গল্পঃ দুর্গামায়ের গয়নাঃ স্বরূপা রায়


দুর্গামায়ের গয়না

স্বরূপা রায়


এক

স্কুল থেকে হেঁটে হেঁটে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছে গণেশ। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক পড়ল, “গণেশ, দাঁড়া।”
গণেশ পেছন ফিরে দেখল ওদের গ্রামের ছেলে পচা ডাকছে। পচা ওর থেকে বছর দুয়েকের বড়ো। শহরে কাজ করে। পচা গণেশের কাছে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল, “বাড়ি যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ, বাড়ি যাচ্ছি।”
“চল, একসাথেই যাই।”
গণেশ আর পচা পাশাপাশি হাঁটা শুরু করল। পচা আবার জিজ্ঞেস করল, “ইস্কুলে গেছিলি? তোদের ইস্কুল কবে থেকে ছুটি দেবে রে?”
“পূজার ছুটি? ষষ্ঠীর দিন থেকে।”
“আচ্ছা, তোর এখন কোন ক্লাস যেন?”
“সপ্তম শ্রেণী।”
“বাহ্‌! তা বলছিলাম যে পূজার কয়েকদিন শহরে কাজ করবি?”
“কী কাজ গো পচাদাদা?”
“একটা বড়ো বনেদী বাড়িতে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত কয়েকটা ছেলে লাগবে। এই টুকটাক কাজের জন্য। থাকাখাওয়া ওখানেই। প্রতিদিন ভোগ খেতে পাবি। আর তার সাথে কিছু টাকাপয়সাও দেবে।”
“মা করতে দেবে না মনে হয়।”
“তোর মাকে আমি বলব।”
গণেশ পচাকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। ওর মা কমলা কুয়োর পাড়ে বাসন মাজছিল।
“মা, পচাদা তোমার সাথে একটা কথা বলতে চায়।” গণেশ কমলাকে বলল।
কমলা বাসন মাজতে-মাজতেই পচাকে বলল, “হ্যাঁ রে পচা, বল।”
“কাকিমণি, দুর্গাপূজার সময় শহরের এক বনেদী বাড়িতে কয়েকটা ছেলে লাগবে। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত কাজ। থাকাখাওয়া ওই ক’দিন ওখানেই। তাছাড়া হাতে টাকাও দেবে।”
“তো?”
“তো বলছিলাম যে, গণেশও কাজ করতে পারে। আমিও তো করব। আমার সাথেই থাকবে।”
“কোনও দরকার নেই। আমাদের ঘরে অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু গণেশকে এই বয়সে কাজ করতে হবে না। বড়ো হোক, পড়াশোনা শেষ করুক, তারপর তো কাজ করবেই।”
“কিন্তু কাকিমণি…”
“কোনও কিন্তু-টিন্তু না। এখন বাড়ি যা।”
পচা আর কিছু না বলে চলে গেল। গণেশও আর কিছু না বলে ঘরে ঢুকে গেল।

গণেশ ওদের গ্রাম থেকে মাইল খানেক দূরে একটা সরকারি বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। পড়াশোনাতে ও বেশ ভালো। ওর বাবা জগন্নাথ একটা কারখানায় কাজ করত। মাস খানেক আগেই এক মেশিনে দুর্ঘটনায় তার হাত কাটা পড়ে। তারপর থেকে সে বাড়িতেই। কমলা শহরে পাঁচ বাড়ি রান্নার কাজ করে। ভোরবেলা বাড়ির কাজকর্ম সেরে চলে যায় শহরে। রান্নার কাজ শেষ করে বেলা তিনটে নাগাদ ফিরে আসে। ওর রোজগারেই ওদের সংসার, জগন্নাথের চিকিৎসা আর গণেশের পড়াশোনা চলছে।
রাত্রিবেলা খেতে বসে কমলা গণেশকে বলল, “কাল তো মহালয়া। পূজা আসতে আর বেশিদিন বাকি নেই। কিন্তু আমি এখনও কোনও বাড়ি থেকেই বোনাস পাইনি। বোনাস না পাওয়া পর্যন্ত তোকে জামাকাপড় কিনে দিতে পারব না রে।”
“মা, আমার কি জামাকাপড়ের অভাব? আছেই তো অনেকগুলো। আর কী দরকার? আমার লাগবে না।”
“তা বললে কি আর হয় নাকি? দুর্গাপূজার সময় নতুন বস্ত্র পরতে হয়।”
“ওসব আবার নিয়ম আছে নাকি?”
“আছে রে, আছে।”
“আমাদের ছেলেটা কত বড়ো হয়ে গেছে, তাই না? কত বড়ো বড়ো কথা বলে আজকাল।” জগন্নাথ খেতে খেতে বলল।
“ও আমাদের কষ্ট বোঝে গো।” কমলা বলল।
“মা, একটা কথা বলি?” গণেশ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, বল না।”
“পচাদাদা যে কাজটার কথা বলছিল, ওটা তো আমি করতেই পারতাম। খারাপ কোনও কাজ নয়। দুর্গামায়েরই তো কাজ।”
“এই বয়সে তুই কাজ কর, তা আমি চাই না রে। আর দুর্গাপূজার পাঁচদিনই বাড়ির বাইরে থাকবি, তা কি আমাদের ভালো লাগবে, বল?”
জগন্নাথ জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”
গণেশ সব বলল। সব শুনে জগন্নাথ বলল, “এটা তো তেমন কাজ নয়। দুর্গামায়ের সেবার কাজ। আর দুর্গাপূজার কয়েকদিন তো ছুটিই। আমরা তো আর ওকে শহরে বেশি ঠাকুর দেখাতে পারি না। উৎসবের দিনও ছেলেটা এই গ্রামের বাড়িতেই বসে থাকে। তার চেয়ে বরং বনেদী বাড়িতে থাকবে, সবসময় পূজা দেখতে পারবে, আনন্দও পাবে।”
কমলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ঠিক আছে, তোর বাবা যখন বলছে তাহলে কাজটা কর।”
“মা, তুমি চাও তো? তুমি না চাইলে করব না।”
“হ্যাঁ বাবা, কর। পচা তো তোর সাথেই থাকবে। আমার অত চিন্তা থাকবে না।”
“আচ্ছা, মা।”
পরেরদিনই পচার সাথে কথা বলে কাজের ব্যাপারটা ঠিক করে নিল গণেশ। পচা বলেছে যে, ও শহরের ওই বাড়িতে জানিয়ে দেবে যে গণেশও কাজ করবে।

দুই

আজ মহাষষ্ঠী। কমলা দু’দিন আগে বোনাসের টাকা পেয়ে ছেলের জন্য দুই জোড়া জামাপ্যান্ট কিনেছে। সকালবেলা ডিম দিয়ে ভাত খাইয়ে একটা জামাপ্যান্টের সেট পরতে দিল গণেশকে। তারপর ওকে বুঝিয়ে বলল, “খুব সাবধানে থাকবি ওখানে, বাবা। তুই তোর বাবার মোবাইল নম্বর তো জানিসই। কোনও অসুবিধা হলে একটা ফোন করে দিবি যেভাবেই হোক। আমি তোকে গিয়ে নিয়ে আসব। ওই বাড়ি থেকে কিন্তু কোথাও যাবি না।”
“মা, তুমি অত চিন্তা কোরো না। আমি পচাদাদার সাথেই যাব। দশমীর দিন দাদার সাথেই তোমার কাছে ফিরে চলে আসব।”
কমলা গণেশের কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল, “আচ্ছা। আর আরেকটা নতুন জামাপ্যান্ট দিয়ে দিলাম। অষ্টমীর দিন পরিস।”
“ঠিক আছে।” বলে গণেশ ওর মা-বাবাকে প্রণাম করে পচার সাথে বেরিয়ে গেল। কমলা কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে বলল, “দুগ্গা, দুগ্গা।”

পচার সাথে গণেশ এসে পৌঁছল শহরের বিশাল এক বনেদী বাড়িতে। সবাই মুখার্জি বাড়ি বলে। পচার কাছে গণেশ শুনেছে যে এই বাড়ির পুজো সাতান্ন বছর পুরনো। বিশাল এক জমিদার বাড়ি। পুরনো দিনের কাঠের জানালা, দরজা। বিশাল উঠোন। ঠাকুরদালানও বিশাল বড়ো। সেখানে দুর্গামা এসে গেছেন ছেলেমেয়ে নিয়ে। কিন্তু সবারই আপাতত মুখ ঢাকা।
একজন ভদ্রলোকের সামনে পচা গণেশকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "দাদাবাবু, ও গণেশ। আমাদের গ্রামেই থাকে। আপনাকে বলেছিলাম যে, ওই কাজ করবে।”
“হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ঠিক আছে, তোরা ওই কোনার ঘরটায় চলে যা আপাতত। ওখানে আরও দু’জন ছেলে আছে। ওরাও কাজকর্মের জন্যই এসেছে। হাতমুখ ধুয়ে ধীরেসুস্থে আয়। তারপর বলব কী করতে হবে।” দাদাবাবু বললেন।
পচা গণেশের হাত ধরে নিয়ে এল কোনার ঘরটায়। এখানে আরও দু’জন ছেলে একটা গদির উপরে বসে গল্প করছে। তাছাড়া আছে আরও অনেকজন।
“আমি পচা, ও গণেশ।” পচা ছেলে দু’জনের কাছে নিজেদের পরিচয় দিল।
“আমি রাঘব, আর ও রাজু।” একটা ছেলে বলল।
হাতমুখ ধুয়ে চারজনে বসে গল্প করতে-করতেই হঠাৎ ডাক পড়ল ওদের।
দাদাবাবু রাঘবকে পাঠালেন রাঁধুনির কাজে সাহায্যের জন্য। রাজু আর পচাকে ফুলের মালা দিয়ে বাড়ি সাজাতে বললেন। আর গণেশকে নিজের সাথে নিয়ে এলেন ঠাকুরদালানে। এখানে একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা বসে পঞ্চপ্রদীপ সাজাচ্ছেন।
“বড়মা, ও হল গণেশ। যে চারটা ছেলে কাজের জন্য এসেছে, এই ছেলেটাই তাদের মধ্যে সবার ছোটো। এ তোমার কাজগুলো করে দেবে।” দাদাবাবু ওই বয়স্কা ভদ্রমহিলাকে বললেন।
বয়স্কা ভদ্রমহিলা চশমার ফাঁক দিয়ে ভালো করে গণেশকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, “ভারি মিষ্টি। আয়, বস আমার পাশে।”
“বড়মা যা বলবে, করে দিবি। ঠিক আছে?” দাদাবাবু গণেশকে বললেন।
গণেশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বসল বয়স্কা ভদ্রমহিলার পাশে। উনি গণেশকে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম কী তোর?”
“গণেশ।”
“বাহ্‌! জানিস তো, দুর্গামায়ের এক ছেলের নামও গণেশ?”
গণেশ লক্ষ্মীমায়ের মূর্তির পাশে রাখা গণেশের মূর্তিটা দেখে বলল, “হ্যাঁ, জানি ঠাম্মা।”
ঠাম্মা তারপর গণেশের কাছ থেকে ওর পরিবার সম্পর্কে সব শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “মূর্তির জন্য শোলার গয়না বানাতে পারিস?”
গণেশ দু’দিকে মাথা নেড়ে বলল, “কিন্তু অল্প দেখিয়ে দিলেই পারব।”
“বেশ। তবে চল আমার সাথে আমার ঘরে।”
গণেশ ঠাম্মার সাথে ওঁর ঘরে এল। এই ঘরে একটা জায়গায় মেঝেতে বিশাল মাদুর পাতা আছে। সেখানে আছে মূর্তির জন্য শোলার গয়নাগাটি তৈরির জিনিসপত্র। কিছুটা কাজ শেষ।
ঠাম্মা একটা ছোটো জলচৌকি নিয়ে এসে মাদুরের উপরে বসলেন। গণেশ বসল ওঁর মুখোমুখি।
“গয়নাগুলোর মূল গঠন বানানো হয়ে গেছে। সাজসজ্জা বাকি। একটা দেখিয়ে দিচ্ছি। বাকিগুলো তুই করবি।” ঠাম্মা বললেন।
“আচ্ছা, ঠাম্মা।”
ঠাম্মা একটা গয়নার গঠনের উপরের সাজসজ্জা কিছুটা করে দেখিয়ে দিয়ে গণেশকে জিজ্ঞেস করলেন, “পারবি তো এবার?”
“মনে হয় পারব। তুমি তাও দেখো পারছি কি না।”
“হ্যাঁ, তুই কর। আমি একখানেই আছি।”
গণেশ কাজ শুরু করল। প্রথমদিকে একটু সমস্যা হলেও ধীরে ধীরে ও কাজটা শিখে গেল।
“এই তো শিখে গেছিস।” ঠাম্মা বললেন।
“হ্যাঁ, এখন পারব।”
“জানিস, আমার শাশুড়ি-মা মারা যাওয়ার পর থেকে এই কাজটা আমিই করে চলেছি। প্রায় বিশ বছর হবে। আমার আগে আমার শাশুড়ি-মা করতেন। আমি মরে গেলে আমার বড়ো বউমা করবে। এটাই আমাদের বাড়ির রীতি।”
“ওহ্‌, আচ্ছা।”
“আমি এখন আর এতটা সাজিয়ে উঠতে পারি না। বয়স হয়েছে তো, কষ্ট হয়। তাই এবার ছেলেদেরকে বলেছিলাম একটা বাচ্চা ছেলে জোগাড় করে দিতে। তোকে দিল সেইজন্যই। তোর হাতের কাজ ভালো। আমি যতদিন না মরছি, তুই প্রতিবছর এসে আমাকে সাহায্য করবি দাদুভাই?”
“হ্যাঁ ঠাম্মা, আমি প্রতিবছর আসব। কথা দিলাম।”
ঠাম্মা খুব খুশি হলেন।

সন্ধেবেলা দুর্গামা সহ তাঁর ছেলেমেয়েদের গয়নাগাটি পরানো হল। কী অপূর্ব লাগছে! সবাই গণেশের কাজকে বাহবা দিচ্ছে। গণেশেরও দারুণ লাগছে। ও একদৃষ্টে দুর্গামায়ের দিকেই তাকিয়ে আছে। ‘আমার মাও তো দুর্গামায়ের মতোই সুন্দর দেখতে। কিন্তু মায়ের এত গয়না নেই। তাই মাকে খালি খালি লাগে। কী ভালো হত, যদি মাকেও এত সুন্দর করে সাজাতে পারতাম।’ গনেশ মনে মনে ভাবল।

তিন

সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী কেটে আজ বিজয়া দশমী। তিনদিন ধরে গণেশ ঠাম্মার সাথে-সাথেই থেকেছে। ঠাম্মা যখন যা বলেছেন, করে দিয়েছে। ঠাম্মাও এক মুহূর্ত ওকে কাছ ছাড়া করতে চাননি।
দশমীর পূজা শেষ হয়ে গেল। সধবারা দুর্গামাকে সিঁদুর লাগিয়ে নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলায় মেতে উঠলেন। অনেকে গণেশদেরকেও সিঁদুর লাগিয়ে দিলেন। গণেশ একমুঠো সিঁদুর নিয়ে এসে ঠাম্মার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঠাম্মা, সবাই তো সিঁদুর খেলছে, তুমি কেন খেলছ না? আমি তোমাকে অল্প সিঁদুর লাগিয়ে দিই?”
“না, দাদুভাই। আমি তো বিধবা। আমি সিঁদুর ছুঁতে পারব না।”
“ওহ্‌, ওইজন্যই সবসময় তুমি সাদা শাড়ি পরো?”
“হ্যাঁ রে।”
“আচ্ছা, তাহলে আর কী করা যাবে!" গণেশ হতাশ হল।
“মনখারাপ করিস না। আজ দুর্গামায়ের বিদায়ের দিন। শেষমুহূর্তটুকু আনন্দ করে নে। কাল থেকে তো আবার সব বদলে যাবে।”
“আচ্ছা ঠাম্মা, আসছি।” বলে গণেশ আবার সিঁদুর খেলায় মেতে উঠল।
সিঁদুর খেলার পরে মিষ্টিমুখ, বড়োদের প্রণাম করা আর কোলাকুলি হল। গণেশও বাড়ির সব বড়োদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
‘মা, বাবা, প্রতিবার দুর্গামায়ের কাছে বই ছুঁইয়ে এসে তোমাদেরই আগে প্রণাম করি। কিন্তু এবার তা হল না। কিন্তু আজ আমি বাড়ি ফিরব। তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছে।’ গণেশ মনে মনে বলল।

সন্ধে হতেই শুরু হয়ে গেল প্রতিমা বিসর্জনে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড়। ট্রাক এসে গেছে, ঢাকি তৈরি। যারা যারা বিসর্জনে যাবে সবাই তৈরি হয়ে উঠোনে জড়ো হয়েছে।
দাদাবাবু গণেশ, পচা, রাঘব আর রাজুর হাতে ওদের পাওনা টাকা দিয়ে বললেন, “তোরা এই ক’দিন খুব ভালো কাজ করেছিস। তোদের প্রতি আমাদের কারও কোনও অভিযোগ নেই। পরের বছর কিন্তু আবার আসিস। অপেক্ষায় থাকব।”
“অবশ্যই আসব, দাদাবাবু।” সবাই একসাথে বলল।
চারজনে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করল। তারপর রাঘব আর রাজু বিদায় জানিয়ে চলে গেল। পচা গণেশকে বলল, “চল, এবার আমরাও বাড়ি যাই।”
“দাঁড়াও, আমি ঠাম্মাকে বলে আসছি।” বলে গণেশ ছুটল ঠাম্মার ঘরের দিকে।
গণেশ ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি, ঠাম্মা।”
ঠাম্মার চোখে জল। “চলে যাচ্ছিস, দাদুভাই? তোর কথা যে আমার বড়ো মনে পড়বে। জানি না পরের বছর দুর্গাপূজা অবধি আমি বাঁচব কি না। তাই এরপরে যখনি শহরে আসবি, আমার সাথে দেখা করতে আসিস কিন্তু। আমি তোর অপেক্ষা করব। তোর বাবা-মাকে নিয়ে আসবি।”
গণেশের চোখেও জল, “তুমি কেঁদো না, ঠাম্মা। আমি আসব তো। তোমার কথাও আমার খুব মনে পড়বে।”
গণেশ ঠাম্মার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। ঠাম্মাকে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে বললেন, “বেঁচে থাক, দাদুভাই। অনেক বড়ো হ। জীবনে অনেক উন্নতি কর। মানুষের মতো মানুষ হ।”
“তুমিও ভালো থেকো, ঠাম্মা। আমি আসছি।”
“আয়, দাদুভাই। আবার আসিস।”
“আসব।”
গণেশ বেরিয়ে এল ঠাম্মার ঘর থেকে। প্রতিমা নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেছে বিসর্জনের জন্য। গণেশ পচাকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা বিসর্জন দেখতে যাব না দাদা?”
“যাব তো। এখান থেকে বেরিয়ে বিসর্জন দেখে বাড়ি ফিরব।”
গণেশ আর পচা মুখার্জিবাড়ি থেকে বেরিয়ে চলল বিসর্জন-ঘাটের দিকে।
ঘাটে দাঁড়িয়ে দু’জনে বিসর্জন দেখতে দেখতে হঠাৎ পচা খেয়াল করল, পাশে গণেশ নেই। নেই, নেই, নেই। পচা গণেশকে কোথাও খুঁজে পেল না। নিরুপায় হয়ে ও ছুটল ওদের গ্রামের দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে গণেশের বাড়িতে এসে কমলা আর জগন্নাথকে ও সব জানাল।
কমলা তো সব শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে কাঁদতে শুরু করল। জগন্নাথ ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল, “গণেশ ঠিক চলে আসবে। ও কি এখন আর খুব ছোটো? হারিয়ে যাবে না। তুমি চিন্তা কোরো না। ও ফিরে আসবে।”
“শহরের পথঘাট কি ও চেনে নাকি? আর শহরে তো কত ধরনের মানুষ থাকে। কে কখন আমার ছেলেটাকে নিয়ে চলে যাবে। এইজন্য চাইনি যে ও কাজ করুক।”
“অত কেন ভাবছ?”
“ভাবারই তো বিষয়।”

গ্রামবাসী সবাই জড়ো হয়েছে গণেশদের বাড়িতে। মহিলারা সবাই কমলাকে সামলাতে ব্যস্ত। রাত প্রায় এগারোটা বাজে। গণেশ এখনও ফেরেনি। জগন্নাথ গ্রামের ছেলেদের নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে বের হতেই যাবে, এর মধ্যে গণেশ ছুটতে ছুটতে এসে হাজির। কমলা তো ওকে দেখামাত্র ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। সবাই এখন তাকিয়ে আছে ওর দিকেই।
“কোথায় ছিলি তুই, গণেশ? তোকে কত খুঁজলাম।” পচা জিজ্ঞেস করল।
“আরে, আমি তো ঘাটেই ছিলাম। একটা কাজ করতে গেছিলাম। কাজটা করে দেখি আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে তুমি নেই। আমি তো গ্রামে ফেরার রাস্তাও ভালোমতো চিনি না। তারপর দাদাবাবুর সাথে দেখা হল। দাদাবাবুই একটা ছেলের বাইকে করে আমাকে গ্রামের মুখে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিলেন।”
“এভাবে কেউ যায়? তোকে কেউ ধরে নিয়ে গেলে কী হত? কী এমন কাজ ছিল তোর যে পচার থেকে দূরে চলে গেছিলি? আর গেলেও ওকে বলে কেন যাসনি বা ওকে নিয়ে কেন যাসনি?” কমলা কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল গণেশকে।
গণেশ ওর মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “আমাকে মাফ করে দাও, মা। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি এই গয়নাগুলো আনতে নদীতে নেমেছিলাম।”
গণেশের হাতে দুর্গামায়ের শোলার তৈরি গয়না, যেগুলো মুখার্জিবাড়ির দুর্গা প্রতিমার জন্য ও নিজের হাতে বানিয়েছিল।
“এগুলো দিয়ে কী হবে?” কমলা অবাক।
“দুর্গামায়ের মুখটা দেখে আমার খুব তোমার কথা মনে পড়ছিল। একইরকম দেখতে তোমরা। কিন্তু দুর্গামায়ের এত গয়নার জন্য দেখতে বেশি সুন্দর লাগে। তোমার তো মা গয়না নেই, তাই নিয়ে এলাম। এগুলো মুখার্জিবাড়ির দুর্গা প্রতিমার জন্য আমি নিজে বানিয়েছি।” বলে গণেশ নিজের হাতে ওর মায়ের গলায়, হাতে, কানে, মাথায় সব গয়না পরিয়ে দিল।
কমলা কী বলবে বুঝে পেল না। কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরল ছেলেকে।
“কমলা, তোমার ছেলে হিরের টুকরো। ওর মধ্যে যে সরলতা, তোমাদের প্রতি ভালোবাসা-টান আছে, তা সবার মধ্যে পাওয়া যায় না।” গ্রামের একজন ভদ্রমহিলা বললেন।
“তা ঠিক বলেছ, বউদিদি। আমার ছেলে সত্যিই হিরের টুকরো।” কমলা গর্ব করে বলল।
“এখন তোর মায়ের সাজ পূর্ণ হয়েছে, গণেশ?” জগন্নাথ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ বাবা, মাকে একদম দুর্গামায়ের মতোই লাগছে এবার।”
“আমি স্বামী হিসেবে যে কাজটা করতে পারিনি, আজ ছোট্ট সন্তান হয়ে তুই সেই কাজটা করে দিলি। আজ তোর জন্য গর্বে আমার বুকটা ভরে গেল।” জগন্নাথ ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।

_____

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

1 comment:

  1. খুব সুন্দর.. তোমার লেখা পড়তে দারুন লাগে |

    ReplyDelete