উপন্যাসিকাঃ টিয়া বাগানঃ সুশান্ত কুমার ঘোষ



এক


আর একটু হলেই পাখিটাকে ধরে ফেলেছিল টুসি। একটুর জন্য, সামান্য একটুর জন্য ওটা হাতছাড়া হল। টুসি যদি আগে বুঝতে পারত, একটা নয়, রেলিংয়ের আড়ালেতে বসে আছে এক দঙ্গল, তাহলে কি অমন তাড়াহুড়ো করত! পা টিপে টিপে গিয়ে রেলিংয়ের ফোঁকরে হাত গলিয়ে ঠিক ধরে ফেলত। একটা কেন, দু’হাতে ধরে ফেলত দুটোকে। এক দঙ্গল টিয়া, দুটোকে ধরা কী এমন কঠিন কাজ! তাছাড়া এক কাজেই সব ঝামেলা মিটে যেত। একটা ধরলে পিকু দেখলেই বায়না জুড়ত, ‘ওটা আমাকে দে, দিদি। আমি আদর করব।’ সে বলত, ‘তা কেন? তাহলে আমি কী নেব? ওটা যে আমি ধরেছি।’ পিকুও ছাড়ত না, লেগে যেত কাড়াকাড়ি। হেরে গেলে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদেকেটে একশা। দিন চলে যেত। রাত আসত ঘরে। পিকুর কান্না তবুও থামত না। হাসি তার মুখে ঢোকার পথই পেত না। পাছদুয়ারে বসে বসে মশার কামড় খেয়ে হাসিটা একসময় অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়ত। পিকু কেবল কেঁদেই যেত, কেঁদেই যেত। তখন তাকেই খেতে হত ধমক মায়ের কাছে। মা ধমক দিয়ে বলত, “টুসি, তুমি না বড়ো! পিকু তো ছোটো তোমার থেকে। দাও ওকে পাখিটা।’ পিকুর দখলে চলে যেত টিয়া। পিকু তাকে ছোলা খাওয়াত। ঠাম্মি আনত লঙ্কা। তার হাসি আর সারারাতেও ফিরত না। অন্ধকারে পথ হারিয়ে শিউলিগাছের ডালেই ঘুমিয়ে যেত।
টুসি দৌড়ে গেল রেলিংয়ের কাছে। অনেক টিয়া তো! তার দরকার মাত্র দুটো। দুটো টিয়াকে এমনি এমনিই ধরতে পারবে। ঠাম্মি বলে ওগুলো টিয়া বাগানের টিয়া। ওখানেই থাকে হাজার হাজার পাখি। কেবল টিয়া, আর টিয়া। সেইজন্যই না বাগানটার নাম টিয়া বাগান! বাগানটাকে দূর থেকে দেখেছে টুসি। তবে যায়নি কোনোদিন। ছাদে উঠলেই দেখা যায় বাগানটা। ওই তো মাঠের ধারে তালপুকুরের কয়েততলা, তার ওপারে শেয়ালডাঙার মাঠ। শেয়ালডাঙার মাঠ পেরলেই টিয়া বাগান। কী আর এমন দূর!
টুসি রেলিং ছেড়ে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল ছাদে। ওই ওই তো টিয়াপাখির দলটা ওইদিকেই উড়ে যাচ্ছে। সব বসবে গিয়ে বাগানে। বাগানের গাছগুলোকে মোটেই বড়ো মনে হচ্ছে না। ডালগুলো সব মাটি ছুঁয়ে আছে। টিয়া ধরার জন্য গাছে ওঠারও দরকার হবে না। কেবল বাগানে পৌঁছে গেলেই হল। মাটি থেকেই টপাটপ ধরে নেবে। মাত্র তো দুটো। না না, চারটে ধরবে। তার জন্য দুটো, পিকুর জন্য দুটো। পাঁচটা হলেও মন্দ হবে না। তোর্সাকে দেওয়া যাবে একটা। তোর্সাও তো ছোটো, পিকুর মতো। পিকুর হাতে টিয়া দেখে তোর্সা যদি কাঁদতে বসে! তখন কী হবে? পিকু তো দেবে না ওকে। ছোটো যে। মা তো টুসিকে ছাড়া চারপাশে আর কাউকে বড়ো দেখে না। তোর্সা জুড়বে কান্না। পিকু দেবে দৌড়। মা ডাকবে, ‘টুসি, এস এদিকে।’ টুসি গুটি গুটি পায়ে দাঁড়াবে গিয়ে মায়ের সামনে। মা বলবে, ‘টুসি সোনা, তুমি তো বড়ো, বড়োদেরই সইতে হয়। ছোটোদের জন্য স্বার্থত্যাগ করতে হয়। তোর্সা ছোটো যে! ওকে একটা টিয়াপাখি দাও, সোনা।’ টুসি আর কী করবে? ও তো বড়ো। ওর ভাগ থেকেই দিতে হবে তোর্সাকে। পাঁচটা নয়, ছ’টা চাই। নয়তো তোর্সা যদি বলে বসে, ‘পিকুর দুটো, আমারও দুটো চাই।’ তখন কী হবে! তার ভাগে যে একটাও থাকবে না। সে তবে ছ’টা টিয়াই ধরবে। তোর্সা না চাইতেই দিয়ে দেবে দুটো। তাহলে আর কান্নাকাটির, ভাগাভাগির ব্যাপার থাকবে না।
টিয়াগুলোকে এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। তালপুকুর পেরতেই আর দেখা গেল না। ওরা ঠিক বাগানে ফিরে গেছে। ওই মাটি-ছোঁয়া গাছগুলোতেই বসেছে গিয়ে। কেবল হাত বাড়িয়ে ধরার অপেক্ষা। আজই ধরবে।
টুসি প্রথমে ভাবল যে একলাই যাবে। পরে মনে হল, ছ’টা পাখি একটা হাতে রাখবে কেমন করে! দু’হাতে তো পাখি রাখা যাবে না, একটা হাতে ধরতে হবে যে। পিকু যদি সঙ্গে থাকে সমস্যা হবে না। সে একটা করে ধরবে আর পিকুকে দেবে। আর পিকু... তাই তো! পিকু ওগুলো রাখবে কোথায়? পাখি যে খাঁচায় থাকে, একটা খাঁচা চাই।
হঠাৎ ছাদের একটা কোণে টুসির চোখ আটকে গেল। ওখানে একটা নারকেল তেলের ডিবে পড়ে আছে। পিকু ওটা দিয়ে ঢোল বাজায়। ডিবের ঢাকনাও আছে। ওটার মধ্যে ছ’টা টিয়া দিব্যি এঁটে যাবে। আগে ধরে তো আনা যাক। খাঁচার কথা পরে ভাবা যাবে।
টিনের ডিবেটা নিয়ে টুসি ছাদ থেকে নেমে এল। কিন্তু পিকুকে ডাকে কেমন করে। মা ওকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেছে। পিকু যদি ঘুমিয়ে যায়! ভাবতে ভাবতে বারান্দার কোণে আচারের থালাটা চোখে পড়ল টুসির। ঠাম্মি বয়াম থেকে ঢেলে রোদে শুকোতে দিয়েছে। আরে! এখানেই তো বসেছিল টিয়াটা। আচারের লঙ্কাগুলো কেমন চকচকে লাল। তার মানে টিয়াগুলো আচার আর লঙ্কা খেতেই এসেছিল। টিয়াপাখি লাল টুকটুকে লঙ্কা খেতে ভালোবাসে সেটা আগেই জেনেছে টুসি। আচারের লঙ্কা ওদের আরও পছন্দের। নয়তো গাছের লঙ্কা ছেড়ে ওরা আচারের কাছে আসবে কেন? টুসি ভাবল, সঙ্গে যদি একটু লঙ্কা সমেত আচার নেওয়া হয় তাহলে টিয়াকে আর হাত বাড়িয়েও ধরতে হবে না। আচার দেখলেই হাতে এসে বসবে। অমনি টপাটপ ধরে ডিবেয় পুরে ফেলবে।
বিলম্ব না করে ডিবের মধ্যেই একটু আচার নিয়ে নিল। ব্যবস্থা সব পাকা। এবার পিকুকে চাই। কিন্তু পায় কেমন করে? মা যে পিকুর কাছেই আছে। সেও শুয়ে ছিল ঠাম্মির কাছে। কিন্তু ঘুম তো আর আসে না। চোখদুটো নয় বন্ধ ছিল, কান তো আর বন্ধ ছিল না। ক্যাঁচরম্যাচর ডাকটা কানে যেতেই চোখদুটো খুলে গিয়েছিল। তাকিয়ে দেখল ঠাম্মি ঘুমে কাদা। ফুরুত ফুরুত করে নাকও ডাকছে। নরম চোখে ঠাম্মিকে কিছুক্ষণ দেখে পা টিপে টিপে সুড়সুড় করে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল টুসি। দরজাটা বন্ধও করেছিল ঠিক তেমনি করেই। কিন্তু মা কি আর ঘুমাবে! তার চোখ বন্ধ থাকলেও কানদুটো যে খোলা থাকে সবসময়। কী যে করবে টুসি ভেবে পায় না। প্ল্যানটাই বুঝি ভেস্তে যায়। একটুর জন্য পাখিটা ফসকাল। আবার পাখির রাজ্যে যাওয়ার প্ল্যানটাও বুঝি মাটি হয়। টুসি পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় শোবার ঘরের দিকে। দরজায় কান পেতে শোনার চেষ্টা করে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় কি না। কোনও আওয়াজ না পেয়ে আলতো করে দরজাটা একটু ফাঁক করতেই বাইরের আলোর ছটা পেয়ে পিকু ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বিছানায়।
পিকু বিছানায় উঠে বসতেই টুসি মুখে আঙুল চেপে ইশারায় ডাকে। পিকুও টুসির ভঙ্গিতেই হাতে মুখ চেপে শিকারি বেড়ালের মতো নিঃশব্দে খাট থেকে নেমে পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে বাইরে। টুসি দরজাটা ভেজিয়ে একটু তফাতে এসে পিকুর কানের কাছে মুখটা এনে নিচু স্বরে বলল, “ভাই, চল আমরা টিয়া বাগান থেকে টিয়াপাখি ধরে আনি।”
টিয়া বাগানের কথা শুনে পিকু চিৎকারে বাড়ি ফাটাতে যাবে অমনি টুসি তার মুখটা চেপে ধরে। “ভাই, পাগল হলি নাকি! সর্বনাশ হয়ে যেত এখুনি! মা জেগে গেলে আর যেতে পারবি!”
তাই তো! এটা তো মনে ছিল না পিকুর। দিদির কথা শুনে পিকু শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দু’হাতে চেপে ধরল মুখটা।
আসলে মা পিকুকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেলে কী হবে, পিকু তো ঘুমায়নি। চোখ বন্ধ করে মায়ের কাছে শুয়ে ছিল কেবল। আর মা তাকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। পিকু পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাচ্ছিল, আর ভাবছিল কখন বিকেল হবে। ভাবতে ভাবতেই আলোর ছ’টাটা পড়ল এসে চোখে। তাকিয়ে দেখল দিদি। তাকে ডাকছে ইশারায়।


দুই


পিকুর হাত ধরে টুসি প্রায় সদর দরজার কাছাকাছি চলে এসেছিল। এতক্ষণ পিকু একটাও কথা বলেনি। কিন্তু দিদির হাতে টিনের কৌটোটা দেখে তার বড়ো কৌতূহল হল। জিজ্ঞাসা করল, “দিদি, কৌটোটা দিয়ে কী হবে?”
“টিয়া ধরে ওর ভিতরে রাখব। আমি ধরে ধরে দেব, আর তুই ওর ভিতরে ঢোকাবি। জানিস ভাই, ওতে না আচার নিয়েছি একটু।”
আচারের নাম শুনে পিকু প্রায় চিৎকার করে উঠল, “কই দিদি দে, আমাকে একটুখানি আচার দে।”
এই সেরেছে। দিলে সব পণ্ড করে। মা চিৎকার ছাড়ল একটা। মা জাগল বলে। টুসি ভাইয়ের মুখটা চেপে ধরে সদর দরজাটা খুলে প্রায় দৌড়ে নেমে এল রাস্তায়।
ঠাম্মি জাগলেও ক্ষতি নেই। ঠাম্মি কানে তেমন শোনে না। চোখেও দেখে না বললেই হয়। টুসিকেই চিনতে পারে না সামনে থেকে। দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও বলে, ‘কে, টুসি নাকি? সাড়া দাও না যে।’ তারপর চশমাটা পরে বলবে, ‘হ্যাঁ, টুসিই তো। তাই তো বলি, টুসি ছাড়া আর তো কেউ বোবা নাই ঘরে।’ এতে টুসির অবশ্য সুবিধেই হয়। মাকে একবার ওপরের ঘরে পাঠাতে পারলেই নিশ্চিন্দি। কৌটো থেকে চানাচুর নাও, বিস্কুট নাও—ঠাম্মি টেরও পাবে না। তবে বয়াম থেকে আচার নিতে গেলেই ধরা পড়ে যায়। ঠাম্মির চোখকান না থাকলেও নাকটা বড়ো ঝাঁঝালো। বয়ামের ঢাকনা খুলতে না খুলতেই ঠাম্মি বলে ওঠে, ‘বড়ো যে গন্ধ পাই নাকে। আচার আচার গন্ধ। চোর ঢুকল নাকি?’ ঠাম্মির কথা শুনে টুসি ফিক করে হেসে ফেলে। কিন্তু ঠাম্মির আসার আগেই টুসি আচার নিয়ে চলে যায় সেখান থেকে। ঠাম্মি এদিক ওদিক উঁকি মারে, আর বাতাসে গন্ধ শোঁকে। ঠাম্মিকে নিয়ে তাই চিন্তা নেই। কিন্তু মা জাগলেই বিপদ। টিয়া ধরা তো জলে যাবেই, উলটে পিঠে পড়বে চড় থাপ্পড়।
টুসি পিকুকে নিয়ে টানতে টানতে গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠের ধারে চলে এল। এটুকু আসতেই পিকুটা কেমন হাঁপিয়ে উঠেছে। “দিদি দৌড়াস না, আস্তে চল। পা ব্যথা করছে।”
পিকুকে নিয়ে এই এক মুশকিল। এমনিতে ঘরময় দৌড়ে বেড়ায় সারাদিন। স্নান করার সময় দৌড়বাজ পিকুর তেজ আরও বেড়ে যায়। তেল মাখানোই দায় তখন। দরজা বন্ধ করেও শান্তি নেই। দৌড়ে বেড়ায় উঠোনময়। মা যত বলে, ‘এসো মানিক আমার, তেল মেখে নাও। বেলা বয়ে যায়, খাবে কখন? পিকু আমার লক্ষ্মী ছেলে যে, যা বলি তাই শোনে। এই দেখো না চুপটি করে বসে তেল মেখে নিজে নিজেই স্নান করে নেবে।’ এসব বলতে বলতে মা চোখ বন্ধ করে গুনতে শুরু করে, ‘এক, দুই, তিন... দেখো না, দশ গোনার আগেই পিকু সোনা চলে আসবে।’ পিকু তখন তুলসীমঞ্চের আড়াল থেকে বলে, ‘আমাকে খোঁজো আগে।’ পিকু দৌড়ায় উঠোনময়। মা ছোটে পিছন পিছন। মা হাঁপিয়ে ওঠে। পিকুর দম তবুও ফুরোয় না। শেষে মাঠে নামতে হয় টুসিকে। তবে সেখানে আরেক বিপদ আছে। টুসির হাতে ধরা পড়লে মাঝেমাঝে তার মেজাজ বিগড়ে যায়। তখন তার শরীরে নখের আঁচড় কেটে, কামড় দিয়ে, চুল ছিঁড়ে একাকার করে। টুসি তো কেঁদেকেটে একশা। তবে মেজাজ ঠিক থাকলে পিকু দিদির গলা জড়িয়ে হাসতে হাসতে মাকে বলে, ‘আমাকে ধরতে পারলে না। তুমি হেরে গেলে। তুমি হারা ফুটো।’ সেদিন টুসির কাছেই হাসতে হাসতে তেল মাখে। টুসি তাকে স্নান করিয়ে দেয়।
সেই দৌড়বাজ পিকু বাইরে এলেই খোঁড়া হয়ে যায়। কোল চায় কেবল। বেশ চিন্তায় পড়ে যায় টুসি। মায়ের নাগাল এড়াতে দৌড়ে গ্রামটুকু তো পার হওয়া গেল। এবার যে আলপথ। মনে মনে ভাবল, পিকুকে সঙ্গে না নিলেই হত। আবার মনে হল, পাখিগুলো রাখবে কার কাছে। সে তো কেবল ধরবে। পিকু না থাকলে ডিবে ধরবে কে?
আলপথে পিকু পাঁচ পা হাঁটতে তিনবার পিছল খায়। দশ পা হাঁটলে আছাড় খায় দু’বার। টুসি দৌড়ে আসে ভাইয়ের কাছে। হাতের ডিবেটা আলের ওপর নামিয়ে রেখে পিকুকে তুলতে যায়। “পিকু আবার পড়লি? লাগেনি তো?”
পিকু ধড়মড়িয়ে ওঠে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে কাঁদোকাঁদো হাসির আভা ছড়িয়ে বলে, “না না, লাগেনি তো। চল চল দিদি, টিয়াপাখি ধরতে হবে চল।”
টুসি ডিবেটা তুলে পথচলা শুরু করার আগেই পিকু আলপথ ধরে দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে যায়। বাঁকের মুখে আবার আছাড় খায়। টুসি পিছন থেকে দৌড়তে দৌড়তে বলে, “ওঠ ভাই, ওঠ। তুই বড্ড বেশি দৌড়াচ্ছিস। আস্তে ভাই, আস্তে চল।”
টুসি সেখানে পৌঁছনোর আগেই পিকু অবশ্য ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়ে। কিন্তু মুখের সেই কাঁদোকাঁদো হাসিটা আর দেখা যায় না। পথ দেখে পথ কখনও হাঁটে না পিকুরা। পা চলে পথের টানে, চোখ ঘোরে চারপাশে। তাই এত আছাড় খাওয়ার ধুম। দোষটা তো পিকুদের নয়, দোষটা পথের। রাজপথেই যারা পদে পদে ঠোক্কর খায়, আলপথে তারা হাঁটে কেমন করে। যত দোষ ওই পথটার। টুসি সেটা ভালোই জানে। তাই পিকু আছাড় খেয়ে হাঁটুতে হাত বোলাতে থাকলে টুসি বলে, “বড্ড লেগেছে, না রে ভাই? পথটা খুব পাজি। বারবার তোকে ফেলে দিচ্ছে। দিচ্ছি দ্যাখ না কেমন...” বলতে বলতে আলের ওপর লাথি মারে আর বলে, “অ্যাঁ! ভারি দুষ্ট হয়েছ, না? বারবার আছাড় খাওয়াচ্ছ পিকুকে! উহ্‌, খুব পাজি! কেমন দিলাম?” ফের পিকুর দিকে তাকিয়ে বলে, “ভাই, খুব মেরেছি ওকে। ওই দ্যাখ কেমন কাঁদছে। কাঁদুক। একটুও আদর করব না। বারবার কেবল পিকুকে ফেলে দিচ্ছে বদমাশটা।”
দিদির দেখাদেখি পিকুও তার ডান পাটা মাটির ওপর বার কতক ঠুকে মনের খেদ মিটিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে।


তিন


বাথান ডোবার পাশে নালাটা পেরোতে গিয়েই সমস্যায় পড়ে গেল টুসি। নালাটা খটখটে শুকনো। কিন্তু বেশ খানিকটা চওড়া এবং গভীর। লোক চলাচলের ফলে দু’দিক বেশ ঢালু হয়ে গিয়েছে বটে। টুসি দিব্যি পেরোতে পারবে, কিন্তু মুশকিল হল পিকুকে নিয়ে। নামার সময় গড়ান বেয়ে যদিও বা নামতে পারল, ওদিকের চড়াই বেয়ে ওঠার মুখেই বিপত্তি। পিকুর পা বারবার পিছলে যায়। এপ্রান্ত থেকে একদৌড়ে উতরে যাবে চড়াইটা সেও আর হয়ে ওঠে না। পাড়ের কাছাকাছি পৌঁছতেই ফুরিয়ে যায় দম। তিন-চারবার চেষ্টা করে পিকু যখন বিফল হল, টুসির মাথায় এল নতুন বুদ্ধি। টুসি লক্ষ করেছে, পায়ে চটি থাকার জন্যে পিছল খাচ্ছে পিকু। টুসি বলল, “ভাই, চটিদুটো খুলে আমাকে দে। তারপর দৌড়ে আয়, দেখ পারবি।”
টুসির বুদ্ধিতেই কাজ হল। জুতো খুলে সে এমন দৌড় দিল, খালের চড়াই টপকে রাস্তা পেরিয়ে বাথান ডোবার ধারে। বাথান ডোবার দৃশ্য দেখে পিকু তো আহ্লাদে আটখানা। নামেই পুকুর। জলকাদা তো নেইই, মাটিও দেখা যাচ্ছে না কোথাও। জল শুকনো পাঁকের ওপর সবুজ ঘাসের গালিচা। ঘাসের ওপর নানান রঙের ছোটো ছোটো ফুল। পিকু দৌড়ে নেমে গেল পুকুরে। ভীষণ তুলতুলে নরম সেই ঘাস। ঠিক যেন সোফা। সোফায় যেমন তুলতুল করে পায়ের তলা, পুকুরটাও তেমনি। কেবল ঘাসগুলোই নরম নয়, ঘাসের তলার পাঁকটাও নরম। স্পঞ্জ যেন। কেবল তুলতুলেই নয়, পায়ের তলায় সুড়সুড়িও দিচ্ছে। এমন অনুভূতি পিকুর আগে হয়নি। মা তো খালি পায়ে হাঁটতেই দেয় না। আজ পেয়েছে। নরম ঘাসে খালি পায়ে পিকু যেন রেসের ঘোড়া। পায়ের তালে তালে পায়ের তলার মাটিও যেন পিকুকে সমান তালে দোলাচ্ছে। মাটির এমন আদর করার অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি পিকুর। গামলার মতো গোলাকার পুকুর-খালে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে পিকু। টুসি হাঁক পাড়ে, “ভাই জুতো পর, কাঁটা ফুটবে পায়ে।”
পিকু খিলখিল করে হাসতে হাসতে ডাক দেয় দিদিকে, “দিদি, আয় না। দেখ দেখ কী মজা! পায়ে কেমন সুড়সুড়ি দেয় দেখ। পুকুরটা তুলোর মতো আদর করে।”
টুসি জুতো পায়ে পাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় কিছু বুঝতে পারেনি। পিকুর কথায় জুতো খুলে নরম ঘাসে যেই না পা রেখেছে, অমনি তার সর্বাঙ্গে একটা শিহরন খেলে গেল। ঠাম্মি তার পিঠে পালক দিয়ে সুড়সুড়ি দিলে ঠিক এমনটাই হয়। সেও দিল দৌড়।
ওদিকে পিকু দৌড় ছেড়ে পুকুরের ঢাল বেয়ে গড়াতে শুরু করেছে। টুসিও চলে এল তার কাছে। পিকুর দেখাদেখি সেও পুকুরের গড়ানের ঢালে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল। কচি ঘাসের নরম ডগা ওদের শরীরে লাগায় ওরা কাতুকুতু খাওয়ার মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে। পিকু বলল, “দিদি, এবার থেকে রোজ আসব নয় এখানে।”
টুসি গড়াতে গড়াতেই বলল, “হ্যাঁ ভাই, ঠিক বলেছিস। রোজ আসব এখানে।” পরক্ষণেই কী ভেবে বলল, “কিন্তু মা?”
ঠিক তখনি মনে পড়ল টিয়ার কথা। “আগে টিয়াপাখিটা তো ধরে আনি! তারপর অন্যকথা ভাবা।”
পিকুর কান টুসির প্রতি ছিল না। সে কখন ফড়িং দেখছে। ঘাসের ডগায় দুলতে থাকা বিন্দুগুলো প্রথমে ফুল বলে মনে হয়েছিল। একটু পরখ করে দেখতেই ভেঙে গেল ভুলটা। কেবল ফুল নয়, ফুলের ওপর শয়ে শয়ে ফড়িং দোল খাচ্ছে। সরু সরু, ছোটো ছোটো রঙবেরঙের কত না সব ফড়িং। ময়ূরকণ্ঠী রং, কামরাঙার রং, হলুদ গাঁদার রং, লাল পলাশের রং, সবুজ টিয়ার রং—চারপাশে কেবল রং আর রং। পিকু মেতে উঠল ফড়িং নিয়ে। ফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ায়, দু’হাতে চেপে ধরতে যায়। ফসকে গেলে চিৎকার করে ওঠে, “ইস দিদি, হল না, পালিয়ে গেল।”
পিকুর তখন মাথা থেকে উড়ে গিয়েছে টিয়া। টুসি কিন্তু টিয়ার কথা ভোলেনি। সে বলল, “ভাই চল, টিয়াপাখি ধরতে হবে যে।”
“আর একটুখানি দিদি, একটা ফড়িং ধরি আগে।”
টুসির মনে হল টপাটপ ক’টা ফড়িং ধরলে মন্দ হয় না। টিয়া যদি আচার না খায় তবে তাদের খিদে পাবে। সঙ্গে ফড়িং থাকলে দিতে পারব। টিয়া নিশ্চয়ই ফড়িং পেলে খুশি হবে। তাজা তাজা ফড়িং পেলে কচমচিয়ে খাবে। তখন টুসির সঙ্গে টিয়ার ভাবটাও জমে উঠবে। পরক্ষণেই মনে হল, টিয়া যদি ফড়িং না খায়! ওরা যে গাছে গাছে ফল খায়! না, থাক গে। রঙিন ক’টা ফড়িং পেলেও টিয়া নিশ্চয়ই খুশি হবে। মনে মনে ভাববে, টুসিটা খুব ভালো। ফড়িং দেখে তখনই হয়তো বলবে, ‘টুসি, তুমি এত ভালো! আমাকে ফড়িং দিলে যে। তুমি খুব ভালো। তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু।’
পুকুরময় দৌড়াদৌড়িই সার হল। ফড়িং ধরা গেল না একটাও। ফড়িং যত উড়ে উড়ে পালায়, পিকুর উৎসাহের পারদ ততই চড়চড় করে বাড়তে থাকে। ওদিকে টুসি উৎসাহ হারিয়ে চড়া গলায় বলে, “ভাই চল, টিয়াগুলো সব পালিয়ে যাবে যে!”
টিয়া পালানোর কথায় চমকে ওঠে পিকু। “চল চল দিদি, টিয়া ধরবি চল।” বলতে বলতে ওঠে আসে পুকুরপাড়ে।


চার


বাথান ডোবা থেকে তালপুকুর বেশি দূর নয়। কিন্তু পথ অতি বন্ধুর। এখানকার আলপথ খুব সরু। মাটিও বেশ শক্ত। এঁটেল মাটি। এবড়োখেবড়ো নাড়া জাগা ধানজমি সব। টুসি আলপথ ছেড়ে নাড়া জমির ওপর নেমে পিকুর হাত ধরে ওকে আলপথে হাঁটাতে থাকে। টুসি হাঁটে এবড়োখেবড়ো জমির ওপর দিয়ে। পিকুর হাতটা শক্ত করে ধরে থাকায় সে অবশ্য আছাড় খায় না। কিন্তু টুসি পদে পদে হোঁচট খেতে থাকে।
ঠোক্কর খেতে খেতে তালপুকুরের পাড়ে এসে উঠল তারা। নামেই তালপুকুর। তালগাছের চিহ্ন নেই। একটামাত্র কয়েতগাছ দাঁড়িয়ে আছে একা। পুকুরটাও তেমনি। ঠাম্মির চাল ঝাড়া কুলোটারও এর থেকে খাল বেশি। জল তো নেই। ঘাসও নেই একটাও। পুকুরময় চৌচির ফাটা। সেই ফাটলের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পাদুটোই না ঢুকে যায়!
ওরা কয়েতগাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। সামনে শিয়ালডাঙার মাঠ। ওই মাঠটা পেরোলেই টিয়া বাগান। টুসির মনে হল, এই তো এসে গেছি। পা চালিয়ে মাঠটা পেরোতে পারলেই হল। ওই তো দেখা যাচ্ছে বাগানটা। কেবল গাছ আর গাছ। সামনের আকাশটাও মিশে গিয়েছে বাগানের সঙ্গে। তার মানে ওখান থেকে টিয়ারা আর পালাতে পারবে না। উড়তে গেলেই আকাশে ঠেকবে মাথা। টুসি একটা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ওপরে তুলে উল্লাসে লাফিয়ে উঠল। যেন সব পাখি তার হাতের মুঠোয়—এমনই ভাব তার। ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে ওঠে টুসি। ধৈর্য আর রাগ মানে না। ইচ্ছে করে হনুমানের মতো লাফ দিয়ে বাগানে পৌঁছে যেতে। ওই তো টিয়া বাগান। হাত বাড়ালেই তো... বড়ো আফসোস হয় টুসির। তার যে সে শক্তি নেই। সে তো পারে না হনুমানের মতো লাফাতে। কিংবা ঠাম্মির গল্পের সেই বুড়িটার মতো দাওয়ায় বসে হাত বাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে ভাতের থালা আনতে, বাগান থেকে কাগজি তুলতে, কুয়ো থেকে জল তুলতে সে তো পারে না। যদি পারত, এক্ষুনি দু’হাতে তুলে আনত বাগানটাকে। সব টিয়া হয়ে যেত তার।
হঠাৎ টুসি উন্মাদ হয়ে উঠল। সর্বাঙ্গে শিহরন খেলে গেল। জেগে উঠল গতি। মন উঠল নেচে। পাদুটো চঞ্চল হয়ে উঠল। টুসি দিল দৌড়। না, আর আলপথ নয়। টুসি লক্ষ করল, পাশ দিয়ে বয়ে চলা ক্যানেলটা বাগান ফুঁড়ে হারিয়ে গেছে দিগন্তে। উঁচু আর চওড়া তার বাঁধ। ওই বাঁধ ধরে দৌড়লে মুহূর্তেই পৌঁছে যাবে বাগানে। ধরে ফেলবে পাখি। সব পাখি তার।
টুসির ছোঁয়ায় জেগে উঠেছে পিকুও। পায়ে তার পিস্টনের উল্লাস। প্রশস্ত বাঁধ পেয়ে সে দিদির আগে দৌড়ায়। বুঝি টুসির আগেই পৌঁছে যাবে বাগানে। একলা হাতে ধরে ফেলবে সব পাখি। দিদিকে কিচ্ছুটি করতে হবে না।
কিছুদূর এগোতেই একটা সাইফন পাওয়া গেল। পিকু আগে পৌঁছে গিয়েছিল সেখানে। এ-জিনিসটা সে আগে কখনও দেখেনি। ক্যানেলের ভিতরের দিকে বাঁধের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধাপে ধাপে নেমে গিয়েছে সিঁড়ি। দুই বাঁধের মাঝের অংশটা ইট দিয়ে বাঁধানো। চাতালের ওদিকের বাঁধটাতেও এমনি করেই ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরে। সাইফনের উলটোদিকে ইটের দেওয়াল নেমে গিয়েছে গভীরে। অনেকটা নিচে টলটলে জল। জলের নিচে বড়ো বড়ো পাথর, পরি-পাখিদের দেখা যাচ্ছে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে খেলে বেড়াচ্ছে মাছ। কিন্তু ওদিকে নামার মতো কোনও সিঁড়ি তার চোখে পড়ল না। পিকু একবার এপাশ দেখে, একবার ওপাশ। পায়ে পায়ে চঞ্চলতা। উল্লাসের কম্পন তার সর্বাঙ্গে। এই চঞ্চলতা, এই উল্লাস ঠিক কোথায় প্রয়োগ করবে ভেবে পায় না। স্পিন ভাঙা বলের মতো ঘুরছিল তার চোখের ডিমদুটো। উসুখুসু করছিল মন। নিশপিশ করছিল হাত-পা। কী করবে, কী করবে—ঠিক তক্ষুনি চোখে পড়ল সবুজ ঘাসের আস্তরণ। অবিকল বাথান ডোবার মতো চাপ চাপ সবুজ ঘাস। সেই ঘাসের ওপর পাখা ছড়িয়ে খেলা করছে দুই শিংওয়ালা পাখি।
“দিদি, শিং পাখি! শিং পাখি! ধরবি আয়!”
পিকু সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে নেমে যায় ক্যানেলের ভিতরে। ইট বাধা চাতাল ছাড়িয়ে খাল বরাবর নরম ঘাসের ওপর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকে। লক্ষ্য তার শিং পাখি। বইতে পড়েছে, ‘হাট্টিমা টিমটিম/তারা মাঠে পাড়ে ডিম/তাদের খাড়া দুটো শিং...’
এই তবে শিং পাখি! এতদিন ছবিতে ছিল, আজ পেয়েছে নাগালের মধ্যে। পিকু ওদের ধরবে। “দিদি, আয় আয়, তাড়াতাড়ি আয়। যাহ্‌! পালিয়ে গেল।”
হতাশ গলায় কথাটা বলে থমকে দাঁড়াল পিকু। পাখিদুটো আপনমনে খেলছিল। পিকুকে দৌড়ে আসতে দেখে উড়ে গেল সেখান থেকে। দৌড়তে দৌড়তে পিকুও হাঁফিয়ে উঠেছিল। পাখিদুটো উড়ে যেতেই তার দমটাও যেন ফুরিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়েই উড়ন্ত পাখির দিকে হাত তুলে, “উই উই দিদি, উই দ্যাখ!” বলে লাফাতে লাগল।
টুসি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছিল। পিকুকে সাইফনের সিঁড়ি বেয়ে বাঁধ থেকে ক্যানেলের খালে নামতে দেখে, “ভাই নামিস না, নামিস না, দাঁড়া!” বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় শিং পাখির কথা যখন তার কানে এল, পিকুর বিপদের কথা ভুলে সেও দৌড়তে শুরু করল। পিকুর কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞাসা করল, “কই ভাই, কই শিং পাখি? কোথায়?”
পিকু দিদিকে হাতের ইশারায় দেখাল, “উই উই, উড়ে যাচ্ছে উই দ্যাখ।”
টুসি দেখল পাশাপাশি দুটো পাখি উড়ে যাচ্ছে অনেকদূরে, ওই টিয়া বাগানের কাছাকাছি মনে হল তার। “ভাই, ঠিক দেখেছিস? শিং ছিল?”
“হ্যাঁ তো! বড়ো শিং!”
“ক’টা শিং, ভাই?”
পিকু কিছু একটা ভেবে আঙুল গুনতে গুনতে বলল, “একটা, দুটো, দুটো পাখির দুটো শিং।”
“ভাই ঠিক করে বল। একটা পাখির দুটো করে শিং ছিল না?”
পিকু একবার দিদির মুখের দিকে তাকাল, একবার উড়ন্ত পাখির শূন্য পথের দিকে। তারপর ঘাড় নেড়ে আপনমনে আঙুল গুনতে লাগল, “একটা, দুটো, একটা, দুটো... দুটো দিদি। দুটো। একটা দুটো।”

টুসির খুশি আর ধরে না। শিং পাখিদুটো টিয়া বাগানের দিকে গেল যে। তার মানে ওখানে গেলেই টিয়াপাখি, শিং পাখি সব পেয়ে যাবে। টুসি এতক্ষণ দৌড়চ্ছিল। এখন আর দৌড়নোর ধৈর্যটুকুও নেই। নরম ঘাসের ওপর লাফাতে শুরু করল। বুঝি তিন লাফেই পৌঁছে যাবে বাগানে। একেবারে হনুমানের মতো।
কিন্তু পথ গেল আটকে। জলশূন্য খাল পথে নরম ঘাসের ওপর দিয়ে বেশ আসছিল এতক্ষণ। বাদ সাধল একটা বাঁধা পাড়ের সাইফনটার একটু আগে খালের পথ আটকে টিলার মতো বসে আছে উঁচু একটা বাঁধ। বাঁধটা ওদের থেকে উঁচু। তাই ওপাশে কী আছে বোঝার উপায় নেই। সেটা এমন খাড়াভাবে উঠে গিয়েছে, যে দুই খুদে অভিযাত্রীর পক্ষে ওটাকে টপকে যাওয়াও সম্ভব নয়। এখন খাল পথ ছেড়ে মূল বাঁধের ওপর উঠে আসা ছাড়া উপায় নেই।
সেখানে বিপত্তি। খাত থেকে চরে ওঠাই যে মুশকিল। চরে উঠতে পারলে ঢাল বেয়ে বাঁধের ওপর উঠতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু খাতের খাড়া গা বেয়ে চরায় উঠবে কেমন করে? পথ খুঁজতে গিয়ে একটা ভাঙন চোখে পড়ল। বর্ষার সময় গরু-মোষ পারাপার করা কিংবা পাড়-গড়ানি জল ক্যানেলের খাদে পড়ায় একটা সরু পথ তৈরি হয়েছে। সেটা তেমন খাড়া নয়। তবে বেশ ঢালু। টুসি দৌড়ে গেল সেখানে। পিকুকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “চল ভাই, তুই আগে চল।”
পিকু হাঁটু গেড়ে বুক টেনে গেছেলের মতো চরে উঠল বটে, কিন্তু সেখানে তার জন্য প্রতীক্ষা করছিল আরও একটা সংকট। যে আগাছাটাকে অবলম্বন করে চড়াই উতরোল, সেই আসলে সংকট। সেটা একটা কুলেখাড়ার গাছ। তুলতুলে হাতের স্পর্শ তাদের জোটে না কখনও। সুযোগ যখন এসে গেল ছাড়বে কেন? পিকু সেটা ধরতেই সেও দিল আলতো একটা আঁচড়। ওইটুকুতেই কিস্তিমাত। পিকু উঠল ক্ষেপে। মাটি তো নয় যে লাথি মারবে। কাঁটার ওপর হাত-পা চলে না। তাই পিকু চরে উঠেই ভ্যা ভ্যা করে কান্না জুড়ে দিল, “আমি মা যাব। আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চল।”
টুসি শশব্যস্ত হয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনার সুরে বলল, “কী হল ভাই, কাঁদছিস কেন? শিং পাখি নিবি না?”
“না। আমি মায়ের কাছে যাব।” বলে আহত হাতটা বাড়িয়ে দিল।
টুসি দেখল পিকুর আঙুলের ওপর রক্তের ছিটে। সঙ্গে সঙ্গে আঙুলটা মুখে পুরে চুষে দিল। “আর লাগছে, ভাই?”
পিকুর কান্না কিন্তু থামে না। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “মা। আমি মায়ের কাছে যাব।”
“ভাই, পাখি পাখি। টিয়াপাখি! শিং পাখি! ওই, ওই তো এসে গেছি। চল চল, পাখিটা ধরে আনি আগে।” বলে পিকুর হাত ধরে টানতে থাকে।
পিকু কিন্তু নড়ে না। জেদি বাছুরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে থাকে।
কী করবে ভেবে পায় না টুসি। পিকুর জন্যেই ভেস্তে যাবে সব। কেন যে ওকে সঙ্গে নিল! একলা এলেই বেশ হত। ওই তো বাগান। হাত বাড়ালেই পাখি। আকাশ ঠেকেছে গাছের মাথায়। উড়বে কোথায়? ওপরে আকাশ, মাটিতে টুসি। হাতে আচার। ভাবতে ভাবতেই আচারের কথা মনে পড়ে গেল তার। তাই তো, সঙ্গে যে আচার আছে! “ভাই, আচার খাবি?”
আচারের নাম শুনেই পিকুর কান্না থেমে গেল। “কই, দে আচার।”
টুসি ডিবে থেকে একটু আচার দিল ওর হাতে। পিকু মনের আনন্দে আচার খেতে থাকে। এদিকে বুক রগড়ে, হাঁটু মুড়ে, হামা দিয়ে খাত থেকে চরে ওঠায় পিকুর শরীরের সামনের দিকটা ধুলোময় হয়ে উঠেছিল। টুসি পরম মমতায় পিকুর শরীরের ধুলো ঝেড়ে দিল।


পাঁচ


আচারের চটকে পিকু টিয়া বাগানের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। বাঁধের পাশে একটা নয়ানজুলি। খটখটে শুকনো। ঘাস বিশেষ নেই। খাড়াও নয় তেমন। ওটা পেরোতে অসুবিধা হবে না। বাগান এখন নাগালের মধ্যে। কিন্তু টুসি পড়ল বেজায় মুশকিলে। বাগান যত কাছে এসেছে, গাছগুলো ডালপালা নিয়ে ততই ওপরের দিকে উঠেছে। আকাশ হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। মিশেছে গিয়ে দূর সীমানায়। বড়ো ভাবনায় পড়ে গেল টুসি। গাছে তো উঠতে পারবে না। তাহলে পাখি ধরবে কেমন করে! পাখপাখালির কিচিরমিচির ডাক আসছে কানে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। কোথায় টিয়া? শিং পাখিই বা কোথায়!
টুসির দৃষ্টি গাছের দিকে থাকায় দেখতে পায়নি। চোখ নামাতেই নজরে পড়ল। থমকে গেল টুসি। পিছন থেকে ধাক্কা দিল পিকু। টুসি কোনওরকমে পতন সামলে ভয়ার্ত স্বরে বলল, “এ ভাই! ওই দ্যাখ!”
পিকু ভাবল শিং পাখি বুখি। সে উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, “ধর, দিদি ধর!”
টুসি কিন্তু পাথর চোখে তাকিয়ে রইল অর্জুনগাছের গোড়াটার দিকে। মস্ত অর্জুনগাছটার নিচেই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। যেমন তেমন লোক তো নয়। এ যে মা দুর্গার অসুর একেবারে। ইয়া বড়ো বড়ো চোখ, মাথায় ফেট্টি, টাঙির মতো গোঁফ। মাগুর মাছের মতো কালচে তেল চকচকে গা। ফেট্টির নিচে ঝাঁকড়া চুল কাঁধের ওপর ঝুলছে। পরনের ধুতিটা হাঁটুর ওপর ছোটো করে পরা। কাঁধে গামছা। বাঁহাতে বালিশের খোলের মতো কালো কাপড় একটা ডানহাতে বল্লম। বল্লমের হাতলে পাশাপাশি তিন-চারটে রেশমের ফিতে বাঁধা।
পিকু এতক্ষণ দেখেনি। সে গাছের ডালে ডালে শিং পাখি খুঁজছিল। টুসি এক কদম পিছিয়ে পিকুকে জাপটে ধরতেই পিকু দেখতে পেল লোকটাকে। অমনি ভ্যা করে কেঁদে উঠল। পিকুর দেখাদেখি টুসিও জুড়ে দিল কান্না। এমন জোড়া কান্নায় হোমরাচোমরা লোকটা কেমন হকচকিয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু করে বলল, “ না গো খুকু, না গো খোকা, তোমাদের ধরবও না, মারবও না। না না, কাঁদে না। খোকা আমার, খুকি আমার, কাঁদে না। এই দ্যাখো না, সেই কবে থেকে খোকাকে খুঁজতে বেরিয়েছি, আজও খোকার খোঁজ পেলাম না।”
খোকার কথায় পিকুর কান্না থেমে গেল। হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার খোকা শিং পাখি ধরতে এসেছে বুঝি? আমাকে দুটো শিং পাখি দেবে?”
“দোব, দোব। শিং পাখি দোব, টিয়াপাখি দোব, ডাহুক পাখি দোব, নীলকণ্ঠ পাখি দোব—সব পাখি দোব। আমার খোকাকে খুঁজে দাও আগে।”
লোকটার কথা শুনতে শুনতে ভয় কখন পালিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি টুসি। সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, “সব পাখি দেবে? টিয়াপাখি? নীলকণ্ঠ পাখি? স-ব?”
“হ্যাঁ, সব। এই বাগানটাই দিয়ে দোব তোমাদের। আমার খোকাকে খুঁজে দাও।”
“তোমার খোকা কোথায় আছে? পাখি ধরছে বুঝি?”
“পাখি! না তো। সে তো ঘুমাচ্ছে।”
টুসি ফিক করে হেসে ফেলল। “এ মা! বাগানে কেউ ঘুমায় নাকি? বাগানে তো বিছানা নেই। বাড়িতে ঘুমায় না কেন? ও বুঝি খুব দুষ্টু? বাড়িতে না ঘুমিয়েই চলে এসেছে?”
“না তো। ও তো ইচ্ছে করে ঘুমায় নাই। আমিই ওকে ঘুম পাড়িয়েছি। ও তো অনেকবার বলল, ‘বাবা, আমি গো, আমি। তোমার মানিক।’ আমি ভাবলাম শেষ বেলায় সবাই অমন বাবা বলে ডাকে। যমকে যে জীবনের খুব ভয়। শেষ ঘুমের আগে সব জীবনই যমকে বাবা বলে। সবাই তো বলেছিল। একে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তারপর মুখোশে ঢাকা মুখ। বু-বু, ব্যা-ব্যা করে বা-বা করলে ক’বার। সবার মুখেই তো এমন কথা শুনে এলাম এতদিন। দিলাম তাই ঘুম পাড়িয়ে ওকে।”
“এ মা, তুমি কী দুষ্টু! অমন মাটিতে কাউকে ঘুম পাড়াতে আছে? শক্ত মাটিতে ঘুমালে ওর পিঠে লাগবে না বুঝি? ওর ঘুম পায়নি, তাই বাড়িতে ঘুমায়নি। তাই বলে জোর করে বাগানে ঘুম পাড়াতে হয়? ওই জন্যেই ঘুম থেকে উঠে লুকিয়ে পড়েছে। তোমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। তোমার ওপর খোকা খুব রেগে আছে। বাড়িতে গিয়ে মাকে বলে তোমায় বকুনি খাওয়াবে, দেখো।”
“খোকার মা তো বকেই দিয়েছে আমাকে। সকালে বাড়িতে গেলাম অনেকদিন পর। ভাবলাম খোকার মা খুশি হয়ে একটু যত্নআত্তি করবে। বেশ তোয়াজ করে খাওয়াবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। আমাকে দেখেই খোকার মা মুখ থুবড়ে পড়ল এসে পায়ের কাছে। কান্না আর থামে না। পা ধোয়াতে গারুড় জল লাগল না। চোখের জলেই ধুয়ে গেল পা। ব্যাপার কী ভেবে পাই না। মনে ভাবলাম, অনেকদিন পর ফেরা কিনা তাই এত রোদন।
“খোকার মাকে তুললাম ধরে। সে আবার পড়ল পায়ের ওপরে। মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলল, ‘খোকা ফেরে নাই ঘরে।’ রায়বাবুদের সঙ্গে খোকা গিয়েছিল ভুবনডাঙার হাট। রায়বাবুর নাতনির মুখেভাতের বাজার করতে। রায়বাবু ফেরেন নাই। ফেরে নাই ওই মুখুজ্যে-বাড়ির মেজছেলে আর আমার মানিক। মানিকই তো ছিল রায়বাবুর গাড়োয়ান। আমি আর ঘরে ঢুকি নাই, খুকু। খোকার মাকে উঠোনে রেখেই চলে এলাম খোকার খোঁজে। সেই থেকেই খুঁজছি তো।”
অবাক হল টুসি। তার মানে ওর খোকা রায়বাবুদের গাড়ি চড়ে ভুবনডাঙার হাটে চলে গিয়েছিল। তাহলে তো খাওয়াও হয়নি কিছু। নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে। টুসি বলল, “তোমার খোকার নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে। সেই জন্যেই রাগ করে লুকিয়ে আছে। সাড়া দিচ্ছে না তোমাকে। রায়বাবুও খেতে দেয়নি। হয়তো দেখতে পায়নি তোমার খোকাকে। বকা খাওয়ার ভয়ে তোমার খোকাও দেখা দেয়নি রায়বাবুকে। এই দেখো, আমার কাছে আচার আছে। দেবে চলো। ঠাম্মির বানানো আচার খেলে সব রাগ কমে যাবে।”
“সে আর কিছু খাবে না গো, কিছু খাবে না।”
“তোমার খোকার খুব রাগ বুঝি? তাহলে ওর মাকে আনোনি কেন? মাকে দেখলে ছেলেদের সব রাগ কমে যায়। এই পিকুকে দেখো না। আমার সঙ্গে খেলতে খেলতে যতই রাগুক, যতই কাঁদুক, মায়ের কোলে উঠলেই সব ঠাণ্ডা। আমারও তো তাই। পিকু মারলে খুব রাগ হয়। কেঁদেও ফেলি মাঝে মাঝে। কিন্তু মা এসে মাথায় হাত বোলালে রাগটা কোথায় পালিয়ে যায় বুঝতে পারি না।”
“না গো খুকি, ও তো রাগ করে নাই। তবুও খায় না। কথা বলে না। বাবা বলে ডাকে না। ও যে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছুতেই ভাঙছে না ঘুম। সেই কবে থেকে ডাকছি।”
“হ্যাঁ, তুমি তো বললে, খোকার মা বলেছে খোকা রাতে বাড়ি ফেরেনি। রাতে ভয় করেনি বাগানে থাকতে? মশা কামড়ায়নি? পিকু তো একলা বাথরুমেই যেতে পারে না।”
লোকটা হো হো করে হেসে উঠল। “ভয়! খিদে! আমার খোকার কিছু পায় না। খোকা ঘুমিয়ে আছে যে। কিছুতেই ঘুম ভাঙছে না। কত ডাকলাম! কত খুঁজলাম! ও খুকু, ও খোকা, দাও না খুঁজে! আমার খোকাকে খুঁজে দাও না।”
“বেশ চলো, তোমার খোকা কোনদিকে আছে দেখি। আমরা ঠিক খুঁজে আনব। তুমি পিছনে থাকবে। নয়তো তোমাকে দেখলে যদি আবার পালিয়ে যায়! আমরা তোমার খোকাকে ঠিক বুঝিয়ে দেব। ঠাম্মির হাতের আচার খেলে সব রাগ কমে যাবে, দেখো। আমাকে কিন্তু পাখি দিতে হবে। টিয়াপাখি, শিং পাখি।”
“সব দোব গো খুকু, সব দোব। বাগানে যা আছে সব দোব।”
হঠাৎ পিকু বড়ো অর্জুনগাছটার ডালের সঙ্গে বাঁধা একটা দড়ির মই ঝুলতে দেখল। “দিদি, দেখ দেখ দোলনা।”
বলতে বলতে পিকু দৌড়ে গেল মইটার কাছে। পিকুর দেখাদেখি টুসিও দৌড়ে গেল সেখানে। ওই মই বেয়ে উঠে যাওয়া যায় গাছের উপরে। গাছের দুটো মস্ত শাখায় তক্তা বেঁধে মাচা তৈরি করা হয়েছে। ওখানে দিব্যি বসা যায়, খাওয়া যায়, শোয়াও যায়। পিকু জিজ্ঞেস করল, “ওখানটায় কী আছে?”
“ওটাই আমার আদ্যিকালের ঘর। সাগরেদ নিয়ে ওখানেই থাকতাম। ছ’মাসে ন’মাসে ফিরতাম ঘরে। এখন তো কেবল বাগান দেখছ। তখন পুরোটাই ছিল জঙ্গল। যমও এদিকে আসার সাহস পেত না। আমি তখন যমের বাবা।”
এদিক পিকু মই বেয়ে উঠে গিয়েছে মাচার উপরে। সেখানে কয়েকটা কালো কাপড়ের খোল আর রেশমের ফিতে পেয়ে পিকু তো বেজায় খুশি। “দিদি, কী পেয়েছি দেখ! এই ঝোলাতে শিং পাখি ভরব। ফিতে দিয়ে বেঁধে দেব মুখ।”
বলতে বলতে তরতর করে নেমে এল মাচা থেকে। লোকটা হা হা করে উঠল। “ও খোকা, করো কী! করো কী! ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না! ফেলে দাও। ওগুলো দেখলে আমার খোকা আর ফিরে আসবে না। আমি সেই যে ফেললাম, আর ছুঁই না।”
টুসি বলল, “বুঝেছি। তুমি ওগুলো দাওনি বলেই খোকার এত রাগ তোমার উপর। কেমন বাবা তুমি! জানো না, খোকারা যা চায় দিতে হয়? এগুলো তো আর এমন কিছু দামি নয়। খোকারা তো আর দাম বোঝে না।”
“না গো খুকি, ওর জন্যেই খোকা আমার ঘুমিয়ে গেল যে।”
“চুপ! তখন থেকে ঘুম ঘুম করছে। চুপ করে পিছনে এসো। কেন, ঘুমিয়ে আছে তো নিয়ে যেতে পারছ না বাড়ি? পিকু ঘুমালে বাবা তুলে শুইয়ে দেয় খাটে। আমাকেও দেয়।”
“ওকে যে তুলতে পারি না!”
হো হো করে হেসে উঠল টুসি। ভারি মজার ব্যাপার। লোকটা বলে কী! বাবা হয়ে তুলতে পারে না ছেলেকে। টুসি বুঝতে পারছে, এইজন্যেই খোকার এত রাগ। এমন বাবাকে কোন খোকা ভালোবাসবে? লোকটার দিকে ফিরে বেশ গম্ভীর গলায় বলল, “এ মা! কেমন বাবা গো তুমি? নিজের ছেলেকে তুলতে পার না? আমার বাবা তো আমাদের দু’জনকে একসঙ্গেই কোলে নেয়। এইজন্যেই তোমার ছেলে তোমাকে সাড়া দিচ্ছে না। ছেলেকে কোলে নিতে পারে না সে আবার কেমন বাবা?”
পিকু বলল, “চল দিদি, আমরা যাই। আচার দিয়ে ভাব করব। ঠাম্মির আচার খেলে ঠিক ভাব করে নেবে আমাদের সঙ্গে। তখন সবাই মিলে শিং পাখি ধরব। চল চল।”


ছয়


পিকু পা বাড়াল সামনে। টুসি টেনে ধরল তার হাতটা। “ভাই দাঁড়া। তুই কি জানিস কোথায় ওর খোকা আছে?”
“ওই তো, ওইদিকে। ওই নদীর চরে। এপথ ধরে কতবার শুধু গেলাম আর এলাম। খোকা তবুও জাগল না।”
“তুমি কতবার ডেকেছ তোমার খোকাকে?”
“তা ন’ কুড়ি দশ কুড়ি বছর তো হবেই। সেই দশ কুড়ি বছর ধরে যাচ্ছি আর আসছি।”
পিকু খিলখিল করে হেসে উঠল। “তুমি এক দুই গুনতে পার না?”
“না। পারি না তো। আমরা যে এক দুই পড়ি নাই।”
“এ মা! তুমি স্কুলে যাওনি? আমরা কিন্তু স্কুলে যাই। ছড়া পড়ি। চন্দ্র পড়ি। নামতা পড়ি, অঙ্ক কষি। পিকু অ-আ পড়ে। তুমি এত বড়ো, আর একে চন্দ্র শেখোনি?”
“না খুকি। আমাদের ইস্কুল ছিল না, চন্দ্র ছিল না, নামতা ছিল না, পেটের খাবারও ছিল না। ছিল শুধু খিদে। খিদে মেটাতেই তো স্যাঙাত জুটিয়ে দল গড়লাম। আর দলবেঁধে এখানে এসে সবাইকে ঘুম পাড়ালাম।”
“সবাইকে ঘুম পাড়ালে! কাকে কাকে গো?” জিজ্ঞেস করল পিকু।
“সে অনেক। ওই তোমার নতুন বউ, পুতুলনাচের অধিকারী, আর সাগরেদ, তিন মোড়ল, সাত বামুন, গোটা পাঁচেক দারোগা। তারপর তোমার সাহেব, মেম, রায়বাবু, খাজাঞ্চিবাবু আর সবার শেষে আমার মানিক।”
পুতুলনাচের কথায় টুসি লাফিয়ে উঠল। “কোথায়? কোথায় পুতুলনাচ? আমাকে দেখাবে?”
“হ্যাঁ, সব দেখাব। আগে আমার খোকাকে খুঁজে দাও। তাহলে পুতুলনাচ দেখতে পাবে, নতুন বউ দেখবে। রায়বাবুর নাতির মুখেভাত হবে। রায়বাবুর বস্তা বোঝাই খাসকান্দির চাল, নলেন গুড়, বস্তা বস্তা ময়দা, টিন টিন ডালডা, বিলিতি দুধ, চিনির বস্তা সব আছে। কাঁড়া মোষের ঠাসা বোঝাই গাড়ি। মানিকই তো চালাচ্ছিল গাড়ি।”
কেমন একটা খটকা লাগল টুসির। মানিক চালাচ্ছিল মোষের গাড়ি? মানিক তার মানে বড়ো? “তোমার মানিক বুঝি মোষের গাড়ি চালায়? তবে তো সে বড়ো! তাহলে খোকা বলছ যে?”
“খোকাই তো! তোমরা যে মা-বাবার চিরকেলে খোকাখুকু।”
“তাহলে তোমার খোকা গাছে উঠে পাখি ধরতে পারবে। ইস, কী মজা!” উল্লাসে লাফিয়ে উঠল টুসি। “চলো চলো, তোমার খোকাকে আগে খুঁজে আনি, চলো।”
পিকু ধরল অন্য বায়না। সে দেখবে পুতুলনাচ। পুতুলনাচ দেখা হলে নতুন বউ দেখবে। তারপর খোকাকে খুঁজে এনে মুখেভাতের ভোজ খাবে। টুসি বলল, “ভাই, সাহেব দেখবি না? আর মেম? ওরাও ঘুমিয়ে আছে যে। তখন বলল যে।”
লোকটা মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে কান্না জুড়ে দিল। তাকে কাঁদতে দেখে পিকু তো অবাক। মুখে বলেই ফেলল, “দেখ দেখ দিদি, আধবুড়ো লোকটা কেমন কাঁদছে দেখ।”
লোকটা কান্নাভেজা গলায় বলল, “কাঁদব না! তোমরা আমার খোকাকে না ডেকেই পুতুলনাচ দেখবে, নতুন বউ দেখবে। আমি কাঁদব না?”
“বড়োরা কাঁদে নাকি? কাঁদে তো ছোটোরা! তোমার খোকা শুনলে হয়তো কাঁদত। এখন দেখছি খোকার বদলে তুমিই কাঁদছ। আর তুমিই তো বলেছ, তুমি ওদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছ। তোমার খোকা ঘুম থেকে উঠলে দেখিও। এখন আমাদের দেখিয়ে দাও।”
“না খোকা। বারবার জাগালে অধিকারী যদি রেগে যায়! একে তো আমার উপর বেজায় চটে আছে। ঘুম যেই পাড়াক, সর্দার তো আমি। আমাকে দেখলেই জ্বলে উঠবে।”
টুসি জিজ্ঞেস করল, “কেন? তোমাকে দেখলে রাগবে কেন? তুমি তো এসেছ খোকাকে খুঁজতে। তাহলে পুতুলনাচের দল রাগবে কেন? আর যদি রাগেও আমরা বুঝিয়ে বলব। ঠাম্মির আচার খেলে সব রাগ কমে যাবে। ওরা যখন আচার খাবে তখুনি বলব যে ওর, হ্যাঁ, তোমার নাম কী বলো তো। নাম না বললে তো বুঝতে পারবে না আমরা কার কথা বলছি। তোমার নামটা বলে দাও, আমরা ঠিক বুঝিয়ে বলে দেব। ঠাম্মির আচার খাবে তো। আচারের স্বাদে তোমার ওপর সব রাগ কমে যাবে।”
“বাপ-মায়ের দেওয়া নাম আমরা সবাই ভুলে গেছি। সেটা আমারও আর মনে নেই। তবে দশ কুড়ি বছর ধরে লোকে আমাকে ঠগি বলে ডাকে। সেই যে বেন্টিং সাহেব আমার গদ্দান নিলে, সেই থেকেই তো রয়ে গেলাম বাগানে। আমাদের নামের সঙ্গে বাগানটারও নাম হয়ে গেল ঠগির বাগান।”
টুসি বলল, “ঠাম্মি যে বলে টিয়া বাগান!”
“ওই হল আর কী। তোমার ঠাম্মির তো বয়স কম, তাই।”
টুসি হেসে উঠল। লোকটা বলে কী? ঠাম্মি নিজেই তো বলে, ‘আমার বয়সের গাছপাথর নেই।’ আর এই লোকটা বলে কিনা বয়স কম! ঠাম্মির সব চুল পাকা। অর্ধেক দাঁত নেই। চোখেও ভালো দেখে না। এই অসুরটার থেকে ঠাম্মির বয়স কম হয় কী করে? ঠাম্মিই ঠিক। এটা টিয়া বাগান। লোকটা ডাহা মিথ্যে বলছে। পুতুলনাচ দেখাবার ভয়ে ঠকাতে চাইছে আমাদের। ভেবেছে ছোটো তো, যা বলবে মেনে নেব।
“না না, ওসব হবে না। ওসব বলে ভোলানো যাবে না। আগে পুতুলনাচ দেখাও, তারপর খুঁজে দেব খোকাকে।”
“ও খুকি, রাগছ কেন! আমি কি তাই বলেছি? সব দোব গো, সব দেখাব। ভোজ তো খাবেই। গাছে গাছে ফল আছে, সব ফল তোমাদের দোব। আগে আমার খোকাকে...”
ফলের কথায় লাফিয়ে উঠল পিকু। “নোনা ফল আছে?”
“হ্যাঁ, আছে। সব আছে এখানে। ওই পুবদিকে আমবন। পশ্চিমে জাম বাগান। উত্তরে তেঁতুল বন, তার পাশে জামরুল বন। তার ডাইনে কাঁঠাল বাগান। তার পুবে নারকেল সারি। ওর পাশে বেলতলা। দক্ষিণে তার আতার বাগান। আতার পুবে কয়েতবেল। তার সামনে আঁশফল। ঠিক তার পাশেই খেজুর আর জিলিপি।”
ফলের কথা শুনে পিকু হাততালি দিয়ে নেচে উঠল। “চলো চলো, নোনা গাছটা দেখাবে চলো।” বলে পিকু দৌড়তে যাবে, পিছন থেকে টুসি তার হাতটা টেনে ধরল। “না ভাই, আগে পুতুলনাচ দেখব। নতুন বউ দেখব। তারপর যাব খোকাকে খুঁজতে। তখন তো নোনা বাগান পাবই।”
পিকু ভাবল দিদি ঠিকই বলেছে। নতুন বউটাই আগে দেখতে হবে। নোনা ফল তো গাছেই থাকবে। “চল দিদি, বউ দেখব চল।”
টুসি আর পুতুলনাচের জেদ ধরল না। ওটা তো হবেই। তার আগে বউটা দেখে নেওয়া যাক। লোকটা আর কী করে? তার এখন খালে পড়া বোঝাই গাড়ির বলদের অবস্থা। গাড়ি যখন গাড্ডায় পড়েছে তুলতে তো তাকেই হবে। তাই অনিচ্ছুক বলদের মতো ব্যাজার মুখে টুসি-পিকুর রশির টানে পা রগড়ে এগোতে লাগল।


সাত


কিছুদূর এসে থেমে গেল লোকটা। তাকে থামতে দেখে টুসি জিজ্ঞেস করল, “কী হল, থামলে যে? বউ দেখাবে না?”
“তোমরা যাও খুকি। ওই যে অশ্বত্থগাছটা দেখছ, ওখানে গিয়ে ডাক দিলেই বেরিয়ে আসবে নতুন বউ।”
“সে কী কথা! আমরা না অচেনা! আমাদের ডাকে বেরিয়ে আসবে কেন?”
“অচেনা বলেই তো আসবে। আমাকে দেখলেই বেধে যাবে গোল। চিনে নিয়েছে যে। মুখে ঢাকনাটা পরানোর আগে প্যাট প্যাট করে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। চোখদুটো জলে ভাসলে কী হবে, ও ঠিক চিনে রেখেছে আমাকে। আমি আর ওদিকে যাব না। ওর কোঁচড়ে লুকোনো আছে কাজললতা। একবার যদি বার করতে পারত... মনে নাই, বাসরঘরে বেহুলা কী করেছিল? কাজললতা ছুড়ে কালনাগিনীর লেজটাই দিয়েছিল কেটে। ও-মেয়েও কি ছাড়বে আমাকে? আস্ত কাজললতাটাই ঢুকিয়ে দেবে পেটে। আমি বরং ওই গাছের আড়ালে বসি। তোমরা যাও, ডাক দাও, দেখবে ঠিক বেরিয়ে আসবে নতুন বউ। তবে হ্যাঁ, বউটাকে আমার কথা বোলো না যেন!” বলে লোকটা মস্ত একটা গাছের আড়ালে লুকোল। ওরাও এল তার পিছু পিছু। পাশেই পড়ে ছিল একটা হাতল ভাঙা পালকি। লতাতে আগাছায় পালকিটা ঢেকে গিয়েছে।
পিকু আগে কখনও পালকি দেখেনি। পালকিটা তার নজরে পড়তেই জিজ্ঞেস করল, “ওটা কী, দিদি?”
সঙ্গে-সঙ্গেই লোকটা গাছের আড়াল থেকে বলে উঠল, “ওটা করেই তো যাচ্ছিল গো বর আর বউ। ছয় বেয়ারা ডাক দিচ্ছিল, হেইও হেইও। ওই মাঠের সীমানা দিয়ে যাচ্ছিল নতুন বউ বরের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি। সূর্য তখন মাঝ আকাশে। বেয়ারাগুলো ভেবেছিল এখন তো গনগনে দুপুর, খটখটে রোদ চারপাশে, হেই সামালো হেই সামালো করতে করতে পেরিয়ে যাবে শিয়ালডাঙার মাঠ। কিন্তু হা রে রে রে করে যেই উঠলাম ডেকে, অমনি ছয় বেয়ারা ছিটকে গেল ছয় দিকে। বরের গেল কাছা খুলে। একহাতে ধুতির কাছা, অন্য হাতে নতুন বউয়ের হাত ধরে ঠ্যাং ভাঙা পাঁঠার মতো দৌড়ুচ্ছে। বেনারসির পাড়ে পা জড়িয়ে বউটা গেল পড়ে। গা-ভর্তি গয়না ঝমঝম করে উঠল। লাফ দিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম তার সামনে। আমার টাঙ্গি গোঁফ আর লাল চোখ দেখে কাছা খোলা বরের তো ভিরমি যাওয়ার অবস্থা। যেই তার ঘাড়ে ফেলেছি গরম একটা শ্বাস, অমনি ধুতি খুলেই দৌড় লাগাল বর। বউয়ের তখন বাঘের মুখে হরিণের দশা। আমার চোখদুটো তখন গয়নার জৌলুসে চকচক করছে। নতুন বউয়ের মুখটাও ভালো করে দেখি নাই। হাত দিয়ে খুলতে গেলাম গয়না, অমনি কানে এল, ‘বাবা, তোমার পায়ে ধরছি, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি।’
“অমনি দপ করে মাথার ভিতর জ্বলে উঠল আগুন। কেউ বাবা বললেই আমার এমন হয়, জানো! মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। চোখ দিয়ে বেরোয় আগুনের হলকা। খোলটা মুখে পরিয়ে দিলাম ফিতেটা গলায় পেঁচিয়ে।
“যাও না খুকু, বউ দেখে খোকাকে খুঁজে আনবে।”
টুসি বলল, “তার মানে তো নতুন বউ ঘুমোচ্ছে। ডাকলে কি উঠবে? যদি না ঘুম ভাঙে! থাক এখন, ওটা পরে হবে। চলো, আগে পুতুলনাচ দেখি।”
লোকটা চমকে উঠল। “না গো খুকু, পুতুলনাচ নয়। পুতুলনাচ নয়। নতুন বউকেই দেখে এসো আগে। ডাকলেই আসবে। শিগগির যাও, শিগগির যাও।”
লোকটার কথামতো পিকুকে সঙ্গে নিয়ে টুসি অশ্বত্থগাছটার দিকে এগিয়ে এল। কী আশ্চর্য! অশ্বত্থগাছটার গুঁড়িটার গাছে এসে ‘বউ! ও নতুন বউ!’ বলে ডাক দিতেই গা-ভর্তি গয়নার ঝমঝম শব্দ তুলে দু’হাতে বেনারসির ভার সামলাতে সামলাতে বেরিয়ে এল নতুন বউ। টুসি তো প্রথমে ওটাকে তার বেবি ডল ভেবেছিল। তার বেবি ডলকে মাঝে মাঝে অমনি করেই সাজায়। একটু ভালো করে দেখার পর তার ভুল ভাঙল—না, বেবি ডল নয়। কিন্তু এ কেমন বউ! এ তো তার মতোই প্রায়। একটু যদি বড়ো হয়। আহেলিদিদির থেকে তো বড়ো নয়। আহেলিদিদি ফোরে পড়ে। মা বলে, ‘আগে তো কলেজে পড়বে, তারপর না হয় বউ হবে, শ্বশুরবাড়ি যাবে।’ ফোরে পড়লে আবার কেউ বউ হয় নাকি? লোকটা তাকে ঠকিয়েছে।
পিকুর আবার অন্য ভাবনা। সে নতুন বউকে বেশ করে পরখ করে বলল, “এ দিদি, এ মেয়ে রে! তোর মতো মেয়ে রে দিদি। পিসি মেয়েও নয়, মাসি মেয়েও নয়। মামণি মেয়ে তো নয়ই। মামণির মতো মেয়ে না হলে বউ হয় নাকি? মামণিকে তো সবাই বউ বলে, ঘোষবাড়ির বউ।”
“না গো, আমি বউ। বাবা আমার বিয়ে দিয়েছে বরের সঙ্গে। তার সঙ্গেই শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলাম। এই দেখো না, বেনারসি পরেছি। আগে তো পরিনি কোনোদিন, পুতুল্কে পরাতাম। শাড়িটা কী ভারী! দু’হাতে ধরে রাখতে পারি না। তোমরাই বলো তো, শাড়ি সামলাব, না পুতুল সামলাব।”
“পুতুল!” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল টুসি।
“পালকিতে ওঠার সময় আমি তো খুব কাঁদছিলাম, মা এনে দিল শশীকে আর কালুকে। আমি তো রোজ ওদের বিয়ে দিতাম। শশী সাজত বউ, কালু সাজত বর। হি হি, পালকিতে বসে বসে ওদের সাজাচ্ছিলাম। শশী যাবে শ্বশুরবাড়ি। কী কান্নাই না কাঁদছে শশী! ঠিক তখনই পালকিটা পড়ল মাটিতে। জানো, শশীর মাথাটা না ভেঙে গেছে। কালু সেই যে কাঁদতে বসল, এখনও কাঁদছে। কিছুতেই ওর কান্না থামাতে পারছি না। আমাকে একটা পুতুল দেবে? শশী বানাব। কালুর সঙ্গে আবার বিয়ে দেব নতুন করে। তাহলেই কালু হাসবে। তোমরাও ভোজ খাবে। মস্ত ভোজ হবে যে। করমচা বিচির লুচি হবে, তেলাকুচির মাছ হবে, বটের আঠায় পায়েস হবে। তারপর ডাল, সন্দেশ, মিষ্টি—দাঁড়াও দাঁড়াও, কালুকে নিয়ে আসি আগে। ওর লোকেরাই তো বরযাত্রী, আর কী কী খাবে জিজ্ঞেস করি। আর হ্যাঁ, তোমরা তো আমার লোক। আমি তো কনের মা। সব দায় আমার। আমি তো ভাই বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকব, তোমাদেরকেই কাজকর্ম করতে হবে। রাঁধতে হবে, সবাইকে খাওয়াতে হবে। দেখো যেন বরযাত্রীদের আদরযত্নের কোনও ত্রুটি না হয়। তাহলে আমার শ্বশুরবাড়িতে চিরকাল কথা শুনতে হবে। ওইটুকু পুচকে মেয়ে, শ্বশুরবাড়ির কী বোঝে বলো? কিন্তু কী আর করি বলো। পাড়াপড়শিদের যা কথা, বয়স হল আট তো ছাড় বাপের ঘাট। মেয়ে হওয়ার যে কী জ্বালা! দাঁড়াও দাঁড়াও, শশীর বাবাকে আবার পাঠাতে হবে স্যাকরার কাছে। গয়নাগুলো আনাতে হবে তো। যা চোর-ডাকাতের ভয়! ঘরে রাখতে সাহস হয় না। এবেলায় না আনালে একটু পরেই সাজাতে হবে তো। তোমরা শশীকে দেখো, আমি ওদিকটা দেখি।”
নতুন বউ চলে গেল। টুসি পড়ল মুশকিলে। বিয়েবাড়ির কাজ, সে তো অনেক সময়ের ব্যাপার। তাহলে পুতুলনাচের কী হবে? ভোজের কাজে লেগে গেলে আর পুতুলনাচ দেখা হবে না। তার থেকে পুতুলনাচটাই আগে দেখে নেওয়া যাক। ভোজ রান্না ও-বেলা করলেও হবে। তাছাড়া ওর তো শশীটাই নেই। শশীকে আগে খুঁজতে হবে, তবে তো বিয়ে! আজ না হয় কাল হবে। বিয়েটা হলেই হল।


আট


টুসি ফিরে এল সেই লোকটার কাছে। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে টুসিকে দেখে লোকটা থতমত খেয়ে বলল, “অহ্‌, তোমরা? আমি ভাবলাম নতুন বউ এল বুঝি।”
“নতুন বউকে তোমার খুব ভয় বুঝি?”
“ভয় করবে না! যাচ্ছিল শ্বশুরবাড়ি, আমি পাঠালাম যমের বাড়ি। ও কি আমায় ছেড়ে দেবে ভেবেছ? কাজললতায় পেট দেবে এফোঁড়ওফোঁড় করে। আমার কথা বলো নাই তো?”
“না না, বলিনি। ওর তো পুতুলের বিয়ে হবে। রান্নাবান্না, বরযাত্রী খাওয়ানো সব আমাদের করতে হবে। চলো চলো, এইবেলা পুতুলনাচটা দেখে আসি।”
চমকে উঠল লোকটা। “পুতুলনাচ! আমি যাব! না না খুকি, আমি ওখানে যাব না। তোমরা যাও। অধিকারী বলে ডাক দাও, দেখবে পুতুলনাচ দেখিয়ে দেবে। ওই, ওইদিকে একটা পুকুর আছে। ওর পাশে বটতলাতে আছে পুতুলনাচের দল। সবক’টাকে পারি নাই। দলে ছিল সাত-আটজন। তিনজনকে রেখেছি। অধিকারী আর তার দুই সাগরেদ। টাকার পুঁটুলিটা ওদের কাছেই ছিল তো। বাকিরা পালিয়েছে যে যেদিকে পেরেছে। আমরাও আর ওদের ধরার চেষ্টা করি নাই। দলের গোদাকেই তো পেয়ে গেছি।”
“অধিকারী তোমাকে তো চেনে। চলো চলো। তুমি বললে ভালো ভালো খেলা দেখাবে।”
“উরি-ব্বাবা! গোলমাল তো ওখানেই। চিনে ফেলেছে যে। যমকে কি কেউ ভুলতে পারে? একবার দেখতে পেলেই হল। শাবল-কুড়ুল-কোদালের কোপে দেবে আমাকে কুচিকুচি করে। ভাগ্যিস ওগুলো বস্তায় ভরে রাখা ছিল সবার নিচে। গাড়ি বোঝাই ছাউনির মালপত্র। পেত যদি হাতের কাছে ওগুলোকে...”
টুসি দেখল লোকটার বকবকানি শুনে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। নতুন বউ তো বেরিয়ে এল তার ডাকে। অধিকারীও বেরিয়ে আসবে। পিকুকে সঙ্গে নিয়ে টুসি এল পুকুরপাড়ে। পুকুরটা বেশ বড়ো। পুকুরের জলে সাঁতার কাটছে জলপিপি। পিকু বলল, “দিদি, একটা জলপিপি ধরবি?”
“ধরব তো। লোকটা বলেছে না খোকাকে খুঁজে দিলে বাগানের সবকিছু আমাদের দিয়ে দেবে?”
পিকু দৌড়ে গেল জলের কাছে। “আয় না দিদি, ওদের একটু আদর করি।”
টুসি ধমকে উঠল, “না, এখন নয়। চল আগে পুতুলনাচ দেখি।”
ভ্যা করে কেঁদে উঠল পিকু। টুসি হাঁক পাড়ল, “অধিকারী! ও অধিকারী!”
আশ্চর্য! টুসির হাঁক শেষ হতেই আলাদিনের প্রদীপ বন্দী দৈত্যের মতো অধিকারী হাজির হল দুই সাগরেদকে সঙ্গে নিয়ে। “এসো খুকু, এসো খোকা। ময়নামতির পুতুলনাচে তোমাদের স্বাগত। কোন পালা দেখবে বলো।”
“পুতুলনাচের আবার পালা হয় নাকি!”
“সে কী কথা! পুতুলনাচের পালা থাকবে না কেন? যাত্রাগানের পালা হয়, কবিগানের পালা হয়, পঞ্চরসেও পালা হয়। পুতুলনাচের পালা হবে না!”
পিকু বলল, “জুরাসিক পার্ক হবে?”
পিকুর কথায় অধিকারী যেন আকাশ থেকে পড়ল। “জুরাসিক পার্ক? সেটা কী জিনিস, খোকা?”
“এ মা, ডাইনোসর জানে না! তবে কী জানো? অ্যানাকোন্ডা, ভূত আঙ্কেল? ছোটা ভীম? ডোরেমন? চ্যাঙ্কুলি কি ম্যাঙ্কুলি?”
পিকু এক এক করে বলে যায়, অধিকারী হাঁ করে চেয়ে থাকে তার মুখের পানে।
টুসির কথায় সম্বিৎ ফেরে অধিকারীর। “কী পালা আছে তোমাদের কাছে?”
“আমরা সাবিত্রী সত্যবান দেখাতে পারি। বেহুলা লখিন্দর দেখাতে পারি। তারপর তোমার হরিশ্চন্দ্র, ভক্ত প্রহ্লাদ, যযাতি দেবযানী, লায়লা মজনু, রাইকিশোরী নিমাই সন্ন্যাস...”
একটা পালাও টুসির মনঃপূত হল না। পিকু বলল, “মহাভারত! মহাভারত দেখাবে না?”
“ওরে বাবা! সে তো বিরাট ব্যাপার। তবে আমরা দুর্যোধন বধ, কর্ণ বধ এসব পালা দেখাতাম। কিন্তু এখন আর ওসব পালা দেখাতে পারি না। হাতি, ঘোড়া, রথ আর সৈন্যসামন্ত যাদের কাছে ছিল সে ব্যাটারা সব পালিয়েছে। গদাদুটো ছিল আমাদের কাছে। এক বদমাশ ধস্তাধস্তি করে একটা গদা ভেঙে ফেলল। ওটা থাকলেও দুর্যোধন বধটা দেখাতে পারতাম। একটা গদায় তো আর যুদ্ধ হবে না। ভীমের গদাটাই ভেঙেছে যে।”
পিকু মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, “লোকটাকে আমরা...”
সঙ্গে সঙ্গে টুসি হাত দিয়ে চেপে ধরল পিকুর মুখ। চাপা গলায় বলল, “এ ভাই! সর্বনাশ করেছিলি, এখুনি। লোকটার কথা খবরদার বলিস না। তাহলে আর পুতুলনাচ দেখাবে না, চলে যাবে ওকে মারতে।”
পিকু ফিক করে হেসে ফেলল। শেষে মুখ থেকে হাসিটা মুছে ফেলল, “ইস, আগে বলবে তো! আমার বাড়িতে গদা আছে, হনুমানের গদা। বাপি কিনে দিয়েছে দক্ষিণেশ্বরে। ওটা দিয়ে তো ভীম মারতে পারবে দুর্যোধনকে। আমি নিয়ে আসব কালকে। তখন হবে ওই যুদ্ধটা। এখন চাঁদের পাহাড়টা দেখাও তো।”
“চাঁদের পাহাড় কী গো, খোকা?”
“তোমার কেমন পুতুলনাচ! চাঁদের পাহাড় জানো না? শঙ্কর আগুন দেখবে, বুনিপ মারবে। সিংহের সঙ্গে লড়াই করবে।”
“সিংহ তো আমাদের নেই খোকা। তবে একটা বাঘ আছে। ওই বাঘ নিয়ে শের আফগান পালা হত।”
“তবে ওটাই দেখাও। বাঘের লড়াইটাই দেখি।”
“বাঘ তো আর লড়তে পারবে না। ওর একটা পা দিয়েছে ভেঙে। ওই, সেই বদমাশ লোকটা। লোকটাকে যদি একবার সামনে পাই না!”
পিকুর মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, “আমরা দেখে...”
অমনি টুসি তার মুখটা চেপে ধরল।
পিকু মুখ ফিরিয়ে ফের একবার ফিক করে হেসে বলল, “ওই পা ভাঙা বাঘের লড়াইটাই দেখাও।”
“তা কী করে হয়, খোকা? শের আফগান তো আধমরা বাঘ মারেনি। মেরেছিল ভয়ংকর তেজি একটা বাঘ। তোমরা পা ভাঙা বাঘের সঙ্গে শের আফগানের লড়াই দেখে সবাইকে বলবে, শের আফগান? সে আর কী এমন বীর? মেরেছিল তো একটা আধমরা বাঘ। একবার ভাবো তো, আমার বীর আফগানের কী দশা হবে।”
“তাহলে কী দেখাবে?”
“আগে আনারকলি পালাটা দেখাতাম। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে ওটা আর দেখাই না। ওটা দেখাতে গেলে আমার কান্না পায়। আহা! আনারকলি, আনারকলির মতোই ওই একরতি বউটাকে আমার চোখের সামনে বদমাশটা...” অধিকারীর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।
“ঠিক আছে, তোমাকে আনারকলি পালা দেখাতে হবে না। নেতাজির পালা দেখাও।”
“নেতাজি আবার কে? তাঁকে তো আমি চিনি না, খোকা।”
“তুমি কী গো? তুমি তো কিছুই জানো না দেখছি। তবে যা দেখাবে দেখাও।”
“তাহলে ভীষ্ম বধের পালাটা দেখাই? শরশয্যায় ভীষ্ম শুয়েই আছে।”
শরশয্যার কথা শুনে পিকু কেঁদে উঠল। এমন ভালো একটা দাদুকে তিরবিদ্ধ করে মেরে ফেলা পিকু দেখতে পারবে না। মারতে হবে বদমাশদের। ভালোরা কেন মারা পড়বে? বদমাশ হল দুর্যোধন আর শকুনি। প্রহার করে মারতে হবে ওদের। তবেই তো ভীষ্মদাদুর স্নেহচ্ছায়ায় সবাই ভালো থাকবে। ভীষ্মদাদু কেন মরবে! ভীষ্মদাদুর মৃত্যু যে পিকু মানতে পারে না কিছুতেই।
ঠিক হল ‘দুর্যোধন বধ’ পালাটাই দেখাবে অধিকারী। গদা সমস্যার সমাধান পিকুই করে দিল। দুর্যোধনকে গদা দেওয়ার দরকার নেই। গদা পেলে যদি ভীমকে মারে! ওটা যে ভীষণ দুষ্টু। গদা থাকবে ভীমের হাতে। তবেই ভীম ওই বদমাশটিকে আচ্ছাটি করে মারতে পারবে। আর তাতেই পিকুর শান্তি।
পালা তো শুরু হবে। গোল বাধল বাজনা নিয়ে। বাজনা না বাজলে যুদ্ধটা যে জমবে না। গাছে গাছে জ্বলে উঠেছে জোনাকির আলো। আকাশে উঠেছে চাঁদ। চাঁদের আলোয় ঘাসজমিটা ঝকঝক করছে। ঝিকিমিকি ঢেউ উঠছে জলে। রণাঙ্গন প্রস্তুত। প্রস্তুত কুশীলবরাও। কিন্তু বাজনা ছাড়া যুদ্ধটা হয় কী করে! বুদ্ধিটা খেলে গেল পিকুর মাথায়। ডিবেটা দেখিয়ে টুসিকে বলল, “দিদি, ওই কৌটাটাকেই তো আমি বাড়িতে ঢোল বাজাই। ওটাই বাজাই?”
“তাহলে আচারটা কী হবে?”
আচারের নাম শুনে অধিকারীর জিভে জল এসে গেল। “তোমরা আচার এনেছ বুঝি? ওই জন্যই ভাবি, এত মিষ্টি গন্ধ আসে কোথা থেকে। এখনও তো আম পাকেনি গাছে। কই, দাও দাও, আচার দাও। ওটা খেয়েই শুরু করব পালা।”
টুসি বলল, “গন্ধ হবে না? আমার ঠাম্মির আচার। রোদে শুকোতে দিলে গোটা পাড়া আচারের গন্ধে ম ম করে। ওই গন্ধেই না এই বাগানের টিয়াগুলো উড়ে গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে!”
“কই, দাও দাও। মুখটা জলে ভরে গেল যে।”
“দাঁড়াও, দিচ্ছি। অমন হ্যাংলাপনা কোরো না তো। হ্যাংলা লোক আমার একদম ভালো লাগে না।”
“হ্যাংলাপনা করব কেন? তোমরা তো টিকিট কাটোনি। পুতুলনাচ দেখতে টিকিট লাগে সেটা জানো না? অনেকদিন দর্শক আসেনি, তাই কিছু বলিনি তোমাদের। দাও, ওই আচারটা দাও। ওতেই হবে।”
“সবটা দেব না কিন্তু। আমরা একটু খাব, তোমরা একটু খাবে। এই নাও, ধরো। আচার খেয়ে ভালো করে পুতুলনাচ দেখাতে হবে।”
“ও কী আচার গো! এমন আচার আমি বাপের কালেও খাইনি। আমার কালে আম গড়াত উঠোনে, আম গড়াত পথের ধুলোয়। এমন খাসা আচার কিন্তু কেউ বানাতে পারত না।”
“হু হু! কে বানিয়েছে দেখতে হবে না! আমার ঠাম্মির আচার যে একবার খায়, সে হ্যাংলার মতো বারবার চায়। তুমি আবার চেয়ে বোসো না যেন। এখন আর দিতে পারব না, সে অন্যদিন হবে। ঠাম্মি যখন ঘুমাবে, তখন।”
“তা বেশ বেশ। তবে দিও কিন্তু। তোমরা যত আচার খাওয়াবে আমার হাতের কেরামতি ততই বেড়ে যাবে। নাচবে পুতুল তুল তুল তুল। যুদ্ধ হবে গম গমা গম। ছুটবে ঘোড়া টগ বগা বগ।”
“আচার তো খেলে, এবার পুতুল নাচাও দেখি।”
শুরু হল পুতুলনাচ। ভীম ছাড়ল হুঙ্কার। কেঁপে উঠল বনস্থলী। দুর্যোধন ভয়ে দিল দৌড়। ভীম ছাড়ার পাত্র নয়। হনুমানের মতো লাফ দিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। শুরু হল প্রহার। ভীম তার মস্ত গদা দিয়ে প্রচণ্ড প্রহার করে দুর্যোধনকে। পিকু বাজায় ঢোল। ভীমের গদা যত জোরে আঘাত করে দুর্যোধনকে, পিকুর লাঠি তেমনি করেই প্রহার করে ডিবেটাকে। এত জোরে আঘাত করেও পিকুর মনের রাগ আর কিছুতেই মিটতে চায় না। গদার আঘাতে দুর্যোধনের শরীর কাচের মতো টুকরো টুকরো হলে তবেই তার শান্তি।
তাই হল। গদার প্রহারে দুর্যোধনের ঊরু গেল ভেঙে। বেচারা দুর্যোধন ঊরু ভাঙার যন্ত্রণায় যত কাতরাতে থাকে ততই গর্জন ছাড়ে। পিকুর প্রহার বাড়তে থাকে ততোধিক। প্রহারে প্রহারে জর্জরিত ডিবেটা একসময় ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। থেমে যায় বাজনা। দুর্যোধনের আর্তনাদ কিন্তু থামে না। অধিকারী বলল, “খোকাখুকু, এবার হাফ-টাইম। তোমরা হাফ-টাইম সেরে এসো। ভীম একটু বিশ্রাম নিক। প্রহার করে করে ও-বেচারা বড্ড ক্ষেপে উঠেছে। ঘাম না শুকোলে দুর্যোধনকে মারতে পারবে না।”
পিকু বলল, “তোমার কাছে টুনটুনমাসির লাড্ডু নেই? টুনটুনমাসির একটা লাড্ডু খেয়ে ছোটা ভীম এক ঘুসিতে সিংহ মারে। ভীমকে দাও একটা। টুনটুনমাসির লাড্ডু দাও।”
টুনটুনমাসি, ছোটা ভীমের কথা শুনে অধিকারী হকচকিয়ে গেল। একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমরা এখন এসো দিকিনি বাপু। আমার এখানে টুনটুনমাসিও নেই, আর ভীমও লাড্ডু খাবে না। ও এখন জল খাবে।”


নয়


পুতুলনাচের আসর থেকে উঠেই পিকু কান্না জুড়ে দিল। “অ্যাঁ অ্যাঁ, আমি মা যাব! আমার খিদে পেয়েছে।”
খিদের নাম শুনে টুসির পেটটাও কেমন কুঁইকুঁই করে উঠল। তখনই মনে পড়ে গেল রায়বাবুর নাতনির মুখেভাতের কথা। তাই তো! রায়বাবুর নাতনির মুখেভাত আছে যে। খিদেটাও পেয়েছে জাঁকিয়ে। এই ফাঁকে ভোজটা খেয়ে নেওয়াই ভালো। ও-বেলায় আবার নতুন বউয়ের পুতুলের বিয়ে। বিয়ের কথায় মনে পড়ল, নতুন বউয়ের তো আবার পুতুল চাই। নয়তো শশী সাজাবে কাকে? শশী না থাকলে কালুর বিয়ে দেবে কার সঙ্গে? এখন আর ওই লোকটার কাছে গিয়ে লাভ নেই। সে ভয়ে লুকিয়ে আছে। ওরা যদি চুপিচুপি মুখেভাতের ভোজ খেয়ে চলে যায় লোকটা জানতেও পারবে না। ওখানে ভোজ খাওয়াও হবে, আর ভোজবাড়ির কাউকে ধরে একটা পুতুল আনানোও হবে।
কিন্তু সমস্যা হল অন্য জায়গায়। লোকটাকে না বলে ভোজবাড়িতে তো যাবে, কিন্তু ভোজবাড়িটা কোথায় সেটাই তো জানে না। টুসির মাথায় একটা বুদ্ধি এল। নতুন বউ, পুতুলনাচ এসব জায়গায় লোকটা তো সঙ্গে যায়নি। সে-ই তো ডেকেছে। তার ডাক শুনে সবাই বেরিয়ে এসেছে। তাহলে ভোজবাড়ি খোঁজা নিয়ে ভাবনা কী? ‘রায়দাদু’ বলে ডাকলেই তো মিটে যাবে। রায়বাবু বাইরে এসে তাদের ঘরের ভেতর নিয়ে যাবেন।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ঘাসজমি পেরিয়ে মেহগনিগাছের তলায় দাঁড়িয়ে টুসি ‘রায়-দা-দু’ বলে যেই না ডেকেছে, অমনি হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন রায়দাদু। “এসো খুকু, এসো। ভোজ খাবে, এসো। শিগগির চলো, ভোজ শুরু হয়ে গিয়েছে।”
ভোজসভা দেখে পিকু তো অবাক। এ কেমন ভোজবাড়ি? চেয়ার নেই, টেবিল নেই, ম্যারাপও বাঁধা হয়নি। লোকজন সব মাটির ওপরে চটের বস্তা পেতে বসেছে। কেউ কেউ তো ধুলোর ওপরেই বসে পড়েছে। পিকু আরও অবাক হল ভোজনের পাত্র দেখে। চিনেমাটি, থার্মোকলের প্লেট তো দূরের কথা, শালপাতাও নেই। ভোজ দিচ্ছে কলাপাতা আর পদ্মপাতায়। তবে যে লোকটা বলছিল রায়বাবু গাঁয়ের মোড়ল! এই বুঝি মোড়ল বাড়ির ভোজ? মাথার ওপর একটা ত্রিপলও নেই। বেঁধে রেখেছে একটা তালপাতার ছররা। তার ফাঁক দিয়ে দুপুরের চড়া রোদ ঠিকরে পড়ছে পিকুর মাথায়।
ওসব ভাবার সময় নেই। বড্ড খিদে পেয়েছে। আর না খেলেই নয়। পিকু আর টুসি মাটির ওপরেই বসে পড়ল ভোজ খেতে। একজন পেতে দিল দুটো কলাপাতা। ভাত এল, শাক এল, ঘি এল, লবণ এল। তারপর একে একে এল ছ্যাঁচড়া, কলাইয়ের ডাল, কুমড়োর ছক্কা, মাছের টক, পায়েস, বোঁদে, রসগোল্লা। পিকুর পাতাটা ভরে উঠল। কিন্তু একটাও মুখে তুলল না। চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকল কখন আসবে ফ্রায়েড রাইস, রাধাবল্লভী, মটর-পনির, চিলিচিকেন, মটনকারি। লুচি হলেও চলবে। লুচি পিকুর খুব প্রিয়। কিন্তু আসে না যে! এদিকে সবার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এল। রায়দাদু গলায় ধুতির আঁচল জড়িয়ে দু’হাত জোড় করে জনে জনে জিজ্ঞেস করছেন, “কেমন খেলে গো সব? রান্নাবান্না কেমন হয়েছে?”
সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
পিকুর কাছে এসে থমকে গেলেন রায়বাবু। “এ কী দাদুভাই! তুমি যে কিছুই খাওনি।”
“আমাকে তো কিছুই দেয়নি। কী খাব তাহলে?”
“কী দেয়নি, দাদুভাই?”
“ওই ফ্রায়েড রাইস, চিলিচিকেন, ফিস-ফ্রাই, লুচি এসব।”
“ফ্রায়েড রাইস কী, ভাই? ওটার তো নাম শুনিনি কখনও। পোলাও হবে রাতে। আর লুচি অবশ্য এবেলা হয়েছে। সে তো কেবল ব্রাহ্মণদের জন্য। ওঁরা তো আর সদগোপ কায়েতের ঘরে ভাত খাবেন না। ছোঁয়াও খাবেন না। ওঁরা নিজেরাই আলাদা করে বানিয়ে নিয়েছেন। ওঁদের খাওয়া শেষ না হলে তো ওসবে আমরা কেউ হাত দিতে পারব না। এবেলা মাছ-ভাতই খেয়ে নাও। ও-বেলা পোলাও দোব। বামুনের হাতে গড়া লুচি দোব।”
পিকুর পেটের ভেতরটা কে যেন কামড়াচ্ছিল। ও-বেলা পোলাও-লুচির কথা শুনে ডাল মেখে ভাতটা সপাসপ খেয়ে নিল।
টুসির খাওয়া হয়ে গিয়েছিল আগেই। পানওয়ালা সবাইকে পান দিল একটা করে। টুসি বলল, “পান! এ মা! পান তো ঠাম্মিরা খায়। আমাদের ভোজবাড়িতে যোয়ান দেয়, হজমোলা দেয়। তোমরা পান দাও বুঝি? আমরা বুড়ো নই কিন্তু।”
হোক না মাটিতে কলাপাতা পেতে ভাতডালের ভোজ, খাওয়াটা মন্দ হয়নি টুসির। রান্নাটা হয়েছিল খাসা। তাদের টেবিল-চেয়ারের ভোজওয়ালারা এত ভালো রাঁধতে পারে না।
ভরপেট খেয়ে একটু বিশ্রাম না করলে চলে না। লোকটার খোকাকে ও-বেলা খুঁজলেও হবে। টুসি তাই একটু জিরিয়ে নিল।
পিকুর আবার অন্য ভাবনা। সে ভেবে পায় না রায়দাদুর বাড়িতে ব্রাহ্মণরা ভাত খাচ্ছে না কেন। লুচি-তরকারি নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছে। রায়দাদুরা কেউ ছুঁতেও পারবে না ওসব। ছোঁয়া গেলে নাকি খাবে না। টেবিল-চেয়ারের ভোজে ফ্রায়েড রাইস, রাধাবল্লভী, চিলিচিকেন তো বেশ খায়। গাঁয়ের সব বামুনরাই একসঙ্গে ভোজ খায় সবার সঙ্গে বসে। তাহলে রায়দাদুদের বেলায় অমন কেন? এসব ভাবতে ভাবতে পিকুও একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে টুসির পাশে। টুসির চোখও জড়িয়ে এসেছে ঘুমে। ভোজ বলে কথা। ভাতঘুমটা না দিলে হয় নাকি? দু’জনেই বেশ জাঁকিয়ে দিচ্ছে ঘুম।
টুসি ঘুমের মধ্যেই শুনতে পাচ্ছে পিকুর বাজনা। কানে আসছে টিয়াপাখির ক্যাঁচর-ম্যাচর ডাক। হাঁস ডাকছে প্যাঁক প্যাঁক, মোরগ ডাকছে ককর-কক। গরু ডাকছে হাম-বা। খটা খট খট, কচমচ শব্দ তুলে গাড়ি যাচ্ছে।
টুসি চোখ খুলব খুলব করছে। অমনি লোকটা দিল একটা ধাক্কা। ও বোধহয় টুসির চালাকিটা ধরে ফেলেছে। তার ধাক্কায় টুসি ধড়মড় করে উঠে চোখদুটো কচলে যেই না তাকিয়েছে অমনি মায়ের হাসি ঝলমল মুখটা ভেসে উঠল তার সামনে। “টুসি, ব্রাশ করবে চলো। ছ’টা বেজে গেছে যে।”
টুসি বিছানা থেকে প্রায় লাফ দিয়ে নেমে দৌড়ে এল বারান্দায়। পিকু তখনও উঠোনে বসে বাজাচ্ছে ডিবেটা দাঁত মাজা ব্রাশটা দিয়ে।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment