গল্পঃ ঘূর্ণিপাহাড়ঃ দীপিকা মজুমদার



এক


১৭০৩ সাল, ২৬শে নভেম্বর।
এডিস্টোন রক, অ্যাটলান্টিক সাগর।
প্লাইমাউথ বন্দর থেকে সাজসরঞ্জাম নিয়ে যাত্রা করতে কিছুটা দেরিই হয়ে গিয়েছিল হেনরি উইনস্ট্যানলির। গন্তব্য, সমুদ্রের বুকে এডিস্টোন নামক ডুবোপাহাড়ের উপর বছর পাঁচেক আগে তাঁর নির্মিত বাতিঘরটি। বেশ কিছুদিন আগে তিনি একবার গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন, বাতিঘরের নীচের দিকের কাঠের তক্তাগুলিতে সমুদ্রের নোনা জল লেগে পচন ধরেছে। এখনই মেরামত না করলে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, যেকোনও সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় চুরমার হয়ে যাবে তাঁর সাধের বাতিঘরখানা।
হেনরি উইনস্ট্যানলি পেশায় ব্যবসায়ী, সমুদ্রপথেই তাঁর যাবতীয় কারবার। এই প্রাণদায়ী সমুদ্রই যে কখন প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝের অ্যাটলান্টিক সাগরের বুকে জলের তলায় মাথা লুকিয়ে রয়েছে এক ডুবোপাহাড়। পাহাড়টির মাঝখানের চূড়ার নাম এডিস্টোন রক। ইংরেজি ‘এডি’ শব্দের অর্থ ঘূর্ণি। পাহাড়টি খুবই সাধারণ। তবে এই পাহাড়ের কারণে সমুদ্রের জল এই পাহাড়ের কাছে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। সমুদ্রের জল এই পাহাড়ের কাছে সবসময়ই বিপজ্জনকভাবে পাক খেতে থাকে। আর সেই কারণে এই পাহাড়টির নাম হয়েছে এডিস্টোন রক বা ‘ঘূর্ণিপাহাড়’।
সমুদ্রে যখন জোয়ার আসে, তখন পাহাড়ের চূড়া প্রায়ই ডুবে যায়। তখন জায়গাটিকে চেনা খুব মুশকিল। এই পাহাড়ের পাশ দিয়ে অসংখ্য জাহাজ প্রতিদিন যাতায়াত করে। একসময় কত জাহাজ সমুদ্রের ওই মারাত্মক ঘূর্ণিতে পড়ে ধ্বংস হয়েছে। যুগ যুগ ধরে এডিস্টোন পাহাড় ছিল নাবিকদের কাছে এক বিভীষিকার নামান্তর। বিশেষ করে রাতেরবেলা কোনও জাহাজই ওই পথ দিয়ে যেতে চাইত না। অনেক সময় পথ ভুলে বা জোয়ারের জলে পাহাড়টিকে দেখতে না পেয়ে কোনও জাহাজ যখন ওই এলাকা অতিক্রম করার চেষ্টা করত তখনই ঘটত বড়ো ধরনের বিপর্যয়।
১৬৯৫ সালের কথা, উইনস্ট্যানলির বয়স তখন একান্ন বছর। ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। সেসময় তাঁর ব্যাবসার কাজে নিয়োজিত পাঁচটি জাহাজের দুটি এই এডিস্টোন রকের কাছে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়। ফলে ব্যাবসা বড়ো ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তখনই উইনস্ট্যানলি ঠিক করেন, ওই পাহাড়ের ওপরই তিনি একটি আলোকস্তম্ভ নির্মাণ করবেন। এই কাজের জন্য তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতিও নিয়ে রাখলেন। ১৬৯৬ সালের জুলাই মাসে উইনস্ট্যানলি বাতিঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। পরিকল্পনা এবং পরিচালনার দায়িত্ব তিনি সরাসরি নিজের কাঁধে তুলে নেন।
জোয়ারের সময় ওই পাহাড়ের যে চুড়োটা জলের ওপর জেগে থাকত তার ওপর কাঠের কাঠামো দিয়ে গ্রানাইট পাথরের বারো ফুট ভিত তৈরি করা হল। পাথরগুলো মাপমতো কেটে প্লাইমাউথ বন্দর থেকে জাহাজে করে ওই পাহাড়ে নিয়ে আসা হত। এই কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য উইনস্ট্যানলি প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ করেন। হঠাৎই এই কাজ চলার সময় এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা আসে।
এই সময় ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ফরাসি সৈন্যদের হাত থেকে নির্মাণকর্মীদের রক্ষা করার জন্য উইনস্ট্যানলি একটি যুদ্ধজাহাজকে ওই পাহাড়ের কাছে সবসময় পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ফলে ফরাসি সৈন্যরা পাহাড়ের দিকে যাওয়ার খুব একটা চেষ্টা করত না। কিন্তু একদিন ঘটল অন্য এক ঘটনা।
কোনও এক কারণে একদিন সেই যুদ্ধজাহাজটি শ্রমিকদের পাহারা দেয়ার জন্য আসতে পারেনি। পাহাড়ের কাছে কোনও যুদ্ধজাহাজ দেখতে না পেয়েই ফরাসি সৈন্যরা পাহাড়টিকে ঘিরে ফেলে। তারা উইনস্ট্যানলিকে বন্দী করে নিয়ে যায়। তখন ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন চতুর্দশ লুই। ফরাসি সৈন্যরা বন্দী উইনস্ট্যানলিকে সম্রাটের কাছে নিয়ে আসে। সম্রাট পুরো ঘটনা শোনার পর ফরাসি সৈন্যদের ওপর খুবই ক্ষেপে যান এবং তৎক্ষণাৎই তাদের শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তারপর উইনস্ট্যানলিকে প্রচুর পুরস্কার দিয়ে ইংল্যান্ডে সসম্মানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এই সময় রাজদরবারে সম্রাট একটি মূল্যবান কথা বলেন। তিনি বলেছিলেন, “ফ্রান্সের যুদ্ধ ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, মানবতার বিপক্ষে নয়।”
তিনবছরের অক্লান্ত চেষ্টার ফলে বিশ্বে সর্বপ্রথম মাঝ-সমুদ্রে বাতিঘর তৈরি হল। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর এডিস্টোন রক লাইট হাউসের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। এই লাইট হাউসটির উচ্চতা ছিল একশো কুড়ি ফুট। এর মাথায় কঠিন চর্বির তৈরি মোমের আলো জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেন উইনস্ট্যানলি। পাঁচবছর ধরে এই বাতিঘরের আলোর সংকেত ওই অঞ্চলের সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সমর্থ হয়।


***


উইনস্ট্যানলি ডানহাতটা চোখের কাছে তুলে ধরে দূরে দেখলেন, ঝড়ের কোনও পূর্বাভাস নেই। আকাশ পরিষ্কার, দরিয়ায় স্বাভাবিক ঢেউ উঠছে। তিনি আশা করছেন সূর্যাস্ত হওয়ার আগেই মেরামতের কাজ শেষ করে প্লাইমাউথ বন্দরে ফিরে যেতে পারবেন।
প্লাইমাউথ বন্দর থেকে এডিস্টোন বাতিঘরের দূরত্বও প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার। গন্তব্যে পৌঁছেই দেরি করলেন না উইনস্ট্যানলি। শ্রমিকদের তাড়া দিয়ে শুরু করে দিলেন মেরামতের কাজ। নৌকা থেকে নামিয়ে নিয়ে আসা হল ভারী ভারী কাঠের তক্তা। মাপমতো কেটে পুরনো তক্তাগুলোর বদলে নতুন কাঠের তক্তা বাতিঘরের গায়ে বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ।
কিন্তু দুপুরের দিকেই আবহাওয়া একদম শান্ত হয়ে গেল। ঢেউয়ের উচ্চতা কম, এডিস্টোনের পাথরগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের বুকে। আকাশেও কেমন একটা থমথমে ভাব। বাতাসও গুমোট। ঠিক ঝড়ের পূর্বাভাস। উইনস্ট্যানলি শ্রমিকদের আবারও তাড়া দিলেন কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য। কিন্তু সবেমাত্র তক্তাগুলো মাপমতো কাটা শেষ হয়েছে। শ্রমিকরা জানালেন, একেকটা পুরনো তক্তা খুলে নতুন তক্তাগুলো বসাতে আরও ঘণ্টা দুই-তিন লেগে যাবে।
উইনস্ট্যানলি আশঙ্কায় বার বার সমুদ্র দেখেন, আকাশে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। পলক ফেলতে না ফেলতেই শুরু হল বৃষ্টি। অথচ কাজ শেষ না করে কিছুতেই ফিরে যাওয়া যাবে না। মাতাল করা হাওয়া এবং উঁচু ঢেউ চিরে এই চৌদ্দ কিলোমিটার পথ নৌকা নিয়ে যাওয়া বিপদজনক। উইনস্ট্যানলি মনস্থির করলেন, আজকের রাতটা নাবিক এবং শ্রমিকদের নিয়ে এই বাতিঘরেই কাটিয়ে দেবেন। ভোরের দিকে ঝড় থেমে যাবে আশা করছেন। তখনই রওনা দেবেন প্লাইমাউথের দিকে। দুর্যোগ বাড়তেই শ্রমিক আর নাবিকসহ উইনস্ট্যানলি আশ্রয় নিলেন বাতিঘরের ভেতরে।
কিন্তু প্রকৃতি বাদ সাধল। প্রবল ঢেউ এসে ধাক্কা দিতে লাগল কাঠের বাতিঘরে। বিশাল বিশাল ঢেউ এসে কোথায় যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল নৌকাদুটো। জলের ধাক্কায় দলে দলে সমুদ্রে তলিয়ে যেতে লাগল নিরীহ শ্রমিকরা। ভারী ভারী যন্ত্রপাতিগুলো তখনও বাতিঘরের বাইরে পাথুরে জমিতে পড়ে আছে। দামি যন্ত্রপাতি জলের স্রোতে সলিলসমাধি হবে! মেনে নিতে পারলেন না হেনরি উইনস্ট্যানলি। কয়েকজন শ্রমিকের সাথে হাত লাগিয়ে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো বাতিঘরের ভেতরে সরিয়ে আনার জন্য দুর্যোগের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। ঠিক তখনই একটা দমকা হাওয়া এসে লাগল তাঁর গায়ে। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন উইনস্ট্যানলি। পাথরে আঘাত লেগে রক্তাক্ত হল মাথা। আর ঠিক তখনই একটা দৈত্যাকৃতি ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ঘূর্ণিপাহাড়ের উপরে বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে। মাত্র পাঁচবছরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের প্রথম বাতিঘর।


দুই


বর্তমান সময়। প্লাইমাউথ বন্দর।
নিজের ছোটো ইয়টের ডেকে পায়ের উপর পা তুলে কাউবয় হ্যাট দিয়ে মুখ ঢেকে আরাম করছিল মার্ক। এমনিতে ওদের কাজ তেমন একটা নেই এখন। দু’মাস আগে এডিস্টোন বাতিঘরে জোড়া খুনের ঘটনার পর কাজ ঢিমেতালে চলছে। সবাই বলে ওখানে নাকি এক সাহেব ভূতের বাস। সেই সাহেবই নাকি ঐ ডুবোপাহাড়ে প্রথম বাতিঘর নির্মাণ করেন। সেই বাতিঘরের মেরামত করতে গিয়ে সমুদ্র-ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যান। এতদিন তো পুলিশি নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওদিকটায় যাওয়া যেত না। কয়েকদিন হল নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবুও ওদিকে বেড়াতে যাওয়া জন্য কোনও যাত্রী এখন পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না মার্কের।
“এই ছোকরা, এডিস্টোন বাতিঘরে নিয়ে যাবে নাকি?”
টুপি সরিয়ে সোজা হয়ে উঠে বসল মার্ক। ওর ইয়টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন লোক। একজন বেঁটে আর মোটামতো, মুখে চুরুট গোঁজা। অন্যজনের চেহারা বেশ পেটানো আর লম্বা। মার্ককে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে বেঁটে লোকটা বলে, “কী হল? যাবে নাকি?”
বলে কী লোকটা! সাহস তো কম নয়। যদিও ভূত-টুত কিছু নেই ওখানে, থাকলে মার্ক এতদিনে তার দেখা পেত। কিন্তু এখনই ওদিকটায় যাওয়ার জন্য যাত্রী পাবে, মার্ক ভাবতে পারেনি।
“যাব। কিন্তু এখন?” কবজি উলটে ঘড়ি দেখে মার্ক। সাড়ে চারটে বাজে। যাওয়াই যায়, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফিরতে পারলে এই শেষ বেলায় আমদানি মন্দ হবে না। তবে একটু খেলিয়ে দর করতে হবে, যাতে এই মন্দার বাজারে বেশি উপার্জন করা যায়।
“কেন? এখন নয় কেন?” লম্বা পেটানো চেহারা লোকটা প্রশ্ন করল এবার।
মার্ক দর বাড়ানোর জন্য ইতস্তত ভাব দেখিয়ে নাটক করল, “এরপর তো অন্ধকার হয়ে যাবে। কিছুদিন আগেই এক সাহেব ভূতের চক্করে পড়ে দু’জন মারা গেছে...”
মার্ককে শেষ করতে না দিয়েই বেঁটে লোকটা হা হা করে হেসে ওঠে। পাশের জনের উদ্দেশ্যে বলে, “ছোকরা বলে কী হে, রবিনসন? ভূত?” তারপর মার্কের দিকে চেয়ে গম্ভীরভাবে বলে, “তুমি যাবে কি না বলো। নাহলে অন্য কাউকে দেখি। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব!”
মার্ক লোকটার রসিকতায় বিরক্ত হয়ে ব্যাজার মুখে বলল, “ইয়টে উঠে বসুন আপনারা। আমার সঙ্গী পিটারকে ডেকে নিয়ে আসি। সে আবার এই সময় জুয়াতে মেতে থাকে।”
মনের প্রসন্ন ভাব আড়াল করে পিটারকে ডাকতে চলে গেল মার্ক।


ইংলিশ চ্যানেলের আপাত শান্ত নীল জলরাশির বুক চিরে প্রায় উড়ে চলেছিল মার্কের ইয়ট। পিটার ব্যাজার মুখে বসে আছে চালকের আসনে। জুয়ার আড্ডা থেকে তাকে প্রায় জোর করেই টেনে এনেছে মার্ক কিছু অতিরিক্ত পাউন্ডের লোভ দিয়ে।
মার্ক ইয়টের ডেকের উপরে দাঁড়ানো দু’জন যাত্রীর কথোপকথন শুনছিল। লম্বা পেটানো চেহারার লোকটার নাম রবিনসন, আগেই শুনেছে। ওদের কথাবার্তায় বেঁটে লোকটার নামও জানা গেলো, জিম।
জিম একটা উন্নতমানের দূরবীন দিয়ে সমুদ্রের মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বাতিঘরটা দেখতে দেখতে বলছিল, “১৭০৩ সালে প্রথম বাতিঘরটা ভেঙে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকবার এই বাতিঘর বানানো হয়েছে, জানো তো?”
“হুম। ১৭০৯ সালে জন রুডইয়ার্ড নামের একজন ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে ওক কাঠ এবং লোহার তৈরি দ্বিতীয় একটি বাতিঘর ওই স্থানে নির্মাণ করা হয়। তবে সেটিও ২রা ডিসেম্বর ১৭৫৫ সালে আগুনে পুড়ে যায়। শোনা যায়, বাতিঘরেরই আগুন ছিটকে এসে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরবর্তীকালে ১৭৫৬ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জন স্মিটন তৃতীয় এডিস্টোন লাইট হাউস নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কংক্রিটের তৈরি লাইট হাউসটি নির্মাণ করতে সময় লাগে তিনবছর। এরপর ১৮৮২ সালে স্যার জেমস ডগলাসের তত্ত্বাবধানে চতুর্থ বারের মতো ওই স্থানে নতুন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই বাতিঘরটি নির্মাণ করা হয়। আগে উচ্চতা ছিল একশো তেত্রিশ ফুট। এখন নতুন টাওয়ার বসিয়ে উচ্চতা হয়েছে একশো একষট্টি ফুট।”
“স্মিটন সাহেবের বাতিঘরটির উচ্চতা ছিল ঊনষাট ফুট। ১৮৪১ সালে একবার মেরামতও করা হয় যা ১৮৭৭ অবধি টিকে ছিল। পরে প্লাইমাউথ বন্দরে স্মিটন বাতিঘরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১৮৭৯ সালে স্মিটন সাহেবের নক্সাকেই আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন জেমস ডগলাস, যা ১৮৮২-তে নির্মিত হয়। স্মিটন সাহেবের মূল বাতিঘরটির ভগ্নস্তূপ কিন্তু ডগলাসের বাতিঘরের পাশে আজও বর্তমান। দেখতে চাও?” বলেই জিম দূরবীনটা এগিয়ে দিল রবিনসনের দিকে।
রবিনসন জিমের হাত থেকে দূরবীন নিয়ে দেখতে লাগল এডিস্টোন বাতিঘর। ওরা এডিস্টোন পাথরের কাছাকাছিই চলে এসেছিল। মার্ক বিরক্ত হয়ে ভাবল, যতসব বড়লোকি চাল! সে খালি চোখে দুটোকেই দেখতে পাচ্ছেーএকটা সম্পূর্ণ বতিঘর, পাশেরটা ভাঙা।


সমুদ্র যতই শান্ত হোক, এডিস্টোন পাথরের কাছে সমুদ্রের নাচানাচি একটু বেশিই থাকে সবসময়। তাই ইয়ট আধ-কিলোমিটার আগেই থামিয়ে দিতে হয়, নাহলে পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ইয়টের দুর্দশা হবে। ইয়ট থেকে ছোটো একটা বোট নামিয়ে ধাতব সিঁড়ি ঝুলিয়ে দিল মার্ক। জিম আর রবিনসনকে ইশারা করে নামতে বলল বোটে। তারপর পিটারকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলল, “তুমি এখানেই বসো, আমি দু’জনকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসছি।”
পিটার মার্কের দিকে বিরক্ত মাখা চোখে চেয়ে বিড়বিড় করল, “শালা নাটকবাজ।”
বোটটা পাথরের গায়ে লাগতেই এক লাফে জিম আর রবিনসন পাথরের মাথায় উঠে দাঁড়াল। মূল বাতিঘরের উলটোদিকে আগের বাতিঘরের ভগ্নস্তূপ দাঁড়িয়ে। মার্ক বোটটা পাথরের গায়ে একটা দড়ি দিয়ে বেঁধে বাতিঘরের দিকে এগিয়ে এল। জিম আর রবিনসন তখন বাতিঘরের প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। দরজার কাছে এসে মার্ক একবার পেছন ফিরে ইয়টের দিকে তাকাল। চালকের আসনে পিটার নেই, সে নিজের কাজ শুরু করেছে।
সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা ওঠার পরই বাতিঘরের খোলা জানালা দিয়ে ব্যাপারটা খেয়াল করেছে জিম। রবিনসনকে বলল, “পাখি উড়ে না যায়। জিনিসটা সাথে এনেছ তো?”
জিমের প্রশ্নে রবিনসন কোনও উত্তর না দিয়ে শুধু কোটের পকেটে ডানহাতটা বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, “একেবারে শেষ তলায় গিয়ে অপেক্ষা করা যাক?”
“সেটাই ভালো। দেখা যাক কী হয়, নাহলে নেমে আসার পথ তো খোলাই রইল।”
জিম আর রবিনসন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।
দু’ধাপ সিঁড়ি চড়ার পরই অপেক্ষা করছিল মার্ক। ইয়ট ছেড়ে পিটার উঠে এসেছে বাতিঘরের সিঁড়িতে। ওর গায়ে একটা পুরনো ভারী লং-কোট, মাথায় মধ্যযুগীয় সাহেবদের মতো একটা টুপি। মার্ককে দেখিয়ে বলল, “ঠিক আছে?”
মার্ক বিরক্ত হয়ে বলল, “স্কুলের গো-অ্যাজ-ইউ-লাইক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছ নাকি যে তোমায় কেমন লাগছে জানাতে হবে?”
পিটার মুখ বেঁকিয়ে বলল, “এই শর্মার জন্যেই আগের কাজটা উতরে গিয়েছিল, বুঝলে? সব ক্রেডিট শুধু তোমার একার নয়।”
মার্ক আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। সত্যি, এই বাতিঘরের জনক হেনরি উইনস্ট্যানলির ভূতের গুজবটা ওদের খুব কাজে লেগেছে। লোকজন এখানে উইনস্ট্যানলির ভূত আছে জেনেই আসে। আর সেই ভূতকে যদি স্বচক্ষে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহলে তৎক্ষণাৎ বিচার-বুদ্ধি লোপ পায় মানুষের। মাস দু’য়েক আগে যে রাশিয়ান দম্পতি এসেছিল এই বাতিঘরে, তাঁদের বাগে আনতে একটুও বেগ পেতে হয়নি ওদের। পুরনো কোট আর টুপি পরে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছিল পিটার। ব্যস, মহিলা তো সেই দেখেই আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আর তাঁর স্বামীটি পড়ে যাওয়া স্ত্রীকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, পেছনে কখন পিটার এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই হয়নি তাঁর। সামান্য একটা ধক্কা দিতেই একেবারে সিঁড়ির ধার ঘেঁষে বাতিঘরের নীচে গিয়ে পড়লেন।
আরও দুটো ধাপ উঠে দরজার সামনে এসে পিটার বলল, “এখানেই দাঁড়াই? ব্যাটারা নেমে এসেই বেশ চমকে যাবে।”
মার্ক সম্মতি জানিয়ে বলল, “সাবধান ভাই, লোকদুটোকে আমার সুবিধার মনে হচ্ছে না। হাতিয়ার সঙ্গে নিয়ে আসা অস্বাভাবিক নয়।”
“আরে, ভূতের সামনে বড়ো বড়ো নাস্তিকও অস্ত্র ব্যবহার করতে ভুলে যাবে, বুঝলে? মাঝ-সমুদ্রের এই নির্জন বাতিঘরে কে আসবে বাঁচাতে? তবে তুমি কিন্তু কাছাকাছিই থেকো, বেগতিক বুঝলেই মাথায় ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করে দিও। পরে লাশ ফেলে দেওয়া যাবে জলে।”
কথাগুলো বলে পিটার সামনের খোলা দরজা দিয়ে পরের ধাপে উঠে গেল। দরজার আড়ালে লুকিয়ে রইল মার্ক।
পরের ধাপের সিঁড়ির কাছে আসতেই পিটারের মনে হল, কেউ একজন জানালার ধারে ওর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। ঐ লোকদুটো এখানেই আছে তাহলে। কিন্তু ওদের মধ্যে কেউই তো এরকম পুরনো কোট পরে নেই! অন্য কোনও পর্যটক আসাও অসম্ভব, বাইরে আর কোন বোটও দেখেনি পিটার।
“অ্যাই, কে আপনি? এখানে কী করছেন?” জোর গলায় হাঁক দেয় পিটার।
পিটারের ডাক শুনে লোকটা ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। ফর্সা ধবধবে সাহেবি চামড়ার তুলনায় একটু বেশিই ফ্যাকাসে চামড়া লোকটার। গালগুলো অস্বাভাবিকরকমের ফোলা। সবচেয়ে অদ্ভুত লোকটার চোখদুটো, কোটর থেকে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। লোকটা ক্রমশ এগিয়ে আসছিল পিটারের দিকে। ওঁর চলন দেখে পিটারের মনে এক অজানা ভয় পেয়ে বসল। কোনওরকমে বলল, “কে আপনি? কী চাই?”
লোকটার গা থেকে একটা আঁশটে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, পরনের জামাকাপড় জলে ভিজে সপসপ করছে। মনে হয় লোকটা বহুদিন জল থেকে ওঠেনি। আর একটু কাছে এগিয়ে আসতেই পিটার দেখল লোকটার মাথার পেছন থেকে রক্ত গড়িয়ে এসে জামাকাপড় ভিজিয়ে দিয়েছে। লোকটা কাছে আসতেই পিটারের মনে হল এক্ষুনি পালানো উচিত। কিন্তু পেছন ফিরে পালাতে গিয়েই দরজাটা মুখের ওপর বন্ধ হয়ে গেল। পেছন ফিরে দেখল পিটার, ফোলা চোয়াল প্রসারিত করে হাসছে লোকটা। যত হাসছে ততোই মুখগহ্বর ছড়িয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ার কোনও শেষ নেই যেন। হঠাৎ লোকটার মুখের ভেতর থেকে পোকামাকড়-কেঁচো-সাপ শয়ে শয়ে বেরিয়ে আসছে। বেরিয়ে এসেই সেগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল পিটারের ওপরে। কানফাটা একটা আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল পিটার।


“ব্যাপারটা কী হল?” জিমকে রবিনসন প্রশ্ন করে।
“কী জানি, গিয়ে দেখা যাক।”
“সাবধানে। এটা ফাঁদ হতে পারে।”
বাতিঘরের চূড়ার শেষ ঘরটায় লুকিয়ে ছিল জিম আর রবিনসন। পিটারের আর্তনাদ শুনে ধীরে ধীরে নেমে আসতে লাগল দু’জনে। সতর্ক হয়ে যাওয়ায় কোটের চোরা পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটাও বের করে লক খুলে বাগিয়ে ধরে রেখেছে রবিনসন, বেগতিক দেখলেই ব্যবহার করতে দ্বিতীয়বার ভাববে না। কিন্তু আর্তনাদটা একবারই শুনেছিল ওরা, তারপর আর কোনও শব্দ নেই। সম্ভবত ঠিক নীচের তলা থেকেই চিৎকারটা ভেসে এসেছে। দ্বিতীয় কোনও পায়ের শব্দ বা কথোপকথনের শব্দও নেই।
পিটারের আর্তনাদ শুনে বার কয়েক ইতস্তত করার পর দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকেছিল মার্ক। তবে সিঁড়ির দরজা পেরিয়েই যে দৃশ্য সে দেখল তা দেখার কল্পনাও করেনি কোনোদিন সে। মার্ক দেখল, পিটার মেঝেয় পড়ে আছে আর ওর সামনে দাঁড়িয়ে একজন লোক। লোকটার মুখ থেকে অদ্ভুত সব সামুদ্রিক জীবজন্তু বেরিয়ে এসে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে পিটারের কোমর, হাত, পা, গলা। মার্ক পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সে জানত না যে লোকটার শরীর থেকে নির্গত কর্শিকাগুলোর কাছে ওর দ্রুতগতিও হার মানবে। পালানোর জন্য পেছন ফিরতেই লোকটার মুখ থেকে অক্টোপাসের চোষকসহ দুটো কর্শিকা বেরিয়ে এসে পেঁচিয়ে ধরল মার্কের পা। মার্ক যতই নিজেকে ছাড়ানোর জন্যে ছটফট করে ততই দ্রুত পা বেয়ে উঠতে থাকে মাংসল নাগপাশ।
“হ্যান্ডস আপ!”
ঠিক নীচের তলাতেই মানুষের নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছিল রবিনসন আর জিম। তাই শব্দদুটো বলার জন্যে চোখের উপর ভরসা করতে হয়নি রবিনসনকে। সিঁড়ির ধাপে নেমে এসেই হাত তোলার হুঁশিয়ারি ছুড়ে দিয়েছে। কিন্তু সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না পুলিশ অধিকর্তা রবিনসন জেরেমি। সিঁড়ির উপরে ঘটে চলা দৃশ্য জিমের গোলগাল শরীরটাকে আতঙ্কে কুঁকড়ে আরও ছোটো করে দিয়েছে।
রবিনসন আর জিমের উপস্থতি টের পেয়ে মার্ক আর পিটারের শরীর থেকে বাঁধন আলগা করল লোকটি। মার্ককে উদ্দেস্য করে বলল, “আগের খুনদুটো কীভাবে করেছিলি, বল?”
মার্ক পেশীবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “খুন করতে চাইনি। ভেবেছিলাম ভয় দেখিয়ে অজ্ঞান করে লুঠ করব। কিন্তু মহিলা হার্টফেল করবে ভাবতে পারিনি। আর ওর স্বামী নীচে পড়ে যাওয়ার পরও সজ্ঞানে ছিল। আমাদের মতলব ধরে ফেলেছিল। সেই অবস্থায় ওকে বাঁচিয়ে রেখে ঝুঁকি নিতে চাইনি।”
“অফিসার রবিনসন জেরেমি এবং জিম হ্যাল নিজের কানেই শুনলেন তবে, খুনি নিজের মুখেই সব স্বীকার করেছে।”
সাহস করে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল রবিনসন, “স্যার, আপনার পরিচয়টা ঠিক...”
লোকটা ধীরে ধীরে বাতিঘরের জানালার দিকে সরতে শুরু করেছে তখন। তার কুৎসিত অবয়বটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বলে উঠল, “হেনরি উইনস্ট্যানলি ঘূর্ণিপাহাড়ে আলোর দিশা দেখিয়ে অভিযাত্রীদের প্রাণ রক্ষার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিল। সে নিজের নামে খুনের বদনাম কিছুতেই সহ্য করবে না।”
রবিনসন আর জিম দেখল, হেনরি উইনস্ট্যানলি বাতিঘরের জানালা দিয়ে বেরিয়ে ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গেলেন। কিন্তু ওরা জানে, এই ঘূর্ণিপাহাড় আর বাতিঘরের রক্ষা করতে হেনরি উইনস্ট্যানলি সবসময় আছেন।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ দীপিকা মজুমদার

5 comments: