে শ্রীমতী একটা কলা খাচ্ছেন মন দিয়ে। পিসিমণি রাকা কোলে তুলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, পুজোর আগেই প্রসাদ করে দিলি হেংলুরানি?”
সবাইকে হাসতে দেখে টিকলি লজ্জায় মুখ লুকোল পিসির কোলেই।
_____


ছয় ইঁদুর


প্রকল্প ভট্টাচার্য

যাক, একটা চিন্তা কমল। আমাদের ছেলেটা করে-কম্মে খেতে পারবে। বদবুদ্ধিতে আমাকে ছাড়িয়ে যাবে শিগগিরিই।
স্কুলে ইন্টার ক্লাশ ক্যুইজ প্রতিযোগিতা, ক্লাশ সিক্সের লিডার আমার পুত্র প্রথমবাবু। দিনরাত গল্পের বই পড়লে আর ইউটিউব দেখলে আর কিছু না হোক, ক্যুইজ টিমে নাম ওঠে। তো নিজের নিজের টিমের নাম ঠিক করতে বলা হল। কড়া প্রিন্সিপাল ম্যাডাম স্পষ্ট বলে দিলেন, “ঐসব সিনেমার হিরো, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নাম দিলে আমি বাতিল করে দেব! অনেক ভালো নাম আছে, তার মধ্যে থেকে বেছে নাও।”
প্রথম বাছল ‘র‍্যাট’। শুনে আমি নাক সিঁটকোলাম, “এ কী, ইঁদুর একটা নাম হল!”
ছেলে মুচকি হেসে বলল, “ক্লাশের নামটা তো ওরা আগে লিখবে!”
বুঝে আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। জ্জিও বেটা!
তারপর চার্ট বানানো হল। ক্লাশ সেভেনের নাম চ্যাম্প, তাদের লেখা হল VII-CHAMP। ক্লাশ এইট VIII-THUNDERBOLT। আর তাদের পাশে জ্বলজ্বল করছে VI-RAT।
হাসাহাসির পর বললাম, “কোহলিকে তোর এত পছন্দ আগে বলিসনি তো!”
জবাব এল, “না বাবা, সেজন্য নয়। কোহলির তেমন ভক্ত নই আমি। কিন্তু প্রিন্সিপাল ওইভাবে বারণ কেন করবেন কোনও হিরোর নাম দিতে? রোল মডেল থাকা তো ভালো, তাই না বাবা?”
_____


তিতলি যখন টিচার


দেবদত্তা ব্যানার্জি

পড়াশোনা করতে তিতলির মোট্টেই ভালো লাগে না। বড্ড বাজে কাজ এগুলো। এত বানান, নম্বর আবার তাদের বানান শিখে কী লাভ! তাই তিতলি স্টুডেন্ট নয়, টিচার হতে চায়। ওর একগুচ্ছ টেডি আর পুতুলগুলোকে ঘর জুড়ে বসিয়ে হোয়াইট বোর্ডে আঁক কষে পড়াতেই ও ভালোবাসে। তবে তার স্টুডেন্টরাও একদম পড়ে না। পড়া ধরলেই সব চুপ। কিন্তু মুশকিল হল, মা বলেছে টিচার হতে হলে তাকে তো বানানগুলো শিখতেই হবে। না হলে পড়াবে কী করে?
এই তো সেদিন বেলুন বানান শেখাতে গিয়ে দুটো এল নাকি একটা, তারপর ও হবে নাকি এーতিতলির সব গুলিয়ে গেছিল। বাধ‍্য হয়ে ছুটি দিয়ে দিতে হল। আজ মা ওর স্টুডেন্ট হয়েছে। মা ভালো স্টুডেন্ট, পড়া পারে। কিন্তু মা যখন জানতে চাইল ওয়েডনেসডে বানানটা, তিতলির কী লজ্জা!
তাই তিতলি ঠিক করেছে চুপিচুপি বাবার কাছে বানানগুলো শিখে নেবে এবার। নয়তো ওর টিচার-টিচার খেলাটাই যে মাটি হতে বসেছে। মা আর বাবার মিটিমিটি হাসিটা অবশ‍্য ওর চোখে পড়েনি।
_____


অবাক জলপান


সুস্মিতা কুণ্ডু

ক্যাপ্টেন নিমোর তখন বছর আড়াই বয়স হবে। নিজের গাড়িঘোড়া-খেলনাপাতির সাথে মায়ের রান্নাঘরের বাসনকোসনও তাঁর ভারি পছন্দের খেলার জিনিস। রান্নাঘরের ওপরের দিকের তাকগুলো নাগালে না এলেও নিচের দিকের তাকগুলোর অবারিত দ্বার। আক্ষরিক অর্থেই। কারণ, বিদেশের হেঁশেল-ঘরের কাঠের পাল্লাগুলিতে বেশিরভাগ সময়ই তালা-ছিটকিনির বন্দোবস্ত থাকে না। নিমোবাবু মনের সুখে আলু-পেঁয়াজ বার করে ফুটবল খেলেন। থালা-বাটি দিয়ে দোকানঘর সাজান।
একদিন কখন এভাবেই কতকগুলো প্লাস্টিকের জলের বোতল এনে ডাইনিং টেবিলের ওপর শুইয়ে লাইন দিয়ে সাজিয়ে রেলগাড়ির বগি বানিয়েছেন। ওদিকে মায়ের খুব জলতেষ্টা পেয়েছে বলে নিমোবাবুর একটা খেলনা বগি তুলে নিয়ে ছিপি খুলে গলায় ঢেলে দিয়েছেন মা। আর যান কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে ছুট্টে বাথরুমের বেসিনে গিয়ে ‘থু থু’ করে সেই জল উগরোতে হল, এমন অবস্থা।
আসলে হয়েছে কী, রান্নাঘরের তাকের সেই অবারিত দ্বার উন্মুক্ত করে নিমোবাবু যে কখন একটা বড়সড় ভিনিগারের বোতল এনে খেলনা রেলগাড়ির বগিরূপী অন্যান্য জলের বোতলের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন তা তো আর মা জননী খেয়াল করেননি। অতএব গালভর্তি ভিনিগার খেয়ে যা হওয়ার তাই ঘটল! এতে আর নিমোবাবুর দোষটা কোথায়?
_____

1 comment:

  1. আহা! সকাল সকাল মন ভালো হয়ে গেল ! সবাইকে ধন্যবাদ।

    ReplyDelete