বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ অস্ত্রের ঝংকারঃ (২য় পর্ব) - কিশোর ঘোষাল



প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

এক

সেকালে তির-ধনুক ছাড়া যে অস্ত্রটি সবথেকে জনপ্রিয় ছিল, সেটি তলোয়ার। আমাদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী অস্ত্র বললাম ঠিকই, কিন্তু এটি একটি শস্ত্র, হাতে ধরে রেখে শত্রুকে আঘাত করার জন্যে। ইস্পাতের তৈরি ধারালো পাতের নাম তলোয়ার বা সংস্কৃতে তরবারি। কিন্তু পৌরাণিক যুগে তার নাম ছিল অন্য। সেই শস্ত্রগুলির প্রায় অধিকাংশই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা আর বহুদিন ব্যবহার করিনি। এই শস্ত্রগুলির দেখা পাওয়া যায় দেবদেবীদের হাতে, কিংবা ব্যবহার হয় বিশেষ বিশেষ পুজোর উপচার হিসেবে।
মহাভারতের শান্তি পর্বে ভীষ্ম যখন কুরুক্ষেত্রে শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যুর দিন গুনছেন, সেই সময় চতুর্থ পাণ্ডব নকুল পিতামহ ভীষ্মকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হে পিতামহ, জনসমাজে তির-ধনুককেই সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র বলা হয়ে থাকে, কিন্তু আমার মতে খড়গই শ্রেষ্ঠ। যুদ্ধের সময় ধনুক ভেঙে গেলে কিংবা যোদ্ধা অশ্বহীন হয়ে পড়লেও একমাত্র খড়গ দিয়েই আত্মরক্ষা এবং শত্রুনিধন করা সম্ভব। খড়গধারী বীরপুরুষ একাই অনেক তিরন্দাজ ও গদাধারী অসংখ্য শত্রুকে পরাজিত করতে পারেন। সবধরনের যুদ্ধে আপনি কোন অস্ত্র বা শস্ত্রকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন? আর এই খড়গ কে বানিয়েছিলেন, কীভাবে বানিয়েছিলেন, খড়গ বানানোর উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?”
পিতামহ ভীষ্ম নকুলের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির কিছুকাল পরেই হিরণ্যকশিপু, হিরণ্যাক্ষ, বিরোচন, নমুচির মতো কিছু দানব পিতামহ ব্রহ্মার শাসন অস্বীকার করে প্রাণীদের প্রতি অত্যন্ত অত্যাচারী ও নৃশংস হয়ে উঠেছিল। তখন প্রজাপিতা ব্রহ্মা দানবদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্যে এক মহা যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সেই যজ্ঞের আগুন থেকে এক দুর্ধর্ষ পুরুষ সৃষ্টি হলেন। তাঁর দেহ বেশ লম্বা, গায়ের রং নীলপদ্মের মতো শ্যামল, ভীষণ ধারালো দাঁত আর তাঁর পেট খুব সরু। তাঁকে দেখে জগৎ সৃষ্টিকারী ব্রহ্মা বললেন, ‘আমি দানবদের বিনাশের জন্যে এবং জনগণের রক্ষার জন্যে অসি নামের এই পুরুষকে সৃষ্টি করেছি।’ পিতামহ ব্রহ্মা এই কথা বলা মাত্র সেই পুরুষ তীক্ষ্ণধার খড়গের রূপ ধারণ করলেন।
“সেই খড়গ তিনি ভগবান রুদ্র বা দেবাদিদেব মহাদেবের হাতে তুলে দিলেন। ভগবান রুদ্র সেই খড়গ দিয়ে ভীষণ যুদ্ধ করে অসুর ও দানবদের বিনাশ করলেন। সেই খড়গ পুরাকাল থেকে বহু ঋষি এবং মহাবীর রাজাদের হাত ঘুরে ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র আচার্য দ্রোণ পেয়েছিলেন, তাঁর থেকে পেয়েছ তুমি। অতএব এই খড়গ মহাস্ত্র বৈকি! এখন আটরকম খড়গের নাম তোমাকে বলছি, মন দিয়ে শোনো, অসি, বিশসন, খড়গ, তীক্ষ্ণধার, দুরাসদ, শ্রীগর্ভ, বিজয় ও ধর্মপাল।”
এই খড়গই আমাদের চলিত কথায় হয়ে গেছে খাঁড়া, যে খাঁড়া আমরা মা কালীর হাতে দেখি। তবে বাংলায় আমরা খাঁড়া বলতে যা বুঝি, উত্তর ভারতে সেই খাঁড়া কিন্তু একদমই অন্যরকম।
খড়গ
সেই সময়কার কোনও অস্ত্রশস্ত্রই আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছোয়নি। কাজেই তাদের বাস্তব আকার বা চেহারা কেমন ছিল সম্পূর্ণ অনুমানসাপেক্ষ। নিচের একটি ছবিতে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর মাগধী সৈন্যদের একটি যুদ্ধযাত্রার ছবি দিয়েছি, তাতে সেই সময়কার নানান অস্ত্রশস্ত্র, যেমন তির-ধনুক, বল্লম, ভল্ল, গদা, খড়গ বা অসির চেহারা কিছুটা যেন চেনা যায়।
মধ্যপ্রদেশের সাঁচি স্তূপের দক্ষিণদিকের দরজার নিচে এই ছবিটি পণ্ডিতদের অনুমান, মাগধী সৈন্যদের যুদ্ধযাত্রা। এটি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ভগবান বুদ্ধের অস্থি নিয়ে যে যুদ্ধ হয়েছিল, সে যুদ্ধের কল্পনা করে আঁকা।

এছাড়াও আরও দুটি অস্ত্রের কথা না বললেই নয়। তার মধ্যে অন্যতম হল চক্র। ভগবান বিষ্ণু এবং তাঁর এক অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে চক্রটি ব্যবহার করতেন, সেটির নাম ছিল সুদর্শন। ভগবান বিষ্ণু এই সুদর্শন চক্র ব্যবহার করে অনেক অসুর, দানব কিংবা দৈত্যের বিনাশ করেছিলেন। যাদের মধ্যে রাহু ও কেতুর কথা তো নিশ্চয়ই শুনেছ। আর মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সভায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই সুদর্শন চক্র দিয়ে রাজা শিশুপালকে বধ করে সভায় উপস্থিত সকলকে চমকে দিয়েছিলেন। পাশের ছবিতে দেখো, ভগবান বিষ্ণুর মূর্তির পিছনের ডানহাতে চক্র ধরা রয়েছে। এমন একটি মারাত্মক অস্ত্র, ভগবান বিষ্ণু কিংবা তাঁর অবতারদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া কাউকে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। সেক্ষেত্রে বলা যায়, এই চক্র একটি অলৌকিক এবং দৈবী গুণসম্পন্ন অস্ত্র। এই কারণেই ‘শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী’ বলতে একমাত্র ভগবান বিষ্ণুকেই বোঝায়, এগুলি তাঁরই প্রতীক।
সুদর্শন চক্র হাতে ভগবান বিষ্ণু
আরেকটি অস্ত্রের কথা না বললেই নয়, সেটি হল বজ্র। এই অস্ত্রটিও মারাত্মক। এই অস্ত্রটির বারবার ব্যবহার করেছেন দেবরাজ ইন্দ্র। এই বজ্রের সৃষ্টি সম্পর্কে এক অদ্ভুত পৌরাণিক কাহিনি আছে, সেটি খুব সংক্ষেপে বলি। একবার অসুরদের রাজা বৃত্রর আক্রমণে পরাজিত হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে দেবলোক ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। বৃত্রাসুরকে কিছুতেই পরাস্ত না করতে পেরে দেবরাজ ইন্দ্র ভগবান বিষ্ণুর সাহায্য চাইলেন। ভগবান বিষ্ণু বললেন, দধীচি মুনির অস্থি বা হাড় থেকে তৈরি অস্ত্র দিয়েই বৃত্রাসুরকে বিনাশ করা সম্ভব। তখন দেবরাজ ইন্দ্র সকল দেবতাদের নিয়ে দধীচি মুনির কাছে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশের কথা বলে তাঁর অস্থি প্রার্থনা করলেন। দধীচি মুনি ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ স্বীকার করলেন এবং যোগবলে দেহত্যাগ করলেন। মৃত্যুর পর তাঁর অস্থি দিয়ে যে অস্ত্র তৈরি হল, তার নাম বজ্র এবং এই বজ্র দিয়েই দেবরাজ ইন্দ্র বৃত্রকে হত্যা করে দেবরাজ্য উদ্ধার করেছিলেন। নিচের ছবিতে ঐরাবতের পিঠে চড়ে দেবরাজ বজ্রপাণি ইন্দ্র, পিছনের বাঁহাতে বজ্রাস্ত্র ধরা রয়েছে।
বজ্র হাতে (বাঁহাত) দেবরাজ ইন্দ্র
এই বজ্রাস্ত্রের কথা শুধু যে ভারতীয় পুরাণ বা শাস্ত্রে পাওয়া যায়, তা নয়। থান্ডারবোল্ট (thunderbolt) নামের যে অস্ত্রটির কথা গ্রীস ও মিশরের পুরাণে পাওয়া যায়, সেটির সঙ্গে বজ্রের মিল দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। চক্রের মতো বজ্র কিংবা থান্ডারবোল্টও সাধারণ যোদ্ধার আয়ত্ত্বের বাইরে ছিল। এটি শুধুমাত্র দেবতারাই ব্যবহার করতেন।
থান্ডারবোল্ট

দুই

পৌরাণিক যুগ থেকে মধ্যযুগের হিন্দু রাজাদের সময় পর্যন্ত এইসব অস্ত্রশস্ত্রের তেমন পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। আমাদের দেশে এখন তলোয়ার বা তরবারি বলতে যা বোঝায় সেগুলি এসেছিল তুর্কি এবং পরবর্তী সময়ে পাঠান ও মুঘলদের ভারত আক্রমণ ও ভারত বিজয়ের সময়। এই তলোয়ার আমাদের প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রগুলিকে অনেকটাই পিছনে ঠেলে দিল। অর্থাৎ আমাদের দেশীয় খড়গ এবং অসির থেকে তলোয়ার যে অনেক বেশি কার্যকরী ও ব্যবহারে সুবিধেজনক ছিল, একথা স্পষ্টতই বোঝা যায়।
বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বীর যোদ্ধা ছিলেন জেঙ্গিজ খান (Genghis Khan। মোটামুটি ১১৫০ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ), যাঁকে আমরা সাধারণত চেঙ্গিস খাঁ নামেই চিনি। তাঁকে বিতর্কিত বললাম এই কারণে যে, তাঁর নিজের দেশে তিনি ভীষণ সম্মানিত দিগ্বিজয়ী বীর, কিন্তু বিশ্বের বহু বিজিত দেশই তাঁকে অত্যাচারী ও হিংস্র রাজা হিসেবে মনে রেখেছে। এশিয়া মহাদেশের কতখানি জুড়ে তাঁর মোঙ্গল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল, সেটা উপরের ম্যাপটি দেখলে বুঝতে পারবে। তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়ে যতই বিতর্ক থাক, তাঁর অসাধারণ রণনৈপুণ্য এবং রণশক্তিকে কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। আর এই রণদক্ষতার অনেকটাই নির্ভর করে অস্ত্রশস্ত্রের ওপর। অতএব তাঁর ব্যবহার করা অস্ত্র এবং বিশেষ করে তলোয়ার যে সেই সময়ের অনেক দেশের অস্ত্রসম্ভারকেই প্রভাবিত করেছিল, সেকথা বলাই বাহুল্য।
জেঙ্গিজ খাঁ
অতএব পরবর্তী সময়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ঢুকে মহম্মদ ঘোরি (রাজত্বকাল ১১৭৩ - ১২০৬) যখন ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রথম ইসলাম রাজত্বের সূচনা করলেন, তখন তিনি কিছুটা হলেও জেঙ্গিজ খানের রণ কুশলতায় প্রভাবিত ছিলেন এবং নিয়ে এসেছিলেন নতুন ধরনের তলোয়ারের প্রকৌশল। ভারতের সুলতানি আমলের তলোয়ার দেখলে সেই প্রভাবের কথাই মনে পড়ে।
জেঙ্গিস খানের তলোয়ারের পাতের (Blade) বক্রতা (Curvature) অনেকটাই কম এবং মাথার দিকে কিছুটা অংশ চওড়া। তলোয়ারের হাতলও (Hilt) অনেক মজবুত।

ওপরে সুলতানি আমলের তলোয়ার। আর পাশে মুঘল সম্রাট শাজাহানের পুত্র দারাশিকোর তলোয়ারের সম্ভার, লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজয়ামে রাখা আছে।
কয়েকটি বিখ্যাত তলোয়ারের কথা বলে এই প্রসঙ্গ শেষ করব।
জুলফিকর
জুলফিকর (Zulfiqar) – বলা হয়, পয়গম্বর হজরত মহম্মদ এবং তাঁর জামাই আলি ইব্‌ন্‌ আবু তালিব এই তলোয়ার ব্যবহার করেছিলেন। ইসলাম ধর্মের কোনও কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি অত্যন্ত পবিত্র একটি প্রতীক হিসেবে এখন ব্যবহার করা হয়। এই তরোয়াল যেন সমস্ত অন্যায় এবং অশুভ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। মুঘল আমলে এরকম একটি জুলফিকার তলোয়ারের ছবি পাশে দেখো।
আলমগীর – মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের খুব প্রিয় তলোয়ার ছিল আলমগীর। এই তলোয়ারটি তিনি পিতা সম্রাট শাহজাহানের থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। শোনা যায়, প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর এই তলোয়ারটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। ‘আলমগীর’ শব্দটির অর্থ বিশ্বজয়ী। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, রাজকুমার ঔরঙ্গজেব দিল্লির মসনদ অধিকার করে নিজেও ‘আলমগীর’ উপাধি নিয়েছিলেন। এছাড়াও সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অন্য একটি তলোয়ার রাখা আছে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। এই তলোয়ারটি সম্রাট মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খাঁকে উপহার দিয়েছিলেন।
ঔরঙ্গজেবের তলোয়ার
ভবানী – মহারাজ ছত্রপতি শিবাজীর প্রিয় তলোয়ারের নাম ভবানী। জনশ্রুতি বলে, এই তলোয়ার নাকি তিনি তাঁর মায়ের এবং তাঁর আরাধ্যা দেবী মা ভবানীর কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই তলোয়ার তিনি সংগ্রহ করেছিলেন কোনও এক পর্তুগীজ জাহাজের এক নাবিকের থেকে। সেই জাহাজ সেই সময় কোঙ্কন উপকূলের বান্দা বন্দরের অগভীর জলে আটকে গিয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে তলোয়ারের উপযুক্ত ভালো ইস্পাতের কথা একটু বলে নিই। তরোয়ালের ইস্পাত অবশ্যই কঠিন হতে হবে, তা না হলে কয়েকবার ব্যবহারেই তার ধার (sharp edge) নষ্ট হয়ে যাবে। কঠিন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারকে ঘাতসহও (Ductile) হতে হবে। তা না হলে যুদ্ধের সময় শত্রুর তলোয়ারের আঘাতে তোমার তলোয়ার যদি ভেঙে যায়, তাহলে সেখানেই যুদ্ধের শেষ, বলা বাহুল্য। ইস্পাতকে কঠিন এবং ঘাতসহ করার জন্যে দক্ষতার সঙ্গে টেম্পারিং (Tempering) করাটা জরুরি। খুব সংক্ষেপে এই টেম্পারিং ব্যাপারটা হল, ইস্পাতের পাতকে বারবার উচ্চ তাপে গরম করা এবং ঠাণ্ডা করা। এই টেম্পারিং ইস্পাত বানানোতে ইউরোপের কিছু কিছু দেশ, যেমন স্পেন, ইটালি, জার্মানি খুব দক্ষ ছিল। সেসময় ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সরাসরি নৌবাণিজ্য শুরু হয়ে যাওয়াতে ওসব দেশের তৈরি তলোয়ার ভারতেও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ওই ধরনের তলোয়ারকে বলা হত ‘ফিরঙ্গি’। সাধারণ ভারতীয়রা তখন ইউরোপীয়দের ফিরিঙ্গি বলেই ডাকত।
এই কারণে অনেকে মনে করেন ভবানী তলোয়ার প্রকৃতপক্ষে একটি ‘ফিরঙ্গী’ তলোয়ার। বর্তমানে ভবানী তলোয়ারের অস্তিত্ব নিয়ে খুবই বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, লণ্ডনের মিউজিয়ামে রাখা আছে। কেউ বলেন, মহারাষ্ট্রের সাতারায় মহারাজ শিবাজীর বংশধরের কাছেই আছে সেই ভবানী তলোয়ার। পাশের ছবিটি নিশ্চিতভাবে ভবানী তলোয়ারের ছবি কি না বলা মুশকিল।

তিন

পাঠান সুলতানদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে কামান-গোলা-বারুদের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে দক্ষভাবে এটির ব্যবহার করেছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর। তখনকার দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদির বিপুল সুসজ্জিত সৈন্যদলকে পানিপথের (১৫২৬ সাল) যুদ্ধে এবং রাজস্থানের রাণা সঙ্গকে খানুয়ার (১৫২৭ সাল) যুদ্ধে খুব সামান্য সৈন্যদল নিয়ে তিনি যেভাবে পরাস্ত এবং নিহত করেছিলেন, তারপর থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই তির-ধনুক এবং তলোয়ারের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে লাগল।
এরপরে মোটামুটি ৫০০ বছরের মধ্যে প্রায় দু’হাজার বছর ধরে চলে আসা যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে গেল, বদলে গেল যুদ্ধের অস্ত্রসমূহ। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ভয়াবহ নাশকতা, মাঝেমাঝেই সমগ্র মানব সভ্যতারই ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। আর সেসব অজস্র এবং অসংখ্য ধরনের মারণাস্ত্রের বর্ণনা আজকাল খবরের কাগজে, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সিনেমাতে প্রায়ই তোমরা দেখতে পাও। অতএব সেই প্রসঙ্গ এই লেখাতে আনছি না।
তবে ওসব প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রের সঙ্গেই আমাদের সভ্যতা থেকে ক্রমশ ম্লান এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে মহৎ শৌর্যের সকল বীরগাথা। মূল্যহীন হয়ে যাছে মহৎ বীরদের মনুষ্যত্ব, নৈতিকতা এবং মহত্ব। সেটা ভালো কি মন্দ, বুঝতে গেলে তাকিয়ে থাকতে হবে ভবিষ্যতের দিকে।

কৃতজ্ঞতাঃ ছবিগুলি গুগল ওয়েব সার্চ এবং উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।

No comments:

Post a Comment