উপন্যাসিকাঃ ছদ্মবেশী শত্রুঃ দেবদত্তা ব্যানার্জী




এক


এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে মোবাইলে খবর পড়তে পড়তে রাজেশবাবুর ভুরুটা কুঁচকে উঠেছিল। শ্রমণাদেবী সেদিকে তাকাতেই বললেন, “আরাকিউরা ফার্মার মতো বড়ো ওষুধ কোম্পানি ক্যানসার সহ বেশ কিছু মারণ রোগের ওষুধের দাম অবিশ্বাস্যরকম কমিয়ে দিয়েছিল কিছুদিন আগে। কিছু হাসপাতালকে এবার বিনামূল্যে ওষুধ দেবে ওরা। ওদের সিইও কাল এটা জানিয়েছেন।”
“এ তো সুখবর! কত লোকের উপকার হবে।” শ্রমণাদেবী বললেন।
“না, ওই ফার্মার বাজারে বহু বদনাম আছে। ওরা বাজার ধরার জন্য অনেক নিচে নামতে পারে। ওরা এমন করলে ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে ছোটো ছোটো কোম্পানিগুলো। দাম কমানোতে ওষুধের গুণমান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে পারছে না ছোটো কোম্পানিগুলো।” রাজেশবাবু বললেন।
রুবাই বাইরে প্লেনের ওঠানামা দেখতে দেখতে বাবা-মার আলোচনা শুনছিল। মাঝে মাঝে চোখ রাখছিল বাবার ফোনে। ওধারে মাসি-মেসো আর ওঁদের দুই যমজ মেয়ে টায়রা আর টিকলি ঘুমিয়ে গেছে। রাত দুটোয় ওদের ফ্লাইট। এবার গন্তব্য কেরালা, সঙ্গে অবশ্য কন্যাকুমারিকা রয়েছে। জুন মাসে যদিও ওদিকে বৃষ্টি থাকে, তবুও ওরা যাচ্ছে এসময়, কারণ রুবাইয়ের বাবা আর মেসো ডাক্তার। ওঁদের একটা কনফারেন্স হচ্ছে এর্ণাকুলমে। রুবাই সবে সেভেনে উঠেছে। এখন গরমের ছুটি চলছে। মাসির মেয়েরা ফাইভে পড়ে। ওদেরও ছুটি চলছে। আপাতত ওদের গন্তব্য কোচি। রুবাই এর মধ্যেই গুগল ঘেঁটে জেনে নিয়েছে কোচি আর এর্ণাকুলম আসলে যমজ শহর। ভেম্বনাদ লেকের বুকে দশটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে কোচি। আর মূল ভূখণ্ড এর্ণাকুলম।
এই প্রথম রুবাই দক্ষিণ ভারত যাচ্ছে। তাই খুব আনন্দ হচ্ছে ওর।  ফ্লাইটের অ্যানাউন্সমেন্ট হতেই নড়েচড়ে উঠল মেসো। মাসিকে ডেকে তুললেও টায়রা-টিকলির ওঠার কোনও লক্ষণ নেই। রাত আটটায় বাগডোগরার ফ্লাইট কলকাতায় নেমেছিল। তারপর ওখানেই ডিনার করে দু’জন ঘুমিয়ে পড়েছিল। রুবাই অবশ্য ঘুমায়নি। ঘুরে ঘুরে সব দেখছিল।
কোনওরকমে ওদের তুলেই তেইশ নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। বাসে করে ওদের পৌঁছে দিল প্লেনের কাছে। টায়রা-টিকলি সিটে বসেই আবার ঘুমিয়ে কাদা। রুবাই একটা  জানালায় বসেছে বাবার সঙ্গে। ওধারে মা আর মাসির সঙ্গে টিকলি, আর সামনে টায়রা আর মেসো। টেক অফের পর চোখটা লেগে এসেছিল রুবাইয়ের।
মাঝ আকাশে বোধহয় সূর্যোদয় তাড়াতাড়ি হয়। জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ায় চোখ কচলে তাকায় রুবাই। নিচে তখন মেঘের সমুদ্র। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা। বোনদুটো তখনও ঘুমাচ্ছে। একবার টয়লেট ঘুরে এসে বসল রুবাই। প্লেনের প্রায় সব যাত্রী ঘুমোচ্ছে। ওধারের জানালার লোকটা ল্যাপটপে কিছু করছে। টুপিটা অদ্ভুত ধরনের, ম্যানড্রেক বা ম্যাজিশিয়ানরা পরত। একবার তাকিয়েছিল রুবাইয়ের দিকে চোখটা নীলচে। কিন্তু মুখটা খুব চেনা। কোথায় যেন দেখেছে রুবাই মনে পড়ে না। ওদিকে রাজেশবাবু পাশের লোকটার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। বোধহয় উনিও মেডিক্যাল লাইনের। ঐ আরাকিউরা ফার্মা নিয়েই আলোচনা চলছে।
রুবাই মন দিয়ে আকাশের বুকে মেঘের খেলা দেখছিল। এবার বোধহয় একটু নিচে নেমেছে প্লেনটা। সমুদ্রর নীল জল দেখা যাচ্ছে। এটা বোধহয় বঙ্গোপসাগর। উত্তাল জলরাশি ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা মারছে। আস্তে আস্তে কয়েকটা শহর পার হয়ে আরব সাগরের উপর চলে এল ওরা। শান্ত সবুজ নীল জল দেখেই মনটা ভালো হয়ে যায়। নারকেলগাছের সারি দেখা যাচ্ছে সবুজ শস্য ক্ষেতের ধারে।
পাইলট সবাইকে সিট বেল্ট বাঁধতে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। রুবাই নিচে নীল জলের বুকে কোচি এয়ারপোর্ট দেখতে ব্যস্ত। প্লেনটা সমুদ্রের উপর পাক খেতে খেতে নিচে নামছে, মনে হয় জলেই নেমে পড়বে। কিন্তু না, সমুদ্রের জলের ঠিক ওপর দিয়ে ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ সৌরশক্তি চালিত এয়ারপোর্টে নেমে পড়ল ওদের প্লেন।
টায়রা-টিকলি উঠে পড়েছে। ওদের কলকলানি শুরু হয়ে গেছে। লাগেজ নিয়ে ওরা এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। বাবার এক বন্ধু এদিকে ঘোরার সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তবে হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নিজে আসতে পারেননি। একটা ছোট্ট দ্বীপের বুকে ওদের রিসর্ট লেক ভিউ। রিসর্টের লঞ্চে করে ওরা এসে পৌঁছল দ্বীপের মাটিতে।
চারদিকে নারকেলগাছের সীমানা, নীল জলরাশির বুকে সবুজ ঘাসের কার্পেটের মাঝে কেরালার ঐতিহ্য কাঠ আর টালির কটেজগুলো যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি। বেশ কয়েকটা রিসর্ট আর একটা মার্কেট রয়েছে এখানে। ভেম্বনাদ লেকের বুকে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু নৌকা ও লঞ্চ।
মেসো সবাইকে তাড়া দিল। আজ ফ্রেশ হয়ে ওরা সবাই যাবে এর্ণাকুলমে এক রাজবাড়ি দেখতে। এছাড়া ইহুদিদের চার্চ ও ওদের ছোট্ট একটা টাউন ঘুরবে ওরা। বেলঘট্টি প্যালেসে বাবা আর মেসোর কনফারেন্স আর সেমিনার পরের দু’দিন। ঐ দু’দিন ওরা মুন্নার আর পেরিয়ার ঘুরে আসবে। সব বুক করা আছে রাজেশবাবুর বন্ধুর দৌলতে।
এর্ণাকুলম  রাজবাড়ির বাগানে প্রচুর হরিণ দেখে টায়রা-টিকলি খুব খুশি। রুবাইয়ের  মা আর মাসি ইহুদি টাউনে অ্যান্টিক জিনিসের দোকান থেকে বেশ কিছু কেনাকাটা করল। বিখ্যাত কথাকলি নাচের মুখোশ থেকে সুপুরিগাছের ছালের বোট, নারকেল ছোবড়ার পুতুল, জলভর্তি নারকেল চেঁছে বানানো হনুমান কিছুই বাদ গেল না। ওখানে একটা ইহুদিদের চার্চ রয়েছে বহু পুরনো। সারা কোচি শহরেই চার্চের ছড়াছড়ি। মসজিদও রয়েছে কয়েকটা। রাতে কেরালা রাইস আর ফিশ-কারি অবশ্য মা-মাসি কারোরই পছন্দ হয়নি। ভাগ্যিস রুবাই আর ওর দুই মাসতুতো বোন চাউমিন নিয়েছিল।


দুই


পরদিন রাজেশবাবুর বন্ধুর ঠিক করে দেওয়া গাড়িতে ওরা চলল আথিরাপল্লী আর ভাঝাচল জলপ্রপাত দেখতে। চালাকুডি নদীর বুকে আথিরাপল্লী কেরালার সবচেয়ে বড়ো জলপ্রপাত। একে দক্ষিণ ভারতের নায়াগ্ৰাও বলে অনেকে। পথে ছোটো ছোটো বেশ কয়েকটা জলপ্রপাত বা ঝরনা পড়ল। জুন মাসে জল সবেতেই রয়েছে। দক্ষিণ ভারতের নদীগুলো সব বৃষ্টির জলে পুষ্ট রুবাই জানে। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে বেশ লাগছিল। রুবাইয়ের বাবা আর মেসো না থাকায় ও এখন এই দলের লিডার। ওঁরা চলে গেছেন সেমিনারে। চারজন মহিলার দায়িত্ব রুবাইয়ের উপর। বারো বছর বয়সেই ওর মধ্যে একটা বড়ো বড়ো ভাব এসেছে।
বেশ লাগছিল রুবাইয়ের। হঠাৎ মাসি বলল সবাইকে কাচ তুলে দিতে। গাছে নাকি বাদুড় রয়েছে। রুবাইও দেখেছে কিছু বাদুড় ঝুলছে গাছে। নিপা ভাইরাসের কথা গতমাসেই রুবাই জেনেছিল। কেরালাতেই প্রথম ছড়িয়েছিল এই মারণ রোগ। যদিও এখন শিলিগুড়ি সহ দেশের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। মাসি তো এসময় কেরালা আসতেও ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু বাবা আর মেসো বলেছিল, একটু সাবধান থাকলেই এই ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পাখিতে ঠোকরানো ফল বা কাটা ফল না খেতে। আর ফল ভালো করে ধুয়ে খেতে। বাইরের মাংস না খেতে।
জানালা বন্ধ করতে করতে কথাগুলো মনে করিয়ে দিল রুবাই। এমনিতে ওর মা শ্রমণাদেবী খুব সাহসী। মাসি রূপসা ঠিক তার উলটো। একটুতেই ঘাবড়ে যায়। বহুদূর থেকে আথিরাপল্লী জলপ্রপাত দেখতে পেয়ে টায়রা আর টিকলি তখন লাফাচ্ছে গাড়িতেই। বহু সিনেমায় এই জলপ্রপাত দেখেছে রুবাই। সামনে থেকে দেখে একটাই কথা মাথায় এলーভয়ংকর সুন্দর। টুরিস্ট তুলনামূলক কম, হয়তো বর্ষাকাল বলেই। তবুও মাসি সেই নিপা ভাইরাসকেই দায়ী করে চলেছে ক্রমাগত। এখানকার ওয়াইল্ড লাইফ বিখ্যাত। প্রচুর জীবজন্তু রয়েছে এই ফরেস্টে। রুবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিল চারপাশটা।
একটা নীল রঙের লম্বা লেজওয়ালা পাখির ফটো তুলতে ও ঢুকে পড়েছিল জঙ্গলে। মায়েরা ঝরনার ফটো তুলতেই ব্যস্ত। এমন সময় লোকটাকে দেখতে পায় রুবাই। ওর মাথার হ্যাটটা দেখে মনে পড়ে, ওদের সঙ্গে প্লেনেও ছিল লোকটা। বেশ লম্বা লোকটার চোখ দুটো বেশ অদ্ভুত, নীলচে ধরনের। দূরবীন দিয়ে কিছু একটা দেখছে আপনমনে। এমন সময় একটা কুচকুচে কালো বেঁটে, ধুতিটা লুঙ্গির মতো পরা লোক এসে লোকটাকে কিছু বলতেই লোকটা অন্যদিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ রুবাইয়ের পায়ের কাছে এসে পড়ল একটা আধখাওয়া ফল। বাবার সাবধান বাণী মনে পড়ায় দু’পা পিছিয়ে এল রুবাই। মাসি ঠিক বলেছিল। বাদুড় রয়েছে গাছে গাছে। ফিরে আসতে আসতে রুবাই দেখল ঐ কালো লোকটা ফলটা কুড়িয়ে নিল। গরিব লোকটা কি ঐ ফলটা খাবে নাকি! ভয় পেল রুবাই। লোকটার হাতের প্যাকেটে আরও কয়েকটা ফল চোখে পড়ল। লোকটা ঐ প্লেনের ভদ্রলোকের সঙ্গে একটা কালো ইনোভায় গিয়ে বসল। কাচগুলোও কালো। মায়ের ডাকে রুবাই ফিরে গেল গাড়ির কাছে।
ফেরার পথে নদীর মাঝে দুটো নৌকার মধ্যে পাতা কাঠের পাটাতনে ওদের জাইলো গাড়িটাকে তুলে দিল ইয়াপ্পা ভাই। ওদের ড্রাইভার। চালাকুডি নদী চেহারায় খুব একটা বড়ো নয়, কিন্তু গভীর। শর্টকাটের জন্য এই ব্যবস্থা। নৌকায় চড়ে নদী পার হয়ে আন্নামালাই পাহাড়ের বুকে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলল ওদের গাড়ি। গন্তব্য ভগবানের নিজের দেশ মুন্নার। মেঘের দল সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছিল ওদের। মাঝে মাঝে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে পথ। চারপাশে সবুজের বন্যা। উত্তরবঙ্গের পাহাড় আর তরাইয়ের মাঝে বড়ো হয়েছে রুবাই। ও মুগ্ধ হয়ে দেখছিল দক্ষিণের সৌন্দর্য।
বেশ কিছুটা উপরে উঠে আসতেই ঠাণ্ডা লাগছিল সবার। হালকা গরম জামা এনেছিল সবাই। জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে বাবাকে একটা ফোন করে নিল রুবাই। এই ট্যুরে মায়ের নতুন ফোনটা ওর হাতেই রয়েছে। মা পুরনো ফোনেই কথা বলছে সবার সঙ্গে। চিপস খেতে খেতে খুনসুটি করছে দুই বোন। হঠাৎ চা বাগান দেখে সবাই খুব খুশি। এখানকার চা বাগান অন্যরকম। সবুজ রঙটাই আলাদা। পাতাগুলোও ছোটো আর বেঁটে। একটা আবছা নীল রঙের ছোঁয়া সবুজ উপত্যকা জুড়ে। পলিউশন নেই কোথাও।
শ্রমণাদেবী স্কুলের বড়দি। ঠিক হেড মিস্ট্রেসের মতো ওদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন সবকিছু। ঢেউ খেলানো চা বাগানের বুক চিরে কুমারী মেয়ের সিঁথির মতো পথ চলেছে আরও ওপরে। বারবার গাড়ি থামিয়ে ওরা ফটো তুলছিল। হঠাৎ পাহাড়ের গায়ে কতগুলো মোটা শিং আর বড়ো বড়ো লোমওয়ালা ছাগলের মতো জন্তু দেখে রুবাইয়ের মা বলল এগুলো নীলগিরি থর। এক বিশেষ লুপ্তপ্রায় প্রজাতির বন্য ছাগল যা এখানেই দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো ঘাসের মাঝে তিনটে ছাগল দাঁড়িয়ে। ফটো তুলল ওরা। ড্রাইভার ভাঙা হিন্দিতে বলল, ওরা খুব ভাগ্যবান যে থরের দেখা পেল। এরা সংখ্যায় এত কমে গেছে যে আর দেখাই যায় না আজকাল।
দূরে ছবির মতো সুন্দর মুন্নার শহর, যার বুক চিরে বয়ে চলেছে ছোট্ট পাহাড়ি তিনটে নদীーমুদ্রাপূজা, নাল্লাথান্নি ও কুণ্ডলী। শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ের মাথায় চা বাগানের মাঝে একটা ছোট্ট হোটেলে ওদের থাকার ব্যবস্থা।
দোতলাটা পুরোটাই ওদের জন্য। পাশেই একটা পার্ক। ছোট্ট লেক রয়েছে। বিকেলে সবাই গেল লেকে বোটিং করতে। তারপর গেল ম্যালে। পাশেই মার্কেট। বেশ কিছু ফটো তোলা হল। হঠাৎ রুবাই ফটো তুলতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল সকালের ঐ কালো বেঁটে লোকটাকে। এখন অবশ্য প্যান্ট শার্ট পরেছে। কিছু ফল কিনছে একটা দোকানে।
সন্ধ্যায় আলোর মালায় সেজে উঠেছিল মুন্নার। কিন্তু ওদের রিসর্টের পাশেই একটা গাছে বাদুড় ঝুলতে দেখে মাসি সবাইকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। রুবাইদের রিসর্টের একটু নিচে টিলার উপর একটা সুন্দর বাংলোবাড়ির বাইরে কালো ইনোভা গাড়িটা দেখে রুবাইয়ের মনে হল এই গাড়িটাই ও আথিরাপল্লীতে দেখেছিল। কালো ইনোভা কম চোখে পড়ে। ঘটনাটা কাকতালীয় কি! লোকগুলো ওদের সঙ্গেই চলেছে সব জায়গায়!


তিন


তিনদিন হল মেলটা করেছে ও, অথচ এখনও তেমন কিছু জানায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। আজ একটা কিছু রিপ্লাই আশা করেছিল মিঃ এক্স। এই নামটাই আপাতত ব্যবহার করছে লোকটা। বড়ো বড়ো চারটে ফার্মা কোম্পানিকেও জানিয়েছে ও খবরটা। তবে ওর ফর্মুলার জন্য আপাতত যা দাম চেয়েছে ও, চারটা কোম্পানি একসঙ্গেও তা দিতে পারবে না। একমাত্র এই দেশের সরকার যদি জনগণের স্বার্থে ফর্মুলাটা কেনে। আপাতত যে ভ্যাকসিন ও বানিয়েছে তা শুয়োর আর বাদুড়ের উপর প্রয়োগ করেছে। এবার মানুষের ওপর প্রয়োগের সময় এসেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এ-ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ভ্যাকসিন নেই। অথচ ও আবিষ্কার করে ফেলেছে সেই যুগান্তকারী জিনিস। কিন্তু শুধু নাম করে কী হবে? চিকিৎসাবিজ্ঞানে নাম তো ও কম কামায়নি। নাম-সম্মান সব রয়েছে ওর পায়ের নিচে। কিন্তু আসল হল টাকা। আরব সাগরের বুকে ওর নিজের একটা দ্বীপ, নিজের এয়ারলাইন্স, ছোট্ট একটা প্রাসাদーআর কী চাই জীবনে। এই ইচ্ছে পূরণের জন্য চাই প্রচুর টাকা। আর সরকার এই দেশকে বাঁচাতে ওকে তা দেবে। নয়তো মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়বে এই ভাইরাস যার ছোট্ট একটা নমুনাতেই কেঁপে উঠেছে আসমুদ্র হিমাচল। আর ও তো অন্যায্য কিছু চাইছে না। ঐ দ্বীপের মালিক ছিল ওর পূর্বপুরুষ। আলি রাজা আর আরাকাল বিবির বংশধর ও। অন্যায়ভাবে ওদের বিতাড়িত করেছে এ দেশের সরকার। ইতিহাস সাক্ষী আছে, সরকার জোর করে অধিগ্ৰহণ করেছে ওর জন্মভূমি। আজ তা পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে।
এমন সময় নিচের বেলটা বেজে ওঠে। মিঃ এক্স লুকানো ক্যামেরায় দেখে আগন্তুক ওর বিশ্বস্ত ফকরু। রিমোটের বোতামে চাপ দিতেই খুলে যায় নিচের লোহার দরজা। ফকরু এসে কয়েকটা দরকারি খবর দেয় ওকে। ফকরুকে নিয়ে নিজের ছোট্ট ল্যাবে চলে আসে লোকটা। নানারকম কাচের জারে রয়েছে বেশ কিছু বাদুড়। কয়েকটা খাঁচায় ইঁদুর আর গিনিপিগ। কয়েকটা বড়ো অ্যাম্পুল তুলে দিল মিঃ এক্স ফকরুর হাতে। মালয়ালি ভাষায় সাবধান করল লোকটাকে। খুব সাবধানে কাজটা করতে হবে বুঝিয়ে দিল। তিনজন বিশ্বস্ত লোক দেশের অন্যান্য প্রান্তে খুব ভালো কাজ করছে বলে ওকে উৎসাহিত করল। আব্রাহাম নিজের মতো করে কাজ করছে। আপাতত ও পেরিয়ার হয়ে কোদাইকানাল দিয়ে চেন্নাইতে চলে যাবে কাল। আজ শেষরাতেই এই ডেরা গুটিয়ে বেস ক্যাম্পে ফিরবে মিঃ এক্স, তাও জানিয়ে দিল। এই বাদুড়, ইঁদুর, গিনিপিগ সব ছেড়ে দিতে হবে আজ রাতের ভেতর। ছড়িয়ে পড়বে মারণ রোগ আরও বেশি করে। তারপর ও ভ্যাকসিনের দাম বাড়িয়ে ইনকাম করবে।
একটু পরেই সব গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল ফকরু। মিঃ এক্স নিজের ইনোভাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল শেষরাতে। তার আগে মারাত্মক মেলটা করে দিল বেশ কিছু ফার্মা কোম্পানিকে।


চার


মাঝরাতে গাড়ির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেছিল রুবাইয়ের। ওরা তিন ভাইবোন এক ঘরে শুয়েছিল। পাশের ঘরে মা আর মাসি। ওধারে ডাইনিং। এই ফ্লোরে আর কেউ নেই। কাচের জানালা দিয়ে নিচের পাকদণ্ডী পথে তাকিয়ে গাড়িটা দেখতে পায় রুবাই। টিলার উপর থেকে ইনোভাটা বেরিয়ে গেল। রাত প্রায় সাড়ে তিনটা। এত রাতে কোথায় যেতে পারে গাড়িটা? বারান্দায় বেরিয়ে আসে রুবাই। বিকেলে মুন্নারের ম্যালে লোকটাকে দেখেছিল রুবাই। হয়তো সাধারণ টুরিস্ট, ওদের মতোই ঘুরছে। তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায় রুবাইয়ের মনে। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটায় শিরশির করে ওঠে শরীর। একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে নেয় ও। গাড়িটা শহরের উলটোদিকে চলে গেল। বনের আড়ালে হেড লাইটের আলো হারিয়ে গেল একটু পরেই।


“মুন্নারে দেখার আছে অনেক কিছু।” টায়রা বলে। আসলে মায়ের ফোন ঘেঁটে ও সব জেনে নিয়েছে। “উল্লেখযোগ্য হল, এরাভিকুলাম ওয়াটার ফল ও ন্যাশনাল পার্ক, আত্তুকার ওয়াটার ফল, টি-ভ্যালি, মাতুপেত্তি ড্যাম, ইকো পয়েন্ট, রাজমালা, কুন্ডলা লেক, টাটা টি মিউজিয়াম, ব্লসম পার্ক, পথামেন্দু ভিউ পয়েন্ট, ইন্দ-সুইস ডেইরি ফার্ম, আরও কত কী!”
রুবাইর মাসি বলল, “সব কি আর একদিনে দেখা যায়?”
প্রথমেই ফুলের সমারোহ দেখতে ওরা গেল ব্লসম পার্কে। নানা রঙের ফুল চারদিকে। মাতুপেত্তি ড্যাম মূলত হাইড্রলিক প্রজেক্টের অধীনে জলের সমস্যা সমাধানে নির্মিত। এর লেকের জল স্বচ্ছ। মাতুপেত্তি ডেইরি ফার্মে চড়ে বেড়াচ্ছে বৈজ্ঞানিকভাবে পালিত উচ্চমানের গবাদি পশুর দল। এরপর কুন্দলা লেক। স্পিড বোটে চড়ে লেকের জলে ঘুরতে দারুণ লাগছিল সবার।
বিভিন্ন জায়গায় টাটকা ফল বিক্রি হচ্ছিল। পরিষ্কার ফল কেটে দিচ্ছিল দোকানদার। মাসির ভয়ে খেতে পারছিল না কেউ। চিপস, কেক, বিস্কুট আর কোচি থেকে কেনা হোম-মেড চকলেট ভরসা। মুন্নারেও প্রচুর হোম-মেড চকলেট পাওয়া যায়। এলিফ্যান্ট রাইড করে ফেরার পথে জঙ্গলের পথে একটা লোককে দেখে ওর ঐ আথিরাপল্লীর লোকটার মতো মনে হয়েছিল রুবাইর। তখনই বাবার ফোন আসায় ভুলে গেছিল ব্যাপারটা।
পরদিন ভোরে ওরা গেছিল পেরিয়ার লেক দেখতে। একটা পুরো বন লেকের নিচে চলে গেছিল ভূমিকম্পে। মৃত প্রাচীন গাছের কঙ্কাল জেগে রয়েছে লেকের বুকে। ছোট্ট বোটে করে ভেসে পড়েছিল ওরা লেকের জলে। চারদিকে জঙ্গল। বন্য জন্তুরা জল খেতে আসে এই লেকে। যদিও একদল হাতি আর বাইসন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না ওদের। বাবার দূরবীনটা বেশ কাজে দিয়েছিল রুবাইয়ের। কিন্তু হঠাৎ জঙ্গলের একটা জায়গায় চোখ আটকে যায় ওর। ভাগ্যিস লঞ্চটা দাঁড়িয়ে গেছিল। ঐ ঘন জঙ্গলে লোকটা কী করছে বুঝতে পারে না রুবাই। গাছে উঠছে কেন লোকটা? জঙ্গলে হিংস্র জন্তুর ভয়ে কি?
প্রায় দু’ঘণ্টা পর ওদের জলভ্রমণ শেষ হয়। এবার ফিরতে হবে মুন্নার। থেক্কাডি বাজারের কাছে লাঞ্চের জন্য দাঁড়িয়েছিল ওরা। হঠাৎ একটা জটলা ও মালয়ালি ভাষার চেঁচামেচি কানে আসে। সামনেই জটলার ভেতর হাতাহাতি চলছে। ওদের ড্রাইভার খোঁজ নিয়ে এল, একটা লোক নাকি ফলের ভেতর কী ইনজেকশন দিচ্ছিল। রুবাই জানে, কলকাতা সহ ভারতের বিভিন্ন অংশে ফলের রং-স্বাদ-গন্ধ ঠিক রাখার জন্য নানারকম কেমিক্যাল ইনজেকশন দেওয়া হয় যা খুব ক্ষতিকারক। ফলকে মিষ্টি ও সুস্বাদু করতে, তরমুজকে লাল করতে এসব করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। বাবা-মা খুব বেছে টাটকা লোকাল ফল আনে ওদের বাড়িতে। ড্রাইভার বলে, আসলে কেরালায় টাটকা তাজা ফল-সবজি কেনে সবাই। টুরিস্ট হোক বা লোকাল লোক, সবাইকে ভালো জিনিস দেওয়া হয় এখানে।
একটু পরেই পুলিশ এসে লোকটাকে নিয়ে চলে যায়।
রুবাই আবার চমকে উঠেছিল। আথিরাপল্লীর সেই কালো বেঁটে লোকটা মনে হল ওর। এ আবার এখানে কেন! নাকি ওর চোখের ভুল? ঐ লোকটাকে নিয়ে ভাবছে বলেই সবাইকে একরকম লাগছে? অবশ্য মালয়ালি লোকগুলোকে একইরকম লাগে ওর। হঠাৎ টিকলি বলে, “এই লোকটাকে কাল ম্যালে  দেখেছিলাম না দাদাভাই? লোকটার বাঁহাতে চারটে আঙুল, জানিস? ওটা কি দুষ্টু লোক?”
টিকলির কথায় আরেকবার চমকে ওঠে রুবাই। ক্লাস ফাইভের টিকলির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দারুণ এটা জানে রুবাই। মোবাইলে কাল ম্যালে তোলা কিছু ফটো ছিল। একটা ফটোয় লোকটা এসে গেছিল পরিষ্কার। ওটা বড়ো করে দেখে, টিকলি ঠিক বলেছে। আশেপাশে ইনোভা গাড়িটা বা টুপি পরা লোকটাকে খুঁজে পায় না অবশ্য।
লাঞ্চের পর কোচির পথ ধরে ওদের গাড়ি। রুবাই শুধু একটু গম্ভীর। সন্ধ্যায় কোচির হোটেলে ফিরে বাবা আর মেসোকে সব না বললে ওর শান্তি হবে না। আজ কনফারেন্স শেষ। রাতে বাবারা ফিরবে।


পাঁচ


কিন্তু রাতে বাবা আর মেসো এত গম্ভীর হয়ে ফিরল যে কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পেরেছিল ওরা সবাই। রাতেই বড়োদের আলোচনা কানে এসেছিল রুবাইয়ের। ওর দুই বোন তখন মোবাইলে লুডো খেলতে ব্যস্ত। বাবাদের সেমিনারের মাঝেই খবর এসেছিল, কোনও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি নিপা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানিয়ে ফেলেছে বলে দাবি করছে। কিন্তু সে এই ফর্মুলা বিক্রি করতে চায় এক বিপুল অর্থের বিনিময়ে। না, ওষুধ নয়, ফর্মুলাই দিয়ে দেবে লোকটা। কিন্তু যা দাম চেয়েছে কেউ দিতে পারবে না। একেই আরাকিউরা ফার্মা ওষুধের দাম কমিয়ে দেওয়ায় রাতারাতি মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রচুর দেশি কোম্পানি। এর মধ্যে এমন একটা খবর সবাইকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। লোকটির দাবি, সে দেশের সরকারকে এই ফর্মুলা দেবে। কিন্তু তার বদলে শুধু টাকা নয়, সে চাইছে আস্ত একটা দ্বীপ, মিনিকয়। লাক্ষাদ্বীপ যে সাঁইত্রিশটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত, তার মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য দ্বীপ এই মিনিকয়। যদিও খুব অল্প লোক থাকে। দ্বীপটা মালদ্বীপের কাছে অবস্থিত। পাগল লোকটা এই দ্বীপটা চেয়ে বসেছে।
ওদিকে নিপা ভাইরাস হিমাচল থেকে কলকাতা, শিলিগুড়ি থেকে গুজরাট সবদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এরপর এর প্রতিষেধক আর কোনও কাজে লাগবে না। মহামারির আকার নেবে এই ভাইরাস।
রুবাই ভাবে, লোকটা কতটা বাজে যে এভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। রাতে শুয়ে শুয়ে ও বাদুড়ের স্বপ্ন দেখে। ভ্যাম্পায়ার রক্ত চুষে খাচ্ছে সাধারণ মানুষের।


পরদিন ভোরে আবার সবাই সব ভুলে রেডি হয়ে নেয়। কোচির পাট শেষ, ওরা চলেছে আলেপ্পির পথে। ভেম্বনাদ লেককে বিদায় জানিয়ে আপাতত আলাপুজা থেকে শুরু হবে ওদের হাউস-বোট রাইড। বাবার বন্ধু রঙ্গন আঙ্কেল ভীষণ ব্যস্ত কী এক কাজে। দেখাই হল না ওঁর সঙ্গে। উনি আসলে ভারত সরকারের সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক বড়ো অফিসার। তবে ফোনে কথা হয়েছে রাজেশবাবুর সঙ্গে। ব্যাক ওয়াটার বেয়ে ওরা যাবে প্রথমে কুমারকম পাখিরালয়। যদিও মাসি দু’বার নিপা আর বাদুড়ের কথা তুলে এ যাত্রা আটকাতে চেয়েছিল, কিন্তু কেরালা ভ্রমণের আসল মজাই এই জলপথে। সামুদ্রিক খাড়ি-পথ এই শহরের অন্যতম যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভেনিসের মতো জলপথে সারা শহর ঘুরে নেওয়া যায়। ভেম্বনাদ লেক ধরেও খাড়ি-পথে পৌঁছে যাওয়া যায় সমুদ্রে। কেরালার গ্ৰাম আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এই জলপথেই উপভোগ করা যায়। বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে নৌকা করে, অফিস যাচ্ছে লোকে ছোটো ছোটো পানসিতে। বাজার বসেছে নৌকায়। এমনকি টুরিস্টদের জন্য হাতের কাজ সাজিয়ে ভাসমান বাজার ঘুরে বেড়াচ্ছে এই জলে। আস্ত গ্ৰামটাই জলের ওপর। কিছু লোকের ঘরের ভেতরেও জল। রুবাইয়ের মা আর মাসি আরও গোটা দুই নারকেলের হনুমান কিনেছে। এখানে সস্তা বেশি বলে আক্ষেপ করেছে মাসি। ওদের হাউস-বোটটায় দুটো বেডরুম আর একটা খোলা ড্রইং বা ডাইনিং।
কুমারকমের পাখি দেখতেই ব্যস্ত সবাই। কতরকম পাখি চোখে পড়ছিল আশেপাশে! হঠাৎ মাসির চিৎকারে ওরা দেখল, জলে ভেসে উঠেছে মরা বাদুড় আর দুটো পাখি। সুতরাং মাসি আর যাবেই না। অনেক বুঝিয়েও কাজ হল না। ওদের ডাব খেতেও বারণ করে দিল মাসি। চারপাশে আতঙ্কের চোখে তাকাচ্ছে সে বারবার। টায়রা আর টিকলি ফোনে ফটো দেখতে ব্যস্ত। টিকলি আবার একটা কী আ্যপ দিয়ে সবার ছবিতে চুলের স্টাইল বদলাচ্ছে, সাজাচ্ছে সবাইকে। মেসোর মাথার পাতলা চুল ঘন হয়ে গেছে ওর আ্যপের জন্য। রাজেশবাবুর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি গজিয়েছে। শ্রমণাদেবীর লম্বা চুল ছেঁটে বয় কাট করেছে ও। সবাই এই নিয়েই হাসাহাসি করছে।
রুবাই একাই বাইরের খোলা জায়গায় এসে বসেছিল। বাবার দূরবীনটা দিয়ে দেখছিল চারদিক। হঠাৎ একটা হাউস-বোটে ওর চোখ আটকে যায়। যদিও বোটটা বেশ দূরে। দূরবীনটা দিয়ে খুব কাছে এসে যাচ্ছে। খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে লোকটাকে। টুপিটা নেই মাথায়। টুরিস্ট ভেবেই মনকে বোঝাল রুবাই। বোটটার মাথায় রয়েছে সোলার প্যানেল। আর দেখতেও একটু আলাদা অন্য হাউস-বোটের থেকে। সোলার প্যানেল ছাড়াও একটা ছোট ডিশ বসানো ছাদে। খুব ভালো করে লক্ষ করছিল রুবাই। বোটটা দাঁড়িয়ে রয়েছে খাড়ির উত্তরদিকটায়। ওদের বোটটাকে কাছে আসতে দেখেই যেন জানালাটা বন্ধ করল লোকটা। কাছ থেকে খুব ভালো করে লক্ষ করল রুবাই। খোলা জায়গাটায় বসে রয়েছে সাদা লুঙ্গি পরা একজন। একে আগে দেখেনি রুবাই। রুবাইদের হাউস-বোট ছাড়া জলে আপাতত আর নৌকা নেই। পশ্চিমদিক বলে সূর্য অস্ত যায় দেরিতে। ওরা রাতটা হাউস-বোটেই কাটাবে সবাই। কেরালার মশলাদার রান্নার গন্ধ আসছে বোটের কিচেন থেকে। গন্ধটা ভালোই লাগছিল রুবাইয়ের। ওদের বোট ঘুরে গেলেও ঐ সোলার বোটটাকেই ফলো করছিল ও। ঐ লোকটা বাইরে এসে অন্য লোকটাকে কিছু বলল। অন্য লোকটা একটা ডিঙিনৌকা নিয়ে জলে নেমে গেল। হাতে একটা ব্যাগ। কিন্তু ব্যাগে ওটা কী ভরল লোকটা! চমকে ওঠে রুবাই। ওর শরীরে অস্বস্তিটা ফিরে আসে। কিন্তু কাকে বলবে আর ঠিক কী বলবে ভেবেই পায় না। ঘরে ফিরে দেখে টায়রা আর টিকলি সেই আ্যপটা নিয়েই খেলছে। হঠাৎ ওর মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। নিজের ফোনটা তুলে নেয় হাতে।
সারাটা রাত উলটোপালটা স্বপ্ন দেখে রুবাই। জুন মাসে কুমারকমে পাখিও কমে গেছে। পরবর্তী গন্তব্য ভারকালা বিচ হয়ে কোবলম।


ছয়


সরকার শুধু সময় চাইছে। মিঃ এক্স আপনমনেই হাসে। কতদিন সময় নেবে আর? চোদ্দটা রাজ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে মারণ বীজ। এবার নিজে নিজেই ছড়িয়ে পড়বে বাকি সব জায়গায়। ফকরু ফেঁসে গেছে অবশ্য। ফলের মধ্যে ইনজেকশন দিচ্ছিল যখন ধরা পড়ে গেছিল। যদিও দোকানটা ওর পরিচিত আব্রাহামের ভাইয়ের। তবে অ্যাম্পুলটা ভেঙে ফেলায় ওর উদ্দেশ্য ঠিক বুঝতে পারেনি লোকজন। নর্মাল চিনি বা রঙ মেশাচ্ছিল ভেবেছে। অনেকে এভাবে এইচ.আই.ভি.-র জীবাণুও ছড়িয়ে দেয়। সেসব পরীক্ষা চলছে। আপাতত থাকুক শ্রীঘরে। ওকে বার করতে গেলেই ফেঁসে যেতে পারে মিঃ এক্স নিজেই। আব্রাহাম বা ফকরু মুখ খুলবে না এই বিশ্বাস ওর রয়েছে।
কিন্তু এই নতুন ছেলেটা বড্ড ঢিলে। একে তো লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে, বারবার জায়গা বদলাতে হচ্ছে, মেলটা হ্যাক করে ওর লোকশন যাতে ট্রেস না করা যায় তার ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে, তবুও কাল খবর পেয়েছে ও যে এদিকে আছে জেনে গেছে সরকারের সাইবার ক্রাইম বিভাগ। একটা দল এসেছে ওর খোঁজে। আপনমনেই হাসে ও। ওকে ধরা কি এতই সহজ? এদেশের সরকারের বুদ্ধি বড্ড কম। স্যাটেলাইট ফোনটা থেকে একটা বিশেষ নম্বরে ফোন করে ও।
“মিঃ এক্স বলছি। আমার মেলটা নিয়ে কিছু ভাবলেন কি?”
হোম মিনিস্টারের ডাইরেক্ট নম্বর এটা। “আমাদের একটু সময় চাই।” মন্ত্রীমশাই ঢোঁক গেলেন ফোনেই।
“বেশি সময় নিলে এই ভাইরাস মহামারীর আকার নেবে। তখন এই একশো তিরিশ কোটি লোককে ভ্যাকসিন দিতে পারবেন তো? ওটা বানানোর খরচও প্রচুর। আমি ফর্মুলাটা দিয়ে দেব। আপনি দ্বীপটা আর টাকাটা দিয়ে দিন।” খুব ঠাণ্ডা মাথায় কথাগুলো বলে লোকটা।
“দ্বীপ তো ওভাবে হস্তান্তর হয় না। আর ওভাবে কি তুমি বাঁচতে পারবে? ঐ মিনিকয় দ্বীপ থেকেই তোমায় ধরে ফেলবে পুলিশ।”
“আমি কি এতটা বোকা আপনার মনে হয়? দ্বীপটা সুরক্ষিত করেই ওখানে পা দেব। টাকাটা তো তাই চাইছি। ঐ ছোট্ট দ্বীপটা হবে আমার স্বাধীন নগরী। একশো তিরিশ কোটি জীবনের বিনিময়ে আমার দাবিটা তো ভীষণ ছোটো।”
ঘামতে থাকেন হোম মিনিস্টার। লোকটা যে আচ্ছা পাগল তা বোঝা যাচ্ছে।
“শেষ বারো ঘণ্টা সময় দিলাম। তারপর সব হাতের বাইরে চলে যাবে।” ফোন কেটে দেয় লোকটা।
ঘাম মুছে সবাইকে কনফারেন্স রুমে ডেকে নেন মন্ত্রীমশাই। এমন বিপাকে এর আগে কখনও পড়েননি উনি। শত্রু দেশের কেউ নয় তো লোকটা? মিনিকয় দ্বীপটাই ওর পছন্দ হল কেন কে জানে। লাক্ষাদ্বীপ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। মিনিকয়ে খুব কম লোক থাকে। কিন্তু তাদের কী বলা হবে? আর টাকাটাও বিশাল অঙ্কের। এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে ঘরের এসিটা বাড়িয়ে দেন মন্ত্রীমশাই।


সাত


দুপুরে খাবে বলে ওরা সমুদ্রের ধারে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিল। নারকেলগাছের ফাঁকে নীল জলের আরব সাগর দেখে মন ভরে যায় সকলের। কিন্তু টিভির খবর দেখে চমকে উঠেন রাজেশবাবু। পাশের একটা টেবিলেও উত্তেজিত আলোচনা চলছে ইংরেজিতে। একটা পাগল লোক নিপা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানিয়ে ফেলেছে আগেই শুনেছিলেন ওঁরা। লোকটা একটা দ্বীপ আর বহু টাকার বিনিময়ে সেই ফর্মুলা দেবে বলেছিল। লোকটাকে ট্রেস করা যাচ্ছে না। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় লোকেশন দেখাচ্ছে। তবে গোয়েন্দা বিভাগের ধারণা এই মুহূর্তে লোকটা কেরলেই রয়েছে। এখন লোকটা নাকি বারো ঘণ্টা সময় দিয়েছে, যার মাত্র আট ঘন্টা বাকি। এরপর ও কী করবে কেউ জানে না। অনেকে বলছে এই লোকটাই নিপা ভাইরাসের জনক, ওই ছড়িয়ে দিয়েছে এই মারণ রোগ নিজের খেয়ালে।
বাবার বন্ধু রঙ্গন আঙ্কেলের ফোন এসেছিল। উনি আসলে এই লোকটাকে ধরার কাজেই ব্যস্ত। লোকটা খুব ধূর্ত। বারবার পিছলে যাচ্ছে। আঙ্কেল কোভলমের কাছে ত্রিবান্দ্রমেই রয়েছেন। আজ বিকেলে ওদের সঙ্গে দেখা করবেন বললেন। রুবাই পুরো গল্পটা জানার জন্য ছটফট করছে তখন। ওর ধারণা যদি সঠিক হয় তাহলে হয়তো…
কোবলম পৌঁছে মন ভালো হয়ে গেল সকলের। টায়রা-টিকলি সুইমিং সুট পরে নেমে পড়েছে নীল জলে। গলা জলে গিয়েও স্বচ্ছতার জন্য নিজেদের হাত-পা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। রুবাই জলে নামলেও ওর মন পড়ে রয়েছে অন্য কোথাও। জলের নিচের রঙিন মাছ বা কাঁকড়ায় মন নেই ওর। আর মাত্র চার ঘণ্টা বাকি। সরকার কি দিয়ে দেবে লোকটার দাবিমতো টাকা আর মিনিকয় দ্বীপ? তারপর! লোকটা কী করবে? এমন একটা ইংরেজি সিনেমা দেখেছিল রুবাই। খুব মনে পড়ছে গল্পটা।
বিচের উপর ওদের হোটেল কোভলম ইন। মেসো আর বাবার সঙ্গে একটা লম্বা লোককে দেখে উঠে আসে রুবাই। বাথ র‍্যাপটা জড়িয়ে এগিয়ে আসে বাবাদের গার্ডেন টেবিলের দিকে। মা-মাসি সবাই সমুদ্রে নেমেছে।
বাবা পরিচয় করায় রঙ্গনাথন বা রঙ্গন আঙ্কেলের সঙ্গে। রুবাইয়ের গল্প উনি আগেই শুনেছেন। ফোনে কথাও বলেছেন। রুবাই যে এর আগে বেশ কিছু অপরাধীকে ধরিয়ে দিয়েছিল উনি জানেন। রুবাইকে দেখে উনি খুব খুশি। রাজেশবাবুই প্রশ্ন করলেন মিঃ এক্সের ব্যপারে। মিডিয়ার দৌলতে সারা ভারত জেনে গেছে মিঃ এক্সের ঘটনা। চ্যানেলগুলোর মধ্যে কম্পিটিশন চলছে কে আগে লোকটাকে পরিচয় বার করতে পারে। কেউ বলছে লোকটা ডাক্তার, কেউ বলছে ফার্মা কোম্পানির মালিক, কেউ বলছে বৈজ্ঞানিক। ওর পাঠানো স্যাম্পল সত্যি জীবন দায়ী। কিন্তু তা বিশ্লেষণ করে কী দিয়ে তৈরি বোঝা যাচ্ছে না। আপাতত একটা টিম সেই কাজ করছে। রঙ্গনাথন বা রঙ্গন আঙ্কেলের টিম লোকটাকে ট্রেস করতেই ব্যস্ত। কিন্তু লোকটা খুব চালাক। পিছলে যাচ্ছে বারবার। দিল্লি, বিহার, কলকাতা হয়ে যদিও কেরালায় ফিরেছে কোনওদিন তো তারপর মুন্নার। সকালে আলেপ্পি দেখাচ্ছে তো বিকেলে কালিকট, আবার কখনও থেক্কাডি। পাগলের মতো দৌড়ে বেড়াচ্ছে রঙ্গন আঙ্কেলের টিম। আপাতত সরকার ওর দাবি মেনেই নেবে ঠিক হয়েছে। টাকাটা একবারে দেওয়া যাবে না। এভাবে সময় নিয়ে লোকটাকে ধরা হবে। গোপনে জানিয়ে দিল রঙ্গন আঙ্কেল।
রুবাই বলে, “পেরিয়ারে কয়েকদিন আগে একটা লোক ধরা পড়েছিল। ফলের মধ্যে কিছু মেশাচ্ছিল। খবরটা ছোটো এবং গুরুত্বহীন। নিউজ হয়নি। আপনি কি জানেন এই ব্যপারটা কিছু?”
লাফিয়ে ওঠেন রঙ্গন আঙ্কেল। বলেন, “তুমি কী করে জানলে? খবরটা গোপন রাখা হয়েছিল তো।”
“আমাদের চোখের সামনে গ্ৰেফতার হয়েছিল লোকটা। দেখেছিলাম তো।”
“ঐ লোকটা যে এই কেসের সঙ্গে যুক্ত জানলে কী করে?” রঙ্গন আঙ্কেলের চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠে।
“সেটা তো জানি না। এমনি জানতে চাইছিলাম। আমার মনে হয়েছিল লোকটা যুক্ত। লোকটাকে তার আগেও দেখেছি।”
“লোকটা ঐ নিপা ভাইরাসের জীবাণু ছড়াচ্ছিল পরীক্ষা করে দেখা গেছে। মিডিয়া জানে না এখনও। তাহলে অপরাধী সাবধান হয়ে যাবে। তবে লোকটা মুখ খোলেনি এখনও। ওর বাড়ি ত্রিশূরে।”
“এবার আপনাকে একটা লোকের ছবি দেখাব।”
রুবাই দৌড়ে ঘরে গিয়ে ফোনটা নিয়ে আসে। ওর তোলা আথিরাপল্লীর ফটো মুন্নারের ফটো সব রয়েছে। লাস্ট দেখায় হাউস-বোটের ফটোটা। যদিও টুপি আর গোঁফটা নেই, পরের ফটোতে একটু এডিট করে ও-দুটো বসিয়ে নিয়েছে রুবাই নিজেই। টায়রা-টিকলির আ্যপটা কাজে দিয়েছিল খুব।
লাফিয়ে ওঠেন রঙ্গন আঙ্কেল। সব ফটো নিয়ে নেন নিজের ফোনে। বেশ কিছু দরকারি ফোন করে নেন তক্ষুনি। হাউস-বোটটা ট্রেস করতে বলেন কোস্ট-গার্ডদের। রুবাইকে আদর করে চলে যান তক্ষুনি। উত্তেজনায় ফুঁসছেন ভেতর ভেতর। যদিও বহিঃপ্রকাশ নেই তেমন।
রুবাই ঘরে গিয়ে পোশাক বদলায়। বোনদুটো, মা আর মাসি তখনও নীল জলে। ওরা জানতেও পারল না রুবাই কী করে ফেলেছে।


আট


সন্ধ্যায় লাইট-হাউসে আলো জ্বলতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সরকার জানিয়েছে দাবি মেনে নেওয়া হবে। তবে আলোচনায় বসতে চায় একটা টিম। লোকটা উত্তর দেয়নি।
রাস্তাঘাটে লোক কম। সবাই টিভির সামনে বসে। দেশের জনগণের জন্য একটা আস্ত দ্বীপ কি দিয়ে দেবে সরকার?
রুবাই অনেক রাত অবধি জেগে বসে থাকে টিভির সামনে। হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে। ব্রেকিং নিউজ, ধরা পড়েছে অপরাধী। বারবার লেখাটা দেখাতে থাকে। কিন্তু ছবি কই? শুধু রিপোর্টারদের দেখাচ্ছে। একটু পরেই কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লম্বা লোকটাকে রুবাইরা দেখতে পায় টিভিতে। এর বেশি কিছুই জানা যায় না।
পিং করে মেসেজ ঢোকে রাজেশবাবুর নতুন ফোনে। রঙ্গন আঙ্কেল ধন্যবাদ জানিয়েছেন রুবাইকে।


পরদিন ঘুম থেকে উঠে রুবাইরা গেল বিষ্ণু মন্দির দেখতে। অনন্ত শায়িত বিষ্ণু। তিনটে দরজা দিয়ে দেখতে হয়। পদ্মনাভস্বামীর মন্দির। পাশেই ত্রিবাঙ্কুর রাজপ্রাসাদ এবং মিউজিয়াম। সেগুন কাঠের উপর লাল টালির তৈরি প্রাসাদ দেখে ওরা ফিরে আসছিল হোটেলে। টায়রা-টিকলি অন্তাক্ষরী খেলায় ব্যস্ত। মা আর মাসি ফোনে কথা বলছিল। রাজেশবাবু ফোনের খবর দেখে লাফিয়ে ওঠেন হঠাৎ। মেসো ঝুঁকে পড়েছে ফোনের ওপর। বলে, “অবিশ্বাস্য!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা হোটেলে পৌঁছে দেখে রঙ্গন আঙ্কেল ওয়েট করছেন। রুবাইকে জড়িয়ে ধরেন উনি। বলেন, ওর জন্যই ধরা পড়ল এত বড়ো মাপের ক্রিমিনাল। তার চেয়েও বড়ো খবর, লোকটা আরাকিউরা ফার্মার মালিক ডঃ আরাবিল। একদিকে ওষুধের দাম কমিয়ে ফ্রিতে ওষুধ দিয়ে ব্যাবসা জগতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করছিল। অন্যদিকে নিজেই ভাইরাস ছড়িয়ে এবং তার প্রতিষেধক বানিয়ে পয়সা কামাতে চেয়েছিল। তবে লোকটা সাইকো, নিজেকে মিনিকয় দ্বীপের রাজা ভাবে। ওর পূর্বপুরুষ নাকি লাক্ষাদ্বীপের রাজা ছিল। তাই ও আবার নিজের সাম্রাজ্য গড়তে চায়। ওর বিশ্বস্ত কিছু লোক আদাড়েবাদাড়ে ঘুরে এই অসুখের জীবাণু ছড়াচ্ছিল বিভিন্নভাবে। আবার প্রতিষেধক বানিয়েছিল আরাবিল নিজেই। নিজস্ব হাউস-বোট নিয়ে ঘুরত বলে ওকে ধরাই যাচ্ছিল না। তাছাড়া ওর সামাজিক সম্মান রয়েছে বৈজ্ঞানিক হিসাবে। আরাকিউরা ফার্মা ক্যানসারের ওষুধের দাম কমিয়ে জনগণের গুড বুকে আছে। চট করে ওকে ধরাই যেত না। ওর লাকটাই খারাপ যে রুবাইয়ের নজরে পড়ে গেছিল ও। আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে যে রুবাই আলাদা, ওর আই.কিউ লেভেলটা বেশি, এটা আরাবিলের জানার কথাই নয়। ভাগ্যচক্রে বারবার রুবাই ওকে দেখেছে বিভিন্ন জায়গায়। ভাগ্যিস প্রশ্ন জেগেছিল ওর মনে!
আপাতত কেরালার সরকার রুবাইকে সম্বর্ধনা দেবে ঘোষণা হয়েছে। সন্ধ্যায় রয়েছে প্রেস কনফারেন্স। সবাই দেখতে চাইছে ছোট্ট হিরোকে। দেশের তরফ থেকেও রুবাই পুরস্কার পাবে ওর বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার জন্য।
টায়রা-টিকলি সহ বড়োরাও খুব খুশি সব জেনে। রাজেশবাবু বললেন, “ঠিক কী দেখে লোকটাকে তুই সন্দেহ করেছিলি?”
“ফ্লাইটে লোকটাকে দেখেছিলাম। নীলচে চোখ, মাথায় ম্যানড্রেক টুপি। তখনই খুব চেনা লাগছিল। এখন মনে পড়েছে, এয়ারপোর্টে বসে তুমি আরাকিউরা ফার্মার খবরটা বলেছিলে, লোকটার ফটো দেখেছিলাম তোমার ফোনে। তখন ফটোতে কিন্তু ব্রাউন চোখ ছিল। টুপি ছিল না।”
“নীল লেন্স, সরু গোঁফ আর টুপি পরে ছদ্মবেশ নিত লোকটা।” বললেন রঙ্গনাথন।
“আবার হাউস-বোটে দেখি টুপি ছাড়া, গোঁফ ছাড়া। ওর সঙ্গীকে বাদুড়ে খাওয়া ফল কুড়োতে দেখেছিলাম আথিরাপল্লীতে। খটকা লেগেছিল তখনই। ঐ ফল কে খাবে? আসলে ওদের রিসার্চে লাগত ঐসব ফল। ওর এক সঙ্গী ব্যাগে একটা খাঁচা ভরছিল হাউস-বোটে। বাদুড় ছিল তাতে। পুরোটাই সন্দেহজনক লাগছিল। তখন হঠাৎ রঙ্গন আঙ্কেলের সঙ্গে দেখা হল। সবটা বললাম। ছবিও দেখালাম। কিছু ছবি এডিট করেছিলাম নিজের মতো করে।”
“আর আমি যে চার আঙুলের লোকটা দুষ্টু লোক বলে চিনিয়ে দিলাম দাদাভাই! আমার নামটা তো একবার বল!” তীব্র অভিমান টিকলির গলায়।
“শুধু তাই নয়, তোদের জন্য ঐ অ্যাপটা পেয়েছিলাম। তাই তো এডিট করে লোকটাকে ধরিয়ে দিতে পারলাম।” রুবাই বলে বোনেদের।
“মাঝে মাঝে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল ফোন খুব কাজে আসে।” রঙ্গন আঙ্কেল বলেন।
সবাই হেসে ওঠে ওঁর কথায়।


সন্ধ্যায় রঙ্গন আঙ্কেল রুবাইকে নিয়ে গেছিলেন প্রেস কনফারেন্সে। টিভিতে ওকে দেখে খুব খুশি সবাই। ফোনে অভিনন্দন আর ভালোবাসার বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। তবে রুবাই আছে একইরকম। পরদিন ওরা কন্যাকুমারিকা যাবে, ভারতের ভূখণ্ডের শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে তিন সমুদ্রের সঙ্গম দেখবে এটা ভেবেই রুবাই খুশি। ঘুমের ভেতর ও দেখতে পায়, সমুদ্রের গভীরে এক বিশাল পাথরে দাঁড়িয়ে গেরুয়াধারী, লাঠি হাতে এক সন্ন্যাসী ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন।


_____

1 comment: