উপন্যাসিকাঃ আবছা পৃথিবীটাঃ রুমেলা দাস


আবছা পৃথিবীটা


রুমেলা দাস

এক


গর্তের ঠিক মুখের কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সোজা হয়ে থমকে গেছিল কাবেরী। আচমকা ওর চোখের সামনে অসম্ভব দ্রুততায় দাঁড়িয়ে ছিল হিলহিলে পাতলা শরীরের এক সরীসৃপ। বুকের সমস্ত জীবনীশক্তি এক নিমেষে নিংড়ে বেরিয়ে আসছিল। হাত-পায়ের অংশগুলো সাড়হীন হয়ে অপেক্ষা করছিল মৃত্যুদূতের আহ্বানের। ক্রমাগত মাথা দোলাতে দোলাতে শিরশিরে এক ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছিল তার চেরা জিভের ধার থেকে। মুখে, চোখে, শরীরের উন্মুক্ত অংশে আতঙ্কের বুদবুদ ছড়িয়ে দিচ্ছিল একটু একটু করে। আঁশ আঁশ গায়ের মিশমিশে কালো শরীরটা দুলছিল। চকচকে শরীরটা থেকে তীব্র একটা জ্বালা ঠিকরে এসে লাগছিল যেন কাবেরীর গায়ে। বাসি ভেজা শেওলা মাখা উৎকট গন্ধে ভরে আসছিল নাক। প্রচণ্ড রাগের শব্দে শরীরটা ডানদিক, বাঁদিক করতে করতে নেমে আসছিল মাথার উপর। ফণা ধরা অংশটার উপর দিয়ে তীব্র হিংস্র দুটো লাল চোখ গিলে খেতে আসছিল। কাবেরী কিছুতেই স্থির থাকতে পারছিল না। চোখ বুজে আসছিল মুহূর্তে। ঝাপসা লাগছিল সামনের সমস্ত জায়গাটা। অস্পষ্ট সে পর্দায় শুধু চরম আতঙ্কের মতো জেগে ছিল অল্প অল্প দুলে ওঠা একটা শরীর। একটা সাপের শরীর। ওর মাথা থেকে আরও হাত তিনেক উপরে একটা ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস কাবেরীর স্নায়ু, ধমনী, রক্তস্রোত বিকল করে পঙ্গু করে তুলছিল ওকে। কোনওমতে চোখের পর্দা সজাগ করে রাখতে চাইছিল। যেকোনও ক্ষণে ওর ছোট্ট শরীরে ছোবল দিতে পারে মৃত্যুদূত। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছিল চোখের দেখা অংশগুলো। নড়ে উঠছিল পৃথিবীটা। পায়ের পাতার তলার মাটিটা যেন কাঁপতে কাঁপতে সরে যাচ্ছিল। ঝিম ধরে আসা শরীরটা দেখছিল একটা নয়, অজস্র হিলহিলে শ্বাপদ ঘিরে ধরছে ওকে। অজস্র কালো শরীর দুলতে দুলতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে আসছে ওকে।
কাছে, খুব কাছ থেকে কাবেরী শুনতে পাচ্ছিল ডাকছে ওরা। চিৎকার করে। হয়তো বা হাত নেড়ে। কেঁদে। ওকে ডাকছে ওদের কাছে। ডিকো, বুম, রবি, শ্রীময়ী, দেবলীনা সবাই। হয়তো মা, বাবা, জেঠুও। কুঁকড়ে আসছিল কাবেরী। এ কোন পাতালপুরীতে এসেছে ও? সমস্ত দিক থেকে এক আতঙ্ক আঁকড়ে ধরছে ওকে। ও কি আর কোনওদিন বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না? দৌড়ে গিয়ে মায়ের কোলের নরম গন্ধে লুকাতে পারবে না নিজের আদুরে মুখ? আস্তে আস্তে কাছের মানুষের শব্দগুলো তালগোল পাকিয়ে অনেক অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। কানের মধ্যে বোঁ শব্দটা সবকিছুকে দূরে সরিয়ে দিয়ে শিসের মতো লিকলিকে শব্দটাকে বাড়িয়ে তুলছে কোনও এক অদৃশ্য ভলিউম সুইচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। কাবেরী বেশ বুঝতে পারছে, ওর হাঁটু ভেঙে শরীরটা নেতিয়ে পড়বে মাটিতে। দৃশ্যমান জগতটায় কালো চাদরের পরত নামতে শুরু করে। কাবেরী আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। কানময় হিসহিস আওয়াজটা ওকে আরও কাছে টেনে নিয়েছে। আরও চিৎকার। অনেকগুলো চিৎকার। কান্না... শেওলা মাখা ভেজা গন্ধটা ওর শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে খুব যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে।


দুই


একমাত্র রবিই পারে ওকে এ কাজে সাহায্য করতে। ওর সঙ্গে রবির বন্ধুত্ব বলতে গেলে সেই ছোটো থেকেই। চুপচাপ হলেও রবি যে কাবেরীর সব দুষ্টুমি মুখ বুজে মেনে নেয়। এটা ও খুব ভালোভাবেই জানে। তাই ওকে একবার রাজি করাতে পারলে কাজটা হবেই এটা হলফ করে বলতে পারে। তাছাড়া কোনওরকমে যদি ধরা পড়েও যায়, রবি হাজার চড়েও মুখে টু শব্দটি কাড়বে না। তা ও বহুবার প্রমাণ পেয়েছে হাতেনাতে। তাই ডিকো, বুম কিংবা শ্রীময়ীকে না বলে রবিকেই মনের ইচ্ছেটার কথা জানিয়েছে।
রবি যে প্রথমেই বিষয়টা মেনে নেবে না কিছুটা হলেও সেটা আন্দাজ করেছিল কাবেরী। পরেরবার কলকাতা থেকে রবির ফেভারিট বেনটেনের ড্রেস আনাবে বাবাকে দিয়ে, এমনটা বলায় কোনওমতে রাজি হয়। শেষমেশ অনেক আলাপ-আলোচনার পর ঠিক হয়, শুক্রবার পড়া থেকে ফিরে রবি চলে আসবে রায়দিঘির ঘাটে। পরেরদিন শনিবার। তাই পড়ার তাগিদও থাকবে না। এই দিনে খেলার একটু হলেও বেশি ছাড় পায় ছেলেমেয়েরা। রায়দিঘির ঘাট ছাড়িয়ে কালীমাতা কলোনি পেরোলেই ওদের গন্তব্য। মোটামুটি হিসেব করলে পায়ে হাঁটা পথ এক কিমির মতো। বিকেল বিকেল আলো থাকতে থাকতে যদি রওনা দেয় তবে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে কাজটা সেরে সন্ধে সাতটার মধ্যে নিরাপদে বাড়িও ঢুকে যেতে পারে। এমনটাই আশ্বাস দিয়েছে রবি। কাজটা বেশ বিপজ্জনক। নেহাত কাবেরী রবির প্রিয় বন্ধু, তাই এত বড়ো ঝুঁকিটা নিচ্ছে। না হলে ও কোনোভাবেই এমন কাজ করত না। সত্যি সেটা কাবেরীও মনে মনে মানে। না হলে সেদিনের ঘটনার পর কোনও মেয়ে হয়তো এই ফতেপুরের মাটি মাড়াত না। কিন্তু কাবেরী সে ধাতু দিয়ে গড়া নয়। কলকাতার জল-আবহাওয়ায় চোদ্দটা বছর ফুলের পাপড়ির মতো রং-রস-গন্ধের বিকাশ হলেও ওর শেকড় যে এই মাটিতেই নিহিত। তা ওর গেছোপনা দেখলে খুব বোঝা যায়।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ফতেপুরে কাবেরীদের পৈতৃক ভিটে। ওর বাবা আর জেঠু এই দু’জনই বিশাল দো-মহলা বাড়ির অংশীদার। আর থাকে মঞ্জুলাপিসি। পিসির বাবা, দাদুর সময় এখানে এসেছিলেন। তারপর থেকে আপদে বিপদে ওরা চ্যাটার্জী বাড়ির মানুষগুলোর পাশেই থেকে গেছে। কাবেরীর বাবা সরকারি দপ্তরে কাজ করায় বাবা-মার সঙ্গে ওকে কলকাতার ফ্ল্যাটে থাকতে হয়। ছোটোবেলায় ঠাকুমা জীবিত থাকতে শুনেছিল ওদের কোনও এক পুরুষ এ-অঞ্চলের জমিদার আখ্যা পেতেন। বাড়ির মোটা মোটা পাথরের থাম, কারুকাজ করা খাবার টেবিল, ঝাড়বাতি, দেওয়ালে টাঙানো সাবেকি আমলের হরেক জিনিস আরও কত কী। দেখলেই তাক লেগে যায়। সেসবে কাবেরীর কোনও আগ্রহ নেই। কারণ বেশিরভাগ ইতিহাসের বইতেই দেখেছে যাঁদের হাতে অর্থ থাকত, পোশাকে থাকত চাকচিক্য সেসব মানুষ কুচক্রী আর লোভী হত। সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন করত সুযোগ পেলেই। যদিও এ গ্রাম-ঘেঁষা এলাকাটায় কাবেরী বা ওর পরিবারের তেমন কোনও কুখ্যাতি নেই। তবুও ও এখানে এলেই নিজের শহুরে মোড়কটা একেবারেই সরিয়ে রাখে। খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসমাটির উপর পা ডলতে, কিংবা কালবৈশাখীর ঝড়ে পড়া শিলের টুকরো মুখে পুরে চিবোতে ওর দিব্যি লাগে। আর তাই তো হয় পুজো নয়তো গরমের ছুটিতে ওরা এদিকটা একবার অন্তত ঘুরে যাবেই। বায়নাটা অবশ্যই আসে কাবেরীর কাছ থেকেই। তাই হাজার কাজ থাকলেও কাবেরীর বাবা বাধ্য হন মেয়ের জেদের কাছে।
এবারেও ঠিক তাই। পুজোর সময়টা ঘোরা যাবে না বলে গরমের ছুটির একমাস কাটাতে ব্যাগপত্র নিয়ে ওরা তিনজনেই এখানে চলে আসে। ভালোই কেটেছিল দিনকতক। কিন্তু সেদিনের বিপদ আর কাবেরীর তিনদিনের ভয়ানক জ্বর কোনওমতেই বাবা, মা আর থাকতে চাইছিলেন না। কিন্তু জেঠু আর ফ্যামিলি ডাক্তার  হরিহরদাদুর অনুরোধে ওর দুর্বল শরীরের দিকে তাকিয়ে আরও সাতটা দিন বেশি পাওয়া গেছে। আর সেটাকেই যে করে হোক কাজে লাগাতে চায় কাবেরী। ল্যান্ডলাইনে ফোন করে রবিকে ডেকে সবকথা জানায়। ঠিক হয় ওরা শুক্রবারই যাবে। বুকের মধ্যেটা তিরতির করে কাঁপছে ঠিকই। কিন্তু ওকে তো সবটা জানতে হবে! সমস্তটাই। কেন এসব বলছে বাবা, জেঠু, এমনকি মঞ্জুলাপিসি, হরিহরদাদুও! কী হয়েছিল ঠিক ওখানে? কেনই বা সবাই পিছিয়ে আসে ওখানে যেতে? কাবেরী ভাবে, এই কথাগুলো যদি ওর স্কুলের বন্ধুরা শুনত তবে কী মজাই না করত! সে ধরনের রসিকতা করতে মন না চাইলেও কৌতূহলটা বিছানায় শুয়ে শুয়ে যেন আরও বেড়ে যাচ্ছিল। মাঝরাতে ঘুম থেকে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে বসে থাকত ও। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে এক চুমুকে খেয়ে নিত গ্লাসের জল। নিজের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করত স্বপ্ন বলে। উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখত ঘরের বাইরেটা। লাইট জ্বালিয়ে বুঝতে চেষ্টা করত ঘরের ভিতরে কেউ আছে কি না। এমন একটা শব্দ সে তো ঠিক ওই সময়ই পেয়েছিল। তাই হাজার স্মৃতির আবডালে এটা ভুলে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। একটা খসখসে জিভের শব্দ! সরসর করে বুকে হেঁটে কেউ যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়। যেন বহু প্রতীক্ষায় রয়েছে তার শিকারের। ধীরে ধীরে পায়ের নিচ থেকে যখন ক্রমাগত উঠতে থাকা শব্দটা কপাল, মুখ ছুঁয়ে ফেলত। চিবুকে ছুঁয়ে দিত ঠাণ্ডা চোরা স্রোত! তখনই ধড়ফড়িয়ে উঠে চরম উৎকণ্ঠায় কাবেরী খুঁজে বেড়াত সেই সরীসৃপটাকে। সেই সাপকে। কেন জানে না বারবার মনে হত ওর, ওরা যেন আছে। খুব কাছেই আছে ওর।


তিন


কাবেরী আর রবি যখন বাড়িটার উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিল তখন ঠিক পাঁচটা বাজে। ওর ব্যাটারির হাতঘড়িটা তাই বলছে। পাঁচটা বেজে গেছে। আর একঘণ্টার মধ্যে আকাশ কালো করে সন্ধ্যা নামবে। তাছাড়া টুকটাক সামনেটা ঘুরবে বলে যে অজুহাতে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে কাবেরী তাতে একঘণ্টার বেশি সময় পাবে এমনটা আশাও নেই। রবি ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে। ভয়ের দানাগুলো হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে যেন! উঠোনে পা রাখতেই সেই চেনা ভেজা শেওলা গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দিল। খুব সন্তর্পণে সতর্ক হয়ে ওরা একটু একটু করে ঢুকে পড়ল বাড়ির চৌহদ্দিতে। পড়ে থাকা শুকনো গাছের পাতায় ওদের অস্তিত্ব যেন জানান দিচ্ছিল খসখস শব্দে। সামান্য ভয় কিংবা অসতর্ক যেকোনও মুহূর্তে অসম্ভব বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই চোখ-কান খোলা রেখে পায়ের দিকে খেয়াল রেখে তাকিয়ে তাকিয়ে ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে।
রবি ওর বাঁহাত দিয়ে একটা ছোট্ট শিশি ধরে তার থেকে জলের মতো একটা তরল ছেটাতে ছেটাতে যাচ্ছিল আশেপাশে। জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, ওটা একধরনের অ্যাসিড। এর ধারেকাছে সেসব আসতে পারে না নাকি। নিজেদেরও অনেকটা নিরাপদে রাখা যায়। গাছগাছড়া-আগাছায় ভরে গেছে গোটা জায়গাটা। দেখে মনে হচ্ছে মানুষ তো নয়ই, এমনকি কুকুর-বিড়ালও এ অঞ্চলে ঢুকেছে কি না সন্দেহ আছে।
হঠাৎ করে কাবেরী কিছু একটা বলার জন্য রবির দিকে ঘাড় ঘোরাতেই রবি মুখে আঙুল দিয়ে কাবেরীকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। কাবেরী রবির আচরণে বিরক্ত হয়েছিল বটে, কিন্তু পরমুহূর্তেই অনুভব করল খুব দ্রুত, ঠাণ্ডা, খুব ঠাণ্ডা চার-পাঁচ হাত লম্বা একটা সাদা সাপ প্রায় পায়ের আঙুল ঘেঁষে শুকনো পাতা মাড়িয়ে মচমচ করে ঢুকে গেল উঠোন পেরিয়ে বাড়ির দালানের উপর। বুকের ভিতরে গুরগুর করে উঠল। তাহলে কি ও ভুল করেছে এখানে এসে? ফিরে যাবে? কিন্তু কেন? মন মানতে চাইছে না যে কোনওভাবেই।
চাপা গলায় রবি বলে উঠল, “কতবার বারণ করেছিলাম তো মিঠি! দেখলি তো! ওরা ঠিক বুঝতে পেরেছে আমরা এসেছি। এবার একটা কিছু হয়ে গেলে আমি কাকুমণি আর জেঠুমণিকে কী বলব তুই বল?”
“উফ্‌! কিচ্ছু হবে না। আর তাছাড়া এখানে তো কেউ আমাদের ধরে রাখতে পারবে না। দরজায় তালাও দেবার মতো লোক নেই। সেরকম যদি সত্যি মনে হয়, দরজা তো খোলাই আছে!”
“তোর ঘটে যদি কিছু থাকে! ওরা কি পালাবার সময় দেয়? সেদিন দেখিসনি কী হয়েছিল?”
“দেখেছি তো। শোন, আমাদের থেকে ওদের ভয় থাকে ঢের বেশি। সেদিন আমার পায়ের শব্দে নিশ্চয়ই ও ভয় পেয়ে গেছিল। আর এখনও হয়তো তাই…”
“বাহ্‌ রে আমার লক্ষ্মীবাই! কালকেউটের সামনে ভিরমি খেয়ে এখন আবার রহস্য খুঁজতে বেরিয়েছে! দাঁড়া না, বাড়ি ফিরি, ঠিক কাকুমণিকে বলব।”
রবির কথাটা শেষ হতে না হতেই পায়ের নিচ থেকে শক্ত ঢিলের টুকরোটা তুলে কাবেরী ওর দিকে ছুড়তেই রবি নিচু হয়। আর ঢিলটা ঠকাং করে সোজা গিয়ে লাগে কোনও একটা ধাতুর উপর। ঝনঝন শব্দটা ধাক্কা খেতে থাকে ফাঁকা জায়গার এপার থেকে ওপার। আওয়াজটা কোথায় হল? ওরা দু’জনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়।
কথা বলতে বলতে দু’জনে উঠোন ছাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বাড়িটার ঘর লাগোয়া দালানে। সবক’টা ঘর পাশাপাশি। মোট তিনটে ঘর দেখতে পাচ্ছে। পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে ধুলো। নোংরা মাকড়সার জালে সামনে কিছু দেখা খুবই মুশকিল। হাত দিয়ে সেগুলো সরাতে সরাতে ওরা দু’জন এগিয়ে যাচ্ছিল ঠিক যেখানে ঢিলটা লেগেছে সেই জায়গাটায়। আসলে ওখানে কিছু একটা লেখা রয়েছে। বহু বছরের পুরনো হওয়ায় অতটা স্পষ্ট করে বোঝা না গেলেও ঢিলটা লেগে অংশটার যেটুকু ধুলো ঝরেছে, দেখা যাচ্ছে তাতে একটা লাল দিয়ে লেখা ‘জ’। আরও একটু এগোতেই মনে হল কিছু যেন ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে পায়ের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে লুকোল দালানে রাখা একটা বড়ো বাক্সের পিছনের দিকে। প্রাণীটার বাদামি লেজের কিছুটা দেখে কাবেরী একটু হেসে রবিকে বলল, “ইঁদুর।”
কিন্তু দেখল রবির মুখ তখন গম্ভীর। একটু ভয়ও পেয়েছে মনে হচ্ছে। ওর দিকে না তাকিয়ে ধুলো পড়া অংশটা হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল, “নাহ্‌, ওটা বেজি ছিল।”
কাবেরীও রবির সঙ্গে সঙ্গে হাত লাগিয়েছিল। স্পষ্ট হয়ে উঠছিল একটু একটু করে পুরোটাই। এটা একটা সাইনবোর্ডের মতো। দালানের শেষ ঘরটার ঠিক সামনে টাঙানো রয়েছে। রংটা পুরনো হয়ে যাওয়ায় কিছু কিছু অক্ষর আবছা হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু পড়তে অসুবিধা হচ্ছে না। কাবেরী বোর্ডের লেখাগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করলー
“পাগলা কুকুরের কামড়, হলুদ পোড়া
সাপের কাটা, কালো তাগা
ভূতের বাতাস, সরিষা পড়া
চোরের উপদ্রব, কণ্টক মন্ত্র। এছাড়াও কড়ি চালনা, বাটি চালনা, চুন পড়া
(বিফলে মূল্য ফেরত)”
ভীষণ অবাক লাগল কাবেরীর। এসব কী! উপরদিক থেকে পরপর যে দুটো প্রাণীর দংশনের কথা বলা হয়েছে সে দুটোতেই চিকিৎসা অতি আবশ্যক। কোনও হলুদ পোড়া বা কালো তাগায় কাজ হয় বলে তো ওর জানা নেই। এমনকি বাড়িতে পোষা কুকুর হলেও না। বেশ মনে আছে, সমীরকাকুর বাড়ির জার্মান শেফার্ড একটু আঁচড়ে দিয়েছিল বাবার পায়ে। তাতেও রীতিমতো ইঞ্জেকশন চলেছিল কয়েক পর্বে। আর ভূতের বাতাস, চোরের উপদ্রব, কী এসব? মনে মনে হাসি পেলেও মুখে সেসব প্রকাশ করেনি কাবেরী। কথাগুলোর নিচে কোনও ব্যক্তির নাম লেখা না থাকলেও কাবেরী বুঝতে পারে, এগুলো সেই ব্যক্তিরই লেখা যিনি বা যাঁদের নিয়ে আজও সকলে ধন্দে। ‘বিফলে মূল্য ফেরত’ কথাটা লেখা থাকলেও ভদ্রলোক সৎ ছিলেন এমন তো নাও হতে পারে।
বোর্ডের সামনেটা থেকে সরে আরও ঘরগুলোর দিকে এগোতেই পা জড়িয়ে যায় কীসে একটা যেন। নিচু হয়ে দু’জনেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। আর ওরা দেখে, ওদেরই চোখের সামনে টানটান হয়ে পড়ে রয়েছে একটা ঘোলা রঙের একমানুষ সমান চামড়ার স্বচ্ছ অংশ। একটা খোলস। বিদ্যুৎ-গতিতে বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যায় ওদের শরীরে বইতে থাকা রক্তের স্রোত। আঁশটে ভেজা গন্ধে ম ম করছে খোলসের চারপাশটা। রবি উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আর একদম নয়। বাড়ি চল। গন্ধটা পাচ্ছিস? খোলস ছেড়ে সাপটা নিশ্চয়ই কাছে কোথাও লুকিয়ে আছে। সন্ধে হয়ে আসছে।”
রবিটা বোকা, মনে মনে ভাবছিল কাবেরী। খোলস-ছাড়া সাপ কখনও আক্রমণ করে না সহজে। খোলস পরিবর্তনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে সাপ নিস্তেজ হয়ে যায়। এই সময় তারা পছন্দমতো নির্জন জায়গায় নিজেদের লুকিয়ে রাখে। লিমফেটিক বা লসিকা-গ্রন্থি নিঃসৃত তরলের কারণে তাদের চোখও অস্বচ্ছ হয়ে যায়। তাই এ-সময় সাপেদের শিকার ধরাটা যে একেবারেই অসম্ভব তা ভালোমতো জানে কাবেরী। জীববিজ্ঞানের দিদিমণি সুচরিতাদি অষ্টম শ্রেণীর সিলেবাসের বাইরেও এমন এমন জিনিস গল্পের মতো করে পড়ান যা কখনও ভোলবার নয়। আর ঠিক সেই কারণেই বিজ্ঞানের নানান বিষয়কে স্বযুক্তির মাধ্যমে ভেবে দেখে কাবেরী। কোনও কিছুকে চট করে বিশ্বাস করাটা ওর ধাতে নেই বললেই চলে। বাবা-মায়ের বকুনিও তার জন্য কম খেতে হয় না ঠিকই, তবুও…
ধুলোর চাদরে পা ঘষে চলতে চলতে ওদের দু’জনের জামাকাপড়ও বেশ নোংরা হয়ে গেছে। খোলস দেখে উঠে দাঁড়িয়ে কাবেরীর আরও একবার ঘরগুলোয় ঢুকে ভালো করে দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই সামনের উঠোনে মরা রোদের কণাটুকু সরে গিয়ে আস্তে আস্তে এই লম্বাটে টালির চালের ছায়াটুকু বড়ো হতে শুরু করেছে। দুপুরের গরম হলকা কমে এসে একটা বাসি গন্ধে ভরে গেছে ঘর-উঠোনের চারপাশ। মাঝেমধ্যেই মনে হচ্ছে কারা যেন চুপিচুপি এসে দেখে যাচ্ছে ওদের। বাড়িতে ঢোকার সময়ও এমনটাই মনে হয়েছিল। সরসর, খসখস শব্দে চমকে ঘাড় ঘোরালেও অদৃশ্য সেসব অবয়ব একটুও চোখে পড়েনি। কী অদ্ভুত!
দালান থেকে মুখোমুখি যে ঘরটা সোজা চোখে পড়ে সেটার একটা জানালা অর্ধেক ভেঙে ঝুলে আছে। ঘরের দরজাটার একটা পাল্লাও খোলা। বাকিটা ভেজানো। অল্প আলোয় যেটুকু চোখে পড়ে ঘরটায় একটা খাট, আলমারি আরও কী কী সব রয়েছে। বাড়ির লোকেরা নিজেদের আসবাব কি কিছুই সঙ্গে করে নিয়ে যায়নি? সাইনবোর্ড টাঙানো ঘরটাতেও তো দুটো বড়ো মাপের আলমারি দেখেছিল। এভাবে কেউ নিজেদের জিনিস ফেলে যায়? কোনও চোর বা গাঁয়ের লোক এসেও যে এখানে হাত দেয়নি সে তো বোঝাই যায়। হাত দিলে হয়তো আসবাব এভাবে থাকত না। যাবার আগে সঠিক উত্তরটা পেতে কাবেরী রবিকে পাশ কাটিয়ে যেই মাত্র ঘরের চৌকাঠে পা রেখেছে, কোথা থেকে ঝড়ো একটা বাতাস ঘূর্ণির মতো পাক খেয়ে এসে সশব্দে কাবেরীর হাতের উপর বন্ধ হয়ে যায় দরজাটা। দুটো দরজার ফাঁকে বন্ধ পাল্লাটায় আঙুল আটকে যাওয়ায় কঁকিয়ে চিৎকার করে নিজের ডানহাতটাকে প্রাণপণে বাঁহাত দিয়ে ছাড়াবার চেষ্টা করতে থাকে। যন্ত্রণায় লাল হয়ে আসা হাতটাকে এক হ্যাঁচকায় ছাড়ায় রবি। গায়ের জোরে অনেক ধাক্কা দিয়েও কিছুতেই খুলতে পারেনি আর দরজাটা।
হাতটাকে চেপে কাবেরী দালানের মেঝেতেই বসে পড়েছিল। ওকে তুলে রবি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি ওখানে। ওর থমথমে মুখ দেখে খারাপ লাগছিল কাবেরীর। ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা মুখের মধ্যে পুরে বাড়ির উঠোনে নেমে পড়েছিল ওরা। কিন্তু কেন কে জানে কাবেরীর বারবার মনে হচ্ছিল ওকে আবার ফিরে আসতে হবে। এখনও অনেক কিছু জানার, দেখার বাকি রয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে ঢুকতে পারল না কেন ও? কেন দরজাটা ওভাবে বন্ধ হয়ে গেল? কই, বাইরে তো তেমন কোনও হাওয়া বইছে না! খটকা আর সন্দেহগুলো বেড়ে উঠছিল একটু একটু করে। নিজের মধ্যেই বেশ অস্থিরতা অনুভব করছিল ও।
মনের প্রতিফলন যেন ফুটে উঠছিল ফতেপুরের বুকে নেমে আসা সন্ধেতেও। কালো জমা হয়ে আকাশটা কেমন থম মেরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কোনও কারণে ঘোর বিপদের আশঙ্কা করে বাড়িমুখো পাখিগুলো নিঃশব্দে তাদের বাসায় ঢুকে পড়ছে। এ-বাড়ির চারদিকে অগোছালোভাবে যেসব বুনো গাছের জন্ম হয়েছে সেগুলোর কাণ্ডে ছানা-পাখিদের দুয়েকটা চিড়িক চিকমিক আওয়াজ শোনা গেলেও বড়ো পাখির ডানার ঝটপটানিতে যেন সেগুলো আস্তে আস্তে আর শোনা যাচ্ছিল না। বাসায় ফিরে চোখ রাঙিয়ে শব্দ করতে নিষেধ করছে হয়তো মা-বাবা পাখিরা। কাদের ভয় পাচ্ছে ওরা? হরিহরজেঠু, মঞ্জুলাপিসির কথা কি সত্যি তবে? এমনটা কি কখনও হয়? হতে পারে।
ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়িটাকে পিছন ফিরে দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল টালির একদম উপরে বেশ বড়ো আকারের একটা কিছু লম্বা হয়ে মুখ ঝুলিয়ে আছে। টালির শেষপ্রান্তে তার মুখটা বিশ্রীভাবে তাকিয়ে আছে যেন ওদেরই দিকে। ও তাকাতেই ঘষটে ঘষটে খুব তাড়াতাড়ি কোথায় যে মিলিয়ে গেল প্রাণীটা বুঝতেই পারল না ও। ওটা কী? সাপ? গায়ের রোমকূপ কাঁটা দিয়ে উঠল কাবেরীর।
চলে যেতে যেতে হঠাৎই অন্ধকারে মিশে থাকা গাছগুলোর একটা জায়গা থেকে চকচকে কিছু নজরে পড়ে। বস্তুটা ঠিক ঠাওর করতে পারে না কাবেরী। ওর চলার গতি কম হতেই ওকে প্রায় হাত ধরে টেনে উঠোন থেকে পিচের রাস্তায় তোলে রবি। উফ্‌, নিজেদের অজান্তেই একবুক নিঃশ্বাস নেয় প্রাণভরে ওরা।
দমবন্ধ গুমোট ভাবটা আগের চেয়ে অনেকটাই কেটে গেছে রাস্তায় আসার সঙ্গে সঙ্গে। কেন? যেন সুমেরু আর কুমেরু! একই জায়গার আবহাওয়া এতটা বিপরীত হয় কী করে? ফুরফুরে একটা মিষ্টি হাওয়ার রেশ আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে কাবেরীর কপাল। সমস্তটাই বড্ড গোলমেলে ঠেকছে। পুরনো ভগ্নপ্রায় জীর্ণ বাড়ির পরিবেশ হয়তো এমনই হয়। অনেকদিন অনেক বছর মানুষ বসবাস না করার ফলে হয়তো বাসি পানসে গন্ধটা কাটতে চায় না। কিন্তু ওই দমকা হাওয়া? ওই যে আধশোয়া একটা প্রাণী চালের মাথা থেকে ওদেরই দিকে তাকিয়ে ছিল! আর সেই বিশ্রী গন্ধে শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা শিরশিরে অনুভব! চকচকে ওই বস্তুটাই বা কী? ওরকম একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে কীই বা থাকতে পারে? আরেকটু সময় পাওয়া গেলে আরও কিছুটা খুঁটিয়ে দেখতে পারত।
আঙুলটা এখনও অল্প অল্প চিনচিন করছে। হাতদুটোকে জড়ো করে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ওদের বাড়ির কিছুটা আগে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। দেখে মন দিয়ে কী একটা দেখছে রবি। বড়ো যে ড্রেনটা মিশে গেছে কালীদের মজা পুকুরে সেটা থেকে একটা ব্যাঙ বেরিয়েছিল হয়তো। তখনই তাকে শিকারে পেয়ে... শুধু দেখতে পাচ্ছে ব্যাঙটার পিছনের পাদুটো অসম্ভব ছটফট করে চলেছে। কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না। কিছুতেই না। আর একটু একটু করে বাইরে বেরিয়ে থাকা শরীরটা ঢুকে যাচ্ছে হাঁ করা সবুজ মুখের শুয়ে থাকা আরেকটা শরীরের মধ্যে। কী প্রচণ্ড একটা কষ্ট! একটা জান্তব গোঙানি বেরিয়ে আসছে শিকার ও শিকারির দিক থেকে। কাবেরী আর থাকতে না পেরে দৌড়ে ঢুকে যায় ওদের লোহার গেট পেরিয়ে।


চার


বাড়িতে চাকরবাকর নেহাত কম নয়। সেটা ভেবেই যা ভয় ভয় করছিল। ওখানে ঢুকতে কেউ দেখে ফেলেনি তো! বলা তো যায় না। দেখলেই কথাটা বাড়ির বড়োজনের কানে যাবে। অস্থিরতার চোটে খুব ভালো করে খাওয়ায় মনও বসাতে পারেনি কাবেরী। কোনওমতে খেয়ে ওর ঘরের বিছানায় গিয়ে বসেছিল চুপচাপ।
জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর তাপে ঝলসে গেছে সবুজে ঘেরা ফতেপুর। কোথাও এতটুকু ঠাণ্ডা নেই যেখান থেকে দুপুরের তাপের ধোঁয়া ধোঁয়া ভাপ বেরোচ্ছে না। অথচ কী অদ্ভুত! ওই বাড়ি সংলগ্ন সমস্ত জায়গাটাই কেমন ভেজা আর জলো হয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছিল যেন বছরের বারোটা মাসই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হয়ে চলে ওখানে। চেনা জায়গায় অচেনা একটা দ্বীপ হয়ে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে যেন।
কাচের জানালা দিয়ে নিপাট সাদা আলোর রেখাটা ওর বিছানার উপর পড়েছে আড়াআড়িভাবে। শুয়েও শান্তি হচ্ছে না কিছুতেই। এপাশ ওপাশ করতে করতে মনে পড়ে যাচ্ছে সেদিনের সেই বিকেলের কথা, পরিত্যক্ত বাড়িটার কথা। আর হরিহরজেঠুর কথা। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওকে চেক-আপ করতে এসে উনিই তো প্রথম বলেছিলেন তপন দলুইয়ের কথা! আজ থেকে আন্দাজ পঞ্চাশ বছর তো হবেই। হয়তো কাবেরীর বাবাও তখন অনেকটাই ছোটো। ওষুধের ঘোরে তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকলেও কথাগুলো শুনতে শুনতে শরীরের প্রতিটা অবশ ইন্দ্রিয় জেগে উঠছিল। আর তাই থাকতে না পেরে পরেরদিনই ঠিক করে নেয় ওখানে যাওয়ার। হরিহরজেঠুর মুখ থেকে যা শুনেছিল তা অনেকটা এইরকমー
মানুষটা কোথা থেকে কীভাবে এখানে এসেছিল কেউ জানে না। অনেকে বলে ওর নাকি জাত-কুল-ধর্ম কিছুই ছিল না। সত্যিকারের ভিটেমাটি বলে কোনও কিছুই থাকে না এমন ভবঘুরের। ওর এ-গাঁয়ে আসার বেশ কিছুদিন আগে এক মুসলমান ফকিরকে এ অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। ছোটোদের বড়োদের মাথায় চামর ঠেকিয়ে, আল্লার দোহাই মেনে টইটই করে চষে বেড়াত। গরিব-দুঃখী বলে কেউ আর তাড়ায়নি। এদিক ওদিক গৃহস্থ থেকে ভিক্ষা করে মাস তিনেক পথেঘাটে থাকার পর কোথায় যেন মিলিয়ে যায় লোকটি। আর দেখতে পাওয়া যায়নি তাকে।
তারপরেই আবির্ভাব এই দলুই পরিবারের। সপরিবারে। স্ত্রী, মেয়ে, আর তপন দলুই। পাড়ার কিছু অনুসন্ধানী চোখ বলত, সেই ফকির বাবাজীবনের চোখের সঙ্গে নাকি এক অদ্ভুত মিল দলুইয়ের। মিল সেই হাড় হিম করা তীক্ষ্ণ দুটো অক্ষিকোটর। রক্তচক্ষু, হাড় বের করা শরীরে গোটা দশেক রকমারি হার পরে থাকত দিনরাত। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা তো বটেই, ভয় পেত সাধারণ লোকেরাও। চেহারা তো বটেই, তাছাড়া লোকটার ঝুড়িতে সবসময় থাকত নানান বিষধর সাপ। কাঁধে, গলায়, মাথায় গোখরো, কেউটে নিয়ে সর্বক্ষণ ঘুরে বেড়াত। বলত, মা মনসা তার সঙ্গেই আছেন। সাপ সবার ভালো করবে। কেউ যেন এদের না মারে।
উটকো লোকের আনাগোনা তেমন সুবিধার ঠেকেনি সকলের। তাই গ্রামের সালিশি সভায় ডেকে ভালো কথায় তপন দলুইয়ের উদ্দেশ্য জানা হবে বলে স্থির করে সকলে। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় অসম্ভব এক চমকপ্রদ ঘটনা।
দিনটা ছিল নাগপঞ্চমীর মেলার প্রথমদিন। আষাঢ়ের সেই দিনগুলোতে ফতেপুরের পাশের গ্রাম রামরাজাতলায় মনসা মেলা বসত ধুমধাম করে। বিভিন্ন গাঁ থেকে গুনিন, সাধুসন্তরা আসত মেলায়। ঢাক বাজিয়ে কোনও এক জলাশয়ের জলকে পবিত্র মেনে পূজার ঘটে ভরে চলত দেবী মনসার পূজা।
মনিহারি সুবীরের একমাত্র ছেলেকে সেই ঘোর বর্ষায় সাপে কাটে। বিষাক্ত কামড়ে ছোটো ছেলেটার শরীর নীল হয়ে যায়। হাত-পা সিঁটিয়ে কুঁকড়ে আসতে থাকে ক্রমশ। ডাক্তার-কবিরাজও হার মানে। হরিহরজেঠুও আশা ছেড়ে দেন। সবাই যখন মৃতপ্রায় শরীরটাকে নিয়ে অপেক্ষায় জলে ভাসানোর জন্য, ঠিক সেই সময়ই মেলায় তপন দলুই সাপের খেলা দেখাতে দেখাতে কীভাবে যেন জানতে পারে। খবর দেয় এক্ষুনি তার কাছে যেন ছেলেটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজি ছিল না কেউই। কিন্তু পিতামাতার মন কি সহজে সন্তান হারাতে চায়? ছেলের অবশ শরীর কাঁধে নিয়ে সুবীর মেলায় উপস্থিত হয়। তারপর তপন দলুই অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে তোলে ছেলেটিকে। টানা একরাতের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সকালের আলোর সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকায় সুবীরের ছেলে। তবে এ চিকিৎসা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? কী করেই বা সাপের বিষ সরে গেছিল কেউ তা জানে না। কারণ, চিকিৎসার সময় সেই জায়গায় আর কাউকে থাকার অনুমতি দেয়নি তপন দলুই। শুধু গুনিনের তাঁবুর বাইরে বসেছিল বাবা-মা আর জনা পাঁচেক কাছের কিছু লোক। দলে দলে লোক এসে পরেরদিন জড়ো হয় সুবীরের ছেলের বেঁচে ওঠার খবর পেয়ে।
এরপর যে ক’দিন মেলা ছিল রোগভোগ, ঝগড়া-বিবাদ, আরও নানান অশান্তি নিয়ে মানুষ ভিড় জমাতে থাকল তপন দলুইয়ের কাছে। চোখের পলকে কেমন করে যেন সেসব গায়েবও হয়ে যাচ্ছিল। একের পর এক সুসংবাদে সবার মুখে ফুটছিল চওড়া হাসি। সালিশি তো দূরে থাক, সবাই তপন দলুইকে একপক্ষে ভগবানের দূত বলে মানতে শুরু করে। যেসব সন্দেহের চোখে সে ছিল ফকিরের ছদ্মবেশে কোনও এক মুসলমান, তারাও দিব্যি ভুলে গিয়ে নিজের নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মেতে ওঠে। বলতে থাকে তারাই, নামকরা গুনিনদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে হয়। তাই তাদের রূপ বেশভূষা বদলাতে হয় মানুষের জন্য। এর মধ্যে দোষের কিছুই নেই।
প্রথমদিকে বিনামূল্যে উপকার করলেও লোকের জোরাজুরিতে সামান্য কিছু মূল্য নিতে শুরু করে পরের দিকে। কয়েকদিনেই ফতেপুরের নামকরা গুনিন হয়ে ওঠে তপন দলুই। ডাক্তার-কবিরাজ দেখানোর আগে লোকে তপনের ঘরেই যেতে থাকে। বউ-মেয়ে নিয়ে পড়ে থাকা জমিতে ঘরও বানায়। কিন্তু কালের চাকা যে সবসময়ই ঘুরছে! তাকে আটকাবে কার সাধ্য! আর তারপরেই ঘটে সেই ভয়াবহ ঘটনা…
এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কাবেরী ঘুমিয়ে পড়েছে তা ঠিক নিজেও জানে না। আচমকাই একটানা একঘেয়ে চাপা আওয়াজে উঠে বসে পড়ে বিছানায়। ঘুমজোড়া চোখ, আর মাথার মধ্যে অগুনতি প্রশ্নের ভিড় কিছুতেই সচেতন করে তুলতে পারে না নিজেকে। আধো ঘুমে চোখ কচলে চারদিকটা দেখতে থাকে ভালো করে। কই, কিছু তো চোখে পড়ছে না! নিস্তব্ধ রাত শুধু অসংখ্য ঝিঁঝিঁর আঁতুরঘর হয়ে জেগে। হঠাৎই মেঝের উপর কীসের যেন একটা ছায়া নড়ে উঠতে দেখে বালিশের পাশে রাখা টর্চটা শক্ত করে ধরে। ছায়াটা একটু নড়ে উঠেই থেমে গেল মনে হল। টর্চের আলো ধরে কাবেরী বুঝতে পারল ছায়াটা মেঝের উপর পড়লেও, সেটি রয়েছে ঠিক ওর মাথার কাছের জানালায়। আর সেদিকে তাকিয়ে উলটো পিঠের চাঁদের আলো, আর ঘরের ভিতরে ওর হাতে ধরা টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখল ওর জানালা বেয়ে এঁকেবেঁকে উঠছে একটা সাপের শরীর। চাঁদের রুপোলী আলোয় চকচক করে উঠছে তার ধূসর গাটা। আর তার ভারী শরীরের চাপে জানালায় শব্দ হচ্ছে খসখস, কটকট, মড়মড়…


পাঁচ


ভয়, ভাবনা, কৌতূহল সব মিলিয়ে বিপুল গোলকধাঁধা। বাকি রাতটা কিছুতেই ঘুম আসেনি। জানালা বেয়ে উঠতে থাকা লতানে শরীরটা উপরের দিকে যেতে যেতে মিলিয়ে গেছিল শেষরাতের দিকে। কাঁটা হয়ে বসে ছিল কাবেরী আকাশের আলো ফোটা অবধি। কোথায় গেল সাপটা? দৌড়ে ছাদে গিয়েছিল পাখি ডাকার সঙ্গে সঙ্গে।
কাবেরীদের বাড়িটা বেশ পুরনো। ছাদের গায়ে গায়ে চুন, রং খসে যাওয়ার দাগ স্পষ্ট। উঁচু গোল থামের আকারের পিলার ছাদের চারদিকে দাঁড়ানো। সিমেন্টের জলের ট্যাঙ্কের নিচেও বেশ খানিকটা জঞ্জাল জড়ো করা। বাকি কোথাও তেমন কোনও গর্ত বা গা ঢাকা দেওয়ার জায়গা তো চোখে পড়ছে না। তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোত্থাও দেখতে পায়নি সরীসৃপকে। ওর ঘরটা দোতলায়। মাটি থেকে আন্দাজ কুড়ি ফুট উপরে। নিচে থাকলেও না হয় বনজঙ্গলের ঝোপঝাড় থেকে এসবের উপদ্রব হতে পারে। কিন্তু এত উপরে হঠাৎ ওর জানালার উপরে আসতে যাবে কেন সাপটা? কীসের জন্য? এভাবেই ঘোরাফেরা করে সাপ এখানে?
চুপ করে থাকা যায় না এমন অবস্থায়। ছাদে ঘুরছিল বেশ অনেকক্ষণ। কখন যে পাতলা আলো রোদ হয়ে ক্রমশ আকাশের মাঝখানে আসতে শুরু করেছে খেয়ালই করেনি। একটু পরেই মঞ্জুলাপিসি পায়রাকে দানা দিতে এসে ওকে দেখতে পায়। অবাক হয়ে কাবেরীকে জিজ্ঞেস করে, এত সকালে সে এখানে কী করছে। গতকাল রাতের সমস্ত ঘটনা কাবেরী তাকে জানায়। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে পিসি। গায়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকে ওর। বলে, “সেই বিকেলের ঘটনাটা এখনও ভুলতে পারিসনি মা? তাই বারবার ওদেরই দেখছিস তুই! ভুলে যা। নাহলে যে ওরা তোকে ছাড়বে না। মনকে শক্ত কর। দাঁড়া, আজই সন্ধেবেলা তোকে সর্ষে, শুকনো লঙ্কা পোড়া দিয়ে ভালো করে ঝেড়ে দেব। ব্যাটারা বাপ বাপ বলে পালাবে।”
কাবেরী পিসির কথা কিছুমাত্র বুঝতে পারে না। হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে মুখের দিকে। পিসি আরও বলতে থাকে, “শয়তান, শয়তানের আখড়া হয়েছিল আমাদের গ্রামে। কী ভাগ্যি ভগবান রক্ষা করেছেন! কালীপদর মেজো ছেলেটা, রামরতনের পোয়াতি বউ, ধলার গরুটা যেভাবে আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছিল চোখে দেখা যায় না। ও সবাইকে শেষ করে দিত আর বেশিদিন হলে। ঠাকুর ঠাকুর!” মঞ্জুলাপিসি বারবার ডানহাতটাকে তুলে একবার কপালে, একবার বুকে ঠেকাচ্ছিল।
“কিন্তু, পিসি ওরা আমার কোনও ক্ষতি করবে কেন? আমি কী ক্ষতি করেছি ওদের? কীসব বলছ তুমি, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
আরও খানিকটা কাছে সরে এসে মঞ্জুলাপিসি গলা নিচু করে বলে, “এতকিছু এই ছোটো মাথায় বুঝতে হবে না। এসব যত কম ভাববি ততই মঙ্গল। চল, বেলা হল নিচে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে কিছু খেয়ে নিবি আয়।”
জানতে হবে না বললেই কি আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায়? জানতে যে হবেই। নাহলে এত কষ্ট করে লেখাপড়া শেখা কেন? কাকে জানাবে? কাকে বলবে ওর মনের শঙ্কাগুলো? রবিকে আরেকবার বলে দেখবে, যদি রাজি হয় অন্তত একবারের জন্য পরিত্যক্ত বাড়িটায় যেতে? কেন এমন হচ্ছে তা যদি কিছুটা বুঝতে পারে। কারণ, কাবেরীর হাতে আর দিন চার-পাঁচমতো বাকি। এই অস্থির অবস্থায় যদি বাড়ি ফেরে, কোনওভাবেই মন বসবে না পড়াশুনায়। অপেক্ষা করতে হবে পরের বছরের জন্যে। মানে বারোটা মাস আরও। অসম্ভব!
মনখারাপ করে বসেছিল সে ঘরের জানলার দিকে তাকিয়ে। কাচ খুলে চারপাশটা দেখেওছে। অথচ রাতের বীভৎসতা এখন কেবল দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। রোদের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে একটু একটু করে। জানালা খুলে দিতেই বাইরের গরম ভাপ শিশুর মতো হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে কাবেরীর শরীর ছুঁয়ে। বুকটা খুব খালি খালি লাগছে। কে জানে রবি আসবে কি না। ফোন করেছিল আবার। সেদিনই বলে দিয়েছিল ওখানে আর যাবে না। কিন্তু কাবেরী যে আর পারছে না। কী এক দুর্বোধ্য আকর্ষণ বারবার ওর মনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই পরিত্যক্ত জায়গায়। বাড়ির পরিবেশটা মাঝে মাঝে বড্ড অচেনা লাগছে। ছোটোবেলা থেকে এখানে আসছে। কিন্তু কাল রাতের অভিজ্ঞতা কোনওদিনই হয়নি। এতটাও মনের ভুল কি হয়? হাওয়ার পরতে পরতে খুব দূর থেকে ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসছে ঢাকের শব্দ। আনমনা হয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল, ঢাক! এখন? পুজো আসতে তো ঢের দেরি। এখন স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। তার মানে জ্যৈষ্ঠমাস হবে হয়তো। চরকের মেলাও তো কিছুদিন আগে হয়ে গেল। তবে? জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে কাবেরী।
“কী রে মিঠি, কী দেখছিস অত ঝুঁকে?”
চমকে পিছনে ফিরে তাকায় কাবেরী। “মা, ঢাক বাজছে কোথায়?”
অল্প হেসে মিনতি উত্তর দেন, “ঝাঁপান এসে গেল যে!”
“ঝাঁপান! সেটা আবার কী?”
“ঝাঁপান উৎসব। তুই দেখিসনি কোনওদিন। শ্রাবণে নাগপঞ্চমীর আগে বিভিন্ন জেলা থেকে সাপুড়েরা এসে নানান কৌশলে খেলা দেখায় এখানে। ঝাঁপান বাংলার তিনশো বছরের পুরনো ঐতিহ্য। সপ্তদশ শতকের শ্রাবণ সংক্রান্তিতে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা প্রথম সাপকে মন্ত্রবলে বশে আনার জন্য এই উৎসব শুরু করেন। সেসময় গুনিন, সাপুড়েদের রাজসভায় নানান উপঢৌকনও দিতেন রাজারা। তারাও খুশি হত। এখন আর তেমন উপহার না পেলেও পুরনো ঐতিহ্য বজায় রাখতেই এসব করে থাকে রাজ্যের সাপুড়েরা। তবে শুনেছি এখানেও ক্লাব থেকে একটা পুরস্কার বরাদ্দ করা হয়। যে সাপুড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের বাহবা পায়, তার জন্য। আমার থেকে তোর মঞ্জুলাপিসি, জেঠিমা, এ বাড়ির সবাই ভালো বলতে পারবে। এবারে পাঁজি অনুযায়ী ঝাঁপানের দিনক্ষণ এগিয়ে এসেছে। কোনও বারে এমন হয় না। তোর জেঠিমা বলছিল, আমরা তো আর বেশিদিন নেই। তাই যদি একবার ঘুরে আসা যেত। আমি রাজি হয়নি। যা বিপদ গেল ক’দিন আগে! তোর বাবাও রাজি হয়নি।”
কথাগুলো শুনতে শুনতে বরফকুচির মত ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছিল কাবেরীর শিরদাঁড়া বেয়ে। এরকম পরিস্থিতি যে কখনও ঘটবে স্বপ্নেও ভাবেনি। এখানেও সাপ? শুধু কল্পনাতেই নয়, কাবেরীর বাস্তব ঘিরে রেখেছে এই সরীসৃপটা। ওকে যে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। কীসের ইঙ্গিত ওকে যে করেই হোক বুঝতে হবেই। কী হতে চলেছে ওর সঙ্গে? কেনই বা এভাবে সাপ-জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকছে ও? বাবা-মা রাজি তো হবেই না জানে ও। কিন্তু একবার বলে তো দেখতে পারে, ‘মা, আমি তো এখন ভালো হয়ে গেছি। জ্বরও আর নেই। চলো না।’
মিনতির মুখটা গম্ভীর হয়ে যায় মেয়ের আবদার শুনেই। ভারী গলায় বলেন, “আমি এসবের মধ্যে নেই। পারো তো বাবাকে রাজি করাও।”


ছয়


সারাদিনের পীড়াপীড়ির পর কাবেরী বাবাকে রাজি করিয়েছিল। রবি, জেঠু, মঞ্জুলাপিসি আর বাবার সঙ্গে যখন ছাতিমতলার মাঠে এসে দাঁড়ায় ওরা তখন সূর্যের তেজ অনেকটাই কমে গেছে। বেলা সাড়ে চারটে। কমলা আলোয় ভরে গেছে লোকে লোকারণ্য মাঠের এ-ধার থেকে ও-ধার। পা ফেলার সামান্য জায়গাটুকু নেই। গিজগিজ করছে ছোটো থেকে বড়ো সবার উৎসাহী মুখ, মাথা। কাবেরী বুঝতে পারল না হঠাৎ করে আজ এখানে এল কেন। কীসের তাগিদ ওকে এক মুহূর্ত ঘরে থাকতে দিল না? ও যেন নিজের অজান্তেই কেমন ঘোরের মধ্যে রয়েছে। কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে তার থেকে বড়ো একটা প্রশ্নই জাগে, কেন তপন দলুইয়ের সমস্ত কিছু অভিশপ্ত হয়ে আছে? কেন? যদি সে গ্রামের উপকারই করবে তাহলে এমনটা হল কেন? আর যদি সে বিপথে গিয়ে মানুষের ক্ষতি করেছিল, তার পিছনেও একটা বড়ো জিজ্ঞাসা।
মাইকে অসম্ভব জোরে একটা গান হয়ে চলেছে। সবটা বুঝতে না পারলেও কিছু কিছু কথা বুঝতে পারছে, মা গো বিষহরি, তোমায় স্মরি... সুর, তাল কেটে যাওয়া গানটা জায়গাটার মতোই বেমানান লাগছিল কাবেরীর।
একটু একটু করে আকাশ ঢেকে বিরাট একটা ছায়ায় গোটা মাঠ জুড়ে অন্ধকার নেমে এল। জেনারেটরের আলোয় অলৌকিক মায়ানগরীর সাজে সেজে উঠল ছাতিমতলার মাঠ। এ যেন এক রহস্য গুহা। আর হরেক কিসিমের মানুষ এখানে নিজের নিজের হিংস্র লোলুপতায় জাদু করে চলেছে ক্রমাগত। প্রচণ্ড উল্লাসে ছোটো লরি ভাড়া করে একে একে এসে দাঁড়াল অসংখ্য সাপুড়ে। মাটির বাঘের পিঠে চেপে, মুখে চোখে শরীরের খোলা অংশে সাদা, হলুদ, নানা রঙের বিকৃত নকশায় কী বিচিত্র সে রূপ তাদের! কেউ কেউ ঝলমলে পোশাকে সেঁটেছে দশ-বিশ টাকার নোট। হাত তুলে শূন্যের দিকে আহ্বান করছে। সেই সঙ্গে বেজে উঠছে ঢাক, ঢোল। বেজে উঠছে গোল আকারের বিন ফুঁড়ে কি তীব্র বিবর্ণ সুর। দু’কান হাতের তেলো দিয়ে চেপে ধরে সে। কাবেরী চোখের পলক ফেলতে পারে না। বুকের ভিতর কে যেন হাতুড়ি পিটতে শুরু করে। খামচে ধরে রবির হাতটা। রবি যেন কিছু বলছে ওকে। ও কি শুনতে পাচ্ছে না? তাহলে শুধু রবির শব্দহীন ঠোঁটটাকে এভাবে নড়তে দেখছে কেন? ও কোথায়? চোখের চারপাশটা টলটল করে কেঁপে উঠছে কেন? দুলে উঠছে কেন? ধোঁয়া ধোঁয়া ঝাপসা। আবছা। কমে আসছে আশেপাশের লোকগুলোর কথা। যেন ওরা সরে যাচ্ছে একটু একটু করে। শুধু ভেসে উঠছে আরেকটা দৃশ্য। সম্পূর্ণ অন্যরকম দৃশ্য! হাত দিয়ে বাতাসকে খামচে ধরতে যায় কাবেরী। দেখে, একটা হাড় জিরজিরে লোক বনবন করে নাচছে। বৃত্ত রচনা করে চলেছে ঢাকের তালে। সমস্ত শরীর গা ঘিনঘিনে সবুজ রঙে লেপটে। কানে, জিভে, ঠোঁটের নিচে ঝুলছে বড়ো বড়ো আংটার মতো নাকছাবি। এমন কখনও দেখেনি ও। কাবেরীর গলা, বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আজ বহুবছর ধরে ও একফোঁটা জল মুখে দেয়নি। লোকটার টকটকে লাল জবার মতো চোখে সাদা অংশ কিছুমাত্র জেগে নেই। চোখের মণিতে অস্বাভাবিক এক উন্মাদনা। হঠাৎ নাচতে নাচতে লোকটা দুটো ঝুড়ির মতো বাক্সের ঢাকনা খুলে দিল। হাতে নিল একটা বিশাল বিন। মুখ ফুলিয়ে বিনে ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাসি শেওলা ধরা গন্ধে ভরে গেল পুরো জায়গাটা। কাবেরী ছুটে পালিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু পারল না। মাথার উপর দিয়ে মনে হল বুপ বুপ আওয়াজ করতে করতে পেঁচা ডেকে চলে গেল। বাবা, জেঠু কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। রবি কোথায়? কেউ নেই ওর পাশে! এত ভয় করছে কেন ওর? চিৎকার করতে পারছে না। গলার স্বর বুজে গেছে একেবারে। বিনের সুর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। আরও, আরও।
ঠিক সেই সময়েই রোগা শরীরের লোকটার পাশে এসে বসেছে দুটি মহিলা। একটা ওরই বয়সী মেয়ে। আরেকটা স্ত্রীলোক। এরা কারা? বিনের সুরে সুরে মাথা দোলাতে থাকে তারা। বেশ কিছুক্ষণ। তারপর দু’জনেই মুখ অল্প ফাঁক করে, আর ভীষণরকম অদ্ভুতকে ঘটে যেতে দেখে চোখের সামনে কাবেরী। অন্য কোনও প্রাণী নয়, গোটা দুই কুচকুচে কালো সাপ আস্তে আস্তে মহিলাদুটোর মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সরসর করে ঢুকে যাচ্ছে দুটো ঝুড়ির মধ্যে! এ যে অসম্ভব! এ কোন অবাস্তব দেখছে ও? আবারও ঝাপসা হয়ে আসছে চোখের সামনেটা। হাত দিয়ে কাউকে ছুঁতে পারছে না কাবেরী। নিশ্ছিদ্র একটা ভয় ওর গলার কাছে কান্না এনে জড়ো করেছে। ধোঁয়া ধোঁয়া অংশগুলো পর্দা সরিয়ে যেন আরও কিছু দেখাতে চাইছে ওকে। ওই তো কাবেরী দেখতে পাচ্ছে লাল কাপড় পরা সারা গায়ে ধুলো মাখা একটা লোক পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে। কার সঙ্গে যেন কীসব বলছে। কিছু শুনতে পাচ্ছে না। কী হচ্ছে এসব? পুরো ছবিটা কেঁপে কেঁপে নড়ে উঠছে বারবার। দুটো হাত শুধু দেখতে পাচ্ছে। কী একটা বোতলে ভরে দিচ্ছে ওই লোকটাকে। ভালো করে চোখের পাতা মেলে ধরে কাবেরী। যে লোকটা একটা কাচের বোতল দিচ্ছে লাল কাপড় পরা লোকটাকে তার দু’হাতের আঙুল শক্ত করে ধরে রেখেছে বোতলটা। কাবেরী দেখল সেই লোকটার দুটো হাতেরই বুড়ো আঙুলের পাশে আরেকটা করে আঙুল ছোটো হয়ে জুড়ে আছে। এ কী? দুটো হাতেই ছ’টা আঙুল! কে এই লোকটা? মুখটা অস্পষ্ট খুব। বুঝতে পারছে না। নাহ্‌, এর থেকে বেশি আর একটুও দেখতে পায় না ও। একটুও না। ঘাড়-মাথা পাথরের মতো ভারী আর শক্ত হয়ে গেছে। মাটিতে আঁকড়ে বসেছে পায়ের পাতা। যেন অক্টোপাস তার দানবীয় নাগপাশ দিয়ে বাধ্য করছে ওকে আটকে রাখতে। ঢাকঢোলের আওয়াজ ছাপিয়ে কান্নার রোল ভেসে আসছে। বুক চাপড়ে আকাশ বাতাস ছিন্নভিন্ন করে কারা যেন কেঁদে চলেছে একনাগাড়ে। অনেকে শুয়ে আছে মাটিতে। আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। জ্বালা ধরছে অসম্ভব চোখে। ঢাক বেজেই চলেছে। হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠছে মাঠ। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মানুষের উল্লাস ঢেকে দিচ্ছে গোটা ফতেপুর।
“চল মিঠি, অনেক রাত হল।”
বাবার ডাকে শক্ত শরীরটা শিথিল হয়ে গেল ওর। মাথাটা ঘুরে উঠে বাবার হাত ধরে ফেলল ও।
“কী রে, শরীর খারাপ করছে নাকি? কতবার বলেছিলাম এই শরীর নিয়ে আসিস না এখানে। সর্বনাশ! এত ঘেমে গেলি কী করে?”
বাবা, জেঠু সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে। ও কিছুই উত্তর দিতে পারে না। এখনও স্বর আটকে গলায়।


সাত


তারপরের গোটা একদিন কাবেরী কী করে কাটিয়েছে কিছুই মনে নেই। হরিহরজেঠুর ওষুধে এখন মোটামুটি শরীরটা আগের থেকে হালকা লাগছে। এই একদিনে কখন উঠেছে, কখনই বা খেয়েছে জানে না ও। সবাই বলছে এখানে এসে ওর উপর দিয়ে অনেক বড়ো ফাঁড়া গেছে। প্রথমদিন খেলতে গিয়ে যেভাবে কালকেউটের মুখে পড়েছিল তাতে ভগবান বাঁচিয়েছেন। মঞ্জুলাপিসি তো বলছে, সে নিষ্ঠা করে মা মনসার পুজো করে তাই রক্ষে। না হলে কী যে হত! এ বংশের এ রক্তের না হলেও সে যে চ্যাটার্জী পরিবারের কতখানি ভালো চায় তা নিজেই বলে চলেছিল সবসময়। ডিকো, বুম, রবিদের খুব বকেছিল। কেন সেদিন তপন দলুইয়ের বাগানের কাছে আম কুড়োতে নিয়ে গিয়েছিল কাবেরীকে? যেকোনও সময় একটা গুরুতর বিপদ তো ঘটে যেতে পারত। ওখানে গ্রামের কেউই আর মাড়ায় না। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে অভিশপ্ত বাড়িটা।
কাবেরীরও সেই বিকেলের কথা মনে পড়লে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর। প্রচণ্ড ঝড়ে মাথা দুলিয়ে কালবৈশাখী যখন সবেমাত্র শান্ত হয়েছে, রবি বলেছিল, “চল, কাঁচা আম কুড়িয়ে আনি। টক-চাটনি করে খাওয়া যাবে জেঠিমাকে বলে।”
দৌড়োতে দৌড়োতে কখন যে একটা গর্তের সামনে পা পড়ে গেছিল আর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সেই মৃত্যুদূত! সবটাই দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কাবেরী জানত হিংস্র কোনও প্রাণীর সামনে কখনও পড়ে গেলে কোনওভাবেই নড়াচড়া করতে নেই। তাহলেই বিপদ হতে পারে। মাথা স্থির রাখাটা সম্ভব ছিল না, তবুও বাড়ির সবার ডাকেও বিন্দুমাত্র চঞ্চল হয়নি। শুধু জ্বালাময় নিঃশ্বাসে চোখের উপর নেমে এসেছিল অন্ধকার। কাবেরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। সাপটাও নাকি কিছুক্ষণ ঐভাবে থেকে ঢুকে গেছিল গর্তে।
ফিরে তো এসেছিল বাড়ি। ভালোও হয়ে যেত হয়তো। তারপর থেকে অদ্ভুত অসম্ভব এক আকর্ষণ কেন যে বারবার ওকে ফতেপুরে বারবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে! ও কি পাগল হয়ে যাবে? সুস্থ হতে পারবে কি কোনওদিন? ঝাঁপানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। একটু আগে মা এসে বলল, ওরা পরশুদিন বিকেলে বাড়ি ফিরবে। আজ আবার শুক্রবার। কিন্তু ও তো উঠতেই পারছে না বিছানা থেকে। পাদুটো খুব দুর্বল লাগছে। ছাতিমতলার মাঠে ধোঁয়া ধোঁয়া ছায়া ছায়া আবছা ঘটনাগুলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বারবার ভেসে উঠেছে মনের অজানা গলিতে। পরিত্যক্ত বাড়ি, সাপ এই অস্পষ্ট নানান রহস্য মনে হচ্ছে যেন এক সুতোয় বাঁধা। একটার সঙ্গে আরেকটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অদৃশ্য কোনও নিয়তি ওকে বোঝাতে চাইছে কিছু। কিন্তু বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় সমস্তটায় ব্যাঘাত ঘটছে। কিছুই ঠিকঠাক মেলাতে পারছে না ও। গা রিরি করে ওঠে এখনও আলো-আঁধারিতে দেখা সেই উন্মত্ত মানুষের চোখটা মনে পড়লে। আর সেই মহিলাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সাপ! অসহ্য! শুধু কি তাই? কাবেরী তো ঘুমের মধ্যে আরও কত কী দেখছিল। মাথাটা যন্ত্রণা করছে। সবটা মনে পড়ছে না। তবুও কিছু গাছ, অনেকগুলো ফুলের গাছ, সাদা ফুলের গাছ... আর হ্যাঁ, সেই লাল কাপড় পরা লোকটা ওই বাড়িটায় ঢুকে কী যেন করছে। ওই পরিত্যক্ত বাড়িটায়? তপন দলুইয়ের বাড়ি! এই ছবিটা অনেকটা পরিষ্কারভাবে মনে পড়ছে। কিন্তু এসব কোথায়? আর কেনই বা হচ্ছে? কে বলে দিতে পারবে ওকে? কে? কে? সবথেকে আশ্চর্য লাগছে ওই মানুষটার হাত দেখে। একটা মানুষের হাতের দুটো বুড়ো আঙুলের পাশে আরেকটা করে আঙুল! কাবেরী ওর ক্লাসের এক বান্ধবীর হাতের আঙুলে এমন দেখেছে। তাই বলে দুটো হাতই? স্ট্রেঞ্জ!
“কী রে মিঠি, ভালো আছিস তো মা? যা গেল দিনগুলো। এরপর আর এখানে তোর বাবা-মা আসতে চাইবে কি না সন্দেহ।”
মঞ্জুলাপিসির কথায় শুধু ঘাড় নাড়িয়ে সাড়া দিল কাবেরী। মঞ্জুলাপিসিকে এমনিতে ভালো লাগলেও উনি খুব কথা বলে। “মা রে, কাল বাদে পরশু তুই চলে যাবি। তাই সকাল সকাল আমাদের থানে পুজো দিতে যাব। তোর মাকে বলে রেখেছি। মেয়ের মঙ্গলের জন্য বৌমা রাজি হয়ে গেছে। আর না করেনি। ঠিক সেরে উঠবি। সকালে পুজো দিয়ে সন্ধেবেলা একটু ঝাড়ফুঁক করে দেব। ব্যস, আর চিন্তা কী! জয় মা জয় মা করে রওনা দিয়ে দিবি।” কথা বলতে বলতে পিসি কাবেরীর চিবুক ধরে চুমু খেল আদরে।


আট


কাবেরী সারা দিনরাত ভেবেও কোনও কুলকিনারা করতে পারেনি। হয়তো এভাবেই বাড়ি ফিরে যেতে হবে। শরীরের যে অবস্থা তাতে বাড়ির বাইরে পা রাখা মুশকিল। অজানা কথা অজানাই থেকে যাবে। সকালে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরে মা, জেঠিমা, পিসির সঙ্গে কাবেরী গ্রামের পুজোর থানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ওদের বাড়ি থেকে আধঘণ্টার পথ। কোথাও পিচ ওঠা, আবার কোথাও কাঁচা মেঠো পথ ধরে এগোতে এগোতে কাবেরীর মনখারাপ করতে লাগল। কাঁটার মতো বিঁধে থাকা জিজ্ঞাসাগুলো কুরে কুরে খেতে লাগল ওকে। এখানে আগেও এসেছে ছোটোবেলায়। মন্দিরটা খুব পুরনো। পোড়া মাটির কাজ করা গোটা মন্দির চত্বরে ধূপ, ধুনো, ফুল, বেলপাতার গন্ধ। সারা জায়গাটায় কেমন একটা খা খা ভাব। দিনের বেলাতেও একপাল ঝিঁঝিঁ প্রাণপণে চেঁচিয়ে যাচ্ছে কোন আড়াল থেকে। কাবেরীর গাটা ছমছম করে উঠল। তবে ভিতরের দেবী চণ্ডীকে গ্রামের লোকজন খুব জাগ্রত বলে মানে। বিশেষ কোনও মূর্তি বোঝা না গেলেও লাল সিঁদুরে মাখা কষ্টিপাথরের একটা নারীর অবয়ব। আর তাঁর ভয়াল চোখদুটো দেখলে নিজের চোখ নেমে আসে আপনা থেকেই। মনে ভয় হয়। মনে হয় ভিতরের অনেক লুকোনো গোপন কথা হয়তো তিনি দেখে ফেলছেন। মন্দিরের মূল বেদির চারপাশে আরও নানা দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। তেমনি কালো পাথরের তৈরি। এদের কোনও কোনওটা আবার ঠিক চেনেও না।
মন্দিরে পৌঁছেই মা, কাকিমা, জেঠিমা হাতের রেকাবি থেকে পুজোর সামগ্রী নামাতে শুরু করল দেবীর সামনে। পুরোহিত মন্দিরেই পাশেই একটা ঘর করে থাকেন বহুদিন আগে থেকেই। তিনকুলে তার কেউ নেই। সবাই বলে কাবেরীর পিতামহ তাঁকে এই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই আছেন উনি।
ও মন্দিরের চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করল। পিছন দিকটায় অনেকগুলো ফুলের গাছ। মিষ্টি ফুলের গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা। কতরকমের জবাーলাল, হলুদ আর ঐ যে সাদা রঙের গাছটা ছেয়ে আছে ফুলে ফুলে। আচমকা শরীরের মধ্যেটা শিরশির করে উঠল কাবেরীর। ফুলগুলোকে ও চেনে। কিন্তু কিছুতেই নামটা মনে করতে পারছে না। কিছুতেই না! পাগলের মতো ছুটে গেল গাছটার কাছে। আরে, ঠিক এমন একটা গাছই তো... ঠিক তাই। এরকম সাদা ফুলের গাছ… আর ওই বেদিটা তুলসিতলার... পাশে কাঁটার মতো যে গাছটা আরও খানিকটা উঠে গেছে তুলসিগাছের মাথা ছাড়িয়ে… গাছের কাণ্ডগুলো সাপের ফণার মতো ভাঁজ হয়ে সামনে ঝুলছে… সব দেখেছে, সবটা দেখেছে ও! কী অদ্ভুত! শরীরের মধ্যে রক্তস্রোত ক্রমাগত উত্তাপ সৃষ্টি করে চলেছে ওর। কিছু বোঝাতে চাইছে ওকে? বুঝতে হবেই ওকে। কী মনে হতে আরও একবার এগিয়ে গেল সাদা ফুলে ছাওয়া গাছটার দিকে। মাইকের মতো দেখতে ফুলগুলো যেন কী দুর্বোধ্য ইশারায় ডাকছে ওকে। গাছের সবচেয়ে নিচু ডালটায় হাত দিয়ে ফুলটা নাকের কাছে আনতেই…
“মিঠি শুঁকিস না, ধুতুরোর গন্ধ বিষ! ছেড়ে দে!” চিৎকার করে এসে জেঠিমা ওর হাত থেকে ছিটকে সরিয়ে দেয় গাছের ডাল।
ঠিক তাই। ধুতুরাগাছ। এইবার মনে পড়েছে। জেঠিমা টিউবকল থেকে জল নিয়ে ভালো করে কাবেরীর হাত ধুইয়ে দিয়ে ওকে হাত ধরে দেবী চণ্ডীর পুজোর কাছে নিয়ে যায়। মাথাটা ঝিম ধরে আসতে থাকে কাবেরীর। এসবের সঙ্গে সাপের ওই ঘটনার কী সম্পর্ক? উফ্‌! বইতে পড়া কিছু কিছু অংশ মনে পড়তে থাকে। ধুতুরা ফুলের পরিধির কিনারাগুলো চার-পাঁচ জায়গায় কোঁচকানো। প্রতিটা কুঁচিতে একটা করে চূড়া থাকে। ফুলের ভিতর তিন-চারটে কেশর থাকে। কেশরের পরাগ রেণুতেই থাকে বিষাক্ত উপাদান। আর এই বিষে যেকোনও প্রাণীর জীবন পর্যন্ত যেতে পারে।
কিন্তু এই ফুল কেন দেখল ও? কী হয়েছিল এই গাছ দিয়ে? তুলসি-মঞ্চের পাশে যে গাছটা দেখল, সেটাকে ও চেনে। ওটাকে ফণীমনসা বলে। কাণ্ডটা খুব মোটা ধরনের। এই কাণ্ডতেই শুনেছে জল সঞ্চিত করে রাখে এই বিরল প্রজাতির গাছ। সেই জলকে বহুবছর জমিয়ে রাখবার জন্য গাছের পাতা চ্যাপটা কাঁটায় পরিণত হয়। মাকে, জেঠিমাকে পুজো করতে দেখেছে। ওতেই নাকি দেবী মনসার অধিষ্ঠান। গাছের শাখাগুলোর আকার সাপের ফণার মতো বলেই হয়তো এইভাবে পুজো করে সকলে। কিন্তু এসবের সঙ্গে তপন দলুই কীভাবে যুক্ত? আদৌ কি কোনও সম্পর্ক আছে, নাকি পুরোটাই ওর মনের ভুল?
দুর্বল শরীরটা নিয়ে কাবেরীর আস্তে আস্তে বসল মায়ের পাশে। আসন পেতে সবাই পুজোর আয়োজন করছে। ভাবতে ভাবতে চোখ চলে গেল সোজা সামনের দিকে। ধুনোর ধোঁয়ায় ঘোলাটে হয়ে আছে দেবীর কাছটা। ওদের থেকে হাত খানেক দূরত্বে বসে ঠাকুরমশাই ভারী গলায় কী যেন মন্ত্র উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। ফুল নিয়ে দিচ্ছেন দেবী চরণে। কাবেরী দেখল পুরোহিতের গায়ে লাল চাদর জড়ানো। পরনে টকটকে লাল ধুতি। উত্তেজনায়, আতঙ্কে বন্ধ হয়ে এল ওর শ্বাস। একটুও ভুল হল না ওর। সেই লাল কাপড় পরা ব্যক্তির সঙ্গে হুবহু মিল পুরোহিতের। কাবেরী খেয়াল করল পিছন দিক থেকে মাথার একদম মাঝ থেকে তার চুল বেশ পাতলা। মাথার চামড়াও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এরকমই তো ও দেখেছিল! ইনি কি সেই? সেই ব্যক্তি? যার হাতে কিছু একটা দিচ্ছিল ছ’আঙুলের ভদ্রলোক? জলরঙের মতো আবছা হয়ে কাবেরীর পৃথিবীটা দুলে উঠলো যেন।


নয়


গুমোট আকাশটায় মেঘ ভিড় করে আছে। একটুও হাওয়া নেই কোথাও। গাছের পাতারা স্থির হয়ে যেন কীসের অপেক্ষায়। কাবেরীর নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না। একবার ঘর, একবার বারান্দায় চলাফেরা করছে। সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। আজ যে ওদের ফিরে যাওয়ার দিন! রবিবার। বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওদের গাড়ি ছাড়বে। এমনটাই বলেছে বাবা। কেন জানে না, কাবেরীর মনে হচ্ছিল যা জানতে হবে ওকে একাই। কারণ এতদিনে ও বুঝেছে ও ছাড়া তো আর কেউ এসব দেখে না, শোনে না। ও কতটা করতে পারবে জানা নেই, তবুও সত্যিটা জানতে আপত্তি তো নেই! দুপুরে খাওয়ার পরই ওকে বেরোতে হবে। যেতেই হবে তপন দলুইয়ের বাড়ি। এবারে সবার চোখ এড়িয়ে। রবিকেও জানাবে না। সবাই যখন গল্প করবে খেয়ে উঠে, ঠিক তখনই। নিজেকে শক্ত করে সে। সম্পূর্ণ অজানাকে জানতে হবে আজ ওকে সম্পূর্ণ একা হয়ে।
রোদহীন দিনটা কমতে কমতে দুপুর শেষের দিকে এগোতেই কাবেরী বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। রাস্তার কুকুরগুলো লেজ গুটিয়ে ছায়ায় বসে হাঁফাচ্ছে। কেউ কি দেখছে কাবেরীকে? পিছন ফিরে তাকায় কাবেরী। নাহ্‌, কেউ কোত্থাও নেই। ও তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওদের বাড়ি পেরিয়ে একটা গাছের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে। দূর থেকে একটা কুলফির গাড়ি আসছে মনে হয়! গাড়িটা চালাতে চালাতে কুলফিওয়ালা হাঁক ছাড়তে ছাড়তে চলে যায়। গাড়িটা পথের বাঁকে মিলিয়ে যাওয়ার পর কাবেরী গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে প্রায় একদৌড়ে ছাতিমতলার মাঠ পেরিয়ে যায়।
ঝাঁপান হয়ে গেলেও মাঠে পড়ে রয়েছে উৎসবের নানান রঙের কাপড়, আরও কত কী। কোনও মানুষ চোখে পড়েনি। ডানদিকে বাঁকতেই তপন দলুইয়ের বাড়ির টালিটা নজরে পড়ে। দরমার দরজা সরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার দমকা ঝাপটা মুখে চোখে লাগে। সরসর, মচমচ করে কারা যেন অদৃশ্য হয়ে লুকিয়ে ফেলে নিজেদের। এক ইঞ্চি পুরু ধুলোর আস্তরণ আর মাকড়সার জাল সরিয়ে সরিয়ে কাবেরী সোজা উঠে যায় উঠোন পেরিয়ে ঘর লাগোয়া দালানে। সাইনবোর্ডে ঝোলানো লেখাগুলো ঠিক সেদিনের মতোই জেগে রয়েছে অর্ধেক ধুলো ঝরে গিয়ে।
আর কিছুমাত্র দেরি না করে সোজা মুখোমুখি ঘরটায় ঢুকে যায় কাবেরী। শক্ত হাতে দরজার পাল্লা ধরে থাকে। আগেরদিন ঠিক এখানেই ওর হাতটা কী করে যেন চিপে গেছিল! অবাক হয়ে দেখে ঘরের প্রতিটা আসবাব কী পরিছন্ন! ধুলোর এতটুকু লেশমাত্র লেগে নেই তাতে। মনে হচ্ছে যেন প্রতিটা আসবাব ব্যবহার হয়। মানুষ বসবাস করে এখানে। ছত্রী লাগানো খাটে পাট পাট করে চাদর বিছানো, বালিশ, পাশ বালিশ। খাট লাগোয়া আলমারিতে তালা লাগানো। নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না কাবেরী। এটা কী করে সম্ভব? আজ বহুবছর হল তপন দলুই ও তার পরিবারকে খুঁজে পায়নি গ্রামবাসী। তাদের উপর অপবাদের কালো ছায়া নেমে আসতেই নাকি ঘরবন্দি করে ফেলেছিল তারা নিজেদের। প্রায় ছ’মাস কি তারও বেশি হবে বাড়ি থেকে কেউ বেরোত না। গ্রামের সবাই তাদের পরিত্যাগ করেছিল এক অর্থে। বুকের ভিতরটা হঠাৎ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে কাবেরীর। কীভাবে একটা মানুষ দোকান-বাজার না করে পরিবার নিয়ে থাকত? না খেয়েদেয়ে? মঞ্জুলাপিসি তো খুব রাগ রাগ গলায় বলছিল, শয়তানটাকে গাঁয়ের দোকানের চাল পর্যন্ত দেওয়া হত না। কী পিশাচ এরা! কিন্তু কাবেরীর তপন দলুইয়ের জন্য এতটা কষ্ট হচ্ছে কেন? ও তো কোনওদিন চোখে দেখেনি লোকটাকে। তাহলে?
ভারী হয়ে আসা মনটা নিয়ে ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে কাবেরী। পাশের ঘরটায় ঢোকে আবার। এই ঘরটায় কোনও আসবাব চোখে পড়ে না। কিন্তু এটাও একইরকম। ধুলোর নামমাত্র নেই। পায়ে পায়ে এগোয় ঘরের মাঝখানে। একটা পিঁড়ি পাতা রয়েছে। উপরে লাল শালু বিছানো। আর তার উপরে কিছু পুরনো বই রাখা। অনেকগুলো পাত্র সাজানো। পাত্রগুলো পাথরের। ছোটো, বড়ো, মাঝারি বিভিন্ন মাপের। কী করা হত এখানে? পাত্রগুলো নাকের কাছে নিয়ে আসতেই বুনো একটা গন্ধ পেল কাবেরী। জলে ভেজা গাছের পাতার মতো। ছোটো ছোটো হামানদিস্তাও রাখা রয়েছে। বইটা হাতে তুলে খুলতেই দেখে কত কী পাতা, মূল, শিকড়ের সম্পর্কে নানান কথা লেখা। ও মন দিয়ে সেগুলো দেখতে যাবে, ঠিক তখনই ওর মাথার উপরে টালি থেকে চড়চড় মরমর করে একটা শব্দ গোল হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকল। শব্দটা কাবেরীর খানিকটা চেনা। ইন্দ্রিয়গুলো সতর্ক করে ও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল একইভাবে ঘরের ঠিক মাঝখানটাতেই। বুকে হেঁটে হেঁটে শব্দটা কাছে এগিয়ে আসতে শুরু করল ওর। চুপ করে চোখ বুজে নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে কাবেরী। শব্দটা কাছে আসছে আরও। আরও কাছে। শব্দটা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এবার ওর চারপাশে শব্দটা মাটি ঘষটে ঘষটে ঘুরছে। হ্যাঁ, ঠিকই তাই। শিরশিরে ঠাণ্ডা জলো অনুভূতিটা ও পাচ্ছে। একইভাবে। সেদিনের মতো। সরসর সরসর শব্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে একটা ফোঁস ফোঁস শব্দ। এই শব্দটাও ও চেনে। এটা ওর জিভের শব্দ। চেরা জিভ ক্রমাগত ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। শ্বাস টেনে নিয়ে প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে কাবেরী পায়ের দিকে তাকাল। আর তাকাতেই আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধ হয়ে গেল প্রাণীটার রূপ দেখে। একেবারেই। তেল চকচকে শরীরটার রং সোনালি। অপূর্ব সোনালি! এ কোন মায়াসাপ বেষ্টন করছে তাকে? ধোঁয়া ধোঁয়া ঝাপসা ভাবটা ফিরে আসে। দেখতে পাচ্ছে কাবেরী। একে একে জলরঙের মতো টলটল করে নড়ে উঠছে ওর চোখের সামনেটা। লাল কাপড় পরা জগমোহনদাদুর মুখটা দেখতে পাচ্ছে ও। ওরই সামনে দাঁড়িয়ে। একেক করে তুলে নিচ্ছে ধুতুরার ফুলগুলো। একটা কাপড়ে থলির মধ্যে নিয়ে চারদিকে বারবার দেখছে। কোথায় যেন যাচ্ছে। যেতে যেতে কার হাতে যেন ফুলগুলো তুলে দিল। পিছন করে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা। মুখ দেখতে পাচ্ছে না কাবেরী। দেখতে পাচ্ছে... ওই যে সেই ছ’আঙুলের হাতদুটো। লোকটাও জগমোহনদাদুকে ব্যাগে করে কী যেন দিল। মাথা ঢিপঢিপ করছে কাবেরীর। কষ্ট হচ্ছে। আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সব অন্ধকার। সব অন্ধকার। আবার দেখছে। সেদিনও দেখেছিল এই ছবিটা। ওই অদ্ভুত আঙুলের লোকটা কাচের বোতল দিল জগমোহনদাদুকে। উফ্‌! মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কে বসে আছে পিঁড়ির কাছে? এ তো সেই লোকটা! ঝাঁপানের দিন যার আবছা মূর্তি দেখেছিল। ক্রমাগত ঘুরছিল। বনবন করছিল ঢাকের তালে তালে। কী ঠুকে চলেছে হামানদিস্তা দিয়ে! মন দিয়ে? তারপর নাহ্‌, আর তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কাবেরী। খুঁজছে। কই, কেউ নেই। আছে সাপটা, এখনও আছে ওর পায়ের চারপাশে। ছিপছিপে শরীরটা ঘুরে চলেছে। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে কাবেরী। জগমোহনদাদু আবার চুপি চুপি কী যেন দেখছে চারদিকে। আর ওটা কী? ওঁর হাতে সেই কাচের বোতলটা ধরা। এ কী? উনি কী ঢেলে দিচ্ছেন পাথরের পাত্রগুলোর মধ্যে? যিনি বসে ছিলেন উনি কোথায়? উনি কি দেখতে পাচ্ছেন জগমোহনদাদুকে? কাবেরী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। পায়ের কাছে যে সেই মায়াসাপ! কী করবে ও? ওর যে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘জগমোহনদাদু, এ কী করছেন?’ ধোঁয়াময় জায়গাটা ঝাপসা হয়ে ছেয়ে রয়েছে পুরো ঘরটায়! একজন লোক এসে নাম ধরে ডাকছে। মনে হচ্ছে খুব দূর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে যেন, ‘তপন গুনিন আছেন? তপন গুনিন…’ আরও অনেক ডাকার পর সেই হাড় জিরজিরে রক্তচক্ষু লোকটা বেরিয়ে এল। কীসব কথা হচ্ছে। অস্পষ্ট। শুনতে পাচ্ছে না কাবেরী। এই লোকটাই তাহলে তপন দলুই? শরীরটা হিম হয়ে আসে। বুকের ধুকপুক কানে শুনতে পায় কাবেরী। বাচ্চা মেয়েটা খেলছে। বাড়ির উঠানে। এ কী! তপন দলুই ওই বাটিটা থেকে কিছুটা পাত্রে করে দিয়ে দেয় ভদ্রলোককে। সর্বনাশ! ওতে যে জগমোহনদাদু কীসব... উফ্‌! কেন পারছে না সে বাধা দিতে? অনেকগুলো লোক কাঁদছে। উঠোনে সার সার শুয়ে সাদা কাপড় জড়িয়ে। ওরা কি বেঁচে নেই? কী হবে এবার? অনেকগুলো কান্না আকাশ জুড়ে। প্রচুর মানুষ কথা বলছে। গুজগুজ ফিসফিস করছে। সবাই আসছে দৌড়ে, লাথি মারছে দরমার দরজায়। ওই তো উঠোনে ঢুকে পড়ে খুব মারছে তপন দলুইকে! আর কিচ্ছু ভাবে না কাবেরী। থাকতে না পেরে আর কোনও কিছু না ভেবে মেঝেতে বসে পড়ে। কোথায় সেই সোনালি সাপ? নেই তো! নিস্তব্ধ ঘরটায় খা খা করছে একটা হা হুতাশ। কান্না। তাহলে কি তবে সত্যি তপন দলুই দোষী নয়? তাকে দোষী বানানো হল কেন? জগমোহনদাদু কেন কীসব মেশালেন পাত্রে? ওই সাদা ফুলগুলো তো ধুতুরা! ওগুলো থেকে কি বিষ তৈরি করা হয়েছিল? কেন? কেন ক্ষতি করল? কার কথায়? তপন দলুই গ্রামের মানুষের ভালো করত। সবাইকে বাঁচাত। এটা কি কেউ সহ্য করতে পারত না? ওই বিষ মেশানো পাত্রের ওষুধ খেয়েই কি মারা গিয়েছিল গ্রামের মানুষ? আর তার জন্যই কি সবাই তাকে একঘরে করে দেয়? সত্যিকারের শয়তান কে তবে?
কাবেরী ছুট্টে বেরিয়ে এল উঠোনে। বুক ঠেলে উঠে আসে এক নিদারুণ কষ্ট। কান্নায় ভেসে যায় চোখ, মুখ। চারপাশের দুঃখ, যন্ত্রণা যেন সাপের মতোই বেড় দিয়ে রেখেছে বাড়িটাকে। তাদের শীতল রক্তে লেখা রয়েছে যেন বাড়ির মালিকের অব্যক্ত কথা। কিন্তু তপন দলুই কোথায় গেল? আর বাড়িটার ঘরগুলো কেন এমন? ওরা কি এখনও আছে? এইসব ঘটনা কাবেরী দেখল কীভাবে?
গুমোট ধরা আকাশটা থেকে রিনরিনে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগছে কাবেরীর গায়ে। অনেক দেরি হয়ে গেল। ওকে যে বাড়ি ফিরতে হবে। দরমার বেড়া সরাতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে চিকচিক করতে থাকা বস্তুটার কথা মনে পড়ে যায়। বাঁদিকে তাকাতেই দেখতে পায় সিমেন্টের বেদির উপর একটা আয়নার টুকরো। এটাতেই আগেরদিন রোদ পড়ে চকচক করছিল। আর তার ঠিক সামনেই বেদির উপর একটা সবজে গাছ। লতানো। ছোট্ট গাছটার মূল কাণ্ড থেকে অনেকগুলো ছোটো ছোটো শাখার মতো বেরিয়েছে। আর প্রতিটা শাখার একদম মাথার কাছের অংশটা সাপের ফণার মতো। মোড়ানো, হেলানো। নিখাদ সবুজ রংটা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে গাছটা থেকে। ফণীমনসা। আগেও দেখেছে এধরনের গাছ। কী অসম্ভব প্রাণ যেন জুড়ে আছে গাছটায়! অদ্ভুত মায়ায় তাকিয়ে থাকে কাবেরী গাছটার দিকে। জানে এ সমস্ত গাছ অনেকদিন বাঁচে। জল ছাড়া। কোনও যত্ন ছাড়াই। কিন্তু গাছটাকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ নতুন। যেন সবেমাত্র প্রাণ পেয়েছে। কোনও কিছু না ভেবে কী মনে হতে গাছটাকে তুলবে বলে ওর কাণ্ডে হাত দেয় কাবেরী। এটাকে ও বাড়ি নিয়ে যাবেই। যে যাই মনে করুক। ব্যালকনিতে রাখবে। কী সুন্দর সবুজ ডালগুলোয় রং ধরেছে। কে জানে, হয়তো এই গাছটাই এ-বাড়ির মানুষদের সাহস জুগিয়ে গেছে শেষপর্যন্ত। এ গাছই তো দেবীর প্রতিভূ।
এসব কী ভাবছে কাবেরী? এত ছোট্ট মাথায় এসব কী ভাবনা উঁকি দিচ্ছে? নিজেকেই চিনতে পারছে না ও। ছোট্ট ছোট্ট কাঁটাগুলো উন্মুক্ত হয়ে কাবেরীর কাছে যেতে চাইছে। আর কী অবাক কাণ্ড! কাবেরী ভেবেছিল অনেক কসরত করতে হবে গাছটা তুলতে। কিন্তু কোনও প্রচেষ্টা ছাড়াই কী আলতোভাবে সহজে কাণ্ডটা ধরে মাটিতে সামান্য চাপ দিতেই ওটা উঠে এল হাতে। এমনটা মনে হচ্ছে, গাছটা যেন অপেক্ষা করেইছিল কাবেরীর।
গাছটাকে নিয়ে কোনওমতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাবেরী বাইরে পা রাখল। দ্রুত, আরও দ্রুতপায়ে ওর বাড়ির দিকে এগোতেই পিছন থেকে কে যেন ডেকে উঠল। একবার মনে হল ও কি ধরা পড়ে গেল? আবার ডাকটা শুনল খুব কাছ থেকে। একটা নারীর কণ্ঠস্বর। পিছন ফিরে তাকাল কাবেরী। কিন্তু চারপাশে কোনও মানুষই চোখে পড়ল না ওর। সামনের দিকে ফিরে খুব জোরে বাইরের অক্সিজেন শরীরে টেনে একবার চোখ বন্ধ করল। আর তখনই সামনে ভেসে উঠল একটা নারীর অবয়ব। সে যেন কাবেরীর কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, ‘তোমার ভালো হবে। যাকে নিয়ে যাচ্ছ তাকে ভালোবেসো।’
চমকে উঠে কাবেরী সামনে আরও দ্রুত এগোতে লাগল। কিন্তু মনের অবচেতনে যে নারীমূর্তি জেগে উঠেছিল মনে হল তার পাতলা হিলহিলে গড়নের শরীরটা অসম্ভব রকমের ঠাণ্ডা। আর চোখের মাঝবরাবর একটা কালো দাগ লম্বালম্বি।


দশ


কেউ দেখতে পায়নি। আরেকটু দেরি হলেই মুশকিল হত। সময় হয়ে এসেছে। ওকে ফিরতে হবে। গাছটাকে বড়ো ক্যারিবাগে নিয়ে উপরে বেশ কয়েকটা জামা চাপা দিয়ে দিয়েছে। কেউ বুঝতে পারবে না। তাড়াতাড়ি গাড়ির ডিকিতে ব্যাগটা ঢুকিয়ে রেখে বাবা-মায়ের পাশে গিয়ে বসেছে কাবেরী। জেঠু, জেঠিমা, পিসি, আরও বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে।
“মিঠি, একটু দাঁড়াও। হরিহরজেঠু তোমার জন্য সারপ্রাইজ গিফট নিয়ে আসছে। একটু অপেক্ষা করতে বলেছে।” মঞ্জুলাপিসি ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কথাগুলো বলছিল।
“এই তো এসে গেছি আমি। এই নাও তোমার গিফট। একদম বাড়ি গিয়ে খুলবে।” রঙিন কাগজে মোড়া একটা চৌকো কোনাচে বাক্স ওর হাতে ধরালেন জেঠু।
কাবেরী মাথা নিচু করে সেদিকে তাকাতেই অসম্ভব জোরে কেঁপে উঠল বুকের ভিতরটা। যে হাতদুটো ধরে রেখেছে বাক্সটা, সে দুটোর বুড়ো আঙুলের সঙ্গে আরেকটি করে ছোটো আঙুল জোড়া লাগানো!


_____


পৃথিবীতে অনেক সময় এমন কিছু ঘটে বা রটে, যার ব্যাখ্যা পাওয়া দুরূহ। বলা যায় সেসব কথা হাজার যুক্তিতেও মেলে না। সমালোচক বলেন সেসব গালভরা গপ্পো, আবার কেউ বা নিখাদ অলৌকিক বলে রামনাম জপ করেন। আসলে সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের দিনরাতের ব্যবধানে এমন এক আবছা পৃথিবী রয়ে গেছে কেউ আমরা হয়তো এর সন্ধান পাই, কেউ বা আমরণ অনুসন্ধান করে যাই। আজকের প্রযুক্তিতে জোর গলায় অস্বীকার করবেন অনেকেই এসব কথা। তবুও কখনও কোনও মানুষ কিংবা মানুষসহ গোটা পরিবার কোনও এক অজানা চক্রান্তে যখন হারিয়ে যায়, আভাস দেয় তার অশরীরী সংকেতে। কিংবা চোখে আঙুল দিয়ে প্রতিবাদ করতে বলে দোষীকে দেখিয়ে। তখন আমাদের অবচেতনেই শুরু হয় তেমনই এক আবছা পৃথিবীর গল্প।


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

1 comment: