গল্পঃ বার্মায় বুবাইমামাঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


কিন্নর থেকে ফিরে সেই যে বুবাইমামা ডুব দিয়েছিল, তার আর পাত্তা নেই। আমরা ভাইবোনেরা যে যার স্কুল, খেলার মাঠ, বাবা-মায়ের বকুনি এইসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। মা দুয়েকবার বলেছে অবশ্য, “বুবাইটার যে কী হল! একেবারে বেপাত্তা। এবার ওর একটা বিয়ে দিতে হবে, নইলে কোথায় যে একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে কে জানে।” সেকথা আমরা ছোটোরা খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি। বড়োরা এমন অনেক কিছু বলে, যা আমাদের কচি মাথায় ঢুকিয়ে একফোঁটা লাভ নেই।
রবিবারের এক সকাল। আমরা সবাই মিলে ড্রয়িং রুমে বসে টিভিতে কার্টুন দেখছি। হঠাৎ কানের কাছে ভারী গলায় কে যেন বলে উঠল, “সকাল সকাল টিভি না দেখে একটু লেখাপড়ায় মন দিলে তোদের জীবনে কিছু উপকার হলেও হতে পারে।”
তাকিয়ে দেখি একটা লম্বাচওড়া লোক, গালে দাড়ি, পরনে জিনস আর পাঞ্জাবি। সানগ্লাসের ভিতর থেকে দুটো বুদ্ধিদীপ্ত চোখ কৌতুকে ঝলমল। হাতে একটা ঢাউস ট্রলি ব্যাগ। দিদি ‘বুবাইমামা’ বলে চেঁচিয়ে না উঠলে বুঝতেই পারতাম না বুবাইমামা আমার ঘাড়ের সামনে নিঃশ্বাস ফেলছে।
দিদির চিৎকারে মা দৌড়ে এসে বলল, “কী রে তুই? দাড়ি-টারি রেখে একেবারে অন্যরকম লাগছে! সাধুসন্ন্যাসী হতে গিয়েছিলি নাকি? একেবারে ডুব তো ডুব!”
বুবাইমামা চোখ থেকে সানগ্লাস খুলতে খুলতে বললে, “দাঁড়াও দাঁড়াও, সাধুসন্ন্যাসীরা বুক পর্যন্ত দাড়ি রাখে। আমার এখনও অতদূর নামেনি। আচ্ছা, এই ব্যাগটা বেজায় ভারী, আগে ভিতরে ঠিক জায়গায় এটাকে পার্ক করি, তারপর বলছি সব।” তারপর দিদির দিকে ফিরে বলল, “বিনি, দু-চার কাপ চা বানিয়ে ফেল দিকি। ততক্ষণ আমি একটু নিজের তসরিফটা চেয়ারে বসাই।”
হাতমুখ ধুয়ে বুবাইমামা চায়ের কাপে চুমুক দিতে না দিতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এবারের অভিযান কোথায় ছিল মামা?”
বুবাইমামা বলল, “এবারের যাত্রা দেশে ছিল না, একেবারে বিদেশ যাত্রা, বুঝলি? সে আবার যে সে বিদেশ নয়, মায়ানমার।”
“মানে বার্মা?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“ঠিক বলেছিস। একটা বিশেষ কাজে মায়ানমার যেতে হয়েছিল প্রায় মাস খানেকের জন্য। বড়ো গরিব দেশ রে!” বলেই বুবাইমামার মুখটা কেমন করুণার ঘন মেখে ঢাকা পড়ে গেল।
“রেঙ্গুনে গিয়েছিলে? ওই যেখানে হলদে দাঁত আর থুতনিতে গুচ্ছ-দাড়ির মানুষ থাকে?”
“দূর দূর! গল্পের বইতে যা সব লেখা আছে, সব পুরনো হয়ে গেছে। এখন আর ওদের দাঁত হলদে নয়। মনে হয় ভালো চাইনিজ মাজন দিয়ে দাঁত মেজে মেজে ওদের দাঁত-টাত সব ফর্সা হয়ে গেছে।”
আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। মামা বলল, “হাসির কথা নয় রে! ওদেশ বড়োই গরিবের দেশ। ওদিকে চায়না থেকে সব জিনিস এসে মার্কেট একেবারে ফ্লাডেড করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ সেসব সস্তা জিনিসে শখ মেটায়। কোনও ইন্ডাস্ট্রিই ওদেশে গড়ে উঠতে পারেনি। দোকানে চা খেতে গিয়ে দেখি গুঁড়ো দুধের কৌটো পর্যন্ত চায়নার।”
বুবাইমামা এসেছে দেখে বাবা এক রাউন্ড ড্রয়িং রুমে ঘুরে বাজারে চলে গেল। আজ অবশ্যই পাঁঠার মাংস আর দেরাদুন রাইসের পোলাও হবে। কারণ, এই দুটিই বুবাইমামার বড়ো প্রিয় খাবার। সকাল সকাল খাবারের আশায় মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমারা ভাইবোনেরা চট করে হোম ওয়ার্ক করতে বসে গেলাম। বুবাইমামা স্নান ঘরে ঢুকল।


এবার যে জায়গাটায় গিয়েছিলাম সেটা ইয়াঙ্গুন থেকে অনেক অনেক দূর। ইয়াঙ্গুন হচ্ছে যাকে আমরা বলি রেঙ্গুন। গান শুনেছিস তো, ‘মেরে পিয়া গয়ে রেঙ্গুন, উঁহা সে কিয়া হ্যায় টেলিফুন…’ সেই রেঙ্গুন। রেঙ্গুন থেকে প্লেনে গেলাম মান্ডালে। মান্ডালে থেকে গাড়িতে আট ঘণ্টার পথ, একটা ছোট্ট গ্রাম, নাম তার সোজাই। সোজাইয়ের ‘জ’ কিন্তু অনেকটা ইংরেজি ‘জেড’ এর মতো হবে। আসলে বার্মিজ উচ্চারণ তো!
গাড়ি ছুটে চলল, কখনও রুক্ষ প্রান্তর, আবার কখনও বেশ শস্যশ্যামলা হরিৎ-ক্ষেত্র পার হয়ে। মাঝে একটা ইন্ডিয়ান ধাবায় বসে পরোটা আর তরকারি খেয়ে আবার যাত্রা শুরু হল। হঠাৎ রাস্তার দু’পাশ একটু বেশিই পাথুরে মনে হল। ভাবলাম এ তো অদ্ভুত জায়গা! কখনও সবুজ ক্ষেত, কখনও রুক্ষ প্রান্তর। অবাক কাণ্ড, আবার দেখি দু’পাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে এই প্রথম।
জঙ্গল শেষ হয়েছে একটা শান্ত, সুন্দর, নিরিবিলি গ্রামে। একেবারে পশ্চিমবাংলার চেনা গ্রাম যেন। পাকা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁচা রাস্তায় পড়ল গাড়ি। দু’পাশে কৌতূহলী মানুষজন রাস্তা ছেড়ে দিল গাড়িকে। ডিসেম্বর মাস, কলকাতায় এই সময়ে একটু শীত করে। কিন্তু সোজাইতে বেশ গরম। গাড়িটা এয়ার কন্ডিশনড ছিল বলে আগে বুঝিনি। গাড়ি থেকে নামতেই বুঝলাম এখানে হাফ শার্টে কাজ চালাতে হবে। ব্যাগে ভরে নিয়ে আসা সোয়েটার কোনও কাজেই আসবে না।
গাড়ি থামতে না থামতেই একদল প্রায় উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চা এসে আমাদের ঘিরে ধরল। গাড়ি থেকে আমার একমাত্র সুটকেসটা নামিয়ে নিয়ে গেল একটা চোদ্দ-পনেরো বছরের ছেলে। থাকার ব্যবস্থা হয়েছে এই গ্রামেরই এক বাড়ির দোতলায়। এখানে বাড়িগুলো সব কাঠের তৈরি। মাথার ছাদগুলো হয় টালির, নয় টিনের। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হল, সব বাড়ির উঠোন তকতকে পরিষ্কার। লোকগুলো গরিব হলেও বেশ পরিবেশ সচেতন। সুটকেসবাহী ছেলেটির পিছন পিছন আমিও চললাম আমার ফাইভ-স্টার থাকার বন্দোবস্তে। উপায় নেই, আপাতত এখানেই ডেরা বাঁধতে হবে। এই গণ্ডগ্রামে হোটেল পাওয়া আর সাহারা মরুভূমিতে কুয়োর হদিস পাওয়া একই ব্যাপার। যে বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সেটা কাঠের দোতলা বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখি কাঠের সিঁড়িতে ঠোক্কর খেয়ে নিজের জুতোর আওয়াজে নিজেই চমকে উঠছি।
ঘরের মধ্যে ঘর। কাঠের মেঝে, কাঠের দেওয়াল, এমনকি কাঠের ফলস সিলিং লাগানো। মনে হয়ে এই বাড়ির মালিক একটু বড়োলোক। চারপাশের বাড়িগুলোর তুলনায় এই বাড়িটারই কিছুটা মান-ইজ্জত আছে। নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না। শোবার ঘরে বেশ নরম একটা বিছানাও দেখতে পেলাম। সন্ধে নেমে আসছে। চারদিক ঝুপঝাপ করে অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আগে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, পিছনে বিশাল জঙ্গল। জানালা খুলে দেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছি, ব্যাগ বয়ে আনা ছেলেটা ‘নো নো’ করে চেঁচিয়ে উঠল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি দেখে বার্মিজ আর ভাঙা ইংরেজি মিশিয়ে সে যা বলল, শুনে মনে হল, এখানে বিরাট বিরাট পোকা আছে কিংবা দানো-টানো থাকাও বিচিত্র নয়। বিদেশে বেঘোরে প্রাণ আর কে দিতে চায়? তাই জানালার কাচের মধ্যে দিয়ে তৃষিত নয়ন মেলে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগলাম।
হাতমুখ ধোয়ার জল চাইতে সাথের ছেলেটা হাতের ইশারায় সিঁড়ির নিচের দিকে দেখিয়ে দিল। নিচে নেমে দেখি একটা চৌবাচ্চা। তার থেকে জল তুলে হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে বুঝলাম, বাথরুম ইত্যাদি সবই নিচে এসেই সারতে হবে। অ্যাটাচড-বাথ এখানে অলীক কল্পনা। লাগোয়া রান্নাঘর থেকে এক বার্মিজ বুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসছিল। সেদিকে তাকিয়ে সোজা বাংলায় বললাম, “মাসিমা, একটু চা পাওয়া যাবে?”
বুড়ির হাসির তীব্রতা বেড়ে গেল। তেড়েফুঁড়ে নিজের ভাষায় বকবক করতে করতে অদৃশ্য হল। আমি অন্ধকার হয়ে আসা কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার একমাত্র চাকরিকে অভিসম্পাত করতে করতে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যেতে একটি অল্পবয়সী বার্মিজ মেয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট হোয়াট?”
বুঝলাম, বুড়ি আমার নামে লাগিয়েছে। মেয়েটা বুঝি ওর নাতনি হবে। আমি বলি, “ক্যান আই হ্যাভ আ কাপ অফ টি?”
সে দুলে দুলে হাসে আর বলে, “টি টি, ইয়েস ইয়েস।”
ভিতরের ঘরে আরও হাসির আওয়াজ। আমি অপ্রস্তুত হয়ে উপরে নিজের ঘরে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বার করি। কিছুক্ষণ পর দরজায় করাঘাত। ব্যাগ বয়ে এনেছিল যে ছেলেটা, তার হাতে একটা ট্রেতে চায়ের কাপ। ছেলেটা কিন্তু বেজায় গম্ভীর। মনে হল উটকো অতিথির সেবাযত্নে তাকে লাগিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা সে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুঝলাম, যে ক’দিন এখানে থাকতে হবে, চা পানের আশা ত্যাগ করাই ভালো। উহ্‌, কেন যে সাথে করে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে আসিনি! এখন আফসোস হচ্ছে। কোনওরকমে নাক টিপে গলা দিয়ে সেই গরম তরল পেটে নামিয়ে দিলাম। এই চা খেলে খুব শিগগির চায়ের নেশা ছেড়ে যাবে, কোনও সন্দেহ নেই।
বাইরের পোশাক পালটে বইপত্র নিয়ে বসেছি, ঝুপ করে লাইট নিভে গেল। চারদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। অন্ধকার হতেই চারদিক থেকে বিনবিন করে মশা এসে হাজির। মশারি খাটানোর অভ্যেস নেই। হাত দিয়ে চটাস চটাস শব্দ করে মশা মারতে মারতে নিজের ভাগ্যকে গালমন্দ করতে থাকলাম বেশ জোরে জোরে। নিজের গলা নিজের কাছে কেমন বেমানান লাগছে। বাধ্য হয়ে চুপ করে আছি। হোটেল হলে না হয় টেলিফোন তুলে হুকুম করা যায়। কাউকে ডাকতে হলে কী বলে ডাকব, কী ভাষায় ডাকব, এইসব সাতপাঁচ ভেবে চলেছি, দরজায় মৃদু টোকা। আবার সেই অনিচ্ছুক বালক। হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। বললাম, “এসেছিস বাবা! বেশ বেশ, তা লাইট কখন আসবে? মানে, হোয়েন দ্য লাইট উইল অ্যারাইভ?”
বলেই বুঝলাম, আমার ইংরেজি যেন অনেকটা ফেলুদার গল্পের লালমোহনবাবুর মতো হয়ে যাচ্ছে। আসলে এই ব্যাটারা ভালো ইংরেজি বললে আরও বোঝে না। তাই আবার, “লাইট, লাইট,” বলে হাত ঘুরিয়ে ঘরের একমাত্র টিউবের দিকে ইশারা করলাম।
এতক্ষণে বাবু আমার প্রতি একটু সদয় হয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, “জেনারেটর, লাইট, লাইট, জেনারেটর।”
বোঝা গেল এই বাড়িতে একটি জেনারেটর নামক বস্তু আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি চালু হন, মোমবাতিতে কাজ চালাতে হবে। হাতে মোমবাতি নিয়ে নিজের ছায়া দেখে নিজেই চমকে উঠি। জানালায় তাকিয়ে দেখি অপূর্ব দৃশ্য। জঙ্গলের মাথায় কখন যেন চাঁদমামা তার পূর্ণাবয়ব বিকশিত করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বালকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জানালা দিলাম খুলে। গান এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে, আজ…’
বসন্তের সমীরণ বয়ে নিয়ে এল মস্ত বড়ো এক গুবরে পোকা। তিনি গোঁ গোঁ শব্দে মোমবাতির দিকে তেড়ে গিয়ে এক ধাক্কায় মোমবাতি উলটে দিয়ে উধাও হলেন। মোমবাতি নিভে গেল। চাঁদের আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে। আহা, বেশ মৃদুমন্দ হাওয়াও আসছে। গুবরে বাবাজীবন কোথাও হয়তো আহত হয়ে উলটে পড়ে আছেন। ভাবতে না ভাবতে আলো চলে এল। তারপর শুরু হল গুবরের ফাইটার প্লেনের দাপট। দেখি, তার আকার আমার ইহজীবনে দেখা গুবরে পোকার চাইতে অনেক বড়ো। গুবরের হাতে জীবন দেওয়া ঠিক হবে না ভেবে মশারির ভিতর আশ্রয় নিলাম। লক্ষ করলাম জানালা দিয়ে নানা বর্ণের ছোটো, মাঝারি, বড়ো সাইজের সব পোকারা ঢুকে পড়ছে। ওরা হয়তো টের পেয়ে গেছে, ভিনদেশ থেকে অতি সুখাদ্য একটা মানুষ এসেছে। কিংবা বোধহয় বার্মিজ রক্ত চুষে চুষে ওদের পেটে চরা পড়ে গেছে।
লাইট আসতে নিচে গিয়ে খাওয়ার ডাক পড়ল। বুঝলাম রুম সার্ভিস পাওয়ার আশা দুরাশা। নিচে একটা কাঠের টেবিলে ক্যাসারোলে রাখা রুটি আর তরকারি। আর একটা বাটিতে দেখি ডাল। আশ্চর্য হলাম, কারণ এদেশে রুটি ডাল কেউ খায় না বলেই জানতাম। বাঙালিদের মতো ভাত খেতেই অভ্যস্ত বার্মিজরা। তবে তরকারির যা চেহারা দেখেছি, আমার মুখে রুচবে কি না যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ডালের বাটিতে সবে চুমুক দিয়েছি, লুঙ্গি পরা খালি গায়ে একটা বেঁটে লোক হাত কচলাতে কচলাতে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, “খানা ক্যায়সা হ্যায় সাব? হমনে বনায়া। পাক্কা ইন্ডিয়ান খানা।”
আমি তরকারির খানিকটা প্লেটে ঢেলে রুটি ছিঁড়ে মুখে পুরে দেখি একেবারে ফার্স্ট ক্লাস। কাজেই মুখ দিয়ে অনায়াস হাসি বেরিয়ে এল। ইশারায় সামনের টেবিলে বসতে বললেও সে বসল না। বলে, অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটাই নাকি তার ধর্ম। বার্মিজ হয়েও এত সুন্দর হিন্দি কীভাবে শিখেছে ভাবতে না ভাবতেই সে নিজে থেকেই সব বলতে শুরু করল। আসলে সে ইন্ডিয়ান, তাদের বাড়ি ছিল অন্ধ্রপ্রদেশে, পিতৃদত্ত নাম নাগেশ্বর রাও। এখানে সবাই তাকে রাও বলেই ডাকে। জন্ম হয় এই সোজাইতেই। তাই বার্মিজ, তেলেগু, হিন্দি, সবই তার মাতৃভাষার মতো। তবে ইংরেজিটা খুব একটা আয়ত্বে নেই। কারণ স্কুলের চৌহদ্দিতে সে কোনওদিন পা রাখেনি। ইন্ডিয়া থেকে সাহেবেরা যখন থেকে এখানে আসা শুরু করেছে কাজের তাগিদে, নাগেশ্বরই তাদের খাবারদাবার তৈরি করার দায়িত্বে আছে।
নাগেশ্বর রাওয়ের বকবকানি শুনতে শুনতে রাতের খাবারের পাট চুকল। এই লোকটা ইন্টারেস্টিং সন্দেহ নেই, কিন্তু কেমন যেন রহস্যজনক মনে হল। সবচাইতে অসহ্য তার খালি গা ক্রমাগত চুলকোতে চুলকোতে কথা বলা। ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে শুনতে পথশ্রমে ক্লান্ত শরীর নিদ্রাদেবীর কোলে ঢলে পড়তে সময় লাগল না।
খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল এই বাড়ির হট্টগোলে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে মানুষের চলাফেরার ধুপধাপ শব্দে আর কতক্ষণই বা ঘুমিয়ে থাকা যায়। চট করে নিচে নেমে হাত-পা ধুয়ে এক কাপ বিস্বাদ চা খেয়ে স্নানঘরে ঢুকে টিনের দরজা লাগিয়ে দিলাম। তিন ফুট বাই চার ফুট স্নানঘরে একটা চৌবাচ্চা, তাতে লাল রঙের প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। ঘুলঘুলির আলো চৌবাচ্চায় পড়তে দেখি আগের দিনের রাতের বিভিন্ন বর্ণের পোকামাকড়েরা জীবন অবসানে জলের উপর ভাসছে। একবার ভাবলাম, ধুত্তেরি চানের নিকুচি করেছে। তারপর ভাবলাম যবনের হাতে যখন পড়েইছি, প্লাস্টিকের মগ দিয়ে পোকা সরিয়ে, দু-চার মগ জল গায়ে ঢেলে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। ইয়াঙ্গুনের ফাইভ-স্টার হোটেলের বাথটবের কথা ভেবে দু-চার ফোঁটা চোখের জল যাও বা বেরোল, চৌবাচ্চা থেকে মগে করে তোলা জলে সব মিশে একাকার হয়ে গেল।
ব্রেকফাস্টে নাগেশ্বর রাও পরোটা আর আলুভাজা টেবিলে নামিয়ে দিয়ে বকবক করতে লাগল। সোজাইয়ের মানুষেরা সব বুদ্ধিস্ট, তাই এখানে চিকেন মাটন কিছুই পাওয়া যাবে না। তাহলে এও ছিল মোর কপালে? তার মানে তৃণভোজী হয়েই থাকতে হবে ক’দিন। আহা, ইয়াঙ্গুনের ফাইভ-স্টার হোটেলের রেস্তোরাঁয় বুফে ব্রেকফাস্টে চিকেন-চাউমিনের কথা ভেবে মনটা হু হু করে উঠল। আমার ব্যাগের দিকে তাকিয়ে নাগেশ্বর জিজ্ঞেস করল, “সাহেব কি কাজে বেরোবেন? কে যাচ্ছে আপনার সাথে? আমি যদি কিছু কাজে আসি... সাথে চলি স্যার?”
আমার যন্ত্রপাতি আর জিওলজিকাল ম্যাপে বোঝাই ব্যাগটা টানার জন্য একজন সাথে থাকবে সেটা আমাকে আগেই বলে দেওয়া ছিল। এই টকিং-মেশিনকে সাথে নিলে কাজকম্ম মাথায় উঠবে, তাই বলে উঠি, “না না, তুমি বরং রাতের জন্য কিছু ভালো ভালো খাবার রান্না করে রাখো। জঙ্গলে জঙ্গলে আমার সাথে ঘুরে লাভ কী?”
আমার কথা শুনে নাগেশ্বর রাও বেশ ক্ষুণ্ণ হল। ব্যাজার মুখে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে ভুঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে কীসব যেন বিড়বিড় করতে লাগল। বোধহয় বার্মিজ ভাষা হবে, একটুও বুঝলাম না।
গাড়িতে উঠতে যেতে যিনি দাঁত বার করে আমার জন্য দরজা খুলে দিলেন, তার বয়স এই বছর তিরিশেকের মধ্যে হবে। একেবারে বিনয়ে বিগলিত। আমার ব্যাগ-ট্যাগ আগেই সে গাড়িতে তুলে দিয়েছে দেখলাম। ড্রাইভারের পাশে বসে সে ভাঙা ইংরেজিতে জানাল, তার নাম ইয়াদু। আমি বললাম, “তোমাকে আমি জাদু বলেই ডাকব।”
শুনে হাসিতে তার দাঁত খুলে পড়ে আর কী! এদিকে ইয়েস ইয়েস, নো নো করে ইংরেজি না বললে ব্যাটারা কিসসু বোঝে না। শরীরের ভাষায় বোঝা যায়, কিছুই বোধগম্য হয়নি। জাদু কথার অর্থ সে বোঝেনি, তাতে আমারও কিসসু যায় আসে না।
গাড়ি ছুটে চলল সরু কাঁচা রাস্তা দিয়ে। দু’পাশে দোকানপাট, বাড়িঘর গায়ে গা লাগিয়ে। জাদু জানাল, এখানকার প্রসিদ্ধ বাজার এটাই। রাস্তাকে স্থানীয় বাসিন্দারা একেবারে বাড়ির ড্রয়িংরুম বানিয়ে ছেড়েছে। দঙ্গল দঙ্গল খালি গায়ে ছোটো ছোটো বাচ্চার পাল গাড়ির পিছনে ছুটছে দেখে ড্রাইভারকে বললাম আস্তে চালাতে। সে কঠিন মুখ নিয়ে স্টিয়ারিং ধরে স্থির ভাবলেশহীন চোখে গাড়ি চালাতে লাগল।
বাজার শেষ হতেই একটা খোলা মাঠ। তার পাশে জরাজীর্ণ কাঠের বাড়ি, ঘরদোর অনেকটা জায়গা জুড়ে। হঠাৎ জাদু খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে সেই বাড়ির দিকে ইশারা করে ইংরেজিতে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল। অতিকষ্টে যা বুঝলাম, তাতে অবাক হওয়ার সীমা থাকল না। জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত যে বাড়িগুলো সামনে, সেটা আসলে নাকি এখানকার একমাত্র স্কুল। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। জাদু এই স্কুলের শিক্ষক, সে ছুটি নিয়ে ভারত সরকারের অফিসারদের খিদমদগারি করবার কাজ নিয়েছে দুটো বেশি পয়সা পাবে বলে। না না, পয়সা ভুল বললাম, মায়ানমারের কারেন্সি হচ্ছে চ্যাটস। চ্যাটসের অঙ্কটা টাকায় হিসেব করে আঁতকে উঠলাম। এত কম? বলে কী ছেলেটা? তাহলে স্কুলে ওর বেতন কত? জিজ্ঞেস করে কোনও উত্তর পেলাম না। জাদু তার সরল হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দিল, ভারত সরকারের দেওয়া ঠিকে কাজের পারিশ্রমিকের তুলনায় অতি নগণ্য তার পারিশ্রমিক। কাজ সেরে ফেরার সময় স্কুল দেখতে যাব, সেকথা জাদুকে জানাতে ও বেশ খুশি হয়ে উঠল।
স্কুল ছাড়িয়ে আবার একটা এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে লাগল। প্রায় কিলোমিটার দুয়েক চলার পর শুরু হল জঙ্গল। জঙ্গল আসতেই গাড়ি থামল। এবার নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। জাদু আমার সামনে সামনে ব্যাগ কাঁধে। পায়ে চলা শুঁড়িপথ দিয়ে হাঁটার সময় জাদু পিছন ফিরে হাত-পা নাড়িয়ে যা বলল, তাতে বুঝলাম আশেপাশের গাছ থেকে জোঁক ঘাড়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে, সাবধানে চলতে হবে। জোঁকের অভিজ্ঞতা আমার আছে। তাই জাদুর কথায় বিচলিত না হয়ে চলতে থাকলাম, তবে গাছের দিকে কড়া নজর রেখে।
ম্যাপ আর কম্পাস দেখে মিলিয়ে নিলাম সামনেই একটা নদী আছে, তার নাম চিন্ডুইন। এবার কাজ হল এই জায়গা থেকে টপোগ্রাফিক সার্ভে। এই সার্ভেতে নথিবদ্ধ করা হয় ভূপৃষ্ঠের প্রকৃতি, মানে পাথর ও মাটির রকম। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আমার নোটবুকে আমার পর্যবেক্ষণ লিখে নিচ্ছি। জাদু খুব আগ্রহ নিয়ে আমার কাজকম্ম দেখছে। তবে সে বেশ চালাকচতুর। একটু বুঝিয়ে দিতেই চট করে কম্পাসের রিডিং নেওয়ার পদ্ধতি বুঝে ফেলল।
জমি ঢালু হয়ে গেল। সাথে পাতলা হয়ে এল জঙ্গল। কিছুটা হাঁটতেই চিন্ডুইন নদী নজরে পড়ল। এত চওড়া সে নদী, যে এপার থেকে ওপাড় দেখা দায়। জলের রং ঘোলা, অর্থাৎ পলিমাটি প্রবল স্রোতে নদীতে ভেসে চলেছে। খুব মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। জাদু তার প্রবল ইংরেজি দিয়েই তার দেশ কত সুন্দর আমাকে বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নদীর ধার বরাবর হাঁটতে হাঁটতে জাদুর সাথে গল্প করছি। আমার কাজও চলছে সাথে সাথে। একটা গাছের তলায় বেশ সুন্দর ঘাসের গালিচা দেখে মনে হল একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। জাদুকে বলতেই সে বেশ খুশি। আমি আমার ল্যাপটপ খুলে কিছু কাজ সারতে লাগলাম। আর সে আমার জন্য ফ্লাস্ক থেকে চা ঢালতে লাগল। কালো চা, একটু কষা, তবে গুঁড়ো দুধের চায়ের চাইতে ঢের ভালো। এই চা হচ্ছে মায়ানমারের গ্রিন-টি। ফেরার সময় নিয়ে যাব বলায় জাদু ভীষণ খুশি হল।
“স্যার, হম ভি আ গয়ে।” কেউ ঘাড়ের কাছে বলে ওঠায় চমকে উঠে দেখি নাগেশ্বর রাও। তবে ভাগ্য ভালো, একটা নীল রঙের জামা গায়ে দিয়ে এসেছে।
বেজায় বিরক্ত হয়ে বলি, “তুম ইধর ক্যায়া করনে আয়া?”
নাগেশ্বর খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে বলল, “আরে হম বড়া কাম কা চিজ হ্যায় বাবু! ধীরে ধীরে পতা চলেগা। অভি অভি তো আয়ে হ্যায় আপ!”
নাগেশ্বর রাওয়ের ভাবগতিক বিশেষ সুবিধার মনে হল না। জাদুকে বললাম, “পাততাড়ি গোটাও হে, আজকের মতো কাজকম্ম শেষ।”
নাগেশ্বর আমার নোটবইয়ের দিকে উঁকি দিয়ে দেখছিল। আমি দুম করে নোটবই বন্ধ করে দিলাম। ওর মুখটা বেশ ব্যাজার হয়ে গেল। তাতে আমার কিসসু এসে যায় না।
জাদুকে কথা দিয়েছিলাম ফেরার পথে ওর স্কুল পরিদর্শন করব। তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। বড়ো মাঠ লাগোয়া স্কুল-বাড়িটার সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াতে জাদু আর আমি নেমে পড়লাম। পিছন পিছন নাগেশ্বর রাও, নাছোড়বান্দা। চিন্ডুইন নদীর পাড় থেকে বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া ভেসে আসছে। লম্বা লম্বা গাছের মাথায় পাখিরা বাড়ি ফিরছে। স্কুল-বাড়িটা কেমন যেন ভৌতিক। পুরো বাড়িটাই কাঠের। তবে যে কাঠের খুঁটিগুলোর উপর ভর করে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো ঘুণ ধরে জরাজীর্ণ। যেকোনও সময়ে ভেঙে পড়তে পারে। জাদুকে আমার শঙ্কা জানাতে দেখলাম ও বেশ নির্বিকার। নাগেশ্বর রাও আমাকে বলতে থাকল, মায়ানমারের সরকার খুব গরিব, তাই স্কুল-বাড়িগুলো সংস্কার করা আদৌ সম্ভব নয়। ফাঁকা স্কুল-বাড়িতে আমরা তিনজন সন্ধের আধো অন্ধকারে ভূতের মতো চলাফেরা করছি। হঠাৎ মনে হল, দরজা ভাঙা ক্লাসরুমের ভিতর থেকে কে যেন ছিটকে বেরিয়ে গেল। তবে যেই হোক, তার গায়ে একটা সবুজ জামা আছে, আর লোকটার চিবুকে একগুচ্ছ দাড়ি। সঙ্গী দু’জন নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তারা এসবের কিছুই দেখেনি।


কলকাতা থেকে আসবার সময় আমার বস ডক্টর বসু বলেছিলেন, “দিব্যায়ন, সোজাইতে যাচ্ছ, ওখানে একটা ন্যাচরাল ক্র্যাটার লেক আছে। দেখে এসো, না দেখলে মিস করবে।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “একটু বিশদে বলুন স্যার, যাবার আগে না হয় একটু গুগল সার্চ করে নেব।”
ডক্টর বসু বলেছিলেন, “সে না হয় ওখানে গিয়েই সরেজমিন তদন্ত কোরো। আগেভাগে বলে দিলে উৎসাহ হারিয়ে যায়। আমি নিজে দেখে এসে বলছি। সে এক বিস্ময়।”
গোটা সপ্তাহ কাটিয়ে দিয়েছি মায়ানমারের এই প্রত্যন্ত গ্রামটাতে। কেমন যেন পশ্চিমবঙ্গের আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতোই অতি সাধারণ এই সোজাই। চারদিকে নারকেল-খেজুরের গাছ গ্রামবাংলার সাথে খুব একটা তফাত রাখেনি। তবে চোখে পড়ার মতো বিষয় হচ্ছে দারিদ্র্য। সভ্যতার আলো ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত এসে বোধহয় লজ্জায় পিছু হটেছে।
এক রবিবারে ড্রাইভারকে বললাম আমাকে ক্র্যাটার লেক দেখাতে নিয়ে যাবার জন্য। জাদু এক পায়ে রাজি। আমার সঙ্গ তার যে বেশ ভালো লাগছে, সে ব্যাপারটা সকাল বিকেল আমাকে জানিয়েও দিয়ে থাকে। আমি বলি, “চলো, আমার বরং একটা গাইড থাকলে সুবিধা হবে।”
এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঝাঁকুনি খেতে খেতে চলল ক্র্যাটার লেকের দিকে। কিছুদূর যেতেই টিলা দেখা গেল। টিলা বেয়ে পেঁচানো রাস্তায় গাড়ি উঠছে। জাদু আমার পাশে বসে বকবক করে চলেছে। ক্র্যাটার লেকের মাহাত্ম্য বোঝাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় এমন ক্র্যাটার লেক তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল উল্কাখণ্ড আকাশ থেকে পড়ে। উল্কা ছোটো হলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে নামার সময় পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু আকারে অনেক বড়ো হলে বায়ুমণ্ডল পার হয়ে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে গর্তের সৃষ্টি করে।
টিলার মাথা পর্যন্ত পৌঁছে দেখা দিল সবুজ রঙের ক্র্যাটার লেক। গোলাকার লেকটার ব্যাস প্রায় কিলোমিটার খানেক হবে। এত বড়ো উল্কা পড়ে এখানে পৃথিবীর বুকে ফাটল তৈরি করেছিল সন্দেহ নেই। সেই ফাটল দিয়ে গলন্ত লাভা বেরিয়ে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল এই টিলা। নয়নাভিরাম লেকের সৌন্দর্য দেখে গাড়ি থামিয়ে চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। লেকে বৃষ্টির জল জমা হয়। শ্যাওলা জমে জলে সবুজ রঙ ধরেছে। লেকের চারদিকে অসংখ্য গাছপালায় ছোটোখাটো জঙ্গল হয়ে আছে।
জাদুর ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বুঝলাম হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের উপকার করে আসছে এই লেক। লেকের জলের নিচে যে কাদা জমা হয়, সেই কাদা আর একরকমের গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হয় তানাখা। গাছটির স্থানীয় নাম তানাখা। গাছের ছাল বেটে তার সাথে এই লেকের কাদা মিশিয়ে রেখে দেওয়া হয় বিশাল বিশাল কম গভীরতার চৌবাচ্চায়। তারপর সেই কাদা রোদে শুকিয়ে লেই হয়ে গেলে কৌটোয় ভরে বাজারে বিক্রি হয়। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে তানাখা মুখে মাখে, যেমন চন্দন-বাটা মুখে মাখা হয়। তানাখা শরীরের চামড়াকে আলট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রকোপ থেকে বাঁচায়। এইবার বুঝলাম হাটে-বাজারে আফিস-কাছারিতে, শুধু মহিলা নয়, পুরুষেরাও মাখে তানাখা।
মায়ানমার সরকার তানাখা প্রস্তুতিকে একেবারে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে। ঢোকার গেটে নামধাম লিখিয়ে, ভিতরে ঢুকে আবার বিস্ময়। কিছুটা তিক্ততায় মন ভরে গেল। নাগেশ্বর রাও এখানেও হাজির! আজ আবার খালি গায়ে লুঙ্গি পরে এসেছে। দেখেই আমার গা ঘিনঘিন করে উঠল। চোয়াল ফাটানো হাসি দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করল নাগেশ্বর। রাগ চেপে রাখতে পারলাম না। বলে ফেললাম, “রান্নাবান্না নেই তোমার? আবার আমাদের পিছু নিয়েছ?”
“আরে সাহেব, নাগেশ্বর কত তাড়াতাড়ি কাজ করতে পারে জানেন না। আজ আলুর সবজি আর ভিন্ডি ভাজা করে রেখে এসেছি। আপনি ফিরলেই গরম গরম রুটি করে দেব।”
জাদুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম গ্রাম থেকে লেক পর্যন্ত আসবার একটা শর্টকাট রাস্তা আছে। গ্রামের মানুষ সে পথেই যাতায়াত করে। নাগেশ্বর আমাদের আসবার কথা জানতে পেরে আগেভাগেই এসে হাজির। আমি চললাম লেকটাকে কাছ থেকে দেখব বলে। নাগেশ্বরের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললাম, “এইখানেই বসে থাকো, একদম নড়বে না যতক্ষণ না আমরা ফিরি।”
ব্যাজার মুখে গেটের দিকে চলে গেল নাগেশ্বর। আমি জাদুর সাথে চললাম লেকের দিকে। একটা বিরাট চৌবাচ্চা দেখিয়ে জাদু বলল সেটিতে লেকের জল তুলে এনে একধরনের পোকার চাষ হয়। মরা শুকনো পোকা প্যাকেট করে বিক্রি হয়। খুবই প্রোটিন যুক্ত সেই পোকা রান্না করে খেলে রোগবালাই ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। অনেক মুমূর্ষু রোগী সেই পোকার তরকারি খেয়ে নাকি দিব্যি উঠে বসে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে। আমার শত অসুখ করলেও ওই পোকার তরকারি খেতে পারব না। ভাবতেই ব্রেকফাস্টে খাওয়া রুটি-তরকারি সব মনে হল পেট থেকে উঠে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। তবে একথাও জানি, আমার কাছে যা অখাদ্য, অন্যের কাছে তাই অমৃত। কিন্তু সাধ করে চৌবাচ্চায় উঁকি দিয়ে পোকাদের ঘরসংসার দেখবার এতটুকু ইচ্ছে হল না।
গেটের দিকে ফেরবার জন্য যেই ঘুরেছি, হঠাৎ দেখি একটু তফাতে একটা সিড়িঙ্গে লোক আমাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। পকেটের ভিতর হাত দিয়ে আমার ফোল্ডিং চাকুটা অনুভব করলাম। একে নাগেশ্বর পিছন ছাড়ছে না, আবার আরেক মূর্তি উদয় হল। জাদু যেন লোকটাকে দেখেও না দেখার ভান করল। বিদ্যুৎ চমকের মতো মাথায় খেলে গেল, লোকটার জামার রঙ সবুজ, থুতনিতে গোছা দাড়ি। সেদিনে স্কুল-বাড়িতে এই লোকটাকেই খুব সম্ভব পালিয়ে যেতে দেখেছিলাম। তাহলে কি বিদেশ-বিভূঁইতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে কেউ বা কারা? লোকটার কাছে আসতেই সে অন্যদিকে মুখ ঘোরাল। গেট পর্যন্ত হেঁটে যেতে না যেতেই নাগেশ্বর ছুটে এল। আমার ঘাড়ের পিছন দিয়ে লেকের দিকে কিছু দেখতে দেখতে ওর মুখটা অস্বাভাবিকরকম কঠিন হয়ে উঠল। আমি নাগেশ্বরকে এড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।


আরও বেশ কিছুদিন কেটে গেল। এখান থেকে পাততাড়ি গোটানোর সময় এসে গেছে। টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভে শেষ করে ফেলেছি। ডিসেম্বর মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে, তবুও সোজাইতে বেশ গরম। বিকেলের দিকে একদিন হাঁটতে গেলাম চিন্ডুইন নদীর ধারে। এখানকার অনেক মানুষের সাথে বেশ মুখ চেনা হয়ে গেছে। রাস্তায় দেখা হতেই দূর থেকে তারা আমাকে নমস্কার জানায়। আমিও প্রতিনমস্কার করে পাশ কাটাই।
নদীর ধারে সাজানো গুছানো একটা চায়ের দোকান আছে। অন্তত আমার বাড়িওয়ালিদের চাইতে ভালো চা করে এই দোকানদার। দোকানের সামনে খোলা উঠোনে খান কয়েক কাঠের ঘুণ ধরা বেঞ্চ পাতা। এমনই একটা বেঞ্চে বসতেই না বসতেই অশরীরী আত্মার মতো কোথা থেকে নাগেশ্বর রাও এসে হাজির। ওকে দেখেই না দেখার ভান করে নদীর দিকে মুখ করে ঘুরে বসলাম। নাগেশ্বর গলা তুলে দুই কাপ চায়ের অর্ডার করল বুঝতে পারলাম। নদীর উপর তখন পাল তোলা নৌকোয় মাঝিরা ঘরে ফিরছে। অলস সন্ধেবেলায় শ্লথ জীবন চলছে গড়িয়ে গড়িয়ে। আনমনা হয়ে বসে আছি। মনে হচ্ছে জীবন এখানে যেন হাজার হাজার বছর ধরে একটুও বদলায়নি।
“আপনার চা স্যার।” শুনে মুখ ফিরিয়ে দেখি নাগেশ্বর ফ্যাক ফ্যাক করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বিরস মুখে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে ঠোঁট লাগাতে না লাগাতে জাদু দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “স্যার, আপনার ল্যাপটপ কোথায়?”
“আমি তো সঙ্গে আনিনি। বেড়াতে বেরিয়ে কেউ ল্যাপটপ ঘাড়ে নিয়ে ঘোরে নাকি? তোর কবে বুদ্ধি হবে বল দিকি?”
“সকালেই তো দেখলাম ঘরে বসে কাজ করছেন। আজ আপনার জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে দেখি সেটা ঘরে নেই।”
নাগেশ্বরের মুখ দেখি কঠিন হয়ে উঠেছে। চায়ের কাপ বেঞ্চে ঠক করে নামিয়ে দৌড় দিল লুঙ্গি গুটিয়ে। আমিও পিছন পিছন ছুট লাগালাম। ল্যাপটপে সমস্ত ডেটা ভরা আছে। হারিয়ে গেলে আমার এখানকার সমস্ত কাজ জলাঞ্জলি যাবে। উপরমহলে জবাবদিহি করে সারাজীবন কাটাতে হবে।
ঘরে ঢুকে দেখি চারদিকে থমথমে পরিবেশ। আমার বাড়িওয়ালি ও তার দুই মেয়ে ঘরে চিরুনিতল্লাশি করেও ল্যাপটপের হদিস পায়নি। আমাকে দেখে ওরা সরে দাঁড়াল। নাগেশ্বর আমার আলমারি ঘাঁটছে দেখে বেজায় খেপে গিয়ে এক ধমক লাগালাম। বললাম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। শুনে ও আরও গম্ভীর হয়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বার্মিজ ভাষায় কাকে যেন মোবাইলে কীসব বলতে লাগল। আমি দিল্লিতে ফোন করে অফিসে সব রিপোর্ট করব কি না ভাবছি। কারণ, এখানকার পুলিশ বাইরের লোকেদের একটুও পাত্তা দেয় না। এই ক’দিনে সোজাইতে একটা পুলিশ চৌকি পর্যন্ত নজরে আসেনি। জাদু বলল একবার গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে দেখলে হয়, যদি ভুল করে গাড়িতে তুলে নেয়। নাগেশ্বর সেকথা শুনতে পেয়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “ল্যাপটপের ডেটা কোনও পেন ড্রাইভে সেভ করেছিলেন?”
এই প্রথম নাগেশ্বরকে একটা কাজের কথা বলতে শুনলাম। জামার পকেটে হাত চলে গেল। সত্যিই তো, কথাটা মনে আসেনি। আমি শেষবার কাজ করে ওঠার সময় ডেটা সেভ করে পকেটে ভরে নিয়েছিলাম। নাগেশ্বর কী করে হঠাৎ বুদ্ধিমান হয়ে উঠল, বুঝে ওঠা গেল না। ঘর ছেড়ে যাবার সময় নাগেশ্বর বলল, “পেন ড্রাইভ যত্ন করে রাখবেন। আপনার ল্যাপটপ খুঁজতে বেরোলাম। আর হ্যাঁ, আপনার রাতের রান্না করে রেখেই বেরিয়েছিলাম, তাই আপনার অসুবিধা হবে না।”
ল্যাপটপ উধাও হওয়ার কোনও কারণ যেমন খুঁজে পেলাম না, তেমনি নাগেশ্বর হঠাৎ বদলে গেল কী করে সেটাও মাথায় ঢুকল না। বাইরে ঝড়ো হাওয়া উঠল। জানালার কপাটগুলো ক্রুদ্ধ হয়ে খুলে যাওয়ার জোগাড়। ঝড় উঠতেই আলো চলে গেল। প্রকৃতি সারাদিন গুম মেরে ছিল। এখন তার দাপট দেখাচ্ছে। অন্ধকারে কিচ্ছু করা যাবে না বুঝে রাতের খাবার দিয়ে দিতে বললাম।
সেদিন সন্ধ্যায় সোজাইতে প্রবল বর্ষণ হল। আলো আর আসবে না দেখে ল্যাপটপ হারানোর কষ্ট বুকে নিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল খোলা জানালা দিয়ে ভেজা বাতাসের ঠাণ্ডা স্পর্শে। আধো সচেতনভাবে মনে হল, জানালার কপাট বেশ শক্ত করেই লাগিয়ে রেখেছিলাম, খুলে গেল কী করে? তারপর রাতের হালকা নীল আলোয় ভেসে যাওয়া ঘরে মনে হল কে যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। উঠে বসতে না বসতেই ঘরের মধ্যে হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। আবছা অন্ধকারে বেশ বুঝে গেলাম, দু’জন মানুষ হাতাহাতি করে চলেছে। হাত বাড়িয়ে টর্চ জ্বালতেই দেখি সিড়িঙ্গেমতো একটা লোককে নাগেশ্বর রাও ধরাশায়ী করে ফেলেছে। আমাকে চেঁচিয়ে বলল, “জানালাটা বন্ধ করে দিন স্যার। ব্যাটা পালাতে পারবে না।”
আমি টর্চের আলো ওদের শরীর থেকে না সরিয়ে জানালা বন্ধ করে দিলাম। দরজায় করাঘাতের আওয়াজ হল। নাগেশ্বর বলল, “খুলে দিন। জাদু এসছে।”
আমি যন্ত্রচালিতের মতো নাগেশ্বরের হুকুম তামিল করলাম। জাদু ঘরে ঢুকল টর্চ হাতে। ঢুকেই চোরটাকে কষিয়ে একটা লাথি মারল। লোকটা গুঙিয়ে উঠল। জাদু কোথা থেকে নারকোল দড়ি এনে পিছমোড়া করে লোকটাকে বেঁধে ফেলে বাইরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গেল। আমি অন্ধকারে বসে ভাবতে লাগলাম, আমার কোন সম্পদের লোভে লোকটা চুরি করতে ঢুকেছিল কে জানে। টাকাপয়সা সব আমার সুটকেসে বন্ধ থাকে। পরীক্ষা করে দেখলাম সুটকেস বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। টর্চের আলোয় দেখলাম ভোর চারটে। এখন আর নতুন করে ঘুম আসবে না। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি। একবার বাথরুম যেতে হবে। সিঁড়ির নিচে মোমবাতির আলো জ্বেলে অনেকে গোল হয়ে বসে। নাগেশ্বর আমার পিছু নিল আবার। আমি অস্ফুটে বললাম, “বাথরুমেও আমার পিছু নেওয়া ছাড়বে না দেখছি।”
অন্ধকারে নাগেশ্বর হাসল কি না বোঝা গেল না, তবে বেশ কঠিন স্বরে বলল, “সাহেব, আমার ডিউটি আমাকে করতেই হবে।”
বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখি সিঁড়ির নিচে কেউ নেই। নাগেশ্বর চাইনিজ ল্যাম্প জ্বেলে টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষারত। চা দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। লোকটা কোনও অসৎ উদ্দেশ্যে আমার পিছু নেয় না, বেশ বুঝতে পারছি।
কেটলি থেকে ব্ল্যাক টি পেয়ালায় ঢালতে ঢালতে বলল, “মাইসেলফ হিতেশ নাগার্জুন, স্যর। ইন্টেলিজেন্স উইং, গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া।”
আমি বাক্যহারা। কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। একটু লজ্জাই হচ্ছে ভদ্রলোকের সাথে এতদিন খারাপ ব্যবহার করেছি বলে। বললাম, “পুরোটা খুলে বলুন। আমি একজন বিজ্ঞানী, হেঁয়ালি বিশেষ বুঝি না।”
হিতেশ হাসতে হাসতে উঁচু গলায় জাদুকে ডাকলেন। সে হাতে ল্যাপটপ নিয়ে ঢুকল। টেবিলের উপর রেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর হিতেশ ওরফে নাগেশ্বর রাওয়ের সাথে বার্মিজ ভাষায় কথাবার্তা চালাতে লাগল। আমি একবর্ণও না বুঝে বোকার মতো দু-তিন কাপ চা উড়িয়ে দিলাম।
জাদুর সাথে কথা শেষ করে হিতেশ আমাকে বললেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই জানতাম আপনার জীবন বা অন্য কিছু ক্ষতি হতে চলেছে। সেই হিসেব মতো আপনার ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলাম এতদিন। এখানে বিদেশি শত্রুদের সাহায্যের জন্য একটা চক্র গড়ে উঠেছে। তারা চায় না ভারতে এখানকার স্থানীয় তথ্য চলে যায়।”
আমি হিতেশকে বাধা দিয়ে বললাম, “কিন্তু আমি যে কাজে এসেছি, সে কাজের বরাত তো মায়ানমার সরকার ভারত সরকারকে দিয়েছে।”
“সেটাই তো সমস্যা। এখানকার সম্পদ অধিকার করবার তালে আছে ওই বিদেশি শক্তি। তারা খুবই শক্তিশালী। আপনার ল্যাপটপ চুরি হওয়ার পর ওরা আপনার পেন ড্রাইভের তল্লাশি করতে এসেছিল। যে লোকটাকে ওরা এই কাজে লাগিয়েছিল, সে একজন জেল ফেরত আসামী। আপনি তাকে ক্র্যাটার লেকের কাছে দেখেছেন।”
“মনে হয় স্কুল-বাড়িতেও দেখেছি।”
“একদম ঠিক। তবে আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাবে কোথায়? সন্দেহ ছিল, কিন্তু চট করে লোকাল লোকেদের তত্ত্বতল্লাশ করলে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়। যাক, চিন্তা করবেন না, সে ব্যাটা এখন বার্মিজ পুলিশের হাতে। ওর বাসা থেকে আমিই আপনার ল্যাপটপ উদ্ধার করেছি। ভাগ্যিস বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার সময় পায়নি। আপনার ফেরার টিকিট তো দু’দিন পর। আমি ও আমার লোকেরা আপনাকে শ্যাডো করবে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত।”
“কিন্তু তুমি, মানে আপনি তো এখানে অসুবিধায় পড়তে পারেন। বিদেশি শক্তির হাত আছে বলছেন যখন...”
নাগেশ্বর ওরফে হিতেশ সামান্য হেসে বললেন, “এর বেশি কিছু বলা আমাদের সার্ভিস রুলের বাইরে স্যার। শুধু বলে রাখি, আমারও এখানকার পাততাড়ি গোটানোর সময় হয়ে গেছে। আর তাছাড়া অনেকদিন হয়ে গেল এখানে।”
একটা কথা না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, জাদুও কি আন্ডার কভার এজেন্ট। সেকথার উত্তরে তিনি জানালেন, জাদু স্থানীয় স্কুলটাতে শিক্ষকতা করে। ছুটি নিয়ে স্রেফ দুটো পয়সা, না না, চ্যাটস রোজকার করবার জন্য ভারত সরকারের ঠিকে কাজ করছে।
পরদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, জাদু এসে হাতে একটা ঠোঙায় মোড়া জিনিস হাতে তুলে দিল। খুলে দেখতে যাব, হিতেশ বললেন, “আপনার জন্য জাদু মায়ানমার-টি উপহার দিচ্ছে। ওর মা চাপাতা তুলে ওদের সংসার চালায়।”
পকেট থেকে কিছু চ্যাটস বার করে জাদুর হাতে গুঁজে দিতে যেতেই ও দুই হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল। দেখি ওর চোখদুটো জলে ভরে গেছে। একদিনেই বড্ড ভালোবেসে ফেলেছিলাম ছেলেটাকে। চ্যাটসগুলো পকেটে ভরে ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি চালাতে। সোজাই গ্রামের অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চাগুলো গাড়ির পিছনে দৌড়ে এল। আমার অস্থায়ী বাসস্থানের বাড়িওয়ালি বৃদ্ধা উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়ি চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছিল। আড়চোখে দেখলাম হিতেশ ওরফে নাগেশ্বর গম্ভীর মুখে মোবাইলে কাকে যেন মেসেজ পাঠাচ্ছেন। নীল জামা পরা চোরটার কথা মনে পড়ে গেল। পেটের তাগিদে আমার সংগ্রহ করা ডেটা চুরি করতে এসে হয়তো কোনওদিনই এই গ্রামে আর ফিরে আসবে না।


গল্প বলা শেষ হতে আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম, “দ্য গ্রেট বুবাইমামা, জিন্দাবাদ!”
মামা বলল, “আহ্‌, রান্নাঘর থেকে এতক্ষণ অপার্থিব মাংসের গন্ধ আসছিল! পেটের ভিতর একেবারে মোচড় দিচ্ছে রে! তোদের পাল্লায় পড়ে বকবক করে রোগা হয়ে গিয়েছি।”
আমি বললাম, “মামা, ওই পোকার প্যাকেট সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ নিশ্চয়ই? তরকারি করে খেলে আবার মোটা হয়ে যাবে।”
মামা আমাকে, “তবে রে, আজ তোর একদিন কি আমার!” বলে মারতে ছুটল।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

No comments:

Post a Comment