গল্পঃ রন্তিদেবের ডাকাত দর্শনঃ প্রতীক কুমার মুখার্জি




স্লাম্বারড্রোমের স্বচ্ছ বায়ো-ডিগ্রেডেবল ফাইবারের ঢাকনা দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের নরম আলো রন্তিদেবের ঘুমটা ভাঙিয়ে দিতেই স্মার্ট-আই তাঁর সামনে হাজির করল সেদিনের স্ট্যাটিস্টিক্স - ১৩ই মে, রবিবার, ২১৯১ সাল, সকাল ৭:৪৫, সাথে সারা দুনিয়ার আবহাওয়ার যাবতীয় ফিরিস্তি। নাকের ডগাটা চুলকোবার জন্য হাত তোলার আগেই নিঃশব্দে ড্রোমের ঢাকনা ঘেঁষে দাঁড়াল বাডি-৪, তাঁর পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট। যান্ত্রিক মুখে একটা মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে, তর্জনী এদিক ওদিক নাড়িয়ে নড়তে বারণ করছে সে।
একশো তেষট্টি বছরের তরুণ রন্তিদেবের অবশ্য ঘুম ভাঙলেই তড়াক করে উঠে বসার হুকুম নেই। তাঁর এই শরীরে বসানো শয়ে শয়ে গেজেটের সম্পূর্ণ ‘বুটিং’ সম্পন্ন না হলে তিনি বিছানা থেকে নামতে পারবেন না। অগত্যা অপেক্ষা করতে করতে ছোটোবেলার প্রিয় সায়েন্স ফিকশন ছবির রোবো-অ্যান্ড্রয়েড হিরোটির সাথে নিজের সাদৃশ্যের কথা ভাবতেই দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে।
রুটিনমাফিক চেক-আপের পর রন্তিদেবকে স্লাম্বারড্রোম থেকে নামিয়ে অরগ্যানিক নাইট বাবল ছাড়িয়ে রিফ্রেশোতে ঢুকিয়ে দিলো বাডি-৪। কার্যসমাধা হলে তাঁকে পাটভাঙা মর্নিং বাবল পরিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে পৌঁছোতে সে সময় নিল ঠিক সাড়ে সাত মিনিট। আগের ‘সাইলেন্ট বাডি’ সিরিজের বাডি-৩ তাঁকে অনেকদিন দেখাশোনা করেছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরও আপগ্রেডেড ‘প্রসিডিউরাল রোবোটিক্স’-এর প্রয়োজন পড়তে বাডি-৪-এর আগমন। ইউরেনাসের পাকাপোক্ত বাসিন্দা তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূ দাদুর যাবতীয় দায়দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন রন্তিদেবের একমাত্র নাতি ভূতোবাবুর উপর–যার পরিবারের সাথে তিনি এখনও পৃথিবীর বাসিন্দা।
টেবিলে বসতেই বাডি রন্তিদেবের ডানহাতের কব্জির উলটোদিকে চাপ দিয়ে স্লট খুলে ফেলে সেদিনের ‘নিউজ চিপ’টা ঢুকিয়ে দিয়ে, তারপর সিন্থেটিক অরগ্যানিক পাউরুটি, জ্যাম, কলা, মাখন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ আর পোচ সাজিয়ে নিজের কাজে চলে গেল। আদরের পুতিও তখন প্রাতরাশে ব্যস্ত ছিল। “গুড মর্নিং গ্র্যান্ডি! আজ কেমন আছ তুমি?”
নাতি আর নাতবউ কোথায় জানতে চাওয়ায় পুতি বলল, তাঁরা প্রিভিজেট নিয়ে জাপান গেছেন আধঘণ্টা আগে। ওখানকার মাছের বাজারটা বড্ড ভালো যে! লাইভ ভিশন জানাল তাঁদের ফিরতে আর মিনিট আষ্টেক বাকি। আরও জানা গেল রাতের মেনুতে আজ জাপানিজ হোয়াইট স্টিমড রাইস, মিক্সড ক্ল্যাম কারি ও সুশি।
কাগজ পড়ার আগে তিনি জেনে নিয়েছেন আজ ভূতোবাবুরা সপরিবারে ‘ওসাইলাস অ্যান্ড্রয়েড’-এ বেড়াতে যাবেন পুতিসাহেবের কোন বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে। বুদ্ধিমান পুতি দাদুর লোভাতুর, অনুসন্ধিৎসু চোখ দেখে ঠোঁট উলটে জানিয়ে দিয়েছে, এই পার্টিতেও খাবারদাবার বলতে সেই ট্যাবলেট, ক্যাপসুল আর সিরাপ। কাজেই রন্তিদেবও প্রবল অনাসক্তিতে মুখ ব্যাজার করে খবর-কাগজে মন দিলেন।
এই খবর-কাগজে ‘কাগজ’ ব্যপারটাই নেই। হাতে ঢোকানো চিপ থেকে কপালে বসানো ‘স্প্যানাভিশন’-এ ফুটে ওঠে যাবতীয় খবর, সিকোয়েন্স বদলে পড়াও যায়। দেশ-দেশান্তরের সমস্ত খবর ছোট্ট চিপে বন্দি। বড্ড সুবিধের জিনিস, রন্তিদেব ভাবেন। আগেকার দিনে মাথার উপর ঘোরা পাখার হাওয়ায় বা বাইরে থেকে আসা হাওয়ার সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হত কাগজ নিয়ে। অবশ্য আজ পাখা বলে জিনিসটাও নেই, আর প্রকৃতির শীতল গা জুড়োনো বাতাস? দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রন্তিদেব। প্রকৃতি জিনিসটাই যে আর নেই!
খবর-কাগজে প্রথমেই তার চোখ আটকে গেল একটা খবরেー’মঙ্গলগ্রহের সরকারি আবাসনে দিনেদুপুরে অভূতপূর্ব ডাকাতি!’
সপাটে পড়ে ফেললেন খবরটা রন্তিদেব। প্রথমবার এভাবে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে এই আবাসনে, দিনেদুপুরে, বাড়িভর্তি লোকজনের নাকের ডগার উপর দিয়ে। আবাসনের ওই বাড়িতে থাকেন এক নামকরা সোনার গয়না ব্যবসায়ী। কাজেই ধরে নেওয়া যায়, লোকের কাছে খবর ছিল। তার উপরে, সে-বাড়ির একমাত্র মেয়ের নাকি বিয়ে ঠিক হচ্ছিল। সুতরাং ঝোপ বুঝে কোপ। এই পর্যন্ত তো ঠিকই ছিল, কিন্তু ডাকাতির ধরনটাই তাজ্জব করে দেওয়ার মতো। অথচ আজকালকার প্রতিটি বাড়ি যেভাবে ‘দ্য ভিজিল’ নামক ইন্টারনেট চালিত ‘কোর ফর্টিফাইড সিকিউরিটি’ এবং ‘ভার্চুয়াল আই’ দ্বারা সুরক্ষিত, এ-জিনিস কী করে ঘটে?
ঠিক দুপুরবেলা, সে বাড়িতে সবাই যখন খেয়েদেয়ে দিবানিদ্রার ব্যবস্থা দেখতে ব্যস্ত, হঠাৎ দেখা যায় মেঝের ও প্রতিটি দেওয়ালের মাঝখানে অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটা সাবসোনিক সাউন্ড এফেক্টের সাথে তৈরি হচ্ছে একাধিক ‘ওয়ার্ম-হোল’। সেই ওয়ার্ম-হোল বড়ো হতে হতে বিশালকায় বহুমুখবিশিষ্ট এক ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো বাড়ির যাবতীয় জিনিসপত্র ধুয়ে মুছে সাফ করে নিয়ে যায় তিরিশ সেকেন্ডের ভিতর! বাড়ির লোক ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই ডাকাতি শেষ।
ওয়ার্ম-হোলগুলো যেভাবে শুরু হয়েছিল, সেভাবেই হঠাৎ করে থেমে গেছিল বাড়ির প্রতিটি জিনিস সুনিশ্চিতভাবে টেলিপোর্ট হবার পরে। কানে তালাধরা অবস্থাটা কমতে ফুটে উঠেছিল একটা বিকৃত, ধাতব আর বিদ্রূপাত্মক কন্ঠস্বর, ‘প্লেজার ওয়ার্কিং উইদ ইউ, থ্যাঙ্কস!’
এরকম ডাকাতির কথা এতবছরের জীবনে কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি। আগাগোড়া ডাকাতি হয়ে গেল, একটা মানুষের টিকিও দেখা গেল না? জিনিসগুলো কোথায় গেল, কোন গ্রহের লোক নিল, কোথায় পাঠাল, আদৌ মানুষে নিল না রোবোটে ডাকাতি করল, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। চুরি-ডাকাতি তো মানুষের জীবনে আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে। যারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায় দাঁতে দাঁত চেপে তাদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু রুখে দাঁড়াবার কোনও উপায়ই তো এক্ষেত্রে পেল না কেউ! এ অবস্থায় কী করণীয়, অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া? মাথা নাড়াতে থাকলেন রন্তিদেব, না জানি আরও কত কী দেখে যেতে হবে এই জীবনে!
ঘেন্না ধরে গেল। এটা কী ধরনের ডাকাতি? এতে কোন গৌরব আছে? এ তো ম্যাজিক দেখানোর মতো ব্যাপার! ডাকাতির কলঙ্ক! মেজাজ এতটাই খারাপ হয়ে গেল, যে সেদিনের মতো কাগজ পড়ায় ক্ষান্ত দিলেন তিনি। অনেকক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পর একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। বাডিকে ডেকে নির্দেশ দিলেন ‘ড্রিমোস্কোপ’ আর তার সাথে ‘টাইম-ফ্রেম’ ডিভাইস দুটো রেডি করে ‘মিউচুয়াল কম্প্যাটিবিলিটি সেট-আপ’ করতে। লাঞ্চের পর আজ উনি একবার বেরোবেন।
বাডির মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু ‘লেভিটেশনে’ ভেসে বেড়ানো তার স্বাভাবিক গতিবেগ বাড়তে বোঝা গেল, রন্তিদেব কোনও অভিযানে বেরোলে তাঁর দায়দায়িত্বের সাথে বাড়তি কাজের চাপ কতটা বেড়ে যায় এক লাফে।
দুপুরবেলায় বারোটা নাগাদ সবাই মিলে লাঞ্চ সারা হলে নাতিদের বিদায় জানালেন ছাদ থেকে রন্তিদেব। প্রিভিজেটের চালকের আসন থেকে নাতি বললেন, “দাদু, সাবধানে ঘুরে এসো। কোনও অসুবিধে হলে ‘ইউবিকুইটান হাইওয়ে’-তে আমায় ধরে নিও কিন্তু! বাডি, দাদুর রিভাইভাল কিট, এক্সেসারিজ, টুল কিট চেক করে নেবে।“
আরও কিছু হয়তো বলতেন ভূতোবাবু, কিন্তু দাদুর কটমটে চাউনি দেখে স্ত্রী-পুত্রের সামনে জোরালো বকুনি খাওয়া এড়াতে তড়িঘড়ি প্রিভিজেট সেট করে ‘গো’ হলেন।
নিজের ঘরে ফিরে এসে এবার বেরোবার তোড়জোড়ে লাগলেন রন্তিদেব। বাডি-৪কে বললেন ‘প্রিজারভেশন ক্লোজেট’ থেকে সবচেয়ে ভালো ধুতি-পাঞ্জাবি আর চামড়ার শুঁড় তোলা নাগরাই বার করতে। তার সাথে সোনার পকেট ওয়াচ আর জার্মান মোনোকলটা। ওসব পরে তৈরি হয়ে নিলেন। আবার একটু আতরও লাগিয়ে ফেললেন আনন্দের আতিশয্যে। আগে থেকে প্রোগাম করা মেশিনগুলো সেট করাই ছিল, তিনি স্রেফ ‘এ ভি ভিশন’টা পরে নিয়ে বাডিকে নির্দেশ দিলেন তাঁর যাত্রা শুরু করিয়ে দিতে।
ড্রিমোস্কোপ তাঁকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে যাবে, আর টাইম-ফ্রেম তাঁকে নিয়ে ফেলবে ঠিক যে সময়টাতে তিনি ফিরতে চেয়েছেন।
এত সাজগোজ করে কোথায় চললেন রন্তিদেব মজুমদার?
১৯৫০-এর কাছাকাছি কোনও এক ডাকাতির রাতে কোনও এক জমিদারবাড়ি তাঁর লক্ষ্য, যখন ডাকাতি নিছক ডাকাতি ছিল না, ছিল রীতিমতো এক উৎসব। একেকটি ডাকাতি সেই গ্রামের জমিদারের দর বাড়াত তাঁর প্রজাদের সামনে।
এ ভি ভিশনটা চোখে দিয়ে রিক্লাইনারে লম্বা হতেই চোখের সামনে নীলচে আলো ফুটে উঠল, আর মৃদু গুনগুন শব্দে তলিয়ে গেলেন রন্তিদেব।
দু’মিনিট পর নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক বিশাল ছাতের উপর লাল মখমলের আরামকেদারায় বসে গড়গড়া টানা অবস্থায়। চিলেকোঠার ঘর থেকে হলুদ আলো এসে পড়ছে জায়গায় জায়গায় নোনাধরা কোমর সমান উঁচু প্যারাপেটের গায়ে। গা ঝেড়ে উঠে পড়লেন রন্তিদেব। উপর থেকে দেখলেন উঠোন লোকে লোকারণ্য–চারদিকে সাজ সাজ রব! বিয়েবাড়ির প্রস্তুতি রীতিমতো। বিশাল বিশাল হাঁড়ি, ডেকচি, কড়াই করে রান্না বসেছে উঠোন জুড়েーতদারকিতে ব্যস্ত স্বয়ং জমিদারমশাই। একপাশে জমিয়ে ভিয়েন বসেছে। সেখান থেকে ভেসে আসা স্বর্গীয় সুগন্ধ চিরকালের ভোজনরসিক রন্তিদেবকে আর ছাদে থাকতে দিল না। তিনি পায়ে পায়ে নেমেই এলেন নিচে।
কিন্তু সব ছাপিয়ে একটা খটকা লাগছে যেন তার মনে। বাডি কি মেশিন ঠিকঠাক সেট করতে পারেনি? এ তো রীতিমতো কাজের বাড়ি মনে হচ্ছে–মানে বিয়েবাড়ি বা পৈতেবাড়ি যেমন হয় আর কী!
নিচে এসে ইতিউতি তাকিয়ে ভীষণ ব্যস্ত এক বাজার সরকারকে পাকড়াও করে জেনে নিশ্চিন্ত হলেন, যে সেদিনই বাংলার ত্রাস, দুর্দান্ত মনা ডাকাত আর তার ভীম পালোয়ান ডাকাতদল এ-বাড়িতে ডাকাতি করতে আসার এত্তেলা পাঠিয়ে রেখেছে। মনটা ভালো হতে শুরু করে তাঁর। আহা, কীসব ডাকাত ছিল বাংলায় – যেমন দুরন্ত, তেমন বুকের পাটা আর সেরকম দরাজদিল মানুষ সব, তাদের সান্নিধ্যে মনটা ভালো হয়ে যায়।
আজ তিনি তা ফের চাক্ষুষ করবেন, ভাবতে ভাবতেই জমিদারবাবুর মুখোমুখি। চাপা উৎকণ্ঠার ফল কি না জানা নেই, তিনি রন্তিদেবের দিকে হাসিমুখে একটা নমস্কার ছুড়ে দিয়েই অন্যদিকে ছিটকে গেলেন। রন্তিদেবের উপস্থিতির চেয়েও এই মুহূর্তে জাফরানের অস্তিত্ব সংকটে!
ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন রন্তিদেব। জমিদারবাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে তেল মাখানো বাঁশের লাঠি বনবনিয়ে ঘুরিয়ে চলেছে চল্লিশজন বিশ্বস্ত লাঠিয়াল, হরুসর্দারের তত্ত্বাবধানে। তাদের মুখচোখ থমথমে আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়। এসময়ে বাজখাঁই গলায় হাঁক পাড়েন জমিদারমশাই, “সুলেমান! বাড়ির ছোটো ছেলেমেয়েদের গোলাপজল আর পদ্মপাপড়ি নিয়ে দরজায় দাঁড়াতে বল, মনাদের আসার সময় হয়ে যাচ্ছে।”
সেই গলা শুনে লাফিয়ে উঠল হরু সর্দারের দলটাও। “জয় মা ক্কালী, আর ভয় নেই রে! কত্তাবাবু, আমরা তৈরি।”
উপর থেকে ভেসে এল একটা কাঁপা কাঁপা খোনা কন্ঠস্বর, “পেস্তাবাদামের সরবতে যেন তুলসীপাতা দিসনি খোকা, মনা আমার তুলসী একদম সহ্য করতে পারে না। ওদের বরং পুদিনা দিতে বল।”
জমিদারবাবুর আশি বছরের মা।
দেখেশুনে চমৎকৃত হলেন রন্তিদেব। দুনিয়া কাঁপানো ডাকাত, সে আসছে সবকিছু লুটেপুটে নিয়ে যেতে, তার উপর কত স্নেহ ভালোবাসা! ডাকাত কী খাবে না খাবে তা নিয়ে এঁদের কত ভাবনা। আহা, কীসব দিন ছিল! এসব ভাবতে ভাবতেই দূর থেকে শোনা গেল রক্ত জল করা গগনভেদী হুহুঙ্কার – ‘হা রে রে রে রে রে!’
আটটা ঘোড়া আর বাকি সবাই পদব্রজে, খান পঞ্চাশেক তেল মাখা দশাসই কালোকোলো মূর্তি বিশাল উঠোনের দখল নিল। পরনে তাদের মালকোঁচা মারা হেঁটো ধুতি, কোমরে কষে বাঁধা রক্তলাল শালু, হাতে তেল মাখানো বল্লম, মাথায় কালো ফেট্টি, আর প্রত্যেকের ইয়াবড়ো বাবরি চুল আর গালপাট্টা! তেল চুকচুকে শরীরে আলো-আঁধারিতে চিকচিক করছে গোলাপজলের ফোঁটা, কারও কারও মাথায় লেগে আছে পদ্মপাপড়ি। এসে পড়ল মনা ডাকাতের দল।
মনা ডাকাতের চেহারাটি বড়ো সুন্দর। বয়স কত হবে? বড়োজোর কুড়ি পঁচিশ। পাথর কুঁদে বানানো চেহারায় থুতনিতে পশমের মতো একগোছা ‘নূর’ দাড়ি। সে এসেই জমিদারবাবুকে প্রণাম করে জানতে চাইল, “ঠাকুমা কুথা বটেক?”
জমিদারবাবু দোতলার বারান্দার দিকে ইঙ্গিত করতেই দু’পা পিছিয়ে গিয়ে হাতের বল্লমটায় ভর করে এক পেল্লায় পোল ভল্টে ছোকরা পৌঁছে গেল তার ঠাকুমার কাছে। হাততালির গর্জনের ভিতর মনাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন বুড়ি। ওখান থেকেই খসখসের দড়িতে ঝুলে নেমে এল ফের মনা ডাকাত। রন্তিদেব ভাবলেন, ওই যুগেও ভরপুর প্যাকেজিংয়ের ব্যাপার ছিল বটে। এখনকার দিন হলে ছোকরা একখান সুপার হিরো হয়ে পড়তই পড়ত।
জমিদার তাকে পাশে নিয়ে বসালেন, ডাকাতদলও বসল উঠোনে গোল করে। সবাইকে পেস্তাবাদামের সরবত দিতে তারা এক চুমুকে সেটা শেষ করে প্রমাণ সাইজের ঢেঁকুর তোলার উপক্রম করতেই রুপোর নকশি থালায় বেনারসি পান এসে গেল। পান দেওয়া শেষ হতে খালি রুপোর থালাটা ভয়ে আমসি মেরে যাওয়া বাচ্চা পরিচারকটির হাত থেকে কেড়ে তার ঝোলায় ঢোকাতে যাচ্ছিল এক ডাকাত। চোখের কোণ দিয়ে সেটা নজর করে ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো তার সামনে এসে দাঁড়াল মনা।
একটাও কথা নয়, মুখ নিচু করে সেই ডাকাত পায়ে পায়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল মনার পায়ের কাছে বল্লম ও তাম্রশাসন জমা দিয়ে। এটাই মনার অনুশাসন। নীরবে লোকটা দল থেকে বিতাড়িত হল। তাকে লোভ সংবরণ না করতে পারার খেসারত দিতে হবে গ্রামছাড়া হয়ে। গোঁফ চুমরোতে চুমরোতে গলা ঝাড়লেন রন্তিদেব, “এথিক্স, এথিক্স!”
এসবের পর্ব মিটতেই মনা জমিদারবাবুর দিকে রোষকষায়িত নয়নে তাকিয়ে বলল, “কত্তা, তাইলে কাজের কতা হোক!”
জমিদারবাবু স্মিতহাস্যে ঘাড় কাত করেই নায়েবমশাইকে তলব করলেন। নায়েবমশাই লম্বা ফর্দ নিয়ে তৈরিই ছিলেন। কাঁপতে কাঁপতে সেটি মনার হাতে ধরিয়ে দিতে সে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “ঠিকই আছে কত্তা, শুধু ঘোড়া দু’খান বাড়ায়ে দ্যান, আমার দুটা ঘোড়া মইরেছে। আর গুড়টা বড়ো ভালো ছিলেক, তিন হাঁড়ি দিবেন আমায়।”
এরপর সে ফর্দটা তার প্রধান সাগরেদ নিমাই ওস্তাদের কাছে জমা করে দিল।
এবার নিমাই দলকে দু’ভাগে ভাগ করে একদলকে জিনিসপত্রের ফর্দ বুঝিয়ে দিল, আরেকদল জোরকদমে ভুষো কালির সাথে আরও তেল-টেল মেখে লাঠিখেলার তোড়জোড়ে ব্যস্ত হল। তিরিশজন ডাকাত তিনমহলা অট্টালিকার নানান খাঁজে খুপরিতে সেঁধিয়ে গেল ফর্দমাফিক বেঁধেছেঁদে রাখা জিনিসপত্র জোগাড় করে আনতে।
প্রবল ঢাকঢোল, কাড়ানাকাড়ার জগঝম্পে শুরু হল মনা ডাকাতের দল বনাম হরু সর্দারের দলের উপাদেয় লাঠিখেলা। এ দল একবার জেতে, তো ওই দল পরেরটা। জমিদারমশাই ও মনা ডাকাত মশগুল হয়ে গেল খেলায়। এমনকি রন্তিদেব আগ্রহে এগিয়ে যেতে ডাকাতদলের একজন তাঁকে একটা বেতের চেয়ার এগিয়ে দিল।
তিনি বসতেই মনা ডাকাতের চোখ পড়ল তাঁর দিকে। ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন রন্তিদেব। কারণ, মনার ভাঁটার মতো চোখের নজরটা মোটেই নিরামিষ ছিল না। জমিদারবাবু অতিথি পরিচয় দিয়ে আলাপ করিয়ে দিতে তবে সে চোখের আগুন নিভল। একটু পরেই আবার সবাই মিলেই জমে গেলেন লাঠিখেলায়। এ-পক্ষ ও-পক্ষ থেকে, থেকে থেকে আশরফি, মোহরের বকশিসের বান ডেকে গেল।
ওদিকে বাকি ডাকাতদল নির্বিঘ্নে তাদের কাজকর্ম শেষ করে ফেলেছে। জিনিসপত্র একত্রিত করে একদিকে গুছিয়ে আবার বাড়ির মহিলাদের কাছ থেকে নতমস্তকে দু’হাত পেতে গয়নার পোঁটলা গ্রহণ করে প্রণাম জানিয়েছে দুর্দান্ত ডাকাতেরা নিমাই ওস্তাদের নজরদারিতে। ক্লান্ত হয়ে তারা দাওয়ায় বসে পড়তে আবার এক গ্লাস করে সরবত দেওয়া হয়েছে তাদের। বিগলিত চাকরবাকররা হাতপাখা টেনে টেনে তাদের পরিচর্যায় ব্যস্ত।
ডাকাতি মোটামুটি শেষ। এবার সবাই অপেক্ষায় লাঠিখেলা শেষ হবার জন্য, কারণ এরপরই খাওয়াদাওয়ার পালা। কিন্তু কেউ আর ওঠে না। অগত্যা ঠাকুমাকে আবার গলা ছাড়তে হল, “লক্ষী দাদা মনু, খেতে আয় খোকন, আমার বাতের ব্যাতা জানিস তো। আফিম খেয়ে আর দাঁইড়ে থাকতে লারছি বাবা, দলবল নিয়ে খেইতে আয় সোনা!”
আর একবারও বলতে হয়? পাঁচ মিনিটের ভিতর উঠোন পরিবর্তিত হল খাবারঘরে। লাইন দিয়ে বিশাল বড়ো বড়ো পিতলের বারকোশ আর ডজন ডজন বাটির সামনে বসে পড়ল ডাকাতদল। জমিদারবাবু, মনা আর আমাদের রন্তিদেবের জায়গা করা হয়েছে একটু আলাদাভাবে, একটু রাজকীয় আয়োজন ওঁদের জন্য। হাজার হোক, মুড়ি আর মিছরির দরটা যে সে যুগে আলাদাই ছিল। ওঁদের জন্য বিশাল একটা পাথরের টেবিলে শ্বেতপাথরের থালা-গ্লাস-বাটিতে করা হয়েছে খাবার আয়োজন।
দেখেশুনে রন্তিদেব বড়োই লজ্জা পেলেন। তারও তো একটা মানসম্মানের ব্যাপার আছে, হাজার হলেও জমিদারের অতিথি বলে কথা! তিনি দোনোমনা করে সোনার পকেট ওয়াচটা বার করে মনা ডাকাতের হাতে দিলেন। “ভাই, এটা আমার তরফ থেকে সামান্য একটা উপহার। রাখো… ইয়ে, মানে রাখুন, এতে সময় দেখবেন আপনি।”
হাতে নিয়ে উলটেপালটে জিনিসটা দেখে কী বুঝল কে জানে গ্রামবাংলার অশিক্ষিত ছেলেটা, কিন্তু হাতজোড় করে উপহারটা গ্রহণ করল সে। পরমুহূর্তেই নিমাই সর্দারের কাছ থেকে একটা মোহর নিয়ে দু’হাতে অঞ্জলি দেওয়ার ভঙ্গিতে এগিয়ে ধরল রন্তিদেবের দিকে।
নেবেন কি নেবেন না ভাবতে ভাবতেই রন্তিদেব দেখলেন মনার চোয়াল শক্ত হচ্ছে। জমিদারবাবু তড়িঘড়ি বললেন, “নিয়ে নিন মশাই, দু’হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিন, ওটা ওর তরফ থেকে অতিথিকে নজরানা। ওটা না নিলে কিন্তু আপনার স্বাস্থ্যের দায়িত্বভার আমার নয়।”
শুনেই খপাত করে মনা ডাকাতের হাত থেকে মোহর তুলে নিলেন রন্তিদেব। এটুকু সময়েই তিনি চপচপিয়ে ঘেমে উঠেছেন বেশ।
মনার মুখে আবার হাসির একটা রেখা ফুটে উঠতেই ওদিক থেকে থরে থরে এগিয়ে আসতে লাগল জিভে জল আনা, পেট চনমন করে তোলা সুখাদ্যের সমাহার। শান্ত হয়ে ভাবলেন রন্তিদেব, ‘ওই সময়েও রিটার্ন গিফটের প্রচলন ছিল আমাদের দেশে?’ গর্বে কি না জানেন না, ভীষণ একটা ভালোলাগায় ভরে উঠতে লাগল তাঁর মনটা।
খাবারের কথা আর নতুন করে কী বলি? জমিদারবাড়ির অসাধারণ ভোজসভা বলাই ভালো। বাড়ির গরুর খাঁটি দুধের সরতোলা ঘি, নারকোলের সাথে পাঁচ পদের ভাজা দিয়ে শুরু। তারপর মাছের মাথা দেওয়া সোনামুগের ডাল, রকমারি শাকের পদ ছাড়াও আরও সাত-আট রকমের নিরামিষ পদ। জমিদারবাবুর মাও কোঁকাতে কোঁকাতে নেমে এসে খাওয়ায় উৎসাহ দিতে লাগলেন ওঁদের। পেঁপের কালিয়া, গহনাবড়ির ঝাল, কাঁঠালের কালিয়া, মনোহারী শুক্তো, ওলের ডালনা, কচুর লতির মিষ্টি চচ্চড়ি, করলার মনবাহার তরকারি, আরও কত কী!
তারপর যথাক্রমে এল সাদা পোলাও, হলদে পোলাও আর শেষে মিষ্টি পোলাও। প্রথমটির সাথে বিশাল বিশাল সাইজের দই-মাছ। খেয়ে মাথাটা ঘুরে যাচ্ছে রন্তিদেবের। জমিদারের মাও তাঁকে আর তাঁর আদরের মনাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারপর হলদে পোলাওয়ের সাথে এল গলদা চিংড়ির মালাইকারি। রন্তিদেব যেন স্বর্গারোহণ করছেন, সেই সুখময় অভিব্যক্তি নিয়ে খেতে থাকলেন।
এসব খেতে খেতেও তাঁর চঞ্চল চোখ পড়ে গেল ডেকচি চেপে চলমান পাতায় মোড়া ইলিশের পাতুরির উপর। চিংড়ির খোলা ছাড়াতে ছাড়াতে ইশারা করে দিলেন পরিবেশনকারীকে। সে তাঁর ওজনকে ‘অনার’ করে পাঁচটা পাতুরি-বর্ষণ করল পাতে।
মিষ্টি পোলাও আর মাংসের কোর্মা যখন তাঁর দিকে এগিয়ে এসেছে, তখন তিনি রীতিমতো হাঁসফাঁস করছেন। কিন্তু ছাড়েনই বা কী করে? দু’হাতা উড়িয়ে দিলেন দেওয়ার সাথে সাথে, আর তাই দেখে খোদ মনা ডাকাতের ইঙ্গিতে আবার তাঁর পাত ভর্তি হয়ে গেল পোলাও আর নধর, সুস্বাদু মাংসের বড়ো বড়ো লালচে ঝোলে মাখা গোটা বিশেক টুকরোতে।
আরও আধা ঘণ্টা পরে যখন পায়েস, মিষ্টি, চাটনি, পাঁপড়, দই খেয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা জমিদারবাড়ির লোকজন, এমনকি তাবড় তাবড় ডাকাতদের সামনে দিয়ে আঁচাতে গেলেন, তখন তিনি আর ভাঁজ হতে পারছেন না। তাঁর মনে আর আইসক্রিম না খাওয়ার আক্ষেপ অবশিষ্ট নেই, যদিও সে জিনিসের আবিষ্কার তখনও ঘটেনি। এতটাই খেয়ে ফেলেছেন রন্তিদেব যে তাঁর পেটে মুখশুদ্ধি ঢোকানোর জায়গাও নেই।
ডাকাতি শেষ, এবার সবাই আস্তে আস্তে বিদায় নেবে, রন্তিদেবেরও বাড়ি ফিরতে হবে, এমন সময়ে ঘটে গেল অনভিপ্রেত ঘটনাটা।
লোকটার মোটেই দোষ ছিল না। সে বেচারা খাওয়াদাওয়া সেরে আরাম করে খড়কে মুখে দিয়ে, বল্লমটা তুলে নিয়ে জিনিসপত্র ওঠাতে যাবে–তার আগে মাথার ফেট্টি খুলে লম্বা বাবরি চুলের ভেজা রাশি শুকোতে যেই না মাথা ঝাঁকিয়েছে, জমিদারবাবুর ছোটো মেয়ে অন্ধকারে সেই দেখে ভয়ের চোটে পিছোতে গিয়ে পা পিছলে একেবারে উঠোনে আছড়ে পড়ল। হইচই লেগে গেল চারদিকে। দোষী লোকটার মাথাই কেটে ফেলে দেবে রাগে ফুটতে থাকা মনা ডাকাত!
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হতে সকলে আসল ঘটনা জানাতেও মনার রাগ পড়ে না। সে বলতে থাকে, “আমি ইহাদের রক্ষা করি বটেক! কার সাধ্যি যে ইহাদের কেউ ক্ষেতি করে? সেই আমার লোক হইয়ে তু কিনা কত্তার বিটির দিকে লজর দিলেক! খুন করি ফেইলব তরে!”
তারপর মনার ঠাকুমা যখন আসরে নেমে মনাকে আসল ঘটনা জানালেন, তখন অগত্যা বেচারি ডাকাতকে ছাড়ল সে। কিন্তু শাস্তিস্বরূপ সে ঠিক করে দিল, এ বাড়িতে পরের ডাকাতি অবধি সেই ডাকাতের কাজ হল জমিদারবাবুর মেয়ের সাথে রোজ পাঠশালায় যাওয়া আসা করা, আর রোজ তাকে টিফিন পৌঁছনো।
সবাই খুশি হল এই বিচারে, বেচারা ডাকাত ছাড়া। সে বল্লম-টল্লম ফেলে দিয়ে জমিদারবাবুর ছোটো মেয়েকে কোলে তুলে নিল।
মনা ডাকাতের জয়ধ্বনি দিতে দিতে আবার ‘হা রে রে রে রে’ শব্দে ডাকাতরা জমিদারবাড়ি ছাড়ল। জয়ধ্বনি জমিদারবাড়ির লোকজনেরাও দিতে থাকল। শাঁখ বাজাতে থাকল বাড়ির মহিলারা, এমনকি রন্তিদেবের চোখেও আবেগে জল এল। তিনিও মনে মনে বলে উঠলেন, ‘মনা ডাকাতের জয়, বাংলার ডাকাতের জয়, বাংলার বীর সন্তানদের জয়!’
তারপর তিনি জমিদারবাবু আর ওঁর মার সাথে দেখা করে বিদায় জানিয়ে এলেন। জমিদারবাবুর মাকে প্রণাম করতে তিনি তাঁকে আশীর্বাদ করে দু’হাত নিজের গালে রেখে অবাক হয়ে বললেন, “না হয় এট্টু বেশিই খেয়েছ তুমি। পেটে বেদনা হলে দুটো হরতুকি আর আমলকি গালে ফেলে রেখো। বুঝি, উঠতি বয়সের ছেলে, দেখো না, আমার খোকন একেবারেই খায় না!”
সিংহদরজার বাইরে বেরিয়ে কাছের অন্ধকার বাগানের কাছে আসতেই শুরু হল ‘বিপ-বিপ-বিপ’, সেই ড্রিমোস্কোপের ‘টি আর’ অর্থাৎ টাইম রিমাইন্ডার। আবার সেই যন্ত্রময় যন্ত্রণার জীবনে ফেরত যাবার শমন এসে গেছে। কোমরে হাত রেখে শরীরটা একটু এদিক ওদিক করতেই সুদীর্ঘ এক ঢেঁকুর। পকেট থেকে জমিদারবাবুর মায়ের দেওয়া আমলকির একটুকরো বার করে মুখে ফেলতেই সেই ফিকে নীল আলো এসে রন্তিদেবকে গ্রাস করল।


রিক্লাইনারের উপর যে মুহূর্তে তাঁর চোখ খুলল, তিনি দেখলেন বাডি-৪ অতন্দ্র প্রহরায় বসে তাঁর ফেরার অপেক্ষায়। তাকে কাছে ডাকলেন তিনি। হাত বাড়িয়ে উপহার পাওয়া সোনার মোহরটা দিয়ে বললেন, “অ্যানালাইজ প্লিজ।”
যেই না বাডি সেটা নিয়ে ব্যস্ত হল, নিপুণ দক্ষতায় তার ঘাড়ের নিচের সুইচে রন্তিদেবের আঙুল বসে গেল। বাডি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়তে রন্তিদেব তার হাত থেকে মোহরটা নিয়ে সোজা চলে গেলেন প্রিজারভেশন ক্লোজেটে।
সোনার পকেট ঘড়িটা গেছে যাক, সেটা গেছে দুর্দান্ত কলিজার এক মানুষের কাছে, তাঁর একফোঁটাও আফসোস নেই সে ব্যাপারে। তিনিও ভাগ্যবান, তার মতো কালান্তক এক বীরের হাত থেকে একখানা মোহর তো তিনি পেয়েছেন–সেকালের জ্বলন্ত দস্তাবেজ। আর যে সুখকর স্মৃতি নিয়ে তিনি আজ ফিরলেন অতীত থেকে, সেটাই তাঁর কাছে আগামী বেশ কিছু দিনের অক্সিজেন।
লাইভ ভিশনে নাতিদের নিজের ফেরার খবর জানিয়ে, তাদের ফিরতে অনেক দেরি আছে জেনে নিয়ে রন্তিদেব লাজুক মুখে জানালেন রাতে জাপানিজ স্পেশাল ডিশে তাঁর রুচি নেই। তাই বাডিকে দিয়ে তিনি জমিয়ে সিন্থেটিক অর্গ্যানিক ডিনার বানিয়ে খেয়ে নিচ্ছেন, আর তারপর বাডিকে ছুটি দেবেন সন্ধেটা। এই না বলে কানেকশন টার্মিনেট করে তিনি জামাকাপড় ছেড়ে জমিয়ে রাখলেন জুতোর সাথে, ডিটক্সিফাই করার জন্য। তারপর রিফ্রেশোতে ঢুকে তরতাজা হলেন। নতুন ‘ইভনিং বাবল’ পরে বেরিয়ে এসে বাডির ‘পেটি নোটস স্লট’-এ কিছু নির্দেশ ঢুকিয়ে দিলেন আর অন টাইমার সেট করে দিলেন দু’ঘণ্টা সময়ের। তারপর আবার ক্লোজেট থেকে ‘এয়ারকন্ডিশন্ড ট্র্যাকসেট’ পরে বাড়ি ইউনিক জেনেরিক কোড দিয়ে ‘কোর লকিং’ করে ছাতে উঠলেন।
একটা মোনোক্যাব ডায়াল করে, তাতে চড়ে বসে রন্তিদেব হুঁশ করে রওনা হয়ে গেলেন শান্তিনিকেতনের দিকে–দেড় মিনিট লাগবে পৌঁছোতে। ছোটোবেলার বন্ধু বেচারা সোমেশটা ডিপ্রেশনে খুব ভুগছে। দেখা যাক আজকের ঘটনার গল্প শুনে সে ব্যাটা চাঙ্গা হয় কি না। আর তাছাড়াও একটু বেড়িয়ে না এলে পেটের ভিতরের গন্ধমাদনটার কী হবে? হজম করতে হবে তো রাতারাতি! নইলে বাডি-৪ কাল সকালে তাঁর চেক-আপ করেই আঁতকে উঠে, থুড়ি ‘ডিসম্যাল শিভার’-এ কেঁপে উঠেই তাঁকে সটান অটোডকের কাছে টেলিপোর্ট করে দেবে যে!


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

1 comment:

  1. প্রতীক, প্রথমবার পড়লাম তোমার রন্তিদেবেরের গল্প, কল্পনাটা অসাধারণ, আর প্লটটিও চমৎকার, আরও পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম

    ReplyDelete