গল্পঃ হেনরি গডফ্রের পাইপঃ সনৎকুমার ব্যানার্জ্জী




এক


জহরলাল নেহেরু রোড আর সুরেন ব্যানার্জ্জী রোডের যে ক্রসিংটা, তার থেকে সামান্য দক্ষিণে পিছিয়ে এলে ছোট্ট একটা দোকান। বাইরে থেকে চট করে চোখে পড়ে না। আর চোখে পড়বেই বা কী করে? একে তো ছোটো দোকান, একখানা মাত্র আড়াই ফুটি পুরনো আমলের কাঠের দরজা, গোটা তিনেক ভাঙা ভাঙা সিমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। মাথায় ছোটো টিনের সাইনবোর্ড–আঢ্যি ব্রাদার্স–টোবাকুনিস্ট। দোকানটা সাত বাই দশ ফুট হয় কি না সন্দেহ। ভেতরে আর কোনও জানালা বলে কিছু নেই, প্রায় অন্ধকারই বলা চলে। আলোগুলোও টিমটিমে। দোকান জুড়ে এল-শেপের কাউন্টার। ওপরে কাঁচ দিয়ে ঢাকা শো-কেস, ভেতরে ইলেক্ট্রিক লাইট লাগানো। শো-কেসের অনেকটাই খালি, বাকি জায়গায় গোটা  পনেরো স্মোকিং পাইপ, প্রত্যেকটা একেকটা কাগজের বাক্সে, নানারকম শেপের। কিছু পাইপ ক্লিনারের বাণ্ডিল। একদিকে গোটা দশ-বারো কাঠের বাক্স। এ বাক্সগুলো আমি চিনি, এগুলো চুরুটের বাক্স। পেছনের দেয়ালে কাচের শো-কেস, তাতে থরে থরে চুরুট সাজানো। একদিকে কয়েক কার্টন সিগারেট–ফিল্টার উইলস, গোল্ড ফ্লেক, ক্লাসিক, ইন্ডিয়া কিংস।
সিগারেট খাওয়া আমার ঠিক নেশা নয়, শখ। সেই কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে ধরেছিলাম। তার আগেও অবশ্য কয়েকবার টান দিয়েছিলাম। তবে কখনই পকেটে প্যাকেট থাকত না, দরকার হলে দোকান থেকে কিনে নিতাম। অফিসে যখন ঢুকতাম, সামনের দোকান থেকে গোটা ছয়েক কিনে নিয়ে ঢুকতাম, সারাদিন চলে যেত। বুদ্ধির গোড়ায় মাঝে মাঝে ধোঁয়া না দিলে কখনও গবেষণার কাজ এগোয়? আমি তো বিশ্বাস করি না।
আসলে আমার পক্ষে সিগারেট খাওয়া বিষবৎ। প্রায়ই সর্দি-কাশি, সেপ্টিক টনসিলে ভুগি। অ্যান্টিবায়োটিক, পেনিসিলিন ইনজেকশন–একবার তো হসপিটালেই ভর্তি হতে হল। ডাক্তারের নিষেধ, মা-বাবার উপদেশ, গিন্নির কাকুতি-মিনতি সবই বৃথা। উলটে বাইরে গেলে কখনও-সখনও বেড়েও যেত। গবেষণার অনেক সমস্যারই সমাধান করতে পারি, কিন্তু সিগারেট কী করে ছাড়া যায় বা আরও কমানো যায়, সে সমস্যার কোনও সমাধানই পাই না।
একদিন আমার এক সহকর্মীকে পাউচ থেকে তামাক নিয়ে পাতলা কাগজে সিগারেট পাকিয়ে খেতে দেখে মনে হল সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। সিগারেট কম খাওয়া মানে তামাকের পরিমাণ কমিয়ে দাও। কেনা সিগারেটে যতটা তামাক থাকে, পাকিয়ে খেলে তামাক অনেক কম লাগে। সহকর্মীকে বললাম একটা পাকিয়ে দিতে। উনি পাউচ থেকে একটু তামাক নিয়ে হাত দিয়ে বেশ করে ছাড়িয়ে কাগজে সমানভাবে ছড়িয়ে বেশ কায়দা করে পাকিয়ে আমায় দিয়ে বললেন, “নিন, কাগজের আঠার জায়গাতে জিভ দিয়ে চেটে লাগিয়ে নিন।”
প্রথমবার তো, চাটার তোড়ে আঠাই প্রায় পুরো চেটে ফেলি আর কী। যাই হোক, কোনওমতে লাগানো গেল। সে সিগারেট চেপ্টে গিয়ে এক অদ্ভুত আকার নিল। দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দু’পাশের তামাক গুঁজে দিয়ে ধরানো হল। সামনের কাগজ ফুরফুর করে জ্বলে নিভে গেল। আবার ধরাও। এবার টানতে গিয়ে দেখি ধোঁয়াই আসছে না। পেছনের দিকের কাগজ জিভের জলে, ঠোঁটের সাঁড়াশি চাপে চেপ্টে লেপ্টে একাকার। পেছনের কাগজ ছিঁড়ে আবার নতুন করে ধরিয়ে বেশ কয়েকটা মাত্র টান দিতে পারলাম। বুঝলাম, বেশ ভজকট ব্যাপার। তবে হাল ছাড়া নেই। সেই যে বলে না, ‘উৎসাহে কী না হয়, কী না হয় চেষ্টায়’।
পরেরদিনই অফিসে ঢোকার পথে ক্যাপস্টেনের ফাইন কাট টোবাকোর পাউচ আর দু্টো সাদা রোলিং পেপারের প্যাকেট কিনে নিলাম। এছাড়াও ছিল প্রিন্স হেনরি, উইলস, ভ্যান গগ। আমি অবশ্য ক্যাপস্টেনটাই নিলাম। দরকার হলে পরে অন্যগুলো চেখে দেখা যাবে। শুরু হল নতুন প্রোজেক্ট। প্রথম ক’দিন নাকানি-চোবানির একশেষ। তিনদিনে আস্ত এক দেশলাই শেষ! ধীরে ধীরে ব্যাপারটা ভালোই রপ্ত হল। আমি আবার আরও নিজস্ব বুদ্ধি খাটালাম। সিগারেটের খালি একটা প্যাকেট নিয়ে কাঁচি দিয়ে ছোটো ছোটো টুকরো কেটে নিলাম। সেগুলো রোল করে পাকানো সিগারেটের পেছনে গুঁজে দিতাম। তাতে আবার ছোটো করে তুলো পাকিয়ে ঢুকিয়ে দিতাম কাঠি দিয়ে। ব্যস, হয়ে গেল ফিল্টার্ড সিগারেট। পেছনটাও আর ঠোঁটের চাপে চেপ্টে যেত না। দেশলাই খরচ বেশ কমে এল। চলল এভাবে বছর খানেক।
তারাতলাতে অফিস হলেও ধর্মতলা, চৌরঙ্গী অঞ্চলে মাঝেসাঝেই যেতাম বিশেষ করে চাঁদনি, নিউ মার্কেট, লিন্ডসে স্ট্রিট–মার্কেটিং করতে। সেদিনও চাঁদনিতে গিয়েছিলাম। হেঁটে লিন্ডসে স্ট্রিটের দিকে আসছি। হঠাৎ আঢ্যিদের দোকানটা চোখে পড়ল। আগেও বহুবার দেখেছি, কিন্তু ঠিক সেভাবে নয়। আজ মনে হল ঢুকি তো দোকানটাতে। আমার তামাক ফুরিয়ে এসেছে, আর বড়োজোর দিন দুয়েক চলবে। এখানে তো অবশ্যই পাব। ঢুকলাম দোকানে। কাউন্টারে দু’জন ভদ্রলোক, নির্ঘাত আঢ্যি ব্রাদার্স। চেহারায় যথেষ্ট মিল, বিশেষত মুখ। তবে একজন বেঁটে, অপরজন মোটামুটি লম্বা। বোঝাই যাচ্ছে, লম্বা ভদ্রলোক বড়ো ভাই। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মাথায় সুবিস্তীর্ণ টাক, পেছনে সামান্য চুল। শান্ত গম্ভীর চেহারা, বয়স ষাটের ওপরে তো বটেই। ছোটো ভাই বেঁটে। মাথায় টাক, মাথার মাঝখানে পাতলা কয়েকগাছি চুল। সাদা প্যান্ট আর হালকা ঘিয়ে রঙের শার্ট পরা। হাসিখুশি চেহারা। কাউন্টারের ওপর দুটো হাত রেখে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে একটু হেসে, “আসুন, কী নেবেন?” বলে আপ্যায়ন করলেন। ব্যবহারটা ভালোই লাগল।
আমি ক্যাপস্টেনের দুটো পাউচ আর পাঁচ প্যাকেট কাগজ নিয়ে নিলাম। খবরের কাগজের টুকরো দিয়ে জড়িয়ে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে দিলেন। এরপর তো আর দোকানে থাকা চলে না। কিন্তু আমি নানারকমের পাইপ, চুরুট দেখে কেমন মোহিত হয়ে গেলাম। হঠাৎ কী মনে হল, জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, ক্যাপস্টেনের এই টোবাকো পাইপে ভরে খাওয়া যাবে নিশ্চয়ই?”
ছোটো আঢ্যি মাথা নেড়ে, মুখ একটু কুঁচকে বললেন, “না, ভালো খাবেন না। এ সমস্ত হচ্ছে ফাইন কাট। ঐ কাগজে রোল করে খাওয়ার জন্য। পাইপের তামাক হচ্ছে কোর্স কাট।” এই বলে একটু নিচু হয়ে কাউন্টারের নিচের একটা ড্রয়ার খুলে একটা পাউচ বার করলেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এগুলো পাইপ টোবাকো।”
নিয়ে দেখলাম, বরকুম রিফ, অরিজিনাল মিক্সচার। ডেনমার্কের প্রোডাক্ট। দাম বললেন সত্তর টাকা। আরও দু-তিনটে বরকুম রিফের প্যাকেট বার করে দেখালেন–চেরী ক্যাভেনডিস, বুরবুন হুইস্কি, শ্যাম্পেন। প্যাকেট দেখলেই তো চক্ষু চড়কগাছ! দাম ওই আশি-একশোর মধ্যে। সবগুলোই সিল করা। ভেতর না দেখলে বুঝব কী করে? একটা অদ্ভুত বিদেশি বিদেশি গন্ধ।
এবার নজর পড়ল পাইপের ওপর। বেশ কয়েকটা বার করে দেখালেন; ভেতরের মেকানিজমও দেখলাম। এবার আমায় ভদ্রলোক বললেন, “দেখবেন, একবার পাইপ খাওয়া শুরু করলে আর সিগারেট ভালো লাগবে না। সিগারেট-বিড়ি হল নেশা। কিন্তু পাইপ বা চুরুট হল হবি। এর মজা, এর চালই আলাদা।”
ভদ্রলোক ভালো সেলসম্যান। আমার লোভটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাছাড়া পকেটে টাকাও নেই যে কিনব। একটু হেসে বললাম, “দেখি, একটু ভাবি। আরেকদিন আসব না হয়।”
ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বললেন, “নিশ্চয়ই আসবেন। সেদিন আপনাকে এই পাইপের ব্যাপারে আরও অনেক কথা বলব। আজকাল তো এসব চর্চা কেউ করেই না। অথচ বিদেশে সাহেবদের এই পাইপ, চুরুট  নিয়ে কত বই লেখা আছে!”
আমি দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম।
দিনকতক পাইপের চিন্তায় বিভোর হয়ে রইলাম। হ্যামলেটের মতন অবস্থা–পাইপ ধরব কি ধরব না! আমাদের বাঙালির আবার চক্ষুলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে। কে কী বলবে, ‘কী রে, আবার সাহেব হয়ে গেলি দেখছি’ বলে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসবে। কিন্তু যত দিন যেতে লাগল, মনটা পাইপের দিকে ঝুঁকতে লাগল।
মাস খানেক টালবাহানার পর সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে একদিন আঢ্যি ব্রাদার্সের দোকানে হানা দিলাম ফের। ছোটো আঢ্যি আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন, “আসুন।”
আমি একটু হেসে বললাম, “নাহ্‌, আপনার কথা মতন পাইপ খেয়েই দেখি।”
আঢ্যি কাউন্টারের ভেতর থেকে বেশ গোটা কয়েক পাইপ বের করে সামনে সাজিয়ে রাখলেন। একটা তার মধ্যে বেশ চোখে লেগে গেল। শার্লক হোমসের পাইপের মতন বাঁকানো। সামনের কাপের মতন কাঠের অংশটা ঘন বাদামি বার্নিশ করা, পেছনের নলের জায়গাটা চকচকে কালো রেসিনের, আর সেটা যেখানে কাঠের বাঁকানো মুখে ফিট হয়েছে সেখানে একটা সোনালি মেটাল রিং। এই পাইপটা, দু’প্যাকেট বরকুম রিফ টোব্যাকোーএকটা চেরী ফ্লেভার আর একটা আল্ট্রা-লাইট, এক বাণ্ডিল তারের পাইপ ক্লিনার আর একটা স্টেইনলেস স্টিলের পাইপ ক্লিনিং টুল কিনে নিলাম।
আঢ্যিবাবুই শিখিয়ে দিলেন পাইপ খাবার নিয়মকানুন। বললেন, “কখনও ধোঁয়া ইনহেল করবেন না। পাইপই বলুন আর চুরুটই বলুন। হালকা করে টেনে নিয়ে মুখের ভেতরেই একটু রাখুন, ধোঁয়া জিভের চারদিকে রোল করবে। তারপর ছেড়ে দেবেন। এতে আপনি টোব্যাকোর স্বাদ, গন্ধ ভালো বুঝতে পারবেন। আর নেশাও মিটবে। চুরুট খাবার নিয়মও তাই। আর দু-তিনটে পাইপ রাখবেন। দিন তিন-চারেকের বেশি একটা পাইপে খাবেন না, বদলে নেবেন। পাইপের কাঠ ময়েশ্চার অ্যাবসর্ভ করে। ওটাকে ক’দিন রেখে শুকিয়ে নেবেন। এভাবে পাইপ বদলে বদলে খাবেন।”
শুরু হল আমার পাইপ খাওয়া। পরে আরও গোটা দুয়েক পাইপ কিনলাম। সত্যিই, পাইপ খাওয়ার মেজাজই আলাদা। বিশেষত এই বরকুম রিফ তামাকের স্বাদ আর গন্ধ। একবার রাস্তায় যেতে যেতে একটা ক্লাসিক সিগারেট কিনেছিলাম। কয়েকটা টান মেরে ফেলে দিতে হল। মনে হল শুকনো ঘাসে আগুন ধরিয়ে টানছি।
বছর তিনেক হয়ে গেল। এরপর কোথাও কেউ সিগারেট অফার করলেও আর খাই না।


দুই


রাত সোয়া আটটা নাগাদ ট্রেন ছাড়ল। হাওড়া-মুম্বই মেল ভায়া নাগপুর। অফিসের কাজেই মুম্বই যাচ্ছি। ফার্স্ট ক্লাস বি কুপে আমি একাই। তিনটে বার্থই খালি। বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে দিয়েছিল–লুচি, তরকারি, মিষ্টি–সদ্ব্যবহার করাই যাক। অন্যসব ব্যাপারে গড়িমসি করলেও এ ব্যাপারে আমি বৃথা কালক্ষয় করি না। খেয়েদেয়ে পাইপে তামাক ঠেসে পায়ের ওপর পা তুলে জানালার ধারে বসে মৌজ করে টানতে থাকি। বাইরে অবশ্য দেখার কিছু নেই। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, মাঝে মাঝে আলো মানে কোনও স্টেশন। টি.টি. টিকিট চেক করে চলে গেলেন। খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে। খড়গপুর না এলে তো হবে না। হাওড়ায় ট্রেনে বসে একটা কফি খেয়েছিলাম। তার কাগজের কাপটা রেখে দিয়েছি। তাতে পাইপের পোড়া ছাই-তামাক ফেলে সামনের স্ন্যাক টেবিলে রেখে দিলাম। রাত্রি প্রায় দশটা। সার দিয়ে আলোর মালা দেখা যাচ্ছে। রেলের লাইন ডবল ছাড়িয়ে বেড়েই চলেছে। দেখতে দেখতে খড়গপুরে ট্রেন এসে দাঁড়াল। হাতে খুচরো বার করে এদিক ওদিক দেখছি। ঐ তো কেটলি আর কাগজের কাপের বাণ্ডিল নিয়ে দাঁড়িয়ে। “অ্যাই চা!” হাঁক পড়তে হল।
চা নিয়ে চুমুক দিয়ে ঘুরে বসতেই উলটোদিকের সিটে ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। কখন যে ঢুকে এসে বসেছেন টেরই পাইনি। বয়স্ক লোক, পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবেন। মাঝারি লম্বা, একহারা চেহারা। গায়ের রঙ একটু শ্যামলা। মাথায় কাঁচা-পাকায় মেশানো ঘন চুল, নিখুঁতভাবে দাড়িগোঁফ কামানো। একটা বাদামি টেরিকটের প্যান্ট আর ক্রিম রঙের বুশ শার্ট পরা। বুক-পকেটে পেন, পকেট ডায়েরি। পায়ে কাবুলি জুতো। সিটের পাশে একটা এয়ার ট্র্যাভেলিং ব্যাগ। আমার দিকে তাকিয়ে কেমন একটু রহস্যময় মিটিমিটি হাসছেন মনে হল। আমি আবার জানালার দিকে চেয়ে যেমন চা খাচ্ছিলাম, খেতে লাগলাম। কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়েই আছেন। চা’টা শেষ করে কাপটা বাইরে ফেলে ঘুরে সোজা ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক হেসে বললেন, “পাইপ খাবার অভ্যাস আছে দেখছি।”
আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, “হ্যাঁ, তা ঐ একটু আধটু...”
“তা শখ, না নেশা?”
“কতকটা শখই বলতে পারেন।”
“তবুও ভালো। আমার মতন নেশার পাল্লায় পড়লে মারা পড়তেন। সাধে কি আর সব ছেড়ে দিতে হল!”
“কেন?”
“পাইপ আর সিগার ছিল আমার জীবনের সবকিছু। আর কোনওরকম নেশা ছিল না। ব্যাচেলর মানুষ, সংসারের কোনওরকম দায়দায়িত্ব, বন্ধন কিছুই ছিল না। যা রোজগার তার থেকে একা মানুষের সংসার খরচ যা চলত চলত, আর বাকি খরচ হত এই পাইপ আর সিগারের পেছনে। মাঝে মাঝে অবশ্য এদিক ওদিক দেশভ্রমণে বেরোতাম, কিন্তু নৈসর্গিক দৃশ্য বা দর্শনীয় স্থানের থেকে আমার আকর্ষণ বেশি ছিল কোথায় ভালো পাইপ বা সিগার পাওয়া যায়। নতুন ধরনের কোনও পাইপ পছন্দ হলে যত দামই হোক, কিনতাম। গোটা চল্লিশেকের মতন পাইপ জমিয়েছিলাম।”
“বলেন কী? এত পেলেন কোথায়?”
“ঐ যে বললাম, নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে, টোবাকুনিস্টের দোকান থেকে। তাছাড়া আমার এক বন্ধু ছিল মার্চেন্ট নেভিতে সেইলর। প্রায়ই তো ভয়েজে যেত। ওকে ছবি দেখাতাম, সব লিখে দিতাম, ও নানা দেশ থেকে জোগাড় করে এনে দিত। অবশ্য আমি ওকে দাম দিয়ে দিতাম। ওর কল্যাণে আমি কত দেশের কতরকম সিগার আর পাইপ টোবাকো টেস্ট করে দেখেছি, তার ইয়ত্তা নেই। নাহ্‌, আমার আর খেদ নেই।”
“আপনি যে বললেন আপনি বন্ধুকে ছবি দেখাতেন, সব লিখে দিতেন, তা আপনি এসব ছবি, খবর পেতেন কোথায়?”
“সিগার আর পাইপ যে আমি শুধু খেতাম, তা তো নয়। এ ছিল আমার একমাত্র হবি। ফিলাটেলিস্টরা যেমন স্ট্যাম্প, নিউমিসম্যাটিস্টরা যেমন কয়েন নিয়ে চর্চা করে, পড়াশুনা করে আমিও তেমন সিগার  আর পাইপ নিয়ে রেগুলার চর্চা করতাম। ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউ.এস.আই.এস, ম্যাক্সমুলার ভবনের লাইব্রেরিতে মেম্বার হয়ে নানান লাইফ-স্টাইল জার্নাল ঘাঁটতাম। সেখানে টোবাকো কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখলে তাদের চিঠি দিয়ে ক্যাটালগ আনাতাম। এক কোম্পানি তো পাইপের ওপর লেখা একটা ম্যানুয়েল পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমার সেই জাহাজি বন্ধুও আমাকে পাইপ আর সিগারের ওপর লেখা দুটো বই আর ‘সিগার আফিসিওনাদো’ নামে একটা অ্যামেরিকান জার্নাল যা শুধু সিগারের ওপর দু’মাসে একবার করে বেরোয়, তার কয়েকটা ইস্যু এনে দিয়েছিল। সেগুলো পড়ে পড়ে কতরকমের পাইপ হয়, কত ধরনের সিগার হয় এসব কত কী যে শিখেছিলাম এ বিষয়ে!”
“বাব্বা! সেই মুভি বাফের মতন দেখছি আপনি একজন রীতিমতো সিগার পাইপ বাফ। তা আপনার এ বিষয়ে এত আকর্ষণ হল কীভাবে? আপনার মতন এ ব্যাপারে এত ইন্টারেস্ট আর কখনও আমি আমার জীবনে কাউকে দেখিনি বা শুনিওনি। আপনি কি কখনও কাউকে দেখেছিলেন?”
“দেখুন, সব বিদ্যাশিক্ষারই একজন গুরু থাকেন। এ ব্যাপারে আমার গুরু ও পথপ্রদর্শক ছিলেন আমারই ওপরওয়ালা। কমার্স নিয়ে বি.কম পাশ করার সাথে সাথেই আমি একটা অডিট ফার্মে চাকরি পাই। আমার পোস্টিং হয় লক্ষ্ণৌতে। সেখানে আমার ওপরওয়ালা ছিলেন এক সাহেব, মিঃ ওল্ডহ্যাম। লম্বাচওড়া, বিশাল ভুঁড়ি, গ্যালিস দিয়ে প্যান্ট পরতেন। দাঁড়ালে সাইড থেকে ইংরেজি ডি অক্ষরের মতন লাগে। হাতে সদাসর্বদা হয় পাইপ, নয় সিগার। হিটলারকে যেমন গোঁফ ছাড়া ভাবা যায় না, ওল্ডহ্যাম সাহেবকেও তেমন পাইপ বা সিগার ছাড়া কল্পনা করা যেত না। পাইপ বা সিগার যে হবি হতে পারে ওল্ডহ্যাম সাহেবকে না দেখলে জানতাম না। সঙ্গদোষ বলুন আর সঙ্গগুণই বলুন, সাহেবের সাথে থাকতে থাকতে আমার মধ্যে কবে যে হবিটা ঢুকে পড়ল, নিজেও জানি না। তবে এটা ঠিকই আমার জীবনের প্রথম পাইপ আর টোব্যাকো পাউচটা সাহেবই আমাকে গিফট করেছিলেন। খুব দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন, বুঝলেন? খাঁটি ব্রিটিশ, তবে তিন পুরুষ ধরে ভারতবর্ষে। ঠাকুরদা সিপাহি বিদ্রোহের কিছু পরে পল্টনের চাকরি নিয়ে এদেশে এসেছিলেন। বাবা চাকরি করতেন এক ব্রিটিশ ফার্মে। সাহেব বড়ো হয়েছেন দেরাদুনে। পাইপ, সিগার ছাড়াও সাহেবের আরেকটি বিষয় জানা ছিল, নানারকম ককটেলের রেসিপি। নিজে খুব একটা ড্রিঙ্ক করতেন না, তবে ওয়াইন খেতে খুব ভালোবাসতেন। সাহেবদের বিভিন্ন পার্টিতে ককটেল বানানোর জন্য সাহেবের খুব কদর ছিল।
“কাজের সুবাদে আমাকে প্রায়ই ওঁর বাড়িতে যেতে হত। গেলেই খুব খাওয়াতেন–তুন্ডে কাবাব আর বিরিয়ানি বাঁধা ছিল। দেখেছিলাম ওঁর নানা পাইপের কালেকশন। আমি অন্তত চল্লিশরকম পাইপের শেপের নাম জানি। তার মধ্যে কুড়ি রকম নাম তো ওঁর কাছেই শেখা। ঐ যে, আপনার যে পাইপটা, ওটা হল বেন্ট বিলিয়ার্ড। তারও আবার হাফ বেন্ট, ফুল বেন্ট আছে। আপনারটা ফুল বেন্ট। এরকম ডিপ্লোম্যাট, চেরীউড, ডাবলিন, বুলডগ, ক্যাভেলিয়ার কতরকম শেপের আর সাইজের যে পাইপ হয় তা আর কী বলব।”
“আচ্ছা, পাইপের বোওল বা কাপটা, সেটা কি শুধু কাঠের হয়? মানে, আমি দোকানে যা দেখেছি...”
“না না। তা কেন? সাধারণত পাইপের বোওল তৈরি হয় ব্রায়ার উড বলে একজাতীয় চিরহরিৎ ঝুরা গাছের শেকড়ের অংশ থেকে। এছাড়াও চেরী, জলপাই, ম্যাপল, ওক, মেহগনি এসব গাছের কাঠ থেকেও হয়। এছাড়া মিরশম অর্থাৎ ম্যাগনেশিয়াম সিলিকেট, সিরামিক, ক্যালাবাস নামের একধরনের লাউয়ের খোল আর ভুট্টার যে ভেতরের অংশটা যেটা আমরা দানাটা খেয়ে ফেলে দিই সেটার থেকেও হয়। আবার সিন্থেটিক মেটিরিয়েল দিয়েও কিছু কিছু তৈরি হচ্ছে। আর পাইপের স্টেম বা ডাঁটিটা আজকাল তৈরি হয় এবোনাইট, বেকেলাইট, ফেনোলিক রেসিন এসব থেকে।”
“তা আপনি এসব আপনার সেই সাহেবের কাছে শিখেছেন?”
“শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ওঁর কাছে শিখেছি, বাকিটা নিজে চর্চা করে। তবে আমার সাহেবের বেশি আকর্ষণ ছিল সিগারের ওপর। এমনকি কখনও-সখনও পাইপের তামাক শেষ হয়ে গেলে সিগার কাটা কাঁচি দিয়ে কোনও সিগার থেকে ইঞ্চি খানেকের মতন কেটে নিয়ে পাইপে ভরে নিয়ে খেতেন। পাইপের মতন সিগারও নানারকমের সাইজ, শেপ আর কালারের হয়। সেই অনুযায়ী নাম হয় করোনা, চার্চিল, রবাস্তো, লন্সডেল, পিরামিড, টর্পেডো, কলোরাডো আরও কত, কী বলব আপনাকে। এই যে এত হলিউডের সিনেমাগুলো আসে, ক’জন অভিনেতাকে সিগেরেট খেতে দেখেন? সবই তো হয় পাইপ, নয় সিগার।”
আমি হেসে বললাম, “তা অবশ্য আপনি ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা, লক্ষ করছি আপনি বারবারই সিগার বলছেন। আমরা সাধারণত চুরুট বলে থাকি।”
“ঐ অভ্যাসটা ওল্ডহ্যাম সাহেবের সাথে থেকে থেকে। আসলে ইউরোপ-অ্যামেরিকাতে সিগারই বলে। আমাদের দেশে সিগার বেশি আসত বার্মা থেকে। বার্মার সিগারগুলোকে এখানে চুরুট বলা হত। চুরুট কথাটা আসলে তামিল চুরুট্টু বা সুরুট্টু থেকে এসেছে। ফরাসিরা দক্ষিণ ভারতে অনেকদিন ছিল। তারা এই কথাটা নেয় আর তা ফরাসি ভাষায় হয়ে যায় সেরুট। সেখান থেকে ইংরেজি ভাষায় ঢোকে।”
“আপনি তো অনেক রকম পাইপ সংগ্রহ করেছিলেন। কখনও কোনও অ্যান্টিক পাইপ খোঁজ করেননি?”
ভদ্রলোক খানিকক্ষণ চুপ করে আস্তে আস্তে বললেন, “করিনি তা নয়। মাঝেসাঝে অ্যান্টিকের দোকানে ঢুঁ মারতাম। তবে সেরকম চোখে লাগার মতন নয়। একবারই একটা পেয়েছিলাম। আর তার যা অভিজ্ঞতা হয়েছিল মশাই, জীবনেও আর কোনওদিন কোনও অ্যান্টিকের দোকানের ধারকাছ দিয়েও যাইনি।”
আমি ওঁর কথা বলার ধরন আর শরীরী ভাষার মধ্যে কেমন একটা দারুণ রহস্যের গন্ধ পেলাম। সোৎসাহে বলে উঠলাম, “কীরকম? বলুন না। অবশ্য আপনার যদি আপত্তি না থাকে।”
“না, আপত্তি আর কী! আসলে দুয়েকজন ছাড়া আর কাউকে কখনও তো বলিনি, লোকে বিশ্বাস করতে চাইবে না। তা আপনি যখন শুনতে চাইছেন... আচ্ছা বলিই তাহলে। ওল্ডহ্যাম সাহেব রিটায়ার করার পরে আমি কলকাতায় একটা অডিট ফার্মে ভালো চাকরি পেয়ে চলে আসি। থাকতাম পার্ক সার্কাসের কাছে বেক বাগানে একটা ভাড়াবাড়িতে, একতলায়। বছর দশেক আগের কথা। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ছোট্ট এক অ্যান্টিকের দোকানে একবার হঠাৎই একটা অদ্ভুত-দর্শন পাইপ পেলাম। পাইপের বোওলটা একটা কঙ্কালের মুখ–শ্যাঙ্কটা মানে বোওলের তলা থেকে স্টেম পর্যন্ত অংশটা একটা রিস্ট পর্যন্ত হাতের তালু আর তাতে ধরা নরমুণ্ডটা। মাথার মাঝে গোল তামাকের চেম্বার। বেশ বড়ো সাইজের হলদেটে রঙের মিরশমের পাইপ। রিস্টের শেষে এবোনাইটের বাঁকানো স্টেম–এই আপনারটার মতো ফুল বেন্ট বিলিয়ার্ড। কী কঙ্কালের মুখ, কী দাঁত, কী হাতের আঙুলগুলো–কী বলব ভাই, আপনি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না এত নিখুঁত কাজ। দেখলেই গাটা শিরশিরিয়ে ওঠে। হ্যান্ড-মেড পাইপ বোঝাই যাচ্ছে। যে বানিয়েছে হ্যাটস অফ। চেম্বারের ভেতরটা পুড়ে কালছে হয়ে আছে। বোঝাই যায় বহুদিন ধরেই ব্যবহার করা হয়েছে।
“পুরনো ব্যবহার করা পাইপ আমি খাই না, কিন্তু কালেক্টরস আইটেম হিসেবে এই পাইপটা কেনার লোভ সামলাতে পারলাম না। দরদাম করে আড়াইশো টাকায় পেয়ে গেলাম। আসলে প্রায় বছর খানেকের ওপর পড়ে আছে, কেউ নেয় না। আমি নিয়ে এসে আমার শো-কেসে রেখে দিলাম।
“পরেরদিন অডিটের কাজে গৌহাটি চলে যাই। কাজ শেষ করে শিলং, কাজিরাঙা এসব ঘুরে-টুরে প্রায় দিন কুড়ি পরে ফিরে আসি। যেদিন ফিরলাম সেদিন রাত্রে বুঝলেন, মনে হল ঘরের মধ্যে কে যেন পায়চারি করছে। ঘুমটা চট করে ভেঙে গেল। দেখি কেউ তো নেই। ভাবলাম মনের ভুল, তাই ব্যাপারটা বিশেষ পাত্তা দিলাম না। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। দু-তিনদিন কেটে গেল। একদিন মাঝরাতে ঘরের মধ্যে আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি একজন রোগা, ঢ্যাঙা, কোট প্যান্ট পরা লোক, মাথায় হ্যাট শো-কেসে কী দেখার চেষ্টা করছে। আমি একটু ভয় পেয়ে চোর চোর করে চেঁচাচ্ছি। উঠে ঘরের আলো জ্বাললাম। না! ঘরের ছিটকিনি, হুড়কো সবই তো ঠিক আছে। আসলে স্বপ্ন দেখেছি। মাথাটা খুব ধরে গেল। সে রাত্রে ঘুম আর এলই না।
“এরপর থেকে মশাই শুরু হল আমার এক দুর্বিষহ জীবন। প্রায়ই ঐ এক স্বপ্ন দেখি, দু’-আড়াই ঘণ্টা জেগে বসে থাকি, কখনও-সখনও ভোরের দিকে এক-আধ ঘণ্টা ঘুমাই আর মাথা ধরে যায়। সেবার আমার জাহাজি বন্ধু এল। ওকে বললাম। ও শুনেই বলল কঙ্কালের মাথাওয়ালা যে পাইপটা কিনেছি ওটা হয়তো কোনও সাহেবের ছিল–ওর টানে সাহেবের ভূত রাত্রে আসে। আমি কোনওদিন ভূত-প্রেত, তাবিজ-কবচ, ঠিকুজি-কুষ্ঠী, হাত দেখা, রত্ন ধারণ এসব বিশ্বাস তো করতামই না উলটে এ নিয়ে প্রকাশ্যে হাসিঠাট্টা করতাম। তাই বন্ধুর কথা শুনে বললাম, ‘তা সাহেবের যদি পাইপটা হয়ে থাকে তাহলে আমাকে দেখা দিয়ে সামনাসামনি এসে বলুক যে এটা আমার, আমাকে দিয়ে দাও। আমি পাইপ খাব। আমি খুশি হয়ে গোটা দুয়েক নতুন টোব্যাকো পাউচসুদ্ধ দিয়ে দিতাম। তা না করে আমার স্বপ্নে এসে প্রায়ই আমার সুখনিদ্রাটির বারোটা বাজাচ্ছে কেন? আর এই মাথাধরা?’
“বন্ধু আমাকে রেগে বলল, ‘ডাক্তার দেখা, সাইকোলজিস্ট।’
“যাই হোক, সাইকোলজিস্ট নয়, আমি পাড়ার এক জেনারেল ফিজিশিয়ানকে দেখালাম প্রায়ই এই ঘুম ভেঙে যাওয়া আর মাথা ধরার জন্য। স্বপ্নের কথা অবশ্য কিছু বললাম না। জানি ব্যাপারটা হাস্যকর। ডাক্তার বললেন, সাইনাসের থেকে হচ্ছে। ওষুধ দিল আর এক্স-রে করে কোনও ই.এন.টি স্পেশালিস্ট দেখাতে বলল–অপারেশন করাতে হবে। ডাক্তারের ওষুধে কোনও কাজ হল না। অতএব এক্স-রে করে বন্ধুর সাথেই গেলাম এক নামজাদা ই.এন.টি ডাক্তারের কাছে। অভিজ্ঞ বয়স্ক ডাক্তার, এক্স-রে প্লেট দেখে বললেন, ‘কিস্যু নেই। নাক, কান, গলা পুরো সাফ। পেটের সমস্যার থেকে হচ্ছে। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট দেখাতে হবে।’
“এদিকে আমার সমস্যার কোনও সুরাহা হচ্ছে না। এখন তো এই স্বপ্ন দেখাটা রোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাকার কোন এক কোট-প্যান্ট পরা ঢ্যাঙা নচ্ছার ব্যাটা আমার সুখের জীবনটা হেল করে দিল।
“গেলাম পি.জি হাসপাতালের এক নামকরা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে। গাদাগুচ্ছের প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করা হল–সবই নরম্যাল। এন্ডোস্কোপি করল–সবই স্বাভাবিক। কিছু পেটের ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দিয়ে নিউরোলজিস্ট রেফার করল–সম্ভবত ব্রেন টিউমার। এম.আর.আই করতে হবে। হায় ভগবান! এ কোন গাড্ডার পর গাড্ডায় পড়ছি, আর এদিকে সাহেব ব্যাটাও আমার সঙ্গ ছাড়ে না। আমার একেবারে পাগলের মতন অবস্থা। আর কিছুদিন এরকম চললে নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়ে যাবে। কী যে করব তাও বুঝতে পারছি না। এর মধ্যে এক রাত্রে বিশ্বাস করবেন না, সেদিন আর শুধু স্বপ্ন নয়, ঘুম ভেঙেও লোকটাকে যেন আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি–ঐ শো-কেসে ঝুঁকে পড়ে কী দেখছে। আমার এই প্রথম ভয় করতে আরম্ভ করল। গলা শুকিয়ে কাঠ, চেঁচাবার শক্তিও হারিয়ে গেছে। আস্তে আস্তে ছায়ামূর্তিটা মিলিয়ে গেল। এতদিনে বোধহয় আমার অবিশ্বাসে চিড় ধরতে শুরু করল। সারারাত আলো জ্বেলে বসে রইলাম।
“পরদিন শনিবার। পার্ক সার্কাস মার্কেটে বাজার করতে গেছি। নিজেই তো রান্না করে খেতাম। তা সে বাজারে বাজার করতে আসতেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক–ফর্সা চেহারা, অত্যন্ত সৌম্যদর্শন, সাদা লম্বা দাড়ি, মাথায় সাদা চুল। দেখলেই বেশ সম্ভ্রম হয়। আমার সাথে ভালোই আলাপ ছিল। আমি ওঁকে খুব শ্রদ্ধা করতাম আর দাদা বলে সম্বোধন করতাম। উনিও আমাকে ছোটো ভাইয়ের মতনই স্নেহ করতেন। আমার কেন জানি মনে হল ওঁকে ব্যাপারটা বলে দেখি, বিচক্ষণ মানুষ, উনি কী বলেন। বাজারে ওঁকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে এসে বললাম, ‘লাহিড়ীদা, আপনার সাথে বিশেষ দরকার ছিল, একটা সমস্যায় পড়েছি। আপনার পরামর্শ চাই।’
“উনি বললেন, ‘বেশ তো, আধঘণ্টা বাদে চলে এসো বাড়িতে।’
“ওঁর কাছে সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বললাম। পাইপের কথা, স্বপ্নের কথা কিছুই বাদ দিলাম না।
“লাহিড়ীদা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘দেখো, কোনও ঘটনার পেছনে একটা কার্য-কারণ সম্বন্ধ থাকবেই। তোমার মূল সমস্যা দুঃস্বপ্ন, অনিদ্রা আর মাথাধরা। আর সেটা শুরু হয়ছে তুমি বলছ পাইপটা কেনার কিছুদিন পর থেকে। হয়তো এটা একটা সমাপতন। পাইপের সাথে এর কোনও সম্বন্ধ নেই, সুচিকিৎসা হলে সেরে যাবে। কিন্তু একটা কথা। তুমি তো অডিটের কাজে প্রায়ই বাইরে যাও বেশ কিছুদিনের জন্য। বাইরে যখন থাকো, হোটেল বা গেস্ট হাউসে যেখানেই হোক, তখনও কি এমনি স্বপ্ন দেখো?’
“আমি একটু ভেবে হতবাক হয়ে বললাম, ‘না। সত্যিই তো! বাইরে থাকতে কখনও তো দেখিনি। এর পরেও অন্তত চারবার বাইরে থেকেছি। এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন বা মাথাধরা কিচ্ছু ছিল না। শুধু বাড়িতে থাকলেই এসব উৎপাত হয়।’
“উনি বললেন, ‘এটা যদি রোগজনিত কারণে হত, তাহলে বাইরে থাকলেও হত। দেখো, এসব অলৌকিক ব্যাপার বা ভূত-প্রেতে আমার কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা এখনও হয়নি। তাই এ ব্যাপারে আমার বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনওটাই নেই। তবে অনেকেরই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা হয়েছে–অনেক পড়েছি, শুনেওছি। বিজ্ঞানের যুক্তির দোহাই দিয়ে সব মিথ্যে, বুজরুকি বলে হেসে উড়িয়ে দেবার কোনও প্রবণতা আমার নেই। আর আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে যা কিছু দেখি, শুনি, অনুভব করি, বিজ্ঞান তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমাদের এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সংবেদনশীলতার সীমাবদ্ধতা আছে আর তার ব্যক্তি বিশেষে বিভিন্নতা আছে। বহু মানুষ আছে যাদের এই ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতার বাইরে অতীন্দ্রিয় জগতের অভিজ্ঞতা হয়েছে, আর তারা সবাই মিথ্যে বলছে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। যাক গে, আমি তোমায় একটা পরামর্শ দিই। এটা না হয় একটা এক্সপেরিমেন্ট বলে ধরে নাও।’
“আমি যেন একটু আশার আলো পেয়ে বললাম, ‘বলুন। আপনি যেটা বলবেন আমি নিশ্চয়ই যথাসাধ্য করব।’
“লাহিড়ীদা বললেন, ‘তুমি যে দোকান থেকে পাইপটা কিনেছ সেখানে খোঁজ করে এর আসল মালিক কে ছিল বের কর। আমি নিশ্চিত সে ব্যক্তি মৃত। তারপর চিন্তা করে দেখি কী করা যায়।’
“বাড়ি এসে স্নান-খাওয়া সেরে পাইপটা নিয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের সেই অ্যান্টিকের দোকানে এলাম। মালিক ভদ্রলোককে পাইপটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা বলতে পারেন, এই পাইপটা আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন?’
“ভদ্রলোক দেখেই বললেন, ‘হ্যাঁ, যার কাছ থেকে এটা নিয়েছিলাম তাকে চিনি। একটি বছর পঁচিশের ছেলে ডেনজিল, কলিন লেনে থাকে। ও আমার কাছে এই পাইপটা, কয়েকটা জার্মান সিলভারের ওয়াইন গবলেট আর একটা কাচের বেলজারে ঢাকা পেতলের টরসন পেন্ডুলাম ক্লক বিক্রি করেছিল।’
“আমি বললাম, ‘আমাকে ওর ঠিকানাটা বলতে পারেন?’
“ভদ্রলোক বললেন, ‘হ্যাঁ। আসলে আমি ওর বাবাকে চিনতাম। কাছেই হোটেল ওয়েলেসলিতে চাকরি করতেন, বছর তিনেক হল মারা গেছেন। ছেলেটির নাম ডেনজিল পিন্টো। ওরা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। ওর মার নাম ডেবোরা–কোনও একটা ফার্মে টাইপিস্ট ছিল। থাকে কলিন লেনে। বাড়ির নম্বর তেরোর এক না দুই–ঐ ধরনের কিছু। তেরো নম্বরটা মনে আছে।’
“আমি ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা হলাম কলিন লেনের খোঁজে। ওখান থেকে কাছেই, হেঁটেই যাওয়া যায়। খুঁজে খুঁজে তেরো নম্বর পাওয়া গেল, কিন্তু এখন সে এ, বি, না সি আবার দেখছি বাই এক, বাই দুই আছে। দুয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। বলতে পারল না। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, অলিভ রঙের হাঁটু পর্যন্ত হাফ প্যান্ট, একটা স্ট্রাইপড কলার দেওয়া টি-শার্ট পরা একটা স্টিক নিয়ে টুকটুক করে আসছেন। ওঁকেই জিজ্ঞাসা করলাম যে ডেনজিল বা ওর মা ডেবোরা কোন বাড়িতে থাকে। উনি বললেন, ‘ডেনজিলরা এখানে ছিল বটে, কিন্তু এখন তো কেউ থাকে না। ডেবোরা মারা যাবার পর ডেনজিল সবকিছু বিক্রি করে আফ্রিকা চলে গেছে। তাও একবছর হয়ে গেছে।’
“আমি খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। জিজ্ঞাসা করলাম যে ওদের কোনও আত্মীয়স্বজনকে উনি চেনেন কি না। তাতে বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটু ভেবে বললেন যে ডেবোরার মা রুবি গডফ্রে এ-বাড়িতেই বহুকাল ছিলেন। ডেবোরার বিয়ে হয়ে যাবার পর ডেবোরাকে এ-বাড়ি ছেড়ে দিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোডে লিটল সিস্টার অফ দা পুওরের অল্ড হোমে জয়েন করেন। সাপোর্টিং স্টাফ ছিলেন। তারপর থেকে ওখানেই থেকে যান।  মাঝে মাঝে আসতেন। বছর চার-পাঁচেক আর আসেন না। এখন আছেন কি নেই কে জানে।’
“কী আর করি। তবুও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি। প্রায় বিকেল চারটে। ওখান থেকে এলাম হোটেল হিন্দুস্থানের উলটো দিকে লিটল সিস্টার অফ দা পুওরের ওল্ড এজ হোমে। এখন অবশ্য ভিজিটিং আওয়ার্স, ঢুকতে অসুবিধা হল না। গেটে সই করে একতলায় একটা অফিস ঘরে এসে একজন সিনিয়র নানকে জিজ্ঞাসা করলাম রুবি গডফ্রের সাথে দেখা করা যাবে কি না। এতকাল বাদে হঠাৎ একজন রুবি গডফ্রের খোঁজে এসেছে যার এখন তিনকুলে কেউ নেই, কী ব্যাপার। আমি সংক্ষেপে দেখা করার উদ্দেশ্য বললাম, যেন আমি পাইপের বিষয়ে স্টাডি করছি। যাক, ভাগ্য সুপ্রসন্ন, বৃদ্ধা এখনও জীবিত, তবে খুব অসুস্থ। নান আমাকে একজন স্টাফকে দিয়ে ভেতরে পাঠালেন। দোতলায় উঠে করিডোরের প্রায় শেষের দিকে ঘর। তারই সামনের বারান্দায় হুইল চেয়ারে বসা এক বৃদ্ধা। খুব রোগা, গায়ের রঙ বেশ কালো। মাথায় পুরো সাদা চুল, ছোটো করে ছাঁটা। হাঁটুর বেশ খানিকটা নিচ অবধি কটন স্কার্ট আর একটা প্রিন্টেড কলার দেওয়া টপ শার্ট পরা। গায়ে মোটা চাদর জড়ানো, পায়ে মোজা, ঝিমোচ্ছিলেন। কানে হিয়ারিং এড লাগানো। আমাকে স্টাফ একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে দিল। আমি বৃদ্ধার জন্য একটা ফুলের বোকে আর কিছু মোসাম্বি, কমলালেবু নিয়ে এসেছিলাম। পেয়ে কী খুশি! এমনিতে তাঁকে দেখলাম বেশ সপ্রতিভ, শুধু হাঁটুর ব্যথার জন্য ডিসেবল্ড হয়ে গেছেন।
“এবার তাঁকে আমার ছোটো ব্যাগ থেকে পাইপটা বের করে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই পাইপটা কি আপনার কোনও রিলেটিভের? কারণ, আপনার নাতি ডেনজিল এটা দোকানে বিক্রি করে দিয়েছিল, আমি কিনেছি।’
“বৃদ্ধা পাইপটা দেখে প্রায় আঁতকে উঠলেন মনে হল। একটু উত্তেজিত হয়েই বললেন, ‘ও জেসাস! ও লর্ড! ওটা ফেলে দাও, ওটা ফেলে দাও! হেনরির সব জিনিস কার্সড।’
“যাই হোক, নানান প্রশ্নোত্তর শেষে বহু কথার মধ্য থেকে শেষপর্যন্ত যা উদ্ধার করলাম তাই আপনাকে বলি।
“রুবি তাঁর হাজব্যান্ড স্টুয়ার্ট গডফ্রে আর মেয়ে ডেবোরাকে নিয়ে ওয়েলেসলি স্ট্রিটে একটা বাড়িতে থাকতেন। প্রায় তিপ্পান্ন-চুয়ান্ন সালের কথা। স্টুয়ার্ট একটা স্টিভেডোর কোম্পানিতে কাজ করতেন। খুব বাজে লোক ছিলেন। যা রোজগার করতেন, মদ, জুয়া আর রেস খেলে উড়িয়ে দিতেন। সংসারে একপয়সাও দিতেন না। ড্রিঙ্ক করে এসে রুবিকে, ডেবোরাকে খুব মারধোর করতেন। রুবি একটা প্রাইভেট ফার্মে স্টেনো-টাইপিস্ট ছিলেন। একাই সংসার টেনে মেয়েকে মানুষ করছিলেন। মেয়ের বয়স তখন বছর পনেরো। এমন সময়ে বার্মা থেকে স্টুয়ার্টের কাকা হেনরি গডফ্রে  হঠাৎ চাকরি ছেড়ে এদেশে চলে আসেন এ-বাড়িতে। অবশ্য রুবির বিয়ের অনেক আগে হেনরি এ-বাড়িতেই থাকতেন। ওঁর আলাদা ঘর ছিল যেটা পরে রুবিরা ড্রইং রুম করেছিলেন। হেনরি আসাতে ঐ ঘরটা ছেড়ে দিতে হল। ওঁর সাথে দুটো বড়ো বড়ো স্টিলের ট্রাঙ্ক ছিল–একটা সবসময় একটা নাম্বার লক দিয়ে বন্ধ থাকত। ঐ পাইপটা হেনরির ছিল। সারাদিন কফি আর পাইপে কড়া তামাক খেতেন, কোথাও বেরোতেন না। প্রায়ই ড্রিঙ্ক করতেন, কিন্তু স্টুয়ার্টের মতন চেঁচামেচি বা কোনও ঝামেলা করতেন না। ওঁর ঘরে কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। খাবার সময় হলে কিচেনের মধ্যেই যে ছোটো খাবার টেবিল ছিল সেখানে চুপচাপ বসে খেয়ে চলে যেতেন।
“হেনরির হাঁপানি রোগ ছিল। প্রায়ই খুব কষ্ট পেতেন। রুবির সংসারে খাওয়াদাওয়া করতেন আর তার জন্য রুবিকে মাঝে মাঝে যা টাকা পয়সা দিতেন তাতে ওঁর হয়ে যেত। মাস দুয়েক পরে হেনরি জানালেন যে এখানে আর থাকবেন না, কানাডা চলে যাবেন। এদিকে স্টুয়ার্ট ওঁর কোনও চেনা জাহাজি লোকের কাছে শুনেছেন, হেনরি বার্মায় ইয়ানগনে কোন এক জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করতেন। ওখানে স্মাগলিং করে অনেক পয়সা করেছেন। সব টাকা সোনার বিস্কুট বানিয়ে, আরও কীসব অনৈতিক কাজ করে ওখান থেকে পালিয়ে এসেছেন। স্টুয়ার্ট ভাবলেন নিশ্চয়ই ঐ তালা দেওয়া ট্রাঙ্কে সোনার বিস্কুটগুলো আছে। কাকা আর ক’দিন বাঁচবেন? মরে গেলে তিনিই সব পাবেন। তিনি কাকাকে খুব তোয়াজ করতে লাগলেন। কিন্তু যখন স্টুয়ার্ট শুনতে পেলেন হেনরি কানাডা চলে যাচ্ছেন, ওঁর মাথাটা গরম হয়ে গেল। মুখে কাকাকে কিছু বললেন না।
“দিন দুই বাদে স্টুয়ার্ট রুবিকে বললেন, ‘কানাডা খুব ঠাণ্ডা জায়গা। কাকার হাঁপানি আছে। ওখানে গেলে কিন্তু বাঁচবে না।’
“এদিকে সেদিন সন্ধ্যায় হেনরির আবার হাঁপানির টান উঠল। স্টুয়ার্ট কাকাকে চেনা এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ইনজেকশন আর ওষুধের জোরে খানিকটা সুস্থ হলেন। তবে ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও স্মোকিং করা ছাড়লেন না। ইতিমধ্যে একজন এজেন্ট এসে হেনরিকে কানাডা যাবার কীসব কাগজপত্র দিয়ে গেল।
“একদিন রুবি স্টুয়ার্টকে দেখেন একটা বাটিতে অল্প জল দিয়ে বেশ কয়েকটা চুরুটের তামাক ভিজিয়ে রেখেছেন। জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, একটা হাঁপানির মেডিসিন বানাচ্ছেন, ওঁকে কোন এক ডাক্তার রেসিপি বলে দিয়েছেন। তারপর তিনি কী করেছেন রুবি জানেন না।
“পরদিন সন্ধেবেলা রুবির অফিসে ওভার-টাইম ছিল আর তার ওপর বাজার সেরে ফিরতে একটু রাতও হল। ডেবোরা কাছেই টাইপ স্কুলে টাইপ শেখে। ওর ফিরতে রাত হয়। রুবি এসে দেখেন হেনরির ঘর খোলা আর একটা গোঙানির মতন আওয়াজ আসছে। দরজার কাছে এসে দেখেন হেনরি বিছানায় বসে, সমস্ত শার্ট চুপচুপে ভেজা, মাথা গড়িয়ে, মুখ দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। বমি করার চেষ্টা করছেন আর মুখ দিয়ে কেবল লালা পড়ছে। হেনরি কথা বলতে পারছেন না, শ্বাস টানতে পারছে না। কোনওমতে জানালেন, কফি খেয়ে শরীর খুব খারাপ লাগছে। এসব দেখে রুবি খুব ভয় পেয়ে গেলেন। ভাবলেন পাড়ার কাউকে ডেকে আনেন। এই ভেবে রাস্তায় বেরোতেই দেখেন দূর থেকে স্টুয়ার্ট আসছেন। তাড়াতাড়ি গিয়ে স্টুয়ার্টকে নিয়ে ফিরে এলেন। স্টুয়ার্ট দেখে খুব একটা আমল দিলেন না। বললেন, ওটা বেশি স্মোকিং করেছেন বলে। ওঁর একে হাঁপানি, ডাক্তার তো মানা করেছিল, তা কাকা যদি কথা না শোনে ও কী করবে। স্টুয়ার্টের এরকম গা ছাড়া ভাবটা রুবির ভালো লাগল না। তাও জোর করে স্টুয়ার্টকে বললেন একজন ডাক্তার ডেকে আনতে।
“স্টুয়ার্ট কোথা থেকে এক হাতুড়েকে ধরে নিয়ে এলেন। সে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝল না, বলল হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তখন রাত্রি প্রায় দশটা। ঠিক হল, পরদিন সকালে আগে যে ডাক্তারকে দেখানো হয়েছিল তাঁকে ডেকে আনা হবে। উনি বললে ওঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।
“সকালবেলা রুবি হেনরির ঘরে গিয়ে দেখলেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। স্টুয়ার্ট ডাক্তারের বাড়ি চলে গেলেন। খানিক বাদে উনি এসে কিছুক্ষণ দেখে বললেন, ‘হি ইজ অলরেডি এক্সপায়ার্ড।’ রুবির কাছে আগেরদিনের ঘটনা শুনে বললেন হয়তো অতিরিক্ত ডিহাইড্রেশনের জন্য মারা গেছেন।
“রুবির খুব খারাপ লাগল। আরও খারাপ লাগল স্টুয়ার্টকে দেখে। ওঁর মধ্যে শোকের কোনও চিহ্ন নেই, বরঞ্চ একটা যেন খুশি খুশি ভাব। যাই হোক, পাড়ার অনেকে মিলে হেনরিকে নিয়ে গেল টালিগঞ্জের বেরিয়েল গ্রাউন্ডে। সেখানে ওঁকে সমাধিস্থ করা হল। রুবির খটকা লাগল। তিনি পরদিন সোজা স্টুয়ার্টকে জিজ্ঞাসা করলেন যে উনি হেনরিকে ঐ কীসব ওষুধ বানাচ্ছিলেন তা খাইয়েছিলেন কি না। স্টুয়ার্ট চমকে উঠে অস্বীকার করলেন আর তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
“পরেরদিন রুবি স্টুয়ার্টকে হেনরির ঘরে ঢুকে ওঁর ট্রাঙ্ক খুলে জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখতে পেলেন। রুবিকে দেখতে পেয়ে স্টুয়ার্ট তাড়াতাড়ি ট্রাঙ্ক বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওঁর হাতে তখন কয়েকটা একশো টাকার নোট। সেদিন ছিল শনিবার। স্টুয়ার্ট দু’জন ফ্রেন্ডের সাথে রেস খেলতে চলে গেলেন। সেদিন রাতেও আর ফিরলেন না।
“পরদিন খুব সকালবেলা আলিপুর থানা থেকে একটি লোক এসে জানাল যে স্টুয়ার্টের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, ওঁকে পি.জি. হাসপাতালে অ্যাডমিট করা হয়েছে। রুবি তাড়াতাড়ি ডেবোরাকে নিয়ে হাসপাতালে এলেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে কয়েকজন রুবির সাথে এসেছিল। স্টুয়ার্ট সকালবেলাই মারা গেছে।
“অ্যাক্সিডেন্টের কেস, সুতরাং পুলিশ এসে বডি পোস্ট মর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দিল। সেদিন আর কিছু হল না। রুবি স্টুয়ার্টের সাথে যে দু’জন রেস খেলতে গিয়েছিল পরে তাদের কাছে জানলেন যে রেসে তিনি অনেক টাকা জিতেছিলেন। রেসের পর ওরা একসাথেই ফেরে। স্টুয়ার্ট খুব ফুর্তিতে ছিলেন। ময়দানের কাছে রাস্তা বেশ ফাঁকা, তিনি আগে আগে যাচ্ছিলেন। রাস্তা যখন পেরোন তখন একটা বাস আসছিল। বাসটা বেশ দূরেই ছিল, তিনি অনায়াসে পেরিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু দাঁড়িয়ে গেলেন। বন্ধুরা ভাবল, বাসটা চলে গেলে পেরোবেন। বাসটা কাছে আসতেই উনি কীরকম হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেন। আর বাসটা ওর দুটো পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেল। কিছুটা পেছনেই একটা পুলিশের ভ্যান আসছিল। পুলিশই অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
“পরদিন স্টুয়ার্টের বডি টালিগঞ্জ সিমেট্রিতে হেনরির কবরের পাশেই কবর দেওয়া হল। রুবির বা ডেবোরার কারোরই স্টুয়ার্টের ওপর কোনও সহানুভূতি ছিল না। তাই ওঁর মৃত্যুর পর ওঁদের জীবনযাত্রা আগের মতন স্বাভাবিক চলতে লাগল। শুধু রুবির মনে মনে বিশ্বাস হল গড স্টুয়ার্টকে ওঁর পাপের শাস্তি দিয়েছেন। এরপর রুবি একদিন অফিস থেকে ফিরে হেনরির ঘরে কেমন গোঙানির শব্দ পান। কিন্তু ঘরে কেউ নেই। রুবি খুব ভয় পেয়ে ঘর তালাবন্ধ করে রাখেন। মাঝেমাঝেই তিনি এরকম গোঙানির শব্দ পেতেন। রুবি বাড়ি ছেড়ে দেবেন ঠিক করলেন।
“ইতিমধ্যে একদিন সকালবেলা রুবির অফিস যাবার আগে সি.আই.ডি থেকে পুলিশের দু-তিনজন লোক এল হেনরির খোঁজে। পুলিশ শুনল হেনরি মারা গেছেন। ওঁরা হেনরির ঘর সার্চ করল। তালা দেওয়া বাক্স ভেঙে ভেতর থেকে একটা পিস্তল, কিছু কাগজপত্র, আর একটা কাঠের বাক্সের ভেতর বেশ কিছু গোল্ড বার পেল। এসব জিনিস আর ওঁর বাইরে যাবার সব ডকুমেন্ট, ডেথ সার্টিফিকেট সব লিস্ট করে রুবিকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে গেল। রুবিকে আর বেশি জেরা করল না। পুলিশের কাছে রুবি যতটুকু শুনলেন তাতে বুঝতে পারলেন যে হেনরি কোনও একটা গর্হিত কাজ করে বার্মা থেকে পালিয়ে আসেন। ওদের একটা দল এখানে ধরা পড়েছে। তাদের কাছেই হেনরির সন্ধান পুলিশ পেয়েছে।
“সাতদিনের মধ্যে রুবি এ বাড়ি ছেড়ে কলিন লেনে বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে আসেন। বছর তিনেক বাদে ডেবোরা একটা চাকরি পায়। মাইকেল পিন্টো নামে একটি ছেলে হোটেলে কাজ করত। ওর সাথে ডেবোরার ফ্রেন্ডশিপ ছিল। ওকেই বিয়ে করে ওরা একসাথে কলিন লেনে থাকত। ডেনজিলের ছয়-সাত বছর বয়সের সময়ে রুবি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে লিটল সিস্টার্স অফ দা পুওরে জয়েন করেন। অফিসের যত ক্লারিক্যাল জব তিনি করতেন। তারপরে ওঁর কঠিন অসুখ হয়। পরে হাঁটুর প্রবলেম শুরু হয়। সেই থেকে এই ওল্ড হোমেই থাকেন। প্রথম প্রথম মাঝে মাঝে বাড়ি যেতেন। গত পাঁচ বছরে আর যাননি। অনেকদিন পর্যন্ত ডেবোরা আসত। ডেবোরার মারা যাবার খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে যান। এখন শুধু মৃত্যুর দিন গুনছেন। আমি বৃদ্ধাকে অনেক সান্তনা আর ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম।
“সেদিন রাতেই লাহিড়ীদার বাড়ি এসে তাঁকে আদ্যোপান্ত সব বললাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার কী মনে হয়? স্টুয়ার্টের মৃত্যু না হয় অ্যাক্সিডেন্ট, কিন্তু হেনরির মৃত্যু কি স্বাভাবিক?’
“লাহিড়ীদা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন। তারপর একটু মাথা নেড়ে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় ধীর গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘স্টুয়ার্টের মৃত্যু একটু অস্বাভাবিক। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন বাসটাকে যেতে দেবার জন্য। তিনি হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যান আর বাসটা ওঁর পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। প্রথম কথা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেউ কখনও হুমড়ি খেয়ে পড়ে না। সেরকম হলে বসে পড়তেন বা সামনে পড়ে যেতন আর তাতে করে বাস ওঁর মাথা বা গায়ের ওপর দিয়ে যেত। পায়ের ওপর দিয়ে বাস যাওয়ার অর্থ তিনি খানিকটা এগিয়ে গিয়ে পড়েছেন অর্থাৎ, কেউ যেন পেছন থেকে ঠেলা মেরেছে। কিন্তু কে ঠেলা মারবে? ওঁর সঙ্গীরা অনেকটা পেছনে ফুটপাথে ছিল। তাছাড়া পেছনে পুলিশের ভ্যান ছিল। সেক্ষেত্রে পুলিশের নজর নিশ্চয়ই এড়াত না।’
“আমি বললাম, ‘আচ্ছা আত্মহত্যাও তো হতে পারে। তিনি বাসের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, বাস কাছে আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন, আর তাতে করে একটু এগিয়ে যেতেই পারেন।’
“লাহিড়ীদা একটু চিন্তা করে বললেন, ‘সেটা হতেই পারে। তবে এক্ষেত্রে বড়ো প্রশ্ন, লোকটা শুধু শুধু আত্মহত্যা করতে যাবেন কেন? বক্তব্য অনুসারে তিনি অনেক টাকা জিতেছিলেন আর ফুর্তিতেই ছিলেন। তাছাড়া ওঁর বিশ্বাস হেনরির ট্রাঙ্কে বেশ কিছু সোনার বার আছে। সেগুলো তিনিই পাবেন। তাই এখন আত্মহত্যা করার কোনও অর্থই নেই। সুতরাং স্টুয়ার্টের মৃত্যু অন্তত আমার বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা মিলছে না।’
“আর হেনরির?’
“হেনরির মৃত্যু পরিকল্পিত খুন। নিকোটিন বিষপ্রয়োগ। হেনরির যা উপসর্গ বললে অর্থাৎ প্রচুর ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব, মুখ দিয়ে লালা পড়া, শ্বাসকষ্ট সেটা বেশিমাত্রায় নিকোটিনের বিষক্রিয়া। আর সেটা ঠিক কফি খাওয়ার পরেই হয়েছে। কফিতে নিকোটিন থাকে না, থাকে ক্যাফাইন, যদি না আলাদা করে নিকোটিন মেশানো হয়। অবশ্য নিকোটিনের মতন ক্যাফাইনও সমান ক্ষতিকারক। আমরা সাধারণত যে কফি বানাই, ধরো একটা বড়ো কাপ একশো পঁচাত্তর মিলি লিটার, তাতে নেসকাফে ইনস্ট্যান্ট কফি কোম্পানির মতে পঁয়ষট্টি মিলিগ্রাম ক্যাফাইন থাকে। আর ক্যাফাইনের লেদাল ডোজ, অর্থাৎ যে পরিমাণ দিলে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে, বলা হয়ে থাকে কম করে দশ গ্রাম। তেমনি একটা সিগারেটে নিকোটিন থাকে এক থেকে প্রায় দুই মিলিগ্রাম, একটা চুরুটে থাকে গড়ে প্রায় তেরো মিলিগ্রাম আর পাইপে যা তামাক ধরে তাতে নিকোটিন থাকে গড়ে পাঁচ মিলিগ্রাম। সেখানে একটা অ্যাডাল্ট মানুষের পক্ষে নিকোটিনের লেদাল ডোজ হচ্ছে ষাট মিলিগ্রাম। তবে হ্যাঁ, সিগারেটের বা চুরুটের সব নিকোটিন তো আর শরীরে শুষে যাচ্ছে না। তাই শুধু একটা দুটো সিগারেট বা সিগার খেয়ে লোকে সাথে সাথে মরে যায় না। তবে নিকোটিন বড়ো সাংঘাতিক বিষ। দীর্ঘদিন ধরে খেতে খেতে শরীরের ক্ষতি তো হয়ই, হার্ট অ্যাটাক আর ক্যানসারের রিস্কও আছে। এবার আলাদা করে নিকোটিন যদি শরীরে ঢোকানো হয় মৃত্যু তো সাথে সাথে হতেই পারে যদি সময় মতন চিকিৎসা না হয়। কফি থেকে ক্যাফাইন এক্সট্রাক্ট করা সহজ নয়, রীতিমতো ভালো ল্যাবরেটরি লাগবে। সেক্ষেত্রে তামাক থেকে নিকোটিন এক্সট্রাক্ট করা খুবই সহজ। বেশ খানিকটা তামাক দশ-বারো ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে, ছেঁকে নিয়ে, ফুটিয়ে ঘন করে নিকোটিন বের করে নেওয়া যায়। রুবি স্টুয়ার্টকে দেখেছিলেন চুরুটের তামাক ভেজাতে। নিশ্চয়ই স্টুয়ার্ট নিকোটিন বের করে কফিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। হেনরির ব্লাড, ইউরিন টেস্ট করলেই ধরা যেত।’
“এবার আমি বললাম, ‘তাহলে লাহিড়ীদা, এখন আমার কর্তব্য কী?’
“লাহিড়ীদা আবার খানিক ভেবে বললেন, ‘আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে তোমার স্বপ্নে দেখা ঐ কোট-প্যান্ট পরা ঢ্যাঙা লোকটা হেনরির প্রেতাত্মা। নিজের পাইপের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। আমি বলি কী, তুমি ঐ পাইপটার সঙ্গ ত্যাগ করো। একটা কাজ করো। তুমি টালিগঞ্জ সিমেট্রিতে গিয়ে হেনরির কবর খুঁজে বার করো। কবরের পাশে ঐ পাইপেরও কবর দিয়ে এসো। হেনরি হয়তো খুশি থাকবেন। দেখাই যাক না কী হয়। তাতে যদি কোনও পরিবর্তন না হয়, তবে না হয় আরেকদিন গিয়ে পাইপটা আবার তুলে নিয়ে চলে আসবে।’
“পরদিন রবিবার। আমি সকাল সকাল নরমুণ্ডের পাইপটা নিয়ে টালিগঞ্জ সিমেট্রিতে এলাম। কেয়ারটেকার ভদ্রলোককে তিপান্ন-চুয়ান্ন সালে মৃত হেনরি গডফ্রের কবরের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ভদ্রলোক তো অবাক। কেউ কস্মিনকালেও খোঁজ করতে আসেনি। যাক, রেজিস্ট্রি খাতা খুলে অনেক খুঁজে খুঁজে পাওয়া গেল হেনরি গডফ্রে আর স্টুয়ার্ট গডফ্রের নাম। কোন প্লটে কবর জেনে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ খুঁজতে খুঁজতে একটা জায়গায় দেখলাম পাশাপাশি অনেকগুলো ক্রস পোঁতা আছে। একটা ক্রসের পায়ের কাছে রয়েছে ভাঙা ইটের চৌকো ছোট্ট বেদি। তাতে সিমেন্টের ওপরেই খোদাই করে লেখা হেনরি গডফ্রে, কোনওমতে পড়া গেল। পাশেরটা মনে হয় স্টুয়ার্টের। শ্যাওলা পড়ে আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না। যাই হোক, আমি একটা ছোটো খুরপি নিয়ে এসেছিলাম। সেটা দিয়ে মাটি খুঁড়ে পাইপটা পুঁতে দিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিলাম। গোটা কয়েক মোমবাতি নিয়ে এসেছিলাম, জ্বালিয়ে দিয়ে মনে মনে বললাম, ‘তোমার জিনিস দিয়ে গেলাম, আর বাপু আমাকে উৎপাত কোরো না।”
এই বলে ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। আমি উদগ্রীব হয়ে আছি, তারপর কী হল। কিছু বলছেন না দেখে আমি খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম, “তারপর? আপনার ঐ স্বপ্ন দেখা, ঘুম ভেঙে যাওয়া আর মাথাধরা? যার জন্য এত কাণ্ড?”
ভদ্রলোক আমার দিকে চেয়ে কেমন অদ্ভুত রহস্যময় হাসি হেসে ধীরে ধীরে বললেন, “দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, হোরাশিও… সেই রবিবার দিন থেকে আজ তো দশ বছর হয়ে গেল। ঐ স্বপ্নও দেখিনি, ঘুমও ভাঙেনি, আর মাথাও ধরেনি।”
বাবা! গল্পে গল্পে রাত দেড়টা গেজে গেছে। ভদ্রলোক বললেন, “নাহ্‌, এখন শুয়ে পড়ুন। আমাকেও আবার খুব সকালে চাঁপায় নামতে হবে।”
আলো নিভিয়ে দু’জনেই শুয়ে পড়লাম। শুধু নীল একটা নাইট ল্যাম্প জ্বলতে লাগল। ভদ্রলোকের অদ্ভুত কাহিনির কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি জানি না।


তিন


পরদিন ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়, প্রায় সাড়ে আটটা। ট্রেন তখন বিলাসপুরের প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার মানে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেটে চলছে। পাশের বার্থ খালি। বুঝলাম, ভদ্রলোক তাঁর গন্তব্যস্থল চাঁপাতে নেমে গেছেন। ঘুমোচ্ছিলাম বলে আমাকে আর ডিস্টার্ব করেননি। বাথরুম গিয়ে ব্রাশ করে, চোখমুখ ধুয়ে কামরায় এলাম। প্যান্ট্রিকারের উর্দি পরা বেয়ারা ট্রেতে করে ব্রেকফাস্ট রেখে গেল। সেই চির পরিচিত ব্রেড-বাটার, ওমলেট, একটা ভেজিটেবল কাটলেট আর ফ্লাস্কে গরম জল, টি-ব্যাগ, সুগার প্যাকেট। ঐ শুধু ওমলেটের জন্য নন-ভেজ ব্রেকফাস্ট। আমি অবশ্য দুটো নেসকাফের স্যাশে নিলাম।
খেতে খেতে জানালা দিয়ে বাইরের শোভা দেখছি। ট্রেন এখন বেশ স্পিড নিয়েছে। এখনও প্রায় একটা দিন কাটাতে হবে। রায়পুর পৌঁছলে একটা নিউজ পেপার কিনতে হবে। আপাতত কালকের কেনা ‘ইন্ডিয়া টুডে’টা পড়া যাক। বেডের পাশে জালি দেওয়া পকেটে রেখেছিলাম। বার করতেই দেখি একটা সাদা কাগজ, ভাঁজ করা। এটা আবার কী? কোত্থেকে এল? কাল তো ছিল না। হঠাৎ মনে হল, তবে কি ভদ্রলোক ওঁর নাম, ঠিকানা-টিকানা সব লিখে রেখে গেলেন? তাড়াতাড়ি খুলে দেখলাম মুক্তোর মতন হস্তাক্ষরে লেখা–
গেল বছর ঠিক এই দিনেই হাওড়া-মুম্বই মেলের এই ফার্স্ট ক্লাস কামরায় অফিসের কাজে চাঁপা যাচ্ছিলাম। সেদিন অবশ্য আমি একাই ছিলাম। কী করব বসে বসে, একটা আস্ত সিগার শেষ করেছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। সমস্ত শরীরটা কেমন অস্থির অস্থির করছে। সারা মাথা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। একটা বমি বমি ভাব। কোনওমতে টলতে টলতে বাথরুমের দিকে গেলাম। বাইরে বেসিন থেকে জল নিয়ে সমানে মাথায়, মুখে দিতে লাগলাম। টি.টি.ই বোধহয় লক্ষ করেছিল। বলল, “কী হল স্যার, শরীর খারাপ লাগছে?” আমি আর জবাব দিতে পারলাম না। বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। ওই আমাকে ধরে ধরে কামরায় নিয়ে এল। সিট অবধি আর যেতে হয়নি। তার আগেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। পরে যখন একটু জ্ঞান ফিরল আবছা মনে হল আমার দেহটা ধরাধরি করে চাঁপা স্টেশনে নামানো হচ্ছে। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু ঐ জ্ঞান আমার আর ফিরে আসেনি। বলছিলাম না, নিকোটিন বড়ো সাংঘাতিক বিষ! আমার একটা অনুরোধ, স্মোকিং করাটা ছেড়ে দিন ভাই।
ত্রিদিব নারায়ণ রক্ষিত


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

5 comments:

  1. গল্পটা দারুন, শেষ মেসেজ টা আরো ভালো

    ReplyDelete
  2. রহস্য ও রোমাঞ্চে ভরা চমৎকার একটি গল্প৷ পাইপ ও সিগার সম্বন্ধে কতোকিছু যে জানতে পারলাম৷গল্পের শেষে 'টুইষ্ট'টাও চমকপ্রদ আর সামাজিক বার্তার উপস্হাপনাও বেশ ভালো৷

    ReplyDelete
  3. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  4. An excellent story full of thrill and mystery. Wonderful and very touchy ending. One can also gain versatile knowledge about smoking, cigars, pipes etc.

    ReplyDelete
  5. Good thrilling story with a interesting twist at the end.

    ReplyDelete