বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ কলার খোসার পিচ্ছিলতার রহস্যঃ সুজিতকুমার নাহা

কলার খোসার পিচ্ছিলতার রহস্য


সুজিতকুমার নাহা


পিচ্ছিলতার বিচারে যে কলার খোসা যে অন্যসব ফলের খোসার তুলনায় অনেক এগিয়ে, সেই ব্যাপারে একমত হবেন সকলেই। তাই আপেল কিংবা কমলালেবুর খোসায় পা না পিছলোলেও কলার খোসার ওপর পা পড়লে প্রায় নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে পা হড়কে পড়ে যাবার থাকে আশঙ্কা। তবে পিচ্ছিলতার বিষয়টা বুঝতে হলে প্রথমে ‘ঘর্ষণ’ (friction) নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা সেরে নিতে হবে।
ধরা যাক, টেবিলে রাখা একটা বইকে ইচ্ছে হল নড়াতে। বইটার ওপর বলপ্রয়োগ শুরু করলাম। বল ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকলে একসময় বইটা নড়তে আরম্ভ করবে। এজন্য যে পরিমাণ বল লাগল তাকে যদি বইয়ের ওজন দিয়ে ভাগ করি তবে পাব বই ও টেবিলের পারস্পরিক ‘ঘর্ষণ গুণাঙ্ক’ (coefficient of friction)। বোঝাই যাচ্ছে ঘর্ষণ গুণাঙ্কের মান যত কম হবে, একটা বস্তুকে অন্য বস্তুর ওপর দিয়ে সরানো হবে ততই সহজ। চেনা বস্তুদের পারস্পরিক ঘর্ষণ গুণাঙ্কের মান সম্পর্কে এবার কিঞ্চিৎ ধারণা করে নেওয়া যাক।
জুতোর রবারের সোল ও মেঝের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক 0.412। গুণাঙ্ক এত অধিক বলে জুতো পড়ে রাস্তা, ফুটপাত বা বাড়ির ভেতর চলাফেরা করা খুবই নিরাপদ ব্যাপার। মোজা পরিহিত পা আর কাঠের মেঝের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক 0.23 হওয়ায় এক্ষেত্রেও নেই পিছলে পড়ার ভয়। তবে ঘর্ষণ গুণাঙ্ক আরও কম হতে থাকলে পা হড়কাবার সম্ভাবনাও বাড়তে থাকবে। রবার সোলের জুতো আর বরফের বেলায় মান 0.15 হওয়ায় বলা যায়, কেসটা যথেষ্ট ‘পিচ্ছিল’! রবার সোলের জুতো পড়ে বরফের ওপর দিয়ে পদচারণা করা তাই প্রভূত ঝুঁকির কাজ!
এসবের তুলনায় অবশ্য কলার খোসার কেসটা অনেক বেশি বিপদের, কেননা কলার খোসা ও মেঝের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক মাত্র 0.07! অর্থাৎ বরফের চেয়ে দ্বিগুণেরও অধিক পিচ্ছিল কলার খোসা! পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঘর্ষণ গুণাঙ্ক 0.1 থেকে কম হলে প্রায় নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে ভয় থাকে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার।
এবার জানা যাক কলার খোসার পিচ্ছিলতার পেছনে রয়েছে কাদের হাতযশ। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কলার খোসার বিচিত্র গঠনের হদিশ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। জানা গেছে খোসার ভেতরে থাকে follicular gel-এর প্রচুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র থলি। (সহজ কথায়, জেল হচ্ছে জেলির মতো থকথকে পদার্থ।) সেলুলোজের পাতলা পর্দা দিয়ে তৈরি এই থলের ভেতরে থাকে মূলত পলিস্যাকারাইড ও স্বল্প পরিমাণ প্রোটিন। চাপ পড়লেই পর্দা ফেটে রেরিয়ে আসে জিনিসগুলো এবং তারপর সবকিছু মিলেমিশে ভোল পালটে তৈরি করে সল (sol)-ধরনের একটি কলয়েডীয় দ্রবণ। নাটের গুরু এই সল বস্তুটিই! এর ঘর্ষণ গুণাঙ্ক খুব কম হওয়ার কারণে কলার খোসার ওপর চাপ পড়লেই দেখা দেয় প্রবল অশান্তির সম্ভাবনা।


চিত্রঋণঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment