উপন্যাসিকাঃ চোরাবালি সংগ্রামঃ রণিত ভৌমিক



সেবার বনবিহারীবাবুর প্রদর্শনী থেকে ফেরার পর কিছুদিন আমাদের বিশ্রামেই কাটল। তবে মন এই বিশ্রামকে কিছুতেই মানতে রাজি ছিল না। আর তাই বাড়ির দৈনন্দিন কাজ এবং লেখাপড়ার মধ্যে দিয়েই আমায় সময় কাটাতে হচ্ছিল। কিন্ত এর মধ্যেই একদিন সকালে বাড়িতে বনবিহারীবাবুর আগমন ঘটল।
ওঁকে দেখামাত্রই আমার খুব আনন্দ হল, ঠিক যেমন সমুদা আর আমার বাবারও হল। তবে উনি বেশ অভিমানের সুরেই সমুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সমুবাবু, আপনারা কি আমাকে একেবারে forgot করে ফেললেন? কত days হয়ে গেল বলুন তো, আপনাদের কোন news নেই। তাই আর wait করতে না পেরে নিজেই today coming আপনাদের এখানে।”
সমুদা ওঁর কথা শুনে বলল, “তা আপনি ভালোই করেছেন চলে এসে। অনেকদিন হল একসঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিইনি।”
সমুদার কথায় সায় দিয়ে বাবাও বলে উঠল, “হ্যাঁ! তাহলে আজ দুপুরে হয়েই যাক কষা খাসির মাংস দিয়ে গরম ভাত আর সেই সঙ্গে নন্দ ময়রার গরম রসগোল্লা। কী বলেন, বনবিহারীবাবু?”
বনবিহারীবাবুকে দেখলাম ঘাড় নেড়ে বলতে, “Yes! Yes! হতেই পারে। আমার no problem, তবে আজ আমার এখানে coming-এর আরও একটা reason আছে।”
সেই শুনে আমি এগিয়ে এসে ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী কারণ, বনবিহারীবাবু?”
উত্তরে উনি বললেন, “শুনলাম আজ evening-এর একটা function-এ বোম্বের famous singer মেনকা শর্মা sing করতে আসছেন। তাই সংগঠকদের সঙ্গে talk করে তোমাদের জন্য কিছু টিকিটের ব্যবস্থা করেছি। এখন তোমরা রাজি থাকলে ওই function-এ একসঙ্গে go করা যাবে আর সেই সঙ্গে আমাদের একটু বেড়ানোও হবে। তবে তোমার father-এর তো আবার এইসব একবারেই not পছন্দ, তাই ওঁকে আর এই ব্যাপারে বিরক্ত করছি না।”
বাবা ওঁর কথা শোনার পর বলল, “ঠিকই বলেছেন আপনি। এইসব ব্যাপারে আমার ইন্টারেস্ট খুবই কম, তাই আপনারাই ঘুরে আসুন।”
অনুষ্ঠানের কথাটা শোনার পর থেকেই আমার মনে খুব আনন্দ হচ্ছিল। আর সেই দেখে সমুদা বনবিহারীবাবুর উদ্দেশ্যে বলল, “বঙ্কুর মনে হয় সেখানে যাওয়ার খুব আগ্রহ, বুঝলেন বনবিহারীবাবুর? তাই চলুন বিকালে অনুষ্ঠানটা দেখেই আসি।”
ব্যস! কথামতোই কাজ। দুপুরে কষা মাংস দিয়ে ভাত, সঙ্গে নন্দ ময়রার গরম রসগোল্লা খেয়ে একটু জিরিয়ে নিলাম এবং তারপর বিকেল হতেই আমরা ওই অনুষ্ঠান দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। সেখানে পৌঁছে দেখি আমাদের জন্য আগে থেকেই বসবার জায়গা রাখা ছিল, সৌজন্যে অবশ্যই বনবিহারীবাবু।
সেই গায়িকা সহ বাকি শিল্পীদের গাওয়া গান ছিল যথেষ্ট প্রশংসনীয়। তবে অনুষ্ঠান শেষে আমরা যখন বেরিয়ে আসছি তখন হঠাৎ বনবিহারীবাবুর চেনা এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বনবিহারীবাবু আমাদের সঙ্গে ওঁর পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং আলাপ করে জানতে পারলাম ওঁর নাম গোবিন্দলাল বর্মণ। উনি বারাসাতে থাকেন এবং বনবিহারীবাবুর ফটোগ্রাফির বড়ো ভক্ত।
কথায় কথায় ওঁর বিরাট ব্যাবসার কথাও জানতে পারলাম এবং এটাও বুঝলাম যে উনি নিয়মিত বনবিহারীবাবুর প্রদর্শনীতে যান আর দু-তিনটে ছবিও কেনেন। আমরা আরও কিছুক্ষণ ওঁর সঙ্গে কথা বলার পর বাড়ি ফিরে এলাম। বনবিহারীবাবু আমাদের ট্যাক্সিতে বাড়ি অবধি ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন নিজের বাড়ি গড়িয়ায়। সেদিন রাতে খিদে না থাকায় আমরা জলদি ঘুমিয়ে পড়লাম।


পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখি গোবিন্দলাল বর্মণ আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। গোপালকাকা ওঁকে বসিয়ে সমুদাকে ডেকে দিলেন। উনি যখন সমুদার কাছে এক দরকারে এসেছেন বলে জানালেন, তখন আমি ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম যে এটা আসলে সমুদার জন্য তার নতুন কেসের আগমনবার্তা।
উনি সমুদাকে দেখে বললেন, “মিঃ দত্ত, আপনি হয়তো আমাকে আজ এখানে দেখে একটু অবাক হবেন, তবে কাল যখন বনবিহারীবাবুর থেকে আপনার পরিচয় পেলাম তখন আর না এসে থাকতে পারলাম না।”
সমুদা ওঁর কথা ঠিক না বুঝলেও বলল, “আপনার কি কোনও সমস্যা হয়েছে, মিঃ বর্মণ?”
শুনেই উনি বললেন, “সমস্যা... না, সমস্যা বললে হয়তো সবার কাছে এটা গুরুত্বহীন হয়ে যায়, মিঃ দত্ত। তবে গত একবছর ধরে এই সমস্যা আমাকে মনের দিক থেকে ক্রমশই তলিয়ে দিচ্ছে জীবনের চোরাবালিতে। আসলে এই সমস্যা আমার স্ত্রীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।”
মিঃ বর্মণের কথা শেষ হতেই সমুদা বলে উঠল, “মৃত্যু? ঘটনাটা কি খুলে বলা যাবে, মিঃ বর্মণ?”
উনি বললেন, “হ্যাঁ! নিশ্চয়ই। সেটা জানাতেই তো আজ আমি এসেছি।”
তারপর গোপালকাকার আনা চায়ে কাপে চুমুক দিয়ে উনি পুরো বিষয়টা খুলে বললেন।
“আমার স্ত্রী অনসূয়ার সঙ্গে আমি প্রতিবছরই রথযাত্রার সময় জগন্নাথদেবের পুজো দিতে পুরী যেতাম আর আমরা প্রতিবারই আমাদের গেস্ট হাউসে উঠতাম। গতবছর রথযাত্রার সময় পুরীতে যাওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে রহস্যজনকভাবে অনসূয়ার মৃত্যু হয়। স্নান করতে গিয়ে সে সমুদ্রের ঢেউয়ে তলিয়ে গেছিল বলেই পুলিশের ধারণা এবং অনেক অনুসন্ধান করার পরও তার মৃতদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
কথা বলতে বলতে মিঃ বর্মণের গলার স্বর ভারী হয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের জন্য হলেও চোখ ছলছলে হয়ে গেছিল। উনি নিজের আবেগকে সামলে ফের বললেন, “মিঃ দত্ত, এই ব্যাপারটা সকলে মেনে নিলেও আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে অনসূয়ার মৃত্যু কেবল দুর্ঘটনামাত্র। আমি মনে করি এই মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু কোনও প্রমাণ না থাকায় সেই ঘটনা সমুদ্রের লাখো ঢেউয়ের মধ্যে চাপা পড়ে গেছে। আজ একবছর হয়ে গেল। সেই ঘটনা কিন্তু কিছুতেই আমার মন থেকে মোছেনি। আর তাই আমি চাই এই মৃত্যুর পিছনে যদি অন্য কোনও রহস্য থেকে থাকে, তাহলে তার সমাধান আপনাকেই করতে হবে মিঃ দত্ত। আর আমার মনের মধ্যে থাকা ওই সমস্যার সমাপ্তি ঘটাতে হবে আপনাকে।”
সব শোনার পর সমুদা বলল, “মিঃ বর্মণ, একবছর পুরনো ঘটনার সমাধান করা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু আপনার কথা অনুযায়ী এই মৃত্যুর পিছনে যদি অন্য কোনও রহস্য থেকে থাকে, তাহলে সেই রহস্য নিশ্চয়ই বের হবে। সেই দায়িত্ব আমি নিলাম।”
সমুদার সেই আশ্বাসে উনি বাড়ি ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “আমার সমস্যাটা কিন্তু একটু আলাদা মিঃ দত্ত। লোকে ভাবে আমি স্ত্রীর মৃত্যুর সাধারণ ঘটনাটাকে অহেতুক জটিল করে তুলছি। তবে আমার বিশ্বাস এটা একদিন ভুল প্রমাণ করতে আমি পারব আর আমার হয়ে এই কাজ করবেন একমাত্র আপনি।”
মিঃ বর্মণের কথা শুনে মনে হল উনি সমুদার উপর যথেষ্ট আস্থা রাখেন এবং জানেন এই সমস্যার সমাধান একমাত্র তার পক্ষেই করা সম্ভব।
ওঁর প্রস্থানের পর আমি সমুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এই কেসটার ব্যাপারে কী বুঝলে?”
সমুদা বলল, “কেসটার মধ্যে এক আলাদারকম ব্যাপার আছে রে, বঙ্কু। পুরো কেসটাই এক অজানা ভিতের উপর দাঁড়িয়ে।”
সমুদার কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম এই কেসটা যখন কোনও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, তখন এর সমাধান করতে গেলে অনেক ঘাম ঝরাতে হবে। কারণ, একটু ভুল হলেই আমরা এই তদন্তের চোরাবালিতে ক্রমশ তলিয়ে যাব। কিন্তু নতুন রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির স্বাদ পেতে গেলে আমার মনে হয় এইটুকু ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি, বিশেষ করে যখন সমুদা পাশে আছে। এই মৃত্যু বিষয়ক তদন্তের সংগ্রামকে তাই নাম দেওয়াই যায়, চোরাবালি সংগ্রাম।
সেদিনই সন্ধ্যাবেলা বনবিহারীবাবু আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলেন, সঙ্গে নিয়ে অবশ্য রঞ্জনের তেলেভাজা। দরজা খুলতে না খুলতেই উনি সমুদাকে দেখে বলে উঠলেন, “সমুবাবু, আপনি new কেস got করলেন আর আমাকে inform করলেন না? দেখুন তো, বঙ্কুর থেকে news-টা got করার পর আমি আর নিজের উত্তেজনা control করতে না পেরে running running আপনাদের এখানে coming। আর একসঙ্গে eat করব বলে নিয়ে এলাম this তেলেভাজা of রঞ্জন।”
বনবিহারীবাবুর কথা শেষ হতেই সমুদা বলল, “আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো মিঃ বর্মণের মুখে এই খবরটা আগেই পেয়ে গেছেন। আর তাই আন্দাজ করেছিলাম, আজ নয়তো কাল আপনি নিশ্চয়ই আসবেন।”
সমুদার কথা ফুরোতেই উনি বললেন, “তা কেসটা কী নিয়ে সমুবাবু?”
সমুদার হয়ে আমি ওঁকে পুরো বিষয়টা জানালাম। সব শুনে উনি সমুদার উদ্দেশ্যে বললেন, “ব্যাপারটা খুব interesting। আমার কিন্তু mind say করছে ওটা murder হতে পারে। তা আপনি কি think করছেন, সমুবাবু?”
সমুদা বলল, “শুরুতেই কিছু ধরে নেওয়া উচিত নয়, বনবিহারীবাবু। তবে এই কেসটার ব্যাপারে এগোতে গেলে আপনাকে আগামীকালই আমাদেরকে একবার বারাসাতে মিঃ বর্মণের বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।”
সেকথা শোনামাত্রই বনবিহারীবাবু হাসি মুখে বললেন, “Yes! Yes! নিশ্চয়ই। সে আর বলতে। এখন আপনার team-এ আমিও কিন্তু name write করিয়েছি সমুবাবু, তাই আপনার কেস মানে বঙ্কু এবং আমারও কেস।”
ঘরে ঢুকতে গিয়ে বাবা ওঁর কথা শুনতে পেয়ে বলল, “আগে ছিল দুই, এখন হল তিন। এবার তাহলে তিনমূর্তি লেগে পড়ো নতুন কেস নিয়ে। দেখবে শেষ অবধি জয় তোমাদেরই হবে, মিলিয়ে নিও।”
বাবার আগাম ভবিষ্যৎবাণী শুনে আমাদের মনে এক নতুন উদ্যম এল। সেই রাত পেরোতেই আমরা নতুন উৎসাহে এই কেসের কিনারা করতে লেগে পড়লাম। দেখা যাক আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে এই তদন্তে।


পরদিন সকাল দশটার মধ্যেই বনবিহারীবাবু এসে হাজির আমাদের বাড়ি। তারপর আমরা তিনজনে একটা ট্যাক্সি করে বারাসাতে মিঃ বর্মণের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের দেখে মিঃ বর্মণ খুবই আনন্দিত হলেন। আমাদের নিয়ে গিয়ে ওঁর বসবার ঘরে বসালেন। সোফায় বসতে বসতে সমুদা জিজ্ঞেস করল, “আপনার বাড়িতে আর কে কে থাকেন, মিঃ বর্মণ?”
এর উত্তর দিতে এগিয়ে এল মিঃ বর্মণের অ্যাসিস্ট্যান্ট, রাজকুমার। সে বলল, “স্যার আর স্যারের দাদা ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ থাকেন না, সমরেশবাবু।”
আমাদের পরিচয় জানেন এমন আরেকজন ব্যক্তি যে ওখানে উপস্থিত তা ভেবেই আমরা অবাক হয়ে গেলাম। সমুদা কিছু বলার আগেই মিঃ বর্মণ বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরে নিজেই বললেন, “মিঃ দত্ত, ও হল আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট রাজকুমার। আমার ব্যাবসার দেখাশোনার কাজ করে, তাই আপনাদের ব্যাপারে ও সব জানে। ওকে আমিই বলেছি।”
ওঁর কথা শোনার পর বুঝলাম, ব্যাবসার কাজ ছাড়া আরও অনেক বিষয়েই খবর রাখে এই রাজকুমার। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা এগোতে লাগল। কিন্তু তারই মধ্যে হঠাৎ উপর থেকে জিনিস ভাঙচুরের শব্দ কানে এল। মিঃ বর্মণকে তখন দেখলাম চিৎকার করে উঠলেন এবং রাজকুমারকে কিছু যেন ইশারায় নির্দেশ দিলেন।
ওঁর এই আচরণে আমরা একটু অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করতেই উনি আমাদের বললেন, “আমার দাদা কালীনাথ বর্মণ মানসিক ভারসাম্যহীন। তাই দাদাকে ঘরের মধ্যেই বেঁধে রাখা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হল সেই ভাঙচুরের পরিমাণ অদ্ভুতভাবে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যখন বাড়িতে কেউ নতুন পা রাখেন।”
মিঃ বর্মণ আরও জানালেন, “দাদার এক অদ্ভুত অনুমান ক্ষমতা রয়েছে যার জন্য উনি ঠিক বুঝতে পেরে যান যে বাড়িতে কেউ এসেছে। আজ কোনওভাবে হয়তো দাদাকে বেঁধে রাখা হয়নি, যার ফলে এই ঘটনা ঘটল।”
মিঃ বর্মণের কথা শুনে বনবিহারীবাবু যে বেশ ভয় পেয়েছেন, তা তাঁর মুখ চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আরও কিছুক্ষণ কথা বলে মিঃ বর্মণ এক জরুরি কাজে পড়ে যাওয়ায় বেরিয়ে গেলেন। তবে যাওয়ার আগে উনি রাজকুমারকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন যাতে তদন্তের স্বার্থে সে যেকোনও ব্যাপারে সমুদাকে সহযোগিতা করে।
মিঃ বর্মণের প্রস্থানের পর আমরা বাড়িটা ঘুরে দেখতে চাইলাম। রাজকুমার আমাদের বাড়িটা ঘুরে দেখাল। তবে একটা অবাক করার মতো ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আমরা উপরে যাওয়ার সময় মিঃ বর্মণের দাদা অর্থাৎ কালীনাথবাবুর ঘরের সামনে দিয়ে যেতেই দেখলাম আমাদের দেখতে পেয়ে উনি জানালার কাছে এগিয়ে এসে যেন কিছু বলতে চাইলেন। কথা ঠিক স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছিল না। উনি যা বললেন তা হল, “পারবে না কিছু করতে, পারবে না তাকে ধরতে। গিরগিটি রং পালটাবে, ধ্বংস, সব ধ্বংস হবে। বাঁচবে না কেউ, সব শেষ হবে।”
বনবিহারীবাবু ভয়ে একটু পিছিয়ে এসে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “বঙ্কু, এ কোন place-এ এসে পড়লাম গো? কিছু understand করতে পারছি না। এই house সত্যিই very suspicious, বিশেষ করে এই mad লোকটা।”
আমি বনবিহারীবাবুর কথায় একমত হলেও বললাম, “আপনি একটু শান্ত হন, সমুদাকে বুঝতে দিন ব্যাপারটা।”
তারপর আমরা সবাই গেলাম মিঃ বর্মণের ঘরে। সেই ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ল মিঃ বর্মণ ও তাঁর স্ত্রীর বিশাল এক ছবি দেওয়াল জুড়ে টাঙানো রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে মিঃ বর্মণের নানা জিনিসপত্র যা দেখার জন্য সমুদা কোনও আগ্রহ দেখালেন না। সে শুধু ওই ছবিটাই মন দিয়ে দেখছিল।
সমুদা ছবিটা দেখতে দেখতে রাজকুমারকে জিজ্ঞেস করল, “ছবিটা কার আঁকা?”
উত্তরে রাজকুমার বলল, “আজ্ঞে, এই ছবিটা স্যারের বন্ধু হালদারবাবুর হাতের আঁকা।”
উত্তর শুনে সমুদা এই হালদারবাবুর বিষয় জানতে চাইল। রাজকুমার জানাল, “হালদারবাবু মানে সুনির্মল হালদার হলেন স্যারের তেলের ব্যাবসার আরেক অংশীদার। চার বছর আগে লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় স্যারের ব্যাবসাটা যখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ উনি উদয় হন এবং স্যারকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। হালদারবাবু সেই ব্যাবসার কিছু অংশ কিনে নেন এবং তারপর ধীরে ধীরে এই তেলের ব্যাবসা বৃদ্ধি পেল, আর সেই থেকেই ওঁদের মধ্যে এই বন্ধুত্ব, যা আজও অটুট।”
সমুদা সব শোনার পর রাজকুমারকে প্রশ্ন করল, “মিঃ বর্মণের বাড়িতে কি সুনির্মলবাবু প্রায়ই আসেন?”
উত্তরে রাজকুমার বলল, “উনি আগে কম আসতেন, তবে স্যারের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এখন প্রায়ই আসেন।”
সেই উত্তর শুনে সমুদা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বনবিহারীবাবু তাকে প্রশ্ন করে বসলেন, “আচ্ছা! তুমি কি tell করতে পারবে why কালীনাথবাবুর এই অবস্থা?”
রাজকুমার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল, “স্যারের দাদা আগে ভালোই ছিলেন। কিন্তু ওই ঘটনার পর কিছুদিনের মধ্যেই উনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ফলে ওঁকে এখন ঘরবন্দি করেই রাখা হয়। নজর রাখতে শুধু ঘরের জানলাটুকুই খোলা রাখা থাকে।”
সব শুনে বুঝলাম, এই কেসের মধ্যে আরও অনেক রহস্যই লুকিয়ে রয়েছে যা উপর থেকে দেখলে একদমই সাধারণ মনে হবে। সুমদাকে তাই এই কেসের জন্য অনেক খাটতে হবে। তবে বিশ্বাস আছে তার উপর। হ্যাঁ, পারলে সে-ই পারবে এই তদন্তের সমাপ্তি ঘটাতে।
আমরা রাজকুমারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
তবে রাস্তায় আসতে আসতে মনের মধ্যে যে সকল প্রশ্ন ডানা মেলেছিল তা সবই করলাম সমুদাকে এবং তার থেকে যা উত্তর পেলাম তা হল, “কেসটা বুঝতে আরেকটু সময় লাগবে রে বঙ্কু। তবে তার আগে কিছু জিনিসের ব্যাখ্যা খুঁজে বার করতে হবে। আমার যে বিষয়টা সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল তা হল ওঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর কালীনাথবাবুর অদ্ভুতভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়াটা। এই দুই ঘটনার কি আদৌ কোনও যোগ আছে? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন রে, বঙ্কু। তাই এখন এই কেস নিয়ে এগোতে গেলে সবার আগে এই পরিবারের বিষয় মিঃ বর্মণের থেকে আরও কিছু খবর জানতে হবে।”
বনবিহারীবাবুও দেখলাম সমুদার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেন। সেদিন বনবিহারীবাবু আমাদের বাড়িতেই রাতের খাওয়া সারলেন। আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে গেলেন বাড়ি।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে রোজকারমতো আমি সমুদার ঘরে গেলাম কিছুটা সময় কাটাতে। সেদিন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, “সমুদা, জানালাটা কি বন্ধ করে দেব?”
“জানালা বন্ধ করলে কি আর বৃষ্টিকে থামানো যাবে রে বঙ্কু? বৃষ্টির জলের আসা বন্ধ করতে পারবি কিন্তু তার শব্দকে নয়।”
কথার কোনও মানে না বুঝে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইলে সমুদা?”
এবার সমুদা আমার কাছে এসে বলল, “মেঘ বিনা যেমন বৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনই এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাকি ঘটনাগুলো খুঁজে বের না করা অবধি এই কেসের সমাধান করা অসম্ভব।”
প্রশ্ন করলাম, “আবার কোন ঘটনার কথা বলছ সমুদা?”
সমুদা হেসে বলল, “সেটা জানলে কি আর এখানে চুপ করে বসে থাকি রে? আমার মন বলছে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সূত্র আমাদের কাছে এসেও ভাগ্যের ফেরে হারিয়ে গেছে বা আমরা এড়িয়ে গেছি তাকে।”
সমুদার সঙ্গে কথা বলে মনে হল সে কিছু হয়তো আন্দাজ করতে পারছে, তবে এখনও তার মনে সন্দেহ রয়েছে কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে যা আমাকে সে স্পষ্ট করে বলল না। রাত গভীর হতে লাগল। আমি গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে দেখি আকাশের মুখ তখনও ভার হয়ে আছে। আমরা বিকালে আবার রওনা দিলাম বারাসাতের উদ্দেশ্যে।
বনবিহারীবাবু আমাদের জন্য বারাসাতের চাঁপাডালি মোড়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমরা সেখানে পৌঁছানোর পর একসঙ্গেই গিয়ে হাজির হলাম মিঃ বর্মণের বাড়ি।
মিঃ বর্মণ সমুদাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু এগোতে পারলেন, মিঃ দত্ত?”
সমুদা কিছু বলার আগেই তার নজর গেল সেখানে উপস্থিত আরেকজন ব্যক্তির দিকে। সেই ব্যক্তিকে দেখে মনে হল উনি আগেই আমাদের পরিচয় মিঃ বর্মণের থেকে পেয়ে গেছেন সুতরাং আমাদের ব্যাপারে জানার ওঁর যেন কোনও আগ্রহ ছিল না। তবে আমাদের আরেকটা বিষয়ও চোখে পড়ল যেটা হল, ওঁর তোয়াক্কা না করার মনোভাব।
ফিরে আসা যাক সমুদার কথায়। মিঃ বর্মণকে উত্তরে সে বলল, “আমাকে আরেকটু সময় দিতে হবে মিঃ বর্মণ। এই বিষয় আপনাকে একটু ধৈর্য রাখতেই হবে।”
সমুদার কথা শেষ হতেই সেখানে উপস্থিত ওই ব্যক্তি বলে উঠলেন, “এইসব ব্যাপারে যদি ধৈর্য রাখতেই হয়, তাহলে আপনাকে কীসের জন্য ডাকা হয়েছে মিঃ দত্ত? আপনি নাকি একজন গোয়েন্দা। তাহলে এসব ছোটো ব্যাপার মেটাতে এত সময় লাগাছেন কেন?”
সমুদা উত্তরে ওঁকে কিছু বলার আগেই মিঃ বর্মণ বলে উঠলেন, “ওর কথায় কিছু মনে করবেন না মিঃ দত্ত। ও আমার বন্ধু সুনির্মল, এরকম কথা বলা ওর স্বভাব। তাই ওর হয়ে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।”
সমুদা মাথা নেড়ে বলল, “না মিঃ বর্মণ, আমি কিছু মনে করিনি। এই পেশায় এরকম কথা প্রায়ই শুনতে হয়। তাই ওটা নিয়ে আপনি কিছু চিন্তা করবেন না।” এবার সুনির্মলবাবুর দিকে তাকিয়ে সমুদা বলল, “মিঃ হালদার, একজন গোয়েন্দার কাছে সব কেসের গুরুত্বই সমান। তার আছে কোনও কেসই ছোটো নয়। আর সেটা না বুঝলে নিজের পেশাকেই যে অসম্মান করা হয়।”
সমুদার কাছে যোগ্য জবাব পেয়ে সুনির্মলবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বলে উঠলেন, “দেখুন মিঃ দত্ত, আমি একজন স্পষ্ট বক্তা। তাই সঠিক কথা লোকের সামনেই বলতে পছন্দ করি। সুতরাং একটা কথা বলি আপনাকে, এসব সস্তার প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের থেকে আমি বেশি আস্থা রাখি সরকারী ইনভেস্টিগেটরদের উপর। আগেই আমি গোবিন্দলালকে বলেছিলাম আমার চেনা এক সরকারী ইনভেস্টিগেটরকে এই কেসের তদন্তের ভার দিতে, যদিও আমার মনে হয় এই কেসটার মধ্যে তেমন কিছু নেই কারণ আগেই প্রমাণ হয়ে গেছে যে ওর স্ত্রীর মৃত্যু একটা দুর্ঘটনামাত্র।”
সমুদা ওঁর কথা শুনে বলল, “আপনার পরামর্শ যখন উনি গ্রহণ করেননি তখন আর কী করবেন বলুন। তবে মিঃ হালদার, আপনাকে একটু আমাকে সাহায্য করতে হবে।”
“হ্যাঁ, তা করতেই পারি, তবে প্লিজ ভুলভাল প্রশ্ন আমাকে করবেন না আশা করি।”
এই সুনির্মল হালদারের সঙ্গে যত কথা এগোতে লাগল ততই যেন আমার ওঁকে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। ওঁর কথা বলার ধরন এবং স্বভাব দুটোই ছিল খুব অদ্ভুত। উনি হয়তো দু’বারও চিন্তা করেন না অন্যকে অপমানসূচক কথা বলতে। এরকম মানুষ সমাজে প্রায়ই দেখতে পাই আমরা। তবে কিছু করারও থাকে না কারণ সবাই তো আর সমান হয় না। সুতরাং আমাদের মানিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
সেদিন বাড়ি ফিরে আমার মন খুব খারাপ ছিল। রাতে সমুদাকে প্রশ্ন করলাম, “সমুদা, তোমার কি এই অপমান প্রাপ্য ছিল? এত কেস সফলভাবে সমাধান করার পরও এরকম অপমান হতে হবে তোমায়?”
সমুদা বলল, “দেখ বঙ্কু, তুই যতই ভালো কাজ করিস না কেন কিছু মানুষ তবুও থাকবে যারা তোর কাজকে অসম্মান করবে। তাদের কাছে হয়তো সেটাই জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু এটা জেনে রাখ, এইসব কটু কথায় সমরেশ দত্তকে থামানো যাবে না। এরা যত অপমানসূচক কথা বলবে, ততই আমার মনে জেদ বাড়বে আর নিজের লক্ষ্যে আমি ততটাই স্থির থাকতে পারব।”
সমুদার কথা শুনে বুঝলাম তার চিন্তাধারা বাকিদের থেকে সত্যি অনেক উঁচু স্তরের, ফলে সুনির্মল হালদারদের মতো কিছু মানুষের কাছে তাকে অপমান করার কাজটা অতটা সহজ নয়।
আবার ফেরা যাক সেদিনের কথায়। সুনির্মলবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমরা যা বুঝলাম তা হল, উনি চার বছর আগে বিদেশ থেকে ফিরেছেন এখানে পাকাপাকি ভাবে থাকতে এবং সেই সময় মিঃ বর্মণের ব্যাপারে জানতে পেরে উনি এগিয়ে আসেন ওঁকে সাহায্য করতে। আর সেই থেকেই ওঁরা হয়ে ওঠেন বন্ধু।
কিন্তু এখানেই সমুদার একটা খটকা লাগল। কারণ, কোনও স্বার্থ ছাড়া এই যুগে কেউই নিজে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় না। তাও আবার তিনি যদি হয় সুনির্মল হালদারের মতো মানুষ, যাকে দেখে কখনওই মনে হয় না যে উনি অন্য কারোর জন্য খুব একটা চিন্তিত বা উনি একজন পরোপকারী ব্যক্তি। ওঁর নিশ্চয়ই কোন স্বার্থ আছে। আর তাই উনি এগিয়ে এসেছিলেন মিঃ বর্মণকে সাহায্য করতে। সুতরাং সমুদা স্থির করল সেই স্বার্থ কী হতে পারে সেটাই এখন খোঁজার চেষ্টা করব সে।
সমুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, তুমি কি সুনির্মলবাবুকে সন্দেহ করছ?”
উত্তরটা সমুদা একটু হেসেই দিল, “তোর মাথায় এই একই প্রশ্ন প্রত্যেকবার কেন আসে রে বঙ্কু? মিঃ হালদারকে সন্দেহ করছি না বললে ভুল হবে, তবে এত তাড়াতাড়ি কিছুই বলতে পারব না। শুধু জেনে রাখ, একটা পথ যখন পাওয়া গেছে তখন এই রহস্যের সমাধান করতে গেলে ওই পথ ধরেই আমাদের এগোতে হবে।”
সমুদার কথা শুনে ওই মুহূর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, যত সময় এগোবে ততই যেন এই তদন্তে আসবে নানা মোড়। ফলে নিজেদের সেসব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই হবে আমার এবং বনবিহারীবাবুর প্রধান লক্ষ্য।


ওই রাতের পর কেটে গেল আরও দুটো রাত। কিন্তু সমুদাকে দেখলাম আমার সঙ্গে এই কেস নিয়ে কোনও আলোচনাই সে করছে না। তাকে দেখতাম রোজ সকাল হলেই কোথায় যেন বেরিয়ে যেত আর বিকেলের মধ্যে ফিরেও আসত। তার এই রোজ যাওয়া আসা আমার কাছে তখন এক নতুন রহস্যে পরিণত হয়েছিল।
আমার মতো আরেকজন অর্থাৎ বনবিহারীবাবুও সমুদার এই আচরণের কারণ জানতে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং ধৈর্য রাখতে না পেরে উনি সেদিন সরাসরি আমাদের বাড়ি এসে হাজির হলেন। বনবিহারীবাবু বাড়িতে ঢোকামাত্রই সমুদাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী matter সমুবাবু? আপনি তো ওই কেসটা নিয়ে আমাকে আর কোন news-ই give করলেন না। এই two days আপনি কি কোনও work-এ busy ছিলেন?”
সমুদা ওঁর প্রশ্নের জবাবে বলল, “বনবিহারীবাবু, আসলে আমি এই দু’দিন কেসটাকে ভালো করে বোঝার জন্য সময় নিয়েছিলাম। মিঃ বর্মণ এবং ওঁর পরিবারের বিষয়ে আমি ভালো করে খোঁজ নিয়ে যা বুঝলাম তা কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ।”
সমুদার মুখে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটা শোনামাত্র আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, “কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সমুদা?”
সমুদা বিষয়টা খুলে বলল। “মিঃ বর্মণের এই ব্যাবসা আসলে ওঁর বাবা শুরু করে গেছিলেন। তারপর বাবার মৃত্যুর পর ওঁরা দুই ভাই দেখাশোনার ভার নেন। পর্যটনের ব্যাবসাটা কালীনাথবাবুই দেখতেন আর মিঃ বর্মণের ভাগে ছিল তেলের ব্যাবসাটা। কিন্তু এখন পুরোটাই দেখাশোনা করেন মিঃ বর্মণ ও ওঁর সেই পার্টনার বন্ধু অর্থাৎ মিঃ হালদার। এই বর্মণদের ব্যাবসা প্রথমে শুরু হয় বর্মণ পর্যটন লিমিটেড নামক পর্যটনের ব্যাবসা দিয়ে, যা পরে সফল হওয়ায় বর্মণ ইন্ডাস্ট্রি নামক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হয়। কিন্তু বড়ো ঘটনা হল, এই ব্যাবসা আসলে মিঃ বর্মণের বাবা একা শুরু করেননি, ওঁর সঙ্গে ছিলেন আরেকজন ব্যক্তি যার বিষয়ে কোনও খবরই কারোর জানা নেই।”
সমুদার কথা শুনে আমার গা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। তারপর সে নিজের সন্দেহের কথা আমাদের জানাল। “আমার এখানেই যত প্রশ্ন জাগছে। কারণ সেই ব্যক্তি যদি থেকে থাকেন তাহলে উনি গেলেনই বা কোথায়, আর কেনই বা মিঃ বর্মণ আমাদের কিছু জানালেন না সেই ব্যাপারে?”
বনবিহারীবাবু সমুদার কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। সব শোনার পর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি মশাই এতসব matter কীভাবে know করলেন?”
উত্তরে সমুদা বলল, “আমি মিঃ বর্মণের কারখানায় ছদ্মবেশে গিয়ে সেখানে উপস্থিত ওঁর কিছু কাছের বয়স্ক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানতে পারি।”
আমি মুহূর্তে প্রশ্ন করলাম, “তাহলে সমুদা, এখন কী করবে? আমরা কি আগামীকালই আবার মিঃ বর্মণের সঙ্গে দেখা করতে ওঁর বাড়ি যাব?”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই বেজে উঠল টেলিফোনটা। আমি দৌড়ে গিয়ে ফোনটা তুলে চমকে উঠলাম অপরদিকের কণ্ঠস্বর শুনে। উনি আর কেউ নন স্বয়ং মিঃ বর্মণ। আমি বুঝতেই পেরেছিলাম সমুদার সঙ্গে এই দু’দিন কোনও দেখাসাক্ষাৎ না হওয়ায় উনি তদন্তের কাজ কতদূর এগোল তা জানতেই ফোন করেছিলেন।
সমুদাকে আমি ডেকে দিলাম এবং বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর সমুদা যখন ফোন রেখে আমাদের কাছে এগিয়ে এল তখন বনবিহারীবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “মিঃ বর্মণ আপনাকে কী say করছিলেন এতক্ষণ ধরে? আপনি কি say করে দিলেন নাকি ওই factory-তে ছদ্মবেশে যাওয়ার secret-টা?”
সমুদা হেসে বলল, “আরে না না। আপনি ভাবলেন কী করে যে সেকথা আমি ওঁকে জানাব? উনি তো তদন্তের কাজ কতদূর এগোল তা জানতেই ফোন করেছিলেন এবং আবারও ক্ষমা চাইলেন ওঁর বন্ধুর ব্যবহারের জন্য।”
বন্ধু নামটা শুনে আবারও বনবিহারীবাবু বলে উঠলেন, “ওই man-টাকে কিন্তু আমার খুব complicated মনে হল সমুবাবু। তাই আপনাকে telling, ওঁকে কিন্তু আপনার একটু observe করা উচিত।”
“আমাকে সবার উপরই নজর রাখতে হয়, বনবিহারীবাবু। নজর না রাখলে সময়ের মায়াজালটা ঠিক ভেদ করব কীভাবে? তবে এটা আপনাদের দু’জনকেই জানিয়ে রাখি, আমাদের আগামীকাল আবার যেতে হবে মিঃ বর্মণের বাড়ি। ওঁর থেকে আমার অনেক বিষয়ই জানার আছে। আর একবার যদি সেইগুলো আমার অনুমানের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে এবার হয়তো আমাদের এই কেসের স্বার্থে রাজ্যের বাইরেও যেতে হতে পারে।”
সমুদার কথা শুনে আমরা দু’জনেই কিছু বুঝতে পারলাম না। ফলে আমি ও বনবিহারীবাবু আগামীকাল মিঃ বর্মণের বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।


পরদিন খুব আগ্রহ সহ ভোরবেলাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। ঘড়িতে দশটা বাজতেই দেখলাম বনবিহারীবাবু আমাদের বাড়ি এসে হাজির হলেন। আমরা তিনজনে তারপর বেরিয়ে পড়লাম বারাসাতের উদ্দেশ্যে।
মিঃ বর্মণের বাড়ি ঢুকতেই দেখি আবারও সুনির্মলবাবু সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। আমাদের দেখে উনি সমুদার উদ্দেশ্যে বললেন, “কী ব্যাপার মিঃ দত্ত? এই ক’দিন কোথায় ছিলেন? কেসটার আর সমাধান বুঝি করতে পারছেন না, তাই আজ বলতে এসেছেন?”
সমুদা উত্তরে ওঁকে কিছু বলার আগেই মিঃ বর্মণ বলে উঠলেন, “সুনির্মল, থাক। আজ আর প্লিজ এসব কথা তুলো না। মিঃ দত্ত তদন্তের স্বার্থেই আজ এখানে এসেছেন।”
ওঁর কথা শুনে সুনির্মলবাবু দেখলাম চুপ করে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এক কাজের অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওঁর যাওয়ামাত্রই মিঃ বর্মণ আমাদের সকলকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন এবং সেখানেই যা বলার সমুদা ওঁকে বলল।
সমুদা মিঃ বর্মণের থেকে ওঁর পরিবার ও ব্যাবসার সম্বন্ধে জানতে চাইল। উনি যা যা জানালেন তা সবই সমুদা আমাদের আগেরদিন বলেছিল। যেটা বাড়তি জানতে পারলাম তা হল ওঁদের ব্যাবসার সূত্রপাত যে পর্যটনের ব্যাবসা দিয়ে, তার প্রধান কেন্দ্র ছিল শ্রীক্ষেত্র অর্থাৎ পুরী। পুরীতে ওঁদের গেস্ট হাউসটি আগে ব্যাবসার স্বার্থেই ব্যবহার করা হত। কিন্তু কিছু বছর আগে আরেকটি হোটেল কেনার পর ওই গেস্ট হাউস হয়ে দাঁড়ায় ওঁদের বহির্বাটী। পুরীতে ঘুরতে গেলে ওঁরা ওই গেস্ট হাউসেই ওঠেন।
সব শোনার পর সমুদা বলল, “এই কেস এখানে বসে সমাধান করা আর সম্ভব নয়, মিঃ বর্মণ। আপনি তাই আমাদের তিনজনের পুরীতে ওই গেস্ট হাউসে থাকার সব ব্যবস্থা করে ফেলুন। আমি ওই গেস্ট হাউসে থেকেই এই কেসের সমাধান করতে চাই।”
মিঃ বর্মণ বললেন, “আপনি রাজি থাকলে আমি আগামীকালের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে ফেলছি, তবে এই সফরে আমিও যাব আপনার সঙ্গে।”
“আপনি তো যাবেনই, মিঃ বর্মণ। আপনার সাহায্য আমার সেখানে খুবই প্রয়োজন হবে।”
সমুদা ও মিঃ বর্মণের কথাবার্তা শুনে আমি আর বনবিহারীবাবু দু’জনেই বেশ আনন্দিত হলাম। মনে মনে আমি কল্পনা করতে শুরু করলাম আবার এক নতুন পরিবেশ, আবার এক নতুন রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি, সে সঙ্গে অবশ্যই আছে ভগবান জগন্নাথদেবের দর্শন।
সব কথাবার্তা শেষ করে আমরা যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি, তখনই কানে এল মিঃ বর্মণের দাদা কালীনাথবাবুর কথা। উনি সেই জানালার কাছে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলছিলেন আবারও সেই একই কথা, “পারবে না কিছু করতে, পারবে না তাকে ধরতে। গিরগিটি রং পালটাবে, ধ্বংস, সব ধ্বংস হবে। বাঁচবে না কেউ, সব শেষ হবে।”
ওঁর কথা শুনে আমাদের ভারি অদ্ভুত লাগল। সেই জানালার সামনে গিয়ে সমুদা ওঁকে বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন, কালীনাথবাবু?”
উত্তরে কালীনাথবাবু প্রথমে কিছু না বললেও খানিক পরেই কেঁদে ফেলে বললেন, “তুমি কি পারবে? পারবে গিরগিটিকে দমন করতে? নাকি সেখানে ধ্বংস হয়ে যাবে? ফুল ফুটবে না আর, গান গাইবে না পাখি আর। গ্রহণ গ্রাস করবে, পদ্মাবতী মূর্ছা যাবে। থাকবে শুধু চারদিকে হাহাকার।”
কালীনাথবাবু আমাদের কাছে এক হেঁয়ালি হয়েই রয়ে গেলেন। মানসিক অবস্থার জন্য ওঁর কথা কেউই গুরুত্ব দেয় না। আমরা অনেক চেষ্টা করেও ওঁর একটি কথার অর্থও বুঝতে পারলাম না।
সেদিন মিঃ বর্মণের বাড়ি থেকে ফিরে সমুদাকে খুবই চিন্তিত দেখলাম।
রাতে খাওয়ার পর সমুদাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, “বঙ্কু, মনে হয় কালীনাথবাবু অনেক কিছুই বলতে চাইছেন কিন্তু আমরা ওঁর কথা বুঝতে পারছি না বলেই হয়তো আমাদের কাছে কথাগুলো মনে হচ্ছে পাগলের প্রলাপ। হতে পারে উনি এই রহস্যের এমন অনেক কিছুই জানেন যা মিঃ বর্মণেরও অজ্ঞাত।”
সমুদার কথা শুনে আমার মনে পড়ে গেল সেদিন ফেরার পথে বনবিহারীবাবুর সেই কথাগুলো। উনি বলেছিলেন, “মিঃ দত্ত মনে হয় mad লোকটার কথার meaning বোঝার try করছেন। এই কালীনাথ বর্মণকে কিন্তু একটু study করতে হবে, বঙ্কু।”
আমি সমুদাকে ওঁর কথা বলতেই সমুদা বলল, “ঠিকই বলেছেন বনবিহারীবাবু। কারণ, আর পাঁচটা মানসিক রোগীর সঙ্গে কালীনাথবাবুকে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। উনি বুঝতে পারেন আমরা ওঁদের বাড়িতে রহস্যের সমাধান করতেই আসাযাওয়া করছি। সুতরাং উনি এমন কিছু বলতে চান বলেই হয়তো আমাদের দেখে বারবার ছুটে আসেন ওই জানালার দিকে।”
সমুদার কথা শুনে বুঝতে পারলাম কালীনাথবাবু হয়তো এই ঘটনা সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানেন। কিন্তু সময়ের অভাবে আমাদের সেই হেঁয়ালি মাথায় নিয়েই এগিয়ে চলতে হবে আগামীদিনের গন্তব্যস্থল, পুরীর উদ্দেশ্যে।


পরেরদিন সন্ধ্যাবেলায় আমরা হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। বনবিহারীবাবু সর্বদাই সময়ের আগে পৌঁছাতে ভালোবাসেন, ফলে আমাদের পৌঁছানোর অনেক আগেই উনি স্টেশনে এসে উপস্থিত। বনবিহারীবাবুর সেই গোঁফ আবারও আমাদের ওঁর ছদ্মবেশের কথা মনে করিয়ে দিল। উনি এখন বিখ্যাত আলোকচিত্রকর নন, উনি শুধুই বনবিহারী গুপ্তপতি।
কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেশনে এসে হাজির হলেন মিঃ বর্মণ ও ওঁর বন্ধু অর্থাৎ সুনির্মলবাবু। আমরা প্রথমে সুনির্মলবাবুকে দেখে একটু হকচকিয়ে গেছিলাম। কারণ, ওঁর আসার কথা আগে ঠিক ছিল না। কিন্তু পরে ট্রেনে ওঠার পর মিঃ বর্মণ জানালেন যে উনি নিজেই সুনির্মলবাবুকে নিয়ে যেতে আগ্রহী হন কারণ, ওঁর পুরীর জগন্নাথদেবের দর্শন করার নাকি বহুদিনের ইচ্ছা। আর এরই মাঝে জগন্নাথ এক্সপ্রেস ছুটতে শুরু করল আপন গতিতে আর আমরাও এগিয়ে চললাম শ্রীক্ষেত্রের দিকে।
ট্রেনে আমরা গল্প করেই কাটালাম। কিন্তু সমুদাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন গল্পের চেয়ে রহস্য নিয়েই বেশি ভাবছিল। পুরীর জগন্নাথদেবের কথা আগে অনেকবারই শুনেছি,কিন্তু সেবার মিঃ বর্মণের থেকে ওঁর নানা লীলাখেলার সম্বন্ধে আরও বেশি করে জানতে পারলাম। গল্প শুনতে শুনতে রাতের খাওয়াও সেরে নিলাম ট্রেনে। ভোর ঠিক পৌনে পাঁচটায় আমরা পুরী স্টেশন এসে পৌঁছালাম।
স্টেশনটা খুবই সাজানো এবং ট্রেন থেকে নিচে পা দেওয়ার মুহূর্তে মনে জাগল এক আলাদা অনুভূতি। এটাই হয়তো পবিত্র স্থানের মহিমা। আমরা স্টেশন থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে গিয়ে হাজির হলাম মিঃ বর্মণদের সেই গেস্ট হাউসে। মালপত্র নামিয়ে ঢোকার মুহূর্তে এক মহিলার সঙ্গে আমাদের দেখা হল। তার সম্বন্ধে মিঃ বর্মণ বললেন, “ও হল সন্ধ্যা, এই গেস্ট হাউসে কাজ করে। একবছর আগে আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর দাদার কথাতেই ওকে গেস্ট হাউসের দেখাশোনার কাজে রেখে দিই। কিন্তু হঠাৎ দাদা মানসিক ভারসাম্য হারানোয় আমাদের কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতায় ফিরে যেতে হয়েছিল। ফলে ওর বিষয় এতটুকুই জানা সম্ভব হয়েছিল আমার। পরে জানতে পারি যে ওর মা-বাপ কেউ নেই। একদম একা বলেই আমার দাদা ওকে এই কাজে বহাল করেছিল। এখন ওর সঙ্গে রাজকুমার যোগাযোগ রাখে।”
সব শোনার পর বনবিহারীবাবু সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বললেন, “তুম এখানে এত big বাড়িতে কীভাবে একা থাকতে হো?”
সন্ধ্যাকে দেখলাম এক বিশাল ঘোমটা দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর ছুটে গেস্ট হাউসে ঢুকে গেল। তার এই চুপ করে থাকা ও পরে ছুটে চলে যাওয়া দেখে আমরা অবাক হলাম। কিন্তু মিঃ বর্মণকে দেখলাম, উনি সেরকম অবাক হলেন না।
এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন, “সন্ধ্যা আসলে কথা বলতে পারে না। ও জন্ম থেকেই বোবা। তাই কোনও উত্তর না দিতে পারায় সে লজ্জায় ছুটে চলে গেল।”
একথা শোনার পর মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। বনবিহারীবাবু নিজেও খুব দুঃখ পেলেন। কারণ, উনিই সন্ধ্যাকে সেই প্রশ্ন করেছিলেন। আমরা তারপর যে যার ঘরে চলে গেলাম বিশ্রাম নিতে।
সমুদার কথামতো আমাদের তিনজনের থাকার ব্যবস্থা একই ঘরে করা হয়েছিল। ফলে সমুদার সঙ্গে আমি আর বনবিহারীবাবু দুতলার এক ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। সেই ঘরে ছিল একটা ছোটো আর একটা বড়ো খাট। বনবিহারীবাবু একাই শোবেন বললেন। তাই ওঁকে সেই ছোটো খাটটাই দেওয়া হল। আর আমি ও সমুদা বড়োটাই নিলাম।
ব্যাগ রাখার পর দেখলাম বনবিহারীবাবু সেই ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে তখনও চিন্তা করে চলেছেন। আমরা ওঁকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে ওই ভুল আমাদেরও হতে পারত। সুতরাং সেই নিয়ে মন খারাপ না করে আমাদের এখানে আসার আসল লক্ষ্য কী সেটাই সর্বদা চিন্তা করতে হবে।
আমরা কিছুটা সময় বিছানায় একটু জিরিয়ে নিয়ে সকাল আটটা নাগাদ নিচে নেমে এলাম। আমাদের দেখে সুনির্মলবাবু তাঁর স্বভাবমতো আবারও টিপ্পনি কাটতে ভুললেন না। বললেন, “কী, মিঃ দত্ত! আপনারা এখানে কি ছুটি কাটাতে এসেছেন, নাকি কোনও কাজে? ভালোই ঘুম দিলেন দেখছি।”
ওঁর কথা শুনে আমি খুব রেগে গেছিলাম। কিন্তু সমুদাকে ওঁর প্রশ্নের উত্তর না দিতে দেখে আমিও নিজেকে সংযত করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে এসে হাজির হলেন মিঃ বর্মণ। উনি অত সকালে গেছিলেন স্বর্গদ্বারে প্রাতঃভ্রমণ সারতে। আমাদের কাছে এসে বসতেই সমুদা বলল, “মিঃ বর্মণ, আমাদের কিন্তু এগারোটা নাগাদ একবার বেরোতে হবে।”
বেরোনোর কথাটা শুনে সুনির্মলবাবু ভুরুদুটো যতটা উপরে তোলা সম্ভব তুলে বললেন, “এগারোটার সময় আপনার কোথায় বেরোনোর প্ল্যান আছে, মিঃ দত্ত?”
সমুদা উত্তর দিল, “সেটা একান্তই আমার তদন্তের স্বার্থে মিঃ হালদার, তাই জানতে চেয়ে আমাকে আর লজ্জায় ফেলবেন না।”
মিঃ বর্মণের দিকে সুনির্মলবাবু তাকাতেই দেখলাম মিঃ বর্মণ বললেন, “ক্ষমা করো আমায় সুনির্মল, এই বিষয়টা আমার একান্তই ব্যক্তিগত। তাই এখনই তোমাকে সব জানাতে পারছি না। তবে ফিরে এসে সব জানাব।”
মিঃ বর্মণের উত্তর পাওয়ার পর উনি চুপ হয়ে গেলেন। সেই দেখে বনবিহারীবাবু আমাকে ফিসফিস করে বললেন, “ঠিক হয়েছে। এবার wicked লোকটা উচিত শিক্ষা পেয়েছে। থোঁতা mouth একেবারে blunt হয়েছে।”
আমি তখন নিজের হাসি অনেক কষ্টে চেপে রাখলাম। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সমুদার কথামতো ওই জায়গার উদ্দেশ্যে।
রাস্তায় সমুদার থেকে জানতে পারলাম যে আমরা তখন সেখানকার স্থানীয় থানায় যাচ্ছি, মিঃ বর্মণের স্ত্রীর মৃত্যুর কেসের ফাইলটা পুনরায় খোলার আবেদন করতে এবং সম্ভব হলে সেই ফাইল ঘেঁটে কিছু তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে।
আমার মনে তখন প্রশ্ন জাগল, কীভাবে একবছর আগের ঘটনার কথা মনে থাকবে সেই ইন্সপেক্টরের? আর মনে থাকলেও সেই ফাইলে কি আদৌ এমন কোনও বিষয় উল্লেখ থাকবে যা সমুদাকে এই কেসের তদন্তে সাহায্য করবে? এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়েই আমরা থানায় এসে পৌঁছালাম।
থানায় ঢুকেই আমরা সরাসরি গিয়ে কথা বললাম সেখানকার ইন্সপেক্টর হীরালালবাবুর সঙ্গে। সমুদা তাকে মিঃ বর্মণের স্ত্রীর মৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, “মিঃ দত্ত, আমি কুছ দিন আগেই এখানে পোস্টিং পেয়েছি, তাই এক সাল আগের ঘটনা সম্বন্ধে কুছ বলতে পারব না। ওই কেসের ফাইল যদি এখনও এখানে থেকে থাকে, তাহলে আমি কেসটা ফিরসে নিশ্চয়ই খুলব।”
মিঃ বর্মণ বললেন, “প্লিজ হীরালালজি, আপনি তাড়াতাড়ি কিছু করুন। নাহলে এই রহস্য রহস্যই থেকে যাবে চিরকাল।”
ইন্সপেক্টর তারপর এক কনস্টেবলকে সেই একবছর আগের পুরনো ফাইল খুঁজে বার করতে নির্দেশ দিলেন। তাঁর আজ্ঞামতোই ওই কনস্টেবল সেখানে রাখা দুটো আলমারি বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর অবশেষে ওই ফাইলটা খুঁজে পেলেন।
ফাইল ঘেঁটে অনেকক্ষণ পড়ার পর ইন্সপেক্টর বললেন, “মিঃ দত্ত, ফাইলে সাফ লেখা আছে ওঁর পত্নীর মৌত সিরফ দুর্ঘটনা ছিল। কোনও রহস্যর মালুম আমি পাচ্ছি না। কিন্তু আপ ডিটেকটিভ আছেন, তাই আপকে লিয়ে আমি কুছ তো হেল্প করতেই পারি। আপকে খাতির আমি এই কেস আবার খুলব। দেখি আপ অউর ম্যায় মিঃ বর্মণকে লিয়ে কী করতে পারি।”
সমুদা ও মিঃ বর্মণ তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না এবং দ্রুত সাক্ষাতের আশা নিয়ে আমরা ফিরে এলাম গেস্ট হাউস।
গেস্ট হাউসে ফিরে আমরা দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। তবে খাওয়ার টেবিলে দেখলাম সুনির্মলবাবুর মুখটা বেশ গম্ভীর। থানায় যাওয়ার ব্যাপারটা মিঃ বর্মণ ওঁকে তখন জানাতে গেলে সুনির্মলবাবুকে দেখলাম ওই বিষয়টা উনি না শোনারই মনোভাব দেখালেন। আমরা মুখে না বললেও বুঝতে পেরেছিলাম, সকালের সেই ঘটনার জন্যই হয়তো ওঁর এই আচরণ।


বিকালে সমুদা, আমি আর বনবিহারীবাবু সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গেলাম। বেশ মনোরম পরিবেশ। যতদূর অবধি দৃষ্টি যাচ্ছিল ততদূরই ছিল জল আর শুধুই জল। ওই দৃশ্য দেখে একবার মনে হচ্ছে আকাশ যেন জলকে স্পর্শ করছে, আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে জল যেন আকাশকেই ছুঁয়ে ফেলছে ওই দিগন্তের পারে। এর মধ্যে যাদের কথা না বললে ভুল হবে তা হল শত শত ঢেউয়ের কথা। তাদের গর্জনই তাদের ক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছিল।
আমরা সেখানে অনেকক্ষণ কাটানোর পর ফিরে আসার মুহূর্তে ইন্সপেক্টর হীরালালের সঙ্গে আমাদের দেখা হল। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে গেস্ট হাউসে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে তাঁর এখানেই দেখা হয়ে যাওয়ায় সমুদা পুরো বিষয়টা এখানেই শুনতে চাইল এবং ইন্সপেক্টর হীরালালও রাজি হয়ে গেলেন। ফলে তখনই আমরা মিঃ বর্মণের বাবার ওই গোপন ঘটনার কথা জানতে পারলাম।
ইন্সপেক্টর হীরালাল আমাদের জানালেন, “মিঃ বর্মণের পিতাজি বহত সাল আগে ওঁর ব্যাবসার আরেকজন পার্টনারকে লোক দিয়ে চক্রান্ত করে এই পুরীর সমুন্দরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। উস সময় পুরী মে অনেক শক্তিশালী লোকের সঙ্গে ওঁর পিতাজির ভালো খাতিরদারি ছিল। অউর সিরফ ইসি লিয়ে প্রমাণের অভাবে ওঁর পিতাজি উস ঘটনা কো দাবানে মে সফল হুয়ে থে।”
সব শুনে আমাদের গা যেন শিউরে উঠল। সমুদা ইন্সপেক্টর হীরালালকে বারণ করল মিঃ বর্মণকে এই বিষয়ে জানাতে। তারপর আমরা আরও কিছু কথা সেরে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে।
শুয়ে পড়ার পর বেশ অনেক রাতে উপরের ছাদ থেকে এক মহিলার গলার আওয়াজ কানে এল। বনবিহারীবাবু ভয় পেয়ে উঠে সমুদার কানের কাছে গিয়ে বললেন, “সমুবাবু, অনসূয়াদেবীর ghost এল নাকি এই গেস্ট হাউসে!”
সমুদা কোনও উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলে একটা টর্চ হাতে নিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আমি আর বনবিহারীবাবু তার পিছনে যাওয়ার আগেই দেখলাম, সমুদাকে একজন জোরে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। ওই ধাক্কায় সমুদার হাতের টর্চ গেল মাটিতে পড়ে ভেঙে আর আমরা দু’জনে ওই মুহূর্তে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে চোর চোর করে চেঁচিয়ে উঠলাম।
আমাদের গলার আওয়াজ পেয়ে মিঃ বর্মণ দৌড়ে এলেন উপরে। আলো জালাতেই চোখে পড়ল সেই ব্যক্তির ফেলে যাওয়া গায়ের চাদর। আসলে নিচে নামতে গিয়ে সমুদার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং পরে আমাদের দেখতে পেয়ে তাড়াহুড়োয় গায়ের চাদরটি গেছিল পড়ে। তার ভাগ্য ভালো ছিল, নাহলে আজ সে ধরা পড়তই এবং তার উদ্দেশ্যটাও জানা যেত।
মিঃ বর্মণ গেস্ট হাউসের চৌকিদারকে ডেকে পাঠালেন। কোনও চোরকে সে পালাতে দেখেছিল কি না জিজ্ঞেস করতে না করতেই সুনির্মলবাবু ছুটে এসে বললেন, “বাহ্‌! সবাই এখানে দাঁড়িয়ে, আর ওই চোর বাগানের পিছন দিয়ে পালিয়ে গেল। ছি মিঃ দত্ত, আপনি থাকতেও এরকম হল! আপনি নিজেকে আবার গোয়েন্দা বলেন!”
সমুদা উত্তর দিল না। বরং মিঃ বর্মণ আবারও সমুদার হয়ে বন্ধুকে বললেন, “ওঁর দোষ নেই। আসলে চৌকিদার ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর মনে হয় সন্ধ্যা ঠিকভাবে সদর দরজা বন্ধ করেনি। তাই চোর খুব সহজেই বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছিল।”
ওঁর কথা শেষ হতে না হতেই সেখানে এসে হাজির সন্ধ্যা। ওকে দেখামাত্রই সুনির্মলবাবু বেশ চড়া গলাতেই ওকে কথা শোনালেন। বোবা মেয়ে বলেই হয়তো কান্নার শব্দটুকুও পাওয়া গেল না তার। আর এর মাঝেই মিঃ বর্মণ ইন্সপেক্টর হীরালালকে পুরো বিষয়টা ফোন করে জানালেন।
তারপর সবাই যে যার ঘরে চলে গেল এবং আমরাও ফিরে এলাম ঘরে। কিন্তু আমাদের তিনজনের চোখেই ঘুম এল না আর। সমুদাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তার মাথায় তখন অনেক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এর মধ্যেই সমুদাকে বনবিহারীবাবু বললেন, “কী ব্যাপার মশাই, listen করলাম একজন lady-র গলা আর নিচে নামতেই হয়ে গেল man-এর চেহারা!”
সমুদা ঘাড় নেড়ে বলল, “ঠিকই বলেছেন বনবিহারীবাবু, মহিলার গলাই শুনতে পেয়েছিলাম। তবে সেটা পুরুষ হয়ে গেল কীভাবে সেটাই চিন্তার বিষয়।”
আমি প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা, চোর কি সত্যি চুরি করতে এসেছিল সমুদা?”
একটু সময় নিয়ে সে উত্তর দিল, “চোর যদি চুরির মতলবেই আসত, তাহলে কি আর সে ছাদে উঠত? এটা চোরের কাজ নয় রে, এখানে চোরের থেকেও বড়ো কোনও মাথা এসেছিল। আজ অল্পের জন্য ওই মহান ব্যক্তি হাতছাড়া হল, কিন্তু রহস্য এবার ক্রমশই জমে উঠছে রে বঙ্কু। এখনও অনেক খেলা বাকি।”
সেই রাতের সমুদার কথাগুলো আমার মনে মধ্যে যেন একেবারে গেঁথে গেছিল। তখন থেকেই যেন প্রত্যেক মুহূর্তে পরিস্থিতি দ্রুতগতিতে বদলাতে লাগল। সুতরাং বনবিহারীবাবু ও আমাকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে বলল সমুদা।


পরদিন সকালে ইন্সপেক্টর হীরালাল গেস্ট হাউসে এসে হাজির। মিঃ বর্মণ তাঁকে পুরো বিষয়টা আবারও খুলে বললেন। সব শুনে তিনি প্রথমেই সমুদার থেকে এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলেন। তবে সমুদা তাঁকে সবার আগে সারা বাড়িটা একটু ঘুরে দেখতে বলল যাতে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যদি কোনও এক সূত্র পাওয়া যায়। ইন্সপেক্টর তাঁর লোকেদের সারা গেস্ট হাউস ঘুরে দেখার নির্দেশ দিলেন এবং আমাদের সঙ্গে তিনি স্বয়ং ছাদে উঠে এলেন।
উপরের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় আরেকটি বিষয় আমাদের সামনে এল। আমরা মিঃ বর্মণের মুখে জানতে পারলাম, ছাদে ওঠার জন্য বাগানের দিক থেকে আরেকটা লম্বা সিঁড়ি রয়েছে এবং ওটা দিয়ে বাড়ির ভিতরে না ঢুকেও একেবারে সরাসরি ছাদে ওঠা যায়। আমরা ছাদে উঠে সেই সিঁড়িটাও দেখলাম বটে, কিন্তু এটা বুঝলাম না যে আগের রাতে যদি চোর এসেই থাকে তাহলে সে ওই সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির বাইরে না গিয়ে এই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে পালাতে গেল কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সমুদা ছাড়া ওখানে কারোরই হয়তো জানা নেই।
কোনও কিছু চুরি যায়নি বলে মিঃ বর্মণ আর পুলিশে ডায়েরি করলেন না। সুনির্মলবাবু অহেতুক বাড়িতে পুলিশ ডাকার জন্য মিঃ বর্মণের ওপর একটু বিরক্ত হলেন। ইন্সপেক্টর চলে যাওয়ার আগে সমুদাকে তিনি কৌশলে একটি চিরকুট দিয়ে গেলেন।
দুপুরে খাওয়ার পর সমুদাকে সেই বিষয়ে আমরা জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, “ইন্সপেক্টর হীরালাল এই কেসের বিষয়ে কিছু খবর দেওয়ার জন্যই আজ আমাদের বিকেলে আলাদাভাবে দেখা করতে বলেছেন।”
সমুদাকে সেই সুযোগে আমি আরেকটা প্রশ্ন করে বসলাম, “তুমি কি সকালে ওই ছাদের সিঁড়ি দেখে কিছু বুঝলে?”
“বুঝেছি তো অনেক কিছুই। ফলে সামান্য হলেও কিছুটা অনুমান করতে পারছি।”
সমুদার কথা শুনে বনবিহারীবাবু বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বললেন, “কেস কি solve করে ফেললেন, সমুবাবু?”
সমুদা একটু হেসে উত্তর দিল, “এতটা সহজ নয়, বনবিহারীবাবু। তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। গতকাল রাতের ঘটনা যে ঘটিয়েছে তারা একজন নয়, ছিল আসলে দু’জন।”
“One নয়, একেবারে two person ছিল বলছেন!”
“হ্যাঁ। দু’জনই ছিল। একজন মহিলা যার গলার শব্দ আমরা পেয়েছিলাম আর অপরজন হল এক পুরুষ যার সঙ্গে আমার ধাক্কাধাক্কি হল। এটা পরিষ্কার যে ওই মহিলা ছাদের ওই লম্বা সিঁড়ি দিয়েই নিচে নেমে গেছিল। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, সেই পুরুষ লোকটা কি সত্যিই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছিল নাকি সে এই বাড়িতেই রয়ে গেছে? এই শেষ সমীকরণটা মিলে গেলেই রহস্য সমাধানের পথটা আরও সহজ হয়ে যাবে।”
আমি আর বনবিহারীবাবু বুঝতে পারলাম না সমুদা আসলে কী বোঝাতে চাইল। ফলে ইন্সপেক্টরের সঙ্গে বিকেলে সাক্ষাৎ না হওয়া অবধি আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হল।
বিকেল চারটে নাগাদ আমরা মিঃ বর্মণকে কিছু না বলেই চলে গেলাম ইন্সপেক্টর হীরালালের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি আমাদের জন্য পুরীর গুণ্ডিচা মন্দিরের সামনেই অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে সমুদাকে বললেন, “আইয়ে, মিঃ দত্ত। চলিয়ে, মন্দির দেখতে দেখতে আপনাদের সব বলব।”
আমরা জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরে গিয়ে ঢুকলাম। চারদিক ঘুরে দেখার মাঝেই ইন্সপেক্টর সমুদাকে বললেন, “মিঃ বর্মণের পিতাজি জিসকে সাথ ব্যাবসা শুরু করেছিল উনকা নাম থা সুকুমার হালদার। আমি ওঁদের একটা ফটো ভি পেয়েছি। অব দেখিয়ে মিঃ দত্ত, এই ফটোটা আপনার কুছ কামে লাগে কি না।”
কথা শেষ করেই তিনি সমুদার হাতে ওই ছবিটা তুলে দিলেন এবং সমুদাও সেই ছবিটি নিয়ে তার বুক পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ইন্সপেক্টর সমুদাকে জিজ্ঞেস করল, “মিঃ দত্ত, সকালে আপ ওই চোরের কেসটা নিয়ে চুপ থাকলেন কেন?”
“আমি আসলে এড়িয়ে গেলাম কারণ, আমার বিশ্বাস, ওটা কোনও চোরের কাজ নয়। চোর হলে ছাদেই বা যেত কেন, আর কিছু চুরি না করে পালাতও বা কেন? এটা কোনও চোরের কাজ নয় ইন্সপেক্টর। গতকাল রাতে ওই সময় ঠিক দু’জন ছাদে উপস্থিত ছিল। আমরা যার গলার শব্দ পেয়েছিলাম সে একজন মহিলা। সুতরাং ওখানে ওই লোকটার সঙ্গে একজন মহিলাও ছাদে ছিল। আর আমার অনুমান, ওই মহিলা আমার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার আওয়াজ পেয়ে পিছনের লম্বা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছিল। আর তাই সে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পেরেছিল।”
ইন্সপেক্টর বললেন, “ইতনা কুছ ঘটে গেল, আর মিঃ বর্মণ কুছ মালুম পেলেন না?”
সমুদা হেসে উত্তর দিল, “ওঁর মতো সরল মানুষ আছে বলেই তো বাকিরা ঠকানোর সুযোগ পায়। এখন আপনাকে কিন্তু একটা কাজ আজই করতে হবে ইন্সপেক্টর।”
কাজের কথা শুনে ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন, “কী কাম বলুন।”
সমুদা তখন আমদের সামনেই সেই কাজের কথা তাঁকে বলল। তবে ওই মুহূর্তে আমি আর বনবিহারীবাবু গুণ্ডিচা মন্দিরের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত থাকায় সেই পুরো বিষয়টাই এড়িয়ে গেছিলাম।
আমরা তারপর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সেখান থেকে বেরিয়ে মার্কেট ও সমুদ্রতটে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে পুরীর বিখ্যাত সেই খাজা খেতে খেতে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে।
সেদিন গেস্ট হাউসে ফিরতে আমাদের প্রায় রাত আটটা বেজে গেছিল। মিঃ বর্মণকে দেখে খুবই চিন্তিত লাগল। আমরা না বলে বেরিয়ে পড়ার জন্য ওঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। কিন্তু আরেকজন ব্যক্তিকে সেখানে উপস্থিত না থাকতে দেখে আমরা বড়োই অবাক হলাম। মিঃ বর্মণ জানালেন, “সন্ধ্যাবেলা গেস্ট হাউসের সব কাজ সেরে সন্ধ্যা ওই যে বাজারের জন্য বেরোল, তারপর এতক্ষণ হয়ে গেল তবুও মেয়েটার আর ফেরার সময় হল না। আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে সুনির্মলকেই পাঠালাম বাজারে ওর খোঁজ করতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেও এখনও অবধি ফেরেনি। মিঃ দত্ত, আমি বুঝতে পারছি না কী করব।”
সব শোনার পর দেখলাম সমুদাও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। গতকালের পর আজকের এই ঘটনা, সব কেন জানি না আমার মাথায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই এই গল্পের আসল শিকড় কোথায় তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেকক্ষণ পর দেখলাম সুনির্মলবাবু ফিরে এলেন, তবে ওঁর সঙ্গে সন্ধ্যা ছিল না।
মিঃ বর্মণ জিজ্ঞেস করতেই উনি বলে উঠলেন, “সন্ধ্যা বাজারে নেই। পুরো বাজার ঘুরে, স্বর্গদ্বার ঘুরে এলাম, কিন্তু ওর দেখা পেলাম না। ইন্সপেক্টর হীরালালকে খবর পাঠাও। একটা মিসিং ডায়েরি করতেই হবে।”
সমুদা বলল, “মিসিং ডায়েরি করার হলে এখনই করে আসি চলুন, মিঃ বর্মণ। নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
সমুদার কথায় সায় দিয়ে মিঃ বর্মণ বললেন, “চলুন তাহলে মিঃ দত্ত, একটা ডায়েরি করেই আসি।”
থানায় বেরোবার মুখে সুনির্মলবাবু এগিয়ে এসে বেশ রাগের সঙ্গেই বললেন, “উনি কেন? আমি এতক্ষণ ওর জন্য যদি এদিক সেদিক করতে পারি, তাহলে থানায় যেতে পারব না? মিঃ দত্তর যাওয়ার দরকার নেই, আমি যাব।”
সুনির্মলবাবুর স্বভাবের পরিবর্তন দেখে আমরা বেশ চমকে গেলাম। সমুদাকে দেখলাম কিছু আর বলল না। ওঁরা দুই বন্ধু থানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম।
বনবিহারীবাবুকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিলাম, সমুদাকে কিছু বলার জন্য ছটফট করছিলেন। অবশেষে উনি আর ধৈর্য না রাখতে পেরে সমুদাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, “সমুবাবু, মিঃ হালদারকে see করলেন? ওঁর behaviour হঠাৎ পালটে গেল কেন, তাও আবার এত fast? আমার কিন্তু ডালটা black মনে হচ্ছে।”
সমুদা উত্তর দিল, “ডালটা সাদা না কালো রাত না পেরোলে ঠিক বুঝব কী করে, বনবিহারীবাবু?”
আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি এই কেসটা সমাধান করে ফেলেছ, সমুদা?”
সমুদা বলল, “কাল সূর্য কোন সকাল নিয়ে আসে সেটা কারোরই জানা নেই রে বঙ্কু। তবে এটা জেনে রাখ, যদি জগন্নাথদেবের কৃপা থাকে তাহলে আগামীকালই এই নাটকের যবনিকা পড়বে।”
সমুদার কথার কোনও মানে আমরা আবারও বুঝলাম না। শুধু জানি সমুদা নিশ্চয়ই এমন কিছু ফন্দি করেছে যার জন্য সে আগামীকালের অপেক্ষায় রয়েছে।
কথা বলতে বলতে এর মাঝেই মিঃ বর্মণ ও সুনির্মলবাবু ফিরে এলেন। ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে আমরা আবারও নিচে নেমে এলাম।
ওঁদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম যে ইন্সপেক্টর হীরালাল ডায়েরি নিয়েও নেননি। তিনি নাকি ওঁদের বুঝিয়েছেন যে মহিলা নিখোঁজ হওয়ার কথাটা ছড়িয়ে পড়লে ওঁদের পর্যটন ব্যাবসার ক্ষতি হতে পারে। যেহেতু এটা মহিলা জড়িত ঘটনা, সুতরাং ইন্সপেক্টর ওঁদের কথা দিয়েছেন যে তিনি এবং তাঁর পুলিশকর্মীরা যথাযথ চেষ্টা করবেন যাতে একদিনের মধ্যে সন্ধ্যাকে খুঁজে বার করা সম্ভব হয়। আর সেই আশ্বাস নিয়েই মিঃ বর্মণ ও সুনির্মলবাবু ফিরে এলেন থানা থেকে।
মিঃ বর্মণকে দেখে খুব খারাপ লাগছিল। গতবার উনি পুরীতে আসার পর ওঁর স্ত্রীকে হারালেন। এবারে সন্ধ্যা গেল নিখোঁজ হয়ে। সত্যি, একেই বলে ভাগ্যের ফের। পুরী হয়তো এখন ওঁর কাছে এক আতঙ্কের শহর হয়ে উঠেছে। আজ সুনির্মলবাবুকেও দেখলাম সমুদার উদ্দেশ্যে কোনও কটু কথা বললেন না। আমার মনে হয়, উনিও হয়তো ভেঙে পড়েছেন। এতগুলো পুরুষ থাকতেও একজন মহিলা নিখোঁজ হয়ে গেল আর আমরা কেউই কিছু করতে পারলাম না, এই অপরাধবোধই হয়তো ওঁর মধ্যে এই আমূল পরিবর্তন এনেছে।
রাতে আমরা কেউই আর কিছু মুখে তুললাম না। সবাই ঘরে গিয়ে যে যার মতো শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কারোর চোখেই ঘুম এল না। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, সমুদ্রের গর্জন সবই কানে আসছিল। সেই রাত মনে হচ্ছে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে দীর্ঘতম রাত।


পরদিন সকালে বনবিহারীবাবু আমাকে ডেকে তুললেন। খবর দিলেন, “সমুবাবু morning থেকেই missing বঙ্কু। উনি আমাকে everyday ডেকে দেন, কিন্তু today নিজেই missing।”
আমি চমকে উঠলাম। মিঃ বর্মণ এই বিষয়ে কিছু জানেন কি না ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম। বনবিহারীবাবু বললেন, “No! No! ওঁকে এখনও say করিনি। তোমাকে এই ডেকে তুললাম, এবার think করছি ওঁকে ব্যাপারটা say করব।”
আমি তাঁকে সেই কাজ করতে বারণ করলাম। কারণ, এর আগে অনেক কেসেই আমি সমুদাকে দেখেছি, গল্পের শেষদিনে এসে সে ভোরবেলা উঠে কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যেত এবং পরে সেই বেরিয়ে যাওয়াটাই কেস সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। আমার কথামতো বনবিহারীবাবু আর এই বিষয় নিয়ে মিঃ বর্মণকে বিরক্ত করলেন না। আমরা সমুদার ফেরার অপেক্ষায় রইলাম।
আমাদের নিচে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদা ফিরে এল। আমাদের আর সেই বিষয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল না। সে এসেই মিঃ বর্মণকে সরাসরি বলল, “মিঃ বর্মণ, আমি আপনার কাছে আবারও ক্ষমাপ্রার্থী। আজও আপনাকে না বলে আমি ভোরের দিকে একটু বেরিয়েছিলাম। তবে আজ এই কাহিনি শেষ হবে।”
মিঃ বর্মণ বলে উঠলেন, “কাহিনি? এখানে তো অনেক কাহিনিই ঘটেছে মিঃ দত্ত, আপনি ঠিক কোন কাহিনির কথা বলছেন?”
উত্তরে সমুদা বলল, “এখানে আসার আসল উদ্দেশ্যের কথা বলছি, মিঃ বর্মণ। ওই মৃত্যুর গল্পের জন্যই বলতে পারেন এই ক’দিনে এতগুলো ঘটনা ঘটেছে।”
এবার দেখলাম সুনির্মলবাবু রেগে উঠলেন। “মিঃ দত্ত, আপনি তখন থেকে আসল কথা না বলে খালি কাহিনি আর ঘটনা বলেই সময় নষ্ট করছেন কেন জানতে পারি? কী বলতে চাইছেন সরাসরি বলুন।”
সমুদা হেসে বলল, “সব কাহিনি তো আপনাকে নিয়েই, মিঃ হালদার। আপনার বাবার নাম সুকুমার হালদার। তাই তো?”
এবারে সুনির্মলবাবুর মুখটা আরও লাল হয়ে গেল। বললেন, “আপনি যা বলতে চান স্পষ্ট করে বলুন।”
সমুদা তারপর মিঃ বর্মণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বহুকাল আগে আপনার বাবা যার সঙ্গে এই পর্যটনের ব্যাবসা শুরু করেছিলেন সেই আরেক অংশীদার হলেন এই সুকুমার হালদার। ব্যাবসার বাড়তি লাভের অংশের লোভে আপনার বাবা পরিকল্পনা করে সুকুমারবাবুকে সরিয়ে ফেললেন সেই ব্যাবসা এবং এই পৃথিবী থেকে যার প্রতিশোধ নিতেই আপনার বন্ধু অর্থাৎ সুকুমার হালদারের ছেলে এই সুনির্মল হালদার উদয় হন।”
আমরা সমুদার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। সে বলে চলল, “উনি প্রথমে নিজের বোনের সঙ্গে আপনার বিয়ে দিলেন, পরে আবার তাঁরই মৃত্যুর মিথ্যে ঘটনা সাজিয়ে আপনার জীবনকে নরক বানিয়ে দিতে যথাযথ চেষ্টা করলেন, যাতে আপনি ব্যাবসা সামলাতে না পেরে এই পুরো ব্যাবসার ভার অন্য কারোর হাতে তুলে দেন। তবে আপনি সেই সময় নিজেকে সামলে তুলতে পেরেছিলেন বলেই উনি নিজের পরিকল্পনা বদলাতে বাধ্য হন। উনি পরে আপনারই বন্ধু সেজে এলেন যাতে আপনার মন জয় করে উনি সুযোগ বুঝে আপনার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে এই বিশাল সম্পত্তির মালিক একমাত্র উনিই হতে পারেন।”
সমুদা কথা শেষ করার আগেই মিঃ হালদার চেঁচিয়ে উঠলেন, “মিথ্যে, সব মিথ্যে। আপনার কাছে কি কোনও প্রমাণ আছে, মিঃ দত্ত?”
সমুদা ওঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “প্রমাণ ছাড়া সমরেশ দত্ত কথা বলে না, মিঃ হালদার। আজ প্রমাণও দেব, আর এই নাটকও বন্ধ করাব।”
মিঃ বর্মণ সমুদার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অনসূয়া কি এখনও বেঁচে আছে, মিঃ দত্ত?”
“হ্যাঁ, অনসূয়াদেবী অবশ্যই বেঁচে আছেন। তবে তিনি এখন ইন্সপেক্টর হীরালালের হেফাজতে রয়েছেন।”
তারপর সমুদা খুলে বলল ওই রাতের ঘটনা। সন্ধ্যার নিখোঁজ হওয়ার আসল রহস্য। বলল, “ওই রাতে যে মহিলার গলার শব্দ আমরা পেয়েছিলাম সে সন্ধ্যা ছাড়া আর কেউ নয়। ও আগাগোড়াই কথা বলতে পারত। তবে বোবা সেজে থাকত শুধুমাত্র মিঃ হালদারের কথায় এবং ছাদে সেই মুহূর্তে ওর সঙ্গে যিনি উপস্থিত ছিলেন উনি আর কেউ নন, স্বয়ং মিঃ হালদার। ওঁরা গোপনে আলোচনা করছিলেন এবং আমার জুতোর আওয়াজ পেয়ে ছাদের ওই লম্বা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছিল সন্ধ্যা। কিন্তু মিঃ হালদার সে কাজ করেননি। উনি গায়ে চাদর ঢাকা দিয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লেন এবং দেখাতে চাইলেন যে বাড়ির সদর দরজা দিয়েই চোর পালিয়েছে।”
সমুদা একটু থেমে আবার বলল, “এবার আসা যাক সন্ধ্যার নিখোঁজ হওয়ার কথায়। ও আসলে নিখোঁজ হয়েনি। ওকে ইন্সপেক্টর হীরালাল তাঁর মহিলা পুলিশকর্মীদের সাহায্যে গতকাল সন্ধ্যাবেলায় বাজার থেকেই থানায় নিয়ে যান এবং হেফাজতে নেন। এই পুরো ব্যাপারটা ইন্সপেক্টর করলেন শুধুমাত্র আমার কথায় বিশ্বাস রেখে। আমার সন্ধ্যার উপর আগেই সন্দেহ হয়েছিল। আর তাই ইন্সপেক্টর হীরালালের সঙ্গে গতকাল গুণ্ডিচা মন্দিরে দেখা হওয়ার পর আমি তাঁকে আমার সন্দেহের কথা বলি এবং তিনিও আমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমার বিশ্বাস ছিল একবার সন্ধ্যাকে হেফাজতে নিতে পারলে অনেক রহস্যের জটই খুলবে। আজ তাই ভোর হতেই আমি থানায় গিয়ে খবর নিয়ে এলাম যে গতরাতের মধ্যেই ইন্সপেক্টর হীরালাল সহ তাঁর বাকি পুলিশকর্মীরা সন্ধ্যার মুখ থেকে সব স্বীকারোক্তি নিয়ে ফেলেছেন।”
সমুদার কথা শুনে বুঝতে পারলাম, গুণ্ডিচা মন্দিরে যেই কাজের কথা সমুদা ইন্সপেক্টরকে বলছিল এবং আমরা যে কথাটা উপেক্ষা করে গেছিলাম সেটা আসলে এই। আমি এটাও বুঝতে পারলাম যে ঠিক এই কারণেই ইন্সপেক্টর হীরালাল, মিঃ বর্মণ ও মিঃ হালদারের ওই নিখোঁজের ডায়েরি নিয়েও নেননি। সেই সময় তিনি নানা কারণ দেখিয়ে তাঁদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, কী লাভ হল সন্ধ্যার এইসব কাজ করে? কেনই বা সে মিঃ হালদারের এই অপরাধমূলক কাজে নিজেকে সামিল করল?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের বেশি অপেক্ষা করতে হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে হাজির হল পুলিশের ভ্যান। সেই ভ্যান থেকে বেরিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর হীরালাল ও সঙ্গে সন্ধ্যা। তাঁরা সামনে আসতেই সমুদা সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বলল, “এবার ঘোমটা তুলে নিজের আসল পরিচয়টা দিন, মিসেস বর্মণ।”
সমুদার এই কথা শুনে মিঃ হালদার ছাড়া বাকি আমরা সবাই হকচকিয়ে গেলাম। তারপর সন্ধ্যা ঘোমটা সরাতেই আমরা চমকে উঠলাম, বিশেষ করে মিঃ বর্মণ। উনি যাকে দেখতে পেলেন তিনি আর কেউ নন স্বয়ং ওঁর স্ত্রী অনসূয়াদেবী। হ্যাঁ! তিনিই অনসূয়া বর্মণ এবং তিনিই হলেন মিঃ হালদারের একমাত্র ছোটো বোন যাকে উনি ওঁর এই প্রতিশোধের খেলায় কেবলমাত্র একটা গুটি হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। অনসূয়াদেবীর মৃত্যুর মিথ্যে গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার পর উনি তাঁকে সন্ধ্যা সাজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কালীনাথবাবুর কাছে। দুই ভাইয়ের মানসিক অবস্থা তখন ভালো নয় দেখে সেই সময়কে কাজে লাগাতেই মিঃ হালদারের এই পদক্ষেপ। বোবা মহিলা, তাও আবার একা দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে কালীনাথবাবু ছদ্মবেশী অনসূয়াদেবীকে গেস্ট হাউসের কাজের ভার দেন। আর সেই থেকেই অনসূয়াদেবী হয়ে উঠলেন সন্ধ্যা এবং রয়ে গেলেন গেস্ট হাউসে।
কালীনাথবাবু পরে সন্ধ্যার আসল পরিচয় ও তার সঙ্গে যে অন্য আরেকজন অর্থাৎ মিঃ হালদারের যোগাযোগ রয়েছে সেটা জানতে পারেন এবং একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারেন যে তাঁরা দু’জনে মিলে এক গভীর ষড়যন্ত্র করছেন। ফলে উনি বাধা দিতে গেলে ওঁকে দমিয়ে রাখার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। ওই সময় এমনকি ওঁর খাবারে নানান ক্ষতিকারক ওষুধ মিশিয়ে ওঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন করে ফেলা হয়েছিল। সুতরাং কালীনাথবাবুর বর্তমান অবস্থার জন্য একমাত্র তাঁরাই দায়ী।
সব শুনে মিঃ বর্মণ খুবই ভেঙে পড়লেন। কোনও কথাই বলছিলেন না। আর এর মাঝেই মিঃ হালদার সবার সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে বললেন, “হ্যাঁ, আমিই এসব কাজ করেছি শুধুমাত্র নিজের বাবার ওপর হওয়া অবিচারের প্রতিশোধ নিতে। আমার বাবাকে যাদের বাপ ছল করে খুন করেছিল, তাদের আমি এত সহজে ছেড়ে দিতাম? না! কখনওই নয়। আমার বোন আমার পাশে না থাকলেও, আমি একাই এই কাজ করে দেখাতাম।”
ওঁর কথা শেষ হতেই সমুদা বলে উঠল, “ছি মিঃ হালদার! আপনার বাবাকে যিনি মেরেছেন সেটা তাঁর অন্যায়। এর মানে এই নয় যে আপনি তাঁর সন্তানদের প্রতি সেই প্রতিশোধ নিতে চাইবেন। এই সমাজে আপনার মতো কিছু মানুষ আছে বলেই হয়তো মানুষের মন থেকে এই প্রতিশোধ বা হিংসা কোনওটারই শেষ নেই। কিন্তু একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, সত্যের জয় অনিবার্য। হাজার চেষ্টা করলেও মিথ্যের জয় কখনওই হবে না।”
ইন্সপেক্টর হীরালাল ওঁদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেন। মিঃ বর্মণ যে মনে মনে দুঃখ পাচ্ছিলেন তা ওঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। তবে উনি সেটা বাইরে প্রকাশ করলেন না।
সেদিন বিকেলেই আবার আমরা থানায় গিয়ে ইন্সপেক্টর হীরালালের সঙ্গে দেখা করলাম। মিঃ বর্মণ দেখা করলেন স্ত্রীর সঙ্গে। অনসূয়াদেবীকে দেখে মনে হল তিনি নিজের কাজের জন্য খুবই অনুতপ্ত, যেকোনও শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত।
কিন্তু আরেকজন? না, মিঃ হালদার নিজের কাজের জন্য একেবারেই অনুতপ্ত নন। উনি এখনও মনে করেন, ওঁর বাবার ওপর হওয়া অবিচারের সঠিক উত্তরই উনি দিতে চেষ্টা করেছেন।
এবার আসা যাক ইন্সপেক্টর হীরালালের কথায়। তিনি সমুদাকে এক হারিয়ে যাওয়া কেসের কিনারা করার জন্য ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না। সমুদার প্রশংসা তখন গোটা পুরী থানা জুড়ে চলছে। একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হয়েও সে যেভাবে সরকারী প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে একবছর আগেকার কেসের সমাধান করল, তা সত্যি প্রশংসনীয়। সে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
বনবিহারীবাবু থানাতেই সমুদাকে বললেন, “আপনাকে কী আর say করব সমুবাবু, আপনাকে যত see করছি ততই surprise হচ্ছি। আপনার no জবাব সমুবাবু, আপনাকে তাই আমার salute।”
সমুদাকে দেখে মনে হল তার কাজ এখনও হয়ত বাকি রয়ে গেছে। সে পকেট থেকে সেই ছবি বার করে মিঃ বর্মণকে দিয়ে বলল, “এই দেখুন মিঃ বর্মণ, আপনার বাবা এবং তাঁর পাশে মিঃ হালদারের বাবার একসঙ্গে তোলা এই ছবি। ছবিটা যদি ইন্সপেক্টর হীরালাল আমাকে না দেখাতেন, তাহলে এই কেস হয়তো এত তাড়াতাড়ি শেষ হত না। তিনি ওই প্রথম সাক্ষাতের পর থেকেই ক্রমাগত আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গেছেন এবং সময়মতো অনেক খবর দিয়ে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। তিনি যে বিশ্বাস করে আমার এক কথায় ছদ্মবেশী অনসূয়াদেবীকে হেফাজতে নিতে রাজি হয়ে গেলেন তা সত্যিই সমানভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। আমি মনে করি, এই রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে আমার থেকেও হাজার গুণ বেশি অবদান রয়েছে হীরালালবাবুর।”
আমরা তারপর আরও কিছু কথাবার্তা সেরে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে। সেদিন ইন্সপেক্টর হীরালাল স্বয়ং নিজে পুলিশের গাড়িতে আমাদের গেস্ট হাউসে ছেড়ে দিয়ে গেলেন। আমরা গেস্ট হাউসে ঢুকে যে যার ঘরে চলে গেলাম। অনেক রাত অবধি সেদিন আমরা তিনজনে গল্প করলাম এবং সেই গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কালীনাথবাবু। সমুদা তাঁর প্রত্যেক কথার মানে শেষপর্যন্ত বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। তার থেকেই আমরা জানতে পারলাম কালীনাথবাবু নিজের ভারসাম্য হারালেও অনেক কিছুই বোঝাতে চেয়েছিলেন এই দুই ভাইবোনের সম্বন্ধে যা তখন আমরা বুঝেও বুঝতে পারিনি। কালীনাথবাবু ওঁর কথা অর্থাৎ, ‘পারবে না কিছু করতে, পারবে না তাকে ধরতে। গিরগিটি রং পালটাবে, ধ্বংস, সব ধ্বংস হবে। বাঁচবে না কেউ, সব শেষ হবে।’ দ্বারা আমাদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে গিরগিটির মতো অনসূয়াদেবী নিজের ভোল বদলেছেন যাতে তিনি তাঁর দাদাকে ওঁদের দুই ভাইয়ের জীবন ধ্বংস করতে সাহায্য করতে পারেন। কালীনাথবাবু আবারও পুরী আসার আগে সমুদাকে ওঁর আরেক কথা অর্থাৎ, ‘গ্রহণ গ্রাস করবে, পদ্মাবতী মূর্ছা যাবে। থাকবে শুধু চারদিকে হাহাকার।’ দ্বারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ওঁদের গেস্ট হাউস অর্থাৎ ‘পদ্মাবতী’তে ওই ভাইবোনের কালো ছায়া পড়েছে। আর তাই যেমন পদ্ম বিনা জল আর বাতাস বেঁচে থাকতে পারে না, ঠিক তেমনই ওঁদের ব্যাবসা ওই ভাইবোন থাকাকালীন কিছুতেই বৃদ্ধি পাবে না।
সত্যি! ওঁর মতো মানুষের প্রতি আমাদের সারাজীবন সহানুভূতি রয়ে যাবে। উনিই হলেন আসল কাণ্ডারি এই লড়াইয়ের, যিনি হাজার বাধা থাকা সত্ত্বেও নিজের কাজ ভুলে যাননি। নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন সমুদাকে এই কেসে সাহায্য করতে। ওঁর মতো মানুষ আছে বলেই সত্য এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাবে সমুদাও ওঁদের সাহায্য এবং আশীর্বাদ নিয়ে।


পরদিন সকালে উঠে আমরা সোজা চলে গেলাম জগন্নাথদেবের দর্শন করতে ও পূজা দিতে। মন্দিরে ঢুকতেই মনটা যেন শান্তিতে ভরে গেল। মনে হল স্বর্গে প্রবেশ করলাম। মন্দিরের ভেতর জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এইটুকুই প্রার্থনা করলাম যাতে সারাজীবন সত্যের পথে থাকতে পারি এবং আজীবন সমুদার সঙ্গে চলতে পারি তার এই বিচিত্র দুনিয়ায়।
পুরীতে পাণ্ডাদের দাপাদাপি থাকলেও এই শহরে এসে এক আলাদা অনুভূতি হল। এই শহর আমাকে শেখাল কীভাবে প্রতিহিংসাকে নিজের মন থেকে বের করে সাগরের জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। এই শহর আমাকে শেখাল মনে জোর রেখে কীভাবে নিজের কাছের মানুষকেও কঠিনতম শাস্তি দেওয়া যায়। হ্যাঁ, এই শিক্ষা হয়তো আমি এখানে না এলে পেতাম না।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment