গল্পঃ মেলার মাঠেঃ সুস্মিতা কুণ্ডু


মেলার মাঠে


সুস্মিতা কুণ্ডু

শীতকালটা বড্ড ভালো লাগে টুটুর। পিঠেপুলি, কমলালেবু, কেক নানারকম ভালোমন্দ খাওয়ার জিনিস যেমন পেট ভরায় তেমনি মেলার মাঠের হুল্লোড়ে মন ভরে যায়। টুটুদের কলোনির মাঠে প্রতিবছর শীতকালে মেলা বসে। হাজার কিসিমের দোকানপাট, রকমারি জিনিসপত্রের পসরা, হরেকরকমের খাবারদাবার! শুধু কি তাই? নাগরদোলা, ঘূর্ণি ঘোড়া, হেলিকপ্টার, পুতুলনাচ, ম্যাজিক শো, বেলুনーকতশত মজারু।
বাবা-মায়ের হাত ধরে নাচতে নাচতে রওয়ানা দেয় টুটু মেলার মাঠের দিকে। দু’চোখ ভরে অবাক হয়ে দেখতে থাকে চারপাশের লোকের ভিড়। কতরকম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে, সবাই খুশি মনে মেলায় চলেছে। বেশ দুগ্গাপুজোর মতো আমেজ চারদিকে। টুটু মনে মনে হিসেব কষতে থাকে কী কী কিনবে। একটা ঝিনুক বাঁধাই আয়না, একটা চিনেদের কাগজের ভাঁজ করা হাতপাখা, একটা বেতের ফুলদানি, আর… আর... নাগরদোলা চাপবে টুটু। কিন্তু বাবা তো নাগরদোলায় ভয় পায়। একা একা টুটু চাপবে কী করে? মা কি রাজি হবে সঙ্গে যেতে? যাক গে নাগরদোলা না-ই সই, অন্য কিছুতে চাপবে’খন।
হেঁটে হেঁটে খিদে পেয়ে গেল টুটুর। কতদূর রে বাবা! পথ যেন ফুরোতেই চায় না। পৌঁছেই কিছু খেতে হবে আগে। এগরোল খাবে, নাকি চাউমিন? আইসক্রিম তো মা খেতেই দেবে না পাছে গলা ধরে এই ভয়ে। তার বদলে চকোলেট খাওয়া যায় একটা। এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন টুটু দেখে সে পৌঁছে গেছে মেলার মাঠে। মা শক্ত করে ওর হাতটা ধরে বললেন, ““টুটুসোনা, একদম হাত ছাড়বে না, মেলায় ছেলেধরা আছে কিন্তু।”
টুটু ফিকফিকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে, “ছেলেধরা তো মেয়েদের ধরবে না নিশ্চয়ই? তাহলে আর ভয় কীসের মা?”
বাবা-মা দু’জনেই হেসে ফেললেন টুটুর কথা শুনে। টুটুর মুখটা দেখে মা বুঝে যান ওর খিদে পেয়েছে। তিনজনে মিলে দাঁড়ায় ‘চটপট চাউমিন’-এর দোকানে। তিন প্লেট চাউমিন নিয়ে বসে কাঠের বেঞ্চে। টুটুর অবশ্য হাফ প্লেট। বাবা বলেন, “পেটের গাড়িতে একটু তেল ঢেলে নিয়ে ফের আমরা ভ্রুম ভ্রুম করে ঘুরব, কী বলিস টুটু?”
টুটু তখন কাঁটা চামচে করে মুখে চাউমিন পুরতে ব্যস্ত। জোরে ঘাড় নাড়াল বাবার কথায়।
বেঞ্চের একপ্রান্তে বসে টুটু চাউমিন খাচ্ছিল। বাবা দোকানের দাম মেটাচ্ছে আর মা উলটোদিকে কাঠের হাতা-খুন্তি নিয়ে বসা কাকুটার দোকানে জিনিস দেখছে, এমন সময় টুটুর পায়ে কী যেন একটা ভিজে ভিজে সুড়সুড়ি লাগল। চমকে চেয়ে দেখে একটা ইট-গুঁড়ো রঙের কুকুরছানা নাক দিয়ে ওর পায়ে গোত্তা মারছে আর গোলাপি জিভটা বার করে ওর পাটা চাটার চেষ্টা করছে। টুটুর ভারি মায়া হয় ছানাটাকে দেখে। আহা রে! খিদে পেয়েছে বুঝি ওর। একটু চাউমিন প্লেট থেকে তুলে ছানাটার সামনে দেয় টুটু। মা এখনও দোকানে ব্যস্ত, নইলে এক্ষুনি টুটুকে বকুনি দিতো কুকুরছানা ঘাঁটার জন্য। ছানাটা কিন্তু চাউমিন না খেয়ে টুটুর পায়ে মাথা ঘষে কুঁইকুঁই করতে থাকে। টুটু বলে, “এই বোকা! চাউমিন খাবি তো। খেয়ে শিগগির তোর মায়ের কাছে চলে যা। নইলে এক্ষুনি ছেলেধরা এসে বস্তায় ভরে নেবে তোকে।”
কুকুরটা তাও মাথা ঘষে চলে।
এমন সময় দোকানের টাকা মিটিয়ে টুটুর বাবা এসে হাজির। “টুটু, খাওয়া হল রে মা? এ কী!”
বাবাও একটু চমকে ওঠেন ছানাটাকে দেখে। “এটা কোত্থেকে এল? এহ্! সদ্য চোখ ফুটেছে ছানাটার। মা কুকুরটা কই গেল?”
বাবা আর টুটুর গলা শুনে মাও তড়িঘড়ি ফিরে এল। কুকুরটাকে দেখে মা একটু সিঁটিয়ে যেতেই বাবা বললেন, “মনে হয় এত ভিড়ে মায়ের কাছছাড়া হয়ে গেছে গো ছানাটা।”
টুটুর মায়ের মুখটা একটু নরম হয়ে এল। বললেন, “একটু দেখবে আশেপাশে ওর মাটা আছে কি না?”
টুটুর বাবা খানিকক্ষণ এদিক ওদিক খুঁজে একটু দূরে জমা হয়ে থাকা একরাশি বস্তা কাগজ থলের স্তূপের পেছন থেকে চেঁচালেন, “এই যে এদিকে!”
তারপর এসে সাবধানে ছানাটাকে বেঞ্চের তলা থেকে ধরে নিয়ে ফিরে গেলেন ওদিকে। পেছন পেছন টুটু আর মাও গেল। একটা কালো রঙের মা কুকুরকে ঘিরে দুধ খাচ্ছে আরও তিনটে কুকুরছানা। আর এই লালুবাবু কোন ফাঁকে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ও হ্যাঁ! টুটু মনে মনে ছানাটার নাম রেখে ফেলেছিল লালু।
মা আর ভাইবোনদের ফিরে পেয়ে লালুর সে কী আনন্দ! ধুলোতেই লুটোপুটি গড়াগড়ি খেতে লাগল। লালুর মাও টুটুদের দিকে চেয়ে ঝপাক ঝপাক করে লেজটা নাড়াতে লাগল জোরে। টুটু হাতের বাকি চাউমিনসহ কাগজের প্লেটটা নামিয়ে রেখে দিল লালুর মায়ের সামনে। মনটা বেশ খুশিতে ভরে গেল টুটুর। তারপর আর কী? লাফাতে লাফাতে মায়ের হাত ধরে চলল কথা বলা পুতুলের তাঁবুটার দিকে।
কী মজার খেলা দেখায় পুতুলটা! একটা কোট-টুপি পরা লোকের কোলে বসে কেমন পাকা পাকা কথা বলে। একদম সামনের সারিতে বেগুনে ফ্রক পরা, হলুদ রিবন মাথায় বাঁধা টুটুকে দেখে পুতুলটা আবার বলল, “এই মেয়েটা! আমায় বে করবি?”
মা গো মা! টুটু তো ভারি রেগে ঝটপট উত্তর দিল, “আগে পড়াশোনা করে চাকরি পাই, তারপর তো বিয়ে করব।”
সেই শুনে তো তাঁবুসুদ্ধু লোক হেসে কুটিপাটি। পুতুলের খেলা শেষ হওয়ার পর বাইরে এসেও মা আর বাবা মুখ টিপে হাসতে লাগল। টুটু বোঝে না এত হাসির কী হল! ওর ছোটকা যখন বলে চাকরি পেলে তবে বিয়ে করব, তখন তো কই কেউ হাসে না! খালি ছোটোদের বেলাতেই যত্ত ইয়ে। রাগ করে মায়ের হাতটা ছেড়ে একা একাই হাঁটা দেয় টুটু।
চারদিকে ছোটো ছোটো পুঁতির মতো রঙিন আলো দিয়ে কতরকমের সাজ! কোথাও সবুজ আলোর গাছে আলোর পাখি বসে আছে, কোথাও বা সাদা আলোর ঝরনা, কোথাও বা নানা রঙের আলোর কলকা-নকশা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধের অন্ধকার নেমে আসতে আলোকসজ্জা আরও ভালো করে বোঝা যাচ্ছে। টুটু অবাক চোখে ডাইনে বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে থাকে। এমন সময় চোখে পড়ে নানারকমের ঝিনুকের জিনিসের একটা দোকান। আয়না, শো-পিস, ফুলদানি... শিগগির মাকে ডাকতে যায় টুটু। কিন্তু তখনই খেয়াল হয়, মা তো পাশে নেই! বাবাও নেই! টুটু চারদিকে ঘুরে দেখে, নাহ্, আশেপাশে মা-বাবা কেউ নেই। অচেনা অজানা নানারকমের লোকের ভিড়, কিন্তু চেনা মুখদুটো কই? ঘাবড়ে যায় টুটু। গলা তুলে ডাকে, “মা! মা গো! তুমি কই? বাবা কোথায় তোমরা? আমি এখানে!”
বেশ খানিকক্ষণ মা-বাবাকে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে চলল টুটু। একটা দাড়িওয়ালা লোক ওকে দেখে এগিয়ে এসে “কী হল খুকি? হারিয়ে গেছো বুঝি? আমার সঙ্গে এসো। চকোলেট খাবে?” এসব বলার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু টুটু জানে মা বলেছে অচেনা কারোর সাথে না যেতে, তাদের দেওয়া কোনও জিনিস না খেতে। টুটু ঘাড় নেড়ে, হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ থেকে গড়িয়ে আসা জলের ফোঁটাটা মুছে নেয়। অন্যদিকে এগিয়ে যায়। এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছয় সেই ‘চটপট চাউমিন’-এর দোকানটার কাছে। এখন দোকানটায় ভীষণ ভিড়, একটা বেঞ্চেও বসার জায়গা খালি নেই।
এমন সময় পায়ের কাছে একটা ঠেলা খেয়ে মাথা নিচু করে দেখে চমকে ওঠে টুটু। এ তো লালুর মা! সেই হারানো কুকুরছানাটার মা, যাকে টুটু চাউমিন খাইয়েছিল। টুটুর ফ্রকের কোনাটা আলতো করে মুখে ধরে টানছে লালুর মা। টুটু বলে, “আমার কাছে চাউমিন নেই গো আর লালুর মা। তুমি ফিরে যাও।”
তবুও কুকুরটা টানতে থাকে টুটুকে। দূরের একটা বড়ো তাঁবুর দিকে মুখ তুলে ‘ভৌঔঔঔ’ করে ডাকে। সেই দাড়িওয়ালা লোকটা যে ওকে চকলেট দিতে চাইছিল সে কোত্থেকে এসে হাজির হয় সেখানে। লোকটাকে দেখে কুকুরটা দাঁত বার করে গরগর আওয়াজ করে। সে টুটুর দিকে আর এগোতে সাহস পেল না। টুটুও এবার আর দেরি না করে কুকুরটার পিছু নিল। ভিড় কাটিয়ে কাটিয়ে দু’জন এগিয়ে চলল। বড়ো তাঁবুটার সামনে পৌঁছে দেখল সেখানে বেশ কিছু লোক বুকে একটা করে নীল রঙের ব্যাজ এঁটে ঘোরাঘুরি করছে। কেউ টেবিলের সামনে বসে আছে কাগজপত্র নিয়ে। একজন হাতে মাইক নিয়ে অ্যানাউন্স করছে, “শ্রীমতী আভারানি সাহা! আপনার বাড়ির লোক মেলা কমিটির তাঁবুর সামনে অপেক্ষা করছে...”
তাই তো! এটা তো মাথায় আসেনি টুটুর। মেলার নানারকম শব্দে এই ঘোষণাগুলো কানেও আসেনি। টুটু শিগগির ছোটে ওই মাইকওয়ালা কাকুটার দিকে। ওর নামটাও অ্যানাউন্স করলে বাবা-মা বুঝতে পারবে ও কোথায় আছে। মাইক-কাকুকে বলতেই কাকুটা একটা চেয়ারে ওকে বসাল। একটা বোতল দিল জলের, তারপর ওর নামধাম জেনে নিয়ে অ্যানাউন্স করতে শুরু করল। “পিয়ালী নন্দী, ডাকনাম টুটু। মেলা কমিটির তাঁবুতে সুরক্ষিত রয়েছে। টুটুর বাবা এবং মা, মৈনাক নন্দী আর নীলিমা নন্দী আপনারা যেখানেই থাকুন তাড়াতাড়ি এখানে আসুন। আপনাদের মেয়ে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
লালুর মাও টুটুর সঙ্গে তাঁবুর বাইরে অপেক্ষায় বসে রইল। কিছুটা সময় যেতে না যেতে টুটুর বাবা-মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন তাঁবুতে। মায়ের চোখে জলের ধারা, বাবার মুখও শুকনো হয়ে গেছে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে। টুটু ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের কোলে। বাবাও জড়িয়ে ধরল ওকে। দু’জনে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে তুলল টুটুকে। সবার চোখে জল মুখে হাসি। মাইক-কাকুর মুখেও হাসি।
সবকিছু ভালো দেখে আরেকজনও ভীষণ খুশি হয়ে লেজ নাড়িয়ে লাফাতে লাফাতে ফিরে গেল নিজের আস্তানার দিকে। টুটুর মতো তার ছানারাও তাকে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে হয়তো এতক্ষণে। কিন্তু ছোট্ট টুটুকে সাহায্য করতে না এসেও লালুর মায়ের উপায় ছিল না। কেউ উপকার করলে তার প্রতিদান সবসময় দিতে হয়, এমনটাই তো ভগবান শিখিয়েছেন সকল প্রাণীকে, তাই না?


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

3 comments:

  1. কী মিষ্টি গল্প। খুব সুন্দর।

    ReplyDelete
  2. ভালবাসার মিষ্টি গল্প

    ReplyDelete
  3. মিষ্টি গল্পটা

    ReplyDelete