উপন্যাসিকাঃ সোনালি মৃত্যুর হাতছানিঃ অদিতি সরকার



এক


পূরণচন্দের সঙ্গে আকাশের প্রথম দেখা হয়েছিল হরিদ্বারে, শ্রাবণী পূর্ণিমার মেলায়।
আকাশের সেদিন সকাল থেকে মেজাজ বেশ খারাপ। সেদিন কেন, গত কয়েকদিন ধরেই মেজাজ ঠিক ছিল না তার। এতদিনের পুরনো সার্কাসের চাকরিটি তার গেছে মাস ছয়েক হল। কেন গেছে সেটা নয় না বলাই থাক। ওটুকু হাতসাফাই কে না করে? ম্যানেজার দেখেও না দেখা করে দিব্যি থাকতে পারত। তা নয়, ধম্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির একেবারে চাকরি থেকেই ছুটি করে দিল। যা দিনকাল, হুট বলতেই চাকরি আর জুটছে কোথায়? এমনিতেই সার্কাসের ব্যাবসাই এখন প্রায় লাটে ওঠার মুখে। ফলে আকাশের মতো আর্টিস্টকে কিনা এখন এসব ফালতু মেলা ফেলায় খেলা দেখিয়ে রুটির জোগাড় করতে হচ্ছে! তাও যদি সেরকম ভিড় হত। লোকে হামলে পড়ে চাট খাবে, দহি-বড়া খাবে, হাজারটা অদরকারি জিনিস কিনবে, তবুও দুটো পয়সা খরচা করে আকাশের খেলা দেখবে না। কিন্তু আকাশের তো খরচা তা বলে কম হয় না। স্টলের ভাড়া আছে, দু-চারটে লোকও রাখতে হয় সাহায্য করার জন্য। বিনা পয়সায় এর কোনওটাই হয় কি? ফলে লাভের মুখ দেখা দূরস্থান, জমা টাকা ভেঙে চালাতে হচ্ছে আকাশকে।
এইরকম মনের অবস্থা, তার মধ্যে যদি সামনে দিয়ে একটা লোক বারবার মুখে একটা বেশ চোখে পড়ার মতো ব্যঙ্গের হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কার না রাগ হবে! তাও শুধু আজ নয়। গত তিনদিন ধরেই লোকটাকে দেখছিল আকাশ। ঠিক মেলা দেখতে আসে বলেও মনে হয় না। মেলা তো খোলে বিকেলে, লোকটা কিন্তু সকাল থেকেই মাঠে ঘুরঘুর করে বেড়ায়। ঘোরেও একটা নির্দিষ্ট ছক ধরে। এই ক’দিনে সেটা বুঝে গেছে আকাশ। খাওয়াদাওয়ার দোকান, বাচ্চাদের দোলনা কি নাগরদোলার দিকে আদৌ যায় না। কেনাকাটাতেও নেই। ও শুধু চক্কর কাটে মাঠের এই দিকটায়, যেখানে সব নিশানাবাজির খেলা চলে। বন্দুক ছুড়ে বেলুন ফাটানো, ডার্টবোর্ডে চাঁদমারি। আর আকাশের নাইফ থ্রোইং। সবথেকে বেশি সময়টা কাটায় আকাশের স্টলের সামনেই। ঘোরে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, কিন্তু নিজে একটা খেলাও খেলে না। আর তারপর মুখে ওই আলগা তাচ্ছিল্যের হাসিটা ঝুলিয়ে সরে যায়।
কেন যেন আকাশ সেদিন ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিল। দশটা টিকিটও বিক্রি হয়নি মেলা খোলা ইস্তক, সেটাও হয়তো একটা কারণ। কিছু না ভেবেই আকাশ ডেকে বসেছিল লোকটাকে। “কী ভাইসাব, শুধু সামনে দিয়ে ঘুরেই যাবেন? খেলা-টেলাও তো দেখতে পারেন একটু। একটা টিকিট বিশ রুপিয়া। আপনার মতো লোকের হাতের ময়লা।”
ইচ্ছে করেই একটু মাখন লাগিয়ে কথা বলেছিল আকাশ। অবশ্য মাঝবয়সী লোকটার চেহারা বা জামাকাপড় দেখে তাকে বড়োলোক না হোক, গরিবও মনে হচ্ছিল না মোটেও। বরং কোথাও যেন একটা আবছা হয়ে আসা বনেদিয়ানার ছায়া উঁকি দিচ্ছিল লোকটার লম্বা চওড়া টানটান গড়নের আড়াল থেকে।
লোকটার মুখের হাসিটা আর একটু স্পষ্ট হয়েছিল। “কী খেলা দেখাবে? ওই যে পোস্টারে আঁকা রয়েছে, ওইগুলো? বাচ্চা ভোলানো?”
খোঁচাটা আকাশকে চিড়বিড়িয়ে দিলেও সে বাইরে সেটা প্রকাশ করে না। “কীরকম খেলা চাইছেন স্যার একটু যদি বান্দাকে বলেন।”
“চাকুর খেলা দেখাতে এসেছ ওস্তাদ, আর কী খেলা দেখতে চাইছি বুঝতে পারছ না?”
লোকটার তেরছা তেরছা কথা বলার ধরনটা বিশেষ সুবিধের লাগছিল না আকাশের। সে কিছু বলার আগেই আবার চিমটি কাটে লোকটা। “ওসব বেলুন ফোটানো, আপেল কাটা অনেক দেখেছি। সাচ্চা সাহসের খেলা দেখাতে পারো তো দেখি। তবে বুঝব তোমার হাতের নিশানায় দম আছে, চোখে ধার আছে।”
সাচ্চা সাহস মানে? আকাশের ভেতরটা ছাঁত করে ওঠে। মানুষ খুন-টুন করতে বলছে নাকি লোকটা? ততক্ষণে এপাশ ওপাশ থেকে কয়েকজন দাঁড়িয়ে পড়েছিল তাদের এই অদ্ভুত কথাবার্তা শুনতে। আকাশ একবার সবার উৎসুক মুখগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়।
“ওই যে পোস্টারে এঁকে রেখেছ, দাঁড় করানো মানুষের মাথায়, হাতে কাঁধে ফল। মানুষের গায়ে ছুরি লাগবে না, কিন্তু ফল কেটে যাবে। পারবে ও খেলা দেখাতে? এই তিনদিন ধরে ঘুরছি, কই, একদিনও তো দেখলাম না তোমায় ও-জিনিস দেখাতে? শুধু মিথ্যে বিজ্ঞাপন বুঝি? লোক টানার কায়দা?”
মাথার ভেতরটা ঝাঁ করে জ্বলে ওঠে আকাশের। সার্কাসে এই খেলার জন্যই বিখ্যাত ছিল সে। অন্যান্য সার্কাস থেকে কত লোক কতবার বেশি টাকা দিয়ে তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে শুধু এই একটি খেলার জন্য। সেই নাইফ-মাস্টার আকাশকে খোঁটা দিচ্ছে কোথাকার কে একটা উজবুক?
“পারি। মিথ্যে নয়।” লোকটার চোখে সোজা চোখ রাখে আকাশ।
“তবে দেখাচ্ছ না কেন?” লোকটার চোখও জ্বলে ধকধক।
“ওর জন্য ট্রেইনড লোক লাগে। যে ভয় পাবে না, নড়বে না। আমার কাছে এখন সেরকম লোক নেই।”
“হাসালে। লোক নেই। এত বড়ো মেলায় তুমি লোক পাচ্ছ না? ভলান্টিয়ার ডাকো ভিড় থেকে।”
“না। এ খেলায় ভলান্টিয়ার নেওয়া যায় না। আমার নিশানায় চুক হবে না ঠিকই, কিন্তু ট্রেনিং ছাড়া লোক সাহস করে স্থির দাঁড়াতে পারবে না স্টেজে। মুখের সামনে ছুরি উড়ে আসতে দেখলে একটু হলেও কেঁপে যাবে। যাবেই। তারপর যে কাণ্ডটা হবে তার দায় কে নেবে, আপনি?”
“আসলে তোমার বাহানা ওসব। নিজের কলিজায় দম নেই।”
“কী বললে? আমি ভীরু?” এতক্ষণের চেপে রাখা রাগ এবার আগুন হয়ে ফেটে পড়ে আকাশকে জ্বালিয়ে দিয়ে। “বেশ। ডাকছি আমি ভলান্টিয়ার। তোমাকেই ডাকছি। তুমি আসবে? দাঁড়াবে আমার ছুরির সামনে?”
“আসব। দাঁড়াব।” আকাশকে অবাক করে দিয়ে লোকটা জবাব দিয়েছিল। “কোথায়, কীভাবে দাঁড়াতে হবে বলো।”
জমা ভিড় থেকে বিস্ময়ের গুঞ্জন উঠেছিল একটা। লোকটা ঘুরে তাকিয়েছিল ওদের দিকে। “বিনা পয়সায় তামাশা দেখবে ভাবছ, ভাইলোগ? সেটি হবে না। টিকিট কাটো, তাঁবুতে ঢোকো। কথা দিচ্ছি এমন খেলা জিন্দগিতে দেখোনি। আর দেখবেও না।”
আকাশ হাঁ করে তাকিয়ে ছিল লোকটার দিকে।
“কী দেখছ ওস্তাদ? চলো চলো, ভেতরে চলো। রেডি হও। পূরণচন্দ যদুবংশীকে চ্যালেঞ্জ করেছ ভাইয়া, খেল তো দেখাতেই হবে।”
দেখিয়েছিল খেলা আকাশ। অনেকদিন পরে হলেও দেখিয়েছিল। একটু ভয় ছিল ঠিকইーঅচেনা টার্গেট, বেশ কিছুদিনের অনভ্যাস। তবে উলটোদিকে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পূরণচন্দকে দেখে নিজে থেকেই তার হাতে সেই পুরনো ছন্দ ফিরে এসেছিল।
আগুনের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল খবরটা। সেই রাতে আরও তিনবার খেলাটা দেখাতে হয়েছিল আকাশকে। প্রতিবারই পূরণচন্দ দাঁড়িয়েছিল তার ছুরির সামনে, হাতে মাথায় কমলালেবু নিয়ে।
লোকটাকে নিয়ে আকাশের কৌতূহল বাধা মানছিল না। কিন্তু কোনও প্রশ্ন করতে গেলেই পূরণচন্দ তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল। “এখন নয়। রাতে তোমার জন্য মেলা গ্রাউন্ডের বড়ো ফটকের সামনে অপেক্ষা করব আমি। মেলা ভাঙলে কাজকর্ম গুছিয়ে ওখানে চলে এসো। কথা আছে।”


দুই


এক সন্ধেয় অনেক টাকা রোজগার করিয়ে দিয়েছিল আকাশকে পূরণচন্দ, চাইলেও এই সত্যিটা অস্বীকার করতে পারত না আকাশ। অনেকটা সেই কৃতজ্ঞতা, অনেকটা নিজের কৌতূহল তাকে পায়ে পায়ে বড়ো ফটকের সামনে নিয়ে গিয়েছিল সেই রাতে।
বহু পুরনো জং ধরা মস্ত গেটটার ঠিক বাইরে ডানদিকের বুড়ো নিমগাছটার গুঁড়িতে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিল পূরণচন্দ। আকাশকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “চলো, সামনের ওই হোটেলটায় খেতে খেতে কথা বলা যাবে। আমিই খাওয়াব, চিন্তা নেই।” খুব হালকা হেসে হাঁটতে শুরু করল পূরণচন্দ। আকাশ চুপচাপ সঙ্গ নিল। সে এখন শুধু শুনে যাবে, ঠিকই করে নিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা বোঝার আগে মুখ খোলা নির্বুদ্ধিতা হবে।
ধৈর্যের পরীক্ষা বেশ ভালোমতনই দিতে হল। খাওয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছনোর আগে মুখই খুলল না পূরণচাঁদ। সমস্ত মনোযোগ সামনের থালায় রেখে খেয়ে গেল চোখ পর্যন্ত না তুলে। আকাশ বুঝতে পারছিল এটাও একধরনের পরীক্ষা নিচ্ছে তার পূরণচাঁদ। তাই সেও কোনও মন্তব্য বা প্রশ্ন কিছুই করছিল না। বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে পড়ে পাওয়া পরোটা আর মুরগা-কারিটাই চেখে চেখে খেয়ে নিচ্ছিল।
চার নম্বর রুটিটার আধখানা বাকি থাকতে অবশেষে কথা বলল পূরণচাঁদ। “বলো, কী জানতে চাও।”
উত্তর না পেয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে। “কী হল, বলো।”
আকাশ থালা থেকে চোখ তোলে না। “আমার তো কিছু জানার নেই। কথা আছে বলে তুমিই তো আমায় ডেকেছিলে।”
“বাহ্! সেয়ানা আছ তো বেশ। হ্যাঁ, আছে কথা। তার আগে বলো, তোমার সার্কাসের চাকরিটা গেল কেন।”
এবার চমকে ওঠে তাকাতে বাধ্য হয় আকাশ। পূরণচাঁদের ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসি লেগে আছে। “কী করে জানলাম ভাবছ? তোমার পোস্টারেই তো আছে।”
“কী আছে?”
“কেন, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস! নাইফ-মাস্টার আকাশ। আছে না?”
“আছে, কিন্তু তার সঙ্গে চাকরি যাওয়ার কী যোগ?”
“শোনো হে নাইফ-মাস্টার। বিজ্ঞাপন দিচ্ছ নামকরা সার্কাসের, আর খেলা দেখাচ্ছ গেঁয়ো মেলায় স্টল ভাড়া করে? গোলমালের গন্ধ তো ওখানেই পাওয়া যাচ্ছে, নাকি? অবশ্য গন্ধ পেলেই যে গোলমাল থাকবে এমন আমি বলছি না। আমি জেনেছি অন্যভাবে।”
“কীভাবে?” আকাশের গলা শুকনো।
“পোস্টারটা বোধহয় সার্কাস থেকেই সঙ্গে এনেছিলে, তাই না? তা ওটার নিচের দিকে যে সার্কাসের ফোন নম্বর দেওয়া আছে, খেয়াল করেছ কখনও? নাইফ-মাস্টারের খোঁজ নিতে একটা ফোন মেরেই দিয়েছিলাম তাই। তোমার ম্যানেজারটি তো দেখলাম বেজায় ক্ষেপে আছে। সত্যিই চুরি-টুরি করেছিলে নাকি?”
“সবাই যখন বলছে, তখন ধরে নাও তাই।”
“উঁহু। শোনা কথায় বিশ্বাস করে এই পূরণচন্দ চলে না। তুমি কী বলছ সেটা জানা দরকার। কারণ, ম্যানেজার আরেকটা কথাও বলেছে আমায়। সেটা সত্যি হলে হিসেবটা মিলছে না।”
“কী কথা?”
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে আকাশ। মাথা নিচু করে। তারপর খুব নিচু গলায় বলতে শুরু করে। “ওর খিদে পেত। খুব। রাঁধুনি যতটুকু দিত তাতে পেট ভরত না ওর। শরীরটা বামন হলেও খিদেটা তো পূর্ণবয়স্ক একটা লোকের মতোই ছিল। অথচ আর একটু চাইলে খাবারের বদলে জুটত মার। সেও অমানুষিক। রোজ রিংয়ে অঙ্গভঙ্গি করে লোক হাসাত বলে ওর যন্ত্রণার কান্নাটাও ছিল ওদের হাসির খোরাক। আর সহ্য করতে না পেরে সেদিন চুরি করেছিল। ক’টা ফল, একটু পাউরুটি। ধরতে পারলে ওকে মারতে মারতে শেষই করে দিত ওরা। তাই, আমার ওপরেই দায়টা নিয়েছিলাম, ওকে আড়াল করে।”
“সাবাশ।”
“মানে?”
“মানে তুমি চাইলে সত্যিটা নাও বলতে পারতে। ম্যানেজার কী বলেছে আমি তোমায় বলিনি তো।”
“কী বলেছে?”
“তুমি যার জন্য নিজের ঘাড়ে চোর অপবাদ নিয়ে বাঁধা চাকরিটা খোয়ালে, সে-ই সব বলে দিয়েছিল তুমি চলে যাওয়ার পর। সে নিজেও চলে গেছে সার্কাসের চাকরি ছেড়ে। ম্যানেজার হা-হুতাশ করছিল ফোনে। তুচ্ছ একটু ভুল বোঝাবুঝিতে তোমার মতো স্টার অ্যাট্রাকশনকে হারিয়েছে সে। আমার কাছে জানতে চাইছিল তোমার ঠিকানা। যা বুঝলাম দরজা খুলেই বসে আছে তোমার জন্য। শুধু একবার তোমার গিয়ে দাঁড়ানোর ওয়াস্তা।”
“বলে দিয়েছে? সব বলে দিয়েছে!” বিস্ময় চাপতে পারে না আকাশ।
“তাই তো শুনলাম। দেখো এবার কী করবে। সার্কাসে ফিরে গেলে কিন্তু কাজ পাক্কা।”
“নাহ্। এত বছর ধরে আমাকে দেখেও যখন ঘাড়ে চুরির দায় চাপিয়ে তাড়িয়ে দিতে দ্বিধা হল না ওদের, ও-জায়গায় আমি আর ফিরছি না। আর সত্যি বলতে আজকাল কারও হুকুম মানতে ভালোও লাগে না। বড়ো খারাপ অভ্যেস হয়ে গেছে এই ক’মাসে। নিজের মতো আছি, বেশ আছি। দুটো ডাল-রুটির ব্যবস্থা করেই দেন উপরওয়ালা।” একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে আকাশ। তার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। “শুধু একটা জিনিসই একটু হেঁয়ালি ঠেকছে।” জলের গেলাসটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলে সে।
“কী?”
“তুমি। আমার পেছনে কেন পড়লে সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।”
পূরণচন্দ মুচকি হাসে। “বুঝবে। কিন্তু তার আগে তোমায় একটা গল্প বলি শোনো।”
“শোনাও।” চেয়ারে হেলান দেয় আকাশ।


তিন


“প্রায় সাতশো বছর আগের কথা। সাতশো কেন বলছি, আরও শ-খানেক বছর পিছিয়েই যাই বরং। এ-গল্পের শুরু তো তখনই।
“রাজস্থানের থর মরুভূমির বুক চিরে তখন চলত অসংখ্য লম্বা লম্বা ক্যারাভান। উট, ঘোড়া, মানুষ নিয়ে এক বিরাট রঙচঙে জমজমাট ব্যাপার। চিন, তুর্কিস্তান, এমনকি ফিরঙ্গিদের দেশ থেকেও সওদাগররা আসত তাদের পসরা নিয়ে। রেশম, দারুচিনি, ধুনো, দামি পাথর, আরও কত কী। মরুস্থলী নিরাপদে পার হতে পারলে তবেই তারা পৌঁছত দিল্লির বাজারে।
“এই পথে, আজকের জয়সলমির শহর থেকে একটু দূরে, জয়সলমিরের নাম শুনেছ তো?”
আকাশ মাথা নাড়ে। “সার্কাসে থাকতে দু-তিনবার শো করতে যাওয়া হয়েছিল ওখানে।”
“বাহ্। তবে তো চেনা জায়গা। যাই হোক, গল্পটা বলি শোনো। জয়সলমির থেকে একটু দূরে ছিল লোদ্রবা নগর। সেখানে রাজত্ব করতেন ভাটি রাজপুতরা। রাজাকে ওদেশি ভাষায় বলা হত রাওয়াল।
“রাওয়াল দেওরাজের বড়ো ছেলের নাম জয়সল। কোনও কারণে বাবার পরে রাজত্ব তিনি না পেয়ে পেলেন তাঁর এক সৎভাই। জয়সল বেরোলেন নিজের রাজ্যের জন্য জায়গা খুঁজতে। মরুভূমির বালি থেকে উঁচু মাথা তুলে জেগে ছিল ত্রিকূট পাহাড়। পছন্দ হল রাজকুমারের। পাহাড়ের চুড়োয় দুর্গ তৈরি হল, তাকে ঘিরে গড়ে উঠল নতুন নগর। রাওয়াল নিজের নামে নগরের নাম রাখলেন জয়সলমের।
“ভাটিরা খুব যুদ্ধবাজ ছিল, বুঝলে তো। লুটপাটে চৌকস যাকে বলে। ওই যে বললাম সওদাগরি কাফেলা, সেগুলোর ওপর প্রায়ই তাদের হামলা চলত।
“এরকমই একটা মস্ত কাফেলা আসছিল আফগানিস্তান থেকে দিল্লি। বিশাল ক্যারাভান। হাজার তিনেক ঘোড়া আর খচ্চরের পিঠে চড়িয়ে দামি দামি রত্ন আর সোনাদানা আনা হচ্ছিল। সেসময় জয়সলমিরের রাওয়াল ছিলেন জেত সিংহ। মহামূল্য রত্নসম্ভারের খবর পেয়ে লোকজন নিয়ে জেত সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ক্যারাভানের উপর। লহমায় শেষ হয়ে গেল সওদাগররা। লুঠের মাল ভাগাভাগি করে নিয়ে ভাটিরা ফিরে গেল দুর্গে।
“দিল্লির মসনদে তখন বসে আছেন দুর্ধর্ষ তুর্কি সুলতান আলাউদ্দিন খলজি। এ-খবর যথাসময়ে তাঁর কানে গেল। আগুনের মতো জ্বলে উঠলেন সুলতান। সৈন্যসামন্ত নিয়ে আক্রমণ করলেন জয়সলমির।”
“বাবা, তোমার তো সব মুখস্থ দেখছি। একেবারে গড়গড় করে বলে যাচ্ছ, যেন ইতিহাসের বই দেখে পড়ছ মনে হচ্ছে।” আকাশ বেশ অবাকই হচ্ছিল। এত কিছু জানা ছিল না তার। কে আলাউদ্দিন, কে জয়সল, সবই কীরকম অদ্ভুত অচেনা শোনাচ্ছিল তার কানে।
“কারণ আছে। বলব পরে। আগে এই গল্পটা শেষ করি।” পূরণচাঁদ জল খায় এক ঢোঁক। তারপর আবার গল্পের সুতোটা ধরে নেয়।
“জেত সিংহ সরাসরি যুদ্ধে নামলেন না। বাচ্চাদের, মেয়েদের আর অশক্তদের পাঠিয়ে দিলেন দুর্গের বাইরে, মরুভূমিতে লুকিয়ে থাকার জন্য। কিছু পুরুষও সঙ্গে গেল খাবারদাবার এবং আরও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে। বাকিরা রইল দুর্গের ভেতর, প্রচুর জমানো খাবারের ভাঁড়ার নিয়ে। বাইরে খিলজির সৈন্যরা, আর ভেতরে ভাটি রাজপুতের দল।
“এভাবে কত বছর চলেছিল জানো?”
“কত?”
“আট বছর। আট বছর ধরে আলাউদ্দিনের সেনাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল ভাটিরা। এর মধ্যে জেত সিংহ মারা গেছেন। রাওয়ালের পদে বসেছেন তাঁর বড়ো ছেলে মূলরাজ। তারপরে অবশ্য কাহিনির মোড় ঘুরে গিয়েছিল। ততদিনে আরও সৈন্য এসে যোগ দিয়েছিল সুলতানি সেনায়। সবদিক দিয়ে দুর্গে খাবার আর অস্ত্র ঢোকার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল তারা। হার নিশ্চিত দেখে দুর্গের ভেতরের প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুরুষ বেরিয়ে আসে যুদ্ধ করে মরবে বলে। আর তাদের বউ-মেয়েরা... থাক তাদের কথা। মোটমাট তারপর বেশ অনেক বছর জয়সলমির দুর্গ পড়ে ছিল একেবারে খালি, শুনশান। মানুষের চিহ্নটি ছিল না কোথাও। শুধু থর মরুভূমির গরম হাওয়া কেঁদে কেঁদে বয়ে যেত তার অলিগলি দিয়ে।”
“তারপর?”
“তারপর অন্য গল্প। তার সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই।”
“তাহলে? এত লম্বা একটা জিনিস আমায় শোনালে কেন? এর সঙ্গে সম্পর্ক আছে বুঝি?”
“আছে হে নাইফ-মাস্টার, আছে। আচ্ছা, তোমায় একটা জিনিস দেখাই দাঁড়াও।” কুর্তার পকেট থেকে একটা মলাট ছেঁড়া খাতা বার করে পূরণচাঁদ। সাধারণ লাইন টানা বাচ্চাদের ইশকুলের খাতা। খাতাটার হাঁড়ির হাল। দেখেই বোঝা যায় প্রচুর হাতড়ানো হয়েছে সেটাকে। ফরফর করে খাতার পাতা উলটে যায় পূরণচাঁদ।
যেটুকু দেখতে পাচ্ছিল পাশ থেকে তাতে মাথামুণ্ডু কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না আকাশের। কয়েকটা পাতা ফাঁকা, তারপর কীসব হিজিবিজি লেখা, আবার উদ্ভট কিছু ছবি আঁকা। এ খাতা থেকে তাকে কী দেখাবে পূরণচাঁদ তা সে-ই জানে।
“দেখো তো, কিছু বুঝতে পারো কি না।” পূরণচাঁদ আকাশের দিকে ঠেলে দেয় খাতাটা।
বাঁদিকের পাতাটায় খুব জড়ানো হাতের লেখায় কীসব লেখা। ও-জিনিস উদ্ধার করার মতো বিদ্যে আকাশের পেটে নেই। ডানদিকে অবশ্য অনেক ছবি-টবি আঁকা। সেগুলোকেই মন দিয়ে দেখতে থাকে সে।
“কিছু বুঝলে?”
“এই তিনটে তো কোনও ঠাকুরের চোখ মনে হচ্ছে। আর এই যে কাঠি কাঠি হাত-পা, এগুলো মানুষ বোধহয়। এই তিন চুড়োওয়ালা এইটা, এটা কী? মন্দির? না পাহাড়-টাহাড় কিছু?”
“মাথায় যখন ত্রিশূল গোঁজা তখন মন্দিরই তো মনে হয়। আচ্ছা, তুমি সোয়াঙ্গিয়া মাতার নাম শুনেছ?”
আকাশ এবার সত্যি সত্যি ক্ষেপে যায়। “তোমার মতলবটা কী বলো তো স্পষ্ট করে। সেই তখন থেকে ভ্যাজরভ্যাজর করেই চলেছ, কোনও কথার কোনও আগামাথা নেই। একবার জয়সল, একবার সুলতান, একবার মন্দির, একবার কী না কী নাম না জানা মাতা না পিতা, পাগল নাকি তুমি? আমিও বুদ্ধুর হদ্দ, অজানা অচেনা একটা লোকের কথায় নাচতে নাচতে চলে এলাম। তুমি থাকো তোমার আজগুবি গপ্পো নিয়ে, আমি চললাম। ঢের রাত হয়েছে, ঘুম পাচ্ছে আমার। কাল খেলা দেখাতে হবে, রেস্ট দরকার। তোমার সঙ্গে বসে হাওয়ায় তির চালালে আমার চলবে না।”
চেয়ার ঠেলে উঠতে যাচ্ছিল আকাশ, পূরণচাঁদ তার হাতটা ধরে ফেলে। খুব আলগা করে ধরলেও আকাশ পরিষ্কার অনুভব করতে পারে সে হাতের জোর। “আরে এত তাড়াতাড়ি ধৈর্য হারালে চলে? বোসো বোসো। কথা দিচ্ছি আর বেশি সময় নেব না তোমার।”
“বেশ।” আকাশের পুরো শরীর দিয়ে বিরক্তি ফুটে বেরোচ্ছিল, তবুও সে আবার বসে।
“তোমায় বলছিলাম না, কিছু পুরুষও দুর্গ ছেড়ে গিয়েছিল সেই আক্রমণের সময়? কেন গিয়েছিল বলো তো?”
“কেন?”
“কারণ সোনা।”
“সোনা? মানে?” সোজা হয়ে বসে আকাশ।
“সোনা। দুর্গের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা সোনা। রেশম পথ বেয়ে আসা অগুনতি ক্যারাভান থেকে লুঠ করা সোনা। দুর্মূল্য রত্ন। সেগুলো লুকিয়ে রাখার একটা জায়গা দরকার ছিল। জেত সিং ভাবেননি যে শেষপর্যন্ত তাঁরা হেরে যাবেন। কিন্তু সাংঘাতিক যুদ্ধ যে একটা হবেই এটা তিনি জানতেন। আর সেই যুদ্ধের আঁচ থেকে নিজেদের সম্পদ বাঁচানোর একটা চেষ্টা তাঁকে করতেই হত। সেটাই করেছিলেন রাওয়াল। বিশ্বস্ত কর্মীদের হাত দিয়ে একটু একটু করে সোনাদানা দুর্গের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লুকিয়ে রাখা হয়েছিল খুব গোপন কোনও জায়গায়। যার হদিশ শুধু যারা সোনা লুকিয়েছিল তারাই জানত।”
“এসব তুমি জানলে কী করে?” আকাশের বিরক্তি কেটে কৌতূহল জাগছিল।
“আমি?” সোজা তাকায় এবার পূরণচন্দ। “আমার নামটা বোধহয় পুরোটা বলিনি তোমায়, না? আমার নাম পূরণচন্দ সিংহ যদুবংশী। পূরণচন্দ ভাটিও বলতে পারো। ওই সোনা লুকোনোর দায়িত্বে থাকা সৈনিকদের একজন ছিলেন আমারই পূর্বপুরুষ। এই কাহিনি আমি জ্ঞান হওয়ার সময় থেকে শুনে আসছি।”
“বলো কী! এ তোমার বংশের ইতিহাস?”
“ভাটি রাজপুতদের ইতিহাসের একটা টুকরো বলতে পারো। আমি সেই টুকরোরই আরও ছোট্ট একটা টুকরো।”
“ইতিহাসই হোক আর গল্পই হোক, ব্যাপার তো দারুণ। কিন্তু এই খাতা? এই ছবি?”
“বললাম না, এঁরা কাউকে সরাসরি বলে যাননি সোনার হদিশ। কিন্তু সংকেত রেখে গিয়েছিলেন। যাতে তাঁরা না থাকলেও কেউ না কেউ ওই কুবেরের ধন খুঁজে বার করতে পারে। তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে এতগুলো বছর পার হয়ে যাবে, দুনিয়া এত পালটে যাবে, তবুও কেউ তাঁদের ইঙ্গিতে বলে যাওয়া পথের ঠিকানাই খুঁজে পাবে না।”
“তোমার ওই খাতার হিজিবিজিই সেই সংকেত?”
“হিজিবিজি?” পূরণচন্দের চোখ ধক করে জ্বলে ওঠে। “হিজিবিজি বলছ কাকে হে? পড়তে না পারলেই অমনি কোনও ভাষা হিজিবিজি হয়ে যায় না।”
“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। রাগ করো কেন? কিছু খারাপ ভেবে বলিনি। আমি এমনি হাতের লেখাই ভালো পড়তে পারি না, তোমার ওই লেখা তো আমার কাছে একেবারেই ইকড়িমিকড়ি। কী লেখা আছে ওতে? পেলেই বা কোথায় ও-জিনিস? ও-খাতা দেখে তো অত শো শো বছর পুরনো জিনিস বলে মনে হচ্ছে না।” বলেই মনে মনে জিভ কাটে আকাশ। আবার না খেপে যায় পূরণচন্দ।
খেপে না অবশ্য। শান্ত গলাতেই উত্তর দেয়। “ছোটো থেকে দেখে এসেছি আমাদের পুজোর ঘরে একটা হলুদ বালি কাগজে লাল দিয়ে আঁকা এই নকশা আর এসব লেখা। বাবা বলতেন ও আমাদের কুলমন্ত্র। পরে, বড়ো হয়ে যখন ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করলাম, আমাদের নিজেদের ভাষার পুরনো রূপ নিয়ে চর্চা করলাম, তখন বুঝলাম কী অমূল্য জিনিস হেলায় পড়ে ছিল ওই ঠাকুরের আসনে। কাগজটা পুরনো হয়ে ঝুরঝুরে হয়ে গিয়েছিল, হাত দিলেই গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল। তাই খুব সাবধানে লেখা আর ছবি পুরোটাই কপি করে নিয়েছিলাম নিজের খাতায়। অনেকদিনের চেষ্টায় লেখাটার মর্ম উদ্ধার করতে পেরেছি, কিন্তু নকশার অর্থ কিছুদিন আগে পর্যন্তও আমার কাছে অধরাই ছিল।”
“এখন বুঝেছ?”
“মনে হচ্ছে।”
কথায় বাধা পড়ল। টেবিলের ওপর খোলা খাতার পাতায় একটা ছায়া পড়তে দু’জনেই ওরা চমকে মুখ তুলে তাকাল। পাশের টেবিলে বসে যে খাচ্ছিল সে কখন যেন সরতে সরতে প্রায় ওদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। পূরণচন্দের তীব্র দৃষ্টির সামনে খুব কুণ্ঠিত হয়ে মাফ চাইতে শুরু করল লোকটি। সামান্যক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে লোকটাকে থামিয়ে দেয় পূরণচন্দ। পাঠিয়ে দেয় নিজের জায়গায়।
আকাশের মনে সেই আগের প্রশ্নই তখন থেকে ঘুরছিল। এবার আবার জিজ্ঞাসা করেই ফেলে। “সবই তো বুঝলাম। দারুণ ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু এর সঙ্গে আমার কী?”
“তোমার সাহস আছে, আমি বাজিয়ে নিয়েছি তোমায়। মাথাও মোটামুটি ঠাণ্ডা। তোমার মতো একজন লোকই আমার দরকার। এত কথা সেইজন্যই বললাম তোমায়। এবার ভালো করে ভেবেচিন্তে বলো দেখি। এই আলুনি ডাল-রোটির জীবন কাটাবে, না বিপদের সঙ্গে লড়াই করে জিত ছিনিয়ে আনবে?”
“কী বিপদ? কী জিত? কী দরকার?”
“যাবে আমার সঙ্গে, আকাশ? যেখানে সাতরাজার ধন অপেক্ষা করে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে?” পূরণচন্দের গলায় এতক্ষণে সামান্য উত্তেজনার আভাস পাওয়া যায়।
“মানে?” আকাশের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে প্রায়। “আমি যাব তোমার সঙ্গে? কোথায়? কেন?”
“হ্যাঁ। যাবে। যদি ওই লেখা ঠিকঠাক পড়ে থাকি, তাহলে তোমার মতো একজন নিশানাবাজকে দরকার হবে ওই সোনা পর্যন্ত পৌঁছতে। আমি কলেজের মাস্টার, পুরনো লেখা পড়ে তার মানে বুঝতে পারি, কিন্তু তার বেশি আমার দ্বারা যে হবে না। আজ তিন বছর ধরে মেলায় মেলায়, সার্কাসে সার্কাসে ঘুরছি শুধু একজন ভালো নিশানাবাজের খোঁজে। পাইও, কিন্তু সব হিসাব মেলে না। কারও হাত ভালো তো স্বভাব খারাপ, কারও স্বভাব ভালো তো চোখে ধার কম। তোমাকে দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে মাতা বোধহয় এবার আমার মনোকামনা পূর্ণ করবেন।”
“ওই লুকোনো সোনার সন্ধানে যেতে চাও তুমি? মাথা কি একেবারেই গেছে? কী না কী একটা নকশা, পুরনো একটা কাগজে কয়েক লাইন কীসব লেখা, তাই ধরে তুমি হাওয়ায় নৌকো ভাসাবে? আর তার জুড়িদার ধরলে আমাকে? কেন মাস্টারজি, আর দুসরা কোনও পাগল পেলে না বুঝি এই গোটা দুনিয়ায়?”
পূরণচন্দও আওয়াজ উঁচু করে এবার। “পাগলামি বলছ কাকে? আমি জানি ওখানে যা লেখা আছে, যে দিকনির্দেশ দেওয়া আছে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। কোনওরকমে তো দু-চার পয়সা রোজগার করে বেঁচে আছ। আজ খেতে পেলে কালকের গ্যারান্টি নেই। তবুও একটু ঝুঁকি নিতে এত ভয়? আরে চাক্কুওয়ালে, জীবন পালটে যাবে তোমার, এই বলে দিলাম।”
“সোনা পেলে? ফিফটি ফিফটি তো?” আকাশ সটান জিজ্ঞেস করে বসে।
“এই তো। দিব্যি দর কষতে লেগেছ চাঁদু।” পূরণচন্দের গলায় তীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“কষতেই হয়। ডেরাডাণ্ডা উঠিয়ে রোজগারপাতি ছেড়ে তোমার মতো একটা পাগলের সঙ্গে অজানার দিকে রওনা হব। কী পাব সেটা আগে থেকে জেনে নিতে হবে না?”
“হবেই তো, হবেই তো। তবে ফিফটি সিক্সটি কিচ্ছু পাবে না, এখনই বলে দিচ্ছি।”
“মানে?” আকাশ লাফিয়ে ওঠে।
“মানে সেদিন আর নেই হে, যে গুপ্তধন যে পায় তারই। ও-জিনিস পেলে তার হকদার আমাদের দেশের সরকার। হ্যাঁ, সরকার একটা পুরস্কার হয়তো দিতে পারে, তা সে আমি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি। চাও তো পুরোটাই দিয়ে দেব না হয়। অবশ্য পুরস্কার না পেলেও আমার কিছু আসে যায় না।”
“লুকোনো সোনা চাও না, টাকাপয়সাও চাও না, তবে এমন হারা উদ্দেশ্যে তুমি ছুটছ কেন?” আকাশ কিছু বুঝতেই পারছিল না লোকটাকে।
“ছুটছি একটা হারানো ইতিহাসের খোঁজে। ও তুমি বুঝবে না। তবে তোমার ভয় নেই, আমার সঙ্গে গেলে তোমার সব খরচাপাতি আমার। ভেবে দেখো।”


চার


এই কথাবার্তার প্রায় তিনমাস পরে হেমন্তের এক ঠোঁটে টান ধরানো বিকেলে আকাশ আর পূরণচন্দ রাজস্থানের পশ্চিমপ্রান্তে ভারত-পাকিস্তান সীমানার কাছাকাছি একটা ছোট্ট গ্রামের ততোধিক ছোট্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। ঘন দুধ আর কড়া মিষ্টির ধোঁয়া ওঠা গরম চা। জায়গাটা জয়সলমির থেকে খুব কাছেও নয়, আবার খুব একটা দূরেও নয়।
আরও একজন ছিল ওদের সঙ্গে। একটা গাড়ি ভাড়া করেছিল ওরা জয়সলমির থেকে, তার ড্রাইভার। উমেদ সিং। এদিকেরই লোক। সে আপাতত দোকানির সঙ্গে কী যেন গভীর আলোচনায় মেতে ছিল। বেশ কিছুক্ষণ খুব মন দিয়ে মাঝবয়সী দোকান-মালিকটির কথা শুনে তারপর ওদের দিকে এগিয়ে এল উমেদ।
“কিছু জানা গেল?” আকাশ জিজ্ঞেস করল।
“আপনারা যেরকম খুঁজছেন সেরকম কোনও মন্দিরের কথা এরা জানে না, কিন্তু এখান থেকে কিছু দূরে একটা গ্রামের কথা বলল, জোগন কি ধানি। সেখানকার লোকেরা নাকি কী এক পুরনো ভাঙা মন্দিরের গান গেয়ে আসছে আজ বহুবছর ধরে। সে মন্দির কোথায় এরা কেউ জানেও না, কোনওদিন দেখেওনি।”
“কোন দেবতার মন্দির কিছু বলল?” এবার পূরণচন্দ প্রশ্ন করে।
“বলল তো দেবী মায়ের গান করে। কোন দেবী কিছু বলতে-টলতে পারল না।”
পূরণচন্দ ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আকাশের দিকে তাকাল। “আজ তো সন্ধে হয়ে এল প্রায়। এখন আর কোথাও যাওয়ার সময় নেই। আজ রাতটা মনে হয় এ-গ্রামেই কাটানোর ব্যবস্থা দেখতে হবে। রাতে আরেকবার খাতাটা নিয়ে বসাও দরকার।”
“বেশ তো। কিন্তু থাকবে কোথায়? এ তো আর জয়সলমির শহর নয় যে পয়সা ফেললেই হোটেলের ঘর পাওয়া যাবে।” আকাশ চিন্তিতভাবে জবাব দেয়।
“কী হে উমেদ, দেখো না কারো ঘরে কি দাওয়ায় একটু জায়গা পাওয়া যায় কি না? না হলে আবার মালপত্র খুলে তাঁবু বের করতে হবে। ও-ঝামেলাটা এখনই করতে ইচ্ছে করছে না। খেতে-টেতে দিতে হবে না, ও সঙ্গে যা শুকনো খাবার আছে তাই দিয়েই চালিয়ে দেব। শুধু রাতটুকু কাটানো। কাল ভোরেই বেরিয়ে পড়ব আবার।”
দোকানির হাত চা আর দুধের ডেকচির মধ্যে ঢালাঢালিতে ব্যস্ত থাকলেও কান যে এদিকেই ছিল তা পরিষ্কার বোঝা গেল যখন তিনি ঠক করে কেতলি নামিয়ে এগিয়ে এলেন। দু’হাত বুকের কাছে জোড় করা, মুখে ভারি বিগলিত হাসি। বিশুদ্ধ দেহাতি বুলিতে তিনি যা বললেন তার মর্মার্থ হল, এ-গ্রামে অতিথি হয়ে আসা এই তিনজনকে একরাতের মতো দানাপানি এই গরিব গুলাবলালই দিতে পারবেন, আর শোওয়ার জায়গাও তাঁর বাড়িতেই হয়ে যাবে। বাড়িটা একটু ভেতরে, তবে অতিথিদের সঙ্গে তো গাড়িই রয়েছে, কাজেই যেতে কোনও অসুবিধে হবে না। এসবের জন্য শুধু একটু মূল্য ধরে দিলেই হবে। মূল্যটাও যা বললেন সেটাও এমন কিছু আকাশছোঁয়া নয়।
এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কোনও কারণই ছিল না।
ওরা তিনজন ছাড়া দোকানে আর কোনও খদ্দের ছিল না। ঘনিয়ে আসা সন্ধের ঝোঁকে আর কেউ চা খেতে আসবে বলেও মনে হচ্ছিল না। অতএব চটপট দোকানে তালা পড়ে গেল এবং গুলাবলালজিকে পাশে নিয়ে উমেদ সিং স্টিয়ারিং ধরে বসল। আকাশ ও পূরণচন্দ পিছনে।
গাড়ি চালু হতে হতেই গুলাবলালের প্রশ্নের বন্যা চালু হয়ে গেল। বোঝাই যাচ্ছিল তাঁর ভেতরে প্রচুর কৌতূহল জটলা পাকাচ্ছে। “উমেদ সিং বলছিল আপনারা নাকি কোন দেবী মায়ের মন্দির খুঁজছেন, তাই কী?”
“না হলে আর বলবে কেন?” পূরণচন্দ নীরস গলায় উত্তর দেয়।
“তা তো বটেই, তা তো বটেই, না হলে আর বলবে কেন।” গুলাবলাল ঢকঢক মাথা নাড়েন। “তা কেন খুঁজছেন বলুন তো। জয়সলমির দুর্গেই তো সোয়াঙ্গিয়া দেবীর মন্দির আছে শুনেছি। সে ছেড়ে এই ঘোর রেগিস্থানে নতুন কী মন্দির খুঁজছেন?”
“নতুন খুঁজছি তো বলিনি।”
“আজ্ঞে?” গুলাবলালের গলায় হতবুদ্ধি ভাব।
“পুরনো মন্দির খুঁজছি। আমি ইতিহাসের মাস্টার, বুঝলেন? এইসব মন্দির নিয়ে পড়াশোনা করি। ছাত্রদের পড়াই। আর এই যে আমার পাশে বসে আছে নওজওয়ান, এ আমার ছাত্র। কাজ শিখছে।”
নিজের এই নতুন পরিচয়ে চমকে উঠলেও বাইরে সেটা প্রকাশ করে না আকাশ। বরং মনের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরতে থাকা প্রশ্নটাকে ছাত্রের মতোই উৎসুকভাবে পূরণচন্দের কাছে পেশ করে। “আচ্ছা, এই সোয়াঙ্গিয়া মাতার কথা আপনি আগেও একবার বলেছিলেন মাস্টারজি। কে ইনি?”
“ভাটি রাজপুতদের কুলদেবী।” পূরণচন্দ জবাব দেয়। “আমার খাতার লেখা বলছে এঁর কাছেই…” বলতে বলতে থেমে যায় পূরণচন্দ। খুব আবছা একটা ইশারা করে সামনের সিটে বসা দু’জনের দিকে। “পরে বলব তোমায়।”
গুলাবলালের বাড়িটা নেহাত ছোটো নয়। চারদিকে চারটে ঘর, মাঝখানে বড়ো খোলা উঠোন। তাতেই খাটিয়া পেতে এদের তিনজনের শোয়ার ব্যবস্থা হল। খোলা আকাশের তলায় কার্তিকের ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে একদিকে কাঠকুটো দিয়ে একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন গুলাবলাল। গাড়িটা অবশ্য সদর দরজার বাইরেই পার্ক করে রাখতে হল।
বাজরার রুটি আর গুড় দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে লণ্ঠন জ্বালিয়ে বসে ছিল পূরণচন্দ। হাতে সেই খাতা। “এই দ্যাখো আকাশ, এখানে পুরনো মরুবাণী ভাষায় কী বলা আছে। বর্বর ম্লেচ্ছদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মহারাওয়াল এই উপায় নির্ধারণ করলেন। দুর্গ থেকে পশ্চিমদিকে সাতদিন সাত রাত্রির দূরত্বে বাণিজ্য পথের নিকটেই মাতা সোয়াঙ্গিয়ার এক গোপন মন্দির নির্মাণ করা হল। সেই অতি দুর্গম শ্বাপদসংকুল স্থানে মাতার চরণে মহারাওয়াল তাঁর ধনরত্নের ভাণ্ডার গচ্ছিত রাখলেন। আলাউদ্দিনের সৈন্য ফিরে গেলে এই সম্পদ আবার দুর্গে ফিরিয়ে আনা হবে। যদি দুর্ভাগ্যক্রমে ম্লেচ্ছ আক্রমণে দুর্গস্থ সকলের মৃত্যু হয় ও মন্দিরের পথ কারও জানা না থাকে, সেই আশঙ্কায় ধন গোপনকারীদের পরবর্তী বংশজদের উদ্দেশ্যে এই বার্তা লিখে রাখা হল। মাতার জয় হোক।”
“সাত রাত্রি?” আকাশ প্রশ্ন করে।
“তখনকার হিসেবে। পায়ে হেঁটে, শত্রুর চোখে ধুলো দিয়ে গিয়েছিল সবাই। তাও ত্রিকূট পাহাড় থেকে হিসেব করলে। এখান থেকে আমাদের হয়তো বড়োজোর একটা গোটা দিন লাগবে গাড়িতে। দেখা যাক। এখন শুয়ে পড়ো। কাল খুব ভোরে উঠতে হবে।”
লণ্ঠন নিভিয়ে দিয়ে চাদরটা মাথা অবধি টেনে নেয় পূরণচন্দ। অগত্যা আকাশও। উমেদ অবশ্য অনেকক্ষণই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার হালকা নাকের ডাক শোনা যাচ্ছিল।
ভোরবেলা উমেদের চিৎকারেই ঘুম ভাঙল আকাশের।


পাঁচ


আচমকা ঘুম ভেঙে প্রথমটা অচেনা জায়গায় ঠিক দিক ঠাহর করে উঠতে পারছিল না আকাশ। তখনও ভালো করে ভোর হয়নি। আবছা আলোতে স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছিল না ভালো করে। পাশের বিছানা খালি দেখে বোঝা যাচ্ছিল পূরণচন্দ উঠে গেছে আগেই। বাইরে থেকে তখনও উমেদের উত্তেজিত গলার আওয়াজ আসছিল।
বিছানা থেকে উঠতে উঠতে আকাশ দেখল গুলাবলালও ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন। “কী হল ভাইয়া? কিছু গোলমাল হল কি?” উদ্বিগ্নভাবে জানতে চান গুলাবলাল।
“কী জানি, দেখি বাইরে গিয়ে।” আকাশ সদরের দিকে যেতে যেতে জবাব দেয়।
উমেদ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ির সামনে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল পূরণচন্দ। কপালে গভীর ভ্রূকুটি।
গুলাবলালকে দেখে যেন ফেটে পড়ল উমেদ। “আপনি না বলেছিলেন আপনার এই গাঁও খুব ভালো! কোনও বদমাইশি-টাইশি কিচ্ছু হয় না। তাহলে এটা কী?” হাত দিয়ে গাড়ির দিকে দেখায় উমেদ।
উমেদের বাড়ানো হাত অনুসরণ করে তাকায় আকাশ এবং রীতিমতো হাঁ হয়ে যায়। গাড়ির চারটে চাকাতেই একবিন্দু হাওয়া নেই। খরখরে বালির ওপর থেবড়ে রয়েছে লতপতে টায়ারগুলো। হতবুদ্ধি চোখে সে একবার পূরণচন্দের দিকে তাকায়, একবার গুলাবলালের দিকে। গুলাবলালও হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
উমেদ সিং আবার চিৎকার করে, “চার-চারটে টায়ারে এবার আমি কী করে হাওয়া ভরাব বলতে পারেন? এমন জায়গায় গাঁও আপনার, একটা বাসও চলে না সামনে দিয়ে। কী করে নিয়ে যাব আমি ওগুলোকে? মাথায় করে? আর এই সাহেবরা যে আমার গাড়ি বুক করলেন, এঁদেরই বা কী জবাব দেব? আমার লোকসানের টাকা কে ভরবে, আপনি?”
“তাই তো। কারা করল এমন, কেনই বা করল? গাঁওয়ের মেহমান আপনারা, কী লজ্জা, কী লজ্জা।” গুলাবলাল বিড়বিড় করতেই থাকেন।
পূরণচন্দ এতক্ষণ চুপ করেই ছিল। সে কথা বলে এবার। গলা সামান্য গম্ভীর, তবে তাতে কোনও অভিযোগের চিহ্ন নেই। “মাথা চাপড়ে কিছু লাভ নেই গুলাবলালজি, এখন জোগন কি ধানি কী করে পৌঁছনো যায় সেটা বলুন। গ্রামে কারও গাড়ি-টাড়ি আছে?”
“এ গ্রামে মোটরগাড়ি কার থাকবে হুকুম, গরিব গ্রাম।” একটুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবেন গুলাবলাল, পাকা দাড়িতে হাত বোলান। “একটা উপায় হয়তো হতে পারে সরকার।”
“কী উপায়?” আকাশ জানতে চায়।
“ধনুয়াকে ডেকে পাঠাচ্ছি, সে হয়তো কিছু একটা করতে পারে।”
“ধনুয়া আবার কে?” উমেদ সিং খিঁচিয়ে ওঠে।
“উটের কারবারি বেটা। দেখো কথা বলে।”
“উট? মানে?” আকাশ চোখ গোল করে তাকায় গুলাবলালের দিকে।


মানে বোঝা গেল ধনুয়া এসে দাঁড়ানোর পর। বেশ বয়স্ক লোকটি। কিংবা হয়তো যতটা বয়স্ক দেখায় ততটা নয়। এই শুকনো তাতবালির দেশ মানুষের মুখে এতই আঁকিবুঁকি কেটে দেয় যে চল্লিশেও অনেককে আশি দেখায় প্রায়। এঁরও বিশাল পাগড়ির নিচে কাটাকুটি ভরা মুখের তুলনায় শরীর অনেক সবল। চাকা থ্যাবড়া গাড়ির হাল দেখে দাঁতে জিভে একটা চিক চিক শব্দ উঠল ধনুয়ার। “ইশ। ছি ছি ছি।”
গুলাবলাল এগিয়ে এলেন সামনে। “তোমার এখন ভালো সওয়ারি উট ক’টা আছে ধনুয়া?”
“হবে চার-পাঁচটা। আজকাল ব্যাবসা মন্দা, বেশি উট রাখব সাধ্য কই? ভালোগুলোকে তো দিয়ে দিয়েছি টুরিস্ট দফতরে ভাড়ায়, ওই জয়সলমিরের আশেপাশে বালিয়াড়িতে ঘোরায় সব। যা ছিল আস্তাবলে তার থেকে কাল রাতেও বেরিয়ে গেছে দুটো। কেন, কার লাগবে সওয়ারি?”
“এই বাবুদের। আর এই ড্রাইভার সাহেবেরও লাগবে, টায়ার নিয়ে শহরে যাবে। চারটেই তো এক্কেবারে বরবাদ।” গুলাবলাল বলেন।
“মানে তিনটে, আর বাবুদের সামান নেওয়ার জন্য আরও একটা। টায়ার আর সামান নেওয়ার জন্য সওয়ারি উট না নিয়ে বরং উটের গাড়ি নিন। তাহলে সওয়ারি দুটোতেই হয়ে যাবে। চালানোর লোকও তো লাগবে। সাহেবরা তো উট চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। তা যেতে হবে কোথায়?”
“জোগন কি ধানি। চেনো?” পূরণচন্দ জিজ্ঞাসা করে।
জবাব দেওয়ার আগে ধনুয়া খানিকক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে পূরণচন্দের দিকে।
“কী হল? চেনো?” একটু বিরক্তই শোনায় পূরণচন্দকে।
“চিনি তো, কিন্তু এত লোক একই দিনে জোগন কি ধানি কেন যাচ্ছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। জানোয়ার চরানো ভিলদের ওইটুকু গ্রাম, ওখানে তো এত বছরে কোনও বাইরের লোককে আসতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।” ধনুয়ার চেহারার অবাক ভাব কাটছিল না।
পূরণচন্দের চাউনি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। “এত লোক মানে? আর কে গেছে ওখানে? কবে গেছে?”
ধনুয়া পাগড়ির তলা দিয়ে আঙুল চালিয়ে মাথা চুলকোয়। “ওই যে বললাম না কাল গভীর রাতে সওয়ারি উট ভাড়া হল দুটো।”
“কারা নিল উট? টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক?”
“না হুকুম। অচেনা লোক। শহরী। আপনাদের মতোই। খুব তাড়া ছিল। সহিসও নেয়নি। নিজেরাই চালিয়ে নিয়ে গেল উট। কিছু গোলমাল আছে নাকি হুজুর?” ধনুয়া একটা রহস্যের আঁচ পেয়ে কাছে ঘনিয়ে আসে।
“নাহ্। গোলমালের কী? কাল অন্য কেউ গেছে, আজ আমরা যাব।” পূরণচন্দ গলাটাকে ইচ্ছে করে নির্বিকার রাখে, যদিও তার কপালের কোঁচ স্বাভাবিক হচ্ছিল না।


ছয়


বেরোতে বেরোতে একটু বেলা হয়েই গিয়েছিল। পথে দুয়েকবার থামতেও হয়েছিল উটদের বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। ওদের নিজেদেরও হাত-পা ছাড়িয়ে নেওয়ার দরকার হচ্ছিল অনভ্যস্ত ওই বাহনের পিঠে চড়ার দরুন।
গুলাবলাল কিছুতেই পয়সাকড়ি কিছু নিলেন না। অতিথিদের অপমানে নাকি শুধু তাঁর নয়, গোটা গ্রামেরই নাক কাটা গেছে। এরকম অবস্থায় হাত পেতে টাকা তিনি কিছুতেই নিতে পারবেন না। অনেক তর্কাতর্কিতেও তাঁকে টলানো যায়নি।
দুটো উট আর একটা উটে টানা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ওরা। কৌতূহল সামলাতে না পেরে একটা উট নিজেই চালাচ্ছিল ধনুয়া। অবশ্য তার যুক্তি ছিল যে ভিলদের ভাষা অতিথিরা কেউ বুঝবেন না, এখানে ও-ভাষা মোটামুটি একমাত্র সে-ই যাহোক কিছুটা বুঝতেও পারে, বলতেও পারে। কাজেই সে সঙ্গে না থাকলে কথাবার্তা চালানোই যাবে না। এত কষ্টের যাত্রাটাই বৃথা যাবে। অন্য দুটো উট চালাচ্ছিল দু’জন অল্পবয়সী ছেলে।
জোগন কি ধানিতে যখন ওরা পৌঁছল তখন সন্ধে গড়িয়ে প্রায় রাত হয় হয়।
অদ্ভুত মিছিলটা গ্রামের কাছাকাছি হতেই ছেলে-বুড়ো-মেয়ে-পুরুষ সবাই পিলপিল করে কুটির থেকে বেরিয়ে ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল। বোঝাই যাচ্ছিল এখানে বাইরের কেউ আসে না।
আকাশ ভালো করে লক্ষ করছিল লোকগুলোর চেহারা। রাজস্থানের সাধারণ লোকের চেহারা থেকে অনেকটাই অন্যরকম এরা। বেশ লম্বাচওড়া শরীর, তামাটে মুখে থ্যাবড়া নাক। প্রায় সকলেরই চোখ কটা বা সবজেটে। প্রত্যেকেরই হাতে মুখে অনেক উল্কি। এদের মধ্যে থেকে একজন পুরুষ দল ছেড়ে এগিয়ে এল ওদের দিকে। প্রশ্নবোধক সুরে কিছু বলল, যা আর যে-ই বুঝুক আকাশ অন্তত বুঝল না।
ধনুয়া সংক্ষেপে অনুবাদ করে দেওয়াতে বোঝা গেল যে এই ব্যক্তি এদের মুখিয়া। সর্দারও বলা চলে। আগন্তুকদের পরিচয় ও এখানে আসার কারণ জানতে চায় সে।
পূরণচন্দ মোটামুটি সত্যিটাই জানাল। তার ধারণা এখানে কোথাও সোয়াঙ্গিয়া মাতার প্রাচীন মন্দির আছে এবং সেই মন্দির সে দর্শন করতে চায়।
মুখিয়ার চোখ বিস্ময়ে রীতিমতো গোল হয়ে উঠছিল। এত পুরনো মন্দিরের কথা যে তারা ছাড়া বাইরের লোকও কেউ জানে সেটা তাকে আশ্চর্য করে দিয়েছিল। হাতজোড় করে সবাইকে গ্রামের ভেতরে ডেকে নিয়ে গেল সে। উটগুলোকে পায়ে ছাঁদনদড়ি বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হল চরে খেতে। ছেলেদুটোও উটের সঙ্গে সঙ্গেই রইল। ধনুয়া, পূরণচন্দ আর আকাশ চলল মুখিয়ার পিছন পিছন। আর তাদের পিছনে চলল বাকি গ্রাম।
একটা আঁকাবাঁকা নিমগাছের তলায় বসে কথাবার্তা শুরু হল। ধনুয়া দোভাষী। মুখিয়া বলল, মন্দির আছে, কিন্তু একেবারে ভাঙাচোরা দশা। তার ভেতরে ভয়ানক বিষাক্ত সাপখোপ থেকে চিতাবাঘ, সবই আছে। ওইজন্য গ্রামের কেউ আর আজকাল মন্দিরে ঢোকে না। তবে নিয়ম চলে আসছে বহুদিন ধরে, তাই প্রতি মঙ্গলবার তারা গিয়ে দূর থেকেই প্রদীপ দেখিয়ে চলে আসে।
“মন্দিরে ঢোকার রাস্তা নেই কোনও?”
মুখিয়া বলল, তারা কেউ কোনওদিন মন্দির পর্যন্ত যায়ইনি। আগে হয়তো কেউ কেউ যেত, কিন্তু সে নিজে জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত কাউকে মন্দিরে ঢুকতে দেখেনি। ওদিকে ভীষণ চিতাবাঘের উৎপাত। কে বেঘোরে নিজের প্রাণটা খোয়াবে! শুধু বাপ-দাদারা কড়া নিয়ম করে রেখে গেছেন তাই প্রদীপ দেখানো আজও বন্ধ হয়নি। রাস্তা একটা আছে বটে ভাঙাচোরা। সে রাস্তায় নাকি আগে দূর দেশের সঙ্গে বাণিজ্য হত, বড়ো বড়ো কাফেলা আসত কাঁহা কাঁহা মুলুক থেকে। কিন্তু সেটাও কিছুদূর গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। তারপর শুধুই বালি আর পাথর।
পূরণচন্দ খুশি হয়ে আকাশের দিকে ফিরল। “ঠিক জায়গায় পৌঁছেছি, বুঝতে পারছ তো? বাণিজ্য পথ, মাতার মন্দির, সবই মিলে যাচ্ছে। খাতার নকশা মনে করো। দেবীর ত্রিনয়নী মুখ, অনেক মানুষের মিছিল, মন্দিরের চুড়ো, মনে পড়ছে? দাঁড়াও, খাতাটায় কী যেন লেখা ছিল?” ব্যাগ থেকে হাতড়ে আবার খাতা বের করে পূরণচন্দ। “হ্যাঁ, এই যে।” খাতা থেকে পুরনো মরুবাণীতে লেখা একটা লাইন জোরে জোরে পড়ে পূরণচন্দ। “এই যে এখানে বলছে, না না, এটা না। এটা তো সেই সংকেতটা, সোয়াঙ্গিয়া মন্দির তিন চূড়া তার। এটা নয়। এই যে এইটা। এখানে বলা হচ্ছে না, দুর্গ থেকে পশ্চিমদিকে সাত রাত্রির দূরত্বে বাণিজ্য পথের নিকটেই মাতা সোয়াঙ্গিয়ার এক গোপন মন্দির নির্মাণ করা হল!”
পূরণচন্দের কথার মাঝখানেই চারদিক ঘিরে থাকা দলটার থেকে একজন উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে আসে। আর ওদের সবাইকে প্রচণ্ড অবাক করে দিয়ে সম্পূর্ণ অজানা ভাষায় কী যেন বলে যেতে থাকে গড়গড় করে। অন্তত আকাশের কাছে তো একেবারেই অজানা, দুর্বোধ্য ভাষা।
পূরণচন্দ কিন্তু চমকে ওঠে রীতিমতো। লোকটাকে সেই ভাষাতেই উলটে কিছু জিজ্ঞাসা করে সে। কিন্তু লোকটার বিব্রত মাথা নাড়া দেখে সকলেই বোঝে যে পূরণচন্দের প্রশ্নের অর্থ সে বুঝতে পারেনি।
“ওকে জিজ্ঞেস করো তো ধনুয়া, ও পুরনো মরুবাণী জানল কী করে? কে ও?”
ধনুয়ার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ উত্তেজিত কথাবার্তা হয় লোকটার। তারপর ধনুয়া আবার এদিকে ফেরে। “হুকুম, ও হচ্ছে ভাটি রাজাদের দেহরক্ষী বংশের সন্তান। বহুবছর ধরে এই শ্লোক বংশ পরম্পরায় ওরা মুখস্থ করে আসছে, অর্থ না জেনেই। ওকে ওর বাপ শিখিয়েছিল, তাকে শিখিয়েছিল তার বাপ। এইভাবেই চলে আসছে কতবছর ধরে কেউ জানে না। ওরা এটাকে দেবীমায়ের পূজার মন্ত্র বলে জানে। আপনার মুখে মন্ত্রটা শুনে ও-ও বলতে শুরু করেছিল তাই।”
“আবার বলতে বলো দেখি ওকে ওর মন্ত্র, খুব আস্তে আস্তে।” খাতা আর কলম নিয়ে তৈরি হয়ে বসে পূরণচন্দ।
লোকটা বলতে থাকে। ভেঙে ভেঙে। পূরণচন্দ লিখতে থাকে তার খাতায়।
“এই পর্যন্তই ওরা শিখেছে হুজুর।” লোকটা চুপ করে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে বলে ধনুয়া।
মুখিয়া এতক্ষণ অবাক হয়ে ব্যাপার দেখছিল। এবার সে কিছু বলে। সবাই ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে ওদের রেখে। পূরণচন্দ খেয়ালও করে না। সে তখন মরুবাণীর শ্লোকটাকে চলতি ভাষায় নিয়ে আসতে ব্যস্ত।
“এই যে শোনো এবার, আকাশ। আমার কাছে শ্লোকটার, মানে সংকেতটার অর্ধেকটা ছিল এতদিন। তাই বুঝেও পুরোটা বুঝতে পারছিলাম না। এইবার পুরোটা পাওয়া গেছে। কী বুদ্ধি করে লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন ওই সৈনিকেরা ভাবতে পারছ? একটা সংকেতের দুটো অংশ। অর্ধেকটা জানবে যে সম্পদ লুকিয়েছে তার বংশধর, অর্ধেকটা জানবে সম্পদকে যারা পাহারা দিচ্ছে তারা। দুয়ে মিলে এক হলে তবেই মিলবে মায়ের কৃপা।”
“কী বলা আছে ওই শ্লোকে?” আকাশ এতক্ষণ হাঁ করে এদের কাণ্ড দেখছিল।
“বলা আছে সেই কথা, যার জন্য তোমায় এতদূর ছুটিয়ে এনেছি।” হাসে পূরণচন্দ।
“মানে?”
“মানে? শোনো দেখি, মানে কিছু বলতে পারো কী না।” পূরণচন্দ আবার হাসে। এত হাসিখুশি তাকে এর আগে কখনও দেখেনি আকাশ। হাসিমুখেই একটা কবিতার মতো কিছু বলতে শুরু করে পূরণচন্দ।
দুর্গ হতে কিছু দূরে সূর্যাস্তের পথ
সেইখানে থেমে যায় বণিকের রথ।
সোয়াঙ্গিয়া মন্দির, তিন চূড়া তার
মাতার চরণতলে সুবর্ণ পাহাড়।
ত্রিনয়নে বিন্দু, হানো বিন্দুতে বাণ
বাণমুখে রন্ধ্রপথ, বোঝো হে সন্ধান।
সোনালি মরণ আছে মাতারে ঘিরিয়া
চতুরঙ্গে অশ্ব চলে বিপদ জিনিয়া।


“এটার মানে কী হল?” আকাশ গোল চোখে তাকিয়ে ছিল।
“ভাবো, আজ সারারাত ভাবার সময় পাবে। শেষটা আমার কাছেও নতুন। ও হ্যাঁ ধনুয়া, মুখিয়াকে জিজ্ঞেস করো তো তোমার উটগুলো নিয়ে যারা এদিকে এসেছিল তাদের ও দেখেছে কি না।”
“আগেই করেছি হুজুর। আসেনি কেউ এদিকে। অন্তত এরা তো কাউকে দেখেনি বলছে। আমার অত ভালো বিকানেরি উটদুটো নিয়ে কোথায় যে গেল। জোগন কি ধানিই তো বলেছিল।” চিন্তিত মাথা নাড়তে থাকে ধনুয়া।


সাত


রাতে তাঁবু খাটানো হল। মুখিয়া কিছু ভুট্টার আটার রুটি আর শুকনো আচার দিয়ে গিয়েছিল, তাতেই দিব্যি পরিপাটি খাওয়াও হয়ে গেল। ভোরের আলো ফুটতেই মন্দিরের দিকে রওনা দেওয়া হবে এই ঠিক করে শুয়ে পড়ল সবাই।
আকাশ ছুরিগুলো হাতে তুলে তুলে দেখছিল। অনেকদিন খেলা দেখানো হয় না, হাতের টিপ কেমন আছে কে জানে। যদিও রোজ একটু আধটু প্র্যাকটিস সে চালিয়ে গেছে ঠিকই, তবুও বলা তো যায় না। কী কাজের জন্য তাকে এতদূর টেনে এনেছে পূরণচন্দ কে জানে। হয়তো দেখা গেল মোক্ষম সময়েই আকাশের ছুরি ফসকে গেল। তাহলে যে কী মাপের কেলেঙ্কারি হবে সেটাও তো জানে না আকাশ।
এইসব ভেবে ভেবে মাথা গরম হয়ে উঠছিল শুধু। ঘুমের দেখা নেই। শুধু এপাশ আর ওপাশ। ওদিকে কালকে প্রায় রাত থাকতেই উঠতে হবে।
হঠাৎ যেন খুব হালকা একটা খসখস শব্দ কানে এল আকাশের। তাঁবুর দরজার কাছেই হচ্ছিল আওয়াজ। সতর্ক হয়ে উঠে বসল আকাশ। কোনও জংলি জানোয়ার এল নাকি তাদের গন্ধ পেয়ে? এরা বলছিল না এদিকে খুব চিতাবাঘের দৌরাত্ম্য আছে? সবথেকে হালকা কিন্তু তীক্ষ্ণ ছুরিটা সাবধানে মুঠো করে ধরে আকাশ। চোখ টান করে অন্ধকারের মধ্যে চেয়ে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করে কী ঘটছে বাইরে।
খুব অল্প ফাঁক হল তাঁবুর ফ্ল্যাপটা। হালকা আলোর একটা তির্যক রেখা তাঁবুর অন্ধকারটাকে একটুখানি আবছা করে দিয়েই আবার মিলিয়ে গেল। ফ্ল্যাপ বন্ধ হয়ে গেল তার মানে।
কিন্তু কী হল ব্যাপারটা? টর্চ জ্বালাতে সাহস পাচ্ছিল না আকাশ। বাইরে যে ঘুরছিল সে এখনও আছে কি না জানা নেই। তাঁবুর মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠতে দেখলে সে কী করবে সেটাও জানা নেই। তাই চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকে আকাশ।
একটা অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিল তাঁবুর ভেতরে। ক্রমশ তীব্রতায় বাড়ছিল শব্দটা। অনেকটা প্রেশার কুকারের সিটির মতো শব্দ। কিংবা যেন কেউ জিভ আর দাঁতের মধ্যে দিয়ে শিস দিচ্ছে। গা শিরশির করছিল আকাশের শব্দটা শুনে।
আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না সে। যা থাকে কপালে বলে টর্চটা জ্বেলেই ফেলে। আলোর রেখাটা গিয়ে পড়ে তার বিছানা থেকে হাত খানেক দূরে, তাঁবুর ফ্ল্যাপের ঠিক সামনে। আর আকাশ স্তম্ভিত হয়ে দেখে সেখানে হলুদ কালো চাকাচাকা দাগ গায়ে নিয়ে চকচক করছে মূর্তিমান মৃত্যু। তার নিঃশ্বাসে শিস, তার দাঁতে প্রাণঘাতী গরল। চোখে আলো লাগায় চ্যাপটা মাথাটা উঁচু করেছে সে, চেরা জিভ বার করে স্বাদ নিচ্ছে বাতাসের।
তাহলে একেই ঢুকিয়ে দিয়ে গেল কেউ তখন তাঁবুর ফ্ল্যাপ ফাঁক করে। কিন্তু কে? আকাশের সঙ্গে কার এমন দুশমনি থাকতে পারে? কারও এত বড়ো কিছু ক্ষতি করেছে বলে তো মনে পড়ে না তার, যে একেবারে বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দিতে হবে বিছানার পাশে। নাকি শুধুই তাদের আটকানোর জন্যই এসব। আকাশ না হয়ে পূরণচন্দও হতে পারত হয়তো। পূরণচন্দের কথা মনে হতেই আরেকটা মারাত্মক ভয় কাঁপিয়ে যায় আকাশকে। ওরা ওই তাঁবুতেও সাপ ছাড়েনি তো? পূরণচন্দ যদি না বুঝে সাপের ঘাড়ে পা দেয়?
অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে চিৎকার করতে থাকে আকাশ। “মাস্টারজি, মাস্টারজি, ওঠো। আলো জ্বালাও। নড়াচড়া কোরো না খবরদার। ওঠো মাস্টারজি, লাইট জ্বালাও।”
পাশের তাঁবুতে একটা ছোট্ট আলোর রেখা দেখতে পায় আকাশ। তারপরেই পূরণচন্দের গলা। “কী হল আকাশ? শরীর খারাপ হল নাকি? দাঁড়াও আসছি আমি।”
“না মাস্টারজি, না।” আরও জোরে চিৎকার করে আকাশ। “আগে চারদিক দেখো। সাবধানে পা ফেলো মাস্টারজি। আমার তাঁবুতে খবরদার এসো না।”
“কী হয়েছে বলবে তো।”
“সাপ মাস্টারজি, সাপ। দবৈয়া সাপ। আমার দরজার গোড়ায়। সাপ ঢুকিয়ে দিয়ে গেল ওরা।”
“কী, বলছ কী?” পূরণচন্দের চমকে ওঠাটা এখানে বসেও স্পষ্ট বুঝতে পারে আকাশ।
“ঢুকিয়ে দিয়ে গেল মানে? কে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল? তুমি দেখলে সাপ ছাড়তে কাউকে?”
আকাশ তক্ষুনি উত্তর দিতে পারে না। সাপটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছিল। আকাশ লক্ষ করছিল ওর গতিপথ। হাতে শক্ত করে ধরা ছুরির বাঁট। বিনা কারণে প্রাণী মারতে ভালো লাগে না আকাশের, সে প্রাণী বিষধর সাপ হলেও। কিন্তু নিজের প্রাণ বিপন্ন হলে ছুরি তো তাকে চালাতেই হবে। টর্চের আলোয় তাই সাপটাকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখছিল আকাশ।
“কী হল আকাশ, কথা বলছ না কেন? আকাশ!” পূরণচন্দ উদ্বিগ্ন চিৎকার করে।
তাদের এই চ্যাঁচামেচিতে এর মধ্যে ধনুয়াদেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ওদিক থেকে তাদের দৌড়ে আসার শব্দ পায় আকাশ। মাটির কাঁপুনি বোধহয় সাপটাও টের পায়। যেতে যেতে একটু থেমে যায় ওটা, সামান্য ইতস্তত করে এবং বিপদের আশঙ্কায় নিজের অভিমুখ পালটে একটা ঝাঁপ দিয়ে এসে পড়ে সটান আকাশের বিছানায়। মুহূর্তের রিফ্লেক্সে আকাশের হাতে ঝলকে ওঠে ধারালো ইস্পাত।
“ঠিক আছি।” উত্তর দিতে গিয়ে গলা ভেঙে যায় আকাশের। “ওটা শেষ।”
হুড়মুড় করে ফ্ল্যাপ সরিয়ে তার তাঁবুতে ঢুকে পড়ে পূরণচন্দ, তার পিছনে ধনুয়া। তারও পেছন থেকে উঁকি দিতে থাকে আরও অনেকগুলো হঠাৎ ঘুমভাঙা মুখ। বিছানার ওপর তখনও মোচড়াচ্ছে একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাতের মতো মোটা চকচকে শরীরটা। চ্যাপটা মাথায় আমুল গেঁথে আছে আকাশের ছোরা।
“আরে বাপ রে! এ তো ভয়ানক জহরিলা সাপ। আপনার বিছানায় উঠল কী করে? ঠাণ্ডা পড়তে শুরু হয়ে গেছে, এখন তো সাপের বেরোনোর সময়ই নয়।” ধনুয়ার দু’চোখ কপালে ওঠে।
“তুমি ঠিক দেখেছ কেউ এটাকে ছেড়ে দিয়ে গেল?”
আকাশ ক্লান্ত মাথা নাড়ে। “লোকের মুখ দেখিনি। তবে ফ্ল্যাপ যতটা ফাঁক হয়েছিল, শুধু সাপ বুকে হেঁটে ভেতরে এলে অতটা ফাঁক হত না।”
পূরণচন্দের চোয়াল শক্ত হয়। “প্রথমে গাড়ির টায়ার, তারপরেও আটকাতে না পেরে একেবারে ঘরের ভেতর সাপ। তার মানে সত্যিই কেউ ভীষণভাবে চেষ্টা করছে মন্দির পর্যন্ত আমাদের যেতে না দিতে। কিন্তু কে সে? আমি তো কাউকে এই ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কিচ্ছুটি বলিনি, এক তোমায় ছাড়া।”
“মাস্টারজি?” আকাশ আস্তে করে ডাকে।
“বলো।” পূরণচন্দ চোখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে।
“সেই হোটেলের লোকটাকে মনে আছে?”
“কোন লোকটা?”
“সেই যে হরিদ্বারের হোটেলে আমরা যখন খেতে খেতে এসব নিয়ে কথা বলছিলাম, একটা লোক একেবারে আমাদের ঘাড়ে এসে পড়েছিল প্রায়, মনে আছে?”
“ও হ্যাঁ, সেই একটা উটকো লোক। তার সঙ্গে এ ব্যাপারের কী? তাকে তো চিনিই না আমি। দেখিওনি কোনওদিন।” পূরণচন্দ তাচ্ছিল্যের হাত নাড়ে।
“আমি কিন্তু আরও কয়েকবার দেখেছি লোকটাকে।”
“মানে! কোথায় দেখেছ?” পূরণচন্দ বেশ অবাক হয়।
আকাশ এতক্ষণ পাথরের মতো আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিল। এবার আস্তে আস্তে শরীরটা শিথিল করে। ছুরির আগায় গাঁথা সাপটাকে ধনুয়া নিয়ে গেছে বাইরে।
“শেষবার দেখেছি জয়সলমিরে। আমরা যে ট্রেনে এলাম সেই ট্রেন থেকেই নামল, আরেকজনের সঙ্গে।”
“বলো কী! কই, আমায় কিছু বলোনি তো।”
“বলার মতো যে কিছু আছে সেরকম তো বুঝিনি।” আকাশ একটু কাঁচুমাচুভাবেই জবাব দেয়।
“তাও তো বটে। কিন্তু এরা কারা আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের আটকাতেই বা এত চেষ্টা করছে কেন তাও তো মাথায় আসছে না। নাহ্, চিন্তায় ফেলে দিল দেখছি।”


আট


বাকি রাতটা কারও চোখেই বিশেষ ঘুম আর এল না। আধো ঘুম আধো জাগাতেই কেটে গেল সময়। ভোরের একটু আগে চারজন রওনা হল মন্দিরের দিকে। আকাশের বেল্টে বাঁধা ছুরি। তাছাড়াও শরীরের অন্য কয়েকটা জায়গায় ছুরি লুকোনো ছিল তার। এমনভাবে, যে প্রয়োজনে লহমায় ছুরি হাতে তুলে নিতে পারবে সে। এছাড়াও তাদের সবার পিঠেই ব্যাকপ্যাক বাঁধা। জল, কিছু খাবার, আরও নানা দরকারি জিনিসপত্র। পূরণচন্দ খাতাটা হাতে নিয়েই হাঁটছিল, আর মাঝে মাঝে চোখ রাখছিল কবজিতে বাঁধা কম্পাসের দিকে। মুখিয়া একটা লাঠি হাতে আগে আগে চলছিল তাদের দলের গাইড হয়ে।
বালির মধ্যে দিয়ে ওভাবে হেঁটে যাওয়া বেশ কষ্টকর। একেক জায়গায় ঝুরো নরম বালিতে পা বসে যাচ্ছিল গভীরভাবে। কোথাও কোনও গাছ নেই, এতটুকু ছায়া নেই। ক্রমশ সূর্য ওপরে উঠে আসছিল। চড়া আঁচ পুড়িয়ে দিচ্ছিল ওদের পিঠ, ঘাড়, মাথা। গলা শুকিয়ে আসছিল। তবুও মুখিয়া থামার নাম করে না।
প্রায় ঘণ্টা চারেক এইভাবে হাঁটার পর দূরে একটা ধ্বংসস্তূপের মতো কী যেন দেখা যেতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে ধনুয়াকে কিছু একটা বলল মুখিয়া।
“হুকুম, ওই যে দেখা যাচ্ছে ওটাই দেবীমায়ের পুরনো মন্দির। এরা এই পর্যন্তই আসে। এরপরের রাস্তা এদের জানা নেই।” ধনুয়া অনুবাদ করে দেয়।
“কিন্তু তিনটে চুড়ো কোথায়? এ তো একটাই চুড়ো দেখছি, তাও আদ্ধেকটা ভাঙা।” আকাশ বলে।
ধনুয়া মুখিয়ার সঙ্গে আবার একটু কথা বলে নেয়। “তিনটেই ছিল হুজুর, ভেঙে গেছে অনেকদিন হল। কিন্তু এটাই সেই মন্দির।”
“বেশ। ওকে জিজ্ঞাসা করো ও আর এগোবে কি না। নাহলে এখানেই অপেক্ষা করুক আমাদের জন্য।” পূরণচন্দ বলে।
ধনুয়ার প্রশ্নের উত্তরে ঘনঘন মাথা নেড়ে আপত্তি জানায় মুখিয়া। সে আর এগোবে না। শহরী বাবুরা যেতে চাইলে যাক।
“তাহলে তুমিও এখানে ওর সঙ্গে থাকো ধনুয়া। একা একা কতক্ষণ বসে থাকবে বেচারা। আমাদের তো ফেরার কোনও ঠিক টাইম জানা নেই।”
“আপনারা দু’জনেই শুধু যাবেন, কোনও বিপদ-আপদ হলে?”
“বিপদ হলে দেবীমা আছেন। বাঁচাতে চাইলে তিনিই বাঁচাবেন। নাহলে মরব।” পূরণচন্দ হাসে। “এসো আকাশ।”
ভাঙা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষকে চোখে রেখে হাঁটতে থাকে ওরা দু’জন। এখানে পথ আরও দুর্গম। উঁচুনিচু বালিয়াড়ি ভেঙে এগোতে হচ্ছিল। মাঝে মাঝেই কাঁটাঝোপে আটকে যাচ্ছিল প্যান্ট। ঘড়ি দেখে আকাশ। মুখিয়াকে ছেড়ে আসার পর দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে এর মধ্যেই। বোতল থেকে অল্প জল খায় ওরা। শুধু ঠোঁটটুকু ভেজানোর মতো। সব জল ফুরিয়ে ফেললে চলবে না। এ পথে আবার ফিরতেও হবে তো।
হঠাৎই একটা বালিয়াড়ি পেরোতেই সামনে ঝম করে মাথা তুলে দাঁড়ায় ভাঙাচোরা মন্দিরটা। দূরত্ব হয়তো খুব বেশি হলে আর এক কিলোমিটার হবে। আকাশের পা থেমে যায় আপনা থেকেই।
পূরণচন্দ কম্পাস ধরে কী যেন মেলাচ্ছিল মন দিয়ে। এবার মুখ তোলে সে। “হুঁ। ঠিকই এসেছি। চলো হে ওস্তাদ, মায়ের দর্শনটা সেরে ফেলি। এতদূর তো হিসেব ঠিকঠাকই মিলল, বাকিটা কদ্দূর মেলে দেখবে না?”
“চলো।” পূরণচন্দের পেছন পেছন পা বাড়ায় আকাশ।
বাড়িয়েও পা টেনে নিতে হয় তাকে। কাঁটাঝোপের সামনে বালিতে এমন একটা জিনিস পড়ে থাকতে দেখে সে যেটা এই জায়গার পক্ষে একেবারেই বেমানান। ধনুয়ার কথা সত্যি হলে এখানে জনমানুষের পা পড়ে না আজ বহুবছর। তাহলে ফিলটার বসানো সিগারেটের ওই পোড়া টুকরোটার মতো একটা আদ্যান্ত শহুরে নেশার জিনিস এই মন্দিরের দোরগোড়ায় পড়ে থাকে কী করে?
পূরণচন্দকে জিনিসটা দেখাতে গিয়ে তাকে কাছাকাছি খুঁজে পেল না আকাশ। সে ততক্ষণে প্রায় মন্দিরের দোরগোড়ায় পৌছে গেছে। খটকাটা মনের মধ্যে চেপে রেখেই অগত্যা পূরণচন্দকে অনুসরণ করে আকাশ।


পাথর গেঁথে তৈরি মন্দিরের দরজা বলতে এখন আর কিছু নেই। এককালে হয়তো ছিল। সেসব কবেই চলে গেছে কালের গর্ভে। এখন শুধু রয়েছে একটা মস্ত অন্ধকার হাঁ মুখ। তার পেছনে আরও গভীর অন্ধকার। আকাশের গা কেমন ছমছম করে ওঠে ওই হাঁ মুখের গহ্বরের ভেতর ঢুকতে গিয়ে।
পূরণচন্দ তার পিঠের ঝোলা থেকে সোলার ল্যাম্প বার করে জ্বেলে নিল। সামনের অন্ধকার তাতে একটু দূর হল ঠিকই, কিন্তু দূরের জমাট অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে এল।
মন্দিরের ভেতরে বিশ্রী গন্ধ। তার কারণরাও চোখের সামনেই ঝুলছিল উলটো হয়ে। ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত দেওয়ালে শুধু বাদুড়। অসংখ্য, অগণ্য। আকাশের গা গোলায়। চোখ বন্ধ করে সে। ফেলে আসা সার্কাসের দিনগুলোর কথা স্মৃতি থেকে তুলে এনে জোর করে এই ভয়ংকর অন্ধকার থেকে নিজের মনকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
পূরণচন্দ বোধহয় এসব কিছুই খেয়াল করছিল না। আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক নজর করছিল সে। হঠাৎই তার উল্লসিত গলা আকাশকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে। “ওই দ্যাখো আকাশ। ত্রিনয়নী!”
সোলার ল্যাম্পের আলো পড়েছে মাটি থেকে প্রায় দু’মানুষ উঁচুতে। সেখানে পাথর খোদাই করে আঁকা তিনটি বিশাল চোখ। চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে পূরণচন্দের ল্যাম্পের আলোয় জ্বলজ্বল করছে সে চোখের তারা।
“নয়নে বিন্দু। দেখেছ আকাশ? এইবার দেখব তোমার কেরামতি।” পূরণচন্দের গলায় এমন উত্তেজনা আগে শোনেনি আকাশ।
“কেরামতি মানে? কিছু বুঝতে পারছি না তোমার কথা।”
“মনে করো, মনে করো সেই শ্লোক। ‘ত্রিনয়নে বিন্দু, হানো বিন্দুতে বাণ, বাণমুখে রন্ধ্রপথ, বোঝো হে সন্ধান।’ তিন চোখের মাঝখানে ওই কালো টিপের মতো দেখতে পাচ্ছ না?”
“পাচ্ছি। তো?”
“ওইখানে ছুরি বেঁধাতে হবে তোমায়।”
“কেন? কী হবে ওখানে ছুরি বেঁধালে?”
“আহ্, তর্ক কোরো না। তর্ক কোরো না এখন। সময় চলে যাচ্ছে। রাত হয়ে গেলে এই গুহা থেকে থেকে ফিরে যেতে পারব না। বার করো ছুরি। ঠিক ওই বিন্দুতে বেঁধাও। আমার ধারণা ঠিক হলে ওখান দিয়েই খুলবে স্বর্ণভাণ্ডারের প্রবেশপথ।”
পূরণচন্দের উত্তেজনার কিছুটা ছোঁয়াচ বুঝি আকাশের ভেতরেও চারিয়ে যায়। কোমরের বেল্টে আটকানো লম্বাটে বর্শাকৃতি একটি ছুরি হাতে তুলে নেয় সে। মেপে নেয় উচ্চতা, মেপে নেয় দূরত্ব। তারপর নিজের সমস্ত মনঃসংযোগ একজায়গায় সংহত করে আনে। মহাভারতের অর্জুনের মতো এখন তার সামনে শুধুই ওই কালো বিন্দু।
ধরে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়তে ছাড়তে আস্তে, খুব আস্তে, নরম হাতে ছুরিটা ছুড়ে দেয় সে।  নিখুঁত নিশানায় সেটা গিয়ে গেঁথে যায় তিন পাথুরে চোখের ঠিক মাঝখানের কৃষ্ণগহ্বরে। বেশ কয়েক মুহূর্ত কিছুই হয় না।
আকাশ সবে পূরণচন্দের দিকে হতাশ, বিরক্ত মুখে ঘুরতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড় শব্দে তাদের পায়ের তলার পাথুরে মেঝে কেঁপে উঠতে আরম্ভ করে। হাজার হাজার বাদুড়ের সন্ত্রস্ত ওড়াউড়ির মাঝখানে বিস্ফারিত চোখে আকাশ দেখে দেবীর ত্রিনয়নের ঠিক নিচ বরাবর পাথরের দেওয়াল ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। বেরিয়ে পড়ছে আরও অন্ধকার এক সুড়ঙ্গপথ।


নয়


পূরণচাঁদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দেওয়ালের কোণে কোণে জমে থাকা অন্ধকারের ভেতর থেকে হঠাৎই একটুকরো অন্ধকার প্রবল বেগে তার দিকে ছুটে আসে এবং একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় তাকে ধরাশায়ী করে দেয়। আকাশ ব্যাপারটা বোঝার আগেই তারও মাথায় পড়ে একটা সাংঘাতিক বাড়ি। কয়েক মুহূর্তের জন্য চেতনা হারায় সে।
জ্ঞান ফিরতে নিজেকে সে আবিষ্কার করে হাত বাঁধা অবস্থায়। পূরণচন্দেরও একই দশা, ফোলা চোখের ফাঁক দিয়ে যতটুকু বুঝতে পারে আকাশ।
কথা বলছিল পূরণচন্দ। সামান্য জড়ানো গলা, তবুও তার বিস্ময় চাপা থাকছিল না। “প্রফেসর করণ সিংজি? আপনি? আপনি এসবের পেছনে?”
একটা অন্ধকার নড়ে-চড়ে আলোয় এসে দাঁড়ায়। শহুরে পোশাক পরা লম্বাচওড়া রাজোয়াড়া চেহারা, খাড়া নাক আর পাতলা ঠোঁটে দম্ভ ফেটে পড়ছে। “অবাক হচ্ছ পূরণচন্দ? কিন্তু কেন? ওই কাগজে যা লেখা তাতে শুধু একা তোমারই হক, একথা ভাবলে কী করে? আমিও তো ভাটি রাজপুত, পূরণচন্দ। আমার পূর্বজের ভাগও তো আছে ওই সোনায়।”
“সোনার ভাগ নিতে তো আমি আসিনি করণ সিংজি। আমি শুধু চেয়েছিলাম আবিষ্কারের গৌরব।”
“সে গৌরব যে আমি চাইনি একথাই বা ভাবছ কেন? গায়ে যে কালি লেগেছে সেটা এই সোনায় মুছে যাবে পূরণচন্দ, একদম চকচকে হয়ে যাবে সব।”
“তা বলে এভাবে?” হতাশায় পূরণচন্দের গলা ভেঙে আসে। “অন্যকে মেরে, ঠকিয়ে? বললেই তো পারতেন ভাইজি, আপনাকেও সঙ্গে নিয়েই আসতাম।”
“মারতে চাইনি তো। আটকাতে চেয়েছিলাম। বোকামি তো তুমিই করলে পূরণচন্দ। এতবার রাস্তা রুখতে চেষ্টা করলাম, তুমি তাও সেই এসে মন্দিরে পৌঁছেই গেলে। এবার তোমায় কী করে আর বাঁচিয়ে রাখা যায়, বলো?”
“আমরা দু’জনে মিলেই তো কাজটা করতে পারতাম প্রফেসর সাহেব। আমাকে যদি ঘুণাক্ষরেও একটু আভাস দিতেন আপনি। এত ঘোরপ্যাঁচ, লুকোচুরি, মানুষ মারা, এসবের তো কোনও দরকারই হত না।” পূরণচন্দকে কাতর শোনায়।
“নাহ্। এ গৌরব বলো গৌরব, সম্পদ বলো সম্পদ, শুধুই আমার। প্রফেসর করণ সিং ভাটি, ভাটি রাজপুতদের লুকোনো ধনভাণ্ডারের পুনরাবিষ্কারক। একটা পদ্মশ্রী তো হবেই, কী বলো? হ্যাঁ, তুমি পথটা দেখিয়ে দিয়েছ, তার জন্য একটা ধন্যবাদ তোমার অবশ্যই পাওনা হয়। দিলাম সে ধন্যবাদ। এবার আমার পালা। কই হে মুন্নারাম, চলো দেখি। আলো দেখাও।”
আরও দুটো জোরালো সৌরবাতি জ্বলে ওঠে পরপর। আকাশ দেখতে পায় সেই হরিদ্বারের লোকটাকে। অনেক ধাঁধাই পরিষ্কার হয়ে যেতে থাকে এবার তার মনের মধ্যে।
আকাশ যেখানে পড়ে ছিল সেখান থেকে সুড়ঙ্গের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বেশ চওড়া একটা ঢালু পথ। সমান করে বিছানো সোনালি বালির মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো চৌকো পাথর। এতটাই সমান বালি যে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ বোধহয় রোজ এসে ঝাঁটপাট দেয়। আসলে সেই বহুযুগ আগে যে বন্ধ হয়েছিল এই সুড়ঙ্গপথের দ্বার, তারপর তো কেউ আর তাকে খোলেনি এতদিনেও। বালি এলোমেলো হবে কী করে?
পাথরগুলোকে দেখে কী যেন একটা চেনা নকশার কথা মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ছিল না আকাশের।
বালিতে প্রথম পা রাখলেন প্রফেসর সিং। এক পা, দু’ পা। ক্রমশ তাঁর মুখে ফুটে উঠতে লাগল বিস্ময় এবং সে বিস্ময় দ্রুত বদলে যেতে লাগল আতঙ্কে। “মুন্না! মুন্নারাম! তোল আমাকে। তোল। ডুবে যাচ্ছি আমি! ডুবে যাচ্ছি!”
মুন্না হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রফেসরের আর্তনাদে বালির দিকে এক পা বাড়িয়েও পিছিয়ে এল সে। এদিক ওদিক খুঁজছিল সে, যদি কিছু ছুঁড়ে দেওয়া যায় করণ সিংয়ের দুই বাড়ানো হাতের মধ্যে।
কিছুই না থাকায় হতাশ এদিক ওদিক তাকায় সে। তখনই তার চোখ পড়ে বালির ভেতর থেকে মাথা উঁচিয়ে থাকা চৌকো পাথরগুলোর ওপর। একটা স্বস্তির ভাব ফুটে ওঠে তার মুখে। একটা মস্ত লাফ দিয়ে সামনের পাথরটার ওপর গিয়ে দাঁড়ায় মুন্নারাম। তারপর নাক বরাবর সোজা পাথরটায় লাফিয়ে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি হয়। মোটামুটি সরলরেখায় তিনটে পাথর পেরোলেই করণ সিংয়ের কাছে পৌঁছে যেতে পারবে সে।
প্রফেসর ততক্ষণে প্রায় বুক অবধি ডুবে গেছেন। খুব দ্রুত তাঁকে টেনে নিচ্ছিল চোরাবালি। মুন্নার পরবর্তী লাফ এবং আকাশের চিৎকার করে বলা ‘না’-টা একই সঙ্গে হল।
ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে আকাশ দেখল একটা প্রচণ্ড ঘড়ঘড় শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গের মুখটা সজোরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওপাশ থেকে দু’জন মানুষের ভয়ার্ত আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে হতে দেওয়ালের আড়ালে চাপা পড়ে গেল। ঝরঝর করে বালি আর পাথর পড়ছিল ছাদ থেকে।
“কী হল ওদের? আকাশ? কী হল?” পূরণচন্দ ব্যাকুল প্রশ্ন করে। সে যেভাবে পড়েছিল তাতে কিছুই তার নজরে পড়ছিল না।
“দেবীমাতা লোভের শাস্তি দিলেন।” ফ্যাঁসফেসে গলায় কোনওরকমে বলে আকাশ। বিস্ময়ে আতঙ্কে পাথর হয়ে যাওয়া ভাব কোনওরকমে কাটিয়ে উঠে নিজের শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করছিল সে।
“কিন্তু সুড়ঙ্গপথ বন্ধ হয়ে গেল কেন?”
“সোনালি মরণ আছে মাতারে ঘিরিয়া / চতুরঙ্গে অশ্ব চলে বিপদ জিনিয়া।” আকাশ বিড়বিড় করে।
“কী বললে? কী বললে আরেকবার বলো।”
“দাঁড়াও, আগে তোমার বাঁধনটা কাটি।”
“বাঁধন কাটবে? কী করে?” পূরণচন্দ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
“নাইফ-মাস্টার নামটা কি এমনি এমনি হয়েছিল মাস্টারজি? ভাগ্যিস আমায় সঙ্গে এনেছিলে, নইলে তো এই মন্দিরেই পচে গলে থেকে যেতে হত।” কথা বলতে বলতে পূরণচন্দের দু’হাতের বাঁধন কাটতে থাকে আকাশ। তার বুটের খাঁজে গোঁজা ছিল ধারালো ছুরি। শরীর বাঁকিয়ে-চুরিয়ে সেই ছুরিই বার করে এনেছিল সে।
“তুমি শ্লোকের ওই অংশটা কী বললে আরেকবার বলো।” উঠে বসে কবজি ঘষতে ঘষতে বলে পূরণচন্দ।
“চতুরঙ্গ খেলা দেখেছ মাস্টারজি কখনও? আমার নানা খেলত। আজকাল যাকে দাবা বলে।”
“তার সঙ্গে কী?”
“ওই যে, পাথরগুলো। প্রথমে ধরতে পারছিলাম না, কিন্তু দেখেই মনে হচ্ছিল কেমন যেন ছক করে পাতা আছে। আট আট ঘরের ছক, একটা পাথর, একটা বালি।”
“তো?”
“চতুরঙ্গে অশ্ব চলে বিপদ জিনিয়া। একটু বুদ্ধিশুদ্ধি আমারও আছে মাস্টার, সে মানো আর নাই মানো। বিপদ থেকে বাঁচতে গেলে কী করে চলতে হবে? না, ঘোড়ার চালে। আড়াই পা। নইলেই সোনালি মৃত্যু। মানে চোরাবালি।”
“কিন্তু সুড়ঙ্গ যে বন্ধ হয়ে গেল!”
“ও বোধহয় তোমার পূর্বপুরুষরা কিছু কলকব্জা করে রেখেছিল। ভুল লোক ভুল জায়গায় পা দিলেই এক্কেবারে রাস্তা বন্ধ।”
“দেখো না আরেকবার ছুরি মেরে, যদি খোলা যায়। ধনরত্ন চুলোয় যাক, মানুষদুটো যে রয়ে গেল ওখানে!” পূরণচন্দ আকুতিভরা চোখে তাকায়।
“উঁহু, সে গুড়ে বালি। একটাই চান্স দেন মাতা। ও তোমার পূর্বপুরুষের ধনসম্পদ আর কেউ পেল না মাস্টারজি। ব্যাড লাক। মাতারানির সোনা মাতারানিই রেখে দিলেন। লোভীরা রয়ে গেল পাহারাদার হয়ে।”
আলোটা উঁচু করে তুলে ধরে আকাশ। পাথরের দেওয়ালে তিন চোখের মাঝখানের বিন্দুটা আর নেই। সেখানে এখন এবড়োখেবড়ো পাথরের তাল জমাট হয়ে আছে।
“কিন্তু আমায় একটা কথা বলো দেখি মাস্টারজি। এই পরফেসর লোকটা কে? তোমার ওপর তার এত খারই বা কেন? তোমার সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও কঙ্কাল বানিয়ে রেখে যাচ্ছিল তো। গায়ে কালি-ফালি কীসব বলছিল কিছুই তো বুঝলাম না।”
পূরণচন্দ ফাঁকা চোখে তাকায় আকাশের দিকে। তার সেই পুরনো দৃঢ় ব্যক্তিত্ব একটু নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল যেন। “প্রফেসর করণ সিং ভাটি। আমাদের কলেজেরই শিক্ষক। আমারই সাবজেক্ট। আমার সিনিয়র ছিলেন। চাকরি চলে গিয়েছিল কিছুদিন আগে। সেই জায়গায় প্রমোশন দিয়ে কর্তৃপক্ষ আমায় বসিয়েছিলেন।”
“চাকরি কেন গেল লোকটার? কলেজেও খুনখারাপি করতে গিয়েছিল নাকি?” আকাশ জানতে চায়।
“না না, সেসব কিছু নয়। উনি যে ওসব করতে পারেন তাই তো জানতাম না। ভাবিওনি কোনওদিন। শুনেছিলাম কিছু গোলমাল ছিল ওঁর কাগজপত্রে। সত্যিমিথ্যে জানি না। ওঁর ডিগ্রি নাকি ভুয়ো। তবে উনিও ভাটি রাজপুতদের ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছিলেন, এটা জানতাম। কিন্তু আমার পেছনে এইভাবে লোক লাগিয়ে, এরকম খুনজখম ধোঁকাদারির পথ বেছে নিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিলেন উনি, এ আমার চিন্তার বাইরে ছিল। এতদিনের এত পরিশ্রম আমার, শুধু এই একটা লোকের জন্য মাটিতে মিশে গেল।” পূরণচন্দের গলা বন্ধ হয়ে আসে হঠাৎ।
তাকে একটু সময় দেয় আকাশ নিজেকে সামলে নিতে। তারপর জোর করেই নিজের কথায় হালকা সুর আনে। “যা বুঝলাম মাস্টারজি, বেশি লেখাপড়া করলেই বিপদ। এই আমাদের মতো মোটামুটি দু’অক্ষর পড়ার বিদ্যে থাকলেই ঢের। খেটেখুটে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকলে, নিজের ওপর ভরসা থাকলে, বললাম না, ডাল-রুটি ঠিক জুটে যায় ওপরওয়ালার দৌলতে। তোমরা সব পণ্ডিত লোকজন এই এটা ওটা পড়ে পড়েই মাথা-টাথা বিগড়ে ফেলো। নাও, চলো এবার। অনেক স্বপ্ন দেখেছ, অনেক দৌড়েছ মরীচিকার পেছনে। শখ মিটেছে, এবার ওঠো দেখি কষ্ট করে। উঠে দাঁড়াও। ধনুয়ারা অপেক্ষা করে আছে ওদিকে। অনেকটা পথ যেতে হবে আবার।”
একে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাত ধরাধরি করে উঠে দাঁড়ায় দু’জন। আশি বছরের কোমরভাঙা বুড়ো মানুষের মতো ঝুঁকে ঝুঁকে, পা ঘষে ঘষে বেরিয়ে আসে যুগযুগান্তের গোপন রহস্য বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটার অন্ধকার গহ্বর থেকে। বাইরে তখনও কিছুটা আলো রয়েছে।
ধাঁধিয়ে যাওয়া দু’চোখ হাত দিয়ে আড়াল করে সামনে তাকায় আকাশ। যেটা চোখে পড়ে সেটা প্রথম নজরে এতটাই অবিশ্বাস্য লাগে যে পূরণচন্দকে ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে চোখ কচলায় আকাশ। কিন্তু তাতেও দৃশ্যটা বদলায় না। আকাশকে ওরকম হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে পূরণচন্দও থেমে যায়। “কী হল?”
আকাশ সামনের দিকে ইশারা করে দেখায়। তাদের দু’জনের হতবুদ্ধি দৃষ্টির সামনে ঠিক একইরকম অবাক হয়ে গলা লম্বা করে তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু’খানা স্বাস্থ্যবান সওয়ারি উট। পিঠ থেকে জিন পর্যন্ত খোলা হয়নি তাদের। সামনের দু’পায়ে জড়ানো আনাড়ি হাতের বাঁধা দড়ির গিঁঠ ছিঁড়ে ঝুলঝুল করছে।
হা হা করে হেসে ওঠে আকাশ হঠাৎ। “চলো মাস্টার। দেবী মা সোনা না দেন, বাহন পাঠিয়ে দিয়েছেন। ভক্তদের এতটা কষ্ট দিতে প্রাণে আর সয়নি বোধহয়। উঠে বসি এসো, আর কিছু করতে হবে না। ধনুয়ার উটই আমাদের ওর কাছে পৌঁছে দেবে এবার।”


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

3 comments:

  1. বেশ ভালো লাগল

    ReplyDelete
  2. শেষ অংক রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম! গুপ্তধন না মিললেও ইতিহাসের খোঁজ মিলল --

    ReplyDelete
  3. দুর্দান্ত! সকাল থেকে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করলাম। এত সুন্দর গল্পের প্লট কোথা থেকে পান? স্যালুট!

    ReplyDelete