প্রবন্ধঃ পরমা প্রকৃতি দেবী দুর্গাঃ সুশান্ত কুমার রায়



‘আজি কি তোমার মধুর মুরতি / হেরিনু শারদ প্রভাতে! / হে মাত বঙ্গ শ্যামল অঙ্গ / ঝলিছে অমল শোভাতে / পারে না বহিতে নদী জলধার / মাঠে মাঠে ধান ধরে নাকো আর / ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল / তোমার কানন সভাতে! / মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী / শরতকালের প্রভাতে’...।
শরতের সকাল দেখেই পুজোর আগমন বোঝা যায়। শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ মিষ্টি সুবাসে চারপাশ ম ম করে। দূর্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলি শ্বেতশুভ্র সকালে সোনালি রোদে মুক্তোর মতো মনে হয়। শরতের নিজস্বতা, শুভ্রতা আর স্নিগ্ধতায় মিশে আছে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ এবং নদীর কোল ঘেঁষে সাদা কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য। সেই সাথে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই শরৎকালীন প্রকৃতির অপরূপ কাব্য-সাহিত্য চিরন্তন মাত্রা পেয়েছে। ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা / নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা / ওগো শেফালী বনের মনের কামনা / সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা / আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ / শিউলি সুরভিত রাতে বিকশিত জ্যোৎস্নাতে / শরৎ প্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে / হৃদয় কুঞ্জবনে মঞ্জুরিল মধুর শেফালিকা’...।
পরমা প্রকৃতি দেবী দুর্গা। তিনি আদ্যাশক্তি ও সৃষ্টির আদি কারণ। প্রতিবছর শরৎকালে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায় অশুভ শক্তি বিনাশিনী বিশ্বমাতা দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে শুভ-সুন্দরের প্রত্যাশায়। শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ এবং সর্ববৃহৎ  সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব। আর এই শারদ প্রভাতেই শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে মর্ত্যলোকে পদার্পণ করেন দুর্গতিনাশিনী মা দূর্গা। যিনি জীবের দুর্গতি নাশ করেন এবং যে দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন তিনিই দুর্গা। নীল আকাশে শ্বেতশুভ্র মেঘপুঞ্জ, নদীতীরে সাদা কাশফুলের দোলা, শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে ঝরে পড়া শিউলি ফুল সবই দেবী আরাধনার পূর্বাভাস, আর বয়ে আনে পুজোর গন্ধ। উলুধ্বনি আর শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের মহামন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ঢাকের বোল বাতাসে ভাসে। মর্ত্যলোকের সমস্ত কালিমাকে সরিয়ে শুভ্রতার রঙ ছড়াতে দেবী দুর্গার স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে আগমন।
দুর্গা পৌরাণিক দেবী। দেবী দুর্গা হিমালয়বাসিনী দক্ষরাজার কন্যা। মৎস্য পুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবী পুরাণ, কালিকা পুরাণ ও দেবী ভাগবতে বিশেষ আলোচনা, দেবী-মাহাত্ম্য ও পূজাবিধি বর্ণিত আছে। এছাড়া বৈদিক সাহিত্য ও মহাভারতের বিরাট পর্বে দেবী দুর্গার বর্ণনা পাওয়া যায়। মার্কণ্ডেয় পুরাণ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী নিজ মুখেই বলেছেন, ‘একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা’ অর্থাৎ এ জগতে আমি একাই মাত্র বিরাজিতা, আমি ভিন্ন দ্বিতীয় আর কে আছে? এই অনন্ত জগতের মূলে আছেন এক মহাশক্তি, যা থেকে সকল বস্তুর উদ্ভব। তাঁর মধ্যেই সকলের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এক হয়েও বহুরূপে বিরাজ করছেন। তিনি সর্বভূতে বিরাজিত। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমোঃ নমঃ’...।
পুরাণে কথিত আছে, মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে। বিপন্ন দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে তিনি শিব ও দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে বিষ্ণুর কাছে গিয়ে প্রতিকার প্রার্থনা করেন। কারণ, ব্রহ্মার বরেই মহিষাসুর অপ্রতিরোধ্য হয়েছে। তখন বিষ্ণু বললেন, এই অসুরকে বধ করতে হলে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে স্ব-স্ব তেজের কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যেন এই সমবেতভাবে উৎপন্ন তেজ হতে এক নারীমূর্তির সৃষ্টি হয়। এই নারীই অসুরকে বিনাশ করবে। আর তাই মহিষাসুর বধের নিমিত্তে সকল দেবতার পুঞ্জীভূত ক্রোধ বা দেবতেজোপুঞ্জ জ্যোতি বা তেজোরাশি থেকে এক অপরূপ জ্যোর্তিময়ী নারীমূর্তির সৃষ্টি হয়। একেক দেবতার তেজ থেকে দেবীর একেকটি অঙ্গ গঠিত হয়। সমস্ত তেজোপুঞ্জ একত্রিত হয়ে দশদিক আলোকিত করে দিব্য নারীমূর্তি গঠিত হয়। যিনি অশুভরূপ আসুরিক শক্তি বিনাশিনী। সেই তেজোময়ী নারীমূর্তিই হল বিশ্বমাতা ও শুভশক্তির প্রতীক দুর্গা।
দুর্গা ত্রিনয়না বলে তাঁকে ‘ত্র্যম্বকে’ বলা হয়। মায়ের বাম চোখ হল ‘চন্দ্র’ বা বাসনা, ডান চোখ হল ‘সূর্য’ বা কর্ম আর মধ্য-কপাল বা কেন্দ্রীয় চোখ হল ‘জ্ঞান’। তিনি আদ্যাশক্তি, চিন্ময়ী, মহেশ্বরী, ভবানী, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, বিজয়া, গন্ধেশ্বরী, চণ্ডী, মহামায়া, যোগমায়া, দশভুজা, সিংহবাহনা, জগৎজননী, শিবানী, বাসন্তী, জগদ্ধাত্রী, কাত্যায়নী, শক্তিদায়িনী, নারায়ণী, দয়াময়ী, দাক্ষায়নী, সৌভাগ্যদায়িনী, ত্রিলোকপালিনী, মহিষাসুরমর্দিনী প্রভৃতি নামেও আখ্যায়িত।
দেবাদিদেব মহাদেব স্বয়ম্ভুর তেজ থেকে দেবীর উজ্জ্বল মুখশ্রী গঠিত হয়। আর যমরাজের তেজ থেকে কেশরাশি নির্মিত হয়। দেবী দুর্গার দেহের মধ্যভাগ সৃষ্টি হয় দেবরাজ ইন্দ্রের তেজ থেকে আর ভগবান বিষ্ণুর তেজ থেকে দেবীর বলিষ্ঠ বাহুসমূহ তৈরি হয়। ভূ-দেবীর তেজ থেকে দেবী দুর্গার নিতম্বদেশ, বরুণদেবের তেজ থেকে তৈরি হয় দেবীর জঙ্ঘা ও উরুদ্বয়। ব্রহ্মার তেজ থেকে দেবীর পদদ্বয়, সূর্যের তেজ থেকে পায়ের আঙুল, বসুগণের তেজ থেকে দেবী দুর্গার হাতের আঙুল গঠিত হয়। ধনাধিপতি কুবেরের তেজ থেকে দেবীর উন্নত নাসিকা, দেব প্রজাপতির তেজ থেকে দেবী দুর্গার শ্বেতশুভ্র দন্তসমূহ তৈরি হয়। আর অগ্নিদেবের তেজ থেকে দেবীর নয়নত্রয় গঠিত হয়। দেবীর ভ্রূ-যুগল গঠিত হয় সন্ধ্যাদেবীর তেজ থেকে। চন্দ্রের তেজ থেকে দেবীর পীনোন্নত স্তনযুগল আর পবনদেবের তেজ থেকে কর্ণদ্বয় সৃষ্টি হয়। অন্যান্য দেবতাগণের তেজ থেকে দেবীর দেহের অন্যান্য অংশগুলি গঠিত হয়। দেবগণের তেজরাশির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় জ্যোর্তিময়ী নারী দেবী দুর্গা।
দেবতারা তখন একে একে তাঁদের নিজস্ব অস্ত্রশস্ত্র ও অলঙ্কার দিয়ে সেই তেজোময়ী দেবীকে সাজিয়ে তুললেন রণাঙ্গিনী বেশে। প্রথমেই দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর নিজস্ব ত্রিশূল থেকে আর একটি ত্রিশূল তৈরি করে দেবী দুর্গাকে উপহার দিলেন। দেবী সেই ত্রিশূল এক হস্তে ধারণ করলেন আর এক হস্তে বিষ্ণুদেব চক্র প্রদান করলেন। বরুণদেব দিলেন শঙ্খ, হুতাশন দিলেন শক্তি, পবনদেব ধনুক ও বাণপূর্ণ তূণ প্রদান করলেন দেবীকে। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর বজ্র থেকে আর একটি বজ্র তৈরি করে দেবীর হাতে দিলেন এবং আর এক হাতে ঐরাবত গজের গলার ঘণ্টা থেকে একটি তেজোময় ঘণ্টা তৈরি করে দেবীকে উপহার দিলেন। সমুদ্র দিলেন পাশাস্ত্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা দিলেন অঙ্গমালা ও কমণ্ডলু। সূর্যদেব নিজের রশ্মির অনুরূপ তেজোরশ্মি থেকে তেজোময় রশ্মি প্রদান করলেন দেবীর সমস্ত রোমকূপে। ভগবান কাল নির্মল খড়গ ও চমরী দেবীকে প্রদান করলেন। যমরাজ কালদণ্ড থেকে একটি দণ্ড সৃষ্টি করে দেবীকে উপহার দিলেন। সমুদ্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা নির্মল হার, অক্ষয় বস্ত্রযুগল চূড়ামণি, দিব্যকুণ্ডল, ঘটক এবং শুভ্র অর্ধচন্দ্র অর্পণ করে দেবীর সর্ববাহুতে কেঁয়ুর প্রদান করলেন। তারপর দেবীর পদযুগলে নির্মল নূপুর, গলায় দিলেন মণিমুক্তাখচিত হার এবং হাতের প্রতিটি আঙুলে পরিয়ে দিলেন অঙ্গুরীয়। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দেবীর হাতগুলিতে নির্মল পরশু, নানাবিধ অস্ত্র এবং অভেদ্য চর্ম প্রদান করলেন। সমুদ্রের দেবতা দেবীর মস্তকে ও ব্রহ্মদেশে একটি করে শুভ্র অম্লান পদ্মের মালা এবং হাতে একটি করে মনোরম পদ্ম প্রদান করে সম্মানিত করলেন। হিমালয়  পর্বতমালা দেবীকে বাহনরূপে একটি সিংহ এবং ভূষার্থ একটি রত্ন প্রদান করলেন। ধনাধিপতি কুবের প্রদান করলেন একটি সাদা সুরাপূর্ণ পানপাত্র। যাঁর মস্তকে ন্যস্ত পৃথিবীর ভার সেই নাগাধিপতি মহামণি বিভূষিত একটি নাগহার দেবীকে অর্পণ করে বিভূষিত করলেন। অনন্য দেবতাগণ তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র, অলঙ্কার ও উপকরণ দিয়ে দেবীকে রণাঙ্গণাবেশে সজ্জিত করলেন। দেবী দুর্গা যেন এক রণমত্তা দিব্যাঙ্গণা। আর এই তেজময়ী রূপই হল মা দেবী দুর্গা।
প্রাচীন শাস্ত্র ব্রহ্মবৈর্বত পুরাণ মতে, সর্বপ্রথম পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ জগত সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টির সামর্থ্য রক্ষা করার প্রয়োজনে গোলকের নিত্য বৃন্দাবনস্থ মহারাসমণ্ডলে দেবীমাতার পূজা করেন। তাই শ্রীকৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়। প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেন পরমাত্মমনা / বৃন্দাবনে চ সৃষ্টাদ্যৌ গোলকে রাসমণ্ডলে / মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ / ত্রিপুরপ্রেষিতেনৈব তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা / ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেন শাপাদ্দুর্বাসসঃ পুরা / চতুর্থে পূজিতা দেবী ভক্ত্যা ভগবতী সতী / তদা মুনীন্দ্রৈঃ সিদ্ধেন্দ্রৈর্দেবৈশ্চ মুনিমানবৈঃ/ পূজিতা সর্ববিশ্বেষু বভূব সব্বর্তঃ সদা… ।
এরপর মধু ও কৈটভ নামক দুই অসুরের ভয়ে ভীত ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেন। তৃতীয় ত্রিপুর নামক এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে শিব দুর্গাপূজা করেন। আর দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে শ্রীভ্রষ্ট দেবরাজ ইন্দ্র চতুর্থ এবং পরবর্তীকালে মুনি-ঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতাগণ এই মহাদেবীর পূজা করেন।
দ্বিতীয় মনু স্বারোচিষের অধিকার সময়ে চৈত্র বংশজাত মহারাজা সুরথ এবং স্বজন প্রতারিত সমাধি বৈশ্য একদিন মেধা ঋষির আশ্রমে যান। সেখানে ঋষির পরামর্শে নদীতীরে তিনবছর তপস্যা এবং প্রতিমা গড়ে দেবী মহামায়ার পূজা করেন। পূজায় তুষ্ট হয়ে দেবী বরদান করেন। সুরথ মহারাজা দেবীর বর পেলেন হৃতরাজ্য ফিরে পাওয়ার এবং পরজন্মে সূর্যদেবের পুত্র সাবর্ণী মনু হয়ে জন্মাবার অর্থাৎ অষ্টম মনু হয়ে পৃথিবীতে রাজত্ব করার অধিকার আর সমাধি বৈশ্য পেলেন তত্ত্বজ্ঞান। তাঁদের মনে ফিরে আসে শান্তি। এ পূজা হয়েছিল বসন্তকালে, তাই এটি বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। এ সময় দেবী দূর্গা ‘বাসন্তী’ নামে পূজিতা হন। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায় তখন থেকে আদ্যাবধি ‘বাসন্তী’ পূজা করে আসছে।
চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে ‘বাসন্তী’ আর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’ অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে দেবীমাতা আবার হেমন্তকালে ‘জগদ্ধাত্রী’ ও ‘কাত্যায়নী’ নামে পূজিতা হন। তবে ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ থেকে জানা যায় রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য ত্রেতাযুগে অকালে অর্থাৎ বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে মা দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। ত্রেতাযুগে অসুরদের দাপটে সমগ্র মানবজাতি যখন উৎকন্ঠিত তখন মানব কল্যাণে এ ধরাধামে আর্বিভূত হন শ্রীরামচন্দ্র। তিনি পিতার আদেশে চৌদ্দ বছর বনবাস যাপনকালে লঙ্কাধিরাজ রাবণ তাঁর পত্নী সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যান। শ্রীরামচন্দ্রের সাথে রাবণের যুদ্ধ হয়েছিল শরৎকালে। সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধন রচনা করে লঙ্কায় উপস্থিত হলেন। সীতা উদ্ধারের জন্য শক্তি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মা রামকে আদেশ দিলেন অপরাজিতা জগন্মাতা দেবীদুর্গার বা মহামায়ার আরাধনা করতে। রামচন্দ্র আর্দ্রা নক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণা নবমী তিথিতে অকালবোধন করে রাবণবধের জন্য ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজা করেছিলেন কিষ্কিন্ধ্যায়। জগদ্রামের ‘দূর্গাপঞ্চরাত্র’ কাব্যে রামচন্দ্র কর্তৃক কিষ্কিন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত অকাল দুর্গোৎসব বর্ণিত হয়েছে। নিদ্রিতা দেবীকে বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে জাগ্রত করেন, এটিই দেবীর অকালবোধন। বোধন অর্থ জাগ্রত করা। রামচন্দ্র স্বয়ং ব্রহ্মার নির্দেশ ও পরামর্শে দেবীদুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে সিংহবাহনা দেবীর বোধন করেছিলেন, ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ম বৃক্ষমূলে। সেই দিনটিই ছিল মহাষষ্ঠী। শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পূজা চলতে থাকে। দেবী স্বয়ং সপ্তমীর দিন রামের ধনুঃশরে প্রবেশ করেন। অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নেন। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করেন শ্রীরামচন্দ্র। রাম নবমীর দিন সীতা উদ্ধার করেন। আর দশমীর দিন প্রাতে যুদ্ধে জয়লাভের পর দেবীমূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিসর্জন হয় মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে। সেদিন পালিত হয় বিজয়া দশমীর বিজয়োৎসব।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে শরৎকালে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। শরৎকালে আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে মহালয়ার দিনে দেবীঘট স্থাপনের মাধ্যমে কল্পারম্ভ পূজা, বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভ সূচনা হয়। সাধারণত ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত চলে পূজা-অর্চনাসহ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। পূজার এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়াদশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের এই শুক্ল পক্ষটিতে এক পক্ষকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও লৌকিক অনুষ্ঠান ও পার্বণাদি অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পক্ষকে দেবীপক্ষও বলা হয়।
ষষ্ঠীর দিনে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, উলুধ্বনি ও বিজয় শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গার পিতৃগৃহে আগমন ঘটে। এটিই দেবীর বোধন। এরপর মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান, প্রবেশ ও স্থাপন এবং মহাসপ্তমীবিহিত পূজা, অষ্টমীতে মহাষ্টমীবিহিত পূজা এবং কুমারী ও সন্ধিপূজা, নবমীতে মহানবমীবিহিত কল্পারম্ভ ও মহানবমীবিহিত পূজা, নবমী পার হয়ে দশমীর দিনে বিজয়াদশমীবিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, সিঁদুর খেলা, বিসর্জন বিজয়াদশমীকৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা আর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও বিজয়া দশমীর পরেও মহাসাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় লক্ষ্মীপূজা।
কুমারী পূজা হল তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অরজস্বলা কুমারী মেয়ের পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গ রূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্রমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুরকে বধ করার মধ্য দিয়ে। কোলাসুর একসময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। দেবগণের প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকে মর্ত্যে  কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হল নারীতে পরমার্থ দর্শন ও মাতৃজ্ঞান অর্জন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তি বলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হয়, সেই ত্রিবিধ শক্তি বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়। এ সাধন পদ্ধতিতে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে। এ ভাবনায় ভাবিত হয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।
সম্ভবত খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় দুর্গোৎসব প্রবর্তিত হয় বলে জানা যায়। তবে জনশ্রুতি আছে, পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর বিধান অনুসারে রাজা কংসনারায়ণ ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর তাহিরপুরে রাজকীয় মন্দিরে মহা আড়ম্বরে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার সূচনা করেন। ধীরে ধীরে রাজা কংসনারায়ণের অনুসরণে সকল বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু রাজন্যবর্গ ও জমিদারগণ একই পদ্ধতিতে শরৎকালে দুর্গাপূজা করেন। পরবর্তীতে রাজতন্ত্র ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর গণতান্ত্রিকভাবে সকলের অংশগ্রহণে ‘বারোয়ারি’ বা সর্বজনীনভাবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। শরৎকালের এ পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায় মহা সাড়ম্বরে পালন করে আসছে। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মন্দিরে মন্দিরে ধূপের ধোঁয়ায় শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে মহামন্ত্র উচ্চারিত হয়।
বর্ষপঞ্জী অনুসারে প্রতিবছর শরৎকালে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও বাঙালি হিন্দু সম্প্র্রদায় অধ্যুষিত বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মহাসমারোহে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অগণিত ভক্ত বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবীর আরাধনায় পুষ্পাঞ্জলি দেয়, অঞ্জলি শেষে ভক্তদের মাঝে ফলমূল, খিচুড়ি আর ভোগের প্রসাদ বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যায় ধূপ-ধুনা, শঙ্খ, ঘণ্টা, ঢোল, কাঁসর, উলুধ্বনি আর ঢাকের তালে চলে আরতি। সুন্দর সাজ আর পোষাকে পূজামণ্ডপে চলে ভক্ত-দর্শনার্থীদের প্রতিমা দর্শন। সর্বস্তরের ও নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের মধ্যে পূজায় গড়ে ওঠে  ভ্রাতৃত্ববোধ, সখ্যতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি।
সকল প্রকার আসুরিক শক্তির বিনাশ সাধনে দুর্গা মায়ের মর্ত্যলোকে আগমন। দুর্গা মায়ের কল্যাণে দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাক, বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হোক। আর এই দুর্গোৎসবের মাধ্যমে আমরা পরস্পরের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে মেতে উঠি আনন্দে। তাই শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব।

_____

No comments:

Post a Comment