লোককাহিনিঃ অকৃতজ্ঞ স্যাকরাঃ রাখি পুরকায়স্থ



এক
এক গভীর বনের বুক চিরে একদিক থেকে আরেকদিকে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে পায়ে চলা সরু পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে এক পথিক। চারপাশ নিঝুম-নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে পাখি আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। এমন সময় পথিকটি হঠাৎ শুনতে পেল কে যেন ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করছে। এমন শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে আচমকা অমন চিৎকার শুনলে কার না আতঙ্ক হয়? পথিক বেচারাও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল, আর তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওই এলাকা থেকে সরে পড়তে চাইল। কিন্তু পথিক বড়ো দয়ালু মানুষ। কয়েক পা এগিয়েই তার মনে হল, ‘আহা রে! নিশ্চয়ই কেউ খুব বিপদে পড়েছে। তাই হয়তো সাহায্যের জন্য এমনভাবে চিৎকার করছে।’ সাতপাঁচ ভেবে পথিক সেই আওয়াজ অনুসরণ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কিছুটা পথ এগিয়ে সে বুঝতে পারল, একখানা পুরনো কুয়োর ভেতর থেকে সেই আওয়াজ ভেসে আসছে। কুয়োর মধ্যে উঁকি দিয়ে পথিক তো অবাক! সেই শুকনো কুয়োর ভেতর কিনা দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মানুষ, একটি বাঁদর আর একটি সিংহ! কুয়োর শ্যাওলা ধরা গায়ে গজিয়েছে একটি জংলি গাছ। সেই গাছের ডালে পেঁচিয়ে রয়েছে একটি বিষধর সাপ!
পথিকের দয়ার শরীর। এদের সকলের প্রাণ বাঁচাতে সে কোমর বেঁধে লেগে পড়ল। আশেপাশে অল্প খুঁজতেই সে পেয়ে গেল একটি শক্ত জংলি লতা। লতাটিকে সে ঝুলিয়ে দিল কুয়োর ভেতর। লতা বেয়ে প্রথমেই ওপরে উঠে এল সাপটি। তারপর একে একে বাঁদর আর সিংহ ওপরে উঠে এল। ওপরে আসার পর তাদের আনন্দ দেখে কে! কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে বাঁদর পথিককে বলল, “বন্ধু, পাহাড়ের গায়ে যে জঙ্গল আছে, সেখানকার সবচাইতে বড়ো বটগাছটাতে থাকি আমি। কখনও পাহাড়ে এলে আমার সাথে দেখা কোরো। তোমার উপকারে লাগতে চাই আমি।”
সাপ ততক্ষণে পাশের একটি গাছের উঁচু ডালে নিজেকে পেঁচিয়ে নিয়েছে। সেখান থেকে গলা বাড়িয়ে সে বলল, “হ্যাঁ বন্ধু, আমিও তোমার উপকারে লাগতে চাই। আমি শহরে থাকি। তুমি সেখানে এলে অবশ্যই আমাদের আবার দেখা হবে।”
সিংহটি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার সে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি গভীর জঙ্গলের বাসিন্দা। কখনও যদি সেখানে এসে বিপদে পড়ো, আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।”
পশুদের মুখে এমন সুন্দর কথাবার্তা শুনে পথিকও যারপরনাই খুশি হল। সে হেসে বলল, “তোমরা সত্যিই খুব ভালো। আশা করি আমাদের আবার দেখা হবে।”
ঠিক তক্ষুনি কুয়োর ভেতর থেকে মানুষের গলা ভেসে এল, “ওহে ভালো মানুষের পো, তুমি কি আমায় ভুলে গেলে নাকি? কুয়োর ভেতরে যে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
পথিক লজ্জা পেল। সত্যিই তো, পশুদের সাথে কথা বলতে গিয়ে মানুষটির কথা একেবারেই ভুলতে বসেছিল সে! তাই সে তড়িঘড়ি এগিয়ে গেল কুয়োর দিকে। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই সিংহ তাকে পেছন থেকে ডেকে বলল, “সাবধান বন্ধু, এই ভুল কক্ষনও কোরো না। এই লোকটা কিন্তু ভীষণ অকৃতজ্ঞ। একে উদ্ধার করে নিজের বিপদ ডেকে এনো না যেন।”
বাঁদর আর সাপও মাথা নাড়িয়ে সিংহের কথায় সম্মতি জানাল।
“না না, এসব কী বলছ তোমরা? নিজে মানুষ হয়ে আরেকটি অসহায় মানুষকে মরতে দিতে পারি না আমি।” পথিক যেন খানিকটা বিরক্ত হয়েই বলে উঠল।
“ঠিক আছে, যা ভালো বোঝো করো।” এই বলে সিংহ, বাঁদর আর সাপ যে যার নিজের আস্তানার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
সিংহ, বাঁদর আর সাপের সাবধানবাণী পথিককে এক ফোঁটাও টলাতে পারল না। কিছুক্ষণের চেষ্টায় লোকটিকে কুয়ো থেকে ওপরে তুলে আনল সে। বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে লোকটিও মহা খুশি। “আমি স্যাকরা। জঙ্গলের পূর্বপ্রান্তে যে শহরটি শুরু হয়েছে সেখানেই আমি থাকি। তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই, ভাই। তবে শহরে এলে আমার বাড়িতেই কিন্তু অতিথি হয়ে থাকতে হবে তোমায়।”
পথিকও খুশি হয়ে সম্মতি জানাল। তারপর পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে দু’জনই যে যার পথে যাত্রা করল।


দুই


এরপর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটি মাস। পথিকটি আবার একদিন সেই একই বনপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এবার তার সাথে রয়েছে এক থলে সোনার মোহর। দিনের শেষে সুয্যি পাটে গেল। ক্রমশ অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ল সেই গভীর নিঝুম বনভূমি। পথিক বুঝতে পারল, এমন অন্ধকারে পথ চলা অসম্ভব। তাই সে ঠিক করল, কিছুক্ষণ গাছের নিচে শুয়ে জিরিয়ে নেবে। তারপর নাহয় অন্য পথিকদলের খোঁজ পেলে তাদের সাথেই বাকিটা পথ যাত্রা করা যাবে।
ক্লান্ত পথিক যখন গাছের নিচে ঘুমোচ্ছিল তখন সেখানে আচমকা হাজির হল একদল ডাকাত। প্রথমেই তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল তারা। অন্ধকারে পথিক কিছু ঠাহর করে উঠবার আগেই ডাকাতেরা তার সোনার মোহর-ভরা থলেটি কেড়ে নিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দিল। তারপর তড়িঘড়ি সেখান থেকে চম্পট দিল সেই ডাকাতদল।
ঠিক তক্ষুনি কাছাকাছি একটি গাছে বসে ছিল সেই বাঁদর, একদিন যার প্রাণ রক্ষা করেছিল পথিক। বাঁদর হঠাৎ শুনতে পেল, কে যেন সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। গলাটা কোন এক মানুষের। ভালো করে কান পেতে শুনতেই গলার আওয়াজটা বেশ চেনা চেনা ঠেকল। গলার আওয়াজ অনুসরণ করে বাঁদর গিয়ে পৌঁছল পাহাড়ের নিচে। সে তো এবার রীতিমতো অবাক! সেখানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে তার সেই পুরনো পথিক বন্ধু! ভাগ্যিস পথিক একটা ঘাসের গাদার ওপর পড়েছে, তাই শরীরে আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছে। উত্তেজিত হয়ে বাঁদর পথিককে বলল, “বন্ধু, তুমি এখানে কী করে এলে? তোমার এমন হালই বা করল কে?”
পথিক কোনও উত্তর দিতে পারল না, কেবল গোঙাতে লাগল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বাঁদর বলল, “ভয় পেয়ো না বন্ধু, আমি আছি তোমার পাশে।”
বাঁদর তাড়াতাড়ি পথিককে বাঁধন মুক্ত করল। তারপর একটা বড়ো গাছের শীতল ছায়ায় তাকে শুইয়ে দিল। ঝরনা থেকে মিষ্টি জল আর গাছ থেকে রকমারি পাকা ফল নিয়ে এসে পরম যত্নে খাইয়ে দিল পথিককে। হাত-পায়ের ক্ষতে লাগিয়ে দিল ঔষধি গাছগাছড়ার প্রলেপ। কিছুটা সুস্থ বোধ করতেই পথিক তার দুর্ভোগের কথা জানাল বাঁদরকে।
“চিন্তার কোনও কারণ নেই, বন্ধু। যেভাবেই হোক তোমার মোহরের থলে আমি উদ্ধার করে আনব। তুমি এখানে নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে বিশ্রাম করো।” এই বলে বাঁদর চলল মোহরভর্তি থলের খোঁজে।
রাত প্রায় শেষ হতে চলেছে। গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বাঁদর ক্রমশ গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করল। হঠাৎ তার নজরে পড়ল, দূরে কোথাও আগুন জ্বলছে। আগুন লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে সে দেখল, চারজন ডাকাত জঙ্গলের মধ্যে একটা খালি জায়গায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। পাশে রাখা আছে তাদের নানান জিনিসপত্র। গাছ থেকে নেমে পা টিপে টিপে বাঁদর পৌঁছে গেল সেখানে। ঠিক যেমনটা ভেবেছিল, ডাকাতদের জিনিসপত্র হাতিয়ে পথিকের মোহরের থলেটি পাওয়া গেল অনায়াসেই। এবার বুদ্ধিমান বাঁদর ডাকাতদের সব জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখল পাশের ঝোপে। তারপর শুধুমাত্র মোহরের থলেটি নিয়ে চুপচাপ উঠে পড়ল একটি বড়ো গাছে।
কিছুক্ষণ পর ডাকাতদের ঘুম ভাঙল। পাশে কোনও জিনিসপত্র নেই খেয়াল হতেই একজন ডাকাত চিৎকার করে উঠল, “আরে! আমাদের বস্তা, বাক্স, তলোয়ার এসব কোথায় গেল?”
সবাই মিলে আশেপাশে খুঁজতে লাগল; কিন্তু অন্ধাকারের মধ্যে হাজার খুঁজেও কিছুই পেল না। শেষমেশ এক ডাকাত উত্তেজিত হয়ে তার সঙ্গীদের বলল, “শিগগির পালাও এখান থেকে। এ নিশ্চয় ভূতের কারসাজি।”
শুনে সব ডাকাতেরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে গেল।
মোহরের থলে হাতে বাঁদর ফিরে এল পথিকের কাছে। “এই নাও বন্ধু, তোমার মোহরের থলে।” বাঁদর সোনার মোহরের থলেটি তুলে দিল পথিকের হাতে। আনন্দে পথিক ধন্যবাদ জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলল। সে কেবল বলল, “তুমি যে আমার কী উপকার করলে, বন্ধু!”


তিন


বাঁদরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথিক আবার বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা পথ এগিয়ে যেতেই কাছাকাছি কোথাও থেকে হাড় হিম করা সিংহের গর্জন ভেসে এল। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগোবার চেষ্টা করতেই পাশের ঝোপ থেকে পথিকের সামনে লাফিয়ে পড়ল এক বিশাল সিংহ! আতঙ্কে দু’পা পিছিয়ে গেল পথিক। ভয়ে যেন তার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে লাগল। সিংহ কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “ভয় পেয়ো না, বন্ধু। আমি সেই সিংহ, যার প্রাণ বাঁচিয়েছিলে তুমি।”
সিংহের কথা শুনে পথিকের ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে বলল, “ওহো, তাই বলো! আমি তো ভয়ের চোটে মরতে বসেছিলাম। তা বেশ ভালোই হল, তোমার সাথে আবার দেখা হয়ে গেল।”
খুশি হয়ে সিংহ পথিককে নিজের গুহায় নিয়ে গিয়ে খুব যত্ন-আত্তি করল। অবশেষে এল বিদায়ের পালা। বন্ধু চলে যাবে ভেবে সিংহের খুব মনখারাপ। বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপ সে একটি সোনার হার উপহার দিল পথিককে। পথিকের চোখে জল চলে এল। চোখের জল মুছতে মুছতে সে বলল, “হে পশুরাজ, তোমার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। তোমার মতো বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য!”


চার


সিংহের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথিক আবার হাঁটতে শুরু করল। জঙ্গল শেষ হলেই একটা শহর। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার হাঁটা পথ। সেখানে কয়েকটা দিন বিশ্রাম নেবে পথিক। তার মনে পড়ে গেল, এই শহরেই থাকে সেই স্যাকরা, যার প্রাণ বাঁচিয়েছিল সে। পথিক তাই ঠিক করল, শহরে পৌঁছেই স্যাকরার সাথে দেখা করবে।
পরদিন সকালে পথিক শহরে পৌঁছল। জমজমাট শহর। এত সকালেই রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড়। দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। রাজার সৈন্যরা রাজপথ দিয়ে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে। তবে এই স্বাভাবিক নিয়মের মাঝে কোথায় যেন একটা চাপা উত্তেজনা। পথিক খেয়াল করল, রাস্তার ধারে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের জটলা। তাদের মুখ গম্ভীর। নিজেদের মধ্যে তারা চাপা গলায় আলাপ-আলোচনা করছে। তেমনই একটি জটলার দিকে এগিয়ে গেল পথিক। কাছাকাছি যেতেই শুনতে পেল একটি লোক বেশ উত্তেজিত গলায় বলছে, “না না, খবরটা একদম সত্যি। আমাদের রাজকন্যাকে হত্যা করা হয়েছে।”
এই কথা শুনে উলটোদিকে দাঁড়ানো লোকটি জিজ্ঞেস করল, “সে কি! এ তো ভয়ংকর দুঃসংবাদ! কে এমন পাপ কাজ করতে পারে?”
পথিক খুব মন দিয়ে এই কথোপকথন শুনছিল। এমন সময় তার পিঠে কে যেন হাত রাখল। চমকে পেছন ফিরে পথিক দেখল, সেই স্যাকরা তার পেছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে আর মিটিমিটি হাসছে। স্যাকরাকে যে এত সহজেই খুঁজে পাবে একথা পথিক কল্পনাও করেনি। সে তাই যারপরনাই খুশি হল। স্যাকরাও ভীষণ খুশি। পথিককে জড়িয়ে ধরে সে বলল, “তোমাকে দেখে আমার কী যে আনন্দ হচ্ছে তা বলে বোঝাতে পারব না। এক্ষুনি আমার বাড়ি চলো। কয়েকদিন ওখানে বিশ্রাম করবে।”
“তুমি যে আমাকে ভুলে যাওনি, তা দেখে আমারও ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।” বলল পথিক।
এবারে স্যাকরা পথিককে তার বাড়ি নিয়ে গেল। সেখানে পথিকের যত্ন-আত্তির ত্রুটি হল না। দুই বন্ধুতে অনেক খাওয়াদাওয়া, গল্পগাছা হল। অবশেষে স্যাকরা পথিককে বলল, “বন্ধু, তুমি আমাকে নতুন জীবন দান করেছ। বলো, তোমার জন্য আমি কী করতে পারি।”
পথিক বলল, “তোমাকে তো আগেই বলেছি, পথে আমি কেমন বিপদে পড়েছিলাম। বাঁদর আর সিংহ না থাকলে আমি হয়তো এখানে বসে থাকবার অবস্থায় থাকতাম না। জানো, আসার সময় সিংহ আমাকে একখানা সোনার হার উপহার দিয়েছে! এত দামী হার নিয়ে যাত্রা করা সমীচীন নয়। তাই হারটা বিক্রি করে দিতে চাই। তুমি কি আমায় সাহায্য করবে?”
শুনে স্যাকরা খুব উৎসাহী হয়ে বলল, “ওরে বাবা! দারুণ ব্যাপার তো! দেখি দেখি, কেমন সেই হার!”
হারটা বের করতে গিয়ে পথিকের ঝোলা থেকে কয়েকটি সোনার মোহর মাটিতে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য স্যাকরার চোখ যেন লোভে চিকচিক করে উঠল। স্যাকরা মোহরগুলি তুলে পথিকের হাতে দিল।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়, তবুও স্যাকরার কথায় ও ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে পথিক তাকে ভীষণ বিশ্বাস করতে লাগল। সোনার হার ও মোহরের থলেটি স্যাকরার দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল, “এগুলি ক’দিন তোমার কাছে রাখবে, ভাই? আমি তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।”
মনে মনে স্যাকরা অত্যন্ত খুশি হল। এ তো মেঘ না চাইতেই জল! সে গদগদ গলায় বলল, “আমার কাছে এগুলি নির্দ্বিধায় রাখতে পার। তোমার হার বিক্রির সব দায়িত্ব আমি নিলাম। এতখানি পথ হেঁটে এসেছ, এখন নিশ্চিন্ত মনে বিশ্রাম নাও দেখি।”
স্যাকরা এবার সোনার হারখানা হাতে নিয়ে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তার চোখের ভাষা যেন ক্রমশ পালটে যেতে লাগল। ‘আশ্চর্য ব্যাপার! এই হারটা তো মনে হচ্ছে আমারই বানানো। আমার অনুমান যদি নির্ভুল হয়, তবে এই হারটা আমাদের রাজকন্যার। তার মানে, রাজকন্যাকে হত্যা করে সিংহ এই হারখানা পেয়েছে!’ মনে মনে বলল সে।
স্যাকরার মাথায় এবার একটা ভয়ংকর কুবুদ্ধি খেলে গেল। সে ফন্দি আঁটল, হারটি নিয়ে রাজদরবারে যাবে।
যেমনটা ভাবা ঠিক তেমনটা কাজ। রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে সে বলল, “রাজামশাই, এই দেখুন রাজকুমারীর হার।”
রাজা সেই হার দেখে চিনতে পারলেন।
“এক পথিক আমার কাছে এই হারটি বিক্রি করতে এসেছিল। হারটি চিনতে পেরে সাথে সাথে আপনাকে খবর দিতে এসেছি। অবিলম্বে পথিককে বন্দী করুন, মহারাজ। সম্ভবত সে-ই আমাদের রাজকন্যার হত্যাকারী।” এই বলে স্যাকরা রাজদরবারে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
রাজামশাই তৎক্ষণাৎ পথিককে বন্দী করবার নির্দেশ দিলেন। রাজ পেয়াদারা ধরে-বেঁধে এনে পথিককে পেশ করল রাজার সামনে।
“মহারাজ, আমি নির্দোষ। আমাকে মুক্তি দিন।” চিৎকার করে বলতে লাগল পথিক।
কিন্তু রাজামশাই তার কথা মোটেই কানে তুললেন না। তিনি সোনার হারটা সামনে তুলে ধরে উত্তেজিত গলায় বললেন, “এই হারটি রাজকন্যার। হারটি তোমার কাছে পাওয়া গেছে। তার মানে, তুমিই রাজকন্যার হত্যাকারী। কাল ভোরে তোমার ফাঁসির হুকুম দিলাম।”
রাজ পেয়াদারা পথিককে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে কয়েদখানায় পুরে দিল। সব দেখেশুনে স্যাকরা তো আনন্দে আত্মহারা। এমনটাই তো সে চেয়েছিল। সে মনে মনে ভাবল, “রাজ-পুরস্কার আর সোনার মোহরভর্তি থলে, দুটোই এখন শুধু আমার!”


পাঁচ


কয়েদখানায় বসে বেচারা পথিক চোখের জল ফেলতে লাগল। এত অসহায় সে কখনও বোধ করেনি। বেশ বুঝতে পারছে সে, এবার মৃত্যু অনিবার্য। ‘ইস, স্যাকরা সম্পর্কে পশুরা সত্যি কথাই বলেছিল। লোকটা বিশ্বাসঘাতক। কেন যে পশুদের কথা শুনিনি!’ পথিক খুব পস্তাতে লাগল।
ঠিক সেই সময় ওপর থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে এল, “আমি আছি, বন্ধু। একদম চিন্তা কোরো না।”
চমকে ওপরের দিকে তাকিয়ে পথিক দেখল, কয়েদখানার ছোট্ট জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়েছে সেই বিষধর সাপ, যার প্রাণ একদিন বাঁচিয়েছিল সে।
“আমাকে বাঁচানোর সাধ্যি কারও নেই। তুমি কীভাবে আমায় বাঁচাবে শুনি!” হতাশ গলায় বলে উঠল পথিক।
সাপ কিন্তু শান্তভাবে বলল, “আমি রাজমাতাকে দংশন করব।”
শুনে পথিকের চোখ কপালে উঠে গেল। থতমত খেয়ে সে জানতে চাইল, “রাজমাতাকে দংশন করবার সাথে আমার মুক্তি পাওয়ার কী সম্পর্ক?”
সাপ বলল, “একটু ধৈর্য ধরে আমার বাকি কথাগুলো শোনোই না। আমার বিষ থেকে রাজমাতাকে বাঁচানোর ক্ষমতা কারও নেই, বুঝলে?” এই বলে সাপ পথিককে এক আঁটি সবুজ পাতা দিল। “তুমি তখন এই ঔষুধি পাতার রস খাইয়ে রাজমাতাকে বাঁচিয়ে তুলবে, কেমন? খুশি হয়ে রাজা তোমাকে মুক্তি দেবেন। সেই সাথে অবশ্যই পুরস্কৃত করবেন।” এই বলে সাপ চলে গেল।
কিছুক্ষণ বাদেই রাজমাতার আর্তনাদ শোনা গেল, “বাঁচাও, বাঁচাও! কে কোথায় আছ, আমাকে সাপ কামড়েছে!”
রাজা, রানি, মন্ত্রী, পেয়াদা, কোটাল যে যেখানে ছিলেন প্রাণপণ ছুটে এলেন। রাজপ্রাসাদে কান্নার রোল উঠল। রাজবৈদ্যকে তলব করা হল। নানান জায়গা থেকে নামকরা ডাক্তার-বদ্যি-কবরেজদের ডেকে আনা হল। সকলে মিলে রাজমাতাকে বাঁচিয়ে তুলবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
অন্দরমহলে বিশাল শয্যায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন বৃদ্ধা রাজমাতা। রাজামশাই বসে আছেন মায়ের পায়ের কাছে। মনে হচ্ছে, রাজমাতার জীবনদীপ ক্রমশ নিবে আসছে। রাজবৈদ্য এগিয়ে এলেন রাজার পাশে। করুণ মুখে বললেন, “মহারাজ, রাজমাতাকে সুস্থ করে তুলবার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। তবে দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। রাজমাতার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির পথে।”
শুনে রাজামশাইয়ের দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি অসহায় মুখে বললেন,  “এমন কি কেউ নেই যিনি আমার মাকে সুস্থ করে তুলতে পারেন?”
সেসময় হঠাৎ দূর থেকে একটি গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এল, “একজন আছে। কেবলমাত্র সে-ই পারবে তোমার মাকে বাঁচাতে। কিন্তু তুমি তো সেই নিরপরাধ লোকটিকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছ। এখনও সময় আছে, তাকে মুক্তি দাও।”
আসলে রাজপ্রাসাদের ভারী পর্দার আড়াল থেকে সাপই এই কথাগুলো বলছিল। তবে রাজামশাই কি আর অতশত জানেন? একে দৈববাণী মনে করে রাজামশাই তৎক্ষণাৎ বন্দী পথিককে রাজদরবারে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন। পথিক রাজার সামনে উপস্থিত হতেই রাজা তাকে অনুরোধ করলেন, “দয়া করে আমার মাকে বাঁচাও। আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।”
শুনে পথিক বলল, “আপনার আদেশ শিরোধার্য, মহারাজ। তবে দয়া করে তার আগে একটা কাহিনি শুনুন।”
পথিকের কাছে সম্পূর্ণ কাহিনি শুনে রাজামশাই ভীষণ আশ্চর্য হলেন। কাহিনি শেষে পথিক বলল, “মহারাজ, স্যাকরা আপনাকে মিথ্যে বলেছে। মনে হয়, সিংহ রাজকন্যার হত্যাকারী।”
ভেবেচিন্তে রাজামশাই বললেন, “স্যাকরাকে অবশ্যই সাজা দেওয়া হবে। তবে তার আগে তুমি আমার মাকে সুস্থ করে তোলো।”


ছয়


রাজামশাই পথিককে নিয়ে গেলেন রাজ-অন্তঃপুরে। সেখানে প্রথমে সেই ঔষধি পাতা বেটে রস বের করা হল। পথিক এক গেলাস দুধে সেই রস মিশিয়ে অতি যত্ন সহকারে খাইয়ে দিল রাজমাতাকে। কিছুক্ষণ পর রাজমাতা চোখ খুলে তাকালেন। রাজামশাই ব্যস্ত হয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। মায়ের মাথায় হালকা হাত বুলিয়ে পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করলেন, “মা, তুমি কি সামান্য ভালো বোধ করছ?”
বৃদ্ধা রাজমাতা কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে ছেলের এক হাত চেপে ধরলেন। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। তারপর মৃদু স্বরে ছেলেকে বললেন, “হ্যাঁ রে বাবা, অনেকটা ভালো লাগছে। তবে যে মানুষটি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, সে যেন তার যোগ্য সম্মান পায়।”
রাজামশাই মাথা নাড়িয়ে মাকে আশ্বস্ত করলেন। তারপর পথিককে রাজসভায় ডেকে পাঠালেন। সেখানে এক হাজার সোনার মোহর দিয়ে পথিককে পুরস্কৃত করা হল। সেই সাথে পথিককে রাজ-আতিথ্য গ্রহণ করতে অনুরোধ করলেন তিনি।
এদিকে তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। রাজ্যের মানুষ পথিকের ফাঁসি দেখবার জন্য সমবেত হয়েছে। রাজ-সৈন্যরা ঘোড়ায় চেপে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্যাকরাও সেখানে উপস্থিত। ফাঁসির সময় প্রায় হয়ে এসেছে। অথচ পথিককে এখনও সেখানে আনা হয়নি! অধৈর্য হয়ে স্যাকরা ভাবতে লাগল, ‘কী হল কে জানে, পথিককে এখনও এখানে আনা হল না কেন? ওদিকে আবার কোনও গোলমাল হয়নি তো? ওর ফাঁসি হয়ে গেলে আমি নিশ্চিন্ত হই।’
ঠিক তক্ষুনি কয়েকজন রাজ-পেয়াদা এগিয়ে এল স্যাকরার দিকে। তারা স্যাকরাকে চেপে ধরে বলল, “সব প্রমাণ হয়ে গেছে। তুমিই প্রকৃত দোষী। মহারাজের আদেশে পথিকের বদলে এখন তোমার ফাঁসি হবে।” এই বলে তারা টেনে হিঁচড়ে স্যাকরাকে ফাঁসির মঞ্চে তুলতে লাগল। স্যাকরার কোনও ওজর আপত্তিই তারা কানে তুলল না।


_____


উৎসঃ হুসেন আলি ওয়েজের ফার্সি ভাষায় লেখা গ্রন্থ ‘আনোয়ার-ই-সুহাইলি’।
অলঙ্করণঃ রাখি পুরকায়স্থ

No comments:

Post a Comment