উপন্যাসিকাঃ উদ্বর্তনঃ দৃপ্ত বর্মন রায়



এক


“আই ওয়াজ ওয়ান অফ দ্য ইল-ফেটেড মেঙ্গলা টুইনস।” কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বৃদ্ধ বললেন, “আই হোপ, ইয়ং ম্যান, তোমার মেঙ্গলা টুইন-দের সম্বন্ধে জানা আছে।”
তখন উনিশশো অষ্টআশি সাল। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী টালমাটাল অবস্থাটা সামলে নিয়ে ভারতবর্ষ সবেমাত্র গুটিগুটি পায়ে সামনে এগোতে শুরু করেছে। উদার অর্থনীতি, গ্লোবালাইজ়েশন এই শব্দগুলো তখনও আমাদের অজানা। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা ‘ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ’-এর জন্ম তখনও হয়নি। মিডিয়া বলতে প্রতিদিনকার খবরের কাগজ আর দূরদর্শনের সাড়ে আটটা আর সাড়ে ন’টার হিন্দি আর ইংরিজি নিউজ় বুলেটিন। সেগুলোও আবার দেশের আভ্যন্তরীণ খবরাখবর নিয়ে এতটাই ব্যতিব্যস্ত যে বাইরের দেশে নজর দেবার সময়ই নেই। ফলে বিদেশ সম্বন্ধে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ধারণা তখন খুবই সীমিত। তাই খুব বিনীতভাবেই উত্তর দিলাম, “দুঃখিত, এই ব্যাপারটা আমি ঠিক জানি না।”
ওপরে নিচে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, তুমি আউশউইৎজ়-বার্কানাউ-এর নাম শুনেছ?”
মানেটা কী? এটা কি ক্যুইজ় কম্পিটিশন হচ্ছে নাকি? মনে মনে ভাবলাম, যেচে পরোপকার করতে গিয়ে এ কী ফ্যাসাদে পড়লাম রে বাবা!
সেটা ছিল আমার প্রথমবার বিদেশযাত্রা। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের একটা কনফিডেনশিয়াল কাজে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে এসেছি দিন পাঁচেক হল। আরও সাতদিন পর ফেরার কথা। কাজ মোটামুটি ভালোই এগোচ্ছে, তাই চাপ কম। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, ফাঁকতালে বিদেশ আসার সুযোগ যখন পেয়েই গেছি, ফেরার আগে মোজ়ার্টের শহরটা একটু ঘুরে ফিরে দেখে যাব। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রবিবার সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলাম শহরটা ঘুরতে। সারাদিন টইটই করে ঘুরে শ্যোনব্রুন প্যালেস, গ্লোরিয়েট, সেন্ট স্টিফেনস ক্যাথিড্রাল দেখে-টেখে ক্লান্ত হয়ে বিকেল নাগাদ ঢুকেছি একটা পার্কে। ইচ্ছে ছিল টাটিয়ে যাওয়া পাদুটোকে একটু বিশ্রাম দিয়ে হোটেলে ফেরার বাস ধরব।
সুন্দর মনোরম বিকেল। ছোটো ছোটো বাচ্চারা মা-বাবার সাথে খেলছে এদিক ওদিক। কয়েকজন আবার সাথে পোষ্যকে নিয়ে ইভিনিং ওয়াকে বেরিয়েছেন। সবুজ মখমলের মতো ঘাসের বুক চিরে এঁকেবেঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়া পেভমেন্টের ঠিক পাশে একটা বেঞ্চে বসে ছিলাম। এমন সময় দেখলাম, একজন বয়স্ক ব্যক্তি আমি যেখানে বসেছিলাম তার কাছে এসে হঠাৎ কেমন যেন একটু বেসামাল হয়ে গিয়ে হাতের লাঠিটা ফেলে কপালের কাছে হাতটা নিয়ে টলতে শুরু করলেন। দেখে মনে হল যেন হঠাৎ করে তাঁর মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। এক্ষুনি পড়ে যাবেন। আমি চট করে উঠে ওঁকে ধরে ধীরে ধীরে এনে বসালাম আমার পাশে। কিছুক্ষণ সময় লাগল ওঁর স্বাভাবিক হতে। একটু ধাতস্থ হবার পর আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম উনি ঠিক আছেন কি না। জবাব দিলেন, ঠিক আছেন। তবে এই পার্কের গেটের উলটোদিকেই ওঁর বাড়ি। আমি যদি অনুগ্রহ করে ওঁকে একটু এগিয়ে দিই, তাহলে ভালো হয়। তখনকার দিনে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসটা আজকের মতো হারিয়ে যায়নি। তাই অচেনা মানুষ, অজানা জায়গা হলেও একবাক্যে রাজী হয়ে গেলাম।
ভদ্রলোকের সাথে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই পার্কের উলটোদিকের রাস্তায় একটু দূরেই ওঁর অ্যাপার্টমেন্ট। দোতলায় ওঁর ফ্ল্যাটে ঢুকে ওঁকে সামনের সোফাতে বসিয়ে দিলাম। ততক্ষণে অবশ্য উনি অনেকটাই সামলে নিয়েছেন। আমাকে একটু বসতে বলে ঢুকে গেলেন ভিতরের ঘরে। বসে বসে ঘরটায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম একটা দেওয়াল জোড়া শো-কেস ভরা প্রচুর বই। সবচেয়ে ওপরের তাকটায় মনে হল অনেকগুলো স্মারক জাতীয় জিনিস সাজানো। দেওয়ালেও দেখলাম বেশ কিছু মানপত্র শোভা পাচ্ছে। ভাবছিলাম একবার উঠে গিয়ে কাছ থেকে দেখে আসব সেগুলো, কিন্তু তার আগেই উনি ফিরে এলেন দুই হাতে দুই কাপ কফি নিয়ে। কফি খাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসব ভেবেছিলাম। কিন্তু কী আর করা? নিতে হল কাপটা।
কফিতে চুমুক দিয়ে নেহাত ভদ্রতার খাতিরেই জিজ্ঞেস করেছিলাম যে এখন শরীরটা কেমন লাগছে ওঁর। উত্তরে তিনি বললেন, “চিন্তা কোরো না, ইয়ং ম্যান! আমি একদম ঠিক আছি। এমনিতে আমি এই বয়সেও অনেক ফিট। রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি, ভোরবেলা উঠে রেগুলার ব্যায়াম করি। এত সহজে কাবু হবার মতো মানুষ আমি নই। তবে এরকমটা মাঝে মাঝে হয়। হুট করে মাথাটা ঘুরে যায়। চোখের সামনে সবকিছু কিছুক্ষণের জন্যে অন্ধকার হয়ে যায়।” এই বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নাটকীয় ভঙ্গিতে যোগ করলেন, “আসলে মানব সভ্যতার ইতিহাসের চরমতম পাপের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। ইচ্ছে থাকলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সেই অভিশাপই বহন করে চলেছি নিজের মধ্যে, বুঝলে? হয়তো এজন্যেই এমনটা হয়।”
কিছুই বুঝলাম না আমি। কিন্তু প্রশ্ন করাটা সমীচীন হবে কি না বুঝতে না পেরে মুখে কিছু না বলে শুধু ওপরে নিচে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। সেটা লক্ষ করেই বোধহয় তিনি একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। মেঙ্গলা টুইনস কাকে বলে, আউশউইৎজ় কী, ইত্যাদি ইত্যাদি। আস্তে আস্তে বিরক্ত লাগছিল আমার। যদিও এখানে সন্ধে দেরিতে হয়, তবুও অচেনা শহর। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি অন্ধকার হবার আগেই হোটেলে ফিরে যাব। পরেরদিন আবার সকাল সকাল উঠে পড়তে হবে। কিন্তু হাবেভাবে মনে হচ্ছিল বৃদ্ধ তাঁর জীবনের দুঃখের কাঁদুনি না শুনিয়ে ছাড়বেন না। তাই শেষ প্রশ্নটার উত্তর আর মুখে না দিয়ে শুধু দু’দিকে মাথা নাড়ালাম।
কিন্তু আমার নেতিবাচক উত্তর পেয়ে যেন খুশিই হলেন ভদ্রলোক। বললেন, “তুমি খুব সৌভাগ্যবান যে তোমাকে আউশউইৎজ়ের নামই শুনতে হয়নি। পৃথিবীর বুকে জীবন্ত নরক বলে যদি কোনওদিন কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা ছিল এই আউশউইৎজ়। আউশউইৎজ় হল নাৎজ়িদের তৈরি সবথেকে নিষ্ঠুর এবং ভয়ংকর কনসেন্ট্রেশন কাম এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প।”
এবার আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎজ়ি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে ইহুদিদের ওপর যে ভয়ংকর অত্যাচার করা হত সেটা জানা ছিল। তখনই আউশউইৎজ় নামটা মনে হয় শুনেছিলাম। ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার মনে একটা সন্দেহ হল। জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি...”
“ইয়েস, মাই ফ্রেন্ড। তোমার অনুমান সঠিক।” আমি প্রশ্নটা শেষ করার আগেই উত্তর দিলেন বৃদ্ধ, “আমি একজন হলোকাস্ট সারভাইভার। ছ’মাসের বেশি সময় আমি বন্দি ছিলাম আউশউইৎজ়ে। চোখের সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে দেখে কাটিয়েছি দিনের পর দিন। কিছু সংখ্যক উন্মত্ত ব্যক্তির যে পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে প্রায় ষাট লাখ নিরপরাধ মানুষ রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই ভয়াবহ নিপীড়ন, নির্যাতনের প্রত্যক্ষ শিকার হতে হয়েছিল আমাকে। আমার ভাগ্য ভালো ছিল বলে আমি সময়মত আউশউইৎজ় থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছিলাম। নাহলে এই বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ ইহুদির মত আমাকেও অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হত সেই কুখ্যাত মৃত্যুপুরীতে।”
এতক্ষণে আমি একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম ওঁর দিকে। বলেন কী ভদ্রলোক! নাৎজ়িদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে উনি পালিয়ে এসেছিলেন আউশউইৎজ় থেকে? অথচ ওঁকে দেখে একদম নির্ঝঞ্ঝাট সাদাসিধে পাঁচটা দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতই মনে হচ্ছিল। বয়স ষাটের আশেপাশে, রোগা-পাতলা চেহারা। আমার থেকেও বেশ অনেকটা লম্বা। মাথার চুলগুলো সব ধবধবে সাদা। শান্ত সৌম্য মুখটা হঠাৎ করে শরীর খারাপ হবার কারণে একটু বিবর্ণ হয়ে গেলেও মিষ্টি একটা হাসি সবসময়ই ফুটে রয়েছে। অবাক হয়ে ভাবলাম উনি নিজে থেকে না বললে বোঝাই যেত না যে এরকম একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তিনি নিজের মধ্যে বহন করে চলেছেন।
ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা হওয়ায় বুঝতে পারলাম তিনি মোটামুটি বিখ্যাত একজন ব্যক্তি। হলোকাস্ট থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরার পর তিনি এই সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এছাড়াও হলোকাস্টের বীভৎসতা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্যে বিভিন্ন হলোকাস্ট রিমেমব্রেন্স অর্গানাইজ়েশনের সাথেও তিনি যুক্ত। এই যে ঘরে সজ্জিত এত স্মারক এবং শংসাপত্র, এইসবই তিনি হলোকাস্ট সারভাইভার হিসেবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে পেয়েছেন। এবার আমি পড়লাম মহা মহা ফাঁপরে। সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করলেও স্কুলে ইতিহাস আমার অন্যতম প্রিয় সাবজেক্ট ছিল। আগেকার দিনের কথা, তখনকার সমাজ, মানুষের জীবনযাত্রা, আচার-আচরণ এসব আমাকে সবসময়ই খুব টানে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো একটা মেগা ইভেন্ট, যা কিনা ইতিহাসের মোড় আমূল বদলে দিয়েছিল, তার প্রতি আমার কৌতূহল বরাবরই ছিল অপরিসীম। এমনিতে বিভিন্ন বই বা পত্রপত্রিকায় পড়া কিছু প্রবন্ধ বা আর্টিকল ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্বন্ধে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল না। এখন চোখের সামনে সেই ভয়ানক দিনগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটা মানুষকে পেয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল। আবার মনে মনে ভাবছিলাম তাড়াতাড়ি বেরোতে না পারলে যদি হোটেলে পৌঁছতে সমস্যা হয়! কিন্তু শেষপর্যন্ত মনের ইচ্ছাটারই জয় হল। দুয়েকবার এড়িয়ে যেতে চাইলেও শেষপর্যন্ত আমার অনুরোধে ভদ্রলোক শুরু করলেন তাঁর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার বিবরণ।


দুই


“আমার নাম অ্যাশার ফ্রিডম্যান। আমার জন্ম হয়েছিল উনিশশো ত্রিশ সালের আঠারোই জানুয়ারি। হিব্রু ভাষায় অ্যাশার শব্দটার মানে কী জানো? ব্লেসড, ভাগ্যবান। সত্যিই, আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম, বুঝলে? আমার জন্ম হয়েছিল কোশিৎজ়ে বলে চেকোস্লোভাকিয়ার ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট একটা গ্রামে। আমার বাবা শ্ম্যুয়েল ফ্রিডম্যান সেই গ্রামের স্কুলে অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়াত আর আমার মা আইরিন ঘরে তৈরি করা কেক, পেস্ট্রি, প্যাটিস দিয়ে একটা বেকারি চালাত আর আমাদের ছোটো সংসারটার দেখাশোনা করত। আমরা ছিলাম দুই ভাই, দুই বোন। আমি আর আমার যমজ ভাই অ্যালেক ছিলাম বড়ো। আমাদের পরে ছিল জুডিথ, আমাদের থেকে দুই বছরের ছোটো। আর সবথেকে ছোটো বোন রোজ়ের যখন জন্ম হয়েছিল তখন আমার আর অ্যালেকের বয়স পাঁচ বছর। আমাদের পয়সাকড়ি, ধনদৌলত অত ছিল না ঠিকই, কিন্তু বাবার স্নেহ, মার ভালোবাসা আর ভাইবোনদের খুনসুটিতে আমার ছোটোবেলাটা কেটেছে একেবারে স্বপ্নের মতো।
“আমি আর অ্যালেক ছিলাম আইডেন্টিক্যাল টুইন্স। বাবা, মা, জুডিথ বা রোজ় ছাড়া বাকি সবাই আমাদের গুলিয়ে ফেলত। এ নিয়ে কত যে মজার মজার ঘটনা ঘটেছে সেসব বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু দেখতে একরকম হলেও আমাদের স্বভাবে বৈচিত্র্য ছিল। আমি যেমন ছোটোবেলা থেকেই একটু শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ টাইপের ছেলে ছিলাম, তেমনি অ্যালেক ছিল বেশ ডানপিটে, ডাকাবুকো গোছের। আমি ছিলাম রোগাসোগা, দুর্বল, চট করে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। কিন্তু অ্যালেক ছিল খুব সাহসী, শক্তিশালী আর পরিশ্রমী। ছোটোবেলা থেকেই আমার পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। পাঠ্যের বই ছাড়াও আমার বাবার কাছে যে সমস্ত বই ছিল বা যেসব পত্রিকা, ম্যাগাজ়িন আসত, সব আমি পড়ে ফেলতাম। এদিকে অ্যালেক ছিল একদম উলটো। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলো করতেই ওর বেশি ভালো লাগত। এছাড়াও, জানো তো, ও ছিল আমাদের সব ভাইবোনদের প্রতি ভীষণ প্রোটেক্টিভ। কতবার যে ও আমার জন্যে আমাদের বয়সী অন্য ছেলেদের সাথে ঝগড়া-মারামারিতে জড়িয়েছে কী বলব। অবশ্য শুধু আমাদের প্রতি বলব কেন, আসলে ছোটোবেলা থেকেই ও ছিল একদম বাবার মতন। পুরো গ্রামের যেকোনও কারোরই বিপদে আপদে বাবার মতো অ্যালেকও ঝাঁপিয়ে পড়ত সাহায্য করার জন্যে।
“আমাদের গ্রামে বেশিরভাগ লোক জিউয়িশ হলেও, বেশ কিছু সংখ্যক ক্রিশ্চানও ছিল। কিন্তু সবার সাথে সবার খুব সুন্দর একটা আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। আমরাও যেমন ক্রিসমাসের সময় ওদের উৎসবে সামিল হতাম, ওরাও তেমনি পিসাখ-এর সময় আমাদের সাথে একসঙ্গে আনন্দ করত। আমাদের গ্রামের লোকেরা গরিব হলেও সবাই সবার সুখে-দুঃখে একসাথে মিলেমিশে বেঁচে থাকার মধ্যেই যে আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে, সেটা জানত।
“আমার যখন সাত-আট বছর বয়স, তখন থেকেই আস্তে আস্তে দেখতাম পরিস্থিতি কেমন যেন বদলাতে শুরু করল। মাঝেমাঝেই দেখতে পেতাম বাবা গ্রামের আরও সব গুরুজনদের সাথে গম্ভীর মুখে কীসব আলোচনা করছে। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে শুনতে পেতাম উদ্বিগ্ন মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে বাবা। কচি মাথায় অত কিছু না ঢুকলেও এটুকু বুঝতাম যে কোনও একটা কারণে বড়োরা খুব চিন্তিত। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করলেই বাবা বা মা হাসিমুখে এমন ভাব করত যেন সব ঠিকই আছে, কিছুই হয়নি।
“গ্রামে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে বাবার একটা আলাদা সম্মান ছিল। যেকোনও ব্যাপারে সবাই বাবার মতামত খুব মেনে চলত। তাই মাঝেমধ্যেই দেখতাম একসাথে অনেকে এসে বাবার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গভীর রাত পর্যন্ত দরজা বন্ধ করে কথাবার্তা বলছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের গ্রামের হলেও, বেশিরভাগ লোকই অপরিচিত। কখনও বা গ্রামের চার্চে বা সিনাগগে বাবা আরও কয়েকজন লোকের সাথে আমাদের আর আমাদের আশেপাশের আরও কয়েকটা গ্রামের লোকেদের জড়ো করে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিত। সবার থমথমে মুখগুলো দেখে এটুকু আন্দাজ করতে পারতাম যে আমাদের সুখের স্বর্গরাজ্যে একটা অশান্তির কালো মেঘ এসে ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে।
“এর কয়েকদিনের মধ্যেই এল সেই ভয়ংকর রাত, যে রাতের কথা আমি আজও ভুলতে পারি না। একদিন গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় দুমদাম ধাক্কা, কথা বলার আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। আধো ঘুমে চোখ মেলে দেখলাম কয়েকজন কালো পোশাক পরা লোক এসেছে বাবাকে সাথে করে নিয়ে যাবে বলে। জুডিথ আর রোজ় তখন একদমই ছোটো। অ্যালেকও ঘুমোলে একদম মড়ার মতো ঘুমোত। ওদের ঘুম ভাঙেনি। দরজার আড়াল থেকে একা আমি উঁকি মেরে দেখলাম, মার চোখের জল মুছিয়ে হাতদুটো চেপে ধরে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বাবা বলল, ‘চিন্তা কোরো না, আমার কিচ্ছু হবে না। আমি এই যাব আর আসব। তুমি বাচ্চাদের নিয়ে শোও। আমি এক্ষুনি চলে আসছি।’ কিন্তু লোকগুলোর সাথে বাবা সেই যে গেল, আর ফিরে এল না।”
বাইরে ধীরে ধীরে আলো কমে আসছিল। বৃদ্ধ উঠে গিয়ে দেওয়ালের গায়ে সুইচবোর্ডে একটা সুইচ টিপলেন। ঘরে লাইট জ্বলে উঠলেও খেয়াল করলাম, ভদ্রলোকের একটু আগের সেই সদাহাস্যময় মুখে জমে ওঠা আঁধারটা কাটল না। আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই চুপ করেই রইলাম। সোফায় ফিরে খানিক আনমনা হয়ে বসে থেকে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “একবেলা, দু’বেলা, একদিন, দু’দিন করে করে সাত-আট দিন কেটে গেল অপেক্ষা করতে করতে। প্রথমদিকে চোখের জল লুকিয়ে মা আমাদের ভরসা দিত। বলত এই তো বাবা চলে আসবে। এসে আমাদের আদর করবে, আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাবে। কিন্তু শেষের দিকে মাও ভেঙে পড়ল। পাড়া-প্রতিবেশীরা শুরুতে আসত আমাদের সান্ত্বনা দেবার জন্যে। আস্তে আস্তে ওরাও আসা বন্ধ করে দিল। আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে মা পড়ল অথৈ জলে। বেকারির কেক, পেস্ট্রি টুকটাক বিক্রি হলেও সেটা আমাদের পাঁচজনের চলার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। মা তাই বেকারি চালানোর পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ শুরু করল। কোনওমতে ক্যাপ্টেন ছাড়া জাহাজের মতো আমাদের সংসারটা দিশাহীনভাবে ভেসে চলল। আস্তে আস্তে আমাদের স্বপ্নের মতো দিনগুলো শেষ হয়ে কষ্টের দিনগুলো শুরু হল।
“তার কিছুদিনের মধ্যেই হিটলারের নাৎজ়ি বাহিনী আমাদের দেশ দখল করে নিল। সবাইকে দেখতাম কেমন একটা চাপা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অনেক ইহুদি পরিবারই প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে অন্যান্য দেশে, যেখানে তখনও যুদ্ধের আঁচ লাগেনি, সেখানে চলে গেল। আমরা আরও কয়েকটা অসহায় পরিবারের সাথে রয়ে গেলাম। কয়েকদিন পর সেই কালো পোশাক পরা লোকগুলো আবার ফিরে এল। ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম যে ওরা ছিল হিটলারের নৃশংস প্যারামিলিটারি বাহিনী শ্যুটজ়স্টাফেল, সংক্ষেপে এস.এস.। ওরা এসে আমাদের আর আমাদের আশেপাশের বেশ কয়েকটা গ্রামের সব ইহুদিদের বন্দুক দেখিয়ে নিয়ে চলে গেল একটা গেটোতে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “গেটো কী?”
“খুব সহজভাবে বলতে গেলে গেটো মানে হল বস্তি।” স্মিত হাসলেন ভদ্রলোক। “নাৎজ়িরা আসলে ইহুদিদের মনুষ্যেতর বা অচ্ছুৎ বলে মনে করত। তাই ওরা প্রত্যেক বড়ো শহরের একপ্রান্তে শুধুমাত্র ইহুদিদের বসবাসের জন্যে এলাকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। এই সমস্ত এলাকাগুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকত এবং ইহুদিদের এর বাইরে বেরোনোর নিয়ম ছিল না। সামান্য কয়েক বর্গ কিলোমিটার জায়গায় প্রায় আট-দশ হাজার ইহুদি পরিবারকে অমানবিকভাবে জোর করে থাকতে বাধ্য করা হত। নিজেদের দেশে, নিজেদের শহরে এটা একধরনের বন্দিজীবন ছাড়া আর কিছুই নয়।”
শিক্ষা সংস্কৃতিতে এত উচ্চ স্থানে আসীন একটা জাতি অন্য একটা সংখ্যালঘু মানবগোষ্ঠীর প্রতি এরকম কদর্য মনোভাব কী করে দেখাতে পারে? ফ্যাসিজ়মের এরকম চূড়ান্ত নিদর্শনের পরিচয় পেয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যে মুখে কোনও ভাষা আসছিল না। বৃদ্ধ কিন্তু অবিচল কণ্ঠে তাঁর হৃদয়বিদারক কাহিনি জারি রাখলেন।
“নিজেদের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও জোর করে গেটোর সেই নোংরা, ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকতে বাধ্য হলাম আমরা। উফ! কী ভয়াবহ ছিল সেই দিনগুলো, তুমি ভাবতে পারবে না, ইয়ং ম্যান। আমাদের কাছে যেটুকু পয়সাকড়ি অবশিষ্ট ছিল সব কেড়ে নিয়েছিল ওরা। মার শরীরটাও ততদিনে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। আমাদের পড়াশোনা মাথায় উঠল। নাৎজ়িরা প্রত্যেক পরিবার পিছু যে সামান্য পরিমাণ রেশন বরাদ্দ করে দিয়েছিল তাই দিয়ে কোনওমতে আমাদের দিন চলত। কোনওদিন আধপেটা খেয়ে, কোনওদিন হয়তো বা না খেয়েই থাকতে হত আমাদের। বাবার অবর্তমানে অ্যালেক আমাদের সংসারের হাল ধরল। আমাদের গেটোর বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ ছিল, বুঝলে? ধরা পড়লে কড়া শাস্তি হত। মারধোর বা অকথ্য শারীরিক নির্যাতন তো হতই, কখনও বা সোজা গুলি করে মেরেও ফেলত গেস্টাপোরা। তাও অ্যালেক মাঝে মাঝে প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে কাঁটাতারের বেড়া পার করে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের জন্যে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসত। মা বহুবার মানা করত, তাও ও কোনও কথা শুনত না। শীতকালে অবস্থা নরকের চেয়েও দুঃসহ হয়ে উঠত। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, নিকৃষ্টতম নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে সেখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি এতটাই অস্বাস্থ্যকর ছিল যে প্রত্যেকটা ঘরে অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। আবার শরীর খারাপ হলেও যতদিন না নিজে থেকে শরীর ঠিক হয় ততদিন পর্যন্ত ওষুধপত্র বা চিকিৎসা ছাড়া পড়ে থাকতে হত। এভাবে বিনা ওষুধে রোগে ভুগে কত লোকের যে মৃত্যু হত, তার কোনও হিসাব ছিল না। খবরের কাগজ আসত না, একটা রেডিও ছিল আমাদের, সেটাও কেড়ে নিয়েছিল ওরা। ফলে বাইরের কোনও খবরই জানতে পারতাম না। সবার ওপরে ছিল মাঝেমাঝেই বিনা কারণে গেটোতে ঢুকে এস.এস. বা গেস্টাপোদের অত্যাচার। এই দুর্বিষহ দিনগুলোর চাপ আর নিতে পারল না আমাদের ছোট্ট বোন রোজ়। দীর্ঘদিন বিনা চিকিৎসায় টাইফাস রোগে ভুগে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল চিরশান্তির জগতে, পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে।
“এত দুঃখ দুর্দশা সত্ত্বেও আমরা আস্তে আস্তে সব মানিয়ে নিচ্ছিলাম, জানো তো? মনে মনে আশা রাখতাম একদিন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা ফিরে আসবে। আমরা আবার আমাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে পারব। আমাদের বাগানে আবার আগুনরঙা টিউলিপ ফুটবে। সারা ঘর মায়ের বানানো কুকিজ়, পেস্ট্রির গন্ধে ম ম করবে। বৈঠকখানায় ফায়ার-প্লেসের ওম পোহাতে পোহাতে কফির কাপ হাতে নিয়ে গল্প করব সবাই মিলে। আরও কত কী। কিন্তু জানো তো, ঈশ্বর হয়তো পুরো ব্যাপারটা অন্যরকম ভেবে রেখেছিলেন।
“আমার এখনও মনে আছে, উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের গ্রীষ্মকাল তখন। একদিন সকালে হঠাৎ গেস্টাপোরা এসে ঘোষণা করে গেল যে আমাদের এই গেটো খালি করে দিতে হবে। আমাদের অন্য একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে সবার জন্যে কাজের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকে যেন নিজের নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেডি হয়ে থাকে। পরেরদিন সকালে ছ’টার সময় ট্রেন ছাড়বে।
“নতুন করে আবার আশা জাগল সবার মনে। নতুন জায়গা নিশ্চয়ই এখানকার মতো ভয়ানক হবে না। নতুন কাজ পাওয়া যাবে। হয়তো আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। অল্পবিস্তর যা যা সম্বল ছিল প্রত্যেকের কাছে কোনওমতে সেসব বাক্স-প্যাঁটরায় গুছিয়ে নিয়ে পরেরদিন ট্রেনে চেপে সবাই রওনা দিলাম অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে।
“একটা ছোট্ট কামরায় গাদাগাদি করে যেভাবে গবাদি পশুদের নিয়ে যাওয়া হয়, ঠিক সেভাবে দীর্ঘ তিনদিনের ট্রেন-যাত্রার পর আমাদের নিয়ে আসা হল আউশউইৎজ়ে। এই দিনটা আমার জীবনের আরেকটা ভয়ংকর কালো দিন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, এমন দিন যেন চিরশত্রুকেও কখনও দেখতে না হয়।
“খুব ভোরবেলা ট্রেন এসে পৌঁছল আউশউইৎজ়ে। ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখলাম চারদিকে গিজ গিজ করছে লোক। নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত জোয়ান মরদ, মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা দুধের শিশু, ময়লা স্কার্ফ মাথায় চোখের তলায় কালি পড়া যুবতী, ছোট্ট পুতুল হাতে বাচ্চা মেয়ে, নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতে থাকা পিঠোপিঠি দুই ভাই, লাঠি হাতে থুত্থুড়ে বুড়ো, পথশ্রমে ক্লান্ত অসুস্থ বৃদ্ধা। কতজন মানুষ। কতরকমের মানুষ। কমসে কম হাজার দশেক তো হবেই। অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে এদিক ওদিক দেখছি। আশঙ্কার একটা দোলাচলে একহাতে আঁকড়ে ধরে আছি ছোট্ট জুডিথকে, অন্য হাতে চেপে ধরে রেখেছি মাকে। অ্যালেক ধরেছে মায়ের অন্য হাত। এমন সময় মাইকে ঘোষণা করা হল, সবাই যেন সামনের দিকে এগোতে থাকে। দেখতে পেলাম কয়েকজন এস.এস. গার্ড লাঠি, ব্যাটন উঁচিয়ে আমাদের লাইন ধরে সামনে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিচ্ছে।
“কিছুদূর এভাবে চলার পর দেখলাম সামনে আরও কয়েকজন সামরিক উর্দি পরা লোক খোশমেজাজে চুরুট মুখে গল্প করতে করতে সেই লম্বা লাইন থেকে মাঝে মাঝে একজন-দু’জনকে আলাদা করে সরিয়ে পাশে দাঁড় করিয়ে রাখছে। বাকিদের বলছে এগিয়ে যেতে। এই আলাদা করা রাখা মানুষগুলোর সংখ্যা একদম নগণ্য, এই ধরো, পঞ্চাশ জনে একজন কি দু’জন হবে। পরিবারের বাকি সবার থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে ওরা বলির পাঁঠার মতো কাঁপছে ভয়ে। আমাদের অবশ্য ইউনিফর্ম পরা লোকগুলো ওদের মতো আলাদা করে দিল না। বাকি অধিকাংশ লোকের মতো আমরাও আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম একটা মস্ত শেডের তলায়।
“দেখলাম, সেখানে কিছুক্ষণ পরপর কোথা থেকে যেন একটা একটা করে খালি ট্রাক আসছে আর কয়েকজন এস.এস. উর্দিধারী সেই অপেক্ষারত মানুষগুলোকে ট্রাকে উঠিয়ে দিচ্ছে। ভর্তি হয়ে যাবার পর ট্রাকগুলো সেই মানুষগুলোকে নিয়ে আবার কোথায় চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে। আস্তে আস্তে আমাদের আগের লোকগুলো ট্রাকে উঠতে শুরু করল। আমরাও সবে উঠতে যাব এমন সময় এক উর্দিধারী হঠাৎ আমাকে আর অ্যালেককে পাশাপাশি দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘টুইন্স?’ আমরা মাথা নাড়তেই সেই উর্দিধারী তার সঙ্গীর সাথে ফিসফিস করে কিছু একটা আলোচনা করে আমাকে আর অ্যালেককে লাইন থেকে বেরিয়ে আসতে বলল। আমরা কিছুতেই মাকে আর জুডিথকে ছেড়ে আসতে চাইছিলাম না। মাও আমাদের হাত চেপে ধরে রেখেছিল। গোলমাল দেখে আরও দুয়েকজন উর্দিধারী সেখানে হাজির হয়ে শেষপর্যন্ত গায়ের জোরে আমাদের টানতে টানতে বের করে নিয়ে এল লাইন থেকে। আমরা ওদের কবল থেকে বেরোনোর জন্যে প্রাণপণে ধস্তাধস্তি করছিলাম। কিন্তু বেশ কয়েকজন মিলে আমাদের চেপে ধরে রেখেছিল। আমাদের চোখের সামনে বাকি উর্দিধারীরা ধাক্কা দিতে দিতে মাকে আর জুডিথকে উঠিয়ে দিল ট্রাকটাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের চোখের সামনে মা আর জুডিথকে নিয়ে ট্রাকটা মিলিয়ে গেল চোখের আড়ালে। জানো, আজও যেকোনও সময় চোখ বুজলেই মায়ের সেই কাতর দৃষ্টি, জুডিথের সেই জলভরা চোখের করুণ আর্ত চিৎকার ছবির মতো মনে ভেসে ওঠে, চেষ্টা করেও কিছুতেই ভুলতে পারি না। অবশ্য ভুলবই বা কী করে, বলো? শেষ দেখা কি আর কখনও ভোলা যায়? হ্যাঁ, ওটাই ছিল মা বা জুডিথের সাথে আমার শেষ দেখা। এরপর মাকে বা জুডিথ কাউকেই আর কোনওদিন দেখতে পাইনি।”


তিন


আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওঁর কথাগুলো শুনছিলাম। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেও ওঁর মন সেই সময় আমাকে, আমাদের এই ঘর, এই শহর অতিক্রম করে চলে গিয়েছিল অনেক অনেক দূরে। সময়ের চাকা উলটোদিকে ঘুরিয়ে জীবনের ভয়ংকরতম একটা অধ্যায়ে। কথায় বলে না, অল্প শোকে কাতর আর বেশি শোকে পাথর? ওঁকে দেখে সেদিন আমার ঠিক এই কথাটাই মনে পড়ে যাচ্ছিল। এরকম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কারোর জীবনে হলে কেউই তা মনে রাখতে চায় না, বেঁচে থাকার দায়েই অন্তত ভুলে যেতে চায়। কিন্তু কী অসামান্য মনোবলে তিনি এই সমস্ত দুঃখদায়ক অভিজ্ঞতা চেপে না রেখে সকলের সাথে ভাগ করে চলেছেন শুধুমাত্র যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে, এটা ভেবে ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
যাই হোক, কিছুক্ষণের নীরবতার পর ভারী গলায় বৃদ্ধ আবার বলতে শুরু করলেন, “পরে আন্দাজ করেছিলাম, সম্ভবত ওখান থেকেই ওদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গ্যাস চেম্বারে। শুধু ওরা কেন, আমরা দু’জন আর বাকি যে হাতে গোনা কয়েকজনকে আগে লাইন থেকে আলাদা করে বের করে রাখা হয়েছিল, তারা ছাড়া বাকি প্রত্যেকেরই ঠিকানা হয়েছিল আউশউইৎজ়ের চার-চারটে বিশাল ক্রেমেটরিয়ামগুলোর কোনও একটায়। এটা শুধু সেদিনের কথা নয়, দিনের পর দিন চলত এই ঘটনা। এটাই ছিল সেখানকার প্রথা, সেখানকার অলিখিত নিয়ম। হিটলারের ‘ফাইনাল সল্যুশন’ কার্যকরী করতে প্রত্যেকদিন রাইখস্টাগের অন্তর্গত ইউরোপের বিভিন্ন অংশ থেকে হাজারে হাজারে ইহুদিদের নিয়ে আসা হত আউশউইৎজ়ে। তারপর অনুষ্ঠিত হত এই ‘সিলেকশন প্রসেস’ যেখানে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন, যাদের কর্তৃপক্ষ মনে করত ক্যাম্পের কাজে লাগানো যেতে পারে, তারা বেঁচে থাকার সুযোগ পেত। আর বাদবাকি সমস্ত পনেরো বছরের কমবয়সী শিশু, চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষ বা মহিলা, অসুস্থ, দুর্বল এবং বিকলাঙ্গদের নির্মমভাবে গণহারে হত্যা করা হত পৌঁছানোর মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই। ভাবতে পারবে না ইয়ং ম্যান, একেকদিন সেই সংখ্যাটা দশ-বারো হাজারও ছাড়িয়ে যেত। একটা কথা তখন খুব প্রচলিত ছিল জানো, আউশউইৎজ়ে ঢুকলে ইহুদিদের বেরোনোর একমাত্র রাস্তা হল চিমনির মধ্য দিয়ে, তবে সশরীরে নয়, ধোঁয়া হয়ে।”
আমি যত শুনছিলাম, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এত কম বয়সে এতকিছু সহ্য করতে হয়েছে ওঁকে! আর আমরা সামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দিই, কান্নাকাটি শুরু করি। একেকবার মনে হচ্ছিল সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে ওঁর পায়ে ধরে সমস্ত মানবজাতির পক্ষ থেকে ওঁদের সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া এই ঘৃণ্য অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাই। কিন্তু অনুতাপে, আত্মগ্লানিতে কিছুতেই সেই সাহস জুটিয়ে উঠতে পারলাম না। ভদ্রলোক বলে চললেনー
“বাকি যে কয়েকজনকে আগে লাইন থেকে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের সাথে আমাদের দু’জনকেও নিয়ে যাওয়া হল স্নানাগারে। সেখানে প্রথমে আমাদের জীবাণুমুক্ত করে স্নান করানো হল। মাথার চুল ছোটো ছোটো করে ছেঁটে দেওয়া হল। পুরনো পোশাকের পরিবর্তে পরতে দেওয়া হল নীল-সাদা ডোরাকাটা ইউনিফর্ম। সবশেষে আমাকে আর অ্যালেককে নিয়ে যাওয়া হল একটা ব্যারাকে। গিয়ে দেখি নানা বয়সের নানাধরনের মানুষ রয়েছে সেখানে। পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, মাঝবয়েসী সবরকম। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই আবার যমজ। কী হচ্ছে বা কী হতে চলেছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এস.এস-দের বা অন্য লোকেদের কথাবার্তায় শুধু একটা শব্দ কিছুক্ষণ পর পর কানে আসছিল। মেঙ্গলা। যদিও তখন ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো সামর্থ্য ছিল না আমাদের। পথশ্রমের ক্লান্তি, মা বা জুডিথের জন্যে উদ্বেগ, অনাগত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে শরীর আর দিচ্ছিল না। অল্পবিস্তর যা খেতে দেওয়া হয়েছিল তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম দু’জনে। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, ব্যারাকে নিয়ে যাবার আগে আমাদের হাতে ট্যাটু করে প্রিজ়নার নাম্বারও খোদাই করে দিয়েছিল ওরা।”
ওঁর এগিয়ে দেওয়া বাঁহাতটার কবজির ওপরের অংশে সময়ের সাথে অস্পষ্ট হয়ে আসা কয়েকটা ছোটো ছোটো কালো নম্বর স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি।
ভদ্রলোক বলতে থাকলেন, “পরেরদিন দেখা হল সেই লোকটার সাথে যার জন্যে আজকে আমার এই অবস্থা। ডঃ ইয়োসেফ মেঙ্গলা। ক্যাম্পের অন্যতম এক প্রভাবশালী মেডিক্যাল অফিসার। সুদর্শন, মাঝবয়সী, সদাহাস্যমুখ ব্যক্তিত্ব। অথচ গ্রিক দেবতার মতো সুন্দর সেই মুখের আড়ালে যে কী ভীষণ নিষ্ঠুর এক পিশাচ লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা এঁকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি আউশউইৎজ়ে নাৎজ়ি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নানাধরনের মেডিক্যাল রিসার্চ করতেন এবং রিসার্চ-সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার জন্যে গিনিপিগ হিসেবে বেছে নিতেন ক্যাম্পে বন্দি অসহায় ইহুদিদের। গবেষণার জন্যে তাঁর সবচেয়ে পছন্দের সাবজেক্ট ছিল আইডেন্টিক্যাল টুইন্স। যমজদের ওপর তিনি নানাধরনের পরীক্ষা চালাতেন। কখনও দু’জন যমজের একজনের শরীরে বিভিন্ন রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে পরীক্ষা করতেন অপরজনের ওপর এর কোনও প্রভাব পড়ে কি না। কোনও সময় আবার রক্তের গ্রুপ না মিললেও একজনের শরীরের রক্ত অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করিয়ে তার ফলাফল স্টাডি করতেন। নতুন আবিষ্কৃত কোনও ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্যে চরম ক্ষতি এমনকি মৃত্যু হতে পারে জেনেও নির্দ্বিধায় তা প্রয়োগ করতেন অসহায় মানুষগুলোর ওপর। জীবন্ত বন্দিদের চোখে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করে কৃত্রিম উপায়ে মানুষের চোখের তারার রঙ পরিবর্তন করার চেষ্টা চালাতেন। আরও কত কী। ওঁকে আড়ালে সবাই ‘অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ’ বলে ডাকত। এমনিতে উনি সবার সাথে খুব সুন্দর ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে ছোটো ছোটো বাচ্চাদের সাথে। ভাবতে পারো, তাঁর গবেষণার কাজে ব্যবহৃত বাচ্চাদের জন্যে তিনি ক্যাম্পে একটা কিন্ডারগার্টেন পর্যন্ত খুলেছিলেন। কেক-চকোলেট উপহার দিয়ে, কোলে তুলে আদর করে খুব সহজেই তিনি বাচ্চাদের মন জয় করে নিতে পারতেন। আবার পরমুহূর্তেই হাসিমুখে প্রাণঘাতী অসুখের জীবাণু প্রবেশ করাতেন তাদের দেহে। একবার তো কী হয়েছিল জানো? এমিলি আর হেলেন বলে দুটো ফুলের মতো যমজ বাচ্চা ছিল আমাদের ব্যারাকে। একদম কচি, সবে তিন কি চার বছর বয়স হবে। তাদেরকে সামলানোর জন্যে তাদের মাও থাকত আমাদের ব্যারাকে। ওদের বাবা বা পরিবারের বাকি সবাইকে হয়তো আসামাত্রই মেরে ফেলা হয়েছিল গ্যাস চেম্বারে। বাচ্চাদুটো এত মিষ্টি ছিল যে ওদেরকে প্রত্যেকেই খুব ভালোবাসত। একবার কোনও এক কারণে, কী জানি হয়তো বা কোনও এক্সপেরিমেন্টের ফলেই হঠাৎ করে হেলেন মারা যায়। বোনকে হারিয়ে পরেরদিন এমিলি খুব কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। ওর মাও ওকে সামলাতে পারছিল না। ব্যারাকে আমরা সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। এমিলিকে থামাতে সবাই যখন ব্যর্থ হল তখন একসময় ডঃ মেঙ্গলা এলেন ওকে দেখতে। ওকে কোলে নিয়ে আদর করে, চকোলেট খেতে দিয়ে শান্ত করে ওর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু চলে যাবার সময় আমি স্পষ্ট দেখলাম উনি পাশের এস.এস. গার্ডকে কী একটা যেন ইশারা করলেন। জানো, পরেরদিন থেকে এমিলি আর ওর মাকে আর কোনওদিন দেখা যায়নি।
“যাই হোক, এভাবেই দিন কাটত আমাদের। তবে একটা কথা ঠিক, ডঃ মেঙ্গলার গবেষণার জন্য আমরা যারা ব্যবহৃত হতাম, তারা ক্যাম্পের বাকি বন্দিদের তুলনায় তুলনামূলক বেশি সুবিধে ভোগ করার সুযোগ পেতাম। আমাদের কায়িক পরিশ্রমও অতটা করতে হত না। অন্যদের তুলনায় খাবারের মান বা পরিমাণও ভালো ছিল। আমাদের ব্যারাকটাও ছিল অন্য ব্যারাকগুলোর তুলনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং প্রশস্ত। সাধারণত কিছুদিন পরপর আমাদের ওপর বিভিন্ন ওষুধ বা অন্যান্য পরীক্ষাধীন কেমিক্যাল প্রয়োগ করা হত। পরীক্ষাধীন অবস্থায় আমাদের রাখা হত ব্যারাকের পাশেই শুধুমাত্র ডঃ মেঙ্গলার গবেষণার জন্যে নির্মিত একটা ছোটো হাসপাতালের মতো জায়গায়। সেখানে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ ধরে আমাদের ওপর সেই কেমিক্যালের প্রভাব লক্ষ করা হত। রোজ আমাদের দেহের উষ্ণতা, রক্তচাপ, ওজন ইত্যাদি মাপা হত। আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও প্রায়ই নানারকম বিপত্তি ঘটে যেত। অনেকসময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পরীক্ষাধীন ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হত। কখনও আবার বেঁচে গেলেও ওষুধের প্রভাবে দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে হত। এখানেও ছিল আরেক বিপদ। বেশি দিন অসুস্থ থাকলেও আবার ডঃ মেঙ্গলার নির্দেশে নিয়ে যাওয়া হত গ্যাস চেম্বারে। মৃত্যুর সাথে এভাবে দৈনন্দিন লুকোচুরি খেলার ফাঁকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না। কিন্তু এই শয়তানের উন্মত্ততা দেখে ঈশ্বরও হয়তো বিতৃষ্ণায় আউশউইৎজ় থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন।”
ভদ্রলোক হয়তো দম নেবার জন্যেই একটু থামলেন। সেই ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ক্যাম্পে আপনাদের রোজকার জীবন কীরকম ছিল একটু বলুন।”
“কী বললে? রোজকার জীবন? মাই ফ্রেন্ড, আর যাই বলো না কেন, এটাকে অ্যাট লীস্ট জীবন বোলো না প্লিজ! এরকম জীবনের চেয়ে মৃত্যুও হয়তো ঢের ভালো।” কেমন একটা উদাসীন তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। “যাক গে, যা বলছিলাম, হ্যাঁ, রোজ ভোর সাড়ে চারটায় দিন শুরু হত আউশউইৎজ়ে। তখনই আমাদের উঠে পড়তে হত ঘুম থেকে। শীতকালে অবশ্য আরও একঘণ্টা বেশি ঘুমানোর সময় পেতাম। যাই হোক, প্রথম ঘণ্টা বাজার পরের একঘণ্টার মধ্যে আমাদের সকালের সমস্ত প্রাতঃকৃত্য সেরে নিতে হত, কারণ এরপর সারাদিন আর সে সুযোগ পাওয়া যেত না। একঘণ্টা পর দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে আমাদের নিজের নিজের ব্যারাকের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হত। ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্যাম্পের এস.এস. অফিসাররা নিজেদের সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী ধীরেসুস্থে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে এসে আমাদের উদ্ধার করতেন। এরপর শুরু হত সিলেকশন প্রসেস। তাতে ঠিক করা হত কে কে সেই দিনটা বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে আর কাকে কাকে পাঠানো হবে গ্যাস চেম্বারে। এসব মিটে গেলে প্রথমে আমাদের দেওয়া হত কফি বা চা। ক্যাম্পে আসার সাথে-সাথেই বন্দিদের প্রত্যেককে একটা করে বাটি দেওয়া হত। সেই বাটি দিয়েই আমাদের সব কাজ করতে হত। মুখ-হাত ধোয়া, চান করা থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া, চা, কফি পান করা সব। চা-পর্ব শেষ হলেই আমাদের কাজে নেমে পড়তে হত। দুপুরে একঘণ্টার বিরতি থাকত লাঞ্চের জন্যে। তাতে আমাদের জন্যে বরাদ্দ থাকত এক বাটি স্যুপ। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ, জাস্ট এক বাটি স্যুপ। অবশ্য স্যুপ না বলে সেটাকে নির্দ্বিধায় জলও বলতে পারো, কারণ জলের থেকে স্বাদে এবং গন্ধে ওই জিনিসটার খুব একটা পার্থক্য ছিল না। ও হ্যাঁ, রোজ সেই জলীয় বস্তুটিতে অবশ্য কয়েকটা মরশুমি সবজির টুকরোও ভেসে থাকত আর সপ্তাহে একদিন করে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে তাতে এক-আধ টুকরো মাংসও পাওয়া যেত। যাই হোক, কোনওমতে সেটা গলাধঃকরণ করার পর আবার শুরু হত বিরামহীন কাজ। সারাদিনে প্রায় এগারো ঘণ্টা অমানুষিক খাটানোর পর সন্ধেবেলা আবার আমাদের ব্যারাকের সামনে দাঁড় করিয়ে রোল-কল করা হত। সবশেষে যখন আমরা ছুটি পেতাম, তখন ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে আমাদের শরীরে দম বলতে আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। সেই ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে কোনওমতে রাত্রের রেশন মানে একটা পাঁউরুটির সাথে এক চামচ চীজ় বা মার্জারিন, যেদিন যেটা জুটত, সংগ্রহ করে ঢুকে যেতাম ব্যারাকে। রাতে সেই পাঁউরুটির অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা রেখে দিতাম পরেরদিন সকালের ব্রেকফাস্টের জন্যে। রাত ন’টার সময় আবার ঘণ্টা বেজে উঠত। ব্যারাকের লাইট অফ করে দেওয়া হত আর আমাদের শুয়ে পড়তে হত। তারপর আর ব্যারাকের বাইরে বেরোবার অনুমতি বা উপায় কোনওটাই ছিল না, কারণ বাইরে থেকে ব্যারাকের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত।”
আমি প্রশ্ন করলাম, “কীধরনের কাজ করতে হত আপনাদের ওখানে?”
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, “একটু আগে বললাম না, ডঃ মেঙ্গলার রিসার্চের অধীনে ছিলাম বলে আমাদের ভাগ্যে একটু কম পরিশ্রমের কাজগুলোই জুটত? তাছাড়া বয়সটাও তো কমই ছিল। তাই বিভিন্ন ধরনের হালকা কাজের মধ্যে বেশিরভাগ দিনই যে কাজটা করতে হত সেটা হল, প্রতিদিন যে হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হত গ্যাস চেম্বারে, তাদের সাথে করে নিয়ে আসা সমস্ত জিনিসপত্র যেমন টাকাপয়সা, পোশাকআশাক, জুতো বা অন্যান্য জিনিসপত্র সব ডাঁই করে রাখা থাকত একটা জায়গায়। পরে সেই সমস্ত জিনিস নাৎজ়িরা নিজেদের দেশে পাঠিয়ে দিত পুনর্ব্যবহারের জন্যে। আমাদের সেগুলো সব গুছিয়ে আলাদা আলাদা করে জমা করে রাখতে হত বিভিন্ন জিনিসের জন্যে নির্দিষ্ট বিভিন্ন খালি ব্যারাকে। এছাড়া বাকি বন্দিরা, যারা বয়সে বড়ো বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী, তাদের পাঠানো হত ক্যাম্পের বাইরে আশেপাশে কোনও খনিতে বা কন্সট্রাকশন সাইটে কাজ করার জন্যে।”
আমি ওপরে নিচে মাথা নাড়লাম। ভদ্রলোক কয়েক মুহূর্ত থেমে থেকে বলতে থাকলেন, “কাজটা আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ-সরল মনে হলেও, আমি খুব আবেগপ্রবণ ছিলাম বলে আমার খুব কষ্ট হত কাজটা করতে। কারণ আমি জানতাম, যে পোশাকটা আমি ভাঁজ করছি, সেটা একসময় যে পরত, সে হয়তো এখন আর বেঁচে নেই। অথবা কোনও স্যুটকেস খুলে হয়তো একটা গ্রুপ ফটো পেলাম। সাজগোজ করে হাসি মুখে বাবা, মা, ভাই, বোন, দাদু, দিদা। সব মিলিয়ে একটা সুখী পরিবারের ছবি। বুঝতে পারতাম এদের সবাইকেই হয়তো নির্মমভাবে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়েছে। বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠত। মনে পড়ে যেত নিজের পরিবারের কথা। ভাবতাম বাবা, মা, জুডিথ ওরা না জানি এখন কোথায় আছে, কীভাবে আছে। আদৌ বেঁচে আছে তো? নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে আসত। কিন্তু দুঃখে বুক ফেটে গেলেও কাজ থামানোর কোনও উপায় ছিল না, কারণ কাজে ফাঁকি দিলেই কপালে জুটত অশ্রাব্য গালিগালাজ আর কাপোদের ব্যাটন।”
“কাপো!” আবার প্রশ্ন না করে পারলাম না আমি, “কাপো আবার কারা?”
“কাপোরা ছিল সব মার্কামারা ক্রিমিন্যাল। প্রত্যেকেই একের চেয়ে এক সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী।” ভদ্রলোক বুঝিয়ে বললেন, “ক্যাম্পে আমাদের সব কাজকর্মের তদারকি করত এরা। নাৎজ়িরা জার্মানির বিভিন্ন জেলখানা থেকে বেছে বেছে সমস্ত নৃশংস খুনি, কুখ্যাত গুণ্ডা বা নচ্ছার ডাকাতগুলোকে নিয়ে এসে বিভিন্ন ক্যাম্পে ইহুদিদের কাজকর্ম দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিত। কথায় বলে না, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়? এই কাপোরা ছিল এস.এস.-দের চেয়েও অনেক অনেক বেশি ভয়ংকর। ওদের আসল কাজ ছিল ইহুদিদের ওপর নির্যাতন করা। কাজে সামান্য কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি হলেই এই কাপোরা ঝাঁপিয়ে পড়ত আমাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করার জন্যে।”
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ করে বসে রইলাম। এই ধরনের অভিজ্ঞতা বলা এবং শোনা দুটোই সমান চাপের। তাই মাঝেমধ্যে এই নীরবতাগুলো যেন আমাদের দু’জনকেই অক্সিজেন যোগাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ড পরে উনি আবার বললেন, “সবচেয়ে খারাপ লাগত কখন জানো? যখন চোখের সামনে দেখতে পেতাম অসংখ্য নিরপরাধ হতভাগ্য মানুষ নিজের অজ্ঞাতসারে আসন্ন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন। আমরা যেখানে কাজ করতাম, সেই জায়গাটা ছিল ক্রেমেটরিয়াম ফোরের কাছাকাছি। এই ধরো একশো দেড়শো মিটার দূরে হবে। প্রতিদিন সকালে আমরা কাজ করতে করতে দেখতে পেতাম ট্রেনে করে আসা একদল ইহুদিকে ট্রাকে করে নিয়ে আসা হচ্ছে ক্রেমেটরিয়ামে। সেই অসহায় মানুষগুলোকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেওয়া হচ্ছে না যে এই পৃথিবীতে তাদের আয়ু আর মাত্র কিছুক্ষণ। তারা টেরও পাচ্ছে না, ভিতরে কী ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে ওদের জন্যে। কী বলা হত ওদের জানো? ওদের বলা হত ওদের জীবাণুমুক্ত করানোর জন্যে স্নান করানো হবে। ওদের নির্দেশ দেওয়া হত ওরা যেন ওদের পোশাকআশাক, জুতো-মোজা সব খুলে বাইরে হুকে টাঙিয়ে রাখে। জুতো জোড়া যেন লেসের সাহায্যে একটার সাথে আরেকটা বেঁধে রাখে। সবচেয়ে বড়ো কথা, যে হুকে রাখা হচ্ছে সেই নাম্বারটা যাতে মনে রাখে, যাতে স্নানের পরে খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়। তারপর ওদের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হত। একটা জানালাহীন ছোট্ট বদ্ধ ঘরে একসঙ্গে হাজার দু’হাজার মানুষকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে ইস্পাতের সাত ইঞ্চি পুরু দরজা লাগিয়ে দেওয়া হত। তারপর একজন এস.এস. অফিসার মুখে গ্যাস মাস্ক পরে মই বেয়ে উঠে স্কাইলাইট দিয়ে সেই ঘরের মধ্যে জ়াইক্লোন-বি নামের একটা বিষাক্ত কীটনাশক ফেলে দিত। এই রাসায়নিক বস্তুটি হাওয়ার সংস্পর্শে এসে এমন সাংঘাতিক এক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করত যার প্রভাবে ওই ঘরে আটকে থাকা মানুষগুলো দমবন্ধ হয়ে মারা যেত। এসব আমরা চোখে না দেখলেও বুঝতে পারতাম। কীভাবে বলো তো? আওয়াজ শুনে। শ্বাস নেবার জন্যে, বেঁচে থাকার জন্যে সেই নিরুপায় মানুষগুলো যখন প্রাণপণে একসাথে সেই ইস্পাতের দরজায় আঘাত করত, সেই গুমগুম আওয়াজ আমরা এতদূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পেতাম। খুব বেশি হলে মিনিট দশেক চলত সেই আওয়াজ। তারপর আস্তে আস্তে ক্ষীণ হতে হতে ধীরে ধীরে থেমে যেত। বিরাজ করত এক অস্বাভাবিক পিন পতন নিস্তব্ধতা। সেই নৈশব্দ যেন আরও তীব্রভাবে কানে এসে বিঁধত আমাদের। পরের দিকে ওরা গ্যাস চেম্বারের বাইরে জোরে আওয়াজ করতে থাকা একেকটা ইঞ্জিন চালিয়ে রাখত যাতে ইহুদিদের সেই মরণপণ আর্তনাদ চাপা দেওয়া যায়। তাও সেই আওয়াজ চাপা দেওয়া যেত না। মশা, মাছি পোকামাকড়দেরও মনে হয় মানুষ এত নির্দয়ভাবে মারে না, যেভাবে নাৎজ়িরা ইহুদিদের হত্যা করত। যাই হোক, সব শান্ত হয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর কাজ শুরু হত জ়োন্ডার-কমান্ডোদের। এই জ়োন্ডার-কমান্ডোরা কারা ছিল জানো? এরা ছিল আমাদেরই মতো আরেক দল ভাগ্যহীন ইহুদি, যাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত হিসেবে গ্যাস চেম্বারে নিহত নিজেদের স্বজন পরিজনদের দেহ বের করে এনে ক্রেমেটরিয়ামের চুল্লিতে দাহ করার কাজ করে যেতে হত দিনের পর দিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা দেখতে পেতাম ক্রেমেটরিয়ামের বিশাল চিমনিটা দিয়ে ভক ভক করে বেরিয়ে আসছে একরাশ ঘন কালো ধোঁয়া। একটা উগ্র কটু গন্ধে ভরে যেত চারপাশ। গা গুলিয়ে উঠত, অসুস্থ লাগত। তাও সব মুখ বুজে সহ্য করে যেতে হত আমাদের। প্রতিদিনই এই নরমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হত আমাদের চোখের সামনে, অথচ ইচ্ছে থাকলেও এর প্রতিবাদ, প্রতিকার বা প্রতিরোধ করার কোনও ক্ষমতা আমাদের ছিল না।”
যেকোনও অস্বাভাবিক ঘটনা প্রথমবার ঘটতে দেখলে বা শুনলে আমরা অবাক হই, শিউরে উঠি। একইরকম ঘটনায় দ্বিতীয়বারে আমরা আবারও চমকে উঠি বটে, কিন্তু সেই বিস্ময়ের অভিঘাত আগেরবারের থেকে কম হয়। এভাবে বারবার একইধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে সেটা আমাদের আস্তে আস্তে গা-সওয়া হয়ে যায়। আমরা আর অবাক হই না। আমারও সেদিন হয়েছিল একই অবস্থা। অবাক হবার যেন আর কিছু বাকি ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঠিকই তো আছে, অস্বাভাবিক তো কিছুই নয়, একটা বিকৃত মস্তিষ্ক সাইকো আর তার অন্ধ অনুগামীদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো আর কীই বা আশা করা যেতে পারে?


চার


চুপ করে খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ভদ্রলোক। মনের ভিতর উথলে ওঠা ঝড়টাকে সামাল দেবার জন্যই হয়তো। আমি ওঁকে বিরক্ত করলাম না। ওঁকে ওঁর মতো সময় নিতে দিলাম। এমনিতেও কিছু জিজ্ঞেস করার আর সাহস হচ্ছিল না আমার। কিছুক্ষণ পর নিজের থেকেই তিনি ফিরলেন আমার দিকে। দেখলাম মুখের গুমোট ভাবটা কেটে আবার একটা মৃদু হাসি ফিরেছে ওঁর ঠোঁটের কোণে। বললেন–
“এই বীভৎস পরিস্থিতিতেও বেঁচে থাকার ছোটোখাটো আনন্দগুলো খুঁজে নিতাম আমরা। একটা মজার কথা বলি, শোনো। ক্যাম্পে ততদিনে দু-তিন মাস কেটে গেছে আমাদের। আস্তে আস্তে আমাদের মন্দভাগ্যকে মেনে নিতে শিখে গেছি। হঠাৎ একদিন কাজ করতে করতে দেখলাম একটি মেয়ে দূরে ক্রেমেটরিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একদল ইহুদিদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। মেয়েটিকে আগে কোনওদিন দেখিনি ক্যাম্পে, মাথাটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে চুলগুলো সবেমাত্র কামানো, তাই আন্দাজ করলাম নতুন এসেছে হয়তো। খুব বেশি হলে দু-তিনদিন হবে। বয়স আমাদেরই মতো, ছিপছিপে চেহারা, তবে শারীরিকভাবে খুবই রুগ্ন, দুর্বল। মেয়েটির যে জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করল, সেটা হল ওর চোখদুটো। মুখখানা বিষণ্ণ হলেও অত সুন্দর প্রাণবন্ত চোখ আমি আগে কখনও দেখিনি। একটা অদ্ভুত মমতা যেন ঝরে পড়ছিল ওর চোখদুটো থেকে। ওর থেকে দুয়েক বছরের বড়ো আরেকটি মেয়ে ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। মুখের আদলে মিল দেখে মনে হল ওর দিদি বা কোনও আত্মীয় হবে সম্ভবত। জানো, সেদিন রাতে বারবার ওই চোখদুটোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। কেন জানি মনে মনে চাইছিলাম পরেরদিনও যাতে মেয়েটিকে আবার দেখতে পাই। কী আশ্চর্য, সেই প্রথম দেখলাম ভগবান আমার ইচ্ছেটা রাখলেন। পরেরদিন আবার আমাদের একই জায়গায় কাজ পড়ল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটির দিকে। দেখলাম সেদিন সে অনেকটাই সামলে নিয়েছে। মাঝে মাঝে সাথের মেয়েটির সঙ্গে হেসে হেসে কথাও বলছে। কী মিষ্টি সেই হাসি! আমি খেয়াল করে দেখলাম, হাসলে মেয়েটির চোখে তার মনের সমস্ত অভিব্যক্তি স্পষ্ট ধরা পড়ে। ও হাসলে ওর চোখও হেসে ওঠে আর মনখারাপ হলে ওর চোখদুটোও বিষাদে ভরে যায়। বিশ্বাস করো, শুধু তোমাকেই বলছি এই কথাগুলো, আর কাউকে কখনও বলিনি, কারণ সবাই শুনলে হাসবে। জানো তো, সেদিন রাতে স্বপ্নেও দেখলাম মেয়েটিকে। আউশউইৎজ়ে আসার পর সেই প্রথম কোনও সকালে ফুরফুরে মন নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। অদ্ভুত একটা উদ্যমের সাথে গেলাম কাজে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেদিন আর ওর সাথে দেখা হল না। সারাটা দিন একটা মনখারাপ নিয়ে কাটালাম। ভাবলাম আমার সেই সর্বসময়ের সঙ্গী দুর্ভাগ্যটা হয়তো আবার ফিরে এল। কিন্তু না, পরেরদিন আবার ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। কাজের জায়গায় এসে দেখলাম, এক কোনায় সেই আত্মীয়াটির সাথে সেও দাঁড়িয়ে আছে।”
আমি স্পষ্ট দেখলাম এই বয়সেও ভদ্রলোকের ফর্সা গালদুটোয় একটা হালকা রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে। মুখে একটা হালকা হাসি ঝুলিয়ে আনমনে তিনি বলে চললেন–
“তারপর থেকে মাঝেমাঝেই এক-দু’দিন অন্তর অন্তর দেখা হত মেয়েটার সাথে। আমার তখন কিশোর বয়স। এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মন সর্বদাই আশাবাদী। তাই এই অসহ্য পরিবেশেও আস্তে আস্তে মন ভালো লাগতে শুরু করেছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হত আজ দেখা হবে তো মেয়েটার সাথে? অথচ জানো তো, মনে মনে এত চাইতাম মেয়েটার সাথে দেখা হোক, কিন্তু ওর সাথে চোখাচোখি হলেই আমার পেটের ভিতরটা কেমন জানি হালকা হয়ে যেত। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত, কানদুটো থেকে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে থাকত। মনে হত এই বুঝি দুম করে পড়ে যাব মাটিতে। মানে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা, কী আর বলব। মেয়েটাও মনে হয় বুঝতে পেরেছিল যে আমি সুযোগ পেলেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। তাই সেও দেখতাম মাঝেমাঝেই দূর থেকে আড়চোখে আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে ওর সাথের মেয়েটার সাথে হেসে গড়িয়ে পড়ত। মনে মনে খুব ইচ্ছে করত ওকে ডেকে ওর সাথে কথা বলি, নাম জিজ্ঞেস করি। কিন্তু হাঁটতে চলতে যদি বা কোনওভাবে মুখোমুখি হয়ে পড়তাম, আমার সব সাহস ফুস করে কোথায় যেন উবে যেত। অন্যদিকে তাকিয়ে ক্যাবলার মতো যেন চিনিই না এমন একটা ভাব করে পার হয়ে যেতাম।
“এভাবেই বেশ কাটছিল দিনকাল। যেদিনগুলোতে আমাদের একজায়গায় কাজ পড়ত না, মেজাজটা কেমন একটা খিঁচড়ে থাকত। পরপর দু-তিনদিন দেখা না হলেই মনটা কু গাইতে শুরু করত। আবার যেদিন দেখা হত, ম্যাজিকের মতো মুহূর্তে মনটা খুশ হয়ে যেত। কী করে যে এগারোটা ঘণ্টা কেটে যেত টেরই পেতাম না। এরকমই একদিন আমাদের একসাথে কাজ পড়েছিল ক্যাম্পের অফিসারস মেসের কিচেনে। তার আগেরদিন মেসে অফিসারদের মস্ত বড়ো একটা পার্টি হয়েছিল। পরেরদিন আমাদের সব টেবিল, চেয়ার গুছিয়ে রাখার, পার্টিতে ব্যবহৃত সব ওয়াইন গ্লাস, প্লেট এইসব সাফ করার কাজ দেওয়া হয়েছিল। তো যাই হোক, আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে একদল সেইসব প্লেট, গ্লাসগুলো সব ধুয়ে মেজে রাখছিলাম আর বাকিরা সেগুলোকে ওয়াশ বেসিন থেকে বয়ে নিয়ে এসে ক্যাবিনেটে গুছিয়ে রাখছিলাম। সেই মেয়েটি ছিল দ্বিতীয় দলে। বলাই বাহুল্য, আমিও তাই কায়দা করে সেই দলেই ভিড়ে গিয়েছিলাম যাতে যেতে আসতে বারবার ওকে মুখোমুখি দেখা যায়। যেকোনও কারণেই হোক সেদিন ওকে খুব অসুস্থ লাগছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে ওর শরীরটা খুব একটা ভালো নয়।
“দুপুরে লাঞ্চের পর একটা সময় হঠাৎ ঘটল ঘটনাটা। আমি ক্যাবিনেটে বেশ কয়েকটা কাচের প্লেট রেখে ফিরছিলাম। উলটোদিক থেকে দেখলাম চোখ মাটির দিকে নামিয়ে মুখ টিপে ঠোঁটে একটা মৃদু হাসি ঝুলিয়ে ও আসছে হাতে একটা ট্রেতে বেশ কয়েকটা ওয়াইন গ্লাস সাজিয়ে। কাছাকাছি আসতেই আমি যথারীতি ওর দিকটা ছেড়ে দুনিয়ার বাদ বাকি সবদিকে তাকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এমন সময় হঠাৎ কাচ ভাঙার একটা প্রচণ্ড আওয়াজে চমকে উঠলাম। সভয়ে তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার বুকটা ধক করে উঠল এক মুহূর্তের জন্যে। দেখলাম অসুস্থতার জন্যেই হয়তো ওর হাতের ট্রেটা থেকে ওয়াইন গ্লাসগুলো সব সশব্দে মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আমার চোখ চলে গেল দূরে তদারকি করার জন্যে দাঁড়ানো কাপোটার দিকে। সেও শুনতে পেয়েছে কাচ ভাঙার আওয়াজ, কিন্তু অনেকটা দূরে থাকার জন্যে দেখতে পায়নি ঘটনাটা। চিৎকার করে গালাগাল দিতে দিতে সে এগিয়ে আসছে এদিকে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। খালি ট্রেটা হাতে নিয়ে থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ করে আমার মাথায় কী হয়ে গেল জানি না, চট করে ওর হাত থেকে ট্রেটা ছিনিয়ে নিয়ে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিলাম ওকে। পরক্ষণেই কোমরে একটা প্রচণ্ড লাথি খেয়ে ছিটকে পড়লাম মাটিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাপোটা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার সারা গায়ে, মাথায়, পিঠে, ঘাড়ে নির্মমভাবে মারতে শুরু করল ব্যাটনটা দিয়ে। সাথে সাথে অকথ্য ভাষায় আমার, আমার পরিবারের, আমার জাতির শ্রাদ্ধ করতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমে গেল চারপাশে। এলোপাথাড়ি মারের চোটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল আমার সারা শরীরে। কিন্তু সেই অবস্থাতেই হঠাৎ চোখ পড়ল সেই মেয়েটার দিকে। দেখলাম ওর সাথের সেই মেয়েটা ওকে ভিড় ঠেলে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে। আমি দেখলাম চলে যেতে যেতেও ও মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকেই স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল ওর সেই মায়াবী চোখদুটোয় তখন টলটল করছে জল। আমার সমস্ত শারীরিক যন্ত্রণাগুলো যেন ওর বিষাদময় সুন্দর মুখটায় ফুটে উঠেছে স্পষ্টভাবে। বিশ্বাস করো, সেই মুখটা দেখার সাথে সাথে আমার শরীরের সমস্ত কষ্ট, ব্যথা, বেদনা যেন নিমেষের মধ্যে দূর হয়ে গেল। সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে আমি সেই মুখটার দিকে চেয়ে রইলাম অপলক দৃষ্টিতে। চোখটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার আগে শুধু এটুকু খেয়াল করলাম, কোত্থেকে জানি অ্যালেক ছুটে এসে আমাকে আড়াল করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার আর ওই কাপোটার মাঝখানে।
“সেদিন রাতে আমি যখন সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা নিয়ে কোনওমতে শুয়ে আছি, তখন অ্যালেক এল আমার বাঙ্কে। আমার তখন ভয়ংকর অবস্থা। ঠোঁটের কোনাটা কেটে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে, চোখে কালশিটে পড়ে গেছে, মাথাটা এত ভারী হয়ে রয়েছে যে নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে অ্যালেক প্রশ্ন করল, ‘মেয়েটা কে?’
“আমি অবাক হবার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মেয়ে? কোন মেয়ের কথা বলছিস তুই?’
“এক দাবড়ানি দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিল অ্যালেক। বলল, ‘মিথ্যে কথা বলিস না। আমি স্পষ্ট দেখেছি গ্লাসগুলো ওই মেয়েটাই ভেঙেছে। তুই ওর হাত থেকে ট্রেটা কেড়ে নিলি।’
“আমি বুঝলাম যে ধরা পড়ে গেছি। ফালতু কথা ঘুরিয়ে কোনও লাভ নেই। তাই চুপ করে রইলাম। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে ও আবার বলল, ‘কেন করতে গেলি ওরকম? তুই জানিস, আমি না এলে কাপোটা আজকে তোকে হয়তো মেরেই ফেলত!’
“কী উত্তর দেব বলো তো এই প্রশ্নের? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই বেরোল না মুখ থেকে। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল অ্যালেক। তারপর পরম মমতায় আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘মেয়েটাকে তোর ভালো লাগে, তাই না? কথা বলতে চাস ওর সাথে? ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করে দেব।’
“এবার আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীভাবে?’
“একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সাথে ও তখন আমাকে আশ্বস্ত করল, ‘ওটা তুই আমার ওপর ছেড়ে দে। আমি দেখছি কী করা যায়।’
“জানো, সেই মুহূর্তে ওকে আমার ভাই বলে মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আমার বাবা-মা দু’জনে যেন একসাথে ওর মধ্যে এসে ভর করেছে। এত মার খেয়েও, শরীরে এত ব্যথা সত্ত্বেও আমার চোখ থেকে তখনও পর্যন্ত একটা ফোঁটাও জল বেরোয়নি। কিন্তু ওর কথা শুনে আর পারলাম না আমি। ওকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললাম।
“পরেরদিন অ্যালেক খবর আনল যে ওই মেয়েটা আমাদের ব্যারাকের দু-তিনটে ব্যারাক পরে উইমেন্স ব্লকে থাকে। ওরা নেদারল্যান্ডস থেকে সবে এসেছে আউশউইৎজ়ে। দু’মাসও হয়নি তখনও। ওর সাথে যে মেয়েটাকে সবসময় দেখা যায় সে হল ওর দিদি। ওর দিদির সাথে কথা বলেছে অ্যালেক। মেয়েটা আর ওর দিদি দু’জনেই আগেরদিন আমার সাথে যে ঘটনাটা হয়েছে তার জন্যে খুব দুঃখিত। মেয়েটা নাকি সারারাত খালি কেঁদেই কাটিয়েছে। অ্যালেকের কথা শুনে মেয়েটার দিদি মেয়েটার সাথে কথা বলে জানিয়েছে যে সে আমার সাথে দেখা করতে রাজী হয়েছে। রবিবার ক্যাম্পে আমাদের ছুটি থাকে। সেইদিন বিকেলে মেয়েটি আমার সাথে দেখা করবে।
“পরের কয়েকটা দিন আমি জাস্ট উড়ে বেড়ালাম আউশউইৎজ়ের আকাশে। কাজের জায়গায় আর মেয়েটার সাথে দেখা হয়নি বটে, কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র খেদ জন্মায়নি মনে। কারণ, জানতাম যে রবিবার এলেই ওর দেখা পাব, কথা বলব। একে অপরকে জানব। হাতে হাত ধরে হাঁটব। আমি কল্পনার ময়ূরপঙ্খীতে ওকে চাপিয়ে ওর সাথে ভেসে বেড়ালাম সেই ক’টা দিন।
“যথাসময়ে রবিবার এল। রবিবার আমাদের ছুটি থাকলেও আমাদের নিজেদের অনেক কাজ থাকত। নিজেদের ব্যারাক সাফ করা, নিজেদের ইউনিফর্ম কেচে শুকোতে দেওয়া। সারা সপ্তাহ জুড়ে আমরা স্নান করার সুযোগ পেতাম না। তাই রবিবার আমরা স্নান করে নিজেরা সাফসুতরো হতাম। এইসব শেষ করে নিজে যথাসম্ভব ধোপদুরস্ত হয়ে দুরু দুরু বুকে গেলাম দেখা করার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গায়। আমাদের কাছে ঘড়ি থাকত না। ক্যাম্পের সাইরেন আর সূর্যের অবস্থান দেখে আমরা সময় আন্দাজ করে নিতাম। আজ যদ্দুর মনে পড়ে বিকেলের অনেক আগেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেখানে। অধীর আগ্রহে শুরু হল অপেক্ষা। কিন্তু আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। সন্ধ্যাও আস্তে আস্তে রাত হল। একসময় রাতের রেশন সংগ্রহ করার ঘণ্টাও বেজে উঠল। সে আর এল না।
“ভাঙা মন নিয়ে ফিরে এলাম ব্যারাকে। পাদুটোর ওজন মনে হচ্ছিল যেন কয়েকশো কেজি বেড়ে গেছিল। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না, কী এমন হল যে জন্যে কথা দিয়েও সে এল না। অ্যালেকও অবাক হল সব শুনে। বুকে একরাশ দুঃখ নিয়ে কাটল সেই রাতটা। মনকে প্রবোধ দিলাম, নিশ্চয়ই কোনও কারণে শরীর খারাপ হয়ে গেছে বলে সে আসতে পারেনি। পরেরদিন কাজের জায়গায় দেখা হলে নিশ্চয়ই নিজে থেকে এসে দুঃখপ্রকাশ করবে।
“সকাল হতেই কোনওমতে ছুটলাম কাজের জায়গায়। কিন্তু হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সেখানেও দেখা পেলাম না ওর। একদিন, দু’দিন করে আরও তিন-চারদিন কেটে গেল। ওর সাথে আর দেখা হল না। এমনকি ওর দিদিকেও আর দেখতে পেতাম না। আস্তে আস্তে হাল ছেড়ে দিলাম। সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাটার জন্যে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম।
“কয়েকদিনের মধ্যে অ্যালেক আবার একে তাকে জিজ্ঞেস করে খোঁজ নিয়ে এল। নাহ্‌, দুঃসংবাদ হলেও যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা খারাপ অন্তত নয়। যেদিন আমাদের দেখা করার কথা ছিল তার জাস্ট আগের দিন মানে শনিবারই সেই মেয়েটা আর তার দিদিকে তাদের ব্যারাকের আরও অনেক মহিলা বন্দিদের সাথে অন্য ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জীবনে আর কোনওদিন হয়তো দেখা হবে না এটা জেনেও মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম এই বলে যে মেয়েটা অন্ততপক্ষে বেঁচে আছে। গ্যাস চেম্বারে অ্যাট লিস্ট পাঠানো হয়নি।”
“যাহ্‌, সে কি! আর দেখাই হল না মেয়েটার সাথে?” এতক্ষণ বেশ মজা লাগছিল ভদ্রলোকের কথা শুনে। কিন্তু শেষটায় আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। বললাম, “পরে আর খোঁজ করেননি ওর? ওহ্‌-হো! খোঁজ করবেনই বা কী করে? ওর নামটাই তো জানা হয়নি, তাই না?”
“নাম জানতাম না কে বলল তোমায়?” একটা দুষ্টু হাসি হেসে বললেন ভদ্রলোক, “মেয়েটার নাম তো অ্যালেক প্রথমদিনই জেনে এসেছিল। ইচ্ছে করেই এতক্ষণ বলিনি তোমায়। ভেবেছিলাম একদম লাস্টে বলব। ওর নাম ছিল অ্যানিলিস মেরি ফ্রাঙ্ক, ওরফে অ্যান ফ্রাঙ্ক।”
চমকে উঠলাম আমি। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। বললাম, “অ্যান ফ্রাঙ্ক! ওহ্‌, মাই গড! অ্যান ফ্রাঙ্ক, মানে সেই ‘ডায়েরি অফ আ ইয়ং গার্ল’-এর রচয়িতা অ্যান ফ্রাঙ্ক! নাৎজ়িদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে নিজের বাড়ির গুপ্তকক্ষে আত্মগোপন করে থাকার সময় লেখা যার ডায়েরি সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল, সেই অ্যান ফ্রাঙ্কের সাথে আপনার দেখা হয়েছিল আউশউইৎজ়ে?”
ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বিমর্ষ গলায় বললেন, “হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। সেই অ্যান ফ্রাঙ্কের সাথেই আমার দেখা হয়েছিল। তখন কি আর জানতাম ও পরে এত বিখ্যাত হয়ে যাবে? তবে জানো, ওকে যতটুকু দেখিছিলাম মনে হয়েছিল ও খুব সরল সাদাসিধে একটা মেয়ে। একদম যেন পাশের বাড়ির মেয়েটার মতো। পরে জানতে পেরেছিলাম ওকে আর ওর দিদি মার্গটকে আউশউইৎজ় থেকে বার্গেন-বেলসেন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে কয়েক মাস চরম কষ্ট ভোগ করে উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালের শুরুতে টাইফাস রোগে ভুগে ও মারা যায়।”
ভদ্রলোকের কমবয়সের এই দুষ্টুমিষ্টি ইনফ্যাচুয়েশনের এরকম বিয়োগান্তক পরিণতি হওয়ায় ভগবানের ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। খালি মনে হচ্ছিল ওপরে বসে তিনি যদি একটু মায়াদয়া দেখাতেন এই বৃদ্ধের প্রতি, তাহলে আজ হয়তো বিশ্বখ্যাত অ্যান ফ্রাঙ্কের সাথে আমার দেখা হয়ে যেতে পারত।
এইসব উদ্ভট ভাবনায় একটু অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল ভদ্রলোক বলছেন, “জানো ইয়ং ম্যান, আমাদের মাত্র এই অল্প কয়েকদিনের জন্যে দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি ওর জায়গায় আর কাউকে বসাতে পারিনি। এখনও যেকোনও সময় ওই নিষ্পাপ, সরল মুখটার কথা মনে পড়লে বুক উজাড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। খালি অপেক্ষা করে আছি, বয়স তো আর কম হল না। আর তো মাত্র কয়েকদিন। তারপরেই তো ডাক চলে আসবে ওপর থেকে। এই পৃথিবীতে হল না তো কী হল, সেখানে তো কেউ আর আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”


পাঁচ


আবার অল্প কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন বৃদ্ধ। তারপর আবার শুরু করলেন তার বিরল আখ্যানের বর্ণনা–
“এভাবে আস্তে আস্তে গ্রীষ্ম পেরিয়ে শীত এল। আউশউইৎজ় ঢাকা পড়ল তুষারের আবরণে। কিন্তু ইহুদিদের জ্বালা-যন্ত্রণার কোনও উপশম হল না। মানসিকভাবে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত থাকতাম প্রতিদিন। তাও মনে মনে আশা রাখতাম একদিন না একদিন এখান থেকে বেরোতে পারব। খুঁজে বের করব মাকে, জুডিথকে। ফিরে যাব আমাদের গ্রামে। জানতাম, হয়তো এসব কোনওদিনই সম্ভব হবে না। তাও শুধুমাত্র এই বিশ্বাসের জোরেই আমি আর অ্যালেক একে অপরকে আগলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতাম।
“আস্তে আস্তে ক্রিসমাসের দিন এল। এমনিতে নরকের পরিবেশ হলেও, শুনেছিলাম আউশউইৎজ়ে খুব ধুমধাম করে ক্রিসমাস পালন করত নাৎজ়িরা। হয়তো উৎসবের আবহতে সেদিন সমস্ত বন্দিদের ওপর অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু সদয় ব্যবহার করা হত। রাতভর অফিসারদের পার্টি চলত। বন্দিরাও নিজেদের মতো আলাদা করে উৎসবে সামিল হত। অনেকেই নিজেদের সামর্থ্যমতো ছোটোখাটো উপহার তৈরি করে কাছের বন্ধুদের উপহার দিত। সেবারও এর অন্যথা হয়নি। আমাদের ব্যারাকের পরিচালন সমিতির তরফে আমাদের সহ সমস্ত বন্দি বাচ্চাদের সেদিন ছোট্ট উপহার দেওয়া হয়েছিল। দৈনিক খাদ্যের সাথে দেওয়া হয়েছিল কেক আর চকোলেট। বাবা চলে যাবার পর থেকে সেই প্রথম চকোলেট খেয়েছিলাম সেদিন।
“বক্সিং ডের পরেরদিন মানে সাতাশ তারিখ সকালে সিলেকশনের পর আমার আর অ্যালেককে নিয়ে যাওয়া হল ডঃ মেঙ্গলার কাছে। মিষ্টি হেসে আমাদের কুশল সংবাদ জেনে ডক্টর জানালেন যে আমাদের ওপর সেদিন তিনি একটা পরীক্ষা চালাতে চান।
“পাশাপাশি দুটো বেডে শোয়ানো হল আমাকে আর অ্যালেককে। প্রথমে ডঃ মেঙ্গলার তত্ত্বাবধানে দু’জন নার্স আমার শিরদাঁড়ার ওপরের দিকে একটা ইঞ্জেকশন পুশ করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শুরু হল অমানুষিক যন্ত্রণা। আমি চোখে রীতিমতো অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করতে করতে জ্ঞান হারালাম আমি।
“আমার জ্ঞান যখন ফিরল তখন দেখলাম আমি বেডে একলা শুয়ে আছি। সারা শরীরে তখনও অসহ্য ব্যথা। কোমরের নিচ থেকে গোটা শরীরটা যেন অসাড় হয়ে রয়েছে। হাতে স্যালাইনের সূচ বেঁধানো। কোনওমতে চোখ খুলতে পারলেও একটা ঘোরমতো লেগে রয়েছিল। আরও বেশ কয়েক ঘন্টা লেগে গেল সেই ঘোর কাটতে। পুরোপুরি চেতনা ফিরলে খেয়াল করলাম হাসপাতালের একটা বেডে শুয়ে আছি আমি। পুরো ঘরটায় আমি একা। অন্যান্য সময় বাকি বেডগুলোয় আরও অনেক লোকজন থাকে। কিন্তু সেদিন সব বেডগুলো খালি ছিল। শুধু তাই নয়, অন্যান্য জুনিয়র ডাক্তার বা নার্স কারোরই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। খালি দূরে দরজার পাশে একজন এস.এস. গার্ড বসা। বেশ অবাকই লাগছিল আমার।
“আমাকে নড়তে দেখে গার্ডটা একজন নার্সকে ডেকে নিয়ে এল। ডঃ মেঙ্গলার অধীনে এখানে যেসব ডাক্তার বা নার্সরা কাজ করতেন, তাঁদের সবাইকেই মোটামুটি চিনতাম। কিন্তু মিষ্টি স্বভাবের এই নার্সটিকে আগে কখনও দেখিনি। তাঁর কাছে জানতে পারলাম, যে পরীক্ষাধীন ওষুধটা আমার শরীরে ইঞ্জেক্ট করা হয়েছিল, সেটার প্রভাবে আমি প্রায় মারা যেতে বসেছিলাম। আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। আমি কোমায় চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু দৈববলে আমি বেঁচে গেছি। শুনে আমার অ্যালেকের জন্যে চিন্তা হল। নার্সটিকে জিজ্ঞেস করলাম অ্যালেকের কথা। তাতে উনি বললেন যে তিনি নাকি সবে দশদিন হল কাজে যোগ দিয়েছেন। তাই অ্যালেককে তিনি চেনেন না। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম তাহলে কি আমি অনেকদিন অজ্ঞান হয়ে ছিলাম! জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে সাতাশ তারিখ থেকে টানা ষোলো দিন অজ্ঞান অবস্থায় থেকে শেষপর্যন্ত আমার জ্ঞান ফিরেছিল জানুয়ারির বারো তারিখ। বুঝলে ইয়ং ম্যান, আজ বিকেলে আমার যে অবস্থাটা দেখলে, মাঝে মাঝে হঠাৎ করে মাথাটা যে ঘুরে যায়, সেটা এই ওষুধেরই দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব।
“যাই হোক, আমার প্রাথমিক চেক-আপ করে নার্স চলে গেলেন। আমি রয়ে গেলাম একা ওই ঘরে। ঘুমিয়ে, জেগে আরও এক-দু’দিন কাটল। প্রথমদিকে শরীরে শক্তি না পেলেও আস্তে আস্তে বেড ছেড়ে উঠতে পারছিলাম। এদিক ওদিক হাঁটাচলাও করছিলাম। যদিও দুর্বলতা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। রোজই ডাক্তার বা নার্সরা এসে আমার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখে যেতেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ডঃ মেঙ্গলাকে একদিনও আসতে দেখিনি। এই কয়দিনে নতুন কারোর ওপর কোনও পরীক্ষা হতেও দেখিনি।
“একদিন বিকেলে চুপচাপ শুয়ে আছি। হঠাৎ আমার বেডের মাথার দিকে যে জানালাটা ছিল, সেটা থেকে আমার নাম ধরে একটা পরিচিত গলার ডাক শুনতে পেলাম। চমকে তাকিয়ে দেখি অ্যালেক জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে ডাকছে। এমনিতেও পাহারা দেবার মতো কিছুই ছিল না বলে এস.এস. গার্ডটা দিনের বেশিরভাগ সময়টাই বাইরে বাইরে ঘুরেফিরেই কাটাত। তাকিয়ে দেখলাম ভাগ্যবশত তখনও সে ঘরে ছিল না। তাই মনে মনে একটু ভয় করলেও উঠে গেলাম অ্যালেকের কাছে। ওর কাছে শুনলাম যে সেইদিন ওই ওষুধের প্রভাবে আমার শরীর এতটা খারাপ হয়ে গেলেও ঈশ্বরের কৃপায় ওর ওপর তেমন কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি। তাই পরেরদিনই ও মুক্তি পেয়ে যায়। কিন্তু আমার শরীরের অবস্থা নিয়ে ও এই কয়েকদিন খুব দুশ্চিন্তায় ভুগেছে। কারও কাছে কোনও খবর না পেয়ে শেষপর্যন্ত নিজেই চলে এসেছে খোঁজ নিতে। আমাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আমিও খুব খুশি হলাম ওকে দেখে। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে পরেরদিন বিকেলে আবার আসবে জানিয়ে ও বিদায় নিল।
“পরেরদিন একইসময় আবার অ্যালেক এল। ওর মুখ থেকে জানতে পারলাম অনেক নতুন নতুন খবর। পৃথিবীর বাকি সব দেশ নাকি হিটলারকে শায়েস্তা করার জন্যে চেপে ধরেছে। যুদ্ধে আস্তে আস্তে নাৎজ়িরা পিছু হটছে। পুবদিক থেকে রাশিয়ান রেড আর্মি এগিয়ে আসছে জার্মানি দখল করে নেবার জন্যে। খুব শিগগিরই হয়তো হিটলারের পতন হবে। ভালো দিন আসতে চলেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এত খবর ও পেল কী করে? জিজ্ঞেস করায় অ্যালেক বলল যে একজন এস.এস. গার্ডের কাছ থেকে ও এসব জানতে পেরেছে। আসলে ক্যাম্পের সব নাৎজ়িরা তো আর খারাপ ছিল না। অনেকের মধ্যেই মনুষ্যত্ব তখনও বিদ্যমান ছিল আর তারা আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীলও ছিল। বুঝলাম এরকম কারোর কাছ থেকেই হয়তো ও এত খবর সংগ্রহ করেছে। মনে একটা আশার আলো যেন আবার নিভু নিভু করেও জ্বলে উঠল।
“পরেরদিন অ্যালেক আবার একটা নতুন খবর আনল। ওর কাছে জানলাম ডঃ মেঙ্গলা নাকি ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন। কবে ফিরবেন বা আদৌ ফিরবেন কি না তার কোনও ঠিক নেই। অ্যালেক বলল, হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধে হিটলারের হার অবশ্যম্ভাবী অনুমান করে উনি গা ঢাকা দিয়েছেন। ওর কথা শুনে আমারও সেটাই মনে হল।
“সেদিন আরেকটু হলেই আমরা ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম। বিকেলে এই সময়টা কোনওদিনই এস.এস. গার্ডটা ঘরে থাকত না। তাই রোজ আমরা নির্বিঘ্নে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারতাম। সেদিন কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বাজখাঁই গলায় একটা চিৎকার শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল। চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম এস.এস. গার্ডটা কখন ঘরে এসে ঢুকেছে খেয়ালই করিনি। নিমেষের মধ্যে লোকটা আমার ঠিক পাশে এসে আমাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে খোলা জানালাটা দিয়ে বাইরে উঁকি মারল। এই লোকটা ছিল একটা মূর্তিমান শয়তান। সবসময় আমাদের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করত আর কথায় কথায় গায়ে হাত তুলত। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এবার আর আমাদের রক্ষা নেই। কিন্তু বেশ কয়েকবার বাইরে এপাশে ওপাশে দেখে লোকটা আমার দিকে ফিরে কর্কশ গলায় জানতে চাইল আমি জানালায় দাঁড়িয়ে কী করছিলাম। আমি আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলাম যে কিছুই নয়, আমি এমনিই বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম। তাতে লোকটা আমার অসুস্থতার তোয়াক্কা না করে আমার দু’কাঁধে চেপে ধরে আমাকে প্রচণ্ড জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘মিথ্যে বলিস না, আমি স্পষ্ট দেখেছি তুই কারোর সাথে কথা বলছিলি।’
“দুর্বল শরীরে এরকম একটা ঝাঁকুনি খেয়ে আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় হঠাৎ একজন ডক্টর ঢুকলেন ঘরে। তিনি আমার ওপর গার্ডটার এই রুদ্রমূর্তি দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। গার্ডটার মুখে সবকথা শুনে উনিও জানালার বাইরে এক-দু’বার উঁকি মেরে এসে আমার সাথে এরকম দুর্ব্যবহার করার জন্যে গার্ডটাকে খুব বকাবকি শুরু করলেন। গার্ডটার কোনও কথাই উনি শুনলেন না। বকতে বকতে উনি গার্ডটাকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলেন। যাবার সময় গার্ডটা সন্দেহ আর রাগ মেশানো একটা দৃষ্টি দিয়ে আমাকে প্রায় ভস্ম করে দিচ্ছিল।
“ওরা চলে যেতে আমি ভয়ে ভয়ে জানালাটার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। আমাদের এই হাসপাতালটা ছিল ক্যাম্পের একদম পূর্বপ্রান্তে। জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি বেশ অনেকটা দূরে ইতস্ততভাবে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা ব্যারাক, তারপর বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সাদা তুষারের আচ্ছাদন আর বহুদূরে ক্যাম্পের সীমানার কাঁটাতারের বেড়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। খুব অবাক হলাম এই খোলা জায়গায় এত তাড়াতাড়ি অ্যালেক কোথায় লুকিয়ে পড়ল এই ভেবে। তবে সাথে-সাথেই মনে হল ওর যা বুদ্ধি, নিশ্চয়ই চট করে মাথা খাটিয়ে কোথাও একটা গা ঢাকা দিয়েছে। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিলাম। ভাগ্যিস গার্ডটা অ্যালেককে দেখতে পায়নি। ও ধরা পড়ে গেলে আমাদের আর দেখতে হত না।
“পরের দিনটা ছিল আমাদের জন্মদিন। আঠারোই জানুয়ারি। সেদিন আমরা পনেরোয় পা দিয়েছিলাম। সকাল থেকেই আমার মনটা খুব খারাপ ছিল। এই প্রথম আমার জন্মদিনে মা, বাবা, অ্যালেক, জুডিথ, রোজ় কেউ ছিল না আমার সাথে। আগে আমাদের জন্মদিনে মা কেক বানাত, আমি আর অ্যালেক মজা করে একসাথে কেক কাটতাম–সেইসব পুরনো স্মৃতিগুলো এসে মনে ভিড় জমাচ্ছিল। বিকেলবেলা আবার যথাসময়ে অ্যালেক এল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ও সাথে করে কোথা থেকে কে জানে ছোটো দুটো কেকের স্লাইস নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞেস করায় বলল, যে এস.এস. গার্ডটার কাছ থেকে ও সব খবরাখবর সংগ্রহ করে, তাকে অনেক অনুরোধ করে ও এই কেকের স্লাইসদুটো যোগাড় করেছে। সেই কেকটা খেয়েই আমি আর অ্যালেক আমাদের জীবনের সবচেয়ে দুঃখের জন্মদিনটা উদযাপন করলাম।
“সেদিন চলে যাবার আগে অ্যালেক হঠাৎ এমন একটা কথা বলল যেটা শোনার জন্যে আমি মানসিকভাবে একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। ও বলল, আর কয়েকদিনের মধ্যেই রাশিয়ান সৈন্যরা এসে এই ক্যাম্প দখল করে নেবে। তাই নাৎজ়িরা এই দীর্ঘমেয়াদী গণহত্যার সমস্ত প্রমাণ লোপাটের জন্যে ক্যাম্প খালি করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যেই মার্চিং অর্ডার আসবে। তখন সব অফিসাররা বন্দিদের নিয়ে রওনা হবে পশ্চিমে অন্য কোনও ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। অসুস্থ, বিকলাঙ্গ বা দুর্বল বন্দিদের যাদের স্থানান্তরিত করা সম্ভব নয় তাদের হয় মেরে ফেলা হবে অথবা এখানে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হবে যাতে তারা না খেতে পেয়ে মারা যায়। ওর কথা শুনে আমার মনে এই দুয়েকদিনে যেটুকু আশা জন্মেছিল সব যেন এক ফুঁয়ে নিভে গেল। কিন্তু আমার হতাশাগ্রস্ত মুখটা দেখে অ্যালেক বলল, ‘চিন্তা করিস না। তার আগেই আমাদের এই ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে হবে।’
“আমি ওর কথা শুনে নিজের কানকে পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা কী বলছে ও! ওর মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেল নাকি? আউশউইৎজ় থেকে পালানো! কী করে সম্ভব? আমার অবস্থা দেখে আমাকে আশ্বস্ত করে অ্যালেক বলল যে ও নাকি বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সব প্ল্যান করে রেখেছে। আমাকে আগে বলেনি অসুস্থ অবস্থায় আমার মনের ওপর চাপ পড়বে বলে। ওর সবকিছু ঠিক করা আছে। এমনিতেই নাৎজ়িরা এখন অনিবার্য পরাজয়ের আশঙ্কায় হতোদ্যম, নিজেদের সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। ক্যাম্পের পাহারার প্রতি অতটা মনোযোগী নয়। এই সুযোগটা যেভাবেই হোক না কেন কাজে লাগাতে হবে। আমাকে খালি ওর কথামতো চলতে হবে। তাহলেই আমরা এই বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেতে পারব। আমার তাও ভয় কাটছিল না। বললাম যে ধরা পড়ে গেলে গেস্টাপোরা কুকুরের মতো গুলি করে মেরে ফেলবে। উত্তরে অ্যালেক বোঝাল যে আমাদের সামনে আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। আমার শরীরের যা অবস্থা, অতটা পথ হাঁটা সম্ভব নয়। কাজেই হয় যেতে হবে গ্যাস চেম্বারে অথবা মৃত্যু হবে না খেতে পেয়ে। আমিও ভেবে দেখলাম অ্যালেকের কথা খুব একটা ভুল নয়। তাই শেষপর্যন্ত দুরু দুরু বুকেই রাজী হলাম ওর প্রস্তাবে। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে অ্যালেক আমাকে ওর পুরো প্ল্যানটা খুলে বলল।”


ছয়


“সেদিন যাবার আগে অ্যালেক বলে গিয়েছিল যে পরেরদিন ও আর বিকেলে আসবে না। আমি যাতে দিনেরবেলা ভালো করে ঘুমিয়ে নিই। রাতে না ঘুমিয়ে যেন চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি। সময় হলে ও জানালায় এসে আমাকে ডাকবে।
“কথামতো পরেরদিন আমি দিনেরবেলা ঘুমানোর অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুশ্চিন্তায় ঘুম এল না। রাতেরবেলা তো আরও খারাপ অবস্থা। খালি এপাশ ওপাশ করতে লাগলাম ভয়ে। অ্যালেক বলেছিল, ও সন্ধেবেলা রোল-কলের পর রাতে ব্যারাকের দরজা বন্ধ হবার আগে কায়দা করে বাইরে বেরিয়ে কোথাও একটা লুকিয়ে থাকবে। তারপর রাত গভীর হলে সময় সুযোগ বুঝে আমাকে এসে জানালায় নক করে ডাকবে। ও আমাকে নিশ্চিন্ত থাকতে বললেও আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল, ও পারবে তো ব্যারাকের বাইরে লুকিয়ে থাকতে? সবকিছু প্ল্যানমতো হবে তো? ধরা পড়ে যাব না তো?
“রাত তখন ক’টা হবে জানি না। জানালায় টোকা পড়ল। মাথাটা উঁচিয়ে দেখলাম, দরজার পাশে এস.এস. গার্ডটা টেবিলে মাথা রেখে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকাচ্ছে। আমি খুব সন্তর্পণে গার্ডটার পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ভাগ্য ভালো, এই হাসপাতালটার দরজাটা ব্যারাকের দরজার মতো বাইরে থেকে বন্ধ থাকত না। অ্যালেক এটা জানত। নাহলে আমাদের পালানোর প্রোগ্রাম শুরুতেই শেষ হয়ে যেত। বাইরে বেরোনো মাত্র কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় সারা শরীরটা ঠকঠক করে কেঁপে উঠল কয়েকবার। আগে থেকে ঠিক করে রাখা কথামতো আমি সবার চোখ এড়িয়ে চুপি চুপি হাসপাতালটা বেড় দিয়ে ঘুরে চলে এলাম আমার বেডের মাথার কাছের জানালাটার নিচে। দেখলাম অ্যালেক কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। খেয়াল করে দেখলাম অ্যালেক বেশ ভালো দিনই বেছে রেখেছে পালানোর জন্যে। কারণ, সেদিনটা ছিল অমাবস্যা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চেষ্টা করেও দু’হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না। আমরা দু’জন ব্যারাকের আড়ালে আড়ালে খুব সাবধানে এগোলাম সামনের দিকে।
“আগেই বলেছিলাম, আমাদের ব্যারাকটা ছিল পূর্বদিকে ক্যাম্পের প্রায় একদম শেষ মাথায়। কিছুদূর যেতেই ক্যাম্পের শেষ ব্যারাকটা আমরা পার করে চলে এলাম। এবার সামনে খালি সাদা বরফের চাদরে ঢাকা প্রায় পাঁচশো মিটার-মতো খালি জায়গা। তারপরেই ক্যাম্পের সীমানা পেরিয়ে জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এইটুকু রাস্তা পার করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ এই খালি জায়গাটার ওপর কড়া নজর রাখা হত। শেষ ব্যারাকটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম কিছুদূরে অবস্থিত একটা ওয়াচ টাওয়ার থেকে ফেলা একটা সার্চলাইটের আলো বৃত্তাকারে অনবরত ঘুরে চলেছে এই খোলা অঞ্চলটায়। অ্যালেক ফিসফিস করে আমায় বলল, ‘শোন, আমাদের ভালো করে এই সার্চলাইটটা খেয়াল করতে হবে। যখন এটা আমাদের থেকে দূরে চলে যাবে তখন আমরা একটু একটু করে সামনে এগোব। কিন্তু যেই আলোটা আমাদের কাছাকাছি চলে আসবে, আমাদের এই যে মাঝে মাঝে ঝোপঝাড় বা বরফের স্তূপগুলো দেখছিস, তার আড়ালে লুকিয়ে পড়তে হবে। ভুল করেও যেন এই আলো আমাদের গায়ের ওপর না পড়ে। তাহলেই কিন্তু সব শেষ। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে মেশিনগানের গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দেবে আমাদের। খুব সাবধান।’
“অ্যালেক এত সহজভাবে কথাগুলো বললেও শুনে আমার বুক শুকিয়ে গেল। একবার মনে হল অ্যালেককে বলি পালাবার চেষ্টা করে কাজ নেই। এর চেয়ে চল ফিরে যাই যে যার মতো। যা হবার হবে। কিন্তু তখন এতটা এগিয়ে এসে আর পিছনে ফেরবার কোনও মানে ছিল না। তাই সার্চলাইটটা আমাদের সামনে দিয়ে একবার বেরিয়ে যাবার সাথে সাথে আমরা উবু হয়ে কাঁধ ঝুকিয়ে সামনের দিকে এগোলাম। তাড়াহুড়ো না করে খুব সতর্কভাবে সার্চলাইটটা এড়িয়ে এড়িয়ে সামনে চলছিলাম আমরা। প্রবল স্নায়ুচাপে এই হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডাতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়াচ্ছিল কপাল দিয়ে। যখন আর মাত্র একশো মিটার মতো বাকি তখনই ঘটল বিপত্তিটা।
“আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকা সার্চলাইটের আলোটার দিকে লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে নরম বরফের আস্তরণে পা দিয়ে টাল সামলাতে না পেরে আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখলাম আমার পাটা মচকে গেছে। পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। সামনের বরফের স্তূপটা যেটা লক্ষ্য করে আমরা এগোচ্ছিলাম, সেটা তখনও আরও সাত-আট মিটার দূরে। এদিকে আলোটা সর্পিল গতিতে মসৃণভাবে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। মরিয়া হয়ে পায়ের ব্যথা সহ্য করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলাম। অ্যালেক ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিল স্তূপটার আড়ালে। আমার বিপদ বুঝে ও তাড়াতাড়ি সাহায্য করতে বেরিয়ে এল। আমার হাতটা ওর কাঁধে নিয়ে চলতে লাগল। আলোটা ততক্ষণে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে আমাদের। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এসে পড়বে আমাদের ওপর। শেষপর্যন্ত আর না পেরে অ্যালেক অমানুষিক শক্তিতে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে আমাকে প্রায় ছুড়ে দিল স্তূপটার আড়ালে। স্তূপের নিরাপদ আড়ালে পৌঁছে আমি সভয়ে তাকিয়ে দেখলাম অ্যালেক তখনও এসে পৌঁছায়নি। মুহূর্তের মধ্যে অ্যালেকও ঝাঁপ দিল সামনের দিকে। কিন্তু আড়ালে পৌঁছানোর ন্যানো-সেকেন্ড আগে আলোটা এসে পড়ল ওর গায়ে।
“আতঙ্কে আমি চোখ বুজে ফেলেছিলাম। এই বুঝি গর্জে উঠল মেশিনগান। এই বুঝি ধেয়ে এল ভয়ংকর পাহারাদার কুকুর হাতে নিয়ে এস.এস. গার্ডরা। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল কিছুই হল না দেখে ভয়ে ভয়ে আমি চোখ খুললাম। দেখলাম স্তূপের আড়ালে পৌঁছে গেছে অ্যালেক। সার্চলাইটের আলোটা আমাদের অতিক্রম করে মন্থরবেগে এগিয়ে চলেছে তার নিজস্ব পথে। উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ডটা প্রায় গলার কাছে চলে এসেছিল আমার। অ্যালেকেরও দেখলাম ভয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আমার দিকে তাকিয়ে কোনওমতে একটা কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, ‘মনে হয় গার্ডগুলো ঘুমের ঘোরে খেয়াল করেনি। জোর বেঁচে গেছি। বল?’
“আমি আর কিছু বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলাম না। কোনওরকমে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেদের ধাতস্থ করে পায়ের ব্যথাটা কমলে আবার আমরা রওনা দিলাম। সার্চলাইটটা এড়িয়ে বাকি অংশটুকু নির্বিঘ্নেই পার করে এসে দাঁড়ালাম ক্যাম্পের সীমান্তে। সামনেই কাঁটাতারের বেড়া, তারপরেই মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বার্চগাছের সারি। হঠাৎ মনে পড়ল, এস.এস. গার্ড বা অন্যান্য ইনমেটদের কাছে শুনেছিলাম যে ক্যাম্পের সীমানার এই কাঁটাতারের বেড়ায় নাকি বিদ্যুৎ সংযোগ করা থাকে। মাঝেমাঝেই না জেনে পালাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক বন্দির মৃত্যুও ঘটেছে। অ্যালেককে এই কথা বলাতে ও আমাকে আশ্বস্ত করে বলল, ও নাকি এর ব্যবস্থাও করে রেখেছে। এই বলে আমাকে নিয়ে বেড়ার পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
“কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, একটা জায়গায় বেড়ার পাশে বরফ খুঁড়ে অনেকটা গভীর একটা পরিখা কাটা যার শুরুটা এপাশে হলেও অন্যপ্রান্তটা কাঁটাতারের নিচ দিয়ে ওপাশে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে অ্যালেক একগাল হেসে বলল, ‘গেটোতে থাকার সময় কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে পার করতে হয় শিখেছিলাম না? সেই বিদ্যাটাই কাজে লেগে গেল, বুঝলি?’
“ওর কাছ থেকে জানলাম যে ও নাকি আমাদের পালানোর জন্যেই এটা দুয়েকদিন আগেই বানিয়ে রেখেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম আগে থেকে পরিকল্পনা করে কতটা প্রস্তুতিই না নিয়ে রেখেছে অ্যালেক। যাই হোক, ওর নির্দেশমত আমরা তখন বুকে হেঁটে ওই পরিখা দিয়ে এগিয়ে বৈদ্যুতিক কাঁটাতারের মরণস্পর্শ এড়িয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই গিয়ে দাঁড়ালাম আউশউইৎজ়ের বাইরে, খোলা আকাশের নিচে মুক্ত পৃথিবীর বুকে।
“আহ্‌! অবশেষে মুক্তি। আনন্দে আমার দু’চোখ বেয়ে জল চলে এল। আবেগে জড়িয়ে ধরলাম অ্যালেককে। ওর জন্যেই এটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অ্যালেকের মধ্যে অতটা আবেগ দেখতে পেলাম না। ও নিজের কাঁধ থেকে ঝোলাটা নামিয়ে তার মধ্যে থেকে একটা জ্যাকেট আর ফুল-প্যান্ট বের করে আমাকে দিয়ে তাড়াতাড়ি পড়ে নিতে বলল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো ও কোথা থেকে পেল। ও তাতে বলল যে গ্যাস চেম্বারে মৃত ইহুদিদের পোশাকআশাক যে ব্যারাকে জমা রাখা থাকে, ও সেখান থেকেই এই পোশাকগুলো লুকিয়ে যোগাড় করে নিয়ে এসেছে। ওর কথামতো আমি আমার পোশাক পরিবর্তন করে নেবার পর ও আমার কয়েদির পোশাকটা নিয়ে নিল। তারপর ঝোলাটা আমাকে দিয়ে বলল, ‘এটার মধ্যে কয়েকটা পাঁউরুটি আর কেক আছে, বুঝলি? এই কয়েকদিনের খাবার। চল, তুই আর দেরি করিস না। সকাল হয়ে আসার আগেই চটপট রওনা দিয়ে দে।’
“আমি যেন আকাশ থেকে ধুপ করে মাটিতে আছড়ে পড়লাম। এটা কী বলছে ও! আমি রওনা দিয়ে দেব মানে? ও আসবে না আমার সাথে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি একা কেন রওনা দেব? চল, দু’জনে তো একসাথেই যাব!’
“নিরুত্তাপ গলায় উত্তর দিল অ্যালেক, ‘না রে, আমি যাব না। তোকে একলাই যেতে হবে। তাড়াতাড়ি কর, আর দেরি করিস না।’
“আমি পাগলের মতো জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর তুই, তুই কী করবি?’
“অ্যালেক বলল, ‘আমি এখান থেকেই ক্যাম্পে ফিরে যাব রে। ভাই, বোঝার চেষ্টা কর। আমি এখন ব্যারাকে রয়েছি আরও অনেকের সাথে। আমি আছি না নেই, সেটা কাল সন্ধেবেলা রোল-কলের আগে ওরা ধরতে পারবে না। কিন্তু তুই রয়েছিস হাসপাতালে। একা। কাল সকাল হতে না হতেই ওরা তোর অনুপস্থিতি ধরে ফেলবে। শিকারি কুকুর নিয়ে ছুটে আসবে আমাদের পিছনে। বিকেলের মধ্যেই ধরা পড়ে যাব আমরা। দু’জনেই মারা পড়ব। তার থেকে তুই একা এগিয়ে যা। আমি ফিরে গিয়ে তোর জায়গায় তুই সেজে বসে থাকি। তাহলে ওরা আমাকে চিনতে পারবে না। ফলে তুই অনেকটা সময় পেয়ে যাবি পালাবার। ভেবে দ্যাখ, একসাথে আমাদের দু’জনের পালানো অসম্ভব। তার চেয়ে দু’জনের মধ্যে একজন যাতে পালাতে সফল হই সেটাই ভালো, তাই নয় কি?’
“আমি তবুও মরিয়া হয়ে বললাম, ‘তাহলে আমি কেন? তুইও তো পালাতে পারিস। আমিই বরং ফিরে যাই ক্যাম্পে।’
“সেটারও উত্তর তৈরি ছিল অ্যালেকের কাছে। বলল, ‘না রে, সেটা হয় না। তুই এখনও পুরোপুরি সুস্থ নোস। তোকে যদি এই অবস্থায় এখান থেকে অন্য ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই ধকল তুই সহ্য করতে পারবি না। পথেই মারা যাবি অথবা অসুস্থ দেখে তোকে হয়তো যাবার আগেই ওরা গুলি করে মেরে ফেলবে। তোর জায়গায় আমি থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না। তাই এটাই একমাত্র উপায়। আর দেরি করিস না ভাই, আমার কথা মেনে নে। আলো ফুটে উঠছে। এক্ষুনি রওনা হয়ে যা।’
“আমি আরও কতবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু অ্যালেক কিছুতেই মানল না। শেষপর্যন্ত আমিই বাধ্য হলাম হার মানতে। মা, বাবা, জুডিথ বা রোজ়কে হারিয়ে এতদিন আমি আর অ্যালেকই ছিলাম একে অপরের সহায়। এবার আমাদেরকেও আলাদা হতে হবে। মনে মনে ভাবছিলাম ঈশ্বর আমাদের আর কত পরীক্ষা নেবেন? কিন্তু বরাবরের মতো এবারও ঈশ্বর মূক ও বধির হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করলেন। আস্তে আস্তে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছিল। জলভরা চোখে দু’জনে দু’জনকে বিদায় জানালাম। ক্যাম্পের সীমানা ছেড়ে বার্চগাছের জঙ্গল অবধি পৌঁছে শেষবারের মতো ফিরলাম পিছনের দিকে। সেই আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম ইহুদি নিধন প্রকল্পের বৃহত্তম কর্মশালা আউশউইৎজ়কে পিছনে রেখে আমার যাত্রাপথের দিকে তখনও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আমার ভাই, অ্যালেক।”
বৃদ্ধের কাহিনি শুনতে শুনতে আমি কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে ভাবছিলাম কী করে মাত্র পনেরো বছর বয়সের এক কিশোর এভাবে সহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মবলিদানের মূর্তপ্রতীক হয়ে উঠতে পারে। হঠাৎ খেয়াল হল, ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ হল কথা শেষ করে চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। তাই ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”
আমার দিকে ফিরে মৃদু হাসলেন ভদ্রলোক। বললেন, “তারপর আর কী? অ্যালেকের কথামতো রোজ দিনের বেলা জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতাম আর রাত্রিবেলা পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলতাম। দিন তিনেক এভাবে চলার পর একরাতে ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই রাস্তার ধারে। জ্ঞান ফেরার পর দেখি অজ্ঞান অবস্থায় রেড আর্মি আমাকে উদ্ধার করেছে। ওরাই আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমাকে সুস্থ করে তোলে। পরে যুদ্ধ থামলে এক নিঃসন্তান রাশিয়ান কর্নেল এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন আর নিজেদের সন্তানের মতো বড়ো করে তোলেন। আজ আমি যে এই জায়গায় পৌঁছেছি তা পুরোটাই সম্ভব হয়েছে সেই সহৃদয় রাশিয়ান দম্পতির জন্য।”


***


নিন্দুকেরা বলে জাগরণী সংঘের উলটোদিকে সুবলদার চায়ের দোকানে আমাদের সান্ধ্যকালীন আড্ডাটা যখন চলে তখন নাকি আশেপাশের গাছগুলোতে কাক-চিল বসতে পারে না। এটা আমরা একটা সর্বৈব মিথ্যাকথা বলে উপেক্ষাই করে থাকি কারণ, আজকাল চিল কেন কলকাতায় কাকের দেখা পাওয়াটাই দুষ্কর। তবে এটা অস্বীকার করাটাও ঠিক নয় যে আমাদের আড্ডার একটা গুরুত্বপূর্ণ ইউ.এস.পি হল তর্ক। যেকোনও বিষয়ই হোক না কেন, সেটা নিয়ে একটা ধুন্ধুমার তর্ক বেধে যাওয়াটা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু আজ ঘোষালজেঠু এই যে এতক্ষণ একটানা গল্পটা বলে গেলেন, এই পুরো সময়টা এবং গল্প শেষ হবার পরেও বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কারও মুখ থেকে একটা শব্দও বেরোল না। এমনকি আমাদের আড্ডার মহা মুখরা বিমলজেঠু, তর্কে জিততে না পারলে যাঁর রাতে ঘুম হয় না, তাঁকেও দেখলাম গালে হাত দিয়ে আনমনে চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের পাশবিকতা সম্বন্ধে প্রত্যেকেই আমরা কমবেশি ওয়াকিফহাল। সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল আজকের আড্ডায়। তারই ফলশ্রুতিতে ঘোষালজেঠু আমাদের শোনালেন এরকম একটা মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার বিবরণ। ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ তত্ত্ব আমাদের সকলেরই জানা ছিল। কিন্তু সেই উদ্বর্তন বা সারভাইভাল যে এরকম ভয়াবহও হতে পারে সেটা জেনে আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রত্যেকেই যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনে মনে ইহুদিদের ওপর হওয়া এই মর্মান্তিক অত্যাচারের সহমর্মিতায় নীরবতা পালন করতে উদ্যত হয়েছিলাম আর অন্তর থেকে অ্যালেক এবং অ্যাশার ফ্রিডম্যানকে স্যাল্যুট জানাচ্ছিলাম।
প্রায় দু-তিন মিনিট পর প্রথম মুখ খুললেন শ্যামলজেঠু। প্রশ্ন করলেন, “আর ওঁর ভাই অ্যালেক, তাঁর কী হল? তাঁকে কি পরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল?”
পকেট থেকে মার্লবরো হার্ডসের প্যাকেটটা বের করে তার থেকে একটা সিগারেট ধরালেন ঘোষালজেঠু। তারপর একটা সুখটান দিয়ে বললেন, “এই প্রশ্নটা আমিও জিজ্ঞেস করেছিলাম ওঁকে। উত্তরে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন ভদ্রলোক। আমি বুঝতে পারছিলাম কোনও কারণে তিনি উত্তরটা দিতে হেজ়িটেট করছেন। আমি কোনও জোর করিনি। কিন্তু এক-দুই মিনিট পরে ভদ্রলোক নিজেই জানালেন যে যুদ্ধ থেমে যাবার পর তিনি তাঁর পালক পিতার সাহায্যে খোঁজ নিয়েছিলেন অ্যালেকের। জেনেছিলেন যে তিনি আউশউইৎজ় থেকে যেদিন পালিয়ে এসেছিলেন, তার ঠিক দু’দিন পরেই ক্যাম্পের অফিসাররা অধিকাংশ বন্দিদের ‘ডেথ মার্চ’-এর আদেশ দিয়েছিল। জানুয়ারির হাড়হিম করা ঠাণ্ডায় প্রায় ষাট হাজার বন্দিকে মাইলের পর মাইল পায়ে হাঁটিয়ে পশ্চিমে লোসলাউ নামে অন্য আরেকটা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পথে যেসব বন্দিরা ক্লান্ত বা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, সেখানেই তাদের নির্মমভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। জানুয়ারির সাতাশ তারিখ রেড আর্মি যখন আউশউইৎজ় দখল করে নেয়, তখন সেখানে মাত্র হাতে গোনা কিছু সংখ্যক বন্দি অনাহারে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছিল। দুর্ভাগ্যবশত তাদের মধ্যে অ্যালেক ছিল না।”
“ওহ্‌ নো!” আমাদের সবার মনের আর্তিটা ফুটে উঠল অভির কথায়, “তার মানে অ্যালেকেরও আর কোনও খোঁজ পাননি তিনি?”
“না, পেয়েছিলেন।” একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিলেন ঘোষালজেঠু। “আরও অনেকদিন পর, যখন আউশউইৎজ়ের সমস্ত তথ্য আস্তে আস্তে বাইরে প্রকাশ পেতে থাকল, তখন ডঃ মেঙ্গলার মেডিক্যাল কেস হিস্ট্রির লগ বুকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল অ্যালেকের ডেথ সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেট অনুযায়ী সমস্ত শরীর প্যারালাইসড হয়ে যাওয়ায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ফলে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল সেই ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর তারিখটা লেখা ছিল আঠাশে ডিসেম্বর, উনিশশো চুয়াল্লিশ।”


_____

5 comments:

  1. নাৎসি অত্যাচার আর আউসউইৎজ নিয়ে বেশ কিছু গল্প পড়েছি। এটা তার মধ্যে অন্যতম সেরা। খুব সুন্দর লেখনী।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্যে। শুভেচ্ছা রইল।

      Delete
  2. অপ্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক ফ্যাক্টর এত সুন্দরভাবে মিশে গেছে লেখাটিতে যে পড়ে মুগ্ধ হলাম। ঐতিহাসিক বর্ণনা ও জার্মান নামগুলির সঠিক উচ্চারণ এই ছোট উপন্যাসটির মনিমুক্তা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্যে। কঠিন সময়ে সুস্থ থাকবেন, সাবধানে থাকবেন। অনেক শুভেচ্ছা রইল।

      Delete
  3. অসাধারণ একটা লেখা। রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম।

    ReplyDelete