গল্পঃ মুশকিল আসান গজুমামাঃ তাপস মৌলিক




শিলিগুড়ির অঞ্জুমাসির মেয়ে নূপুরদির বিয়ে। মামাবাড়ির সবাই মিলে দল বেঁধে যাওয়া হবে। দাদু, দিদা আর গজুমামাও তাই দিল্লি থেকে কলকাতায় চলে এসেছে আমাদের বাড়ি। কামরূপ এক্সপ্রেসে যাওয়া-আসার টিকিট কাটা হয়েছে সবার একই কামরায়, হই হই করতে করতে যাব সবাই। যাবার দু’দিন আগে কালনা থেকে বড়োমাসি গজুমামাকে ফোন করে বলল, “কতদিন তো আসিস না এখানে! সেই যে বুবুর পৈতের সময় এসেছিলি, তারপর আর আসিসনি। কাল চলে আয় না! পরশু তো যাওয়া, এখান থেকে আমাদের সঙ্গেই কামরূপে উঠে পড়বি।”
গজুমামা বলল, “খেজুরগাছ কাটানো হয়েছে? হাঁড়ি বাঁধা হয়েছে?”
“হবে না কেন? বরাবরই তো হয়! এখন তো রসেরই সময়। সকালবেলা জিরেন কাঠের টাটকা খেজুর-রস পাবি, নলেন গুড়ের পায়েস, মাখা সন্দেশ, রসি গুড়...”
“ব্যস ব্যস, আর বলতে হবে না, কাল সকালেই আসছি।” বড়োমাসিকে থামিয়ে দিয়ে বলল গজুমামা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলল, “কী ভাগনে! বিয়েবাড়ির ভোজের আগে নেট প্র্যাকটিস হবে নাকি একটু?”
আমি তো একপায়ে খাড়া। বললাম, “ব্যাগ গোছানো আছে আমার। তোমরা এলে সময় পাই কি না পাই, তাই আগেই গুছিয়ে রেখেছি।”
অতএব পরদিন সকালে হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকাল ধরে অম্বিকা কালনা স্টেশনে নামলাম দু’জন। মাসির বাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় বারোটা। পৌঁছে দেখি হুলুস্থুলু কাণ্ড! লালজি, অর্থাৎ মেসোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও!
মেসোর ভালো নাম ললিতমোহন চক্রবর্তী। পরিচিত ছোটোবড়ো সবাই তাঁকে লালজি বলেই ডাকে। গজুমামার তিনি জামাইবাবু, আমার মেসো। ওদিকে গজুমামাও লালজি বলছে, আমিও তাই। মুশকিল হল লালজির বয়স হয়েছে, ছেষট্টি-সাতষট্টি বছর বয়স তার, আর বয়সের সঙ্গে বাসা বেঁধেছে বিতিকিচ্ছিরি এক রোগーঅ্যালঝাইমার্স। মাঝে মাঝেই তিনি নিজের নামধাম, কোথায় আছেন সেসব বেমালুম ভুলে যান আর তাইতেই হয় বিপত্তি। রোজ ভোরবেলা হাঁটতে বেরোন লালজি, তারপর ফেরার সময় একেক দিন বাড়ির রাস্তাই ভুলে যান। ডাক্তারবাবু এবং বাড়ির সবাই তাঁকে একা একা রাস্তায় বেরোতে বারণ করেছে, কিন্তু কে শোনে কার কথা! মর্নিং ওয়াকে তাঁকে যেতেই হবে!
আজও ভোরবেলা সাড়ে ছ’টা নাগাদ হাঁটতে বেরিয়েছিলেন লালজি। সাধারণত আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যেই রোজ ফিরে আসেন। দুপুর বারোটা বাজতে চলল এখন, অথচ ফেরার নাম নেই তাঁর। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির সবাই চিন্তায়। মাসতুতো দাদা বুবু সাইকেল নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে বাবাকে। বড়োমাসি ঘর-বার করছে। আমরা পৌঁছোতেই বলল, “আয়। দ্যাখ না, তোদের লালজি মাঝে মাঝে এমন বিপদে ফেলে! কতবার বলেছি, রাস্তায় হাঁটতে যাবার দরকারটা কী? বাড়ির মধ্যেই হাঁটো না যত খুশি, সামনে উঠোন পেছনে এত বড়ো বাগান রয়েছে। আমার কথা শুনলে তো! নামধাম সব গুলিয়ে যায়, ওদিকে বুদ্ধিটা কিন্তু টনকো আছে এখনও! সেদিন বাড়ির রাস্তা ভুলে গিয়ে বুদ্ধি করে একটা রিকশায় উঠে বসেছিল। তারপর রিকশাওয়ালাকে বলে, ‘বীরহাটা কালীবাড়ি চলো।’ রিকশাওয়ালা তো অবাক! সে আবার কোন জায়গা? লালজি বলে, ‘সে কী গো! বর্ধমানে রিকশা চালাচ্ছ আর বীরহাটা কালীবাড়ি চেন না! এই তো জি.টি. রোড ধরে কার্জন গেট পাশে রেখে কিছুটা এগোলেই বীরহাটা!’ তখন রিকশাওয়ালা বলে, ‘বাবু, এটা বর্ধমান কোথায়! এ তো কালনা!’ বোঝো অবস্থা! আরেকদিনও এরকম রিকশা ধরে বলেছিল, ‘দেশবন্ধু পাড়া যাব।’ রিকশাওয়ালা চেনে না বলায় কী হম্বিতম্বি! ‘ক’দিন রিকশা চালাচ্ছ শিলিগুড়িতে যে দেশবন্ধু পাড়া চেন না?’ ভাগ্যি ভালো, দু’দিনই রিকশাওয়ালা দু’জন ভালো ছিল। বুঝতে পেরে ঘুরে ঘুরে একে-তাকে জিজ্ঞেস করে ঠিক বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। আসলে কোথায় আছে গুলিয়ে যায় মাঝে মাঝে। আজ আবার কী হল কে জানে!”
লালজি কর্মজীবনে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার ছিলেন। চাকরি-সূত্রে বাংলার নানা মফস্বল শহরে থেকেছেন। বর্ধমান আর শিলিগুড়িতেও ছিলেন বেশ কিছুদিন করে। বুঝলাম, স্মৃতির সেসব শহর আর বর্তমানের কালনা, সব মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।
বসার ঘরের সোফায় বসতে বসতে গজুমামা বলল, “লালজির বুকপকেটে সবসময় নামঠিকানা লেখা একটা কার্ড রাখা উচিত।”
“থাকে তো!” বড়োমাসি বলে, “সেকথাও যে ভুলে যায়! নে নে, তোরা হাতমুখ ধুয়ে চা-জলখাবার খেয়ে নে একটু। দুপুরের খাওয়ার দেরি আছে। দ্যাখ, কতক্ষণে ফেরে তোদের লালজি!”
এমন সময় দোতলা থেকে মাসতুতো দিদি বাবলিদির গলা পাওয়া গেল, “ও মা! বাবা তো মাছ ধরার ছিপ-টিপ নিয়ে বেরিয়েছে! বুবু খুঁজে পাবে কী করে!”
“অ্যাঁ!! সে কী রে! কী করে বুঝলি?”
“এই তো বারান্দার এই কোনায় ছিপগুলো রাখা থাকে। একটাও নেই! কাল-পরশু চার বানিয়ে এখানেই একটা কৌটোয় রেখেছিল বাবা, সেটাও দেখছি না। নিশ্চয়ই মাছ ধরতে গেছে আবার! শহরে ওকে খুঁজেই পাবে না বুবু।”
“বোঝো কাণ্ড! এই মাছ ধরার নেশা যে কী নেশা! উফ্‌, আর পারি না আমি!” হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেয় বসে পড়ল বড়োমাসি। “তাও যদি ধরে-টরে মাছগুলো বাড়ি নিয়ে আসত তো বুঝতাম, খাওয়া যেত সবাই মিলে। সে তো আনবে না! ধরে, আবার বঁড়শি ছাড়িয়ে ছেড়ে দেয় জলে!”
সত্যি! লালজির এই আরেক বহুদিনের নেশা। মাছ ধরার নেশা। চাকরি-জীবনেও ছুটির দিন হলেই ছিপ-টিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন সকাল সকাল, চলে যেতেন গ্রামে-গঞ্জে কোনও দিঘি বা বিলের ধারে। কখনও সঙ্গে বন্ধুবান্ধব থাকত, কখনও একাই। সারাদিন ছিপ ফেলে বসে মাছ ধরা-ধরা খেলার পর সন্ধেবেলা ফিরতেন বাড়ি। খেলাই বটে, কেননা লালজি মাছ ধরেন ধরার নেশাতেই, খাওয়ার জন্য নয়। ছিপে মাছ উঠলে বঁড়শি ছাড়িয়ে সে-মাছ ফের ছেড়ে দেন জলে। তারপর আবার ছিপ ফেলেন।
অ্যালঝাইমার্স ধরা পড়ার পর লালজির এই মাছ ধরা অভিযানেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছেーগ্রাম-গঞ্জে দিঘিতে-পুকুরে মাছ ধরতে বসে যদি বাড়ির কথা ভুলে যান! শহরের মধ্যে তবুও লালজিকে চেনে অনেকেই। ছোটো মহকুমা শহর কালনা, ওতে রাস্তা ভুলে ঘুরে বেড়ালেও খুঁজে বার করা তেমন অসম্ভব নয়। কিন্তু শহরের বাইরে গাঁ-গেরামে নাম-ধাম-ঠিকানা ভুলে গেলে তো আরও বিপদ! সেখানে কে চিনবে লালজিকে? কেই বা ফিরিয়ে আনবে বাড়িতে?
কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা লালজি গ্রাহ্যই করেন না, ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না। বড়োমাসি জানতে পারলে বাড়ি মাথায় করবে, তাই মাসিকে লুকিয়ে প্রায়ই চুপি চুপি বেরিয়ে যান মাছ ধরতে, হয় ঠিক দুপুরবেলা যখন মাসির দিবানিদ্রার সময়, কিংবা কাকভোরে কেউ টের পাওয়ার আগে। ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধে। এখন অবধি অবশ্য বিপদ-আপদ হয়নি কোনও, কিন্তু হতে কতক্ষণ!
ঘণ্টা খানেক পরে বুবুদা ফিরল। যথারীতি শহরের রাস্তায় লালজিকে খুঁজে পায়নি কোথাও। বাড়ি ঢুকে সব শুনে খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “মাছ ধরতে গেলে বাবার ফেরার সময় হয়নি, বিকেলের আগে ফিরবে না। বেকার খোঁজাখুঁজি করে লাভ নেই এখন, দেখা যাক।”
“খুঁজবিই বা কোথায়! ঠাকুরের নাম করা ছাড়া গতি নেই আমার, জয় মা সিদ্ধেশ্বরী!” ভক্তিভরে দু’হাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে বলে বড়োমাসি, “নে, তোরা সব স্নান-টান সেরে আয় একে একে, রান্নাবান্না হয়ে গেছে আমার, লালজির জন্য বসে থেকে লাভ নেই। সকাল থেকে কিছু খেল কি না মানুষটা কে জানে।”
এ কথায় ভারি অবাক হয়ে ভুরুদুটো যথাসম্ভব ওপরে তুলে গজুমামা বলল, “স্নান! শীতকালে কেউ স্নান করে নাকি! নিমোনিয়া হবে যে!”
“খাটাশ কোথাকার! এত বয়স হল এখনও সেই হতচ্ছাড়াই রয়ে গেলি! যা, স্নানে যা বলছি!” চোখ পাকিয়ে গজুমামার দিকে একটা তোয়ালে ছুড়ে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল বড়োমাসি।
সজনে ফুলের বড়া, সোনামুগের ডালের সঙ্গে ফুলকপি ভাজা, পালং শাকের তরকারি, বাঁধাকপি ঘণ্ট আর কেচকি মাছের ছেঁচকি দিয়ে একথালা ভাত খাওয়ার পর বাটিভর্তি নলেন গুড়ের পায়েস। গলা অবধি খেয়ে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে ঢেঁকুর তুলে গজুমামা বলল, “এ খাওয়া হজম করতে একটু হাঁটাহাঁটি দরকার। চল ভাগনে, গঙ্গার ধার থেকে ঘুরে আসি।”
গঙ্গার ধারে কিছুক্ষণ কাটানোর পর মামা বলে, “চল, একশো আট শিবমন্দিরটাও দেখে আসি, অনেকদিন যাইনি। কাল সময় পাওয়া যাবে কি না কে জানে। সন্ধেবেলাই তো ট্রেন।”
বিখ্যাত একশো আট শিবমন্দিরের পাশেই রাজবাড়ি চত্বরে রয়েছে আরও কিছু প্রাচীন মন্দির। রাসমঞ্চের পাশে প্রতাপেশ্বর মন্দিরের অসাধারণ টেরাকোটার কারুকাজ দেখতে দেখতে খেয়াল হল বেলা পড়ে এসেছে। শীতকালের দিন, তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়।
গজুমামা বলল, “চল ভাগনে, বাড়ি যাই। এতক্ষণে লালজি নিশ্চয়ই চলে এসেছে।”
বাড়ি ঢোকার আগেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে পড়ল। মাসির বাড়ির দোতলার টানা বারান্দাটা রাস্তা থেকেই দেখা যায়। দেখি আলো জ্বলছে বারান্দায়, একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড়োমাসি। লালজি ফেরেননি এখনও। বুবুদা ফের সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে খোঁজাখুঁজি করতে। বাবলিদির গানের ক্লাস ছিল, যায়নি, ঘরেই বসে আছে চুপ করে। মাসিও চুপচাপ হয়ে গেছে চিন্তায়।
দেখেশুনে গজুমামা বলল, “চল ভাগনে, তাঁতিপাড়ার ভেতর দিয়ে দিঘির ধার হয়ে লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে আসাম রোডের দিকটা খুঁজে আসি আমরা। বড়দি তুমি চিন্তা কোরো না। এক্ষুনি এসে পড়বে লালজি।”
আসাম রোড অবধি যেতে যেতে বেশ কয়েকজনকে লালজির বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম আমরা, কেউই কোনও খোঁজ দিতে পারল না। বাড়ি যখন ফিরলাম তখন রাত আটটা। দেখি বুবুদাও কোনও হদিশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছে। মাসি ঠাকুরঘরে দরজা বন্ধ করে পুজোয় বসেছে।
গজুমামা বলল, “নাহ্, বুবু চল, থানায় একটা খবর দিয়ে আসা দরকার। লালজির একটা ছবি নিয়ে নে সঙ্গে।”
আমি আর গজুমামা একটা রিকশা ধরে চললাম থানার দিকে, আগে আগে সাইকেলে বুবুদা। মিসিং ডায়রি করা হল একটা। পুলিশের বড়োবাবু বললেন, “এখন এই রাত্রিবেলা কোথায় আর খুঁজব! হাসপাতাল আর নার্সিং হোমগুলোয় খোঁজ নিচ্ছি কোনও অ্যাক্সিডেন্ট কেস এসেছে কি না। তারপর কাল সকালে দেখা যাবে। আপনারাও যদি কোনও খোঁজ পান জানাবেন।”
ফেরার সময় রিকশা যখন চকবাজারের অম্বিকা সুইটস পেরোচ্ছে, গজুমামা বলে, “ভাগনে, কালনার বিখ্যাত নলেন গুড়ের মাখা সন্দেশ! রিকশা থামাতে বলি?”
কী অসভ্য! বাড়ির এই অবস্থা, আর মামার এখন সন্দেশ খাওয়ার নোলা চেগেছে! কটমট করে চোখ পাকিয়ে এমন তাকালাম, গজুমামা ঝটপট কান ধরে বলল, “সরি সরি, ভুল হয়ে গেছে, এই কান ধরছি। সন্দেশ খাওয়ার সময় নয় এটা। লালজি ফিরুক, তারপর সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া যাবে।”
রাত্রে দাঁতে কুটোটিও কাটল না মাসি। ফোনে ফোনে খবর ছড়িয়ে পড়েছে, আত্মীয়স্বজন ফোন করে খবর নিচ্ছে লালজির। মাসি ছলো ছলো চোখে কাঁদো কাঁদো গলায় ফোন ধরে যাচ্ছে একের পর এক। বাবলিদিও ফোঁৎ ফোঁৎ করে কান্না শুরু করেছে, বলল খিদে নেই। বাড়ির রান্নার লোক শচীমাসি গজুমামা, বুবুদা আর আমায় দুধভাত মেখে দিল। খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি রসি গুড়ের সঙ্গে সেই দুধভাত খেয়ে আমি আর গজুমামা উঠে এলাম দোতলায়।
বড়োমাসি, বাবলিদি আর বুবুদা নিচে একতলাতেই থাকে। দোতলার চারটে ঘরের একটা লালজির, আরেকটায় বাবলিদি রোজ তানপুরা নিয়ে রেওয়াজ করে। বাকি দুটো ঘর বন্ধই থাকে। তার একটায় আজ আমাদের শোবার ব্যবস্থা। দোতলায় উঠে দেখি বারান্দার গ্রিল ধরে বড়োমাসি দাঁড়িয়ে আছে একা, রাস্তার দিকে চেয়ে। হাঁটুর ব্যথার জন্য এমনিতে দোতলায় খুব একটা ওঠে না বড়োমাসি, অথচ আজ সন্ধে থেকে বারবার এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে রাস্তাটা দেখা যায় কিনা!
গজুমামা নিচে গিয়ে থানায় আরেকবার খোঁজ নিল ফোন করে, কোনও খবর নেই। ওপরে এসে ঘর থেকে বারান্দায় দুটো টুল বার করে বলল, “বোসো বড়দি, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? থানায় খবর দেওয়া হয়েছে, ওরা ঠিক খুঁজে বার করবে লালজিকে।”
বড়োমাসি বসল না, কোনও কথাও বলল না, একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল গ্রিল ধরে।
বুবুদা নিচে শুয়ে পড়েছে। সারাদিন অনেক দৌড়ঝাঁপ গেছে ওর। বাবলিদি কী করছে কে জানে। গজুমামা একটা চাদর মুড়ি দিয়ে গুছিয়ে বসল একটা টুলে। আমিও ঘর থেকে একটা মোড়া বার করে বসলাম গজুমামার পাশে। হাঁটাহাঁটি আমারও সারাদিনে কম হয়নি। একটু পরেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। বড়োমাসি আর গজুমামা মনে হয় সারারাত এভাবেই কাটিয়ে দেবে আজ। ঘুম তাড়াতে উঠে চোখেমুখে জল দিতে গিয়ে দেখি রাত একটা বাজে। ফের এসে বসলাম মোড়ায়। কিছুক্ষণ অতিকষ্টে চোখ খোলা রাখার পর হঠাৎ গজুমামার ঠেলায় চটকা ভাঙল। “বসে বসে ঢুলছিস তো! পড়ে যাবি যে! যা, শুয়ে পড় গিয়ে। অনেক রাত হয়েছে।”
ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে শুনছিলাম বারান্দায় মাসি আর গজুমামা নিচু স্বরে গুনগুন করে কথা বলে চলেছে।
পরদিন ঘুম ভাঙতে দেখি বেশ বেলা হয়ে গেছে। শীতের নরম রোদে ঝকঝক করছে বাইরের গাছপালা। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে বসার ঘরে ঢুকে দেখি গজুমামা সোফায় আধশোয়া, বড়োমাসি ঠাণ্ডা মেঝেতে থেবড়ে বসে, চুল-টুল আলুথালু, চোখদুটো রক্তজবার মতো লালーরাত জেগে না কান্নাকাটি করে কে জানে। লালজি ফেরেননি এখনও। বুবুদা ভোর হতেই সাইকেল নিয়ে ফের বেরিয়ে পড়েছে।
দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সোয়া আটটা। আমায় দেখে গজুমামা বলল, “উঠেছিস? তৈরি হয়ে নে তাড়াতাড়ি, থানা থেকে ঘুরে আসি একবার।”
ঠিক তক্ষুনি গেটের বাইরে রিকশার প্যাঁ পোঁ শোনা গেল একটা। গেট ঠেলে উঠোনে ঢুকলেন লালজি, পরনে কর্ডের একটা প্যান্ট, গায়ে ফুল সোয়েটার, গলায় মাফলার, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে দু-তিনটে ছিপ। লালজির পেছন পেছন ঢুকলেন আরেকজন, গায়ে খয়েরি রঙের চাদর জড়ানো ধুতিপরা একজন গ্রাম্য লোক।
আমরা সবাই উত্তেজিত হয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। গজুমামাকে দেখেই লালজি হই হই করে উঠলেন, “আরে গজু, যা একখানা মাছ ধরার জায়গা পেয়েছি না! উফ্‌, স্বর্গ! বিশাল দিঘি, চারপাশ ঘিরে বড়ো বড়ো গাছ, একেবারে ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, গাছের ছায়ায় টলটলে কালো জলে ঘাই মারছে অ্যাত্তো বড়ো বড়ো রুই, কাতলা, বোয়াল... বেশি দূর নয়, ছ-সাত কিলোমিটার হবে এখান থেকে, জায়গাটার নাম হাটগাছা। চল, তোকে নিয়ে যাব কাল। সন্ধে হয়ে গেলেও চিন্তা নেই, এই সরেনের বাড়ি থেকে যাব রাত্রে। খুব ভালো লোক সরেন।”
বোঝা গেল লালজির সঙ্গের সেই গ্রাম্য ভদ্রলোকটির নাম সরেন। সবাই মিলে উঠে এলাম বসার ঘরে। সোফায় গা এলিয়ে বসে লালজি বললেন, “বোসো, সরেন।”
সরেন মেঝেতেই বসতে যাচ্ছিল। লালজি হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “আরে, আরে মাটিতে কেন? উচ্চাসনে বোসো। ওই চেয়ারটায় বোসো না!”
জানা গেল, কাল রাতে সরেনের বাড়িতেই ছিলেন লালজি। মাছ ধরতে বসে বেখেয়ালে সন্ধে হয়ে গেছিল। ফেরার জন্য উঠে দেখেন কিছুই মনে পড়ছে না, নিজের নামটাও না। অন্ধকার গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা চায়ের দোকান পেয়ে চা-বিস্কুট খেতে ঢুকেছিলেন, সেখানে গ্রামের পাঁচ-ছ’জন বয়স্ক লোক বসে গল্প করছিল, তাদের মধ্যেই ছিল সরেন। লালজি তাদের বুঝিয়ে বলেন নিজের অসুখের কথা, মাঝে মাঝে কিছুই যে তার মনে পড়ে না সেকথা। সব শুনে সরেন তাঁকে নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। হাটগাছার সম্পন্ন চাষি সে, দোতলা মাটির বাড়ি গ্রামে। দিব্যি ছিলেন লালজি। খুব যত্নআত্তি করেছে সরেন। তারপর আজ সকালে ঘুম ভেঙেই সব কিছু মনে পড়ে যায় লালজির। একাই ফিরতে পারতেন, কিন্তু সরেন ছাড়েনি, সঙ্গে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল।
“কোথায় গেলে? চা দাও আমায়। সরেনকে চা দাও, জলখাবার দাও।” লালজি কথাটা বললেন বড়োমাসির উদ্দেশে, কিন্তু কোথায় তিনি! মাসি তখন ঠাকুরঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছে।
গজুমামা থানায় ফোন করে লালজির ফেরার খবরটা জানিয়ে দিল। বুবুদাও ফিরল এইসময়। বুবুদাকে দেখেই গজুমামা বলে, “বুবু, তোর সাইকেলটা দে তো, অম্বিকা সুইটস থেকে নলেন গুড়ের মাখা সন্দেশ নিয়ে আসি। বহুদিন চালাইনি অবশ্য, অভ্যেস নেই।”
বিশাল বপু নিয়ে গজুমামা সেই সাইকেলে চড়ায় দেখতে যা হল না! যেন বাচ্চাদের খেলনা ট্রাইসাইকেলে হাতি চেপেছে একটা। টায়ার দুটো প্রায় ফ্ল্যাট হয়ে গেল, সিটের স্প্রিং মড়মড় করে উঠল। হাল ছেড়ে দিয়ে মামা বলল, “নাহ্‌, হেঁটে যাওয়াই ভালো, ব্যায়াম হবে। যাবি নাকি ভাগনে?”
আমার হাতে এক কেজি মাখা সন্দেশ, মামার দু’হাতে নলেন গুড়ের রসগোল্লার দুটো হাঁড়ি দোলাতে দোলাতে বাড়ি ফিরলাম। দু’হাঁড়ি রসগোল্লা কেন? “এক হাঁড়ি বাড়ির জন্য, এক হাঁড়ি রাত্রের ট্রেনের জন্য।” বলল মামা।
বাড়ি ঢুকে দেখি তুলকালাম কাণ্ড! দোতলার দিকে তাকিয়ে লালজির উদ্দেশে উঁচু গলায় বলে চলেছে বড়োমাসি, “এমন ঠ্যাঁটা লোক আমি জীবনে দেখিনি বাপু! পই পই করে সবাই বারণ করছে, ডাক্তারবাবু বারণ করছেন, তাও একলা একলা বেরোনো চাই! মাছ ধরার যে কী নেশা বুঝি না। বাড়ির সবাই যে এদিকে চিন্তায় আধমরা সে খেয়াল আছে?”
দোতলা থেকে লালজির উত্তর ভেসে আসছে, “বেশ করব বেরোব, একশো বার বেরোব। হাতে চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকব নাকি? মাছ ধরতেই তো গেছি, এমন ভাব করছ যেন রাতের বেলা চুরি-ডাকাতি করে বাড়ি ফিরেছি! আবার যাব মাছ ধরতে। কালকেই যাব।”
বুবুদা ফিসফিস করে বলল, “ওই সরেন না কে, চা-জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে যেতেই লেগে গেছে দু’জনে। নারদ, নারদ!”
দুপুরবেলা খেতে বসে কোনও কথা না বলে গম্ভীর মুখে খাওয়া শেষ করে উঠে গেলেন লালজি। বড়োমাসিও গম্ভীর। গজুমামা বলল, “তোমাদের গোছানো হয়েছে? খেয়েদেয়ে কাপড়জামা সব গুছিয়ে নাও তাড়াতাড়ি, সন্ধে সাতটায় ট্রেন কিন্তু।”
বড়োমাসি গম্ভীরভাবে বলল, “আমার যাওয়া হবে না। তোরা যা, বুবু-বাবলিকে নিয়ে যা।”
“সে কি! যাওয়া হবে না মানে? টিকিট কাটা আছে সবার!”
“তোদের লালজি তো বলছে যাবে না! কোথায় নাকি মাছ ধরতে যাবে কাল আবার। নিজে যে অসুস্থ সেটাই তো বোঝে না। একলা একলা একে বাড়িতে ফেলে যাই কী করে বল দেখি?”
বাবলিদি বলল, “একলা কেন, মা? সুকুমারকাকুর এ ক’দিন এসে থাকার কথা না বাড়ি পাহারা দিতে? শচীমাসিও তো আছে!”
মুখ ঝামটে উঠল বড়োমাসি, “মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না তো! খা তাড়াতাড়ি। আমার কথাই গ্রাহ্য করে না, সুকুমারকাকুর কথা শুনবে তোদের বাবা? ঠিক বেরিয়ে যাবে একা একা, তখন আরেক চিত্তির! আমার হয়েছে যত জ্বালা।”
খাওয়াদাওয়ার পর মুখ ধুয়ে গজুমামা উঠে গেল দোতলায়। “কী লালজি, কেমন মাছ ধরলে বলো তারপর! আচ্ছা, কোন মাছ ধরা সবচেয়ে শক্ত বলো দেখি...” ইত্যাদি বলতে বলতে সটান ঢুকে গেল লালজির ঘরে। আধঘণ্টা পরে নিচে বসার ঘরে নেমে বলল, “লালজিকে যাওয়ার জন্য জোর কোরো না। ধকল গেছে বেশ, বিশ্রাম দরকার একটু। আমি আর লালজি যাচ্ছি না বিয়েবাড়ি। তোমরা যাও। কাল আমাদের মাছ ধরার স্পেশাল প্রোগ্রাম আছে। হুঁ হুঁ, বাবা!”
বড়োমাসি পান চিবোতে চিবোতে বলল, “হয়েছে! এক রামে রক্ষা নাই সুগ্রীব দোসর!”
“কী! আমায় সুগ্রীব বললে! মানে হনুমান?” কপট রাগে চোখ পাকিয়ে বড়োমাসির গালদুটো টিপে দিয়ে গজুমামা বলল, “শোনো বড়দি, কোনও চিন্তা নেই তোমার। আমি থাকছি লালজির সঙ্গে, সবসময় চোখে চোখে রাখব, একা একা কোত্থাও বেরোতে দেব না, প্রমিস। তোমরা যাও। দু’দিন খুব চিন্তা গেছে। সবাই মিলে বিয়েবাড়িতে একটু আনন্দ করে এসো।”
“সত্যি থাকবি তুই!” ছলো ছলো চোখে বলল বড়োমাসি, “তুই থাকলে আমি নিশ্চিন্ত মনে যেতে পারি। আমি না গেলে অঞ্জুটা খুব কষ্ট পাবে রে! নূপুরের জন্য কানের দুটো ঝুমকো গড়িয়ে রেখেছি, বেনারসিও কিনেছি একটা। কতদিন দেখিনি মেয়েটাকে, বিয়ের পর কোথায় সেই নাগপুর চলে যাবে, কবে আবার দেখব কে জানে!”
“বলছি তো থাকব, এ ক’দিন আমার আর লালজির কমপ্লিট রেস্ট এখানে।”
“সোনা ভাই আমার।” সোফা ছেড়ে উঠে এসে গজুমামার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল বড়োমাসি, “অ্যাই বুবু-বাবলি, গোছগাছ হয়েছে তোদের?”
যাহ্‌, গজুমামাই যাবে না! বিয়েবাড়ি তাহলে জমবে কী করে? মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। মাসিরা গোছগাছে ব্যস্ত হয়ে পড়লে মামাকে বললাম, “আমিও যাব না। থাকব তোমাদের সঙ্গে।”
“বেশি পাকামি করিস না। আমার আর লালজির সঙ্গে তুই কী থাকবি রে? পোলাপান মানুষ!” গম্ভীর গলায় বলল গজুমামা।
বোঝো! অন্য সময় ভাগনে ভাগনে করে কত পিরীত, আর এইবেলা পোলাপান!
সন্ধে ছ’টায় স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। একটা রিকশায় মাসি আর বাবলিদি, আরেকটায় বুবুদা আর আমি। রাত্রে ট্রেনে খাওয়ার জন্য আনা রসগোল্লার হাঁড়িটা যাওয়ার আগে কোত্থাও খুঁজে পাওয়া গেল না। গজুমামাকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলাম। মামা বলল, “পাবি না খুঁজে, সরিয়ে রেখেছি। ওটা আমার ক্ষতিপূরণ।”


***


তারপর তো বিয়েবাড়ি পর্ব... তুমুল হই হই করতে করতে রাতের ট্রেনে যাওয়া, ফ্যান্টাবুলাস খাওয়াদাওয়া, বিয়ে, বাসরঘর, শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় নূপুরদির সঙ্গে বাড়িশুদ্ধু লোকের ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না, কনেযাত্রী, বউভাত ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার তো গজুমামা আর লালজির কথা ভাবার ফুরসতই ছিল না। বড়োমাসির তাড়নায় বুবুদা অবশ্য রোজ সকাল বিকেল ফোন করে খোঁজ নিয়েছে, দিব্যি আছে নাকি ওরা।
সবকিছু মিটে যাবার পর একদিন সকালবেলা ফেরার ট্রেনে কালনা স্টেশনে নামলাম চারজনーবড়োমাসি, বুবুদা, বাবলিদি আর আমি। আটটা নাগাদ বাড়ি ঢুকে দেখি বসার ঘরের সোফায় আয়েশ করে বসে গজুমামা নিবিষ্টচিত্তে ইয়া মোটা একটা বই পড়ছে। বড়োমাসি প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, “কী রে, তোর লালজি কোথায়?”
“মর্নিং ওয়াকে গেছে।” বই থেকে চোখ না তুলেই বলল গজুমামা।
“সে কি! মর্নিং ওয়াকে গেছে মানে? একা একা? আবার? পই পই করে যে তোকে বলে গেলাম একলা ছাড়িস না মানুষটাকে!” চিন্তিত বড়োমাসির গলায় স্বাভাবিক উদ্বেগ।
“আমি মর্নিং ওয়াকের মধ্যে নেই। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি আমার পোষায় না। অনেক কষ্টে মোটা হয়েছি, বেশি পরিশ্রম করলে রোগা হয়ে যাব।” নির্লিপ্ত গলায় বলল মামা।
“তাই বলে একলা ছেড়ে দিবি মানুষটাকে? ফের যদি নামধাম ভুলে যায়?”
“একলা যায়নি। রিকশা ঠিক করে দিয়েছি, রিকশায় গেছে।”
“রিকশা করে মর্নিং ওয়াক!” অবাক হয়ে বললাম আমি।
ঠিক তখনই গেটের বাইরে একটা রিকশার হর্ন শোনা গেল, রিকশা থেকে নামলেন লালজি। ঘরে ঢুকে আমাদের দেখে খুশি হয়ে বললেন, “বাহ্‌, এসে গেছ তোমরা? বেশ বেশ।” তারপর দোতলায় উঠতে উঠতে হাঁক দিয়ে বললেন, “বাবলি, আমার চা-জলখাবার দিয়ে দিতে বল শচীমাসিকে, জামাকাপড় পালটে আসছি।”
আমরা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে গজুমামার হয়তো একটু মায়া হল। ধীরে ধীরে খোলসা করল ব্যাপারটা, “অবাক হবার কী আছে! মাসকাবারি চুক্তিতে একজন রিকশাওলা ঠিক করে দিয়েছি। এ-পাড়াতেই থাকে, বিহারি, নাম সহদেব। ভালো লোক। ভোর ছ’টা থেকে রোজ সে গেটের বাইরে লালজির জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। লালজি হাঁটতে বেরোলেই পেছন পেছন রিকশা নিয়ে ফলো করে। লালজি গঙ্গার ধারে গিয়ে এক দোকানে চা খায় রোজ, সহদেব দাঁড়িয়ে থাকে কাছেই। তারপর আটটা বেজে গেলে লালজিকে বলে, ‘বাবু, মর্নিং ওয়াক হো গিয়া, রিকশা মে বইঠিয়ে, ঘর যানা হ্যায়।’ লালজি যদি আরও কিছুক্ষণ হাঁটতে চায় তো হাঁটে, সহদেব একটু পরপর জিজ্ঞেস করে, ‘বাবু, হো গয়া?’ তারপর লালজিকে নিয়ে ফিরে আসে বাড়ি। হয়ে গেল। সোজা ব্যাপার!”
ফোঁস করে লম্বা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কপালে হাত ঠেকিয়ে বড়োমাসি বলল, “যাক বাবা, বাঁচা গেছে! ঠাকুর ঠাকুর। এবার ওই অলক্ষুণে মাছ ধরার নেশাটা গেলেই বাঁচি।”
“সে ব্যবস্থাও হয়েছে।” গম্ভীরভাবে বলল গজুমামা।
“মানে?” সমস্বরে বলে উঠলাম সবাই।
ওপর থেকে লালজির নেমে আসার ফট ফট চটির আওয়াজ শুনে ঠোঁটের সামনে তর্জনী ধরে ইশারা করে গজুমামা বলল, “চুপ! আস্তে! যথাসময়ে বলব, এখন নয়।”
নিচে নেমেই লালজির হুঙ্কার, “কই, ব্রেকফাস্ট রেডি হয়েছে আমার? বলে গেলাম যে!”
আমরা হাতমুখ ধুয়ে জলখাবারের লুচি-তরকারি খেতে বসার আগেই লালজির ব্রেকফাস্ট, চা খাওয়া সব শেষ। তড়িঘড়ি দোতলায় উঠে যেতে যেতে মামাকে বলে গেল, “গজু, তুই খেয়েদেয়ে আয়, আমি বসছি গিয়ে।”
বড়োমাসি বলল, “তোর লালজির খুব তাড়া আছে মনে হচ্ছে! কোথাও যাবি নাকি তোরা?”
গজুমামা তরকারিসুদ্ধু গোটা একটা লুচি মুখে পুরে আধবোজা চোখে চিবোতে চিবোতে বলল, “হুঁ, মাছ ধরতে।”
“আবার...”
“আহ্‌!” বড়োমাসিকে থামিয়ে দিয়ে বলল মামা, “বললাম না, আস্তে! খেয়েদেয়ে নাও সবাই, তারপর এসো আমার সঙ্গে দোতলায়, দেখাচ্ছি।”
একটু পরে সবাইকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চাপা গলায় মামা বলল, “লালজির মাছ ধরার নেশা নিয়ে কেউ মশকরা করবে না তোমরা। মানুষটা অসুস্থ, বিরক্ত করবে না ওকে একদম।” তারপর দোতলার বারান্দায় পা দিয়ে গলা তুলে বলল, “কোথায় লালজি, আমাদের মাছ ধরার ব্যবস্থা দেখাতে নিয়ে এলাম সবাইকে ওপরে।”
ভেজানো দরজা ঠেলে লালজির ঘরে ঢুকে দেখি, ঘরের একপাশে একটা বড়ো কাঠের টেবিলের ওপর বিরাট এক জলভরা অ্যাকুয়ারিয়াম, তার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে রঙবেরঙের বাহারি সব মাছ। অ্যাকুয়ারিয়ামের ওপরটা খোলা। অন্যপাশে খাটের ওপর লম্বা একটা ছিপ হাতে বাবু হয়ে বসে আছেন লালজি, ছিপ ফেলেছেন অ্যাকুয়ারিয়ামের জলে, মুখে অল্প অল্প হাসি, অন্য কোনওদিকে হুঁশ নেই তাঁর। ফাতনা থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন, “বুঝলি গজু, এই কাচের চৌবাচ্চাটা, কলোসিয়াম না কী যেন বলে, এটার সামনের দিকের কাচটার ওপর আঠা দিয়ে একটা খবরের কাগজ লাগিয়ে দেব আজ। এখন তো মাছগুলোকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি কোনটা টোপ গিলতে আসছে। এতে তেমন মজা নেই, শুধু ফাতনা দেখে বুঝতে হবে মাছ টোপ ধরেছে কি না, ছোটো মাছ না বড়ো মাছ...”
_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment