গল্পঃ সম্রাট অশোকের কড়িঃ পবিত্র চক্রবর্তী




এক


“বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হওয়া একদিনেই সম্ভব নয়, তার জন্য চাই অনেক ত্যাগ। তার থেকেও বড়ো বিষয় হল প্রজাদের কাছাকাছি গেছ কতটা, তাদের কষ্টকে নিজের বলে মনে করেছ কতখানি। সম্রাট পেরেছিলেন, আর তাই তো...”
মামার কথাগুলো মন দিয়ে গিলছিল টুটুন। কথার মাঝেই কলিং বেলের শব্দ। অন্য সময় হলে টুটুনের ভ্রূজোড়া কুঁচকে উঠত।
দরজা খুলতেই রিতমা হুড়মুড়িয়ে ঢুকেই বলল, “উফ্‌, আবার শুরু করেছ তুমি মামাজী!”
মামা হাসি হাসি মুখে বলল, “ওটা শোনাবার দায়িত্ব টুটুনের। আগে থেকে জানলে তোর জন্য অপেক্ষা করতাম।”
রিতমা টুটুনের সাথেই পড়ে। এখানে বলে রাখি, শুভাঙ্গীর ডাক নাম রিতমা। পুজোর ছুটি দেয় না পুনা প্রশাসন। কিন্তু দুর্গাপুজোয় ওদের ধরে রাখাই দায়। আজ চতুর্থীর সকাল। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে।
“শোন,তোরা গপ্পো কর, আমি একটু রায়বাবুদের নাটমন্দির থেকে ঘুরে আসি।” বলেই মামা দরজার দিকে পা বাড়াল। আসলে মামা বোঝে, একটা সময়ের পর ইয়ং জেনারেশনদের একটা স্পেস দেওয়া দরকার।
রায়বাবুদের পুজো বহু প্রাচীন বর্ধমান অঞ্চলে। এই শহরটার ইতিহাস তো কম নয়। সেই রাজা বল্লাল সেন, গুপ্তবংশ... রায়বাবুরা বছরের অন্যান্য সময়ে কম আসেন এখানে। কিন্তু পুজোয় সকলের উপস্থিতি মাস্ট। পলেস্তরা খসা প্রায় জীর্ণ বাড়ির একাংশে বৃদ্ধ পুরোহিত তাঁর পরিবার নিয়ে থাকেন। প্রায় ভাঙা নাটমন্দিরে তৈরি হয় দেবীর কাঠামো। পঞ্চমীর রাত থেকেই আসতে শুরু করেন পরিজনেরা। তখন কুলদেবী কমলার সাথে সাথে এদেরও নিত্য সেবায় পুরোহিতগিন্নি লেগে পড়েন। এঁদের পুজোর মূল বিষয় হল শ্রী দুর্গা আবাহনের আগে ষোড়শোপচারে দেবী কমলার পুজো। তবে মূর্তি নয়, চারটি কড়ির পুজো হয়। জনশ্রুতি, এই কড়ি বহু প্রাচীন।
“আচ্ছা টুটুন, দেবী কমলা মানে তো লক্ষ্মী?” রিতমা প্রশ্ন করে।
“হুম। আসলে এই কড়িগুলোই ওঁদের বংশপরম্পরায় দেবী রূপে নিত্য সেবা পান।”
“কত কী নতুন শুনছি রে!” চোখ গোল করে রিতমা বলে।
“ব্যাপারটা হল আমরা অনেক কিছু নতুন শুনি বটে, কিন্তু সেগুলোর অস্তিত্ব প্রাচীন, যা আমরাই মূল্য দিই না।”


দুই


বেলা গড়িয়ে গেল, কিন্তু মামা বেপাত্তা। বার কয়েক ফোন করার পর একটিবার মাত্র ফোন ধরে ফিসফিস করে জানাল, “একটু দেরি হবে।”
এখন বিকাল পাঁচটা। মায়ের গজগজানি অনেকক্ষণ ধরে শুরু হয়ে গেছে। টুটুন জানে, আজ দুই ভাইবোনের জব্বর বিলা হবে। এই যাহ্‌! ভাগ্যিস ‘বিলা’ শব্দটা মন অবধি এসেই থমকে গেছে, নইলে মা এতক্ষণে হাজারটা সাওয়াল জবাব শুরু করে দিত।
অবশেষে সাড়ে পাঁচটায় মামা ঘরে ঢুকে সোজা সোফায় গা এলিয়ে দিল। গোমড়া মুখে মা মামার জন্য একবাটি তেল-মুড়ি মাখা আর চা দিতেই মামা নিজের থেকেই বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “বুঝলি, যত নষ্টের মূল হল ব্যাটা ইবনবতুতা।”
“ই-বন-বতুতা! সে আবার ক্যা?” মায়ের গলায় বিস্ময়।
এক খাবলা মুড়ি চিবোতে চিবোতে মামা নিজের পুরনো সুরেই বলে যায়, “ভারতের অর্ধেকেরও বেশি সাম্রাজ্য দখল করে অবশেষে সম্রাট অশোক এসে হাজির হন পুণ্ড্রবর্ধনে। আর গড়ে তোলেন আরেক সাম্রাজ্য এবং এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের পরিবর্তন।”
“আরে হয়েছে কী তোর! সম্রাট অশোক আবার এলেন কেন?”
“কী জানিস দিদি, মানুষের পরিবর্তন যে কতরকমভাবে আসে। সম্রাট অশোককে আমরা জানি শান্তির প্রতীক হিসাবে। কিন্তু ওই মানুষটাই একসময়ে কতজনকে হত্যা করেছেন। প্রায় শেষ করে দিয়েছিলেন আজীবক সম্প্রদায়কে।”
টুটুন আর নিজের ঘরে না থাকতে পেরে মামার কাছে এসে চুপচাপ বসে পড়ে। মাও আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সামনের চেয়ারে বসে নিঃশব্দে চা খেতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর টুটুন জিজ্ঞাসা করে, “আজীবক কী?”
“উম? কিছু বললি টুটুন? ও হ্যাঁ, আজীবক হল তারা যারা সম্পূর্ণ নাস্তিক অথচ জন্মান্তরবাদ বিশ্বাস করে। মূলত এরা মহাবীরের ভক্ত। তবে গৌতম বুদ্ধকে যে অবহেলা করে তা নয়। আর মজা কী জানিস? ভারতীয় চার্বাক দর্শনের মতো এরাও মনে করে খাও পিও আর মৌজ করো।”
মা অস্থির হয়ে বলে, “তা হয়েছে কী? এটা কি কোনও গল্পের প্লট, না রায়বাবুর বাড়িতে যাওয়ার ফল?”
মামার মুখে এতক্ষণে হাসি। “এই না হলে আমার দিদি!”
“ঝেড়ে কাশ তো বাপু।”
“কাশির সময় হয়নি রে দিদি। তবে এ বিষয়ে আজকেই জানতে পারলাম বলতে পারিস। আগে কোনওদিন এসব ঘেঁটে দেখিনি।”
টুটুন চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, “কীভাবে?”
কথার রেশ ধরেই মামা বলে, “হয়েছে কী, আজ যখন গেলাম তখনও রায়কর্তা আর তাঁর সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী সমর ছাড়া কেউ আসেনি। কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে কড়িগুলোর কথা।”
“তারপর?”
টুটুনের কথাকে হালকা ধমক দিয়ে থামিয়ে মামা বলে, “তোর সবকিছুতেই তাড়াহুড়ো। আমাকে দেখাবে বলে কড়িগুলো সমরকে আনতে বলেন এস. হলধর রায়। নির্দেশ পাওয়ামাত্র সমর একটা কাঠের বাক্স আনে। খোলাও হয়, কিন্তু তারপর সব ভোঁ ভাঁ। মানে কড়ির ক অবধি নেই।”
“সে কি!” মা আর টুটুন প্রায় একসাথেই বলে ওঠে।
মামা ঠাণ্ডা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। ঘড়িতে টিক টিক করে কাঁটা ঘোরার শব্দ। টিং টং! কলিং বেলের আওয়াজে সকলে যেন একসাথে কোন এক অজানা ঘুম থেকে জেগে ওঠে। টুটুন দরজা খুলতেই রিতমা টপ আর জিনস পরে হাজির। সবার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে মামার দিকে তাকিয়ে প্রবাসী বঙ্গ কন্যা কোমরে হাত গুঁজে বলে ওঠে, “মামাজী কাট্টি! ফির শুরু করে দিয়েছ?”
মামা কপট রাগ দেখিয়ে বলে, “তা বাপু তুই ক’দিন টুটুনের সাথেই থেকে যা না।”
“মামা, তুমি বলো বাকিটা। আমি ওকে ফ্ল্যাশব্যাক বলে দেব না হয়।”
“হুম। কোথায় যেন ছিলাম? হ্যাঁ, এস. হলধর রায়ের অবস্থা শোচনীয়। একটা কথা বলিনি তোদের। ওই যে বললাম ভোঁ ভাঁ, ছিল কড়ি, কিন্তু সেগুলো আসল নয়।”
“যাচ্চলে।” টুটুনের গলায় আফসোস।
“কয়েক পুরুষের ঐতিহ্যবাহী আসল কড়িগুলো নেই অথচ তিনি সেগুলো রাখেন কলকাতার বাড়িতেই। সবথেকে বড়ো কথা হল আজ সকালে বর্ধমানে এসে নিজের হাতে কড়িগুলোকে গঙ্গাজলে ধুয়ে যথাস্থানে রেখেও দিয়েছিলেন। আমাকে দেখাতে গিয়েই বিপত্তি।”
“ওয়াও মামাজী, ইউ আর গ্রেট!” রিতমা আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।
“মানে! কী বলছিস?” আমরা বাকি তিনজন অবাক হয়ে বললাম।
“আরে টুটুন, অগর চুরি না হত তাহলে মামাজীর আসলি কাজ কেমন করে দেখতাম!”
হায় ভগবান! কারও পৌষ মাস তো কারও সর্বনাশ। মামা হতাশ হয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আবার বলে, “আর কী করা! এস. হলধর রায়কে জিজ্ঞাসা করে এটাই বুঝলাম যে আজ সকাল থেকে তিনি, তাঁর বিশ্বস্ত পি.এ সমর সেন আর পুরোহিত এবং তাঁর স্ত্রী... এই, ক’টা বাজে রে?” সর্বনাশ হয়ে গেছে এমন গলায় মামা শেষ কথাটা বলেই হলঘর থেকে বাইরের দিকে পা বাড়ায়।
আর যায় কোথা! টুটুন গায়ে একটা টি-শার্ট গলিয়ে মামার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তার পিছনে রিতমা। “মামাজী, হম ভি যায়েঙ্গে।”
আকস্মিক এই ত্রিমূর্তির অন্তর্ধানে মা বেচারা কিছু বলার সুযোগই পেল না। তবে এটা বুঝল, আগেরমতোই এইবার বর্ধমানেও কিছু একটা ঘটতে চলেছে।


তিন


রিতমা এত বড়ো বাড়ি আগে দেখেনি। অতিপ্রাচীন, ভেঙে পড়েছে অনেক জায়গা। কিন্তু যেটুকু অংশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে তাদের প্রতিটি শিরায় আজও ছুটেছে চলেছে গরম রক্ত।
আবছা অন্ধকার পেরিয়ে মামা দুই সাগরেদকে নিয়ে হাজির হল রায়বাবুর বৈঠকখানার ঘরে। আদ্যিকালের ঘর। সামনেই পেল্লাই মেহগিনির সোফাসেট আর ঠিক মাঝখানে চৌকোনা কালচে শ্বেতপাথরের টেবিল। দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের কয়েকটা ছবি। একটা ছবির দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল টুটুনের। মাথায় মহারাজের মতো পোশাক, তলায় লেখা এস. অশোক রায়-২। আর ঠিক তার পাশেই অসন্ধিমিত্রা নামাঙ্কিত একজন ভদ্রমহিলার ছবি। ঘরটার কোনার দিকে ঠিক জানালার উপরের দিকটায় ভিজে ভিজে ভাব। এখানে ইলেক্ট্রিসিটি আছে, তবে অত বড়ো ঘরে টিউবলাইট দুটি খানিকটা ম্লান। রায়বাবুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন সমর, পুরোহিত আর ওঁর স্ত্রী। বউটার চোখেমুখে কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব। মামার সাথে থাকতে থাকতে টুটুনের এগুলো এখন আর চোখ এড়িয়ে যায় না।
গলা ঝেড়ে মামা কথা শুরু করল। তার সারাংশ দাঁড়ায় ঠিক এইরকমーআজ সকালে বর্ধমানে এসে আবলুশ কাঠের বাক্স থেকে চারটে বেশ বড়ো আকৃতির কড়ি বার করেন হলধরবাবু। পুরোহিত বিধিমতে গঙ্গাজলে সেগুলোর পুজো করেন এবং তারপর সেগুলিকে পুনরায় বাক্সে রেখে দেওয়া হয় পরেরদিনের উপাচারের জন্য।
মামা হলধরবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি ঠিক মনে করে বলছেন তো মিঃ রায়?”
নিস্তব্ধ ঘর। মামা আবার একই কথা জানতে চাইলে হলধর রায় একটু অবাক হওয়া দৃষ্টিতে মামার দিকে খানিক সময় তাকিয়ে থাকেন। তারপর উত্তর দেন, “সরি। হুম, কড়িগুলোকে তো মহিলা দ্বীপেই রাখলাম।”
“কোথায়?” মামার গলায় বিস্ময়।
“ইয়ে মানে কিছু না, ওই বাক্সেই রাখি।”
“তখন সেখানে আর কারা কারা ছিল?”
“এই আমাকে নিয়ে চারজন। সমর তো এইসব মানে না, নাস্তিক তো। ও একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। আর আর, পুরোহিত-কাকিমা...”
“না বাবু, আমি মা কমলার ভোগ রান্না করছিলাম ওই রান্না ঘরে।” উত্তরটা পুরোহিতের স্ত্রী পশ্চিমদিকে রান্না ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন।
মামা কথা বলছে এদের সাথে ঠিকই, কিন্তু চোখ কেন জানি না সমর সেনের দিকে। তাই এবারে সরাসরি সমরকেই, “আচ্ছা সমর, মিঃ রায়ের এখানে কতদিন কাজ করছ?”
সমর সেনের বুকের বোতাম খানিকটা খোলা। ওখান থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা সাপ জড়ানো একটা সোনার লকেট। জামার বোতামটা বন্ধ করে উত্তর দিলেন, “তা একবছর তো হবেই।”
সমরের কথা অসম্পূর্ণ থাকতেই হলধরবাবু নিজেই বললেন, “আসলে ব্যাবসার জন্য আমাকে নানা জায়গায় যেতে হয়। সেবার আসামের কামাখ্যায় গিয়েছিলাম। ছিলামও কিছুদিন। সেখানেই পরিচয় সমরের সাথে। খাসা মাথা ছেলেটির। কিন্তু কাজের জন্য পড়ে আছে আমি যে হোটেলে ছিলাম তার ম্যানেজার হয়ে।”
সমর এবার নিজেই বলতে থাকেন, “স্যার আমাকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। কাজ বলতে স্যারের বংশ পরিচয়ের তর্জমা। উনি সময় পেলেই বলতেন আর আমি কম্পিউটারে লিখে রাখতাম।”
রায়বাবু নিজের থেকেই পুনরায় বলেন, “আসলে বই-টই বার করব এমন কিছু না। নেহাত শখে বলতে পারেন। তাছাড়াও পরের প্রজন্মের কাছে তথ্য তুলে রাখা আর কী।”
“আমি কি লেখাগুলো পড়তে পারি আজকের জন্য?” মামা আবেদনের সুরে রায়বাবুর কাছে জানতে চায়।
হলধর রায় সামান্য মাথা হ্যাঁ-সূচকভাবে নাড়াতেই, “শিওর স্যার। আমি পেন ড্রাইভটা সাথে করেই এনেছি। ভাবলাম ওঁরা পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন আর আমি লেখাগুলো নিয়ে।” কথাটা বলেই সমর পাশের ঘরের দিকে চলে গেলেন। খানিক পরেই ছোট্ট একটা ড্রাইভ মামার হাতে এনে দিলেন।
“আচ্ছা হলধরবাবু, এখন আমাদের উঠতে হচ্ছে।” সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে মামা বলে।
“কিন্তু আসল কড়িগুলো! পাব তো? কাল পঞ্চমী যে!” হতাশার সুর ভেসে আসে রায়বাবুর গলা থেকে।
“একটা ছোট্ট প্রশ্ন, মিঃ রায়। আপনার নামের আগে ‘এস’ কেন?”
“আসলে ওটা আমাদের বংশের রীতি বলতে পারেন। বংশের বড়ো ছেলের নামের আগে ওটা আমরা ব্যবহার করি।” সাবলীল কণ্ঠে উত্তর দেন রায়বাবু।
“কিন্তু পুরোটা কী?”
“সম্রাট।” রায়বাবুর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি।


চার


বেশ রাত হয়ে গেছে ফিরতে। রিতমা এবার উঠেছে এক দূরসম্পর্কের মামার বাড়িতে। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় ও বেচারা টুটুনদের বাড়িতেই থেকে যায় আজ। মা অবশ্য এর জন্য ওর মামার কাছে ফোন করে পারমিশন নিয়ে নিয়েছে।
খেতে বসে মামার মুখে কোন রা নেই। রিতমা বার কয়েক খোঁচা মারার পর মামা ওর দিকে তাকিয়ে শেষে একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে, “জিমনোসোফিস্ট কী?”
“জিম-নো-সো-ফিস্ট! হোয়াট ইজ দিস, মামাজী?” রিতমা এবার ক্লিন বোল্ড।
“কাল সকালে বলব, কেমন? টুটুন, একটু তোর ল্যাপটপটা ধার দে না আজ রাতে।” কথাটা বলতে বলতে আমার শোয়ার ঘরে মামা চলে যায়।


মামার ধাক্কায় ঘুম ভাঙে টুটুনের। চোখ কচলে ঘড়ি দেখে টুটুন, ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।
“টুটুন, ইবনবতুতা ১৩৪৬ সালের আগস্ট মাস নাগাদ শিলিগুড়ির বগুড়া অঞ্চলের দিকে আসেন এবং সেখানেই তিনি থেকে যান বেশ কিছুকাল। স্থানীয় মানুষজনদের জীবনযাত্রা দেখেন ও লেখেনও...”
“আবার ইবনবতুতা!” ঘুম জড়ানো গলায় টুটুন বলে।
“আরে মুখ্যু, এখানেই তো আসল মজা। অনেক কিছু পরিষ্কার হচ্ছে রে টুটুন। টু-টু-ন!”
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই মামা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে টুটুন চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ফের।


পঞ্চমীর সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল ন’টা। মামা ঘরে নেই। রিতমা মায়ের সাথে বসে চা খাচ্ছে।
“মামা কোথায়?”
“ভোরবেলায় বেরিয়েছে। চলে আসবে বলেছে দশটার মধ্যে।”
মায়ের উত্তরে টুটুনের আফসোসের আর শেষ নেই। এবার কিছুতেই মামার সাথে আগের মতো খেই ধরতে পারছে না। নানা কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অশোক-২ কেন? আজীবক, জিমনোসোফিস্ট, সম্রাট, ইবনবতুতা, আর একটা অদ্ভুত লকেট সমর সেনের গলায়, ন্যাড়া মাথায় সাপ জড়ানো... সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সাজাতে হবে। নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকে টুটুন।
“টুটুন, মহিলা দ্বীপ, হোয়াট ইজ দ্যাট?”
রিতমার গলায় চমকে ওঠে টুটুন। শেষে এও মাথা ঘামাচ্ছে! টুটুন ঠোঁট ওলটায়।
অবশেষে বেলা সাড়ে এগারোটায় মামা ফেরে। সারা শরীরে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখমুখ আজ কালকের থেকে ফ্রেশ।
“টুটুন, তোরা আজ বিকালে যাবি তো রায়মশাইদের বাড়িতে?” মামা ঘরে ঢুকেই হাই তুলতে তুলতে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
রিতমা লাফিয়ে ওঠে। টুটুন একটু গম্ভীর গলায় বলে, “তার মানে এবারের পুরো ক্রেডিট নিজের পকেটেই রেখেছ, বলো।”
“ধুর! না রে, তুই আর রিতমাও আছিস। ওই যে কাল রাতে ফেরার পথে তুই জানতে চাইলি, রায়বাবুদের বাড়িতে এত গৌতম বুদ্ধের ছবি কেন, কেন অশোক-২।”
“হাঁ মামাজী। আরেকটা কথা। সমর সেনের অ্যাকচুয়াল বাড়ি কোথায়, এটা কাল জানতে চেয়েছিলাম।” রিতমা তড়বড়িয়ে বলে।
“রাইট। তোদের ওই প্রশ্নগুলোই আমাকে সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।” হাত পা টানটান করতে করতে মামা জবাব দেয়।
“অনেক হল। এবার দয়া করে খেয়ে উদ্ধার করো আমায়। কাজের লোক আসেনি।” মা পাশ থেকে ফুট কাটে।
“রিভেঞ্জ রে দিদি, রিভেঞ্জ। তুই আর কী বুঝবি।” টুক করে কথাটা পেড়েই মামা সরে পড়ল।


পাঁচ


পঞ্চমীর পড়ন্ত বিকাল। কালচে ঘন ছেঁড়া মেঘের আড়ালে গোধূলির আলো মায়াময় করে তুলেছে চারপাশ। টুটুনের মনে হল ওই আলোর পথ বেয়েই নেমে আসবেন সপরিবারে দেবী দশভুজা। মামা ইতিমধ্যেই পায়ের স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে পিছন ফিরে গলা তুলে বলছে, “আরে তাড়াতাড়ি চল রে বাবা।”
রিতমা মামার সাথে দিব্যি তাল মিলিয়েছে। খানিকটা পিছনে টুটুন। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর রায়বাবুদের বাড়ির আধা মরচে পড়া পেল্লাই গেট নজরে এল। পুজো উপলক্ষে বাড়ির খানিকটা অংশ রং করা হয়েছে।
লোহার গেট ঠেলে পা বাড়াতেই মামা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখাদেখি টুটুন আর রিতমাও জিজ্ঞাসু মুখে থামল। চোখাচোখি হতেই মামা ভ্রূ নাচিয়ে আঙুল তুলে কোনার দিকে জানালা দেখাল। টুটুন কান পাতল ইঙ্গিতমতো। হলধরবাবুর হলঘর থেকে হালকা টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসছে। মামা মুখটা কানের কাছে এনে বলল, “টুটুন, এ যে রায়বাবুর গলা। আরেকটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কার।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। কিন্তু দিব্যাবদানের কথা লিখতে বলিনি।”
“না স্যার, মনে হল...”
“আরে তোমার মনে হওয়াতে কী যায় আসে? লোকে ছি ছি করবে।”
“কিন্তু এটা তো সত্যি।”
“শাট আপ!” শেষের কথাটা বেশ তীব্র আর পরিষ্কার।
টুটুন মামার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা তো সমর সেনের গলা।”
“হুম। যা ভেবেছিলাম। এটাই স্বাভাবিক।” মামার গলায় প্রশান্তি।
টুটুন রিতমার কাছে গিয়ে বলল, “কিছু একটা মামার মধ্যে চলছে।”
রিতমা মুখ খুলতেই মামা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ করতে বলল। ফতুয়ার পকেট থেকে আদ্যিকালের মোবাইল বার করে কথা বলছে।
খানিক পরেই টুটুন বুঝল রায়বাবুকে ফোন করেছিল মামা।


ছয়


“মিঃ রায়, ইনিও কি ‘এস’?”
মামার প্রশ্নে রায়বাবু হা হা করে হেসে উঠলেন। খানিক আগেই এত হল্লা আর এখন মুখে হাসির বন্যা। কে বলে বাঙালি  ভালো ব্যবসায়ী হয় না? ভালো ব্যবসায়ীর প্রধান লক্ষণ পার্সোনাল আর প্রফেশনাল লাইফকে আলাদা রাখা।
“ইউ আর অ্যাবসলিউটলি রাইট। হি ইজ অলসো ‘এস’। এস. বলরাম রায়, আমার বড়ো ছেলে।” রায়বাবু হাসি থামিয়ে বললেন।
“বাকিরা আজ রাতেই আসছেন? যদি বলেন তখন না হয় আমি সবার সামনেই বলব।” মামা জিজ্ঞাসা করল।
“খেপেছেন মশাই! আপনার হয়ে গেছে এর মধ্যে?” রায়বাবুর গলায় আশ্চর্যরকমের বিস্ময়।
“কেন? আপনি চাননি সমাধান হোক?” মামা ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল।
“না না, তা নয়। বাট...”
“রায়বাবু ওরফে সম্রাট হলধর রায় মশাই, বিষয়টা কাল রাতেই সমাধান হয়ে গেছিল। কিন্তু ছিল সব ছড়ানো ছিটানো। আসলে আমি তো প্রফেশনাল গোয়েন্দা নই, নিতান্তই ছাপোষা বাঙালি লেখক।” কথাগুলো মামা বলেই রায়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঘরে তখন সমর থেকে শুরু করে মানে আগে যারা ছিল তারা সবাই। এক্সট্রা কেবল এস. বলরাম। রায়বাবুর আপত্তি নেই বুঝেই মামা মুখ খুলল এবার। “হলধরবাবু, কড়ি কিন্তু মহিলা দ্বীপেই আছে। কী, তাই তো?”
রায়বাবু নড়েচড়ে বসেন। একটু চুপ থেকে বলেন, “হোয়াট ডু ইউ মিন?”
“তাহলে আগাগোড়াই বলি, কেমন?”
মামা যা যা বললেন তার সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় ঠিক এরকম। দিব্যাবদানের অশোকাবদান খণ্ডে উল্লেখ আছে কীভাবে সম্রাট অশোক প্রায় আঠারো হাজার আজীবক সম্প্রদায়ের মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন। পরে নিজের ভাই ভিতাশোককে ভুলবশত হত্যা করার পর তিনি পুরোপুরি শান্তির প্রচারক হয়ে সমগ্র বাংলা ও অখণ্ড ভারতে গৌতম বুদ্ধের বাণী প্রচার করেন। যে হত্যার খেলা শুরু হয়েছিল পাটলিপুত্রে, বর্তমানের পাটনায়, সেই নারকীয় রক্তের খেলায় যে অল্প সংখ্যক বেঁচে যায় তারা সোজা কিষাণগঞ্জের পথ ধরে প্রবেশ করে শিলিগুড়ি অঞ্চলে। সেখানেই বসবাস শুরু করে। বগুড়া গ্রাম তাদের মধ্যে প্রধান অঞ্চল। এর কথা অবশ্য জানা যায় ইবনবতুতা যখন ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে বাংলার এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন কামারু মানে বর্তমানের কামাখ্যা থেকে এবং ভ্রমণকাহিনি লিখতে শুরু করেন বগুড়ায় বসে।
“আচ্ছা হলধরবাবু, আপনার আদি বাড়ি তো বাংলাদেশে। তাই না? দেশভাগের কিছু আগে আপনাদের ঠিকানা হয় শিলিগুড়ি অঞ্চলে।”
“হুম। ক্যারি অন।” গম্ভীরভাবে প্রত্যুত্তর দেন রায়বাবু।
“এটা অবশ্য আপনার লেখা থেকেই পেয়েছি। গতবছর থেকে আপনার কাজে সাহায্য করে সমর। আর তার আগে আপনিই কি সময় করে লিখতেন?”
মামার এই প্রশ্নে কেন জানি না রায়বাবু চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে ওঠে। মামা এবার সমর সেনের দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছোড়ে। “সমর, সবটা না জেনে তুমি যে রিভেঞ্জ নিতে গেছিলে তা তো হল না, তাই না? কয়েকটা নকল কড়ি তোমাকে ধরিয়ে দিল।”
“কী বলছেন আপনি তা জানেন!” সমরের গলায় বিস্ময় আর বিরক্তি।
“হুম। তুমি যে সেই আজীবকদেরই একজন তার পরিচয় গতকালকেই পেয়েছি। তোমার গলায় সর্পবেষ্টিত মহাবীরের লকেট আর তোমার উচ্চারণে বগুড়ার বাতাস।”
টুটুনের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। আর রিতমা কাঠপুতুলের মতো একবার মামা আরেকবার সমরের দিকে ঘুরছে।
“লেখক মশাই, কিছুই বুঝতে পারছি না আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন।” রায়বাবু গলা ঝেড়ে বললেন।
এরপর বেশ খানিকটা কথা হল যার সারমর্ম হলー
সমর রায়বাবুর আসল পরিচয় জানতেন না। তাঁর লেখায় যখন হাত দিলেন তখন বুঝতে পারেন সম্রাট হলধর রায়রা হলেন সম্রাট অশোকের বংশধর। সমর সেনদের পূর্বপুরুষ ছিলেন আজীবক এবং পরে তাঁরা পুনরায় জৈনধর্মে দীক্ষিত হন। বাংলায় সেন পদবী আসে মূলত জৈন সম্প্রদায় থেকে। কিন্তু মানুষের মনে কখন যে প্রতিহিংসা জন্মায় তা বোঝা খুবই কঠিন।
সমর জানতে পারেন রায়বাবুদের কাছে ওই চারটে কড়ির অসীম গুরুত্ব। মনের মধ্যে জ্বলে ওঠে পূর্বপুরুষদের হত্যার প্রতিশোধ। সুযোগ অবশ্য আসে যখন তিনি লিখতে বসে জানতে পারেন কড়িগুলো সম্রাট অশোকের। সুতরাং কড়িগুলো হাপিস করে রায়বংশের সর্বনাশ করা এটাই হয়ে উঠল প্রধান ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু এখানেই করে বসলেন মস্ত ভুল। কথায় বলে, তাড়াহুড়োতে মতিভ্রম।
টুটুনরা লক্ষ করল সমরের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা। রায়বাবুর এলানো শরীর এবার খাড়া।
“কিন্তু আমি কাল রাতে পুরোটাই পড়েছি, হলধরবাবু। আপনি কেবলমাত্র একজায়গায় উল্লেখ করেছেন আপনার প্রপিতামহ বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন। যার শেষ বয়েসে ছাপ ফেলেন আসল সম্রাট অশোক এবং তাঁরই নির্দেশে প্রথম সন্তানদের নামের আগে ‘এস’ ব্যবহার শুরু হয়। আর তাছাড়া এ-বাড়ির দেওয়ালময় গৌতম বুদ্ধের ছবি, পূর্বপুরুষের ছবির তলায়ও লেখা অশোক-২… ভুল বললে ধরিয়ে দেবেন, রায়বাবু।”
“গল্পের মতো সাজিয়েছেন সাহিত্যিক মশাই, বাট দিজ অল আর ভেরি ট্রু।”
“শুধু তাই নয়, এর পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে তারা সম্রাটের বংশ, যা আসলে সত্য নয়। আপনার লেখার এই অংশটাই সমর বাদ দিয়ে ফেলে। আর বাদ দেয় অশোক-২ ও অসন্ধিমিত্রার ছবিগুলো। কী সমর, ঠিক বলছি তো?” মামা ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করে সমরকে। সমর দেওয়ালের এককোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন কেবল, মাথা নিচু।
“কিন্তু আপনি বুঝলেন কী করে, আর আসল কড়িগুলোই বা কোথায়?” রায়বাবু জানতে চান।
“ওয়েল, মিঃ রায়, সেকেন্ড প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা। তবে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন যখন তারও উত্তরও দেব। তবে একটা কথা আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে, আপনি সমরকে রাখার বেশ কিছুদিন পর সন্দেহ করতে শুরু করেন। আর এই পুজোতেই সমরকে হাতেনাতে ধরার মতলব এঁটেছিলেন।”
“হাউ! আই কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড!”
“আপনি জানেন, এখানে আসার কয়েকদিন আগেই আপনাদের বহু পুরনো পু্রোহিতকে আপনি নির্দেশ দিয়েছিলেন মহিলা দ্বীপে কড়িগুলো ডুবিয়ে রাখতে।”
“মহিলা দ্বীপ কী, মামা?” টুটুন জানতে চায়।
“ছোট্ট এককথার ধাঁধা বা বলতে পারিস হলধরবাবুর রসিকতা। মালদ্বীপকে আরেক কথায় মালে দিবেহী রাজ্য বা মহিলা দ্বীপ বলা হয়। এখান থেকেই সম্রাট অশোকের ইতিহাস...”
“ওহ্‌ মাই গুডনেস! ইউ আর রিয়েলি…একদম ঠিক।” রায়বাবু আর থাকতে না পেরে মামাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, “কিন্তু এখানে মহিলা দ্বীপ কোনটা?”
“মায়ের মুখের প্রতিবিম্ব কোথায় পড়ে? জলপূর্ণ কলসে। আর ঠিক উপরে থাকে ছোট্ট তেকোনা বাঁশের ফালা। যদিও এটা আমার অনুমান ছিল কিন্তু আপনিও তাড়াহুড়ো করে ওহ্‌ মাই গুডনেস বলে ফেললেন, এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতেই পারে।”
মামার উত্তরে রায়বাবু আরও জোরে হাসতে থাকেন।
হাসির মধ্যেই কান্না। আমাদের চোখ গেল সমরের দিকে। হাউমাউ করে কাঁদছেন বেচারা। মামা সমরের কাছে গিয়ে বলল, “আসলে কী জানো, হিংসা আমাদের সর্বনাশ করে। এবার তুমি নিজেই বলে ফেলো নকল কড়ি কেন রাখলে।”
“ঘরে গিয়ে যখন দেখলাম কড়িগুলো নেই তখন বুঝলাম সন্দেহ আমাকেই করবে। তাই আমার কাছে রাখা নকল কড়ি বাক্সে রাখলাম।”
“ব্যস, আর তাতেই তুমি পড়লে ধরা। কারণ, রায়বাবু ওগুলো স্নান করানোর সময়েই পুরোহিতের সাহায্যে সরিয়ে দেন।”
সমরের মাথা নিচু হয়ে যায়।
রায়বাবু এবার একটু কঠিন গলায় বলেন, “তা এবার সমরকে নিয়ে কী করা যায়? পুলিশ?”
সমরের কান্না বেড়ে যায় পুলিশের কথা শুনে।
“দেখুন, এটা আপনাদের পারিবারিক বিষয়। তবে আমি বলি কী, কাল থেকেই তো পুজো। থাক না থানাপুলিশ। বেচারার পূর্বপুরুষদের কথা ভেবে না হয় ছেড়েই দিলেন।”
“বেশ, তাই হোক। তবে আপনি কিন্তু আমাদের এই বিষয় কাউকে বলবেন না প্লিজ।” রায়বাবু অনুরোধ করেন।
“ঠিক আছে, মিঃ রায়। তবে আমার একটা আবদার রাখতেই হবে। আমি লেখক মানুষ। এত সুন্দর প্লট হাতছাড়া করা যায় না। আমি অন্য নাম স্থান দিয়ে কিন্তু প্রকাশ করবই।”
সেদিন ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। টুটুনের মাথায় এখনও নানা প্রশ্ন। আর সেটা বুঝতে পেরেই মামা টুটুনের দিকে দাঁড়িয়ে বলে, “দ্যাখ, আমি লেখকমাত্র। চোর ধরা আমার কম্ম নয়। বলতে পারিস কিছুটা অনুমান, কিছুটা লজিক, কিছুটা ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি...”
হঠাৎ রিতমা মামাকে জিজ্ঞাসা করে, “মামাজী, হোয়াট ইজ জিমনোসোফিস্ট?”
মামা হাঁটা থামিয়ে রিতমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “নগ্ন দর্শন। একটু গুগল ঘেঁটে দেখে নিস মা।”


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

1 comment:

  1. এই গল্পটি আমার খুবই ভালো লেগেছে।

    ReplyDelete