গল্পঃ রমেনবাবুর আমগাছঃ পুষ্পেন মণ্ডল



রমেনবাবু খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। সব ব্যপারেই নাক উঁচু ভাব। প্রতিদিন সকালে যখন বাজারে ঢোকেন তখন দোকানিরা সব তটস্থ হয়ে থাকে। সেরা মাছ, সেরা সবজি ছাড়া তাঁর চলে না। এলাকার পুরনো ব্যবসায়ী। তাই সবাই সমীহ করে। ইলিশ মাছের কানকোটা উলটে দেখে নাক সিটকে বলেন, “এঁ হে! এ তো একেবারে পচা রে বিশু! ক’দিনের পুরনো মাছ নিয়ে এসেছিস?”
মাছওলা আমতা আমতা করে বলে, “আজ্ঞে কত্তা, একদম টাটকা। সবে ভোরবেলা জালে উঠেছে।”
রমেনবাবু নাকে রুমাল চেপে বলেন, “মিথ্যে কথা বলিস না বিশু। তোর বাপের কাছ থেকেও আমি মাছ কিনতাম। গাটা তো নরম। দু’হপ্তা বরফের তলায় ছিল। কানকোর নিচেটা কালো হয়ে গেছে।”
বেগুনে একটা ফুটো থাকলে নেবেন না, ঢ্যাঁড়সের সবক’টা পিছন ভেঙে ভেঙে দেখবেন, বাঁকা ঝিঙে চলবে না, চশমা এঁটে ফুলকপির ভিতরে পোকা খুঁজবেন।
তা সেই রমেন সমাদ্দার একটা তিন হাত আমগাছের চারা কিনলেন রথের মেলা থেকে। চারপাশে কুড়িটা লোক দাঁড়িয়ে দেখল আমগাছ কী করে কিনতে হয়। লোকটার বড়ো বড়ো চুলদাড়িতে জটা পড়েছে, পরনে লাল ধুতি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে রক্ততিলক। পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে তাকে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় থাকা হয়?”
“আজ্ঞে, আমি? হ-হরিদেবপুর।” থতমত খেয়ে বলল লোকটি।
মেলাটা বসে বড়ো রাস্তার ওপরেই। তার মধ্যে গাছের দোকান অনেকগুলো বসেছে। রমেনবাবু ভেবেই ছিলেন, এবার রথের মেলা থেকে একটা ভালো জাতের আমগাছের চারা কিনবেন। অনেক খুঁজে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে একেবারে শেষের দিকে এই গাছের দোকানে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর বৃষ্টিটাও থামছে না, থেকে থেকেই হচ্ছে। ছাতা নিয়ে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো মুশকিল।
হরিদেবপুরের নাম শুনে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “সে তো অনেকদূর। তা সেখান থেকে এখানে এয়েচ গাছ বিক্কিরি করতে? ওখানে কি রথের মেলা বসে না? নাকি ওখানের লোক গাছ কেনে না?”
“ওদিকে লোকের হাতে অত পয়সা নেই গো বাবু। সব জলা আর বনবাদাড় এলাকা।” পাশে আরেকটা খদ্দেরকে গাছ বেঁধে দিতে দিতে বলল সে।
“হরিদেবপুরে পঞ্চানন্দতলায় মদন মুখুজ্যেদের বাড়ি চেনো? ওটা আমার পিসিমার বাড়ি।”
“সে আর চিনবনি বাবু? ওনারা তো এককালে জমিদার ছিলেন। আমদের বাড়িটা ঐ পাশের গুমো পাড়ায়।”
“তা গাছটা ভালো হবে বলছ? আম মিষ্টি হবে তো?” গাছের পাতাগুলো শুঁকতে শুঁকতে জিজ্ঞাসা করলেন রমেনবাবু।
“আপনি নিশ্চিন্তে নিয়ে যান কত্তা। মিষ্টি না হলে এই গাছ উপড়ে নিয়ে এসে ফেলে দিয়ে যাবেন।” মাথায় বড়ো চুলগুলো বেড় পাকিয়ে বলল সে।
“তা তোমাকে পাচ্ছি কোথায় বাপু? আমি কি হরিদেবপুর দৌড়াব হনুমানের মতো গাছ মাথায় করে?”
“পরের বারে রথের মেলায় আমাকে এখানেই পাবেন। আমার নাম গোবিন্দ পাড়ুই, বাপের নাম নিত্যানন্দ পাড়ুই, ঠাকুরদা...”
“থামো থামো, তোমার চোদ্দ পুরুষের নাম জেনে আমি কী করব হতচ্ছাড়া? তাছাড়া, পরের বছরের মধ্যে কি আম হবে নাকি?”
“আজ্ঞে হতেই হবে। এ নতুন জাতের আমগাছ। একবছরে ফল না হলে নাকখত দেব।”
“রাখো তোমার নাকখত। কী যেন নাম বললে এই গাছটার?”
“আজ্ঞে, রসবিহারী সোনামুখী।” একগাল হেসে বলল গোবিন্দ।
“বাপের জম্মে এমন নাম শুনিনি। গোলাপখাস শুনেছি, ল্যাংড়া, ফজলি, দিশি, বেগমপুরি এসব শুনেছি। রসবিহারী সোনামুখী, এ কোথাকার আম শুনি?”
“সে বাবু অনেক কথা। এখন এই গোলের মধ্যে বলা যাবে না। আপনি বরং আপনার বাড়ির ঠিকানাটা বলুন।” তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “এ-গাছের দাম আপনাকে দিতে হবে না। শুধু আমাকে একটা কথা দিতে হবে।”
রমেনবাবু ভাবলেন, এটা আবার কী ফন্দি! গাছ কিনব, দাম নেবে না? সন্দেহের দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, “কী কথা?”
কান এঁটো করা হাসি হেসে গোবিন্দ বলল, “আজ্ঞে, তেমন কিছু নয়। আম যখন ফলবে গোটা চারেক এসে খেয়ে যাব। তাহলেই দাম উশুল হয়ে যাবে। তবে একটা কথা বলি বাবু। এ-গাছ কিন্তু সবার বাগানে বাঁচে না।”
জীবনে কোনওদিন কারোর কাছ থেকে পাঁচ টাকার জিনিস ধারে নেননি। বিনা পয়সায় কেনার তো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি প্রায় জোর করেই তিরিশ টাকা গুঁজে দিলেন তার হাতে। গচ্চা গেলে যাবে। জীবনে অত মেপে কি সব কাজ করা যায়?
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, মেলা থেকে ফিরে পাঞ্জাবিটা খুলে আলনায় ঝোলানোর সময় দেখলেন পকেটে সেই তিরিশ টাকা পড়ে রয়েছে। ভিড়ের মধ্যে কি তবে লোকটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল টাকাটা? ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না রমেনবাবু।
পরেরদিন রমেনবাবু নিজেই শাবল দিয়ে গর্ত করে মাটি সমেত গাছটা পুঁতে দিলেন বাগানের এককোণে। বর্ষাকালে আর কিছুই করার নেই।
বাগানটা খুব বড়ো নয়। বাপ-ঠাকুরদারা যা জমিজমা রেখে গিয়েছিলেন, ভাগ-বাটোয়ারার পরে তাঁর ভাগে এটাই রয়েছে। সাকুল্যে দশ কাঠা জায়গা। তাও এই মফস্বলে অনেকটা। তিন কাঠা জায়গাতেও যেখানে সেখানে ফ্ল্যাট উঠছে। তাঁর এ বাগান আর বাড়িটা বাদ দিলে প্রায় পুরো পাড়াটাই ফ্ল্যাটে ভরে গেছে। তাঁর পিছনেও অনেক প্রমোটার পড়ে আছে। ভালো টাকার লোভ দেখাচ্ছে। তিনি অবশ্য সেসব কথায় কান দেননি এতদিন। বাগানটা তাঁর খুব প্রিয়। আগের একটা আমগাছও আছে, তবে এটার ফল খুব একটা মিষ্টি নয়। সেই জন্য তাঁর মনটা সবসময় খুঁতখুঁত করত। তাই আবার একটা নতুন লাগালেন। এছাড়া আছে কাঁঠাল, লিচু, জাম, পেয়ারা, চারটে নারকেল, আটটা সুপারি, টগর, জুঁই আর একটা মোটা মহানিম গাছ।


মাস দুয়েক পরে দেখা গেল নতুন লাগানো আমগাছটা যেন একটু বেশিই তাড়াতাড়ি বাড়ছে। আশ্চর্য! আর দু’মাস পরে রমেনবাবুর মাথা ছড়িয়ে দু’হাত উঠে গেল। আবার ক’দিনের মধ্যে মুকুলও দেখা গেল। সামনের জ্যৈষ্ঠে ফল হল গাছ ছেয়ে। সেই আমের যেমন রং, তেমন তার স্বাদ আর গন্ধ। হাত বাড়িয়ে পাড়া যাচ্ছে। হলুদের উপর লালচে আভা, গোল গোল আম। এরকম আম সত্যিই তিনি কোনওদিন খাননি। শুধু তিনি কেন, কেউই খেয়েছে বলে শোনেননি। নেহাত বাগানের চারপাশে উঁচু করে পাঁচিল দেওয়া, না হলে পাড়ার ছেলেছোকরারা একটাও আস্ত রাখত না। সপরিবারে খেয়ে, সব আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি বিলিয়েও অনেক রয়ে গেল। শেষে আমের চাটনি, আমের জেলি পর্যন্ত করে ফেললেন গিন্নি।
একদিন ভোরবেলা রমেনবাবু বাগানে পায়চারি করছেন, হঠাৎ বাগানের টিনের গেটে ঠং ঠং করে আওয়াজ। “বাবু আছেন? ও রমেনবাবু!”
কার গলা? রমেনবাবু গেট খুলে উঁকি মারলেন। একজন লোক দাঁড়িয়ে, বড়ো বড়ো চুলদাড়ি, লাল কাপড় হাঁটুর উপরে কোঁচা মেরে পরা, গায়ে ময়লা গেঞ্জি, মাথায় বাঁধা লাল কাপড়ের ফেট্টি। চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না।
“বাবু চিনতে পারছেন? আমি গোবিন্দ পাড়ুই। গেল বারে রথের মেলায় আমার থেকে আমগাছ কিনেছিলেন। মনে পড়েছে?” হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল লোকটি।
“তা এতদিন পর?” গলায় রুদ্রাক্ষের দু’ছড়া মালা দেখে ধাঁ করে মনে পড়ে গেল রমেনবাবুর।
“আজ্ঞে, গাছটার খোঁজ নিতে এলাম। ফল হয়েছিল, বাবু?”
“হ্যাঁ, ফল ভালো হয়েছে। গোল গোল রসালো আম, মিষ্টি মধুর মতো। তা কী যেন নাম বলেছিলে গাছটার? এতদিনে ভুলেই গেছি।”
“রসবিহারী সোনামুখী।” একগাল হেসে বলল গোবিন্দ।
“তা যেমন গালভরা নাম তেমন ওর স্বাদ। এসো ভিতরে, দেখে যাও গাছটাকে। এখনও গাছে বেশ ক’টা আম ঝুলছে। বলেছিলে খাবে, ঐগুলো মনে হয় তোমার জন্যই রয়েছে। সামনে বারের ফল আর হয়তো খাওয়া হবে না। এবছরেই হয়তো কেটে ফেলতে হবে গাছটি।” মনমরা হয়ে বললেন রমেনবাবু।
“কেন বাবু? এমন সুন্দর গাছ কেটে ফেলবেন!”
“আর কী করা যাবে বলো। আমার ব্যাবসার অবস্থা ভালো নয়। শরীরে সুগার। আর বাঁচব না বেশিদিন। সামনে মেয়ের বিয়ে। প্রচুর খরচা। জমানো যা ছিল, ছেলের পড়াশোনার পিছনে সবই প্রায় শেষ। এখন এ জায়গা বিক্রি করা ছাড়া কোনও রাস্তা নেই।” সরল মনে সত্যি কথাই বলে ফেললেন রমেনবাবু। গাছটার সামনে এসে পরম স্নেহে একবার ডালপালায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
গোবিন্দ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বসে পড়ল ঘাসের উপর। তারপর বলল, “বাবু, একটা কথা বলব? সেবারে আপনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এ-গাছ আমি কোথা থেকে পেয়েছি। তখন বলা হয়নি, এখন শুনবেন সে গল্প? শুনলে মনে হবে গল্পকথা। আসলে কিন্তু সত্যি।”
রমেনবাবু উৎসাহভরে বললেন, “বেশ, শুনি কী গল্প।”
“আপনি তো জানেন, আমাদের গ্রামটা সুন্দরবন এলাকায় পড়ে। জোয়ান বয়েসে প্রায়ই যেতাম জঙ্গলে কাঠ কাটতে আর মধুর চাক ভাঙতে। একদিন মৌমাছিদের লক্ষ্য করে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছিলাম। বড়ো চাকের খোঁজে। পেয়েও ছিলাম। কিন্তু একটা বড়ো বাঘ পিছু নিয়েছিল। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। জঙ্গলের মধ্যে বাঘের পায়ের শব্দ কেউ পায় না। চুপি চুপি এসে আমাদের পিছন থেকে আক্রমণ করল। দু’জন সঙ্গী সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। আমি কোনওরকমে পালালাম। প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেলাম জঙ্গলের আরও গভীরে। দু’দিন না খেয়ে বাঘের ভয়ে বসে রইলাম গাছের উপরে। নামলেই মৃত্যু। শরীর তখন আর বইছে না। যেকোনও সময়ে হয়তো ঢলে পড়ে যাব। মাথা ভোম হয়ে গেছে।
“এমন সময়ে ভোরের আলোয় দেখলাম টকটকে লাল কাপড় পরা এক সাধু চলেছেন মন্ত্র জপতে জপতে। অবাক ব্যাপার! জঙ্গলের এত গভীরে মানুষ আসবে কোথা থেকে? মানুষখেকো বাঘের ভয়ে এখানে কেউ ঢোকে না। চোখের ভুল নয় তো? চোখ কচলে দেখলাম, না, এ তো সত্যি সাধু। তখন মনে সাহস পেয়ে গাছ থেকে নেমে দৌড়লাম সেই সাধুর পিছনে। সোজা গিয়ে পা জড়িয়ে ধরলাম। ‘বাবা বাঁচান আমাকে।’ সাধু নিজের কুটিরে নিয়ে গেলেন। পরে জানলাম, সেই সাধু হলেন এক পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক দ্বীপের মধ্যে এক আমবাগানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে সাধনা করতেন। হিংস্র মানুষখেকো বাঘেরাও তাঁর ত্রিসীমানায় আসত না। আমাকে তিনি আশ্রয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোর প্রাণ বাঁচাতে পারি, কিন্তু তার বিনিময়ে তুই সারাজীবন আমার সেবা করবি।’ আমি সেই শর্তে রাজী হয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলাম জঙ্গলে।”
“তারপর?” রমেনবাবুর মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বের হল শব্দটা।
“তারপর আর কী? বহুবছর কেটে গেল। ঐ বাগানের আম এত সুস্বাদু, কী বলব! মনে হয় এটা ঐ তান্ত্রিকের সাধনার ফল। কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকত না, তান্ত্রিক ঐ জঙ্গলের মধ্যে একা একা কীসের আশায় পড়ে আছেন? আর সুন্দরবনের বাদা জমিতে আমবাগানই বা হল কীভাবে? এদিকে আমি সংসারী মানুষ। জঙ্গলে কি আর মন টেকে? মন পড়ে আছে বাড়িতে। বউ, বাচ্চা, বাবা, মা সবাই কেমন আছে, কী করছে তারা, কত বছর হয়ে গেল দেখিনি তাদের। শুধু ভাবি, কীভাবে পালাব এই জাল কেটে।
“একদিন তান্ত্রিকের ধ্যান শেষ হতে আমি বললাম আমার মনের কথা। ‘বাবা, কিছুদিনের জন্য ছুটি দাও। বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসি।’
“তান্ত্রিক বললেন, ‘তোর বাড়িতে সব ভালো আছে। চিন্তা করিস না।’
“বললাম, ‘বাবা, মনকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না। একবার বাড়ি যাবার অনুমতি দাও।’
“অনেক অনুনয় বিনয়ের পর তিনি বললেন, ‘যা, ঘুরে আয়।’
“আমি মহানন্দে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে নিলাম সেই বাগানের এক বস্তা আম। কিন্তু বাড়িতে ফিরে আমি অবাক। আমার জায়গায় অন্য একজন গোবিন্দ পাড়ুই সেজে ঘর করছে। আমাকে দেখে বাড়ির লোক খুশি হওয়া দূরে থাক, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। আমার বহুদিনের না কাটা চুলদাড়িতে জটা পড়েছে, গায়ে খড়ি, হাতে-গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে লাল তান্ত্রিকের পোশাক, রক্তচন্দনের তিলক। এসব দেখে ওরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু ঐ লোকটা কে যে আমার বেশ ধরে ঘর করছে? কিছুই মাথায় ঢুকল না। এই জন্যই কি তান্ত্রিক আমাকে বলেছিলেন যে বাড়ির লোক সব ভালো আছে? তিনি কি সব জানতেন? নদীর ধারে বসে খুব কাঁদলাম। তারপর ফিরে চললাম আবার সেই তান্ত্রিকের আস্তানায়। কিন্তু আশ্চর্য! সেই দ্বীপটা আর খুঁজে পেলাম না। গোটা সুন্দরবন চষে ফেললাম। কিন্তু পেলাম না কিছুতেই। আরেকটা জিনিস দেখলাম, কোনও বাঘ বা কুমির কিন্তু আমার ধারেকাছে ঘেঁষছে না।”
এই পর্যন্ত বলে সে চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। রমেনবাবু বললেন, “তা এখন থাকো কোথায়?”
“জঙ্গলেই থাকি, বাবু। যেখানে কোনও মানুষ থাকে না, সেখানে আমি থাকি। তান্ত্রিকের মন্ত্রের জোরে আমার কাছে যমও ঘেঁষতে ভয় পায়। সেই এক বস্তা আমের আঁটি থেকে আমার নিজের একটা আমবাগান তৈরি করেছি জঙ্গলের মধ্যে। আচ্ছা, চলি বাবু। আমাকে আবার অনেকটা পথ যেতে হবে।” বলে সে উঠে পড়ল।
রমেনবাবু চুপ করে ভাবছিলেন গোবিন্দ পাড়ুইয়ের কথা। অনেকক্ষণ পর খেয়াল হল, সে যে বলেছিল আম খাবে। কথা বলতে বলতে তাই ভুলে গেছে।


এর বেশ কিছুদিন পর একদিন সকালে স্নান-খাওয়া সেরে অফিসে বেরোতে যাবেন এমন সময়ে ফোনটা বেজে উঠল। পিসিমার বাড়ি থেকে ফোন। তিনি কাল রাতে গত হয়েছেন। রমেনবাবু শোকাহত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “হঠাৎ করে মারা গেলেন কীভাবে?”
বয়স্ক ম্যানেজারবাবু জানালেন, “আপনি যে একঝুড়ি আম পাঠিয়ে ছিলেন দু’দিন আগে, সেই আম খেতে গিয়েই শ্বাসনালীতে রস ঢুকে হেঁচকি তুলে মারা গেলেন। ডাক্তার ডেকে আনার সুযোগ দেননি। এমনিতেও বহুদিন ধরে ধুঁকছিলেন শ্বাসকষ্টে।”
পিসিমার তিন কুলে রমেনবাবু ছাড়া কেউ নেই। তাই তিনি সবকিছু রমেনবাবুকে উইল করে দিয়ে গেছেন। এ খবর যদিও রমেনবাবু আগে থেকে জানতেন না। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার হরিদেবপুর যেতে হবে। ফোনটা রেখে দেখলেন এই দুঃখের খবরেও মনের ভিতরে একটা খুশির বাতাস বয়ে গেল। যাক, জমিটা তাহলে বিক্রি করতে হবে না। কিপটে বৃদ্ধা পিসিমার টাকাপয়সা, গয়নাগাটি যা ব্যাঙ্কের লকারে রাখা আছে, তাতে মেয়ের বিয়ে বেশ ধুমধাম করেই হবে। আবার বাজারে দেনাও সব মিটে যাবে।
এর পরেরদিনই রমেনবাবু পৌঁছলেন হরিদেবপুর। নধেখালি পর্যন্ত ট্রেনে করে গিয়ে রিক্সায় খেয়াঘাট। সেখান থেকে দেড় ঘণ্টা নৌকা করে গিয়ে আবার ভ্যানে চাপতে হয়। পড়ন্ত বিকেলে নামলেন হরিদেবপুরে।
প্রায় পঁচিশ বছর পরে রমেনবাবু এলেন এখানে। সন্ধ্যাবেলা যখন পিসিমার বাড়ি ঢুকলেন, থমথম করছে বড়ো বাড়ি। সোজা গিয়ে ঢুকলেন পিসিমার ঘরে। খাটের ওপরে সাদা কাপড় বিছিয়ে তাঁর ছবিতে মালা পরানো আছে। মনে পড়ল, কতবার আসতে বলেছিলেন। শেষ জীবনে একা একা কষ্টও পেছিলেন খুব। যখন ছোটো ছিলেন রমেনবাবু এখানে এসেছেন বহুবার। দুয়েকবার মাস খানেক করে থেকে গেছেন। পিসিমার ছেলেপুলে ছিল না বলে তাঁকেই নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন। কিন্তু বড়ো হয়ে হাজারো কাজের চাপে তাঁর কথা রাখা হয়নি। এতদিন পরে এলেন শুধু সম্পত্তির লোভে। খেয়াল হল নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল।
শেষকৃত্য মেটাতে আরও ক’দিন থেকে যেতে হল। সব কাজ মিটিয়ে ফেরার আগের দিন ম্যানেজারবাবুকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানে গুমো পাড়া বলে কোনও জায়গা আছে?”
তিনি বললেন, “আজ্ঞে, আছে। বাড়ির পিছনে বাগানের পরে চাষের জলা জমিটা পেরোলেই নদীর ধারে গুমো পাড়া।”
“ওখানে গোবিন্দ পাড়ুইকে চেনেন?”
নামটা শুনে ম্যানেজারবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “কে গোবিন্দ পাড়ুই? নিত্যানন্দর ছেলে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। চেনেন ওকে? ভালোই হল। একবার নিয়ে যাবেন ওদের বাড়ি?” রমেনবাবু আগ্রহ নিয়ে বললেন।
“ওদের বাড়িতে এখন তো আর কেউ থাকে না। বছর দুই আগে ভয়ানক বন্যায় ওদের বাড়ি তলিয়ে গেছে নদীতে।” তারপর কিছুক্ষণ থেমে ম্যানেজারবাবু বললেন, “এত বছর পরে মনে পড়েছে তাকে। ঐ গোবিন্দ ছোটোবেলায় আপনার সাথে খেলতে আসত এখানে। সে অবশ্য জোয়ান বয়েসেই মারা গেছে। মধুর চাক ভাঙতে গিয়েছিল গভীর বনে, তখন বাঘের পেটে যায়। সে অনেক বছর আগের কথা। বেচারা। আপনার মনে আছে, সে আম খেতে কী ভালোবাসত! গোবিন্দ আর আপনি বাড়ির পিছনের আমবাগানে ঢুকে সারাদিন গাছ থেকে আম পেড়ে খেতেন।”
আরও কত কথা বলে চললেন ম্যানেজারবাবু। বয়স বাড়লে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কথা বলে। কিছু কথা কানে ঢুকল, কিছু ঢুকল না। তাঁর মনে পড়েছে, গোবিন্দকে ছোটোবেলায় গবা বলে ডাকতেন তিনি। সে অনেককাল আগের কথা। স্মৃতির পলি সরিয়ে একটুকরো ঘটনার কথা মনে পড়ল। বয়েস তখন চোদ্দ-পনেরো হবে। গরমের ছুটিতে বেড়াতে এসেছিলেন এখানে। গবা কাঁদতে কাঁদতে এসে বলল, “চাষের জমি বন্দক দিয়ে বাবা দিদির বিয়ে দিয়েছিলেন। আর একমাসের মধ্যে টাকা না পেলে মহাজন বলেছে সব জমি কেড়ে নেবে। তখন আমরা সবাই না খেতে পেয়ে মরব রে!”
ছোটোবেলায় বন্ধুর জন্য মানুষ কত কিছু করতে পারে! রমেনবাবু নিজের গলা থেকে সোনার চেন খুলে দিয়েছিলেন গবাকে। বাড়ি ফিরে বলেছিলেন পুকুরে স্নান করার সময়ে হারিয়ে গেছে। সেজন্য বাবার হাতে মারও খেয়েছিলেন। এতদিন পরে গবাও তাঁর উপকার করে মিথ্যা কথা বলল! ভাবলেন পরের বছর রথের মেলায় গবার সাথে দেখা হলে আরও একটি আমগাছ কিনবেন তিনি। আগেরটার পাশে বসিয়ে একটির নাম রাখবেন রমেন, আর একটির গোবিন্দ।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

3 comments:

  1. অপূর্ব গল্প! ওয়ান অফ ইওর বেস্ট পুষ্পেন দা

    ReplyDelete
  2. এটা আর একটা৷ ক্লাসিক। কী মোচড় দিয়েছ? দারুণ লাগল।

    ReplyDelete