বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ আলোর বেগে চলতে গিয়েঃ অর্পণ পাল



আলো কত জোরে যায় এটা আমাদের সকলেরই জানা আছে। আমি একটা টর্চ জ্বাললাম, আর তার আলো দেওয়ালে গিয়ে পড়লーএই টর্চ জ্বালা আর আলোর দেওয়ালে গিয়ে পড়াটা ঘটে যায় মুহূর্তের মধ্যে, এর থেকে আলোর বেগ সম্বন্ধে ধারণা মেলে না। যদি বলি সূর্যের বুক থেকে যে আলোটা টর্চের আলোর মতো এই মুহূর্তে বের হয়ে পৃথিবীর দিকে রওনা দিল সেই আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছবে আট মিনিট কুড়ি সেকেন্ড পরে, তবে হয়তো বুঝবে, আলোর বেগ সত্যিই অত্যন্ত বেশি। বাতাসের মধ্যে দিয়ে বা শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে আলো সেকেন্ডে যেতে পারে তিন লক্ষ কিলোমিটার। এই বেগ কত বেশি আরেকটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য বলি, মানুষের তৈরি সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান এখনও অবধি যেতে পারে সেকেন্ডে দু’শো কিলোমিটারের সামান্য কম দূরত্ব। মানে, আমাদের আলোর বেগের কাছাকাছি যাওয়া তো দূরের কথা, অর্ধেকটা অর্জন করতেই হয়তো বহু যুগ লেগে যাবে।
আলোর বেগে যে চলা সম্ভব নয় কোনও বস্তুর পক্ষে, এটা প্রথম বলেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সেই বিখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদের বিশেষ নিয়মে। ১৯০৫ সালে প্রকাশ পাওয়া সে নিয়মে তিনি বলেছিলেন আরও কয়েকটি কথা। তবে এই আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের কিছু নিয়ম আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা একটু একটু করে আবিষ্কার করতে পারছিলেন, এটা বলে রাখা ভালো। আইনস্টাইন প্রথম সেগুলোকে একটা সুন্দর বাঁধনে বাঁধলেন, এক ছাতার তলায় নিয়ে এলেন বস্তুর গতি সংক্রান্ত নিয়মগুলোকে। আইনস্টাইন এটাও বললেন, অন্য বস্তুর বেগ যাই হোক না কেন, আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগ হতে পারবে না কোনও কিছুরই। আর, কোনও বস্তুর বেগ যাই হোক, তার তুলনায় আলোর বেগ সবসময় একই থাকবে। বা অন্যভাবে বললে, আলোর বেগের সঙ্গে অন্য বস্তুর বেগকে যোগ বা বিয়োগ করলে সবসময় সেটার উত্তর ওই আলোর বেগই হবে। ব্যাপারটাকে একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
আমাদের কমিক্স চরিত্র সুপারম্যান প্রচণ্ড গতি নিয়ে ছুটতে পারে। সে যদি তার পাশ দিয়ে দ্রুতবেগে ধাবমান একটা বুলেটকে ধরতে বুলেটের সমান বেগে ছুটে যায়, তাহলে সে নির্ঘাত বুলেটটাকে ধরে ফেলতে পারবে টার্গেটে আঘাত করবার আগেই। এখানে সুপারম্যানের গতি বুলেটের গতির সমান হওয়ার জন্যই এটা সম্ভব হচ্ছে। যদি সুপারম্যান বুলেটের চেয়েও জোরে যেতে পারে, তবে সে দেখবে বুলেটটা তার পাশ দিয়ে পিছনের দিকে যাচ্ছে, অর্থাৎ সে বুলেটকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
এখন যদি বুলেটের গতি আলোর বেগের সমান হয়? নিউটনের গতি সংক্রান্ত যে সমস্ত নিয়ম, তা মানলে সহজেই বলতে পারব, যদি বুলেটের গতি ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার হয়, আর সুপারম্যান ছোটে ঘণ্টায় পনেরো কিলোমিটার বেগে, তবে তার কাছে বুলেটের গতি পিছনের দিকে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার বলে বোধ হবে। যদি বুলেটের গতি আলোর বেগের সমান হয়, তখনও নিয়ম একই হবে, অন্তত নিউটনের মতানুসারে।
কিন্তু আইনস্টাইন এসে নিউটনের সে নিয়মে দিলেন কুঠার মেরে। তিনি সহজ করেই বললেন, না। সেটা হবে না। আলোর বেগের পাশে ছুটন্ত সুপারম্যানের কাছে আলোর বেগ থাকবে সেই ঘণ্টায় তিন লক্ষ কিলোমিটারই, একটুও কমবেশি না।
এই ব্যাপারটা অস্বাভাবিক হলেও সত্যি। আর এটা যে সত্যি, পরীক্ষাগারে হাতেকলমে তার অনেক প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাই তো আইনস্টাইনকে এত গুরুত্ব দেন সবাই। তাঁর অত হিসেবনিকেশ তো আর মিছে নয়!
এখন আসা যাক বাস্তব জগতের প্রসঙ্গে। সত্যিই যদি কোনও বস্তু বা সহজ করে ভাবলে কোনও মহাকাশযান কখনও আলোর সমান বেগ অর্জন করতে সক্ষম হয়, তবে কী হবে। সেটা কি বাস্তবে সম্ভব করা যাবে কখনও?
আলোর বেগে ছুটতে শুরু করলে আইনস্টাইনের নিয়ম থেকেই বলতে পারব, তখন বস্তুটির ভর দাঁড়াবে অকল্পনীয় রকমের বেশি, যাকে আমরা অসীমও বলতে পারি।
আইনস্টাইন তো অঙ্ক কষে বলেছেনই, একটা বস্তু যত বেশি বেগে ছুটবে, ততই তার ভর বাড়বে। এটা আমরা দৈনন্দিন জীবনে বুঝতে পারি না; কারণ, আমাদের কাজকারবার আলোর বেগের চেয়ে এতটাই কম মানের বেগ নিয়ে হয় যে তাঁর দেওয়া সূত্রে সেই বেগের মান বসালে আমাদের ভরের যেটুকু বৃদ্ধি হচ্ছে বলে জানতে পারব, তা নেহাতই অত্যন্ত ক্ষুদ্র, যাকে আমরা অনায়াসে তুচ্ছ বলে বাদ দিতে পারি। যদি সেটা এত ক্ষুদ্র না হত তবে কী কেলেঙ্কারি হত ভাবো দেখি! তুমি যখন ছুটছ, তোমার নিজেকে মনে হচ্ছে ভারী, যত বেশি জোরে ছুটছ, তুমি হয়ে উঠছ আরও বেশি ভারী। এরকম হলে কি দৌড়ে সুখ হত?
আর, আইনস্টাইনের সেই সমীকরণ থেকে এটাও দেখানো যায় যে বস্তুর বেগ যদি আলোর বেগের সমান হয়, তবে তার ভর হবে অসীম, যার কোনও পরিমাপের উপায় নেই। এখন বস্তুর ভর অসীম হলে তার শক্তিও আইনস্টাইনেরই বিখ্যাত সেই E= mC (‘m’ ভরের বস্তুকে যদি শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় তবে সেই শক্তির পরিমাণ হবে ‘E’, আর ‘C’ অর্থে আলোর বেগ, যার মান আগেই বলেছি) সমীকরণ দেখেই বলতে পারি যে অসীম হবে। যেটা হওয়া অসম্ভব। তাই কোনও বস্তুই কখনও শূন্যস্থানে আলোর বেগের সমান বেগ নিয়ে চলতে পারবে না।


কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আলোর বেগে না হয় কেউ কখনও চলতে পারবে না, কিন্তু যদি কখনও সেভাবে চলতে পারে কেউ, সেই লোকটার কী মনে হবে? বা তার কাছে বাইরের জগতকে কেমন লাগবে?
প্রথম কথা, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ সংক্রান্ত তত্ত্ব থেকেই আরও একটা সমীকরণ পাওয়া যায়, যেটার সাহায্যে দেখানো যায় যে বস্তুর গতি যত বেশি, তার কাছে ‘সময়’ নামক ব্যাপারটি ততই স্লো। এখন ‘সময়’ বলতে আমরা কী বুঝি সেটা একটু বলে নিই।
‘সময়’ বা ‘টাইম’ দেখতে আমরা ঘড়ির দিকে তাকাই। ঘড়ি যেটা দেখায়, সেটা আসলে একটা সময়কালকে নির্দিষ্ট করে দেখায়। আমরা যদি ঘড়িতে একটা বেজে কুড়ি মিনিট দেখি, বাইরের আলো আর সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সহজেই বুঝতে পারব, এখন দুপুর একটা কুড়ি, অর্থাৎ বারোটা বাজবার পর এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট কেটেছে। ঘড়ির ব্যাপারে আর বেশি কিছু না বলে শুধু এটুকুই বলি, ঘড়িতে দেখি আমরা সেই মুহূর্তের স্ট্যান্ডার্ড সময়টা। আবার কোনও কোনও ঘটনায় আমাদের জানবার দরকার পড়ে সময়সীমা (টাইম-স্প্যান), মানে কতক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়েছে সেই ঘটনাটুকু ঘটবার মাঝখানে। যেমন একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে কম সময়ে কে দৌড় শেষ করল বা একটা ট্রেন কতক্ষণে কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছল। এই সময়সীমা মাপবার কাজে আমরা সাধারণত কেউই মনে করি না যে যদি দু’জন মানুষ মেপে দেখেন তবে তাঁদের কাছে সময় দু’রকম হবে। যদি তাঁদের ঘড়ি একইরকম হয় এবং ঠিকঠাক অবস্থায় থাকে, তবে আমরা যেকোনও একটা ঘড়ির সময়কেই সঠিক বলে ধরে নিই এবং সেইমতো সিদ্ধান্ত নিই।
নিউটনের সমস্ত গতি সংক্রান্ত যে সমীকরণ, সেখানে সময়কে দেখানো আছে একটা এমন রাশি হিসেবে, যা বস্তুর গতির ওপরে কোনওভাবেই নির্ভর করে না। সেখানে যে বস্তু থেমে আছে আর যে বস্তু গতিশীল, এই দুটোর বেলাতেই সময় একইরকমভাবে কেটে যাচ্ছে। কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর ‘সময়-বিস্তার’ (টাইম ডাইলেশন) নামে একটা নিয়মে বললেন, দু’জন মানুষের ঘড়িতে কোনও একটা ঘটনা ঘটবার সময়সীমা দু’রকম দেখাবে, যদি দু’জনের একজন অন্যজনের সাপেক্ষে গতিশীল হয়। অর্থাৎ, একজন থেমে আছে, অন্যজন এগিয়ে চলেছে, এরকম ক্ষেত্রে যিনি এগিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর হাতের ঘড়ি স্লো চলবে। যদি থেমে থাকা ব্যক্তিটি বলেন যে দৌড়বাজ দৌড় শেষ করেছে তিরিশ সেকেন্ডে, তো হাঁটতে থাকা ব্যক্তিটি বলতে পারে, কই না। আমার ঘড়ি বলছে, ও দৌড়েছে বত্রিশ সেকেন্ডে।
এখন কেউই যে মিথ্যে বলছেন তা নয়। এটা জগতেরই নিয়ম। বা প্রকৃতির। নিয়মের যে গাণিতিক সূত্র, সেখান থেকেই দেখানো যায়, কোনও বস্তু যদি আলোর বেগেই চলতে থাকে, তার কাছে সময় যাবে থেমে। যেন তার ঘড়ি আর সময় দেখাবে না। ঘড়ি তা বলে খারাপ হয়নি। সে অনন্ত এক সময়ের সমুদ্রে যেন ভেসে যাচ্ছে, যে সমুদ্রে সময় স্থির। হিসেব করে দেখানো যায়, যদি কোনও ব্যক্তি আলোর বেগের নব্বই শতাংশ বেগ নিয়ে চলতে পারে (মানে, সেকেন্ডে ২.৭ লক্ষ কিলোমিটার) তবে সেই ব্যক্তি একটা কবিতা পড়বার পর যদি ঘড়িতে দেখে পাঁচ মিনিট কেটে গেছে; অন্য একটি ব্যক্তি, যে দাঁড়িয়ে আছে মাটিতে, সে ওই কবিতা পড়বার সময়টুকু তার ঘড়িতে মেপে দেখবে কেটে গেছে কুড়ি মিনিট!
আর যদি কেউ আলোর সমান বেগে চলতে শুরু করে, সেরকম সময় সে মানুষটি দেখবে, তার সামনে যেন সব অন্ধকার, শুধু একটা সরু লম্বা পাইপের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের প্রকৃতিকে। জগতের সবকিছুই তাকে দেখতে হবে ওই পাইপটুকুর মধ্যে দিয়ে। তবে সাধারণ পাইপ দিয়ে দেখা আর এই পাইপে দেখবার পার্থক্যーএখানে মানুষটি তার চোখের সামনে স্থির অবস্থায় যেটুকু দেখতে পাওয়ার কথা অর্থাৎ চোখের দু’পাশের প্রায় ১৮০ ডিগ্রি কোণে বিস্তৃত যে দৃশ্য, সেটার সবটুকুই দেখবে, শুধু সবটুকু দৃশ্যকেই কেউ যেন চ্যাপ্টা করে ঢুকিয়ে দিয়েছে ওই সরু টানেলের মতো পাইপের মধ্যে!
আবার যদি কেউ খোলা আকাশের নিচ দিয়ে এই বেগে চলতে থাকে, তার সামনের আকাশের তারাগুলোকে মনে হবে যেন একটু নীলচে, আর তার পিছনের তারাগুলোকে মনে হবে লালচে বলে। এই ব্যাপারটার নাম ‘ডপলার ক্রিয়া’, দর্শকের গতির ওপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নির্ভরতা। বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ডপলার-এর নামে। মহাকাশে যে সমস্ত তারা-সমষ্টি ছায়াপথগুলো রয়েছে, সেগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এটা আবিষ্কার করেছিলেন আমেরিকান বিজ্ঞানী এডউইন হাবল। এই আবিষ্কার থেকেই পরে আসে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা।
যাই হোক, অত্যন্ত বেশি বেগ নিয়ে চলার ফলে এই যে সময়ের স্লো হয়ে যাওয়া, এটার একটাই ভালো দিক আছে। যদি রমেশ মহাকাশযানে চেপে সোজা ওপরের দিকে রওনা দেয় আলোর কাছাকাছি গতিতে, আর ফিরে আসে বেশ কয়েক বছর পর, দেখা যাবে তার ক্ষেত্রে সময় ধীরে কেটেছে বলে এখানে তার যমজ ভাই পরমেশের বয়স যদি পাঁচ বছর বেড়ে গিয়ে থাকে, তবে রমেশের বয়েস বেড়েছে মাত্র কুড়ি মাস! তার চুলে পাক ধরেনি, চেহারাও তরতাজা।
এসবই বাস্তবে হওয়া সম্ভব কি না সেটা আগামীদিনই বলতে পারবে। তবুও এখনও এসব শুনলে কল্পবিজ্ঞানের কথা বলে মনে হয় না? বিজ্ঞান কল্পনার চেয়েও বেশি অবাস্তব ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে কখনও কখনও। এটা তারই একটা উদাহরণ।


_____

No comments:

Post a Comment