গল্পঃ জয়সলমীরে মৃত্যুফাঁদঃ অরূপ দাস




এক


বালি, উট, ফণীমনসা, সোনার কেল্লা এখন শুধু এসবই ঋজুর মাথায় ঘুরছে। জয়সলমীর থেকে শনিবার রাতে সন্দীপনের ফোন আসে। এক যুগ পর সন্দীপনের কন্ঠস্বর শুনল ঋজু।
ঋজুদের বন্ধুদের মধ্যে সন্দীপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সবথেকে বেশি। ‘সবথেকে বেশি’ এই কথাটি বলার চাইতে বলা চলে, তার চিন্তাভাবনা ছিল ঋজুদের থেকে অনেক আলোকবর্ষ দূরে। সে বলত ভিনগ্রহের বৈজ্ঞানিক হতে চায়। তা শুনে বন্ধুরা ভীষণ হাসিঠাট্টা করত। তারপর একদিন সন্দীপন কোথায় যে চলে গেল! একসময় ঋজু আর সন্দীপন ছিল আত্মাপ্রাণের বন্ধু। আজও বন্ধুত্বের মধ্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি তা বোঝা গেল সন্দীপনের আমন্ত্রণে ঋজুর সমস্ত কাজ ফেলে এভাবে ছুটে যাওয়া দেখে।
জয়সলমীর স্টেশনে ট্রেন থামল সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিটে। কিছুক্ষণ আগে সন্দীপনের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। স্টেশনের বাইরে নাকি সন্দীপন দাঁড়িয়ে আছে। ঋজু স্টেশনের বাইরে আসতেই একজন লোক হাত দেখাল। এগিয়ে গিয়ে ঋজু লোকটার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আর কেউ নয়, স্বয়ং সন্দীপন। ঋজু অবাক হল বৈকি। ভেতো বাঙালি আজ জেন্টেলম্যান হয়ে দাঁড়িয়ে!
সন্দীপন ঋজুর মনের কথা বলে উঠল, “অবাক লাগছে, তাই না ? সব পরে বলছি। এখন গাড়িতে ওঠ।”
দু’জনে গাড়ির পিছনের সিটে চড়ে বসল। ঋজু বলে ওঠে, “এবার জানতে পারি?”
ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে কে যেন বলে উঠল, “আমি বলছি।” এই বলে আগন্তুক সিটের পাশ দিয়ে গলে অনেকটা বেরিয়ে এল।
আগন্তুক একটা জলজ্যান্ত এলিয়েন। উচ্চতা দু’ফুটের বেশি নয়। দেহত্বক সবুজ, ঠিকরে বেরিয়ে আসা বড়ো বড়ো ড্যাবড্যাবে দুটো চোখ, মণিদুটো খাড়া, চোখের পাতার পরিবর্তে হলদে সবুজ রঙের বৃত্ত, লাল কন্ঠ ও হস্তবন্ধনীসহ পরনে স্বচ্ছ আবরণ।
ঋজু ভয় পেয়ে সন্দীপনের জামা খামচে ধরল। ঋজুর কাঁধে হাত রেখে সন্দীপন ভরসা দিল। বলল, “আরে ঘাবড়াস না। এ আমার বন্ধু ও সহকর্মী। নাম বৈজ্ঞানিক চ্যাংকু তস। পটলিক গ্রহে থাকে। চোদ্দ বছর আগে চ্যাংকুই আমার স্বপ্নপূরণ করেছিল। হ্যাঁ, আমি আজ ভিনগ্রহের বৈজ্ঞানিক।
“চোদ্দ বছর আগের কথা। আমি যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তার ছাদে একটা গুমটি ছিল। সেই গুমটিও আমি ভাড়া নিয়েছিলাম। কিন্তু এই ব্যাপারে তোদের কাউকে কিছু বলিনি। সেই গুমটিতে সারারাত আমার তৈরি যন্ত্রের সামনে বসে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সংকেত পাঠাতাম। ওদিকে চ্যাংকুও সংকেত পাঠাত অন্য কোনও ভিনগ্রহীর সন্ধানে। এভাবে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। তাকে সংকেতের মাধ্যমে আমার স্বপ্নের কথা জানালাম। কয়েকদিনের মধ্যে চ্যাংকু ফ্লাইং-সসার চড়ে আমায় নিতে চলে আসে। ওর সঙ্গে স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম মহাকাশে। ঋজু, তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই কয়েকদিনের জন্য আসা।”
মনের মধ্যে ঋজুর যত আতঙ্ক, যত ভয় দূর হয়ে গেল সন্দীপনের শেষের কথা শুনে। সন্দীপনকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোকে অনেক খুঁজেছিলাম বন্ধু। আমি কিন্তু জানতাম তুই স্বার্থপর নোস। আমার কথা ঠিক মনে পড়বে।”
চ্যাংকু কান্না জড়ানো গলায় বলল, “তোমরা আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়লে। তোমাদের বন্ধুপ্রেম দেখে আমি মুগ্ধ।”
চ্যাংকু খুব মিশুকে। সে কথার জাদুতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঋজুর মন জয় করে নিল। দু’জনের মধ্যে গল্প জমে উঠেছে। সন্দীপন জানালার বাইরে তাকিয়ে। দু’ধারে ধূ-ধূ বালি, আর তার মাঝের রাস্তা দিয়ে ড্রাইভার দ্রুত গাড়ি ছোটাচ্ছে। হঠাৎ সন্দীপন ড্রাইভারের উদ্দেশে বলে ওঠে, “গাড়ি থামাও।”
ড্রাইভার গাড়ি থামায়। গাড়ি থেকে সন্দীপনরা বেরিয়ে আসে। সন্দীপন পকেটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনে তিন ইঞ্চি ছোটো একটা যন্ত্র। নাম তিক্সু। যন্ত্রটিতে সন্দীপন আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল। যন্ত্রটি চটজলদি ড্রাইভারের মাথার ডানদিকে অর্থাৎ, কানের ঠিক এক আঙুল উপরে ছোঁয়ায় সন্দীপন। ছোঁয়াতেই তা সেটে যায়। সেই যন্ত্রটি মাথাতে সেটে যাওয়ামাত্র শরীর কারেন্ট খাওয়ার মতো দু’বার ঝাঁকুনি দিয়ে ড্রাইভার জ্ঞান হারাল।
ঋজু উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠল, “এটা তুই কী করলি!”
সন্দীপন স্বাভাবিক হয়ে জবাব দেয়, “দশ মিনিট পর ওর জ্ঞান ফিরবে। জ্ঞান ফেরার পর আমাদের কারও কথা ওর মনে থাকবে না। কারণ, এই যন্ত্র আমাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ডিলিট করে দিয়েছে।” এই বলে সে ড্রাইভারের মাথা থেকে যন্ত্রটি খুলে নিল।
চ্যাংকু বলে ওঠে, “এই যন্ত্র আবিষ্কার সম্পর্কে আমাকে তো কিছু বলোনি!”
সন্দীপন জবাব দেয়, “তোমাকে চমক দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলিনি। আমি জানতাম পৃথিবীতে এসে এই যন্ত্রের প্রয়োজন পড়বে। তাই এনেছি। এবার যাওয়া যাক।”
সাত মিনিট হাঁটার পর সন্দীপনরা গন্তব্যস্থানে পৌঁছাল। চ্যাংকু হাওয়াতে হাত নাড়ানো মাত্র একটা ডিজিটাল স্ক্রিন ভেসে উঠল। স্ক্রিনে কিছু একটা লিখতেই ফ্লাইং-সসারের সামান্য অংশ বালি থেকে বেরিয়ে এল। সেই অংশে থাকা দরজাটি খুলে গেল। চ্যাংকু এরপর আবার হাত নাড়াতেই স্ক্রিন অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনজন দরজা দিয়ে ফ্লাইং-সসারের ভিতরে ঢুকলে, দরজা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। ফ্লাইং-সসার আবার বালির নিচে ঢুকে গেল।
ঋজু যেন স্বপ্ন দেখছে। এলিয়েন, ফ্লাইং-সসার এসব দেখার প্রত্যক্ষদর্শী পৃথিবীর বুকে শোনা যায় অনেক আছে। তা সত্যি না মিথ্যে সেই যুক্তি-তক্কে না গিয়ে শুধু একটা কথাই বলা চলে যে ঋজু সৌভাগ্যবান। এলিয়েনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা, ফ্লাইং-সসারে ছুটি কাটানো এসব কথা ভাবতেই তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, হিপ হিপ হুররে!
চ্যাংকু ঘুরে ঘুরে ঋজুকে ফ্লাইং-সসার দেখাছে ঠিকই, কিন্তু মনের দিক থেকে খানিকটা হতাশ হয়ে। সন্দীপন কিছু আবিষ্কার করে লুকিয়ে রাখবে তা ভাবতেই চ্যাংকুর কেমন গোলমেলে ঠেকছে। কারণ, এর আগে এমন অবাক করা ঘটনা একটিবারও ঘটেনি। আর এই ঘটনা একবার যখন চ্যাংকুর মনে সন্দেহের বীজ রোপণ করেছে, তখন তো সেই বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হবেই। পৃথিবীতে আসার আগে ছোটো ছোটো মুহূর্তগুলো চ্যাংকুকে এখন খুব ভাবাছে। এই যেমন পৃথিবীতে আসার আগেরদিন রাতে সন্দীপন লকারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রেখে লকার রুম বন্ধ করে রেখেছে। ফ্লাই-সসার চড়ে এর আগে বহুবার দু’জনে অন্যান্য গ্রহে গেছে। কিন্তু কোনওদিন সন্দীপন লকার রুম বন্ধ করে রাখেনি। লকার রুমের ক্যামেরাও সন্দীপন খুলে রেখেছে। ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। পৃথিবীতে আসার সময় পটলিক গ্রহের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম নষ্ট হয়ে গেছিল। এখন কেন যেন মনে হচ্ছে এর পেছনেও সন্দীপনের হাত আছে। সন্দীপনকে তক্কে তক্কে রাখতে হবে। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে চ্যাংকু।


দুই


দুপুরের খাওয়াদাওয়া তিনজনে একসঙ্গে সারল। তবে চ্যাংকুর একটু গা-ছাড়া ভাব। খাওয়াদাওয়ার পর চ্যাংকু একটা পুচকে ফ্লাইং-সসারে চড়ে আশেপাশে ঘুরতে বেরিয়ে গেল। সন্দীপন কিন্তু চ্যাংকুর গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করছিল। কিছু একটা বুঝতে পেরে সন্দীপনের কপালে হালকা ভাঁজ ভেসে উঠল।
এই ভালো সময়। চ্যাংকু নেই। সন্দীপন কোনওরকম দেরি না করে ঋজুকে লকার রুমে নিয়ে আসে। ঋজুর দু’হাত ধরে সন্দীপন বলল, “বন্ধু, আমি তোর কাছ থেকে কিছু নিয়ে ফিরতে চাই।”
ঋজু বলে, “কী নিতে চাস বল? তা যদি দিতে পারি আনন্দের সীমা থাকবে না।”
“পটলিক গ্রহে নাগরিকের অধিকার দেওয়ার সময় তোকে নিয়ে হাতেগোনা স্মৃতি ছাড়া আমার মস্তিষ্কের মেমরি থেকে বাকি সমস্ত কিছু মুছে দেওয়া হয়েছে। তোর মস্তিষ্কের মেমরি থেকে আমাদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কাটানো সমস্ত অতীত ডাউনলোড করে নিতে চাই। তোদের স্মৃতিটুকু আমার সঙ্গে নিয়ে যাব।”
সন্দীপনের কথার ওপর ঋজু বলে উঠল, “ঠিক আছে। কী উপায়ে ডাউনলোড করা যাবে তার ব্যবস্থা কর।”
সন্দীপন আর দেরি করল না। লকার থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি বের করল। আর বের করল কফিন বাক্সের মতো দুটি ধাতব বাক্স। দুটি কাচের পাইপ দ্বারা বাক্সদুটি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। পাইপদুটির মধ্যে রঙেবেরঙের ছোটো ছোটো বলগুলো এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে। ধাতব বাক্সদুটি খুব ছোটো ছিল। সন্দীপন সুইচ টিপতেই ধাতব বাক্স বড়ো হয়ে গেল।
ঋজু অবাক হয়ে সন্দীপনের কাণ্ডকারখানাগুলো দেখছে। ঋজুর দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর লেখকরা কল্পবিজ্ঞানের যে গল্পগুলো লেখে তা ওদের গ্রহে বাস্তব। তবে এর চেয়েও বিস্ময়কর দৃশ্য তার চোখের সামনে ঘটল। সন্দীপন হজমি লজেন্সের মতো ছোটো একটা বস্তু হাতের তালুতে পিষে গুঁড়ো করে তা হাওয়াতে ভাসিয়ে দেয়। হঠাৎ সেগুলো জমাট বেঁধে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে জেলির মতো থলথলে ফুটবলের আকার ধারণ করল। থলথলে বড়ো ফুটবলের মতো জিনিসটি দিয়ে দুটি হাত গজিয়ে উঠল। এরপর চোখ, কান, নাক, ঠোঁট ফুটে রোবটে পরিণত হয়ে উঠল। এই দৃশ্য দেখে ঋজু চুপ থাকতে না পেরে বলে ওঠে, “অসাধারণ! অভাবনীয়!”
থলথলে রোবট বলে ওঠে, “বেশি কথা নয়। এবার আমার কথা শুনুন। আমি যা বলব সেটা মন দিয়ে করতে হবে।” এই বলে রোবট ডানহাত হাওয়াতে নাড়ানো মাত্র একটা ডিজিটাল স্ক্রিন ভেসে ওঠে। স্ক্রিনে রোবট কিছু একটা লিখল। লেখার সঙ্গে সঙ্গে ধাতব বাক্সের ঢাকনা দুটি খুলে গেল। এরপর রোবট বলে ওঠে, “সন্দীপন, আপনি বাঁদিকের বাক্সে শুয়ে পড়ুন। আর ঋজু, আপনি ডানদিকের বাক্সে শুয়ে পড়ুন।”
দু’জন নির্ধারিত বাক্সের মধ্যে শুয়ে পড়ল। শুতেই বাক্সের ঢাকনা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ বাক্সদুটিতে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। আর যার ফলে দু’জন জ্ঞান হারায়। এদিকে দুটি পাইপের টিউবগুলোর ভিতরে ছুটতে থাকা রঙবেরঙের ব গুলো স্থির হয়ে ভাসতে থাকে। হঠাৎ ডানদিকের পাইপের ভিতরে এক আলোকরশ্মি ডানদিক থেকে বাঁদিকে ছুটে গেল। আবার বাঁদিকের পাইপের ভিতরে এক আলোকরশ্মি বাঁদিক থেকে ডানদিকে ছুটে গেল। এরপর কয়েক মুহূর্ত যেতেই রঙবেরঙের বলগুলো আবার ছুটতে শুরু করেছে। খুলে গেল বাক্সের দুটি ঢাকনা। এই যন্ত্রটির কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে এখন ঋজুর দেহে সন্দীপনের আত্মা, আর সন্দীপনের দেহে ঋজুর আত্মা।
বাক্সের ঢাকনা খোলামাত্র রোবট বন্দুকের ট্রিগার টেপে। বন্দুক থেকে লেজার বেরিয়ে এসে ঋজুর মাথা থেকে পা দড়ির মতো পেঁচিয়ে নিল। এরপর রোবট লকার রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সন্দীপন আফসোসের সুরে বলল, “আহা, নিজের দেহকে এভাবে বলিদান দিতে হচ্ছে। কিছু করার নেই। পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য এটুকু যে না করলেই নয়। দুঃখিত বন্ধু, পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য তোর প্রাণটাকেও বলিদান দিতে হবে। তবে তার আগে এর পেছনে যে যে  কারণ রয়েছে তা অবশ্যই শোনাতে চাই। এই যন্ত্র স্মৃতি ডাউনলোড করার যন্ত্র নয়। এই যন্ত্র হচ্ছে আত্মা অদলবদল করার যন্ত্র। পটলিক গ্রহের নাগরিকের অধিকার নেওয়ার সময় আমাকে কিছু শর্ত মানতে হয়েছিল। সেইসব শর্তগুলোর মধ্যে আরেকটি শর্ত হল, আমি আর কোনওদিন পটলিক গ্রহ ছাড়তে পারব না। তাই তিনবছর আগে আমি একটা প্ল্যান করেছিলাম। প্ল্যানটা হচ্ছে, এমন একটা মেশিন বানাতে হবে যার মাধ্যমে এক দেহের আত্মা অন্য দেহে পাঠানো যাবে। যার ফলে অন্যের রূপধারণ করে আমি পৃথিবীতে থাকতে পারব।
“মেশিন তৈরি করার পর দেরি না করে পৃথিবীতে আসার তারিখ নির্ধারণ করে নিলাম। ঠিক করলাম পৃথিবীতে এসে কোনও এক নির্জন স্থানে তোর সঙ্গে দেখা করব। তারপর সুযোগ বুঝে তোর সঙ্গে আত্মা অদলবদল করে নেব। কী করব বল বন্ধু, তুই ছাড়া আর যে পৃথিবীতে কারও সঙ্গে মনের মিল নেই। আমার মেমরি থেকে তোকে ছাড়া সবাইকে মুছে দেওয়া হয়েছে। আর মনের মিল না থাকলে এই মেশিন কাজ করবে না।
“ফ্লাইং-সসারে রোবটের সঙ্গে তোকে আর চ্যাংকুকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। রোবট ফ্লাইং-সসার পটলিক গ্রহের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে ব্লাস্ট করবে। এদিকে পৃথিবীতে আসার সময় পটলিক গ্রহের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম ছিন্ন করে দিয়েছিলাম। আমরা যে পৃথিবীতে এসেছি তারা জানতে পারল না। শুধু জানল আমাদের ফ্লাইং-সসার ব্লাস্ট হয়ে গেছে। এখন শুধু চ্যাংকু মরলে আমার প্লান সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সব পথের কাঁটা দূর হয়ে যাবে। তোর রূপ আর পরিচয় নিয়ে আমি স্বাধীনভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকব। তার আগে ঋজুর বৈজ্ঞানিক হয়ে ওঠার একটা অলৌকিক গল্প বানিয়ে লোকজনদের শুনিয়ে দিলেই হবে। এরপর অত্যাধুনিক আবিষ্কারের মাধ্যমে আমি হয়ে উঠব এই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক।”
পিছন থেকে চ্যাংকু হাততালি দিয়ে উঠল। ঘৃণার সুরে বলে উঠল, “তুই কত নীচ! তুই আমাদের গ্রহের নিয়ম ভেঙেছিস। আর যার শাস্তি মৃত্যু।” এই বলে চ্যাংকু লেজার বন্দুক বের করতে যাবে, এমন সময় সেই রোবট এসে চ্যাংকুকে লক্ষ্য করে বন্দুকের ট্রিগার টেপে। লেজার বেরিয়ে এসে চ্যাংকুরও মাথা থেকে পা দড়ির মতো পেঁচিয়ে নিল।
সন্দীপন চ্যাংকুর গায়ে সাপাটে লাথি মেরে বলে ওঠে, “জাহান্নামে যা।” এই বলে সন্দীপন অট্টহাসি হেসে উঠল। তার এই উদ্ধত হাসি ফ্লাইং-সসারের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।


তিন


পৃথিবী ছেড়ে ফ্লাইং-সসার পটলিক গ্রহের সামনে পৌঁছে ব্লাস্ট হয়েছে। ঋজু-চ্যাংকুরা বেঁচে নেই। রোবটও ফ্লাইং-সসারের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে।
এদিকে সন্ধে নেমেছে। তবে ভয় নেই। সন্দীপন গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। এটা হাইওয়ে। এখানে গাড়ি পাওয়া যাবে, সে নিয়ে চিন্তা নেই। সন্দীপন চিন্তায় মগ্ন। প্রথমে কী আবিষ্কার করবে এসবই ভাবছিল। এমন সময় গাড়ি এসে সন্দীপনে সামনে থামল। এই গাড়ি করেই সন্দীপনরা স্টেশন থেকে এসেছিল। ড্রাইভার বিন্দুমাত্র সন্দীপনকে চিন্তে পারল না। ড্রাইভার বলে উঠল, “কোথায় যাবেন?”
সন্দীপনের বরাত আজ খুব ভালো। মহানন্দে সে ড্রাইভারকে বলে উঠল, “স্টেশন।”
“ঠিক আছে, বাবু।” এই বলে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে।
কিন্তু ড্রাইভার গাড়ি স্টেশনের উলটোদিকে নিয়ে যাচ্ছে! সন্দীপন বলে ওঠে, “এ কী, স্টেশনের উলটোদিকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?”
ড্রাইভার জবাব দেয়, “আপনাকে তাড়াতাড়ি পৌঁছে দিতে হবে যে বাবু।”
ড্রাইভারের এই কথায় সন্দীপনের সন্দেহ মোটেও কমল না। সন্দীপন ড্রাইভারের চুলের মুঠি ধরে বলে, “গাড়ি থামাবে, নাকি মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেব?”
ড্রাইভারের কোনও হেলদোল না দেখে সন্দীপন গাড়ির দরজা খুলে ঝাঁপ দিল শেষে। সন্দীপন ছিটকে গিয়ে বালিতে পড়ে কয়েকবার পাক খেল। গাড়ি থামাল না ড্রাইভার। সোজা বেরিয়ে গেল। সন্দীপন কোমরে আর হাঁটুতে চোট পেয়েছে। কোনওমতে সে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পেরেছে কেউ ড্রাইভারকে সম্মোহন শক্তি দ্বারা বশ করে রেখেছে।
সন্দীপন হাইওয়ে ধরে স্টেশনের দিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে। হঠাৎ তার নজর পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের দিকে। এই তিনজনকে সে চেনে। তার সহকর্মী। অর্থাৎ পটলিক গ্রহে সে যে বিজ্ঞান সংস্থার বৈজ্ঞানিক, এই তিনজনও সেই সংস্থার বৈজ্ঞানিক। প্রথম জনের নাম হস্ক্র টং। দ্বিতীয় জনের নাম ব্রটন মকউ। তৃতীয়জন জিকল দ্রাসহুম।
ব্রটন বলে উঠল, “আমাদের দেখে খুব অবাক হচ্ছ, তাই না?”
সন্দীপন না চেনার ভান করল। “কে আপনারা? আর এলিয়েনদের মতো সেজে আছেন কেন?”
সন্দীপনের কথা শুনে জিকল বলল, “আমরা অন্যের রূপে সেজে নেই। সেজে আছ তুমি। গোপন ক্যামেরাতে আমরা সব দেখেছি। চ্যাংকু ছোটো ফ্লাইং-সসার নিয়ে বেরোনোর আগে উড়ক্কু ক্যামেরা রেখে গেছিল। শুধু তাই নয়, সেই ক্যামেরা আর আমাদের বিজ্ঞান সংস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দিয়েছিল। দুর্ভাগ্য, চ্যাংকুকে বাঁচাতে পারলাম না।”
সন্দীপন দু’হাত জুড়ে কাকুতিমিনতি করে বলে উঠল, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে মেরো না।”
হস্ক্র আর জিকল এগিয়ে এসে সন্দীপনের দুটি হাত ধরে। ব্রটন বলে, “আমরা তোমাকে মারতে আসিনি। তবে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর শাস্তি পাবে। তুমি যে এখন অন্যের দেহে, সেই স্মৃতিও তোমার মধ্যে ছেড়ে যাব না।”
কথা বলতে বলতে ব্রটন সন্দীপনের প্যান্টের পকেট থেকে তিক্সু যন্ত্র বের করে। যন্ত্রটা নিজের মুখের সামনে নিয়ে এসে ব্রটন বলে ওঠে, “চ্যাংকুর সঙ্গে সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ হওয়ার পর থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত সন্দীপনের সমস্ত স্মৃতি মুছে দেওয়া হোক।” এরপর সন্দীপনের উদ্দেশে ব্রটন বলে ওঠে, “চ্যাংকু গোপন ক্যামেরাতে যন্ত্রটির কথা বলেছিল।”
ব্রটন এই বলে যন্ত্রটি সন্দীপনের মাথাতে সেঁটে দিল। যন্ত্রটি সেঁটে যাওয়া মাত্র শরীর কারেন্ট খাওয়ার মতো দু’বার ঝাঁকুনি দিতেই সন্দীপন জ্ঞান হারিয়ে বালিতে লুটিয়ে পড়ল।
সন্দীপনের যখন জ্ঞান ফেরে ততক্ষণে তিনজন এলিয়েন ফ্লাইং-সসারে উঠে গেছে। শুধু তাই নয়, পটলিক গ্রহের উদ্দেশ্যে ফ্লাইং-সসার বালিভূমি ছেড়ে উপরের দিকে উড়তে শুরু করেছে। এদিকে ফাইং-সসার দেখে সন্দীপন আত্মহারা। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই সন্দীপনের। সরীসৃপের মতো সে বুক দিয়ে ঘষটে ঘষটে এগোচ্ছে। আর চিৎকার করে ফ্লাইং-সসারের উদ্দেশ্যে সে বারবার বলতে লাগল, “এলিয়েন, তোমরা আমাকে নিয়ে যাও। আমার স্বপ্ন ভিনগ্রহের বৈজ্ঞানিক হওয়ার…”
বেচারা সন্দীপন। সে জানে না নিজেই কিছুক্ষণ আগে ভিনগ্রহের বৈজ্ঞানিক ছিল। ফ্লাইং-সসার আকাশে মিশে গেল।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

2 comments: