গল্পঃ যদুবাবুর হাতঃ পীযূষ হালদার


টিকলুর চোখে ঢিল লেগেছে। সমস্ত স্কুল জুড়ে হই হই হচ্ছে, ‘টিকলুর চোখে ঢিল মেরেছে।’ অর্থাৎ ঢিল লেগেছে কথাটা টিচার্স রুমে যখন এসে পৌছাল, তখন হয়ে গেল, ‘টিকলুর চোখে কেউ ঢিল মেরেছে।’
স্যারদের মধ্যে প্রশ্নের গুঞ্জন উঠল, কে মেরেছে? কেন মেরেছে?
একমাত্র গেম টিচার অতীন স্যারই করিৎকর্মা লোক। তাঁর শোনার প্রয়োজন হয় না কে মেরছে, কেন মেরেছে। দশাসই চেহারা নিয়ে, বড়ো বড়ো পা ফেলে চললেন আগে টিকলুকে দেখতে। তার কী করা দরকার আগে সেটা দেখতে হবে।
ছ’ফুট লম্বা অতীন স্যারের পদক্ষেপ মানে আমাদের লং জাম্প দেওয়ার সমান। একবার পদক্ষেপ প্রায় দু’মিটার। স্যার সোজা কাঁঠালতলায় এলেন। সেখানে টিকলু চোখে হাত চেপে বসে যন্ত্রণায় কুঁইকুঁই করছে। হাত বেয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।
টিকলু আমাদের মহেন্দ্র দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। রোগাপাতলা, ছোটোখাটো ছেলে। স্যার ওকে দু’হাতে তুলে নিয়ে সোজা পাশের ডাক্তারখানায়। সেখানে হল না। সেখান থেকে রিক্সায় চাপিয়ে হাসপাতালে। বেশি দূরে নয়, হাফ কিমি হবে। আমারা আর কিছু জানতে পারলাম না। যথারীতি স্কুল ছুটি হয়ে গেল।
আমরা দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ি। তার মানে আমরাই ওদের দাদা। তাহলে আমাদেরও জানা উচিত কী হল, কেন এরকম হল।
আমি, বাপি, টিপু তিনজনে বিকেলে হাসপাতালে গেলাম। শুনলাম টিকলুকে স্ক্যান করাতে নিয়ে গিয়েছে। এখানেও সেই অতীন স্যার। উনি একা নন অবশ্য, সঙ্গে টিকলুর বাবাও গিয়েছেন। আমরাই কেবল পিছিয়ে। আমাদের কাজটুকু করার সু্যোগই পাচ্ছি না।
পরদিন আগে আগেই স্কুলে এসে উপস্থিত আমারা। আমরা তিন মাথা এক জায়গায়। সত্যি ঘটনা আমাদের উদঘাটন করতেই হবে।
একাদশ শ্রেণীর রনি আমাদের বলল, “টিকলুকে ঘুসি মেরেছে।”
জিজ্ঞেস করলাম, “কে মেরেছে? কেন মেরেছে?”
রনি রহস্য রেখে বলল, “কান পেতে শোন। বাতাসে ভাসছে আর তোরা শুনতে পাচ্ছিস না? কাঁঠালগাছেই আছে রহস্য। আর বলব না।”
আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়ল। বাপি জিজ্ঞেস করল, “কতদিনের পুরনো হবে রে গাছটা?”
আমি বললাম, “শুনছি আর দু’বছর বাদেই হীরক জয়ন্তী বর্ষ পালন করা হবে।” এও বললাম, “কেমন ঝোপ মতন দেখ। গা ছমছম করে। তবে সত্যিটা জানতেই হবে আমাদের।”
টিফিনে গেলাম রাত-প্রহরী গোপালদার ক্যান্টিনে। সাইকেল শেডের এককোণে চারটে বয়াম, কয়েকটা পাউরুটি, আর এক ডেকচি আলুর দম। বয়ামের কোনওটায় কেক, কোনওটায় লজেন্স। ওর কাছে কাঁঠালগাছের কথা তুলতেই বলল, “আলুর দম খা।”
গঙ্গাজলের মতো ঘোলাটে ঝোলে চার পিস আলুーএকটাকা। তবে গরম মশলার গন্ধে মার মার কাট কাট। নিলাম তিন প্লেট। “এবার বলো।”
“তোদের বাবা-কাকারা এই স্কুলে পড়েছেন না? তাঁদের কাছে আগে শুনে আয় যদুবাবু কে ছিলেন। তারপর আমি রাতের ব্যাপার-স্যাপার বলব।”
এবার আমাদের যদুবাবু রহস্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল গোপালদা। সেই সাথে আবার নাকি রাতের ব্যাপার-স্যাপার। তার মানে কালকে আবার বিক্রি।
অগত্যা সন্ধ্যা থেকে আমি কাকুর পাশে পাশে ঘুরঘুর করছি। কাকুর সময় হয় না। কাকুর খেলার মাঠ থেকে এসেই প্রথমে আধঘণ্টা টানটান হয়ে জড় পদার্থের মতো শুয়ে থাকা, তারপর স্নান। এরপর বডি ট্যালক খানিকটা মেখে নেন। তারপরও বাকি। একবাটি ছোলা-ভিজে। টুকটুক করে খেতেই আধঘন্টা। যে কাজই করুন না কেন, কিছু বলতে গেলেই বলেন, “দাঁড়া, দাঁড়া।”
ইতিমধ্যেই বাবার এসে  যাওয়ার সম্ভাবনা। অতএব আমিও পড়ার টেবিলে। মাথায় এখন তিনটে ব্যাপার ঘুরছে। যদুবাবু, কাঁঠালগাছ আর রাতের ব্যাপার-স্যাপার। এগুলোর রহস্য উদঘাটন না হলে যে টিকলুর রহস্য সমাধা করা যাবে না।
রাতে খাবার টেবিলে মুখোমুখি। বাবা-কাকা দু’জনেই। কাকা মিচকে হাসছে। বলব কি বলব না মনে করে বুক ঢিপঢিপ করছে। ফস করে মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “আমাদের স্কুলের যদুবাবু কে ছিলেন?”
কাকা ফিচ কাটলেন, “কাকে বলছিস?”
বাবা খাওয়া বন্ধ করে সারাসরি আমার দিকে তাকালেন। “কেন রে?”
ঘুরিয়ে বললাম, “স্কুলে একটু উলটোপালটা হচ্ছে তো, তাই।”
“কী এমন হল? এতদিন থাকলি, কিছুই জানলি না? এখন শেষ সময়ে জানতে ইচ্ছা হল? শোন তবে। উনি আমাদের ইংরেজি স্যার ছিলেন। তোদের যেখানে সাইকেল শেড, সেখানে আগে দুটো ছোটো ছোটো ঘর ছিল। তারই একটা ঘরে উনি থাকতেন। একা মানুষ। শেষদিকে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। তারপর একদিন... না থাক। তোকে আর শুনতে হবে না। আর এসব ব্যাপার মন থেকে সরিয়ে ফেল। ফাইনাল ইয়ার, পড়াশোনাটা কর ভালো করে।”
বাকি না শোনা অংশ আমি রাতেই কাকুর কাছ থেকে শুনে নিয়েছি। এখন আর কোনও সংশয় থাকল না, ঘুসিটা সত্যিই কাঁঠালগাছের মধ্যে থেকে এসেছিল।
পরদিন স্কুলে গিয়ে ওদেরকে বললাম, “যদুবাবু ইংরেজির টিচার ছিলেন। ঐ কাঁঠালগাছে হ্যাং হয়েছিলেন।”
টিফিনে গোপালদার ক্যান্টিনে গঙ্গোদক ও চারটে আলু নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “গোপালদা, রাতে কিছু দেখতে পাও?”
“তোরাও তো দেখিস, দিনের বেলাতেও। দেখলি না টিকলু কেমন ঘুসি খেল! রোজ দেখবি এই সাইকেলগুলো একবার না একবার একটার ঘাড়ে আরেকটা। অদৃশ্য হাত একটা সাইকেলে ধাক্কা দিয়ে জানিয়ে দেয় সে আছে। তারপরই তো হুড়মুড় করে ঢেউ খেলানো সাইকেল। আর রাতের কথা তোদের শোনার দরকার নেই। ভয় পাবি।”
বললাম, “বলো বলো। এর একটা বিহিত আমরা করবই।”
“পারবি না। আমি আনেক চেষ্টা করেছি। আগে আমার সাথে লুকোচুরি খেলা হত। একবার এ-বিল্ডিং তো আরেকবার ও-বিল্ডিং। তোরা এ নিয়ে আর নাড়াচাড়া করিস না। জানাজানি হলে বাচ্চাগুলো ভয় পাবে।”
বললাম, “যা করার আমাদের করতে হবে চুপিসাড়ে। তুমি আমাদের সাথে থেকো।”


পরদিন শনিবার। চলে গেলাম জানবাড়ি। পয়সা আমাদের কিছু খরচ হল বটে। তবে অনেকটা ফুঁ দেওয়া মাটি পাওয়া গেল। গোপালদাকে বলে টিনের গেটের মধ্যের ছোটো গেটটা ভেজানো ছিল। সন্ধের একটু আগে আমরা তিনজন ঢুকে গেলাম স্কুলের মধ্যে। গোপালদাকে দেখলাম না। আমরা মাটিটুকু দিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ সারলাম। আমাদেরই দায়িত্ব। জানবাড়ির মাটি অব্যর্থ। পালাবেই।
এমন সময় কাঁঠালগাছের ঝোপের মধ্যে থেকে হঠাৎ ‘এঁই, তোঁরা কীঁ কঁরছিঁস রেঁ?’ চন্দ্রবিন্দু দেওয়া শব্দগুলো আমাদের দায়িত্বর কথা ভুলিয়ে দিল। কে আগে পালাতে পারি তারই পাল্লা দেওয়া শুরু করলাম। ঐ ছোট্ট টিনের গেটের কাছে পৌঁছাতেই হবে। না হলে অদৃশ্য হাত যদি পেছন থেকে টেনে ধরে!


সোমবার দিন স্কুলে গিয়ে গোপালদাকে ধরলাম। গোপালদার কালো দাঁতকপাটির হাসির অর্থ আমাদের বুঝতে অসুবিধা হল না। গোপালদা বলল, “তোরা ভয় পেলি কেন? আমাকে তো কালকেও লুকোচুরি খেলতে হয়েছে। ঠিক আছে, তোদের আর দায়িত্ব নিতে হবে না। তবে আলুর দম খাবি। অনেক ঘটনা শুনতে পাবি আমার কাছ থেকে।”
আমরাও চুপ করে গেলাম। যা ঘটেছে সেটা কাউকে বলা যায় না।
সুস্থ হয়ে টিকলু স্কুলে এলে কে ঘুসি মেরেছিল জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, “ধুত্তোর। আমি তো হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।”


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment