রূপকথাঃ আশার আলোঃ দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী



জাপান দেশে এক চাষির এক ফুটফুটে মেয়ে ছিল। ঠাকমা তার  নাম রেখেছিল নোজোমি। মানে, আশা। কিন্তু জন্মের পরই সে মাকে হারায়। বাবার কাছে বড়ো হতে থাকে নোজোমি। নোজোমির নামের মতো তার ছিল বড়ো বড়ো আশা। রাতদিন স্বপ্ন দেখত সে। তার বাবা বলত, “বেশি আশা করতে নেই রে মা, তাতে মানুষ দুঃখ পায়।”
কিন্তু নোজোমি সেকথা শুনত না। সে তার ইচ্ছেগুলোকে নিয়েই বেঁচে থাকত। সে তার বাবাকে ঘুম থেকে উঠেই বলত, “একদিন আমাদের বাগানে অনেক গোলাপ ফুটবে দেখো বাবা।” “একদিন আমরা খুব সুন্দর একটা বাড়িতে থাকব দেখো বাবা।” “একদিন রাজার বাড়ি থেকে আমাদের নেমন্তন্ন আসবে দেখো বাবা।”
বাবা-মেয়ে মিলে তারা বাগানের খুব যত্ন করত। একদিন সত্যিই তাদের গোলাপ-বাগান আলো করে থরে থরে অনেক গোলাপ ফুটল। নোজোমি বলল, “দেখলে তো বাবা, আমার কথা সত্যি হল।”
পরের দিন চাষির বাড়িতে রাজপেয়াদায় ঠকঠকায়।
“রাজকন্যের জন্মদিন তাই রাজা চেয়েছেন পাঁচ ঝুড়ি গোলাপ ফুল।
আজই নিয়ে আসবি।
না যেন হয় ভুল।”
নোজোমি মহা খুশি হয়ে বলল, “দেখলে তো বাবা, আমার কথা সত্যি হল। রাজার বাড়ি নেমন্তন্ন আমাদের।”
গোলাপ ফুলের ঝুড়ি নিয়ে বাপ-মেয়ে তখন রাজবাড়ি চলল।
সে এক মস্ত প্রাসাদ। আকাশে কোথায় তার মাথা ঠেকেছে ঠাহর করা যায় না।
ফুলের ঝুড়ি নিয়ে সুন্দরী রাজকন্যের পায়ের কাছে রাখতেই ফুলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল মস্ত একটা সাপ। রাজা তো তক্ষুনি সেপাই ডেকে সাপটাকে বন্দি করলেন। আর রেগে আগুন হয়ে বললেন, “ওই চাষাকে আর তার মেয়েকে এক্ষুনি বন্দি করে নির্জন দ্বীপে পাঠিয়ে দাও।”
রাজার সৈন্যরা তাই করল। বহুদূরের একটা জনমানবশূন্য দ্বীপে ছেড়ে এল ওদের।
চাষি কপাল চাপড়ে কাঁদতে শুরু করল। নোজোমি বলল, “কেঁদো না, বাবা। জীবন তো শেষ হয়ে যায়নি। এই দ্বীপে নিশ্চয়ই কোথাও সুন্দর ফলের গাছ থাকবে।”
দ্বীপের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তারা সত্যিই একটা লাল ফলের গাছ দেখতে পেল। থোকা থোকা আঙুরের মতো দেখতে ফলগুলো। চাষি তার মেয়েকে বলল, “খিদে তো মিটবে, কিন্তু আমরা বাড়ি কী করে ফিরব?”
নোজোমি বলল, “চিন্তা কোরো না বাবা, এক্ষুনি কোনও জাহাজ এসে আমাদের নিয়ে যাবে।”
অমনি তারা দেখতে পেল দূর থেকে একটা পালতোলা জাহাজ আসছে। কিন্তু তারা বোঝেনি, জাহাজটা ছিল জলদস্যুদের। তারা নোজোমি আর তার বাবাকে ধরে বেঁধে জাহাজে তুলল। তারা ছিল নরমাংসভোজী। জাহাজের মধ্যে অনেক মানুষের হাড়গোড়ের স্তূপ ছিল তাই।
লাল লাল ফলগুলো তারা কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলল। ওদিকে নোজোমি আর তার বাবার খিদে-তেষ্টায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তবে সেই লাল ফলগুলো ছিল বিষাক্ত। একজন দস্যুরও প্রাণ বাঁচল না। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মারা পড়ল।
তখন সেই সোনাদানা বোঝাই জাহাজ নিয়ে নোজোমি আর তার বাবা তাদের রাজ্যে ফিরে এল। ভারি সুন্দর একটা বাড়ি হল তাদের যেমনটি নোজোমি স্বপ্নে দেখেছিল। সেই বাড়ির নাম তারা রাখল ‘কিবো নো হিকারি’ーআশার আলো।


_____

2 comments: