অণুগল্পঃ লেবু-লজেনঃ সুস্মিতা কুণ্ডু


কাঁচকলাসেদ্ধ-ভাত আর একটা করে কমলা রঙের ট্যাবলেট প্রতিদিন দু’বেলা। ব্যস, এটুকুই বরাদ্দ করেছেন নতুন ডাক্তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড়িটা বিরস বদনে মুখে চালান করলে রজনীকান্তবাবু। এমন সময় চোখে পড়ল দরজার পাশে হাসিহাসি মুখে চেয়ে আছেন সজনীকান্ত। রজনীকান্তর ছোটো ভাই। রাগের চোটে দাঁত কিড়মিড়িয়ে হাতের জলসুদ্ধু গেলাসটা ছুড়ে মারলেন রজনী। সজনীকে ভেদ করে গেলাসটা গিয়ে পড়ল উঠোনে। ঠং ঠং করে গড়িয়ে গেল লাল মেঝের ওপর দিয়ে। কলতলা থেকে ততোধিক খ্যানখ্যানে গলা ভেসে এল মণিমালার, “ভাঙো, সব ভেঙে ফেলো! রাক্ষুসে বুড়ো কোথাকার! উলটোপালটা গিলে রোগ বাধিয়ে আসবে আর আমি ডাক্তার-ঘর করব এই বুড়ো বয়েসে। পেটসর্বস্ব লোক একটা!”
সজনীর ছায়া ছায়া মূর্তিটা আরও দাঁত বার করে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকেন। রজনী ধপ করে আরামকেদারায় বসে বললেন, “হেসে নে! জীবনে তো বিয়ে করলি না! সংসারী মানুষের দুঃখটা আর বুঝবি কী করে? দিব্যি আইবুড়ো থেকেই ড্যাঙড্যাঙিয়ে চলে গেলি। একবারও দাদাটার কথা ভাবলি না। দ্যাখ তোর বৌদি কেমন ডাক্তার এনেছে। সব খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার ওপর আবার এই তিতকুটে কমলা বড়ি দিয়েছে দু’বেলা চেবাতে।”
এবার সজনীকান্ত একটু দুঃখ পেয়ে, হাওয়ায় ভেসে ভেসে দাদার কাছে এসে, চেয়ার হাতলে বসেনーইয়ে, মানে ভাসেন। “দাদা গো! হাসতে ঠিক চাইনি, কিন্তু তোমার দুঃখ দেখে আর থাকতে না পেরে হেসে ফেলেছি। কী করব, সেই ছোটোবেলার অভ্যেস যে!”
রজনী গুম হয়ে বসে থাকেন। সজনী মান ভাঙান, “দাদা! ও দাদা! ও দাদা গো!”
“কী হল?”
“ওই শিশি থেকে কমলা বড়িগুলো ফেলে এইগুলো ভরে নাও।”
রজনীকান্ত দেখেন সজনীর ধোঁয়া ধোঁয়া হাতের মুঠোয় একগাদা কমলাগুলি ভাসছে।
“কী লাভ হবে শুনি তাতে?”
“আহা! একটা মুখে ফেলেই দ্যাখো না!”
জিভে কমলা বড়িটা দিতেই রজনীকান্তর মুখে একগাল হাসি খেলে যায়। এ তো সেই ছোটোবেলায় ট্রেনে চাপলে বাবা-মা দুই ভাইকে যেমন ‘লেবু-লজেন’ কিনে দিত, বিলকুল সেই সোয়াদ! চোখ বুজে বাঁধানো দাঁতে লজেন খেতে থাকেন রজনী। একটু পরে চোখ খুলে দেখেন, সামনের টেবিলে খবরের কাগজের ওপর কমলা বড়িগুলো রাখা, সজনী কোত্থাও নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌটোর বড়িগুলোর সাথে ওগুলো বদল করতে লাগলেন। ভাইটা বড্ড ভালোবাসত দাদাকে।


_____

No comments:

Post a Comment