উপন্যাসিকাঃ টেক্কা দিলেন পিসিমণিঃ অদিতি ভট্টাচার্য



রাস্তার ধারেই ফুল, মালা নিয়ে বসে যতীন। বয়স্ক মানুষ, পিসিমণি বরাবর এর কাছ থেকেই ফুল কেনেন। আজও তাই কিনছিলেন, হঠাৎ একটা গাড়ি এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে পিসিমণির ঠিক পাশেই থামল। জিপ পুলিশের। আর তার ভেতর থেকে প্রদীপচন্দ্র খাসনবিশ গলা বাড়িয়ে বললেন, “আপনি তো দিব্যি নিশ্চিন্তে ফুল কিনছেন বড়দি, এদিকে আমার অবস্থা যদি জানতেন!”
“কেন ভাই, আপনার আবার কী হল?” পিসিমণি জিজ্ঞেস করলেন।
“আর বলেন কেন? দেশে যেন চুরি ডাকাতি থামতেই চায় না। সারাটা জীবন চোরের পিছু ধাওয়া করেই গেল। কয়েকটা বড়ো চুরি এদিকেও হল তো। তার মধ্যে আজ আবার কী উৎপাত জানেন? সক্কাল সক্কাল এক ভদ্রলোক থানায় এসে হাজির। ওঁর বারান্দার গ্রিলের গেটের তালা রাতে কেউ খুলে ফেলেছে। এমন কিছু শক্তপোক্ত গেটও নয়, তালাও নয়। ক্ষয়ক্ষতি কী হয়েছে শুনবেন? বারান্দায় সরস্বতী ঠাকুরের একখানা মূর্তি ছিল, সেটা ভেঙে গেছে। জানালা-ফানালার গ্রিল ভাঙতে গেছিল হয়তো, অসাবধানে মূর্তিটা ভেঙে গেছে। জানলার ঠিক নিচেই বসানো ছিল তো। আর কিছু যে হয়নি, এজন্যে কোথায় খুশি হবে তা নয়, থানায় এসে চেঁচামেচি শুরু করেছে। এটা কিন্তু আপনি করেছেন বড়দি, সামান্য কিছু হলেও লোকে অন্য গন্ধ পায়। কয়েকটা চুরি-টুরি আপনি ধরে ফেলায় সবাই এখন নিজেদের বড়ো বড়ো গোয়েন্দা ভাবতে শুরু করেছে, বুঝলেন? কী জ্বালা আমার বলুন তো! আপনার আর কী, আপনি তো বেশ ফুল কিনছেন।”
যেমন হুট করে খাসনবিশ এসেছিলেন তেমন হুট করেই আবার চলেও গেলেন।
পিসিমণি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন। তারপর নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বললেন, “হায় রে আমার পোড়া কপাল! কাজ করতে হচ্ছে বলে কী বিরক্তি! বাড়ির গেটের তালা কেউ ভাঙলে লোকে থানায় যাবে না তো কোথায় যাবে? এইজন্যেই দেশের এত দুরবস্থা।”
“এইডা এক্কেরে হক কথা কইছেন বড়দি।” যতীন সায় দিল।
পিসিমণি ফুল কিনে বাড়ি ফিরে দেখলেন এক ভদ্রলোক বসে আছেন তাঁরই অপেক্ষায়। পিসিমণি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে নীলুর বাবা বললেন, “বড়দি, ইনি শ্রী সুধাংশু মল্লিক, তোমার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছেন। বলছেন খুব দরকার।”
নীলুর বাবার কথা শেষ হল কি হল না, সুধাংশুবাবু বললেন, “আপনাকে এখনই আমার সঙ্গে একবার যেতে হবে বড়দি, না করবেন না, অনেক আশা নিয়ে এসেছি।”
“আগে ঠাণ্ডা হয়ে বসুন ভাই, কী হয়েছে বলুন।” পিসিমণি বললেন।
“সব বলছি। তবে আপনাকে কিন্তু এখনি একবার যেতে হবে, না বলবেন না।”
“মানুষের দরকারে না বলার পাত্রী নিভারানি বামনী নয় ভাই, আপনি বলুন আগে কী হয়েছে।”
সুধাংশু মল্লিক এ শহরেরই বাসিন্দা। ওঁর বাড়ির পাশে সম্প্রতি একটি নতুন বাড়ি হয়েছে। লোকও বসবাস করতে শুরু করেছে। দেবরূপ সেনগুপ্ত, তার স্ত্রী কাকলি আর তাদের দুই ছেলেমেয়ে। দেবরূপের বয়স বেশি নয়, বছর পঁয়ত্রিশ হবে। ছেলেমেয়েদুটোও ছোটো ছোটো। বড়োটা ছয়, ছোটোটা সবে দুই। আজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেবরূপরা দেখে সামনের বারান্দার গ্রিলের গেটের তালাটা খোলা।
“আর বারান্দায় রাখা সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তিটা ভাঙা। থানায় গিয়েও কোনও লাভ হয়নি, এই তো?” পিসিমণি কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন।
সুধাংশুবাবু এত অবাক হলেন যে কিছু বলতেই পারলেন না। নীলুর বাবা শুধু বললেন, “তুমি জানো বড়দি!”
“না জেনে আর উপায় কী ভাই? যতীনের কাছে ফুল কিনছিলাম, দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা। তিনিই সব বললেন। বললেন যে আমার জন্যেই নাকি এসব হচ্ছে, সামান্য ঘটনাতেও লোকে নাকি আজকাল অন্য গন্ধ পাচ্ছে।”
“খাসনবিশ এই কথা বললেন? বলতে পারলেন? তুমি কী করেছ জানেন না?” নীলুর বাবা আরও অবাক হলেন। একটু বিরক্তও।
“থাক না ওসব কথা।” পিসিমণি বললেন, “কিন্তু ভাই আমি গিয়ে কী করব? রাতে কেউ বাড়িতে ঢুকেছিল, চলে গেছিল, এরকম চুরি তো শুনছি হচ্ছে আজকাল। আমি কি আর এসব চোর ধরতে পারি?”
“না না, ওকথা বলবেন না। আপনি কী পারেন আমরা জানি না, নাকি! সারা শহর জানে। আপনাকে একবার যেতেই হবে, গেলে তবে না বুঝবেন কী হয়েছে। চলুন বড়দি।” সুধাংশুবাবু নাছোড়বান্দা।
অগত্যা পিসিমণিকে যেতেই হল। গিয়ে অবশ্য দেখার তেমন কিছুই ছিল না। তালাটা খুলে ফেলেছিল, তালা পালটে দেওয়া হয়েছে। আর সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তিটা ভাঙা। ভাঙা টুকরোগুলো একটা কাপড়ের পুঁটুলির মধ্যে রাখা আছে। পিসিমণি পুঁটুলি খুলে একবার উঁকি মেরে দেখলেন, তারপর আবার যেমন ছিল তেমন বন্ধ করে রেখে দিলেন।
“দশদিন হয়ে গেল সরস্বতী পুজো হয়ে গেছে, মূর্তিটা বিসর্জন দাওনি কেন ভাই? আর নাও যদি দাও, ঠাকুরঘরে রাখো, বারান্দায় ফেলে রেখেছিলে কেন?” পিসিমণি জানতে চাইলেন।
“আপনি কি ভাবছেন আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয়েছে? না না, আমাদের বাড়িতে পুজোই হয়নি।” বলল কাকলি, “কী আর বলব বড়দি, যে শুনছে সেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। এ আমার ছেলের কীর্তি, বুঝলেন? গতকাল টোটো চড়ে বেড়াতে গেছিল আমার ছেলে, মেয়ে, আমাদের বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টা যে মেয়েটি থাকে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্যে সেই রুমার সঙ্গে। টোটোওলাও চেনা। রুমা এরকম বাচ্চাদের নিয়ে মাঝেমাঝে যায়, আমরাই বিলাস মানে টোটোওলাকে সকালে বলে রাখি। দু’জনেই চাকরি করি, বাচ্চাদের নিয়ে রবিবার ছাড়া বিশেষ বেরোনো হয় না, তাই রুমাই নিয়ে যায়। গঙ্গার কোন ঘাটে গেছিল বেড়াতে, আমাদের এখানেও নয়, হালিশহরের ওদিকে কোথায়, সেখানে নাকি একটা শেড করা আছে আর তার তলায় গাদা গাদা সরস্বতী ঠাকুর রাখা আছে। একখানা ছোটো মূর্তি দেখে আমার ছেলের কী বায়না! ওটাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। কাঁদছিল, তাই বিলাস সেটাকে টোটোতে করে নিয়ে এসেছে।”
“রুমাকে ডাকো না ভাই, একটু কথা বলি। আর বাচ্চাদেরও।”
রুমা এল, সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চারাও। রুবান বড়ো, আর রুমনি ছোটো। রুবানের মুখ গোমড়া, চোখ ছলছল করছে আর রুমনি পিসিমণিকে দেখে খুদি খুদি দাঁত বার করে হাসল। পিসিমণিও একগাল হেসে ওদের কাছে টেনে আদর করলেন। তারপর কাকলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাছার আমার মুখ গোমড়া কেন? বকাঝকা করেছ?”
“বকব না? কী বলেন, বড়দি? কী অন্যায় বায়না বলুন তো? কোত্থেকে একটা সরস্বতীর মূর্তি তুলে এনে হাজির করল!” বেশ রেগেই কাকলি বলল।
“মূর্তি এনে ঠিক করেনি সে আমিও মানছি। কতদিন পড়ে আছে, নোংরা হয়ে আছে হয়তো, বাচ্চাদের ওসবে হাত দেওয়াই উচিত নয়। কিন্তু বাচ্চারা তো বায়না করবেই ভাই। বড়োদের কাজ ভুলিয়ে দেওয়া। বড়োরাও তো তাদের কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে না। যা বাবা তোরা ভেতরে যা, খেলা কর। রুবানের ইস্কুল নেই?”
“আজ আর পাঠানো হল না এসব গোলমালে। ওদের বাবাকে আজ অফিসে যেতেই হবে, তাই দেরি করে হলেও গেল, আমারও স্কুলে যাওয়া হল না।”
পিসিমণি এবার রুমার দিকে ফিরলেন। “বলি তোমার কী আক্কেল বাছা? বেড়াতে যাওয়ার আর জায়গা পেলে না? ওই ঘাটেই যেতে হল? ওখানে আছেটা কী? কোথায় গেছিলে বুঝেছি আমি। তার একটু দূরেই তো গঙ্গার ধারে কী সুন্দর একটা পার্ক আছে। সেখানে তো নিয়ে যেতে পারতে বাচ্চাদুটোকে।”
“সেখানেই তো নিয়ে গেছিলাম।” রুমা মুখ গোঁজ করে বলল, “ফেরার সময় বিলাসদা বলল, ‘কোথা থেকে আমাদের কলে জল আসে চল দেখিয়ে নিয়ে যাই।’ এই এত বড়ো বড়ো পাইপে করে গঙ্গার জল নাকি আমাদের কলে আসে, সেই দেখতে গেছিলাম। আমি কী জানি ওখানে এত এত মূর্তি পড়ে থাকে! রুবান বায়না করছিল দেখে বিলাসদা ‘নিয়ে যাই মূর্তিটা’ বলে টোটোতে তুলে দিল।”
“বলিহারি! তোমার বিলাসদাও বলল আর তুমিও চলে গেলে! সবাই জানে ওখানে ঠাকুরের মূর্তি রাখা থাকে, গঙ্গার দূষণ আটকানোর জন্যে এখন গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া বন্ধ আছে। তাও গেলে গেলে, মূর্তি তুলে আনতে গেলে কেন? বাচ্চা ছেলে একটা, ভোলাতে পারলে না?” 
রুমা কিছু বলল না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
পিসিমণি সেদিকে এক ঝলক দৃষ্টিপাত করে কাকলিকে বললেন, “যা হওয়ার হয়ে গেছে, এ নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই। দারোগাবাবুর কথাই মনে হয় ঠিক, জানালায় কিছু করতে গেছিল, অসাবধানে মূর্তিটা ভেঙে গেছে। বড়ো যে কোনও ক্ষতি হয়নি এই ভালো। আমি আসি ভাই, তবে এবার থেকে বাচ্চারা কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে সেটা খেয়াল রেখো।”
“আমিও বেরোব। একবার পুরুতমশায়ের কাছে যেতে হবে। রুমা দরজা বন্ধ কর, কেউ ডাকলে না দেখে খুলবি না।” কাকলিও বেরিয়ে এল।
“পুরুতমশায়ের কাছে কেন ভাই? পুজো-টুজো কিছু আছে?”
“এক তো বিসর্জন দেওয়া মূর্তি বাড়িতে তুলে আনল ছেলে। তারপর এই কাণ্ড। মূর্তি ভেঙে গেল। সে নিয়ে কী করব, সেসব জানতে হবে তো!”
“কী আবার করবে? ওই কাপড়ের পুঁটুলি করে যেখান থেকে নিয়ে এসেছিল সেখানে গিয়ে রেখে দাও।”
“না না, শুধু রেখে দিলে হবে না। এত কিছু ঘটল, সংসারের মঙ্গল অমঙ্গল বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। সবকথা তো আপনাকে বলিনি। সকালে দেখি সিঁড়ির ওপর দুটো জবা ফুল, সিঁদুর এসব পড়ে আছে! সেগুলো ফেলে দিয়েছি। তবে এসব ভালো ব্যাপার নয়।” কাকলি শিউরে উঠে বলল, “ও থানায় গেছিল, তবে আমি তখনই বলেছি এসব থানাপুলিশের ব্যাপার নয়, এ অন্য জিনিস। ও-মূর্তি এনে খুব বাজে কাজ হয়েছে।”
পিসিমণি আর কিছু বললেন না, বাড়ি চলে এলেন।
সুধাংশুবাবু অবশ্য খুব কাঁচুমাচু হয়ে পিসিমণিকে বলেছিলেন, “আপনি কিছু মনে করবেন না বড়দি, আমি ভেবেছিলাম চোর এসেছে, পুলিশ পাত্তা দিল না, আপনি কিছু করতে পারবেন। কিন্তু এখন তো দেখছি এরাই তাতে আগ্রহী নয়, অন্য কিছু ভাবছে। ওই ফুল-টুল আমরাও দেখেছি, কিন্তু এতসব ভাবিনি।”
রাতে নীলু ফিরল খুব উত্তেজিত হয়ে। “কতদূর কী এগোলে বলো পিসিমণি, এবার কিন্তু প্রথম থেকে সব বলতে হবে।”
ফোনে সব খবর পেয়ে গেছে তো।
“কিছু হলই না তো এগোব কী বাছা?” পিসিমণি মুখটাকে ব্যাজার করে বললেন, “আর এইসব এই তোমাদের জন্যে হচ্ছে। কিছু হলেই তোমরা একেবারে উঠে পড়ে লাগো, ‘যাও যাও পিসিমণি’ করে। ফল দেখো, একদিকে সেই কোনখান থেকে লোকে বাড়িতে এসে বসে থাকছে আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে আর অন্যদিকে খাসনবিশ রাস্তার মাঝখানে আমাকে বলছে এসব নাকি আমার জন্যে!”
“খাসনবিশের কথা বাদ দাও তো! তুমি বরং ওকে দেখিয়ে দাও তোমার ক্ষমতা।”
“চুপ করো বাছা, কাউকে কিছু দেখানোর শখ আমার নেই। আর তাছাড়া এখানে না খাসনবিশের কিছু করার আছে, না আমার। কাকলি গেছে পুরুতমশায়ের কাছে বিধান নিতে। মূর্তি তুলে আনা, তারপর মূর্তি ভেঙে যাওয়া, সিঁড়িতে জবা ফুল পড়ে থাকা–এসবের জন্যে।”
“কী!”
“হ্যাঁ। কাকলি বলল এসব নাকি খুব খারাপ ব্যাপার। এমনভাবে বলল যে আমি একেবারে বাক্যিহারা হয়ে গেলাম! কিন্তু ও নীলু, তুই কি বকবক করেই যাবি বাবা? যা হাত মুখ ধো, খাওয়াদাওয়া কর।”


“আমি ভাবলাম আবার বেশ একখানা কেস এসেছে, তুমি আবার সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে, কিন্তু এ তো দেখছি সেসব কিছুই নয়।” রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বেশ হতাশ হয়েই বলল নীলু।
পিসিমণি কোনও উত্তর দিলেন না।
“কী ভাবছ পিসিমণি?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“মূর্তিটা ওভাবে টুকরো টুকরো কী করে হল? জানালায় কিছু করতে গেলে আগে কি জানালার তলা থেকে মূর্তিটা সরিয়ে নেবে না? হাত থেকে ভারী কিছু পড়লেও কি ওরকম টুকরো টুকরো হবে?” পিসিমণি যেন নিজের মনেই বললেন। তারপরেই যেন জোর করে ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলতে চাইলেন, “যাক গে, এসব নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই। কাকলি একটু আগে ফোন করেছিল। কাল বিকেলে নাকি কীসব যাগযজ্ঞ হবে, আমাকেও যেতে বলল।”
“তুমি যাবে?”
“আজ যখন গেলাম, কালও যাই, দেখে আসি কী ব্যাপার, কী যাগযজ্ঞ।”


পিসিমণির যেতে যেতে সন্ধে হল। যজ্ঞ তখন শুরু হয়ে গেছে। সে এক এলাহি ব্যাপার। মূর্তির টুকরোগুলো নিয়ে যাওয়া হয়ছে। পুরুতমশাইই নাকি নিয়ে গেছেন, কোথায় তা কাকলিরা জানে না। সারা বাড়ি নাকি ঘড়া ঘড়া গঙ্গাজল ঢেলে শুদ্ধ করা হয়েছে, তারপর যজ্ঞ শুরু হয়েছে। ধোঁয়ায় সারা বাড়ি অন্ধকার, রুমনি তারস্বরে কাঁদছে, পুরুতমশাই জোরে জোরে কীসব মন্ত্র বলছেন, সঙ্গে দু’জন সহকারীও আছে। এত বড়ো যজ্ঞ, একা হাতে সামলানো যায় না, তাই দু’জন সাহায্য করছে।
সব দেখেশুনে পিসিমণি গম্ভীর মুখে চলে এলেন।


“রুমনির আর দোষ কী! ধোঁয়ায় আমারই যা চোখ জ্বালা করছিল! তবে সব দেখেশুনে আমার মোটে ভালো লাগল না। মনে হচ্ছে কিছু একটা গোলমাল হবে।” বাড়ি ফিরে পিসিমণি বললেন।
“তুমি ওদের কিছু বললে না?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“বললাম, একটু সাবধানে থেকো ভাই, একবার তালা ভেঙেছে, আবার যেন কিছু না হয়। তাতে কাকলি বলল, ‘আপনি ভুল করছেন বড়দি, এসব মামুলি চুরি-ডাকাতির ব্যাপার নয়, এ অন্য ব্যাপার। পুরুতমশাইও তাই বললেন। ওভাবে মূর্তি তুলে এনে ঘোর অকল্যাণ হয়েছে। এই যজ্ঞ করলে সব কেটে যাবে, আর কোনও ভয় নেই।’ একে আর কী বোঝাব বাছা? মাথায় যা কল্যাণ-অকল্যাণের ভূত ঢুকে আছে! খাসনবিশকেও একবার ফোন করলাম। সে খুব বিরক্ত হয়ে বলল, ‘যার ইচ্ছে যজ্ঞ করুক, পুজো করুক, যা খুশি করুক, আপনার কী?’ এরপর আর আমি কী করব?”
“তোমার কী মনে হয় পিসিমণি? একটা মূর্তি তুলে আনলে সত্যি অকল্যাণ হয়?”
“চুপ কর নীলু, উলটোপালটা বকিস না!” পিসিমণি খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, “বাচ্চা ছেলের কী মনে হয়েছে, বায়না করে সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তি তুলে এনেছে, এর মধ্যে অকল্যাণ আসছে কোত্থেকে? কী যে এদের পড়াশোনা শেখা বুঝি না বাপু!”


পরেরদিন সকালে কিন্তু দেখা গেল পিসিমণির কথাই ঠিক ছিল। অনেক বেলা পর্যন্ত কাকলিদের, বাচ্চাদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না দেখে সুধাংশুবাবুদের সন্দেহ হয়। রুবানের স্কুলে যাওয়ার পুল কার ডেকে ডেকে ফিরে গেছে। সুধাংশুবাবু এসে দেখেন গ্রিলের গেটের তালা আজও খোলা, হুড়কোটা সামনে থেকে আটকানো। বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকার দরজারও তাই। উনি আরও কয়েকজন প্রতিবেশীকে ডেকে এনে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন। তখন প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। তখনও বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে। আর বাড়ির যা অবস্থা সে আর কহতব্য নয়। মনে হচ্ছে যেন ঝড় বয়ে গেছে। জিনিসপত্র সব লণ্ডভণ্ড অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সুধাংশুবাবুদের ডাকাডাকিতে কাকলিদের ঘুম ভাঙে, তারপর উঠে এই অবস্থা দেখে তো হাঁ!
পিসিমণিকে এসব খবর সুধাংশুবাবুই ফোনে দিয়েছেন। শুনেই পিসিমণি বেরিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখেন প্রদীপচন্দ্র খাসনবিশও উপস্থিত।
“এই যে আপনিও এসে গেছেন দেখছি।” খাসনবিশ পিসিমণিকে দেখে বললেন।
“না এসে আর উপায় কী ভাই? কাল কাকলিকে বললাম, আপনাকে বললাম, কিন্তু আপনারা তো কেউ আমার কথা শুনলেনই না! কী অবস্থা হয়েছে দেখুন বাড়িঘরের! আর দেরি না করে যান ওই পুরুতটাকে ধরুন, তাহলেই সব বেরিয়ে পড়বে।” বললেন পিসিমণি।
“পুরুতমশাইকে? তাঁকে আবার কেন?” কাকলি বলে উঠল। গলা তখনও ঘুম জড়ানো।
“হায় রে আমার পোড়া কপাল!” পিসিমণি বেশ বিরক্ত, “এই সামান্য কথাটাও বুঝতে পারছ না? নিজেরাই বলছ পুজো, যজ্ঞ মিটে যাবার পর খুব ক্লান্ত ছিলে সবাই, তার পরেই ঘুমিয়ে পড়েছ, আর কিছু মনে নেই। নিশ্চয়ই প্রসাদ খেয়েছিলে, তাতেই কিছু মেশানো ছিল। নাহলে এই বেলা পর্যন্ত এরকম অঘোরে ঘুমোচ্ছ? বাচ্চার গাড়ি এসে ডেকে ডেকে ফিরে গেল, প্রতিবেশীরা এসে ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙালেন! যাক গে, তোমায় আর এসব নিয়ে ভাবতে হবে না, দারোগাবাবু এসে গেছেন, উনিই দেখবেন। তুমি যাও, বাচ্চাদুটোকে দেখো, ঘরদোর ঠিক করো, কী চুরি গেল দেখো। চাল-ডালের টিন অবধি খুলে ছড়িয়েছে।”
বাড়িতে হাজার দশেক টাকা ছিল, কাকলির ছোটোখাটো কিছু গয়না ছিল, দেখা গেল সেসব কিছুই নেই।
“ওই তো টাকা গয়না এসব নেওয়ার জন্যেই আসে। প্রথমদিন পারেনি, পরেরদিন নিয়ে গেল। এরকম চুরি হচ্ছে। এই তো গতমাসেই একটা বাড়িতে হল। এ তাদেরই কাজ। ওই বাড়ির লোকজনও এরকম বেলা অবধি ঘুমোচ্ছিল।” খাসনবিশ বললেন।
“তাও একবার ওই পুরুতের খোঁজ করে দেখুন না ভাই, কালকে আমার ওদের ব্যাপার মোটেই ভালো ঠেকছিল না। কাকলি কল্যাণ অকল্যাণ করে এত মেতে উঠেছিল যে আমিও যেন বাক্যিহারা হয়ে গেছিলাম। তখন ওরকম না করলে হয়তো এই অকল্যাণটা আটকানো যেত।” বললেন পিসিমণি।
“আপনিই বোঝান বড়দি, আমার কথা তো শুনলই না। কী যে ভূত মাথায় ঢুকেছিল!” দেবরূপ এতক্ষণে বলল।


খাসনবিশের বিশেষ ইচ্ছে না ছিল না এক্ষুনি পুরুতের খোঁজখবর নেওয়ার, কিন্তু পিসিমণির কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্যও করতে পারলেন না। কী জানি পরে যদি দেখা যায় পিসিমণির অনুমানই নির্ভুল ছিল!
পুরুতকে কিন্তু পাওয়া গেল না, না তার সহকারীদের। পুরুত নাকি কাকলিদের বাড়ি থেকে পুজো করে আর ফেরেইনি। তার স্ত্রীই তাকে খুঁজে যাচ্ছে, মোবাইল ফোন বাড়িতেই পড়ে আছে। খাসনবিশ পুরুতের বাড়ি যেতেই তার স্ত্রী হাউমাউ করে তার পায়ের ওপর পড়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে, “ও দারোগাবাবু, আমার স্বামীকে খুঁজে এনে দিন। আমি নাহলে কী করব! যজ্ঞ করতে গিয়ে আর ফিরলই না! বুড়ো শ্বশুরকে আমি কী বলব? ছেলে ফেরেনি দেখে উনি তো শয্যা নিয়েছেন। এ কী হল আমার!”
আশেপাশের লোকজনও বলেছে পুরুতমশাইকে তারা গতকাল সন্ধে থেকে আর দেখেনি।
সব দেখেশুনে খাসনবিশ ফিরে এসেছেন, কিছুই আর করতে পারেননি। এসব খবর খাসনবিশ নিজেই পিসিমণিকে দিয়েছেন। পিসিমণি শুনলেন, শুনে গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন।
“কী বুঝছ বড়দি? নীলু আমাকে ফোন করেছিল। ওই একই কথা, পিসিমণি কী করছেন। কী বলব ওকে?” নীলুর মা বললেন।
“এখনই ছেলেকে কিছু বলার দরকার নেই, কাজকর্ম করছে করুক। আমি বরং একবার কাকলিদের ওখানে একবার ঘুরে আসি। যা অবস্থা দেখে এলাম!” পিসিমণি বললেন।
“সাবধানে যেও কিন্তু। আজকাল তুমি কিছুতে জড়িয়ে পড়লেই আমার কীরকম যেন ভয় করে, ওই হুমকি দেওয়ার পর থেকেই।”
পিসিমণি একগাল হেসে বললেন, “তুমি মিথ্যে চিন্তা কোরো না ভাই, আমার কিচ্ছু হবে না। আর আমি জড়িয়ে পড়লাম কীসে? এ তো খাসনবিশের কাজ।”


কাকলিরা তখনও জিনিসপত্র গুছিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশীরাও সাহায্য করছে। রুবান যেন কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে, রুমনি ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে।
পিসিমণি রুমনিকে কোলে বসিয়ে আদর করে বললেন, “কী হয়েছে বাবা, কী বলছিস?”
“আমার প্যাঁকপ্যাঁক দিচ্ছে না, প্যাঁকপ্যাঁক দাও, অনেক প্যাঁকপ্যাঁক।” রুমনি ছলছল চোখে বলল।
পিসিমণি হেসে ফেললেন। বললেন, “আচ্ছা দাঁড়াও, কোথায় তোমার প্যাঁকপ্যাঁক দেখছি।”
কাকলিও শুনেছে রুমনির কথা। বলল, “আর বলবেন না বড়দি, একে এই অবস্থা, তার মধ্যে মেয়ে বায়না করে যাচ্ছে। ওর একটা হাঁস আছে, ওটাকেই প্যাঁকপ্যাঁক বলে। হাঁস মানে সফট টয়। ওর খুব পছন্দের। ওটা না নিয়ে খাবে না, শোবে না, কিচ্ছু না। ওটাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়। ঘুমিয়ে পড়লে আমরা খাট থেকে নামিয়ে রাখি হাঁসটা। কাল তো সব জিনিস তছনছ হয়েছে, একটা জিনিসও ঠিক জায়গায় নেই! রুমুর হাঁস দেখি ডাইনিং স্পেসে পড়ে আছে, তার ওপর আবার টম্যাটো সস পড়েছে একগাদা। সসের বোতল নিয়ে কী করছিল জানি না বাবা! ওই সস মাখা হাঁস তো আর দেওয়া যায় না। কাচার সময় হয়নি কারুর। ওই ওপরের তাকে তুলে রেখেছি আর মেয়েও ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে।”
“না, সস মাখা হাঁস তো দেওয়া যায় না।” পিসিমণি বললেন, “কাঁদে না বাবা, কাঁদতে নেই। আচ্ছা দেখি আমি ওরকম একটা প্যাঁকপ্যাঁক পাই কি না।”
পিসিমণি কাকলিদের বাড়ি থেকে চলে এলেন, কিন্তু বাড়ি ফিরলেন না। কাছাকাছি একটা দোকানে গেলেন, কিন্তু সেখানে অত বড়ো হাঁস পেলেন না।
দোকানে বাজারে গেলে দু-চারজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েই যায় আর পিসিমণিকে এ শহরে কে না চেনে! আজও তাই হল। এ ঘটনাটার কথাও অনেকে শুনেছে, পিসিমণিকে যে ডেকে আনা হয়েছে তাও। সেই নিয়েই কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। একজন ঘর সাজানোর জন্যে একগুচ্ছ প্লাস্টিকের লাল গোলাপ কিনেছিলেন, তাঁর হাতেই ধরা ছিল ফুলগুলো। তাই দেখে পিসিমণি বললেন, “আপনার হাতের ফুল দেখে ভালো মনে পড়ল ভাই। কাল শনিবার, মাকে জবা ফুলের মালা পরাব ভেবেছি, যাই কিনে রাখি।”
ফুল তো পিসিমণি যতীন ছাড়া কারুর কাছ থেকেই কেনেন না। তাই আবার হাঁটতে হাঁটতে ওর কাছেই গেলেন। টকটকে লাল জবাফুলের একটা বেশ বড়ো মালা কিনলেন। যতীন যেখানে বসে তার কাছেই টোটো স্ট্যান্ড। পিসিমণির কী খেয়াল হল কে জানে, যতীনকে বললেন, “মালাটা রাখো, আমি ঘুরে এসে নিয়ে যাব।”
টোটোতে চেপে চললেন সেই ঘাটে যেখান থেকে রুবান সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তি নিয়ে এসেছে। সরস্বতী পুজো হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে ভোরবেলা আর সন্ধেবেলা একটা চাদর অন্তত না জড়ালে গা শিরশির করে। টোটোতে হাওয়াও খুব লাগে। পিসিমণি তাই চাদর দিয়ে ভালো করে গা, মাথা মুড়ে বসলেন।
ঘাটটা বেশ নির্জন। চারদিক খোলা একটা শেডের তলায় নানান আকারের নানান রকমের সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তি রাখা, দু-চারটে কালী ঠাকুরের মূর্তিও আছে। কারুর বাড়ির পুজোর হয়তো। মূর্তিগুলোর কোনও কোনওটার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। কোনওটার বীণা ভেঙে গেছে, কোনওটার চুল খুলে গেছে, একটা মূর্তির তো মাথাই ভেঙে গেছে, আবার কোনও মূর্তি দিব্যি অটুট রয়েছে।
‘এরকম জায়গায় কেউ বাচ্চাদের নিয়ে আসে! বলিহারি! আর ওই তো মোটা মোটা পাইপ দিয়ে গঙ্গার জল তোলা হচ্ছে। এই বা ওইটুকু বাচ্চারা দেখে কী করবে? কী বুঝবে?’ পিসিমণি আপনমনেই বললেন ঘুরে দেখতে দেখতে। হঠাৎ সজোরে একটা ইটের টুকরো এসে লাগল পিসিমণির বাঁ কাঁধে। ব্যথায় কপাল কুঁচকে গেল পিসিমণির, মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আতর্নাদ বেরিয়ে এল। কিন্তু হাজার হলেও তিনি পিসিমণি। তাই সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে পেছন দিকে গেলেন। ওদিক থেকেই ইটের টুকরোটা ছোড়া হয়েছে। কাজ হাসিল করে বাইকে চেপে মূর্তিমান তখন নিরাপদ দূরত্বে। পিসিমণি ইটের টুকরোটা কুড়িয়ে নিয়ে চলে এলেন। টোটো চালক টোটোতেই বসে ছিল, নামেনি, মোবাইল ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত।
“ফিরে চলো ভাই।” টোটোতে উঠে পিসিমণি বললেন।


পিসিমণির গম্ভীর মুখ দেখে নীলুর বাবা-মা বুঝলেন যে কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু পিসিমণি কিছু বললে তো! তিনি তো মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
“এখন আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। আমি বুঝেছি ছেলে না ফিরলে বড়দি কিচ্ছু বলবেন না।” নীলুর মা বললেন।
নীলু অফিস থেকে ফিরলে পিসিমণি তার হাতে ইটের টুকরোটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাও। তোমার বাবা, মা তো আমাকে পাগলা করে দিচ্ছে ‘কী হয়েছে বলো’ করে। এরকম ঘটনা প্রথম ঘটল। আমি আগে ওদের বলে দিলে তুমি যদি আবার মুখ হাঁড়ি করে বসে থাকো, তাই কাউকে কিচ্ছু বলিনি। অবশ্য তেমন গুরুতর কিছু নয়, সেরকম হলে তো বলতেই হত। আমি গঙ্গার ঘাটে গেছিলাম যেখানে মূর্তিগুলো রাখা থাকে। ওখানেই ইট ছুড়ল। কিন্তু ও নীলু, ব্যাটার হাতের টিপ তো মোটে ভালো নয় বাবা। নিশ্চয়ই মাথায় মারতে চেয়েছিল, কিন্তু লাগল তো কাঁধে!”
“মারতে চেয়েছিল মানে!” নীলু, নীলুর বাবা, মা তিনজনে একসঙ্গে আঁতকে উঠলেন।
“মারতে চেয়েছিল মানে মারতে চেয়েছিল। কাঁধে লেগেছে, অল্পই।” পিসিমণি নির্বিকার মুখে বললেন।
“তোমাকে মেরেছে! তোমাকে!” নীলুর তখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।
“আমাকে মারতে চেয়েছে যখন আমাকেই তো মারবে বাছা, আর কাকে মারবে? আশেপাশে তো কোনও জনমনিষ্যি ছিল না।”
“আর তুমি সেটা এতক্ষণে বলছ বড়দি!” নীলুর বাবা বললেন একটু রেগেই, “তখনই থানায় যাওয়া উচিত ছিল। ওষুধপত্রও তো দিতে হয়, নাকি?”
“এইজন্যেই বলি না। তোরা অল্পেই এত অস্থির হয়ে উঠিস! বলছি তো তেমন কিছু হয়নি, গায়ে শালটা জড়ানো ছিল না? তাছাড়া এসে আমি মলম লাগিয়ে দিয়েছি, ও দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে। অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর থানায় গিয়ে কী হবে? দারোগাবাবু বলবেন, ‘ওসব জায়গায় যাওয়ার আপনার কী দরকার বড়দি? বয়স হয়ে গেছে, এসব ছেড়ে দিন। আর বলছিই তো এরকম চুরি হচ্ছে, আপনি এ নিয়ে আর মাথা ঘামাবেন না।’ এই শুনতে যাব? আজকাল উনি আর আমার কথা পাত্তাই দেন না দেখি।” বললেন পিসিমণি।
“তাহলে এখন কী করবে?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“কী আর করব? এতদিন যা করে এসেছি তাই করব! এসবের পেছনে কারা আছে দেখতে হবে না?”
নীলু খুশিতে পিসিমণিকে জড়িয়ে ধরল। “এই না হলে পিসিমণি!”
“কিন্তু এ ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে বড়দি। আজ না হয় অল্পর ওপর দিয়ে গেছে। কাল যদি আরও বেশী কিছু হয়?” নীলুর বাবা বললেন।
“সে কাল দেখব। কিন্তু তাই বলে ভয়ে বাড়িতে বসে থাকার পাত্রী নিভারানি বামনী নয়। আমার নীলুই বা কী ভাববে? বলবে ইট-পাটকেলের ভয়ে পিসিমণি শেষ অবধি হেরে গেলেন? বাছার আমার মন খারাপ হবে, না না, সে আমি সইতে পারব না।” পিসিমণির সাফ উত্তর।
নীলুর বাবা-মা হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে গেলেন। পিসিমণিও চুপ। কিছু ভাবছেন যে সে ভালোই বোঝা যাচ্ছে। নীলু দুয়েকবার জিজ্ঞেস করেও কোনও উত্তর পেল না। পিসিমণি এরকম করেন। মাঝে মাঝে একেবারে স্পিকটি নট হয়ে যান।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর নীলু যখন শুতে যাচ্ছে তখন পিসিমণি বললেন, “খাসনবিশ যতই বলুক, এ অন্য চুরির মতো ব্যাপার নয়, আরও কিছু আছে। নাহলে গঙ্গার ঘাটের ওখানেই আমাকে ইট ছুড়ল কেন? ওখানে তার মানে কি সত্যিই কিছু আছে? ও নীলু, আমি যেন সব দেখতে পেয়েও, সব বুঝতে পেরেও পারছি না। কিছু যেন ধরতে পারছি না। কী হল বল তো বাবা?”
“কিচ্ছু হয়নি পিসিমণি, এক্ষুনিই দেখবে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি জানি।” নীলু বলল।
একগাল হেসে পিসিমণি বললেন, “তোর জন্যেই হতে হবে। যা বাবা, তুই শুয়ে পড়, সারাদিন খেটেখুটে এলি।”


নীলুর ঘুম ভাঙল পাঁচটার সময়, সেও পিসিমণির ডাকাডাকিতে। “চটপট ওঠ বাবা, অনেক কাজ আছে, ওঠ ওঠ।”
নীলু ঘুম জাড়ানো চোখ খুলে তাকাল। আজ শনিবার। অফিস নেই, তাই সাধারণত একটু বেলা করেই ওঠে। তবে আজকের কথা আলাদা। পিসিমণির মুখ দেখে মনে হল সারারাত ঘুমোননি, যদিও চোখদুটো খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। তড়াক করে উঠে বসল নীলু।
“তোমাদের তো সবসময় একই কথা, ‘পিসিমণি আগে পুলিশের কাছে যান, কক্ষনও আমাদের বলেন না, বললে আমরাই দেখিয়ে দিতাম।’ এবার তোমাদের সুযোগ দিচ্ছি।” বললেন পিসিমণি, “এবার আগে খাসনবিশের কাছে যাবই না, কিছু বলবও না, যা করার একেবারে করে তারপর যাব, যাতে আর কিছু বলতে না পারে। আমার মুখ রেখো বাছা।”
“কী করতে হবে একবার শুধু বলো পিসিমণি, তারপর দেখো।” বলল নীলু।
“বেশ, বলব। কিন্তু তার আগে সম্বুদ্ধ আর সৌম্যকে ডাকো। দু-তিনজন না হলে হবে না, আর ও নীলু, গাড়ি চালিয়ে তুই নিয়ে যাবি কিন্তু বাবা।”
আধঘণ্টার মধ্যে সম্বুদ্ধ আর সৌম্য হাজির হয়ে গেল। পিসিমণি ডেকেছেন তাঁর কাজে সাহায্য করার জন্যে, এর থেকে বড়ো ব্যাপার ওদের কাছে আর কিছুই হতে পারে না। কী করতে হবে পিসিমণি তিনজনকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ওদের উত্তেজনা দেখে বলেছেন, “মাথাটি ঠাণ্ডা রেখো বাছা, উত্তেজনায় ভুলভাল কিছু করে বোসো না।”
ততক্ষণে নীলু গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করে ফেলেছে। পিসিমণি, সম্বুদ্ধ আর সৌম্য গাড়িতে চড়ে বসলেন। সম্বুদ্ধ সামনে নীলুর পাশে, আর সৌম্য পিসিমণির সঙ্গে পেছনে। নীলুর বাবা-মা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওঁরা কিছুই জানেন না। ওঁরা জানবেন সেই যখন পিসিমণি রহস্যভেদ করে ফিরে সবাইকে সব খোলসা করে বলবেন তখন। তবে একদিকে নিশ্চিন্ত যে নীলুরা অন্তত সঙ্গে আছে। বেশিরভাগ সময় তো পিসিমণি কাউকে সঙ্গেই নেন না।
যেতে যেতে নীলু বলল, “পিসিমণি, কী ভুলে গেলে বলো তো? মন্দিরে আসবে বলেছিলে, মালাও তো কিনে রেখেছ। নিয়ে আসতে ভুলে গেলে, নাহলে দিয়ে যেতে পারতে। মন্দির তো রাস্তাতেই পড়বে।”
“কিছুই ভুলিনি বাছা, সব মনে আছে, পরে আসব। এখন কাজের সময়। এখন অন্য কোনওদিকে মন দিতে পারব না। মা অবুঝ নন, ঠিকই বুঝবেন।” বললেন পিসিমণি।
পিসিমণির কথাতে নীলুরা হেসে উঠল।
গাড়ি এসে থামল একটা গলির মুখে। এই গলিতে একটু ঢুকেই কাকলিদের পুরুতমশায়ের বাড়ি। তখন ছ’টা বাজে প্রায়। গলিতে অল্প-স্বল্প লোক চলাচল রয়েছে। গলির মুখের চায়ের দোকানটা‍তে অবশ্য কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। পিসিমণিরা সোজা পুরুতমশায়ের বাড়ি গিয়ে দরজা ধাক্কালেন। পুরুতমশায়ের স্ত্রী  দরজা খুললেন, চোখমুখ সন্ত্রস্ত।
“তোমার স্বামী তো এখনও বোধহয় ফেরেনি ভাই, কোথায় আছে আমি খবর পেয়েছি, তাই সাতসকালেই দৌড়তে দৌড়তে এলাম। একটা মানুষ নিখোঁজ আর নিভারানি বামনী চুপচাপ বসে থাকবে, এ কখনও হয় নাকি?” পিসিমণি বললেন।
“কিন্তু আপনি, মানে আপনি কী করে খবর পাবেন?” পুরুতমশায়ের স্ত্রী আমতা আমতা করে বললেন।
“পিসিমণি খবর পাবেন না মানে? আপনি পিসিমণির কথা শোনেননি? জঙ্গিদের খবরাখবর অবধি পিসিমণি জানতে পেরে যান!” পেছন থেকে নীলু বলল।
“রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী এসব কথা বলা ভালো ভাই? দরজাটা ছাড়ো, ভেতরে গিয়ে বসে শান্তিতে কথা বলি, চলো।” পিসিমণি সিঁড়ির আরও এক ধাপ উঠে দরজার একদম সামনে চলে এলেন।
ততক্ষণে বাড়ির সামনে আরও দু-চারজন লোক জমা হয়েছে। ‘যাও, ভেতরে নিয়ে যাও। উনি কী খবর দেন শোনো।’ এরকম কথাও বলছে তারা। পুরুতমশায়ের স্ত্রীর আর বিশেষ কিছু করার উপায় রইল না। পিসিমণি তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল নীলু আর সৌম্য। সম্বুদ্ধ বাড়ির পেছন দিকে আছে।
“তোমার শ্বশুরমশাই আছেন তো বাড়িতে?” পিসিমণি জিজ্ঞেস করলেন।
“হ্যাঁ, উনি তো অসুস্থ, মানে শুয়েই আছেন।”
“অসুস্থ হওয়াই স্বাভাবিক। ছেলের জন্যে এই বয়সে যা চিন্তাভাবনা হচ্ছে। ওঁকে আর ডেকে এনে কাজ নেই, আমরা গিয়েই দুটো কথা বলে আসি। খুব দরকারি কথা, কোন ঘরে আছেন?”
“উনি, মানে উনি...” পুরুতমশায়ের স্ত্রী ইতস্তত করতে লাগলেন।
“থাক ভাই, তোমাকে কিছু বলতে হবে না, আমিই সব দেখেশুনে নিচ্ছি। আমার ছেলেরাও খুব কাজের।” পিসিমণি বললেন।
নীলুরা ততক্ষণে এ-ঘরে ও-ঘরে উঁকি মারতে শুরু করে দিয়েছে।
“এই তো এ-ঘরে রয়েছেন উনি। চলে এসো পিসিমণি।” সৌম্য চেঁচিয়ে উঠল।
নীলুরা ঘরে ঢুকে পড়তে পুরুতমশায়ের বৃদ্ধ বাবা একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। কিন্তু ওদের সঙ্গে পারবেন কেন? লোকজনের গলার আওয়াজ পেয়ে সবে পাকা গোঁফটা লাগাচ্ছিলেন, পাকা চুলের পরচুলাটা অবশ্য পরা হয়ে গেছিল, নীলুর এক টানে সেটাও খুলে গেল। বেচারা পুরুতমশাই, ধরা পড়ে মুখের যা অবস্থা হল! হাউমাউ করে উঠলেন একেবারে।
“এঁকে আমরা এখন নিয়ে চললাম ভাই। তুমি আবার রাতারাতি কোথাও চলে যাবার চেষ্টা কোরো না বা বুড়ি হয়ে যেও না। নিভারানি বামনী ওসবে ভোলে না।” পুরুতমশায়ের স্ত্রীকে বললেন পিসিমণি।
সম্বুদ্ধও চলে এসেছে। পিসিমণিই ওকে বাড়ির পেছনের দিকে দরজাটাতে নজর রাখতে বলেছিলেন। বলা যায় না পুরুতমশায়ের বাবার যদি ওদিক দিয়ে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে হয়!
স্তম্ভিত প্রতিবেশীদের সামনে দিয়ে পুরুতমশাইকে গাড়িতে ওঠানো হল। গাড়ি ছুটে চলল থানার দিকে। গাড়িতে উঠে পিসিমণি ধীরেসুস্থে খাসনবিশকে ফোন করলেন।
“আপনি এই সক্কাল সক্কাল থানায় আসছেন? বড়দি আপনার কী হয়েছে বলুন তো? এখন আবার কোথাও যেতে-ফেতে বললে কিন্তু আমি পারব না, আমার কাজ আছে।” ফোনের ওপাশ থেকে খাসনবিশের গলা ভেসে এল।
“না ভাই, আপনাকে কোত্থাও যেতে হবে না। আমিই আসছি আপনার কাছে। কত ব্যস্ত মানুষ আপনি। সময় পাচ্ছেন না, তাই আপনার কাজও করে দিলাম।” বললেন পিসিমণি।
নীলুরা মুখ টিপে হাসতে লাগল।
পুরুতমশাইকে দেখে খাসনবিশ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
“আপনি যে একেবারে বাক্যিহারা হয়ে গেলেন, ভাই?” খাসনবিশের অবস্থা দেখে পিসিমণি বললেন, “যে লোক নিজের বাড়িতে নিজের বাবা সেজে থাকে আর রটিয়ে দেওয়া হয় সে নিখোঁজ, সে যে গোলমেলে লোক এটা তো মানবেন? এবার আপনার কাজ আপনি করুন, আমার কাজ আমি।”
“আপনার আবার এখন কী কাজ বড়দি? চললেন কোথায়?” ক্ষীণ স্বরে খাসনবিশ জিজ্ঞেস করলেন।
“কাজ এখনও শেষ হয়নি, আরও কিছু দেখাশোনার বাকি আছে। যা ভাবছি তা যদি ঠিক হয়, তখন আপনাকে ডাকব। তখন কিন্তু ‘কোথাও যেতে-ফেতে পারব না বড়দি’ বললে চলবে না। আসি এখন? চল বাবা, তাড়াতাড়ি চল।” পিসিমণি চলে গেলেন।
গাড়ি এসে থামল কাকলিদের বাড়ির সামনে। দেবরূপ দরজা খুলে দিল। “কী ব্যাপার বড়দি, ভোর পাঁচটার সময়ে ফোন করলেন, কী ব্যাপার?”
“সব বলছি ভাই। আগে বোলো, আর কিছু হয়নি তো?” পিসিমণি জিজ্ঞেস করলেন।
“না না, আর কিচ্ছু হয়নি। আপনার কথামতো সিকিউরিটির ব্যবস্থা করেছি তো। দু’জন লোক সারারাত টহল দিয়েছে, আজকে সারাদিনের জন্যেও একজনকে রেখেছি।”
“খুব ভালো করেছ। এবার মেয়ের আমার ওই প্যাঁকপ্যাঁকটাকে নিয়ে এসো না ভাই।”
“রুমনির ওই হাঁসটা? ওর তো বিচ্ছিরি অবস্থা! সস মেখে-টেখে একসা। আপনি বললেন বলে রেখে দিয়েছি, পরিষ্কারও করা হয়নি।” কাকলি বলল। পিসিমণির গলার আওয়াজ পেয়ে সেও চলে এসেছে।
“হোক সস মাখা, দাও দেখি তুমি।” পিসিমণি একেবারে নাছোড়বান্দা।
দেবরূপ এনে দিল।
পিসিমণি সেটাকে হাতে নিয়ে ভালো করে উলটেপালটে দেখতে লাগলেন। হালকা হলুদ রঙের হাঁসের গলায় গোলাপি ফিতে বাঁধা। ঠিক তার নিচেই একপাশে একটা ফুটো। সেলাই খুলে গেছে। খুব বেশি বড়ো নয়, তবে ছোটো বাচ্চার হাত অনায়াসে ঢুকে যাবে। পিসিমণিও তার ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দিলেন। শুধু দেবরূপ-কাকলি নয়, নীলুরাও হাঁ করে পিসিমণির কাণ্ড দেখছে। পুরুতমশায়ের ব্যাপারটা নীলুরা জানত, আসার আগে পিসিমণিই বলেছলেন। কিন্তু এসব কিছুই জানত না। এমনকি পিসিমণি যে কাকলিদের বাড়িতে আসবেন সেটা অবধি না।
“ভেতরে কিছু আছে মনে হচ্ছে। ফুটোটাকে বড়ো করতেই হবে, আমার হাত নাহলে ঢুকবে না। কিছু মনে কোরো না ভাই, রুমনিকে আমি এরকম একটা হাঁস কিনে দেব।” পিসিমণি বললেন। সেলাই আরও একটু ছিঁড়েও ফেলেছেন।
“তাই ভাবি, এত তছনছ করা কীসের জন্যে! সে-জিনিস যে বাছা আমার এর ভেতরে এত যত্ন করে ঢুকিয়ে রেখেছেন তা কি আর বুঝেছে!”
পিসিমণি হাঁসের ভেতর থেকে বার করে এনেছেন আরও দুটো হাঁস। একটা মা হাঁস আরেকটা তার ছানা। দুটোই ছোটো ছোটো, ছানাটা তো খুবই ছোটো। দুটোর নিচেই চাকা লাগানো। তবে আসল ব্যাপার হচ্ছে দুটোই খাঁটি সোনার তৈরি। চোখে লাল পাথর চকচক করছে, গায়ে রংবাহারি মিনার কাজ।
“এ-দুটো কোত্থেকে এল?” দেবরূপ আর কাকলি একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল।
“কোত্থেকে এল তা আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। তবে সবকথা পরে জানতে পারব। সন্ধেবেলা বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসো, তখন মনে হয় সব বলতে পারব। দারোগাবাবুকে একটা ফোন করি।” পিসিমণি বটুয়া খুলে ফোন বার করলেন।
খাসনবিশের আজ বাক্যিহারা হওয়ারই দিন। “এ জিনিস এখানে!” চোখ কপালে তুলে বললেন তিনি, “কিছুদিন আগে চুরি গেছে এগুলো কোচবিহারের রাজবাড়ি থেকে। আরও কিছু জিনিসও। এ-দুটো নাকি কোন রাজকুমারীর ছোটোবেলার খেলনা ছিল, উপহারে পাওয়া। সব থানায় থানায় খবর এসেছিল, এই চক্রর লোকেরা নাকি সারা দেশে ছড়িয়ে আছে! জোর খানাতল্লাশি চলছে এদের জন্যে। এ যে আমাদের শহরেই রয়েছে তা তো ভাবিনি।”
“আমাদের শহরে তো ছিল না ভাই। সেকথা এখন থাক, আপনি বরং পুরুতের সাগরেদদের খুঁজে বার করুন দেখি। তারপর তারা কী বলে শুনলে বোঝা যাবে আমি যা ভেবেছি ঠিক কি না।” পিসিমণি বললেন।


সন্ধেবেলা নীলুদের বাড়ি লোকে লোকারণ্য। প্রতিবেশী যাঁরা আসেন তাঁরা তো এসেইছেন, নীলুর বন্ধুরাও আছে। তাছাড়া আছেন সুধাংশুবাবু, দেবরূপরা, খাসনবিশও এসেছেন আজ। এর মধ্যে পুরুতমশায়ের দুই সাগরেদও ধরা পড়েছে। খাসনবিশ একাজটা খুব তাড়াতাড়ি করেছেন। না করে অবশ্য উপায় ছিল না, বেশিরভাগটা তো পিসিমণিই করে দিয়েছেন।
সকাল থেকে সন্ধের মধ্যে পিসিমণিকে বেশ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। থানাতেই তো গেলেন দু’বার। তারপর নীলুকে নিয়ে সারা শহর চষে রুমনির জন্যে একটা হাঁস কিনলেন। এটা আগেরটার থেকেও একটু বড়ো। শুধু কী তাই? দুই ভাইবোনের জন্যে খেলনা কিনলেন, আবার মন্দিরে গিয়ে ফুল, মালা দিয়ে পুজোও দিয়ে এসেছেন। তারপর আবার বাড়ি ফিরে সবার জন্যে মাংসর ঘুগনি রান্না করেছেন।
থানা থেকে যখন চলে আসছিলেন খাসনবিশ তখন মাথা চুলকে বলেছেন, “অনেক কিছুই বুঝতে পারছি এখন বড়দি। তবে দু-চারটে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যদি বলেন তাহলে সন্ধেবেলা আমিও যাই আপনার ওখানে।”
“নিশ্চয়ই আসবেন ভাই। ঘুগনিও খেয়ে যাবেন। নীলুটা আমার বড্ড ভালোবাসে তো, তাই আজ করব।” পিসিমণির উত্তর।
“প্রথম থেকেই বলতে শুরু করি।” গুছিয়ে বসে পিসিমণি বলতে শুরু করলেন, “বুধবার বিকেলে রুমা বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে গেল হালিশহরের গঙ্গার ঘাটে। ফেরার সময় ছেলে বায়না করে সরস্বতী ঠাকুরের মুর্তি তুলে নিয়ে এল। সেই রাতেই কাকলিদের বাড়ির বারান্দার গেটের তালা কেউ ভাঙল। বৃহস্পতিবার সকালে সুধাংশুবাবু এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। জানালার ঠিক নিচেই সরস্বতীর মূর্তি ছিল। ও-জানালার গ্রিল যদি ভাঙতে হয় তাহলে কি আগে মূর্তিটা সরিয়ে রাখবে না? আমার কীরকম খটকা লেগেছিল। দারোগাবাবু অবশ্য বললেন আজকাল আবার চুরি শুরু হয়েছে, এও চেষ্টা করেছিল, পারেনি কোনও কারণে। আমিও দারোগাবাবুর কথাই মেনে নিয়েছিলাম। কাকলি তো আবার অন্য কথা বলল। বলল, এ নাকি খুব অকল্যাণের কথা, পুরুতমশায়ের কাছে বিধান নিতে যেতে হবে। বলি ভাই, তোমরা একালের মেয়ে, লেখাপড়া শিখেছ, চাকরিবাকরি করছ, এসব আবোলতাবোল কুসংস্কারে এত বিশ্বাস কেন? কল্যাণ, অকল্যাণ করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পুরুতমশায়ের কাছে ছুটলে! তা তিনিও যজ্ঞের বিধান দিলেন। সেদিন সন্ধেয় ওই যজ্ঞর ধুম দেখে কিন্তু কেন জানি না আমার মনে হয়েছিল যে এবার কিছু একটা হবে। কিন্তু না তোমরা, না দারোগাবাবু–কেউ আমার কথা কানেই নিলে না।”
খাসনবিশ মাথা-টাথা চুলকে মন দিয়ে ঘুগনি খেতে লাগলেন। পিসিমণি আড়চোখে সেদিকে দেখে বললেন, “হালিশহরের গঙ্গার ঘাটে যেখানে মূর্তিগুলো রাখা থাকে সেখানেও গেলাম। ঘাটের কাছাকাছি যখন এসেছি সাইকেলে করে একটা লোক পাশ দিয়েই গেল। মুখটা খেয়াল করিনি, কিন্তু আসল জিনিসটা করেছিলাম। লোকটার ডান পায়ে ছ’টা আঙুল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আর কার যেন দেখেছি না এর মধ্যে ডান পায়ে ছ’টা আঙুল? মনে পড়ে গেল, পুরুতমশায়ের একজন সহকারীর। এদিকে পুরুতমশাই তো নিখোঁজ। দারোগাবাবু সেরকমই বলেছিলেন। ঘুরে ঘুরে মূর্তিগুলো দেখছিলাম, হঠাৎ কে ইট ছুড়ল, কাঁধে এসে লাগল। নিজের মনেই বললাম, নিভারানি বামনী তুমি ঠিক জায়গায় এসেছ, নাহলে এখানে কেউ তোমাকে ইট ছুড়ত না।”
“ছোঁড়াটা কী বলল জানেন?” খাসনবিশ বললেন, “বলল, ‘একটুর জন্যে মিস হয়ে গেছিল, নাহলে বুড়ির মাথাটা একেবারে ফেটে যেত। এত ওস্তাদি আর করতে হত না।”
“ও নীলু, আমি তো ঠিক কথাই বলেছিলাম বাবা। কাজকর্মও বাজে, হাতের টিপও এত বাজে! তবে সত্যি কথাই বলব, তখনও সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনি। রাতে ধীরেসুস্থে ভাবতে ভাবতে সব পরিষ্কার হল। পুরুতমশাই নিখোঁজ সেকথা অনেকেই জেনে গেছিল। যতীনের কাছে গেছিলাম জবা ফুলের মালা কিনতে। সে বলল, ‘পুরুতডা এক্কেরে বাজে লোক। আমাদের গেরামেরই কি না। নিজের বাপের কাছ থেকে জোরজবরদস্তি কইরা সব আদায় করছে। বাপেরে দেখতও না। বুড়া বাপ এ মাইয়া ও মাইয়ার দোরে ঘুইরা বেড়াইত। একখান পোলা, কত আশা ছিল, সেই এই করল! বুড়া মরলে গেরামে গিয়ে কোনোরকমে ছেরাদ্দ করল। এহেনে কাউরে কয়ও নাই যে বাপ মরছে। আপনেরে সব কইলাম বড়দি, আপনে নিজের মতো ভাইব্যা কথা কন।’
“তখন আমি অত খেয়াল করিনি। পরে মনে পড়ল, তবে যে দারোগাবাবু বলছিলেন পুরুতমশায়ের বাড়িতে তার বাবাও আছেন? পুরুতমশাইই বাবা সেজে নেই তো? আর বাকি কাজ? সে তো করেছে আমার বাছা।” পিসিমণি রুমনিকে কোলে বসিয়ে আদর করে বললেন, “কত বড়ো কাজ যে করেছে তা কেউ ভাবতেও পারবে না। দারোগাবাবু, আপনি বলুন না, সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তিতে কীভাবে কী রাখা ছিল, বলেছে তো ওরা।”
“বলবে না মানে? না বললে ছাড়ব নাকি?” খাসনবিশ একেবারে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “কোচবিহারের রাজবাড়িতে চুরিটা হওয়ার পরেই জোর ধরপাকড় শুরু হয়। সব থানায় থানায় খবর যায়, এরা যে কোথায় না কোথায় ছড়িয়ে আছে! কয়েকটা জিনিস পাওয়াও গেছে। যা পাওয়া যায়নি তার মধ্যে ছিল সোনার এই হাঁসদুটো। সে দুটো নিরাপদ স্থানে পাঠানো হয়, হাত ঘুরতে ঘুরতে হালিশহরে এসে পৌঁছয়। সেখানে এই দু’জন, মানে পুরুতমশায়ের সহযোগীর ওপর ভার পড়েছিল সে দুটোকে রাখার। সবকিছু শান্ত হলেই আবার যথাস্থানে পাচার করে দিত, হয়তো দেশের বাইরেই। কিন্তু হালিশহরের পুলিশের চোখ এদের দু’জনের ওপর ছিল। এদের ডেরা খানাতল্লাশিও করে কিন্তু কিছুই পায়নি। পাবে কী করে? এরা অস্থায়ী ডেরা বেঁধেছিল ওই ঘাটে। এদিকে সবসময় তো আর হাঁস সঙ্গে করে ঘোরা যায় না বা পালালেও পুলিশের আরও সন্দেহ পড়বে। ওরা ভাবছিল ক’দিনের ব্যাপার, তারপরেই জিনিস যথাস্থানে চলে যাবে, তাই বেশিরভাগ সময়েই ওই ছোটো সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তিতে একটা কাপড়ে মুড়ে হাঁসদুটো রাখত। সরস্বতী আর হাঁসের মাঝখানটায় ঠিক। কাপড়টাও একটা শাড়ির ছেঁড়া অংশ, কোনও মূর্তি থেকেই নিয়েছে। ওই ঘাটে একেবারেই লোকজন আসে না, এখন কোনও পুজোও নেই। আসার কথা পুরসভার লোকেদের, ঠাকুর তুলে নিয়ে যেতে। তা সে তো তারা বড়ো গাড়ি নিয়ে আসবে আর ওরা খেয়ালও রাখে। একবারই বোধহয় কেউ নেই দেখে একটু এদিক ওদিক গেছিল, ঠিক তখনই আমাদের রুবান আর রুমনি সেখানে যায় আর রুবান বায়না করে ওই মূর্তিটাই নিয়ে আসে। ওটাই বোধহয় ভালো অবস্থায় ছিল। টোটো যখন চলতে শুরু করে দিয়েছে, তখন এদের খেয়াল হল। তবে ঘাবড়ায়নি, টোটোটাকে ফলো করে বাড়ি দেখে নিয়েছিল। সুবিধেই ছিল, মূর্তিটা বারান্দায় ছিল, রাতে এসে গ্রিলের গেটের তালা ভেঙে বারান্দায় ঢুকল। কিন্তু সে জিনিস তখন ওখানে নেই। মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করল, কিন্তু পেল না।”
“কিন্তু সে রাতেই ওরা বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি কেন?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“বোধহয় তৈরি ছিল না বা কোনও আওয়াজে ভয় পেয়ে পালিয়েও যেতে পারে।” খাসনবিশ উত্তর দিলেন।
“সরস্বতীর মূর্তি দেখলে যে আমার ছেলের কী হয়! পুজোর একদিন আগে বাজারে গেছি, অনেকেই মূর্তি কিনে নিয়ে যাচ্ছে দেখে ছেলের কী বায়না মূর্তি কেনার! শেষে যে এই কাণ্ড করবে ভাবতে পারিনি।” দেবরূপ বলল, “কিন্তু পুরুতমশায়ের সঙ্গে এদের যোগাযোগ কী করে হল?”
“এও বুঝলে না ভাই? কাকলি নিশ্চয়ই মূর্তি আনা থেকেই অকল্যাণ অকল্যাণ করে চেঁচামেচি করছিল।” পিসিমণি উত্তর দিলেন, “ওরা কী শোনেনি ভেবেছ? না পেয়ে সিঁড়ির ওপর ফুল, সিঁদুর এসব ফেলে গেছে ভয় পাওয়ানোর জন্যে। সকাল থেকেও তোমাদের ওপর নজর রাখছিল। কাকলি পুরুতমশায়ের কাছে গেছে দেখেছে। পুরুতমশাইকে কবজা করতে আর কতক্ষণ? যা লোভী লোক, কিছু টাকা দিলেই হয়ে যাবে। ওই নিখোঁজের নাটকও মনে হয় ওদের মাথা থেকেই এসেছে। কারণ, পুরুতমশাইকে না ধরতে পারলে এদেরও ধার যাবে না। এরা তো এখানকার লোকই নয়! টাকাপয়সা, কাকলির গয়না এসব নিয়েছে লোভে পড়ে, আসল উদ্দেশ্য অন্য ছিল। কিন্তু এতকিছু করেও হাঁস পাওয়া গেল না। পাবে কী করে? কোন ফাঁকে মেয়ে আমার তাদেরকে সরিয়ে ফেলেছে সে তো কেউ জানে না। নিয়ে লুকিয়েও ফেলেছে!”
“খেলনাপাতি নিয়ে সবসময় দাদার সঙ্গে লাগছে। রুমু তাই নতুন কিছু পেলেই লুকিয়ে রাখে। সেদিন আমার একটা নতুন পেন অবধি লুকিয়ে রেখেছিল।” বলল কাকলি।
“আর এ তো সুন্দর খেলনা। দেখে তো পছন্দ হবেই ভাই। আমি প্রথম যেদিন তোমাদের বাড়ি যাই সেদিন দেখেছিলাম রুমনি হাঁসটাকে নিয়ে ঘরের এককোণে গিয়ে মন দিয়ে কী যেন দেখছে। আর সেদিন তো কাঁদতে কাঁদতে কত কিছু বলছিল। আমি ভেবেছিলাম হাঁসটা না পেয়ে ওরকম করছে। পরে ভেবে দেখলাম শুধু যে ওই হাঁসটার কথা বলছে তা কিন্তু নয়। একবার বলল অনেক প্যাঁকপ্যাঁক, একবার বলল ছোতো ছোতো প্যাঁকপ্যাঁক। অথচ হাঁসটা তো বেশ বড়ো, আর কোনও ছোটো হাঁস দেখিওনি ওর খেলনার মধ্যে। সব যা ছত্রাকার হয়ে পড়ে ছিল আর বাছা বড়ো কাঁদছিলও, তাই ওদের খেলনাগুলো নিয়ে আমিই ভোলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনও প্যাঁকপ্যাঁক তো ছিল না, বেচারার মন ভালো হয় কী করে? মন বলল নিশ্চয়ই ওই প্যাঁকপ্যাঁকের মধ্যে কিছু আছে। তাই অত সক্কাল সক্কাল তোমাদের ফোন করেছিলাম।”
“আশ্চর্য, ওরা সব জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করল আর রুমুর হাঁসটাই দেখেনি!” বলল দেবরূপ।
“ওরা কি ভাবতেও পেরেছে ভাই যে ও-জিনিস ওখানে থাকবে? তোমরাও কী পেরেছে? বাছা আমার খুব কাজের কাজ করেছে। এই নাও তোমার প্যাঁকপ্যাঁক আর এই খেলনাগুলোও সব তোমাদের। রুবান, বোন তো ছোটো বাবা, বোনের সঙ্গে মিলেমিশে খেলিস। খেলবি তো? লক্ষ্মী সোনা আমার।” পিসিমণি দু’জনকে আদর করে বললেন।
“এত কাণ্ড এই পুঁচকে ছেলেমেয়েদুটোর জন্যে! একজন সরস্বতীর মূর্তি তুলে নিয়ে এলেন, আরেকজন হাঁস লুকিয়ে ফেললেন! বাব্বা!” সুধাংশুবাবু বললেন।
“মা সরস্বতীর ইচ্ছে এদের দিয়ে একাজ করাবেন, আপনি আমি কী করব ভাই?” পিসিমণি বললেন।
“যাক, সব মিটল অবশেষে আর এটাও বোঝা গেল বড়দির কী ক্ষমতা, কী পারেন আর কী না পারেন। এ শহরে কোথাও কিছু হলে যে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন না তাও আবার জানা গেল।” নীলুর বাবা বললেন। কটাক্ষটা কার উদ্দেশ্যে সে ভালোই বোঝা গেল।
খাসনবিশ মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, “আসলে এত কাজের চাপ থাকে, চারদিকে এতকিছু ঘটছে যে মাথার ঠিক থাকে না একেক সময়।”
“না ভাই, ওইটাই তো আসল। সবসময় মাথা ঠাণ্ডা রাখা, মাথা ঠিক রাখা। না হলেই তো গোলমাল। আপনি থানার দারোগাবাবু। কত দায়িত্ব আপনার কাঁধে আর আপনি এটাই জানেন না? পোড়া কপাল আমার!” বললেন পিসিমণি।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

1 comment:

  1. খুব সুন্দর লেখা। পড়ে ভালো লাগলো।

    ReplyDelete