গল্পঃ কাশীনাথবাবুর ভূত দেখাঃ বিভাবসু দে



এক


রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরেই সাইনবোর্ডটা পড়ছিলেন কাশীনাথবাবু। তাতে একেবারে ওপরে ফলাও করে লেখা ‘জ্যোতিষাচার্য জ্যোতিষার্ণব জ্যোতিষরত্ন শ্রী শ্রী কল্পেশ্বর মহারাজ’। তার ঠিক নিচটায়, একটু ছোটো অক্ষরে ‘অক্সফোর্ড হইতে পাশ্চাত্য জ্যোতিষশাস্ত্রে গোল্ড মেডেলিস্ট, কামাখ্যা হইতে ডাকিনী ও তন্ত্রবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত এবং কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিশেষ অনুমোদন প্রাপ্ত’।
এটুকু পড়েই একবার মাথা চুলকোলেন কাশীনাথবাবু। তাঁর বয়স নেহাত কম হবে না, হয়তো সত্তরের একটু ওপরের দিকেই। মাথার সামনাটায় টাক পড়ে কপালটা বেশ চওড়া হয়ে গেছে, যদিও পেছনে চিরুনি ফেরাবার মতো খানিকটা সাদা চুল এখনও আছে। সরু দুটো চোখের নিচে টিকালো নাক, ছিপছিপে লম্বা গড়ন, গায়ে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। দেখলেই কেমন যেন একটা শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব আসে। কাশীনাথবাবুর সারা মুখে বয়সের ভাঁজ, তবুও ভেতরের তারুণ্য যে একফোঁটাও মরেনি, তা তাঁর ধারালো চাউনিতেই স্পষ্ট।
মাথা তুলে আরেকবার তাকালেন সাইনবোর্ডটার দিকে। ঘড়িতে এখন এগারোটা পঁচিশ, ভিজিটিং আওয়ারেই এসেছেন, দেখা করা যাবে এই কল্পেশ্বর মহারাজের সঙ্গে। সাইনবোর্ডের মাঝখানে কিছু রাহু-কেতু আর ক’দিন আগে ধরা পড়া ব্ল্যাকহোলের একটা রঙিন ছবিও রয়েছে। ভদ্রলোক আরেকবার হাতঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন সাইনবোর্ডের নিচের ঝাপসা কাচ লাগানো দরজাটার দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এ.সি-র ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ছুঁয়ে গেল সারাটা শরীর। বেশ সুন্দর ঝকঝকে তকতকে একটা রিসেপশন, ডেস্কটপসহ একজন সুন্দরী রিসেপশনিস্টও রয়েছেন।
“গুড মর্নিং, স্যার! হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?”
বাহ্, একেবারে হাই-ফাই ব্যাপার! মনের ভাবটা সামলে নিয়ে কাশীনাথবাবু বললেন, “মহারাজজীর সঙ্গে একটু দেখা করা যাবে কি?”
“আপনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে, স্যার।”
“না, মানে আমার দরকারটা আসলে একটু অন্যরকম।”
কাশীনাথবাবুকে একপলক দেখে নিয়ে রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা একটা বাঁধানো কাগজ এগিয়ে দিলেন তাঁর দিকে। “আপনি একবার এটা দেখে নিন, এতে আমাদের সবধরনের ডিটেইল রয়েছে।”
কাশীনাথবাবুর চোখদুটো এবার আরেকটু কপালে উঠল। পুরো হোটেলের মেনু কার্ডের মতো একখানা কাগজ। তাতে গ্রহশান্তি থেকে শত্রুনাশ, বশীকরণ থেকে পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া সব রয়েছে। আর পাশেই তাদের সবক’টার রেট কিংবা দক্ষিণা। একেবারে কর্পোরেট ব্যাপার-স্যাপার। আগা থেকে গোড়া অবধি বেশ খুঁটিয়েই কাগজটা দেখছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ ষোলো নম্বর আইটেমে এসে তাঁর চোখদুটো যেন আপনা থেকেই থমকে গেল। এটাই তো খুঁজছিলেন, এর জন্যেই তো এতদূর ছুটে আসা।
‘১৬) প্রাচীন ডাকিনীবিদ্যা দ্বারা ভূত আহ্বান করা। দক্ষিণা ২০০১ টাকা মাত্র।’
কাশীনাথবাবু কাগজটা হাতে করে আবার গিয়ে দাঁড়ালেন রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলার সামনে। “এই ষোলো নম্বরটায় ঠিক কী করা হয়?”
ঠোঁটে ছোট্ট একটু হাসি খেলিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, “যারা ভৌতিক অভিজ্ঞতা পেতে চান বা চোখের সামনে ভৌতিক কিছু দেখতে চান, এটা তাদের জন্যে। আপনি কি…”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই দরকার।” কাশীনাথবাবুর গলাটা যেন হালকা কেঁপে উঠল উত্তেজনায়।
“ওকে, স্যার। আপনার নামটা?” রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলার চোখ ততক্ষণে ঘুরে গেছে ডেস্কটপের নীলচে পর্দার দিকে।
“কাশীনাথ তলাপাত্র।”
“বয়স?”
“সাতাত্তর।”
“পেশা?”
“প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক।”
“ঠিকানা?”
“১৩-এ নতুনপল্লী, কৃষ্ণনগর। রামনগর-৭-এর বিপরীতে। আগরতলা-৭৯৯০০১।”
কয়েক সেকেন্ড কীবোর্ডে খুটখাট করার পর বেশ মিষ্টি করে ভদ্রমহিলা বললেন, “স্যার, ফিটা?”
কপাল কুঁচকে তাকালেন কাশীনাথবাবু। “পুরোটাই আগাম নেবেন নাকি? পরে যদি ঠিকঠাক ভূতের দেখা না পাই?”
“সেরকম কিছু ঘটলে আমরা হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফি রিফান্ড করে দিই। কিন্তু আজ অবধি মহারাজের কৃপায় কেউ নিরাশ হয়ে বাড়ি ফেরেনি।” শেষের কথাগুলো বলতে বলতে যেন বেশ গাঢ় একচিলতে আত্মবিশ্বাস ঝিলিক দিয়ে উঠল ভদ্রমহিলার ঠোঁটের কোণে।
অগত্যা একটা কড়কড়ে গোলাপি দু’হাজারের নোট আর বেশ খানিকটা পকেট হাতড়া-হাতড়ির পর একটা ছোট্ট একটাকার কয়েন এগিয়ে দিলেন কাশীনাথবাবু।
“থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।” একটা প্রিন্টেড রসিদের মতো কাগজ এগিয়ে দিতে দিতে ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আগামী মঙ্গলবার রাত ন’টা দশ মিনিটে। তখনই অমাবস্যা শুরু হবে। কাইন্ডলি আধঘন্টা আগেই এসে পড়বেন।”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” কাগজটা পকেটে পুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন কাশীনাথবাবু।
“হ্যাভ অ্যা গুড ডে, স্যার।”


দুই


সময়মতোই এসেছেন কাশীনাথবাবু। ঘড়িতে এখন সাড়ে আটটা। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে আলতো করে ঠেলে দিলেন কাচের দরজাটা। বুকের ভেতর কিছু একটা যেন ধুকপুক করছে। রিসেপশনে সেদিনের রসিদটা দেখিয়ে সোফায় গিয়ে বসলেন কাশীনাথবাবু। আজ সেখানে আগে থেকেই আরও তিনজন বসে আছে, সম্ভবত মা-বাবা, ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। একটা ছোট্ট সৌজন্যসূচক হাসি বিনিময় করে ওদের পাশে গিয়ে বসলেন কাশীনাথবাবু। এরাও কি তবে ভূত দেখতে এসেছে? তাহলে যে কাশীনাথবাবুর ভৌতিক আমেজটাই মাটি হয়ে যাবে। মিনিট দশেক মনে মনে উসুখুসু করার পর আর জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলেন না তিনি। “আপনারাও কি, মানে ভূত দেখতে…”
বেশ একটু অবাক চোখে তাকালেন ছেলেটির বাবা। “না না, আমরা আসলে ওই একটু ছেলের পড়াশুনোর ব্যাপারে... ন’টা চল্লিশে সময় দিয়েছেন মহারাজ।”
“ওহ্‌, আচ্ছা।” মনে মনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন কাশীনাথবাবু।
তখনই রিসেপশন থেকে সুললিত নারীকণ্ঠ ভেসে এল, “স্যার, আপনি ভেতরে যান।” চোখের ইশারা কাশীনাথবাবুর দিকেই।
“হুম।” উঠতে উঠতে আরেকবার ঘড়ি দেখে নিলেন তিনি। ন’টা বাজতে পাঁচ মিনিট। মানে অমাবস্যার আরও পনেরো মিনিট বাকি।
ঘরের দক্ষিণ কোণে একটা কাঠের কাজ করা দরজা। রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা ওদিকেই যেতে বললেন। কাশীনাথবাবু আস্তে আস্তে গিয়ে ঢুকলেন সেই ঘরের ভেতর। বাইরের আলো ঝলমলে রিসেপশনের সঙ্গে একেবারে আকাশপাতাল তফাত। সারাটা ঘর জুড়ে কেমন একটা ঘোর লাগানো আলো-আঁধারি। দেয়ালে দেয়ালে সার দিয়ে সব ঠাকুর-দেবতা, নবগ্রহ, তান্ত্রিক সাধুদের বাঁধানো ছবি ঝুলছে, চার কোণে চারটে যজ্ঞবেদী, নিভু নিভু হয়ে কেমন যেন ভূতুড়েভাবে আগুন জ্বলছে সেগুলোতে, এদিক ওদিক দু-চারটে মড়ার খুলিও ছড়ানো। আর ঘরের ঠিক মধ্যিখানটায় বেশ সুন্দর একটা শ্বেতপাথরের টেবিল, সঙ্গে মানানসই দুটো কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা দামি চেয়ার। মুখোমুখি করে রাখা।
“আসুন কাশীনাথবাবু, আসুন।”
বাজ পড়ার মতো চমকে উঠেছিলেন কাশীনাথবাবু। এতক্ষণ খেয়ালই করেননি যে ঘরের ওপাশে সরু একটা দরজাও রয়েছে। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক আবছা অবয়ব। ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে কাশীনাথবাবুর। আস্তে আস্তে সেই ছায়ামূর্তি কিছুটা সামনে এগিয়ে এল। এবার পরিষ্কার দেখতে পেলেন তিনি। লালচে খয়েরি আলখাল্লা পরা একটা লোক, গায়ে রক্তবর্ণ উত্তরীয়। এই তবে কল্পেশ্বর মহারাজ। মুখে ভরাট চাপদাড়ি, কপালে সিঁদুরে তিলক, গলায় খান পাঁচেক রুদ্রাক্ষের মালা, পায়ে খড়ম, হাতে আঙুল-প্রতি একখানা করে আংটি।
“আপনি ভৌতিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে চান?” মহারাজের গলাটা বেশ ভারী, কিন্তু মোলায়েম।
“আজ্ঞে, মহারাজ। আপনার অনেক নাম শুনেছি তো…” হাতজোড় করেই কথাগুলো বললেন কাশীনাথবাবু।
মহারাজের ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একফালি হাসির রেখা যেন ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে গেল। “ভয় পাবেন না তো?”
“একদম না, মহারাজ। এটাই তো আমার নেশা। যখনই আপনার মতো সিদ্ধ মহাত্মাদের খোঁজ পাই,” কাশীনাথবাবু জোড় করা হাত কপালে ঠেকাতে ঠেকাতে বললেন, “তক্ষুনি ছুটে যাই আমি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠিক, মানে সন্তুষ্ট হতে পারি না আর কী।”
“আমার এখান থেকে কেউ কোনওদিন আশাহত হয়ে ফেরেনি। আজও তার ব্যতিক্রম হবে না।” ঘরের মাঝখানে রাখা চেয়ারদুটোর একটার দিকে ইশারা করলেন মহারাজ। “বসুন।”
কাশীনাথবাবুর দু’চোখ যেন ভক্তিতে আরেকটু গদগদ হয়ে উঠল। চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। কল্পেশ্বর মহারাজ ততক্ষণে একটা মড়ার খুলি এনে রেখেছেন টেবিলের ওপর। “প্রস্তুত হোন। আমি এখন প্রেত আহ্বানের মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করব।”
শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন কাশীনাথবাবু। চোখে অপলক দৃষ্টি। মহারাজ নিজে উলটোদিকের চেয়ারটায় বসে সেই খুলির ওপর হাত রেখে কী যেন বিড়বিড় করতে শুরু করলেন। মিনিট দুয়েক পর হঠাৎ সেই বন্ধ ঘরের ভেতর কোথা থেকে যেন ঝড়ো হাওয়া বইতে লাগল। মহারাজের চোখ তখনও বোজা। মন্ত্রের গতিও যেন পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বাতাসের সঙ্গে।
“কী রে কাশী, কেমন আছিস?” কে যেন খুব চাপা গলায় ফিসফিস করে উঠল বাতাসের মধ্যে।
চমকে উঠলেন কাশীনাথবাবু। “কে? কে আপনি?”
“তোর বাবা, হরনাথ।” আবার সেই কণ্ঠস্বর।
শিরশির করে উঠল কাশীনাথবাবুর সারাটা শরীর। “বাবা!”
“উনি চলে গেছেন। ভালো আত্মাদের বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না।” জবাবটা এল সামনে থেকে।
কাশীনাথবাবু তাকিয়ে দেখলেন মহারাজের চোখ ওঁর দিকেই স্থির হয়ে আছে। “এবার আমি যাকে এই খুলিতে আহ্বান করব সে এক ভীষণ অতৃপ্ত আত্মা।”
কাশীনাথবাবুর উত্তেজনার পারদ চড়ছে। আপনা থেকেই যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে চোখের সামনে অলৌকিক কিছু ঘটতে দেখার প্রবল উৎসাহে। মহারাজ আস্তে আস্তে নিজের ডানহাতটা ওপরের দিকে তুললেন।
“আশ্চর্য!” অজান্তেই যেন কথাটা বেরিয়ে এল কাশীনাথবাবুর মুখ দিয়ে। তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, টেবিলে রাখা সেই মড়ার খুলিটা মহারাজের হাতের তালে তালে আপনি হাওয়ায় উঠে যাচ্ছে, ভাসছে, দোল খাচ্ছে! মহারাজের মুখে প্রশান্ত হাসি। এক ভৌতিক সবজেটে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে সেই খুলির অক্ষিকোটর থেকে।
আর তখনই হঠাৎ, “আহ্‌!”
খুলিটা একেবারে ধাঁই করে ছুটে গেল মহারাজের মাথার দিকে। ঠিক সময়ে সরে না গেলে বেশ ভালোই ঘা লাগত মাথায়। ব্যাপারটার জন্যে যে মহারাজ নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না সেটা তাঁর চোখেমুখেও একমুহূর্তের জন্যে যেন স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “ভূত বড়ো ভয়ংকর জিনিস কাশীনাথবাবু, এদের কাবু করা যে কী কঠিন সংযমের বিষয় তা আপনি ভাবতেও পারবেন না। এই প্রেতাত্মাটা আসলে নতুন, অপঘাতে মৃত্যু, মনে অনেক দুঃখকষ্ট জমে আছে তো, তাই একটু অবাধ্য।”
“তা তো বটেই। ভূত নিয়ে সাধনা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়।” কাশীনাথবাবুর গলায় তখনও অকৃত্রিম ভক্তির সুর।
মহারাজও যেন একটু আশ্বস্ত হলেন। “এবার আপনাকে এমন একটা…” কিন্তু কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না, তার আগেই যজ্ঞবেদীগুলোতে দাউদাউ করে প্রায় ফুট খানেক উঁচু হয়ে জ্বলে উঠল আগুনের লেলিহান শিখা। যেন কেউ এক বোতল করে পেট্রল ঢেলে দিয়েছে।
কল্পেশ্বর মহারাজের কপালের ভাঁজটা চোখ এড়াল না কাশীনাথবাবুর। তবে বেশ কায়দা করে এবারও সামলে নিলেন তিনি। “এই দেখুন, এরা আমারই অনুগত প্রেত। এরা চোখের নিমেষে এই আগুনকে আমার আদেশে আরও অনেকগুণ ভয়ংকর, এমনকি দাবানলের মতোও করে তুলতে পারে।”
কিন্তু মুখের কথাটা শেষ হতে না হতেই দপ করে আগুন জ্বলে উঠল মহারাজের চেয়ারটার চারপাশে। এবার আর ভেতরের ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা সামলাতে পারলেন না কল্পেশ্বর। ভয়ে কেমন যেন কিশমিশের মতো শুকিয়ে গেল তাঁর মুখখানা।
“কী ব্যাপার মহারাজ, ভয় পেলেন নাকি?”
পিঠে একটা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়ায় শিউরে উঠলেন কল্পেশ্বর। “ক-ক্কে? কে?”
কিন্তু পেছন ফিরতেই যা চোখে পড়ল তাতে তাঁর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে কেঁপে উঠল। কেউ যেন টেনে একটা হাতুড়ির ঘা মারল কলজেতে। কল্পেশ্বরের ঠিক পেছনটায় দাঁড়িয়ে আছেন কাশীনাথবাবু। চোখে সেই ভক্তি-বিগলিত চাউনি।
“আ-আপনি!” ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমে উঠছে কল্পেশ্বর মহারাজের সিঁদুরে তিলক কাটা কপালে।
“হ্যাঁ মহারাজ, আমিই।”
উত্তরটা এল ঠিকই কিন্তু পেছন থেকে নয়, সামনে থেকে। থিরথির করে কাঁপছে মহারাজের হাত-পা। এক তীব্র আতঙ্ক বুকে চেপে সামনে তাকালেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল কেউ যেন তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটিটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। কাশীনাথবাবু তাঁর নিজের জায়গাতেই বসে আছেন। দু’চোখে এক অদ্ভুত প্রাণহীন হিমেল দৃষ্টি।
কিন্তু কল্পেশ্বর যে এখনও স্পষ্ট টের পাচ্ছেন তাঁর কাঁধের ওপর সেই স্থির হাতের ছোঁয়া। এসব কি স্বপ্ন নাকি! এক অজানা ভয়ে চেয়ার থেকে ছিটকে পড়ে গেলেন কল্পেশ্বর মহারাজ। চারপাশের আগুন নিভে গেছে, পেছনে কেউ নেই, শুধু সামনের চেয়ারটায় বসে আছেন কাশীনাথবাবু।
কিন্তু তখনই শুরু হল সেই বীভৎস দৃশ্য যা হয়তো কল্পেশ্বর কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবেননি। ভয়ে কথা বন্ধ হয়ে এল তাঁর, মুখ দিয়ে শুধু বিচ্ছিরি গোঙানির মতো একটা আওয়াজ বেরোচ্ছিল। কল্পেশ্বরের চোখের সামনে একটু একটু করে এমনভাবে ঘুরে যাচ্ছিল কাশীনাথবাবুর মাথাটা যেন ঘাড়ের সঙ্গে জুড়েই নেই! ঠিক তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে এসে তাঁর চোখদুটো আবার স্থির হল কল্পেশ্বরের দিকে। সে-চোখে এখন আঙরার মতো লাল ভূতুড়ে চাউনি। জং-ধরা পুরনো যন্ত্রের মতো অদ্ভুত এক ফ্যাঁসফেঁসে গলায় কিছু কথা বেরিয়ে এল কাশীনাথবাবুর মুখ থেকে, “কী হল কল্পেশ্বর, তুমি না ডাকিনীবিদ্যা, তন্ত্রবিদ্যার মহাজ্ঞাতা? ভূতেরা না সব তোমার হুকুম তামিল করে?”
“ভ...ভ...ভূ...কে, কে তুমি?” খুব কষ্টে শেষের দুটো শব্দ উচ্চারণ করলেন কল্পেশ্বর মহারাজ। আর তখনই তাঁর ঘাড়ের কাছে কে যেন নিঃশ্বাস ফেলল। আগুনের হলকার মতো গরম নিঃশ্বাস। চমকে উঠলেন কল্পেশ্বর। কাশীনাথবাবু উবু হয়ে বসে আছেন তাঁর ঠিক পিছনটায়। সামনের চেয়ার ফাঁকা! হাত-পা হিম হয়ে আসছিল কল্পেশ্বরের।
“তোদের মতো বুজরুকগুলোর দয়ায় মরেও আমার শান্তি নেই রে কল্পেশ্বর।” আবার সেই ভূতুড়ে গলা। “বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলাম; গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে ঘুরে তোদের মতো ভণ্ডগুলোর মুখোশ খোলাই ছিল আমার নেশা। ভূতের নামে তোরা যেসব সস্তা ভেলকি দেখিয়ে বেড়াস সেটাই সারাজীবন ধরে বুঝিয়েছি সাধারণ লোকেদের।”
দমকা হাওয়ার মতো একটুকরো দীর্ঘশ্বাস এসে ধাক্কা মারল কল্পেশ্বরের চোখেমুখে। সেই প্রেতকণ্ঠ আবার বলতে লাগল, “কিন্তু একদিন তোর মতো এক ভণ্ডের প্ররোচনায় কিছু সরলসোজা অন্ধবিশ্বাসী মানুষ আমাকেই পিটিয়ে মারল। অপঘাতে মৃত্যু, প্রেতত্ব প্রাপ্ত হলাম। আর ভাগ্যের কী পরিহাস দেখ, সারাজীবন বেঁচে থেকে যা করতে পারিনি, এখন ভূত হয়ে অনায়াসে তাই করে বেড়াই।” সেই ভৌতিক স্বর যেন হঠাৎ আগুনের মতো দপ করে জ্বলে উঠল। বিকট এক অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়ল ঘর জুড়ে। “ধরে ধরে ঘাড় মটকাই তোদের মতো বেইমানগুলোর।”
“আ-আ...আমি আর করব না স্যার। ছেড়ে দিন...মা কালী...দিব্যি…”
কেমন যেন অবশ হয়ে আসছিল কল্পেশ্বরের অনুভূতিগুলো। নেতিয়ে পড়ছিল শরীরটা। চোখের সামনে আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল কাশীনাথের সেই ভূতুড়ে চেহারা। শুধু অজ্ঞান হবার আগমুহূর্তে কল্পেশ্বরের কানে ভেসে এল কিছু টুকরো টুকরো কথা, যেন সমুদ্রের ওপার থেকে কেউ বলে চলেছে, ‘আমি আবার আসব, কল্পেশ্বর। আবার আসব।’


তিন


“বাবু, একজন বুড়ো লোক এটা দিতে বললেন।” একটা ছোট্ট হাতচিঠি ফণীশের দিকে এগিয়ে দিল পল্টু।
ফণীশ সেন, মাস ছয়েক হল নতুন মিষ্টির দোকান খুলেছেন এলাকায়। তবে এর মধ্যেই বেশ রমরমিয়ে চলছে। ফণীশের মিষ্টির বেশ সুখ্যাত হয়েছে এ-তল্লাটে।
“আমাকে? চেনা কেউ?”
“না বাবু, আগে দেখিনি। এসে দুটো রসগোল্লা আর একটা শিঙাড়া খেয়ে এটা দিয়ে চলে গেলেন।”
“ঠিক আছে, তুই যা, ওদিকে সামলা গে।”
পল্টুকে বাইরে পাঠিয়ে কাগজটা হাতে করে গদিতে গিয়ে বসলেন ফণীশ। ছোট্ট দু’লাইনের একটা চিঠি। তাতে লেখাー
‘এসেছিলাম। ভালো লাগল তোমার সুমতি দেখে। মিষ্টিগুলোও বেশ ভালো, খাঁটি দুধের ছানা, মুখে দিলেই বোঝা যায়। ভালো থেকো। হ্যাঁ, আরেকটা কথা, দোকানের নামটা খাসা হয়েছে।
ইতি,
কাশীনাথ তলাপাত্র’
শিরশির করে উঠল ফণীশের বুকের ভেতরটা। চোখের সামনে যেন ছবির মতো ভেসে উঠতে লাগল দেড় বছর আগের সেই রাত। কাশীনাথবাবুর সেই প্রেতমূর্তি, সেই জ্বলন্ত চোখ, সেই ঘুরতে থাকা মুণ্ডু। নাম পালটালেও অতীত যে এত সহজে পিছু ছাড়ে না!
কাশীনাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক ফণীশ সেনের ঘেমে ওঠা হাত থেকে কখন যেন আপনি খসে পড়ে গেল চিঠিটা।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ জয়ন্ত বিশ্বাস

5 comments:

  1. বাঃ! খাসা হয়েছে। জয়ন্তর অলঙ্করণও দারুণ

    ReplyDelete
  2. শেষটা দূর্দান্ত হয়েছে

    ReplyDelete
  3. বাঃ দারুন ভূতের গল্প

    ReplyDelete