বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ আল্লা ম্যাঘ দেঃ অমিতাভ প্রামাণিক



“সর্ষের তেল যত মহার্ঘই হোক, নাকে দিয়ে ঘুমোবার সময় মানুষ কার্পণ্য করে না, বুঝলি জুলু? তা সে বিজ্ঞানীরা যতই সাবধানবাণী শোনাক।” বলতে বলতে ঘরে ঢুকতেই বৌদি তার বাচ্চা দুটোকে আমার দিকে এগিয়ে দিল। “যা যা, ছোটকা এসেছে, ছোটকার কাছে বুঝে নে।”
জলদ আর বারিধিーএকজন মাধ্যমিক দেবে, অন্যজন উচ্চমাধ্যমিক। দু’জনেরই স্কুলে প্রোজেক্ট করতে দিয়েছে সাম্প্রতিক জল-সমস্যার ওপর। সেই নিয়ে মার কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল। বৌদি আমাকে ফোন করে ধমকাল, “ঘরের খেয়ে বনের মোষ না তাড়িয়ে বাচ্চাগুলোকে একটু পড়ালে তো পার।” আমি বাড়ি ঢুকে একটা নাটকীয় ডায়ালগ শুরু করতেই ছুটে এল তারা। আমি আমার থিয়েটার চালু রাখলাম, “তাই যখন ২০১৭ সালের জুন মাসে বিজনেস-ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন প্রতিবেদন পেশ করল ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের একুশটা শহর জলশূন্য হয়ে যাবে, কেউ তা গ্রাহ্যই করল না।”
দু’জনেই সমস্বরে বলে উঠল, “একুশটা! আমরা ভাবছিলাম শুধু চেন্নাই আর হয়তো দুয়েকটা শহর। ম্যাগাজিনে লিখেছে একুশটা শহর! বাব্বা! শুধু ইন্ডিয়াতেই কি এই বাজে অবস্থা, ছোটকা? অন্য কোথাও জলের সমস্যা নেই? তুমি যে ব্যাঙ্গালোরে ছিলে, ওখানেও কি খারাপ অবস্থা? ইন্ডিয়ার বাইরে অন্য কোনও শহরে জলের সমস্যা হতে পারে, এমন কথা কেউ বলেনি? এই যে ক’দিন আগে কোথায় যেন দেখছিলাম দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে নাকি জল ফুরিয়ে গেছে।”
“একদম ঠিক শুনেছিস। অফ কোর্স পৃথিবীর অনেক শহরেই এই সমস্যা আছে এবং তা ফলাও করে খবরেও এসেছে।” আমি বলে উঠলাম, “এ সন্দেহ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন শহরে জল সরবরাহ হয় সে দেশের ছ’খানা বড়ো বড়ো বাঁধে জমিয়ে রাখা জল থেকে। সবগুলো মিলিয়ে এই বাঁধগুলোতে জল ধরে ন’লক্ষ মেগালিটার। মেগালিটার বুঝলি তো? এক মিলিয়ন বা দশ লক্ষ লিটারে হয় এক মেগালিটার। বৃষ্টিবাদলা ঠিকঠাক হলে এগুলোতে এদের ক্যাপাসিটির আশি শতাংশের ওপর জল থাকার কথা। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে (১৫ই মে) প্রায় সাড়ে ছ’লক্ষ মেগালিটার জল ছিল বাঁধগুলোতে, মোট ক্যাপাসিটির ৭২%-এর ওপর, কাজেই খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন ছিল না। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যে লেভেল ওয়ান রেস্ট্রিকশন চালু ছিল, সেটাই থাকল।”
“সে আবার কী? লেভেল ওয়ান রেস্ট্রিকশন?” জিজ্ঞেস করল ওরা দু’জন সমস্বরে।
“এর মানে পৌরসভা যে পানীয় জল সরবরাহ করে, তার ব্যবহারের ওপর কিঞ্চিৎ বিধিনিষেধ।” আমি বললাম, “লেভেল ওয়ান থেকে সেভেন অবধি আছে এই নিষেধাজ্ঞা। ওয়ান মানে সবচেয়ে কম নিষেধাজ্ঞা, সেভেন মানে জল ফুরিয়ে গেছে, সুতরাং সরবরাহ বন্ধ। লেভেল ওয়ান রেস্ট্রিকশনে বলা হয়েছে বাগান, পার্ক, ঘাসের জমি মাঠ ইত্যাদিতে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি বিনা বেলা দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি স্প্রিঙ্কলার দিয়ে জল ছেটানো বন্ধ। হোসপাইপ দিয়ে এইসব জায়গায় জল সরবরাহ করলে তার মুখ বন্ধ করার সরঞ্জাম যেন পাইপের সঙ্গে অবশ্যই লাগানো থাকে। রাস্তা বা ফুটপাথ ধুয়ে পানযোগ্য জল যেন নষ্ট না করা হয়, এইসব।”
“আচ্ছা, এত বছর ধরে ওরা তার মানে জলের ব্যবহারে বাধা নিষেধ চালু রেখেছিল? আমাদের এখানে তো এরকম কিছু নেই, না ছোটকা?” বলল বারিধি।
“কোনওদিন দেখেছিস কাউকে রাস্তার ট্যাপ খুলে রাখার জন্যে শাস্তি পেতে? বা নিজের ইচ্ছেমতো জল নষ্ট করার জন্যে অ্যারেস্ট হতে?” আমি উত্তর দিলাম, “কিন্তু এসব করেও যে কেপ টাউনে আরও বড়ো সমস্যা ঠেকিয়ে রাখা গেল, তাও না। পর পর তিন বছর খরা হওয়ায় অবস্থা বদলে গেল প্রবলভাবে। ২০১৫ সালের ১৫ই মে দেখা গেল মোট সঞ্চিত জল আছে সাড়ে চার লক্ষ মেগালিটার (৫০%), ২০১৬ সালের ১৫ই মে পৌনে তিন লক্ষ মেগালিটার (৩১%) আর ২০১৭ সালের ১৫ই মে তা আরও কমে দাঁড়াল দু’লক্ষ মেগালিটারেরও কম (২১%)। পরিস্থিতি বুঝতেই পারছিস। ঐ বাঁধে জমা জলই যাদের পানীয় জলের উৎস, তার ভাঁড়ারে টান পড়লে কী হতে পারে।”
“তখন কী করল ওরা?” দু’জনেই সমান উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
“কী আর করবে? রেস্ট্রিকশন বাড়াতে লাগল।” আমি উত্তর দিলাম, “২০১৬ সালের গোড়াতেই চালু হল লেভেল টু রেস্ট্রিকশন। ঐ যে বাগান-পার্ক-মাঠ ইত্যাদিতে জল দেওয়ার কথা বলছিলাম, ওটা লেভেল টু রেস্ট্রিকশনে করা যাবে সপ্তাহে মাত্র তিনদিন–মঙ্গল-বিষ্যুৎ-শনিবারে, দিনে ম্যাক্সিমাম একঘণ্টা করে, হয় সকাল ন’টার আগে বা বিকেল চারটের পরে। গাড়ি বা অন্য জিনিস সরবরাহ করা পানীয় জল দিয়ে ধোয়াধুয়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়ি হল। সে বছরই নভেম্বরে রেস্ট্রিকশন লেভেল বেড়ে হল লেভেল থ্রি। স্প্রিঙ্কলার বা স্প্রেয়ার ব্যবহার করা চলবে না, সপ্তাহে তিনদিন দিনে ম্যাক্সিমাম একঘণ্টা জল দেওয়া যাবে ঐসব জায়গায় ড্রিপারের মাধ্যমে, অর্থাৎ যাতে গাছের গোড়ায় ফোঁটা ফোঁটা করে জল পড়ে। গাড়ি বা অন্য জিনিস ধোয়ার জন্যে যেন রিসাইক্লড ওয়াটার ব্যবহার করা হয়। ঐ জলে রাস্তাঘাট ধোয়াধুয়ি তো বন্ধ বটেই। সুইমিং পুল ঢাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হল, যাতে তা থেকে জল উবে যাওয়া কমে, যখন পুল ব্যবহৃত হচ্ছে না।”
“তাতে কি লাভ হল? সমস্যা কমে গেল? তুমি যে বললে ২০১৭ সালে জল আরও কমে গেল?” জলদের প্রশ্ন।
“তাই তো। বৃষ্টি না হলে কী হবে?” উত্তর দিলাম আমি, “বাঁধের সঞ্চিত জল কমতেই থাকল আর পৌরসভা তাদের রেস্ট্রিকশন বাড়াতেই লাগল। মে মাস আসতে রেস্ট্রিকশন বেড়ে হল লেভেল থ্রি বি। জলের রেশনিং। বলা হল মাথা-প্রতি দৈনিক ১০৫ লিটার করে জল পাবে অধিবাসীরা, তার বেশি নয়। ওর মধ্যেই জলপান, খাবার রান্না, স্নান, ওয়াশিং মেশিন, টয়লেট, ঘরদোর পরিষ্কার যাবতীয় সারতে হবে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্যত্র ভালো বৃষ্টি হলেও কেপ টাউনে বৃষ্টি হল না ভালো। বলা হল, গত একশো বছরে এত কম বৃষ্টি হয়নি। ১৯৩৩ সাল থেকে তারা রেকর্ড রাখছে, সেবারেই সবচেয়ে কম বৃষ্টি। একমাসের মধ্যে অর্থাৎ জুন মাসে চালু হল লেভেল ফোর রেস্ট্রিকশন–মাথাপিছু ১০০ লিটার জল। জুলাইতে লেভেল ফোর বি, মানে আরও কম সরবরাহ। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় তা বেড়ে হল লেভেল ফাইভ–মাথাপিছু ৮৭ লিটার। নির্দেশ দেওয়া হল ওয়াশিং মেশিন থেকে বেরনো অপরিষ্কার জল যেন টয়লেট ফ্লাশ করতে কাজে লাগানো হয়। গোটা শহর চালাতে হবে ৫০০ মিলিয়ন লিটার জল দিয়ে।  তাতেও মাত্রই কয়েক মাসের বেশি চলবে না যদি বৃষ্টি না আসে।
“সেপ্টেম্বরেও বৃষ্টি হল না তেমন। কর্তৃপক্ষ হিসেব করে দেখলেন এইভাবেও আর মাস পাঁচেকের বেশি টানা যাবে না। সারা শহরে জল-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারি হল। জল সরবরাহ করা হতে লাগল খুব কম প্রেশারে। গণনা করে দেখা হল এইভাবে চললে কতদিন অবধি জল সরবরাহ সম্ভব। ঘোষণা করা হল, বাঁধের জল একটা মিনিমাম ভল্যুমের কাছাকাছি চলে এলে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই দিনটাকে বলা হবে–ডে জিরো। গণনা করে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করা হল, ২০১৮ সালের ২২শে এপ্রিল হচ্ছে সেই ডে জিরো। তারপর আর পাইপ দিয়ে হাসপাতাল জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ছাড়া ঘরে ঘরে জল ঢুকবে না।”
দু’জনেই মন দিয়ে আমার কথা শুনছিল। দু’জনের মুখেই উদ্বেগ। আহা, এই উদ্বেগ নিয়ে আমাদের সবাই যদি আমাদের ঘরের সমস্যার কথাগুলো পর্যালোচনা করতে পারতাম!
আমি বলতে লাগলাম, “২০১৮ সালের শুরুতে চালু হল লেভেল সিক্স রেস্ট্রিকশন–মাথা-প্রতি ৬৭ লিটার। ফেব্রুয়ারিতে লেভেল সিক্স বি–মাথাপিছু ৫০ লিটার। যতই ডে জিরোর কাছাকাছি আসছে, ততই দুশ্চিন্তায় মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে শহরবাসীদের, জল ছাড়া বাঁচবে কী করে? পৌরসভা বুঝতে পারল, জল নিয়ে এবার মারামারি শুরু হতে পারে। সারা শহরে পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করা হল। আগে যেখানে মাসে মাসে বুলেটিন বেরোচ্ছিল, এবার শুরু হল পাক্ষিক। জানুয়ারির মাঝামাঝি মেয়র ঘোষণা করলেন, ডে জিরোর বেশি দেরি নেই। এলেই লেভেল সেভেন রেস্ট্রিকশন চালু হবে, সরবরাহ বন্ধ। শহরের দেড়শোটা জায়গায় ট্যাঙ্কারের মতো কিছুতে জল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, বাড়ি থেকে বালতি এনে সেই জল কিনতে হবে, মাথা-প্রতি মাত্র ২৫ লিটার হিসাবে। যে হারে বাঁধের সঞ্চয় কমে আসছে, ডে জিরো এসে যাবে ২২শে এপ্রিলে নয়, ১২ই এপ্রিলে, অর্থাৎ আগের গণনার দশদিন আগেই।
“সমগ্র পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে আধুনিক নগরসভ্যতায় কেপ টাউনের এই কাহিনি এক নতুন নজির সৃষ্টি করল। কাজকর্ম বন্ধ রেখে মানুষ পাগলের মতো জলের চিন্তায় উন্মাদ হয়ে উঠছিল।”
বারিধি আর থাকতে পারল না। ক্লাইম্যাক্স জানতে সে উদগ্রীব। “তারপর কী হল ছোটকা? জল পুরো বন্ধ করে দিল ওখানকার কর্পোরেশন?”
“না, ওদের লাক ভালো, তা করতে হয়নি।” আমি উত্তর দিলাম, “শুধু ঘরে সরবরাহ নয়, কৃষিকাজেও খুব কম জল ব্যবহার করা হচ্ছিল। ভাগ্যক্রমে সেবার আগের তিন বছরের তুলনায় ভালো বৃষ্টি হল, ফলে ডে জিরো আবার পিছিয়ে যেতে লাগল। শীতের বৃষ্টিতে বাঁধের জল বাড়তে লাগলে ডে জিরোর ভবিষ্যদ্বাণী তুলে নেওয়া হল। পৌরসভা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বাধা নিষেধ তুলে নিতে রাজী নয়। তারা বলল, বাঁধের মোট সঞ্চিত জল যখন ক্যাপাসিটির ৮৫% হবে, তখনই উঠবে সমস্ত রেস্ট্রিকশন, তার আগে নয়। ৮৫% অবশ্য হয়নি, ৭৬%-এ এসে থিতু হল স্টক। পর্যায়ক্রমে বাধা নিষেধ কমিয়ে কমিয়ে তখন লেভেল থ্রি চালু রাখল পুরসভা। ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবি কী অবস্থায় পৌঁছেছিল কেপ টাউন।” বলে আমি ওদের মুখের সামনে একটা গ্রাফ মেলে ধরলাম।
“এখন কী অবস্থা ওখানে, ছোটকা?” বলে উঠল জলদ।
আমি উত্তরে বললাম, “এখনও রেস্ট্রিকশন চালু রেখেছে ওরা। পুরসভা এবছরেই জুন মাসে বের করেছে ওদের আগামী দশ বছরের পরিকল্পনা। সাড়ে পাঁচশো থেকে আটশো কোটি র‍্যান্ড খরচ করে ওরা তৈরি করবে জলসঞ্চয় প্রকল্প। বাঁধের জলের ওপর ওদের নির্ভরতা থাকবেই, তবে দৈনিক অতিরিক্ত ৩০০ মিলিয়ন লিটার জল যাতে তা থেকে পাওয়া যায়, তার কাজ শুরু করা হবে। এবছর বৃষ্টি আগের তিন বছরের তুলনায় বেশি হলেও আহামরি কিছু নয়। কাজেও দীর্ঘ সময় ধরে শাওয়ারে স্নান বা বাথটাবে গা ডুবিয়ে বসে থাকা এখনও বন্ধ। তবে বাঁধগুলোতে এই অগাস্ট মাসে জল রয়েছে ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশের মতো, কাজেই এই মুহূর্তে চিন্তা নেই। তবে আরেকটা ডে জিরো যেন কখনই সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে তারা এখন অত্যন্ত সতর্ক। দশ বছরের জলসঞ্চয় প্রকল্পে স্থান পেয়েছে একটা বিশাল রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট বানানো, সেটা শিগগিরই শুরু হবে। এই যে ম্যানেজমেন্ট, এই যে প্ল্যান, আমাদের দেশে এই ব্যাপারটাই নেই, বুঝলি? থাকলেও দুয়েকটা মিটিং-ফিটিং হয়ে কিছু কাজকর্ম শুরু হয়, তারপর আবার যে-কে-সেই।”
“রিভার্স অসমোসিস জিনিসটা কী গো ছোটকা? প্রচুর শুনি। আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও তো।” বলে উঠল বারো ক্লাশের বারিধি।
আমি বললাম, “এখন না। অনেক বকবক করলাম, কালকে বলব, এখন খেলতে যা। গুগল ঘেঁটে এবার তোরাও তথ্য জোগাড় করতে শুরু কর। বৌদি, একটু চা হবে?”


* * * 

রাতে রুটি-তরকারি শেষ না করেই বারিধি কাটা আমের বাটিটা টেনে নিতে যাচ্ছিল, আমি বলে উঠলাম, “সেদিন রিভার্স অসমোসিস কী জিজ্ঞেস করছিলি না? সেটা একটু বুঝে নে।”
থতমত খেয়ে বারিধি আমের বাটির বদলে জলের গেলাসটা টেনে নিল। তারপরে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলো।”
আমি বললাম, “তামিলনাড়ুতে তীব্র জলাভাব দেখা দিয়েছে, নদী-জলাধার শুকিয়ে গেছে খবরে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে কতজন এ নিয়ে লেখালিখি শুরু করে দিয়েছে, দেখেছিস নিশ্চয়ই। গতকাল শুনলাম একজন বলছে, জল যে হারে নষ্ট হচ্ছে, এরকম চলতে থাকলে সাগর-মহাসাগরও শুকিয়ে যাবে। তোরা হয়তো এরকম কিছু শুনে অন্য আরেকজনকে বলতে যাবি। তাই বলছি, ব্যাপারটা বুঝে নে।”
“এ আর বোঝার কী আছে! রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন, শেষের সে দিন ভয়ংকর।”
“এটা আবার রবীন্দ্রনাথ কবে বললেন? সবই কি একজনকেই বলে যেতে হবে?”
“ওহো, রবি ঠাকুর বলেননি? তাহলে?”
“বলেছিলেন রামমোহন রায়। সে কথা থাক। সাগর-মহাসাগর শুকিয়ে যাবে শুনে তোর মনে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, একটু শুনি।”
“ওগুলো কী করে শুকাবে! ধুত। পৃথিবীর তো তিনভাগ জল, একভাগ স্থল। এত জল, তাও যে কেন জল পাওয়া যায় না!”
“ঠিক বলেছিস। তবে পৃথিবীর যদিও তিনভাগ জল, এর শতকরা সাতানব্বই অংশই রয়েছে সাগর-মহাসাগরে। সে জল নোনা জল, সরাসরি মানুষের কাজে লাগে না। মোট জলের মাত্র তিন শতাংশ থাকে স্থলভাগে, যার দুই-তৃতীয়াংশ আবার তরল হিসাবে নয়, কঠিন বরফ হিসাবে পাহাড়ের মাথায় নতুবা মেরু অঞ্চলে বন্দী। মেরুর বরফ নাকি দ্রুত গলে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে আমাদের ক্ষতিবৃদ্ধি, কেননা সে জল সাগরে গিয়ে মিশবে, ফলে সমুদ্রতলের লেভেল ওপরে উঠে উপকূলের এলাকা ডুবিয়ে দেবে। নদী, হ্রদ ও ভূমধ্যস্থ জল মিলে বাকি যে জল, তা মোট জলের এক শতাংশেরও কম। নদীমাতৃক আমাদের দেশে, বিশেষ করে বঙ্গভূমিতে এত জলাশয় থাকলে কী হয়, আফ্রিকা, রাশিয়া, উত্তর আমেরিকার বিশাল বিশাল হ্রদগুলোর একেকটাতে যত জল আছে, তার তুলনায় এগুলো নগণ্য।”
“মনে আছে, তুমি আগেও বলেছ। তাহলে কী হবে? এবার যে বিষ্টিবাদলাও কম হচ্ছে, জল কোত্থেকে আসবে? আচ্ছা, এই যে গালফ কান্ট্রিগুলো, ওখানে তো মরুভূমি, ওরা জল পায় কোথায়? ওদের তো বিষ্টি-ফিষ্টি কম হয়।”
“হ্যাঁ। এই ধর তোর দুবাই বা শারজা, যে নামগুলো আমরা শুনি ক্রিকেটের সৌজন্যে, সেখানে বছরে গড়ে বৃষ্টি হয় ১০০ মিলিমিটারেরও কম। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে হয়তো মাসে দু’দিন, ফেব্রুয়ারি-মার্চে তিন-চারদিন।”
“তো ওরা জল পায় কোথায়?”
“ওরা সমুদ্রের জল থেকে রিভার্স অসমোসিস করে পানীয় জল বানিয়ে নেয়। এই কথাটাই তো জানতে চাইছিস। ওই যে তোদের বাড়িতে লাগাল যে আর-ও ওয়াটার পিউরিফায়ার, ঐ আর-ও হচ্ছে রিভার্স অসমোসিস।”
“সেটা জানি। এই জিনিসটা একটু ভালো করে বোঝাও তো। এর থিওরি, ওর থিওরি–ওসব বলবে না কিন্তু। সহজ করে বলো।”
আমি উঠে রান্নাঘর থেকে একটা বাটিতে জল ভরে নিয়ে এলাম। আর নিয়ে এলাম এক চিমটে নুন। তারপর বারিধিকে বললাম, “ভালো করে দ্যাখ। এই হচ্ছে তোর এক বাটি জল। কতটা? এই ধর সিকি লিটার-মতো, মানে আড়াইশো এম.এল। ধরে নে এ হচ্ছে একেবারে যাকে বলে খাঁটি জল, বিশুদ্ধ ডাই-হাইড্রোজেন মনোক্সাইড। এর মধ্যে অন্য কিচ্ছু নেই। আসলে কিন্তু আরও কিছু জিনিস আছে, সেসব অন্যদিন বলব, এখন ধরে নে এটা বিশুদ্ধ জল। আর এই বাটির জলের মধ্যে এককোণে আমি আস্তে আস্তে ঢেলে দিচ্ছি এক চিমটে নুন। কতটা? এই ধর, গ্রাম দুয়েক।”
বারিধি বাটিটা নাড়াতে যেতেই আমি বললাম, “উঁহু, নাড়াসনে। নাড়ানোর হলে তো আমিই নাড়াতাম। যা বলছি শোন। তুই তো জানিস, জলে নুন গুলে যায়, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে ঐ যে বাটির তলায় দেখা যাচ্ছে নুন, ওটা কেন গুলছে না?”
“গুলবে তো, বাটিটা নাড়ালেই গুলে যাবে। আমি নাড়িয়ে দেখাব?”
“না। না নাড়ালে গুলছে না কেন? গুলেই যদি যায়, তাহলে এতক্ষণে গুলল না কেন?”
“আরে জলটা একটুখানি ঘুরিয়ে দাও না। ঠিক গুলে যাবে।”
“ওহ্‌-হো, আমার প্রশ্নের উত্তর দে আগে। আমি জানি তো, নাড়িয়ে দিলেই গুলে যাবে। এখনও গোলেনি কেন?”
“জানি না। বলে দাও।”
“যেখানে নুনটা আছে, তার ঠিক চারপাশে যে জল, তাতে নুনের দানাগুলোর গায়ের কিছু নুন কিন্তু গুলে গেছে। তুই যদি একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ দিয়ে খুব কেয়ারফুলি ওখানকার জল টেনে নিস, জিভে দিলে দেখবি নোনা। অথচ নুনের দানা থেকে অনেকটা দূরে যে জল, সেটা তত নোনতা নয়। মানে কী? সলিড নুন গুলছে ওর গা থেকে, দানার চারদিকে তৈরি হচ্ছে নোনতা জল। এই নোনতা জলে নুনের পরিমাণ যদি সেই জলে ম্যাক্সিমাম যতটা নুন গুলতে পারে ততটা গুলে যায়, মানে জলটা নুনে স্যাচুরেটেড হয়ে যায়, তবে আর নুন গুলবে না। সেই জন্যেই এখনও তুই নুনটা দেখতে পাচ্ছিস। যেই তুই বাটিটা নাড়িয়ে দিবি, অমনি স্যাচুরেটেড নুনজল বাটির অন্য জলে মিশে গিয়ে আর স্যাচুরেটেড থাকবে না, তখন নুন আবার গুলবে যতক্ষণ না স্যাচুরেটেড হচ্ছে। এমনিতেও অনেকক্ষণ রেখে দিলে ও আপনা-আপনি গুলে যাবে পুরোটাই, কেননা স্যাচুরেটেড নুনজল আস্তে আস্তে বাটির অন্য জলে ছড়িয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়াকে বলে ডিফিউশন, বাংলায় বোধহয় ব্যাপন। ঘরে যখন এসি অন থাকে, তখন এই জন্যে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়, যাতে ঠাণ্ডা হাওয়া ডিফিউজ করে বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে বা বাইরের গরম হাওয়া ডিফিউজ করে ঘরে ঢুকতে না পারে। ডিফিউশন এমনিতে স্লো, যদি না বাইরের থেকে এনার্জি সাপ্লাই করে একে ফাস্ট করা হয়, এই যেমন বাটি নাড়িয়ে।”
“বুঝলাম। এর সঙ্গে ‘আর ও’-র সম্পর্ক কী?”
“বলছি বলছি। তো এই নুন যখন জলে পুরো গুলে গেল, তখন তো একেবারে স্বচ্ছ দ্রবণ হয়ে গেল। তাকে চায়ের ছাঁকনিতে ছাঁকলে তো আর নুন ফেরত পাবি না। ঠিক কি না? আমাদের অবশ্য নুনের চেয়েও বেশি দরকার জলটা। নোনা জল পৃথিবীতে অনেক আছে। সাগর-মহাসাগরে তো ঐ জলই থাকে।”
“হ্যাঁ। ছেঁকে ফেলা যাবে না। গ্যাসে বসিয়ে দিলে অবশ্য জলটা উড়ে নুনটা ফেরত পেয়ে যাব, কিন্তু জলটা পাব না।”
“ঠিক। রোদে ফেলে রাখলেও তাই। ছাঁকনিতে ছেঁকে ফেলা যাচ্ছে না কেন, বল দেখি।”
“ছাঁকার মতো কিছু তো নেই। পারফেক্ট সলিউশন তো। চা যখন ছাঁকি, তখন তো পাতাগুলো সেপারেট হয়। চা তো বেরিয়েই আসে।”
“রাইট। ছাঁকা বা ফিলট্রেশন তখনই সম্ভব, যখন যে ছিদ্র দিয়ে ছাঁকবি, তার মাপ দ্রবণের মধ্যে একটা জিনিসের চেয়ে বড়ো আর অন্যটার চেয়ে ছোটো হয়। ছোটোগুলো ফোকর দিয়ে গলে যাবে, বড়োগুলো আটকে যাবে। চায়ের ছাঁকনির ফুটোর চেয়ে চা-পাতা বড়ো, তাই আটকে যায়। চায়ের সলিউশনের ‘অণু’ ছোটো, তাই আটকায় না। চায়ের সলিউশনে অবশ্য একটা অণু থাকে না, থাকে জলের অণু, জলে গুলে থাকা চায়ের মধ্যের যৌগদের কিছু অণু, দুধের ফ্যাটের কণা, তার মধ্যে গুলে থাকা চায়ের কিছু অণু যারা জলের চেয়ে তেলে ভালো গোলে–এইসব।”
“তার মানে নুন আর জল ফিল্টার করে আলাদা করা যাবে না।”
“ঠিক। যদি না এমন ছাঁকনি পাওয়া যায়, যার ফুটোগুলো এত ছোটো যে তাদের সাইজ জল আর জলে গুলে থাকা নুনের অণুর–এক্ষেত্রে নুনের অণু নয়, বরং তাদের আয়নের, যারা জলের মধ্যে আছে বলে ‘হাইড্রেটেড’ অর্থাৎ জল দিয়ে ঘেরা অবস্থায় আছে, তাদের মাঝামাঝি কিছু একটা হয়। তাহলে তাদের হয়তো ছেঁকে ফেলা সম্ভব। অবশ্য এক্ষেত্রে শুধু সাইজ নয়, বরং তাদের অন্য কিছু ধর্মের পার্থক্য–যেমন, একটা অন্যটার চেয়ে বেশি পোলার অর্থাৎ আয়নিক–এইসব।”
“তাহলে তাদের আলাদা করা যায়? এরকম ছাঁকনি আছে যাদের ফুটো জল আর নুনের অণুর সাইজের মাঝামাঝি?”
“বললাম যে, শুধু সাইজে কাজ হয় না। আচ্ছা, ভেবে বল তো, জোঁকের গায়ে নুন দিলে জোঁক মরে যায় কেন?”
“নুন যে বিষ। জোঁক নুন খায়, আর মরে যায়।”
“ধুস। খেয়ে মরে না। গায়ে দিলেই খতম। জোঁকের চামড়া হচ্ছে সেই ছাঁকনি যার মধ্যে দিয়ে নুন আর জলের প্রবাহ আলাদা। শুধু জল যেতে পারে, নুন না। কোনদিকে জল যাবে? যেদিকে নুনের ঘনত্ব বেশি, সেই দিকে যতক্ষণ না দুই দিকে ঘনত্ব সমান হচ্ছে। জোঁকের শরীরে সামান্য কিছু নুন আছে আর আছে জল। সেই জলে নুনের যা ঘনত্ব, ওর গায়ে যখন নুন দিচ্ছিস, তা ওর চামড়ার জলে গুলে যে ঘনত্ব হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। ফলে শরীরের অভ্যন্তরের জল বাইরে বেরিয়ে আসে, যাকে বলা হয় ডিহাইড্রেশন। ডিহাইড্রেশনের ফলে কোষে জল কমে গিয়ে জোঁক শুকিয়ে মরে যায়।”
“তাহলে তো জোঁকের চামড়া খুব উপকারী জিনিস। জোঁকের চামড়া দিয়ে আমরা নুন আর জল আলাদা করতে পারব? অবশ্য আমাদের এত যে জল লাগে, সমুদ্রের জল এ দিয়ে নুন-ছাড়া করতে হলে তো জোঁকের চাষ করতে হবে।”
“ইয়েস, এই তো তোর বুদ্ধি আছে দেখছি। তবে শুধু জোঁকের নয়, আমাদের শরীরের কোষের চামড়াও, যাকে আমরা বলি সেল মেমব্রেন, তারাও এরকম। এদের বলা হয় সেমিপার্মিয়েবল মেমব্রেন। বাংলা জানতে চাস না, আমার মনে নেই। আর যে পদ্ধতিতে কোষ তাদের ভেতরের আর বাইরের জিনিসের আদান-প্রদান অ্যালাউ করে, তাকে বলা হয় অসমোসিস, বাংলায় বোধহয় অভিস্রবণ।”
“আচ্ছা। কিন্তু একটা জিনিস বলো, কম ঘনত্ব থেকে বেশি ঘনত্বের দিকে জল যায়, এটা কেমন উলটো ব্যাপার না? যার বেশি আছে, সে-ই তো দেয়।”
“ঠিক। প্রবাহ সেই মেনেই চলে। বেশি উচ্চতা থেকে কম উচ্চতার দিকে তরল বয়ে যায়, বেশি পোটেনশিয়াল থেকে কম পোটেনশিয়ালের দিকে ইলেকট্রিসিটি, বেশি উষ্ণতা থেকে কম উষ্ণতার দিকে তাপ, এখানেও তাই। তুই খেয়াল করিসনি, যা বয়ে যাচ্ছে, তা হচ্ছে জল, নুন নয়। নুনের ঘনত্ব যেখানে বেশি, সেখানে জলের ঘনত্ব কম। যেখানে জলের ঘনত্ব বেশি, সেখান থেকে জল যাচ্ছে যেখানে জলের ঘনত্ব কম। নুনের হাইড্রেটেড আয়ন তো যাচ্ছে না।”
“ওহো, তাই তো। তাহলে ঠিকই আছে। তো এ দিয়ে আমরা নুন আর জল আলাদা করব কী করে? ধরো দুটো চেম্বার এই সেমিপার্মিয়েবল মেমব্রেন দিয়ে আলাদা করা। একটায় যদি সমুদ্রের জল নিই, অন্যটায় কী নেব? যদি বিশুদ্ধ জল নিই, সেটা সমুদ্রের জলের দিকে চলে যাবে, তাতে আমি আর জল পাব না। যদি আরও বেশি ঘনত্বের নুন নিই, তবে সমুদ্রের জল থেকে জল সেটায় ঢুকবে, কিন্তু তাতেও তো বিশুদ্ধ জল পাব না।”
“ঠিক। আর সে কারণেই অসমোসিস প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ জল পাওয়া যায় না সমুদ্রের জল থেকে। যে প্রক্রিয়ায় পাওয়া যায়, তার নাম রিভার্স অসমোসিস। সেটা এর উলটো। মানে এখানে যেদিকে নুনের ঘনত্ব বেশি, সেদিক থেকে জলকে অন্যদিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।”
“কী করে? বললে যে সেমিপার্মিয়েবল মেমব্রেন তা অ্যালাউ করে না।”
“এমনিতে করে না। কিন্তু ঠেলার নাম যে বাবাজি!”
“মানে?”
“মানে মনে কর একটা ফোলানো বেলুনের গায়ে তুই পিন দিয়ে একটা অতিক্ষুদ্র ফুটো করে দিলি। কী দেখবি?”
“বেলুনটা চুপসে যাবে।”
“কেন?”
“হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে বলে।”
“হাওয়া কেন বেরিয়ে যাচ্ছে?”
“কেননা বাইরে হাওয়ার ঘনত্ব কম, ভেতরে বেশি।”
“বাহ, একদম ঠিক বলেছিস। এখানে ঘনত্ব না বলে বলতে হয় চাপ। যাই হোক, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে বেলুনটা ফুলল কী করে?”
“কোথায় ফুলল? এমনি এমনি কি ফুলল? ও তো ফোলানো হল।”
“কী করে?”
“ফুঁ দিয়ে।”
“কোথা দিয়ে ফুঁ দিয়ে?”
“বেলুনের ফুটো দিয়ে।”
“দ্যাখ, তুই বলছিস ফুটো থাকলে বেলুন থেকে হাওয়া বেরিয়ে যায়। অথচ এখানে ফুটো দিয়ে–আসলে অনেক বড়ো ফুটো দিয়ে–বেলুনের মধ্যে হাওয়া ভরাও যায়, ফুঁ দিয়ে অর্থাৎ প্রেশার দিয়ে। তার মানে প্রেশার দিয়ে প্রবাহ উলটো করে ফেলা যায়। অসমোসিসে একদিন থেকে আরেকদিকে তরল প্রবাহিত হয় এই প্রেশার ডিফারেন্সের কারণেই। ঐ যে ঘনত্বের পার্থক্য, তাতেই তৈরি হয় সলভেন্টের বা দ্রাবকের প্রেশার ডিফারেন্স। একে বলে অসমোটিক প্রেশার ডিফারেন্স। দুটো তরলের যখন সেম অসমোটিক প্রেশার, তখন তাদের বলে আইসোটনিক সলিউশন। হাসপাতালে যে স্যালাইন দেয়, তাতে দেখবি নুন থাকে, সেই নুনের ঘনত্ব আমাদের কোষের মধ্যে নুনের ঘনত্বের সমান অর্থাৎ তারা আইসোটনিক। নুন-ছাড়া ইনট্রাভেনাস লিকুইড গুচ্ছের ঢোকালে সেল হাইড্রেট করে তুই ঝামেলায় পড়তে পারিস। এবার বুঝে দেখ, অসমোটিক প্রেশারের চেয়ে বেশি প্রেশার যদি উলটোদিক থেকে দেওয়া হয়, তাহলে আগে লিকুইড যেদিকে যাচ্ছিল, তার উলটোদিকে যাবে।”
“আবার বলো। মনে করো ওই আগে যেটা বললাম, দুটো চেম্বার, মাঝখানে সেমিপার্মিয়েবল মেমব্রেন, একদিকে সমুদ্রের জল, অন্যদিকে বিশুদ্ধ জল। এইবার?”
“এমনিতে কী হত? বিশুদ্ধ জল ঢুকত সমুদ্রের জলের দিকে, কেননা বিশুদ্ধ জলের দিকে অসমোটিক প্রেশার বেশি। যতটা বেশি, ঠিক সেই পরিমাণ প্রেশার যদি সমুদ্রের জলে রাখি, তাহলে কী হবে? বিশুদ্ধ জল সমুদ্রের জলের দিকে ঢোকা বন্ধ হয়ে যাবে। তার চেয়েও যদি প্রেশার বাড়িয়ে দিই সমুদ্রের জলে, তবে সমুদ্রের জলের দিক থেকে জল বিশুদ্ধ জলের দিকে যাবে। ফলে তুই সমুদ্রের জল থেকে বিশুদ্ধ জল পাবি।”
“কিন্তু একদম বিশুদ্ধ তো পাওয়া যায় না। খানিকটা লবণ তো থাকেই।”
“সেটা হচ্ছে ট্রেড-অফ। তুই কত তাড়াতাড়ি জল চাস, কতটা বিশুদ্ধতা চাস, এইসব হিসাব করে লোকে মেমব্রেনের ফুটোর সাইজ, পাম্পের প্রেশার–এইসব নির্ধারণ করে।”
“বাব্বা। এত ঝামেলায় কাজ কী বাপু! সিম্পুল গ্যাসে চাপিয়ে জল ফোটাও আর সেই ভেপার ঠাণ্ডা করে বিশুদ্ধ জল বানিয়ে নাও। আমি জানি, একে বলে ডিস্টিলেশন। অ্যালকোহল তৈরি হয় তো এইভাবে।”
“বাহ্‌, ঠিক বলেছিস। ওরে, ঠিক একইভাবে যে সুয্যিদেব তার প্রখর তপন-তাপে অহরহ সাত সমুদ্রের জল উড়িয়ে মেঘ বানাচ্ছেন, যাকে ঠাণ্ডা করতে পারলেই বৃষ্টির জল পাওয়া যায়, সে খেয়াল করিস না? মেঘ তো কম হচ্ছে না এখনও, কিন্তু সেই মেঘ আগে যে কন্ডিশনে ঠাণ্ডা হয়ে ঝরে পড়ত, এখন সেই কন্ডিশনটা পাচ্ছে না। সাধারণভাবে বনভূমির ওপর সেই ঠাণ্ডা এলাকা থাকত বলে বনে বৃষ্টি হত বেশি। গাছপালা কেটে আমরা আর মেঘকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে দিচ্ছি না, বুঝলি? তাহলে রিভার্স অসমোসিস ক্লিয়ার হয়ে গেল? বাকিটুকু বইতে পড়ে নে।”
“ঠিক আছে, ছোটকা।”

* * *

“পৃথিবীর অন্যান্য শহরের অবস্থা কেমন, ছোটকা? আর তোমার ব্যাঙ্গালোরের?”
জলদ-বারিধির মুখোমুখি আবার আমি। বললাম, “নিজেরা তো একটু সার্চ-টার্চ করে দেখতে পারিস, সবকিছুতেই ছোটকা! আচ্ছা, শোন।”
আমি বলে চললাম, “২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেপ টাউনের মহা বিপর্যয় চলাকালীন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) খবর ছাপায়–শুধু কেপ টাউন নয়, সারা পৃথিবীতে এগারোটা বড়ো বড়ো শহরেও আসতে চলেছে ডে জিরো। কোন এগারোটা শহর? তার শীর্ষে আছে ব্রাজিলের সাও পাওলো, দ্বিতীয় স্থানে ভারতের ব্যাঙ্গালোর। তিনে চিনের বেইজিং, চারে মিশরের কায়রো, পাঁচে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, ছয়ে রাশিয়ার মস্কো, সাতে তুরস্কের ইস্তানবুল, আটে মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, নয়ে ইংল্যান্ডের লন্ডন, দশে জাপানের টোকিও, এগারোয় আমেরিকার ফ্লোরিডার মায়ামি।
“সাও পাওলো হচ্ছে ব্রাজিলের ফিনান্সিয়াল ক্যাপিট্যাল, আমাদের যেমন মুম্বই। জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীর প্রথম দশের একটা। ২০১৫ সালেই তাদের ভয়ংকর জলকষ্টের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। শহরের প্রধান জলাধারে তখন সঞ্চিত ছিল মাত্র ৪% জল, ২.২ কোটি লোকের বাসস্থান এই শহরের মাত্র কুড়ি দিনের প্রয়োজনীয় জল সেটা। জলের ট্যাঙ্ক ছিনতাই হওয়া শুরু হয়েছিল, পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছিল তার সুরক্ষায়। ২০১৬ সালে অবস্থার অনেক উন্নতি হলেও ২০১৭-তে সঞ্চয় দাঁড়ায় অন্যবারের চেয়ে ১৫% কম। ভবিষ্যত সুতরাং ভীষণই অনিশ্চিত এবং যেকোনও সময় ২০১৫-র মতো বা তার চেয়েও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
“ব্যাঙ্গালোরের ব্যাপারটা পরে বলছি। চিনের বেইজিং রয়েছে লিস্টিতে তার পরে। চিন যদিও পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ মানুষের বাসভূমি, সারা পৃথিবীর ব্যবহারযোগ্য মিষ্টি জলের মাত্র সাত শতাংশ আছে চিনে। বিশ্বব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী যে অঞ্চলে প্রতিটি মানুষ বছরে ১০০০ কিউবিক মিটার জল পায় না, সেই অঞ্চল জলসমস্যায় আক্রান্ত। ২০১৪ সালে দু’কোটি বেইজিংবাসীর প্রত্যেকের জন্যে ছিল ১৪৫ কিউবিক মিটার করে। দেশের জল সংরক্ষণ দ্রুতহারে কমছে। ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে কমেছে ১৩ শতাংশ। পরিমাণের চেয়েও বেশি সমস্যা দূষণের। বেইজিঙের জলাশয়ের জলের চল্লিশ শতাংশই এমন দূষিত যে তা এমনকি কৃষি বা শিল্পের জন্যেও ব্যবহারযোগ্য নয়।
“নীলনদের অববাহিকায় কায়রোকে সভ্যতার মাতৃক্রোড় ধরা হয়। নীলনদের জলেই কায়রোর ৯৭% কাজকর্ম চলে। দুর্ভাগ্যক্রমে কৃষি ও ঘরবাড়ির সমস্ত নোংরা জলও পড়ে গিয়ে সেই নীলনদেই। ওখানকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের মৃত্যুর এক প্রধান কারণ জলবাহী রোগে আক্রান্ত হওয়া।
“জাকার্তার দু’রকম সমস্যা। এক তো দেশের প্রায় চল্লিশ শতাংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে আছে, মেরুর বরফ যে হারে গলছে, তাতে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হয়ে উঠলে জাকার্তার অধিকাংশই ম্যাপ থেকে মুছে যাবে। তাছাড়াও শহরের এক কোটি লোকের আদ্ধেকের বাড়িতে নল দিয়ে জল সরবরাহ হয় না। যথেচ্ছ জল তোলা হয় নলকূপ খুঁড়ে, ফলে ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলের ভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষিত। প্রচুর বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ভূগর্ভস্থ অ্যাকুইফারে জল সঞ্চয় হচ্ছে না শহরটাকে কংক্রিট আর অ্যাসফাল্ট দিয়ে মুড়ে রাখার জন্যে।
“মস্কোতে জল-সমস্যা অত্যন্ত ভাবনার খোরাক, কেননা রাশিয়ায় আছে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মিষ্টি জলের ভাণ্ডার। তা সত্ত্বেও জলে টান, কেননা দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। সোভিয়েত যুগে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশনের কু-প্রভাব এখনও বয়ে চলেছে মস্কো এবং রাশিয়া। মস্কোয় সরবরাহ হওয়া জলের ৭০% হচ্ছে ভূপৃষ্ঠের জল আর তার ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশই পানীয় জলের মানের চেয়ে নিচে।
“এরকমই সমস্যা বাকি উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতেও।
“এবার বলি ব্যাঙ্গালোরের কথা। বৃহত্তর ব্যাঙ্গালোর এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম শহর, লোকসংখ্যার বিচারে তৃতীয়। অত্যন্ত দ্রুতহারে জনসংখ্যার বৃদ্ধি, গাছপালা নিধন, কংক্রিট ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে ব্যাঙ্গালোরের নাভিশ্বাস। গত পনেরো বছরে ব্যাঙ্গালোরের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০৩০ সালে ব্যাঙ্গালোরের জনসংখ্যা হবে গোটা শ্রীলঙ্কার বর্তমান জনসংখ্যার সমান। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জল পাবে না।
“ব্যাঙ্গালোর ভারতের একমাত্র বড়ো শহর যার ধারেকাছে কোনও নদী বা সমুদ্র বা বড়ো জলাশয় নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আটশো মিটার ওপরে এই শহরে জল সরবরাহ করা হয় শতাব্দী-প্রাচীন প্রযুক্তিতে, প্রায় একশো কিলোমিটার দূর থেকে কাবেরী নদীর জল পাম্প করে তুলে। কাবেরী নদী ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছে, তার জলের অধিকার নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মধ্যে নিত্য বচসা। ব্যাঙ্গালোরের দ্রুত জনসংখ্যার বিস্ফোরণের সঙ্গে কাবেরীর জল সরবরাহ তাল রাখতে পুরোপুরি অসমর্থ। যতটা জল পাম্প করে তোলা হয়, তার মাত্র ৫০ শতাংশের হিসাব পাওয়া যায়, বাকি অর্ধেকের কিছুটা নষ্ট হয় এই বিপুল দূরত্বের পাইপে ফুটো থাকায়, বাকিটা চুরি হয়। পঞ্চাশ বছর আগে ব্যাঙ্গালোরে জনসংখ্যা ছিল খুব কম, শহর আচ্ছাদিত ছিল ঘন গাছপালায় এবং তার সঙ্গে ছিল ছোটো ছোটো বহু জলাশয়–এক হাজারেরও বেশি। জলাশয়গুলো একে অপরের সঙ্গে নালা দিয়ে সংযুক্ত, যাতে একটার উদ্বৃত্ত জল নালা দিয়ে পরেরটায় গিয়ে পড়ে। ফলে সারা শহরটাই ছিল এক দুরন্ত ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’, যার ফলে বৃষ্টি হলে অনেক জল গিয়ে জমা হতে পারত ঐ জলাশয়গুলোতে। ব্যাঙ্গালোরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু ছাড়াও প্রত্যাবর্তী মৌসুমী বায়ুতেও বৃষ্টি ভালোই হত।
“সে দিন আজ অতীত। জনসংখ্যার বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত বাড়িঘর রাস্তাঘাট ইত্যাদি তৈরির ফলে গত তিরিশ বছরে শহরের ৮৫% গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে। হাজারখানা জলাশয়ের মধ্যে বেঁচে আছে তিরিশ-পঁয়ত্রিশটা, তাদের অবস্থাও কহতব্য নয়। নালাগুলো বুজিয়ে তার ওপর বাড়িঘর উঠে গেছে, ফলে বৃষ্টি হলেও জলাশয়ে আর তেমন জল জমে না। বাড়িঘরের বর্জ্য ফেলে ফেলে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক জলাশয়। দিনে দিনে তাদের জলের সঞ্চয় কমতে কমতে পুরো শুকিয়ে যাচ্ছে তারা। যেগুলো বেঁচে আছে, তাদের একটা জলও পান তো দূরের কথা, এমনকি স্নান করার উপযুক্তও নয়।
“২০১৬ সালের সমীক্ষায় ব্যাঙ্গালোরের জলদূষণের কারণগুলো এরকম–
“ঘরোয়া বর্জ্য – ৪৪.৫%; বিল্ডিং নির্মাণের বর্জ্য বা কনস্ট্রাকশন ডেব্রি – ৩৩%; কৃষি-বর্জ্য – ৮.৭%; মলত্যাগ – ৭.৭%; শিল্প-বর্জ্য – ৩.৫%; পোল্ট্রি-বর্জ্য – ২.১%।
“এসবের মাত্র ৩০% বর্জ্য শোধিত করা হয়, বাকি সব পড়ে গিয়ে ঐসব জলাশয়েই। এখন জলাশয়গুলো সব শুকিয়ে যাচ্ছে, আমাদের চোখের সামনে।
“দুটো ছবি দেখাচ্ছি, আমার নিজের তোলা, একই জায়গা থেকে। এ হচ্ছে একটা ছোটো লেক, মুন্নেকোলালা লেক, আমার বাড়ির থেকে এক কিলোমিটার দূরে। এক কিলোমিটার পরিধির এই গোলাকার লেকের চারপাশ স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাতঃভ্রমণের জায়গা। আমি গত সাত-আট বছর ধরে নিয়মিত এখানে যাই মর্নিং ওয়াকে। প্রথম ছবিটা তোলা ২০১৪ সালে, দ্বিতীয়টা কিছুদিন আগে, ২০১৯ সালে।
২০১৪ সাল
২০১৯ সাল
“পাঁচ বছরে যদিও এ লেকের জল কমে গেছে প্রায় নব্বই শতাংশ, এতে তাও কিছুটা জল আছে। বাড়ির কাছে আর এক লেক আছে, তার নাম ডোড্ডানেকুন্দি লেক। প্রায় আড়াই কিলোমিটার পরিধির এই লেকে বছর দশেক আগে অন্তত এক-মানুষ-ডোবা জল থাকত। আজ তা খাঁ খাঁ করছে, একফোঁটা জল নেই।
“নিচে গুগল ম্যাপটা দেখলে বুঝতে পারবি। Home লেখা জায়গাটায় আমি থাকি, আর নীল এরিয়ার জায়গাটা ঐ লেক। ম্যাপে দ্যাখ কতখানি জায়গা জুড়ে নীল, ঐ জায়গাটা আসলে জলাশয় হিসাবে এখনও চিহ্নিত আছে, যাতে এখন জল আছে বোধহয় কয়েক বালতি।”




* * * 

“আচ্ছা ছোটকা, জলের অভাবেই তো সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছিল, না? ওরা কি জল না পেয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছিল? সরস্বতী নামের সেই নদীটা থেকে গঙ্গার ধারে এসে গেছিল?” জলদের প্রশ্ন।
আমি বললাম, “ইতিহাসে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ আমরা যত ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি, সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণ ঠিক সেইভাবে পারি না। আমাদের হাতে তত তথ্য নেই। যা আছে, তাতে ধারণা করা যায়, জলের অভাবে শহরবাসী হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। হয়তো গাঙ্গেয় অববাহিকায়।”
সে থামল না। জিজ্ঞেস করল, “অবস্থা কি এখন এমন হতে পারে যে জলের অভাবে মানুষ শহর ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাবে?”
আমি বললাম, “তা তো পারেই। একইরকম বিপর্যয়ের পূর্বাভাস ধ্বনিত হচ্ছে এখন ভারতের বিভিন্ন শহরে। যে হারে শহরমুখী হয়েছে মানুষ, বাড়িয়েছে জনসংখ্যা, তাতে শহরগুলোর নাভিশ্বাস ওঠাই স্বাভাবিক। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নামতে নামতে এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রবল জলসঙ্কট বহু জায়গাতেই। আর এ তো কলির সন্ধে!”
জলদ বলল, “কীরকম?”
আমি বললাম, “দৈনিক কী পরিমাণ জল লাগে আমাদের, তা নিয়ে তোর ধারণা আছে? বিভিন্ন শহরে পুরসভার জল সরবরাহের মাত্রা অনুযায়ী শহরাঞ্চলে দৈনিক মাথা-প্রতি জলের প্রয়োজন ৫০০ থেকে ৭০০ লিটার। এর সিংহভাগ খরচ হয় ওয়াশিং মেশিনে এবং বাথরুমে। রান্না ও পান করার জলের পরিমাণ অনেক কম। দৈনিক মাথাপ্রতি ৪ থেকে ৬ লিটার। চাল বা শাকসবজি ধোয়াধুয়ির জন্যে যে জল লাগে, তা ধরলে আরও এক-দেড় লিটার বেশি। কিন্তু খাবার প্রস্তুত করতে যে কাঁচামাল লাগে শস্য, শাকসবজি, ফলমূল, ডিম-দুধ-মাংস ইত্যাদি, তা তৈরির প্রয়োজনে যে পরিমাণ জল লাগে, তার কাছে এই পরিমাণ নস্যি।”
অবাক হল জলদ। বলল, “মানে?”
আমি বললাম, “মানে কৃষিকাজের জন্যে যে জল লাগে, সেইটার কথা বলছি। পরিমাণটা শুনলেই বুঝবি। ধারণা করতে পারিস, প্রতিদিন একজন শহুরে মানুষ যে পরিমাণ খাদ্যগ্রহণ করেন, তা প্রস্তুত করতে মোট কতটা জল লাগে? বৃষ্টির জল এবং সেচের জল মিলিয়ে এই পরিমাণ দৈনিক মাথা-প্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার। প্রতি গ্রাম চাল তৈরিতে লাগে দু’লিটার জল, প্রতি গ্রাম গমে এক লিটার। আর প্রতি গ্রাম মুরগির মাংসে? বারো লিটার!
“চার জনের এক নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির জীবনধারণের প্রয়োজনে বছরে প্রকৃতিকে শুধু জলই সরবরাহ করতে হয় ষাট লক্ষ লিটার। হিসাব গুলিয়ে যাচ্ছে তো? ষা-ট-ল-ক্ষ লিটার!
“হ্যাঁ। এই জলের সরবরাহ বজায় রাখতে গেলে নিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর বজায় রাখা অপরিহার্য। এর একমাত্র উপায় অরণ্য প্রস্তুত করা, যা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়ায়। কংক্রিটের জঙ্গল থেকে গ্রাম-শহরকে মুক্ত করা এবং রেইন-ওয়াটার হার্ভেস্টিং, যাতে বেশি বেশি জল ভূগর্ভস্থ স্তরে গিয়ে পৌঁছায়। তাতেও যদি না পেরে ওঠা যায়, তবে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন…”
কথাবার্তার মধ্যেই পাশের ঘর থেকে দাদা বারিধির প্রবেশ। আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বলে উঠল, “সত্যি? চারজন লোকের বছরে ষাট লক্ষ লিটার জল লাগে? এত জল?”
আমি বললাম, “আমি বলছি না, এ বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলের হিসেব এটাই।”
“প্রতি গ্রাম চালের জন্যে জল লাগে দ’লিটার? এক গ্রাম চাল মানে তো ক’টা দানা মাত্র। তার জন্যেই দু’লিটার জল?”
“উঁহু, দু’লিটার লাগে শুধু বৃষ্টির জল। তার সঙ্গে আরও লাগে প্রায় পৌনে এক লিটার সেচের জল। তবে তুই পাস এক গ্রাম চাল।”
“কেন? এত জল লাগে কেন?”
“লাগবে না? চালটা কি হাওয়া থেকে আসে? চাল আসে ধান থেকে। ধান হয় ধানগাছে। ধানগাছ কী করে হয় জানিস? জমি তৈরি করতে হয়, ধানের বীজতলা বানাতে হয়, রুইতে হয়, কতগুলো সেচ দিতে হয়, আগাছা নির্মূল করতে হয়, সার-কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। তবে ধানগাছে ধান হয়। হলেই তো হল না, ধান কাটা আছে, ঝাড়াই-মাড়াই আছে, সেদ্ধ-শুকনো করা আছে, ধান থেকে চাল বের করা আছে, সে চালের পালিশ করা আছে। এতসব করে পাবি তুই চাল। এক গ্রাম চালের জন্যে কতটা গাছ তৈরি করতে লাগছে, কতটা তুষ, কতটা খড়, কতটা বিচুলি, সেই হিসেবটা দ্যাখ। তোর চাল দরকার, তুই চাল পেয়েই খুশি, বাকি জিনিসটা না হলে তো চালটা পাবি না। আর সেগুলোর জন্যেও জল চাই। তুই চাল পেলি, বাকি জিনিসটার কী হবে? তুষের ইউজ আছে, খড়-বিচুলি গোরুকে দেওয়া যায়, আগে লোকে গ্রামের দিকে বাড়ির চালেও দিত। ধানগাছের গোড়াটা, সেটার কী হবে? পাঞ্জাবের দিকে ওরা হেক্টার-কে-হেক্টার গমগাছের গোড়া জমিতেই আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তার ধোঁয়া আর ছাই আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়ায়, তৈরি করে বীভৎস ধোঁয়াশা। শীতকালে এই যে সারা উত্তর ভারত জুড়ে ব্যাপক ধোঁয়াশা, দিল্লি-চণ্ডীগঢ়ে এয়ারপোর্ট বন্ধ, এসবের পেছনে মুখ্য কারণ এটা। বুঝলি?”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। ভারতে এখন একশো তেত্রিশ কোটি লোক। এতগুলো পেটে খাবার তুলে দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা?”
“হুঁ। আমি হিসাব করছিলাম, বছরে পার হেড পনের লক্ষ লিটার জল লাগলে সারা ভারতবাসীর জল লাগে প্রায় দু’হাজার লক্ষ কোটি লিটার। মানে দুইয়ের পর পনেরোটা শূন্য বসালে যা হয়…”
“ঠিক। তিনটে শূন্যতে থাউজ্যান্ড, ছ’টা হলে মিলিয়ন, ন’টায় বিলিয়ন, বারোটায় ট্রিলিয়ন, পনেরোটা শূন্য হলে কোয়াড্রিলিয়ন। দুই কোয়াড্রিলিয়ন লিটার জল লাগে বছরে।”
“এই যে বললে এক গ্রাম চালের জন্যে কতটা গাছ বানাতে লাগছে, এই হিসাবটা কিন্তু আগে মাথায় আসেনি, জানো? ইন্টারেস্টিং!”
“শুধু গাছ বানাতে লাগছে না রে পাগলা, এর পেছনে আরও জিনিস আছে। ঐ যে গাছটা তৈরি করতে লাগছে, তার পেছনে যতটা সার দিতে লাগছে, সেটাও তো তৈরি হচ্ছে কোনও এক কারখানায়। তার জন্যেও জল লাগছে, কেমিক্যাল লাগছে, এনার্জি লাগছে, মানুষ লাগছে। তেমনি কীটনাশকের জন্যেও।”
“হ্যাঁ, এই দুটো তো লাগেই।”
“আরও আছে। ঐ ধান জমি থেকে যাবে কোনও এক জায়গায়, তার পরিবহণের জন্যে যা যা লাগে, তার জন্যেও দেখবি জল লাগে, এনার্জি লাগে। সিদ্ধ করতে তো লাগেই। প্রতিটা স্টেপে এইসব লাগে। তারপর আরও জিনিস আছে। এই যে জমিতে সার দেওয়া হল সুপার ফসফেট, বৃষ্টিতে ধুয়ে এর কিছু তো চলে যায় অন্যান্য জলাশয়ে। ফসফেট এবং অন্যান্য মিনারেল জলে থাকলেই সেই জলে শ্যাওলা ও পানার আধিক্য দেখা দেয়। এতে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে জলচর প্রাণী যেমন মাছের দফারফা। ধানের জমিতে আনেরোবিক ব্যাক্টেরিয়ার প্রকোপে মিথেন গ্যাস সৃষ্টি হয়, যা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পোটেনশিয়ালে এই মিথেন হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বাপ। জমির কীটনাশক জলে মিশে জলের মধ্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীকে মেরে ফেলতে পারে। ফলে ফুড চেন ব্যাহত হয়, মাছ-ব্যাঙ-সাপ এরাও মারা পড়ে, ইকো-সিস্টেমের বারোটা বেজে যায়। যদি বা মারা নাও পড়ে, মাছের শরীরে থাকলে মানুষের শরীরেও ঢুকবে যখন আমরা সেই মাছ খাব। এবার পুরো ব্যাপারটা বোঝ। তোর চাই ভাত। চাষ করছিস ধান। তার ফলে এতসব ব্যাপার ঘটছে। এই পুরো ব্যাপারে প্রতি গ্রাম চাল উৎপাদনের জন্যে কত জল লাগবে, কত এনার্জি লাগবে, কত গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হবে, পরিবেশ, অন্যান্য প্রাণী ও মানুষের ওপর তার কতখানি ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে–সব হিসাব করে তৈরি করা হয় কিছু নাম্বার। এই নাম্বারই হচ্ছে ফুটপ্রিন্ট। ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট, কার্বন ফুটপ্রিন্ট। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় জীবনচক্র পর্যালোচনা বা লাইফ সাইকল অ্যানালিসিস।”
“বাব্বা। সামান্য এক গ্রাম চাল, তার পেছনে এত কিছু?”
“তবে আর বললাম কী!”
“তাহলে কি কাল থেকে রুটি খাব? চালে বলছ জল বেশি লাগে, গমে কম। তাহলে তো রুটি খেলে জল বাঁচবে। যদি সবাই রুটি খাই?”
“আমি তো মাত্র কয়েকটা খাবারের নাম বলেছি। যদি আমাদের পুরো খাবারের প্লেট ধরে আলোচনা করা হয়, মানে তাদের লাইফ সাইকল অ্যানালিসিস করে, তাহলে তার যা রেজাল্ট হবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা করতে পারলে মঙ্গল।”
“সেরকম কেউ করেনি?”
“করেছে।”
“তো ধানাই পানাই না করে সেটা বলে ফেলছ না কেন?”
“কেননা সেটা আমি বলতে চাই না। তুই, তোরা দু’জনেই এ নিয়ে একটু পড়াশুনা কর। করলে উত্তর নিজেরাই পেয়ে যাবি। তখন সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হবে।”
“আচ্ছা, এটুকু তো বলো, ভেজ না নন-ভেজ, কীসে জল বেশি লাগে?”
“কীসে লাগে বলে তোর মনে হয়?”
“নন-ভেজ।”
“কেন?”
“কেননা গরু-শুয়োর-ছাগল-ভেড়া সবাই যা খেয়ে বড়ো হয়, সেগুলোতেই কত কত জল লাগে। আর এক কেজি খাবার খেয়েই তো ওদের ওজন এক কেজি বেড়ে যায় না, বাড়ে মাত্র কয়েক গ্রাম। তাই…”
“কিন্তু দাদা,” জলদ মধ্যে থেকে বলে উঠল, “এরা তো মানুষের ফেলে দেওয়া জিনিস খাবার হিসাবে খায়, ঘাস খায়। তাহলে বেশি জল লাগছেটা কোথায়?”
আমি বললাম, “হি হ্যাজ এ পয়েন্ট। সেই জন্যেই এই প্রশ্নের উত্তর স্ট্রেট ফরোয়ার্ড নয়। বিদেশে নন-ভেজ হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি, সেখানে এর হিসাব আলাদা। প্রচুর জল লাগে। আমাদের দেশে একটু কম, কিন্তু ভেজিটারিয়ান খাবারের তুলনায় বেশ বেশি। গুগল করে দেখ।”

* * *

“তাহলে প্রোজেক্টটার শেষে কী লিখব, ছোটকা?” আবার দুই মক্কেল আমার মুখোমুখি।
আমি বললাম, “তোরা যদি ভেবে থাকিস, আমি তোদের প্রোজেক্ট লিখে দেব, সে আশা এখনই ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দে। আমি শুধু কতগুলো তথ্য তোদের সামনে হাজির করলাম মাত্র। আর রিভার্স অসমোসিসের থিওরি জিজ্ঞেস করলি বলে একটু ধানাই-পানাই করলাম। লাইফ সাইক্ল অ্যানালিসিস নিয়ে দুয়েকটা কথা বললাম। কিন্তু কীভাবে কনক্লুড করবি, সেটা তোদের ব্যাপার।”
“আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে।” বারিধি বলল, “এই জায়গাটা দেখো তো। এরকম লিখেছি – 
উনিশে জুন ২০১৭ সালে বিজনেসওয়ার্ল্ড লিখল, ২০৩০ সালের মধ্যে একুশটা ভারতীয় শহর জলশূন্য হয়ে যাবে। এই তালিকায় আছে ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি, গুরগাঁও, হায়দ্রাবাদ, চেন্নাই, কোয়েম্বাটোর, বিজয়ওয়াড়া, অমরাবতী, সোলাপুর, সিমলা, কোচির মত শহর। জলবায়ুর পরিবর্তন, চটজলদি গ্রীষ্মের প্রত্যাবর্তন, কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সরকারি অনুশাসনে উদাসীনতা এর প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাঙ্কই জানিয়েছে এই একুশটা শহর ২০২০ সালের মধ্যে তাদের ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলবে, অর্থাৎ কেপটাউনের ডে জিরোর দশা হবে তাদের। ২০৩০ সালে ৪০ শতাংশ ভারতবাসী পানীয় জল পাবে না।
মহারাষ্ট্রের মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলে লাটুরের সাম্প্রতিক ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাত্র কিছুকাল আগেই তাদের পুরসভা জানিয়েছিল, মাসে একদিনের বেশি তারা জল সরবরাহ করতে পারবে না। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি, ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেওয়া হয়েছে যথেচ্ছ, তার ওপরে জলের ব্যবহারে কোনও ম্যানেজমেন্ট নেই–কোত্থেকে আসবে তবে সরবরাহ? উপায়হীন সরকারকে রেলগাড়িতে জল সরবরাহ করতে হয় শেষে। স্থানীয় অধিবাসীরা এমনকি চাষিরাও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল কিছুদিনের জন্য।
শুধু মহারাষ্ট্রের অবস্থাই উদ্বেগজনক নয়, এই চিত্র সমগ্র ভারতব্যাপী। মহারাষ্ট্রে সঞ্চিত জলের পরিমাণ এখন মাত্র ৩০ শতাংশ, কিছু কিছু এলাকায় একেবারে শূন্য। সারা ভারতের ৫৪ শতাংশ এলাকায় জলাভাব। বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাবে ২০৩০ সালে ভারতে জলের প্রয়োজন হবে ১.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার, যেখানে বর্তমান ক্যাপাসিটি মাত্র ৭৪০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার অর্থাৎ প্রয়োজনের অর্ধেক। ইউনাইটেড নেশনসের মতে ১২২টা দেশের মধ্যে জলের গুণমানের বিচারে ভারতের স্থান ১২০ নম্বরে, কেননা সরবরাহ হওয়া জলের ৭০ শতাংশই দূষিত ও অপেয়।
একুশটা ভারতীয় শহরের অন্যতম চেন্নাইয়ে তিনটে নদী, চারটে বৃহৎ জলাশয়, পাঁচটা জলাভূমি ও ছ’টা বনভূমি পুরো শুকিয়ে গেছে, ২০১৯ সালের জুন মাসের খবর। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি বৃষ্টি ও জলবণ্টন সত্ত্বেও। সাম্প্রতিক অতীতে চেন্নাইয়ে নতুন সমস্ত বিল্ডিং প্রোজেক্টে রেইন-ওয়াটার হারভেস্টিং আবশ্যকীয় করা হয়েছিল, তা সত্ত্বেও এই বিপর্যয়। এখন বিশাল বিশাল ডিস্যালিনেশন প্লান্ট অর্থাৎ সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করে পানীয় জল তৈরি ছাড়া সম্ভবত আর রাস্তা নেই। বলা বাহুল্য, ডিস্যালিনেশন ব্যয়বহুল প্রকল্প এবং একমাত্র উপকূলের অঞ্চলেই সম্ভব। দেশের অভ্যন্তরে জলের সমস্যার সমাধান তা দিয়ে সম্ভব নয়।
ভারতে বৃষ্টিপাত এখন অনেকটা বাচ্চাদের কান্নার মতো, মুডের ওপর নির্ভরশীল। কখন যে আসবে, তার ঠিক নেই। সারাবছরে যত বৃষ্টি হয়, তার অর্ধেক হয় মাত্র পনেরো দিনে। নদীগুলোর জলপ্রবাহ ঠিকঠাক বজায় থাকে বছরে মাত্র চার মাস। এসব খেয়াল করে অতীতে ভারতে বেশ সুন্দর জলবণ্টন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। জনবিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমশ অপ্রতুল হয়ে পড়ল। এই বৃষ্টিপাতের খুব অল্প অংশই ভারত তার স্বাভাবিক ও কৃত্রিমভাবে নির্মিত জলাশয়গুলোতে সঞ্চিত রাখতে পারে। আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার ঊষর জায়গাতে ওরা যেমন বিশাল বিশাল এলাকা জলসঞ্চয়ের জন্যে তৈরি করেছে, ভারতে সে তুলনায় বলতে গেলে প্রায় কিছুই হয়নি। এই দুই দেশে ওরা প্রতি মানুষের জন্যে সঞ্চয় রাখতে পারে প্রায় ৫০০০ কিউবিক মিটার জল, চিনেও এর পরিমাণ ১০০০ কিউবিক মিটারের মতো, ভারতের বাঁধগুলোতে সেখানে জল সঞ্চয় করতে পারে জনপ্রতি মাত্র ২০০ কিউবিক মিটার।
ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অবস্থাও তেমনি। শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোতে যেখানে সেখানকার মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের আশি শতাংশ ব্যবহার করে, ভারত ব্যবহার করে মাত্র কুড়ি শতাংশ। যদিও ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে এবং হিমালয়ের নদীগুলো থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সহজ, এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি।
এতে কোনও সন্দেহই নেই যে ভারতে জলসঞ্চয়ের প্রয়োজন বাড়তেই থাকবে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এখন আর তর্কের বিষয় নয়, প্রমাণিত সত্য। হিমালয়ের শীর্ষগুলো যে হারে তাদের বরফের মুকুট হারাচ্ছে, তাতে পরবর্তীতে নদীগুলোতে কী পরিমাণ জল থাকবে, আদৌ থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। যত এর তারতম্য ঘটবে, তত জল সঞ্চয়ের প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেবে।
এখন ভারতে আছে ২০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার জল সঞ্চয়ের ব্যবস্থা। ৯ কোটি হেক্টর জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করতে হয় তা থেকে, তৈরি করতে হয় ৩০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ। কোনও সন্দেহ নেই এগুলো স্থাপন করার জন্যে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হচ্ছে ঠিক সময়ে জলসেচ করতে পারার জন্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শস্য চাষ হচ্ছে এবং ভারতের বিশাল জনসংখ্যাকে গত কয়েক দশক ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রেখেছে। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে শিল্প ও সেচের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এসব কখনই সম্ভব হত না জলসঞ্চয় প্রকল্পগুলোর সূচনা না হলে। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পগুলো রূপায়িত করার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এমনকি প্রান্তিক মানুষরাও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে পেরেছে। অথচ নতুন কিছু প্রকল্প সৃষ্টি করতে গেলেই সরকারকে সব সময়েই সম্মুখীন হতে হয় বিপুল বাধার। এটা আমাদের গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্যজনক চিরকালীন সমস্যা।
আমি বললাম, “বাহ্‌, ঠিকই তো লিখেছিস। কিন্তু এইভাবেই কি শেষ করবি? এটা তো ঠিক শেষ হল না।”
বারিধি বলল, “হ্যাঁ, শেষটা একটু হেল্প করো না।”
আমি বললাম, “না। এর শেষ করা আমার কম্মো নয়, এর শেষ তোদের হাতে। আমরা, যারা ভাবি আমরা জানি, তারা যদি সত্যিই জানতাম, তাহলে তো আমরা কিছু করতাম। তাহলে তো এই সমস্যার মুখোমুখিই হতে হত না আমাদের। আমার প্রজন্ম হয়তো সত্যিই সমস্যাটা অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারিনি। তোরা এটা নিয়ে পড়াশুনা কর, ভাব, ভেবে বের কর কী করা দরকার। সরকারের কাজ যেমন আরও জলসঞ্চয় প্রকল্প রূপায়িত করা, উপকূল অঞ্চলে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট বসিয়ে সমুদ্রের জল থেকে পানীয় জল তৈরির ব্যবস্থা করে সরবরাহ নিশ্চিত করা, নিয়মিত ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা বজায় রেখে জল সঞ্চয় বৃদ্ধি করা ও বন্যা রোধ করা, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে নদীর জলের অধিকার নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা, জল নষ্ট বা দূষিত করলে তার শাস্তি নির্দিষ্ট করা ও সেই অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা, জলের ব্যবহার রিডিউস-রিসাইক্ল-রিইউজের জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া, তেমনি সাধারণ মানুষেরও অনেক দায়িত্ব আছে।”
“ঠিক। যেমন আরও আরও গাছ লাগানো, অরণ্যসম্পদ বৃদ্ধি করা ও গাছকাটা বন্ধ করা, প্লাস্টিক ও কংক্রিটের দূষণ বন্ধ করা, রেইন-ওয়াটার হার্ভেস্টিং, নদীগর্ভে চাষবাস বন্ধ করা, গ্রিনহাউস গ্যাস রোধ করা, চাষবাসের প্রকরণ ও প্রয়োজনে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করা যাতে জলের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়, সমস্ত রকম জল নষ্ট করা বন্ধ করা, এইসব, তাই না?”
“হ্যাঁ। আর এসবে কাজ না হলে আরেকটা উপায় তো আছেই।”
“কী সেটা, ছোটকা?” জলদ জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, “বাংলার লোকগীতির গায়কদের মতো ঘরসংসার ছেড়ে প্রকৃতির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে প্রার্থনা করা–আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই, আল্লা ম্যাঘ দে…”

_____

No comments:

Post a Comment