স্মৃতির প্রজাপতিরাঃ স্মৃতিতে দুর্গাপূজাঃ দীপঙ্কর চক্রবর্তী



‘ওই গাছের পাতায়, রোদের ঝিকিমিকি,
আমায় চমকে দাও, চমকে দাও, দাও, দাও, দাও’
আগেরগুলো মনে করতে পারছি না, এই শ্রাবণ মাসটা একটু অন্যরকম লাগছে। আকাশটা ঝলমলে নীল হয়ে এই হাসে তো এই মুখভার। মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরিতে কখনও ঘন কালো মেঘ, কখনও সাদা। আবার এই বুঝি নামে ঝুপ বৃষ্টি! নস্টালজিক।
আগে শরত আসত ষড়ঋতুর হাত ধরেই। তাছাড়া সব ঋতুই সময়ে স্বমহিমায় আবির্ভূত হত। ঋতুর পালাবদলে ঋতুচক্রকে বড়োই ঐশ্বর্যময়ী, অপূর্ব আর প্রাণবন্ত মনে হত তখন। উপলব্ধিতে অনুভব হত উপস্থিতি। এখন কিছু বৃষ্টি, দিন বিশেকের মতো শীত ছাড়া বাকি সময়টা গরম আর শুধুই গরম। উষ্ণায়ন, নিম্নচাপ বা যাই হোক না কেন, আজ কিছু বছর ধরে ঋতু পরিবর্তনের হিসাবটা ক্যালেন্ডারের পাতা দেখেই বুঝতে হয়।
কিন্তু এই বছর, এই সময়ে স্বচ্ছ নীল আকাশে ভেড়ার পালের মতো শ্বেত-শুভ্র মেঘমালা দেখলে মনে হয় শরৎ বুঝি সময়ের আগেই চলে এসেছে। মতিভ্রম কি না জানি না। শ্রাবণের এই আকাশের নানা রূপ আমায় সত্যিই ভাবিয়ে তুলছে। ভাবনায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফ্ল্যাশব্যাকে। মনে করিয়ে দিচ্ছে শিউলির মনমাতানো স্নিগ্ধতা আর অন্যান্য ফুলের সুবাসে চারদিক ম ম করার কথা। সকালবেলা দলবেঁধে ফুল কুড়োতে যাওয়ার কথা। চারদিকে সবুজ, সবুজ আর সবুজের কথা। এক সবুজ পৃথিবীর কথা।
বাড়ির সামনে, পথের ধারে, পুকুরের পাশে যেমনি ছিল চাঁপা, করবী, অপরাজিতা আর পলাশ, গাঁদা ফুলের গাছ, তেমনি ছিল আগাছা নানান বুনোফুলের ঝাড়, রাস্তায় দু’পাশে কত নাম না জানা ফুলের সমারোহ!
তিন যুগের অধিক সময়ের আগের কথা। পোদ্দারদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তজীতকাকু। এমনিতে ওঁর বাড়ি বিশালগড়ের অফিসটিলায় হলেও, চাকরিসূত্রে থাকতেন আমাদের গ্রামেই। সেই আমলে পোদ্দারদের বাড়িটা ছিল আমাদের গ্রামের সুপ্রাচীন বাড়িগুলোর মধ্যে নামকরা একটা। বাঁধানো পুকুরঘাট, সামনে বিশালাকৃতির খেলার মাঠ, অনেকগুলো ঘর সহ একটা ঠাকুরঘর। নিচে ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে চলা আঁকাবাঁকা রাস্তা গিয়ে মিশেছে নদীর সাথে। বাড়ির উঠোন, রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিছন্ন এবং চারদিক সবুজে মোড়া। সেই বাড়িরই আরেকটা ঘরের মধ্যে টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে চলত প্রতিমা তৈরির কাজ। কাকুকে অফিস থেকে আসার সময় মাটি নিয়ে আসতে দেখলেই আমরা অনেকেই সন্ধ্যায় খেলা শেষে মাঠ ছেড়ে ছুটে যেতাম প্রতিমা বানানোর কাজ দেখতে।
নদীতে স্নান করতে কিংবা সাইকেলে ‘রানির চর’-এ গেলেই ছুটতাম কাশবনের দিকে। ফুল দেখলেই আমরা বুঝে নিতাম পুজো এসে গেছে। ফুলের দোলা দেখলেই মনে হত পুজোর আর বেশি দেরি নেই।
তারপর আসত কুয়াশাচ্ছন্ন মহালয়ার ভোর। ভোরের পুণ্যতিথিতে কাকভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সুললিত কণ্ঠে মহালয়ার স্তোত্রপাঠে আবছা সকালের আকাশে-বাতাসে একটা অদ্ভুত আমেজের সৃষ্টি হত। আমরা ঘুম থেকে ওঠে এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়তাম।
তখন গ্রামে যে কয়টা পুজো হত, এর মধ্যে আজকের দিনের ধর্মান্ধতার, সংকীর্ণতার খেলার মাঝে একটা পুজোর কথা ভাবলে একটু অবাকই লাগে।
আমাদের গ্রামেরই একটা ক্লাবে দুর্গাপুজোর সেক্রেটারির নাম ছিল রবিউল আলম। আমার সাথেই পড়ত। পুজোয় প্রসাদের বিশেষ ব্যবস্থা করে রাখত। বাড়ি থেকে অনেকটা দূর হলেও, আমি, আশিস আর তার ছোটো দুই যমজ ভাই মিলে ক্যাপ-বন্দুক ফাটাতে ফাটাতে প্রসাদ খেতে যেতাম দুপুরে। এই ক্লাবেরই ক্যাশিয়ারের নাম মফিজ মিঞা, সভাপতি আলমগীর হোসেন, আবার কখনও বা কানা ভূঁইয়া। আর কার্যকরী সদস্যের নামের তালিকায় যদি আক্তার হুসেনের নাম না থাকত তবে গণ্ডগোল নিশ্চিত জানত সবাই। আসলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের যোগদানে পুজো উদযাপনের আনন্দ দ্বিগুণ বেড়ে যেত।
আমাদের বাড়ির পাশেই পাড়ায় পুজোয় মাইকে নানান গান বাজত। সেই গানের তালে অজিতদার নাচের কথা আজো মনে আছে। মনে আছে ঢাকি নট্ট কাকুর ঢাকের তালে তালে আমাদের কোমর দোলে ওঠার কথা। পূজার আনন্দ আর গান বা ঢাকের তালে নাচ, সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে কাঁধে ঢাক নিয়ে বাবার বাজানোর কথাও কোনওদিনই ভোঁলার মতো নয়।
এখন রেডিমেড এবং অনলাইন শপিংয়ের চল বেশি। ফলে পুজোয় নতুন জামাকাপড়ের আনন্দটা সেরকমভাবে অনুভব করি না। তখন সুধন্য খলিফা নামে এক কাকু ছিলেন। তিনি নিত্যনতুন স্টাইলে আমাদের দু’ভাইকে পুজোর জামা-প্যান্ট বানিয়ে দিতেন। পোশাকগুলো কবে পাব, সেই আশাতেও অনেক আনন্দ লুকিয়ে ছিল। হাতে পেলেই সেগুলোকে পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নানান ভঙ্গিমায় দেখে, খুব যত্ন করে নিজ দায়িত্বে কাঠের আলমারিতে তুলে রাখতাম।
পুজোয় খাওয়াদাওয়ার কোনও ঠিকঠিকানা থাকত না। বুট, বাদাম, চকলেট, মিষ্টি, খিচুড়ি, লাবড়া যেখানে যখন যাই পেতাম তাই খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতাম। একবার পুজোয় বাবার সাথে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে গলা অবধি খেয়ে শেষমেশ প্যান্টের হুক, চেইন খুলে দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে ওঠে দাঁড়ানোর কথাটাও মনে পড়ল এখুনি।
আসলে পুজোর এই চার-পাঁচটা দিন যে কী করে কেটে যেত, বুঝতেই পারতাম না। বিসর্জনের সকাল থেকে মনখারাপ শুরু হত। ক’দিন বাদেই আবার সেই একঘেয়ে বই নিয়ে বসার নাটক চালু।
শৈশব-কৈশোরে একবারও আগরতলায় পুজো দেখা হয়নি। মা-বাবা-ভাই-বোন মিলে বেড়াতে এসেছিলাম কয়েকবারই। কিন্তু পুজোতে কখনওই আসিনি। ইস্কুল জীবন শেষ করে কলেজে পড়ার সময়ই প্রথম পুজো দেখেছিলাম। প্রত্যেকবার আসার সময় বাড়ি থেকে চাল আর কেরোসিন তেল দিয়ে দিত সঙ্গে। পুজোর ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে ঠিক করলাম গ্রামের ছোটোবেলার বন্ধুদের নিয়ে একদিন শহরের পুজো দেখার। সেই অনুযায়ী চাল-তেল নিয়ে ছয়জন মিলে সপ্তমী দিন সকালে বাড়ি থেকে আগরতলায় এসে বটতলার বাংলা বাজার থেকে ছয়টা সানগ্লাস কিনে ভাড়াবাড়িতে চলে গেলাম। ভাড়া থাকতাম কলেজটিলার একটা বাড়ির ছোট্ট একটা ঘরে। ঠিক করে বসতেও পারছিল না সবাই। তাড়াতাড়ি স্টোভে চাল-আলু সেদ্ধ করে খেয়েদেয়ে সবাই মিলে বেলবটমের প্যান্ট, হাই হিল বুট জুতো পরে গেলাম ‘চিত্রকথা’য় সিনেমা দেখতে। ম্যাটিনি শো। সিনেমা শেষে হল থেকে বেরিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। তখন হলের পাশের একটা দোকানে অসাধারণ চানাচুর বিক্রি করত একজন। এর আগেও একদিন খেয়েছিলাম। আমরা গেলাম সেই দোকানের সামনে। দোকানে তখন সাংঘাতিক ভিড়। কার আগে কে খাবে, এই নিয়ে হুড়োহুড়ি। দোকানের সামনেই টিকিট ঘর। সেখানেও লম্বা লাইন। দু’জন ব্ল্যাকার ‘এই ব্যালকুনি, ব্যালকুনি, ফাস ক্লাস, ফাস ক্লাস’ বলে চেঁচাচ্ছে। এর মধ্যেই হঠাৎ এক দারোগার আগমনে সবাই বলছে, ‘রঙ্গ আইয়ে রে!’ মুহূর্তেই পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়ে গেল। আমরাও চানাচুর নিয়ে চোখে কুচকুচে কালো রোদ-চশমা লাগিয়ে চলে রাতের আগরতলায় প্রথম পুজো দেখতে এগিয়ে গেলাম চলমান সংঘের পুজো প্যান্ডেলের দিকে।
সেখান থেকে বেরিয়ে নেতাজী প্লে সেন্টার, স্মৃতি ক্লাব, ভেনাস হয়ে, অশোকা রেস্টুরেন্টে গেলাম মোগলাই খেতে। রাত দশটা প্রায়। তখনও কুচকুচে কালো রোদ-চশমাগুলো আমাদের চোখেই ছিল। আমাদের দেখে মানুষ হেসেছে। ইয়ার্কি মেরেছে। অনেকে জয়বাংলার রোগী বলে ডেকেছে। তবুও খুলিনি গ্লাস। খাওয়ার শেষে শান্তিপাড়া, চিত্তরঞ্জন হয়ে বাড়ি ফেরা অবধি সানগ্লাস চোখেই ছিল। এমনকি রাতে যে সানগ্লাস পরের রীতি নেই, সেকথা জানার পরেও খুলিনি। এখন কথাগুলো মনে হলে হাসি পায়। একা একাই হাসি।
আসলে মনের দর্পণে যখনই পুজোর কথা এসে হাজির হয়, স্মৃতির পাখায় ভর করে আমি যেন শৈশবের সেই দিনগুলোতে, সেই সোনালি অতীতে ফিরে যাই। মহালয়ার ভোর থেকে শুরু হত যে আনন্দ, ইস্কুল মাঠ থেকে দশমীর মাঝরাতে বাড়ি ফেরার পরই সমাপন হত এর।
পুজো মানেই আমার কাছে আগামী একবছরের প্রাণবায়ু শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভরে নেওয়া প্রস্তুতি। মনে আছে এখনও, ছোটোবেলায় বাবার বকুনি খেয়ে বা অন্য যেকোনও কারণেই যদি মনখারাপ হত কখনও, তাতে এই পুজোর কথা ভেবে ভেবেই মনকে শান্ত করতাম। পুজো মানে পুজোই! বিকল্প নেই। তাই যদি বলি এখনও এই অশান্ত মনকে শান্ত করতে কিংবা জীবনযুদ্ধের শক্তি সঞ্চারে এই পুজো আমায় ভীষণভাবে উদ্দীপিত করে, তাহলেও ভুল বলা হবে না।
এখন আর গ্রামে যাওয়া হয় না। সময় মেলাতে মেলাতেই হুশ করে চলে যায় চারটে দিন। এর মধ্যে নো-এন্ট্রি, ভিড়, এলাহি সব ব্যাপার-স্যাপার।
আনন্দ এখনও হয়, করি। কিন্তু একটা বিষয় অনুভব হয়, সেই সময়ে পুজো এখনকার মতো এত জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও আনন্দ ছিল ষোল আনা খাঁটি নির্মল নির্ভেজাল। সে আনন্দের অমূল্য, তুলনা হয় না।
আজ পুজো নিয়ে এলোমেলো এই ভাবনাগুলো মনের দর্পণে প্রতিফলিত হতেই ফিরতে শুরু করি একটি ঘোরের মধ্যে দিয়ে। আসলে জীবনের সামান্য যা কিছু আলো সঞ্চয় হয়েছে মাধুকরীর ঝুলিতে, তাতে শৈশবের সেই পুজোর দিনগুলোর আলোককণায় আলোকিত হয়ে বেঁচে থাকব যতদিন, ভুলতে পারব না আমি সেসব দিন।

দীপঙ্কর

৩০শে জুলাই,২০১৯

No comments:

Post a Comment