গল্পঃ চিংড়িঃ মণিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার



প্রতিদিন এই সময় দোকানের পেছনে ছোট্ট খুপরি ঘরটায় বসে মোমবাতির আলোয় পড়া মুখস্থ করে চিংড়ি। এমন নয় যে ওদের এই আধা গ্রাম আধা শহর চন্দ্রপুরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। খুব আছে; ইলেক্ট্রিসিটি আছে, রবিবারের হাট আছে, সবজির আড়ত আছে, সাহাবাবুর পেল্লায় লাল ট্র্যাক্টর আছে, একপাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া একটা অখ্যাত নদী পর্যন্ত আছে। নেই শুধু চিংড়িদের টাকা। চিংড়ি জানে, ওরা খুব গরিব। বাবা অনেক বলে-কয়ে পাশের চন্দ্রকাকুর চালের দোকান থেকে লাইন টেনে একটা টিমটিমে বালব জ্বালায় দোকানের ভিতরে। তাতে যেন অন্ধকারগুলো সন্ধ্যার পর আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। তার মধ্যেই বাবা উনুন ধরিয়ে চা বানিয়ে খদ্দেরদের দেয়। আর খদ্দের কেই বা। এই তো এখানের লোকজন সব। ক’জনই বা এই মফস্বলে দোকানে চা খাওয়ার বিলাসিতা করে? তার ওপর বাবা ভালো চা বানায়, বাবাকে খুব ভালোবাসলেও একথা চিংড়ি বলতে পারবে না। তাই তাদের দোকান প্রায় চলে না বলতে গেলে। বাবা মাঝে মাঝেই মাথা নেড়ে নেড়ে বিড়বিড় করে আর বলে, “আর বাঁচতে হবে না, আর পারব না।”
সেরকম সময়ে খুব মন খারাপ হয় চিংড়ির। তার তো দিব্যি লাগে বেঁচে থাকতে। সকালবেলা উঠে পুকুরধারে যখন দাঁত মাজতে যায়, তখন দেখে একটা জলফড়িং অকারণে ঘাস বেয়ে উঠছে আর নামছে, নামছে আর উঠছে, কোনওদিকে তাকাচ্ছে না। অবাক হয়ে চেয়েই থাকে সে। কী সুন্দর পরির মতন পাখা ফড়িংটার, রোদ পড়ে ঝিলমিল করছে। পরিদের পাখা মনে হয় আর একটু বড়ো হয়। নয়তো আকাশে ওড়ে কী করে! এসব ভাবতে ভাবতেই একটা ঢোঁড়া সাপ পায়ের পাশ দিয়ে হিলিবিলি কেটে জলে নেমে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড়ের বনকলমির ঝোপ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামে ইট রঙের বেজিটা, বেকুবের মতন চেয়ে থাকে জলের দিকে। ঠিক এই সময়েই বাবার গলা ভেসে আসে। “হল তোমার? নাকি সারাদিন জলের দিকে চেয়েই কাটিয়ে দেবে? ইশকুল যেতে হবে না আর।”
এভাবেই প্রায় রোজ শুরু হয় চিংড়ির সকাল। ভালো লাগে তো তার। খুব ভালো লাগে বেঁচে থাকতে। এমনকি এই যে এখন সন্ধেবেলা কাঁপা কাঁপা মোমের আলোয় বসে সে ইতিহাস পড়ছে, এও তার ভালো লাগে। থোক থোক অন্ধকার জমে থাকে ঘরটার চার কোনায়। মাঝেমাঝেই দুয়েকটা জোনাকি রাস্তা ভুল করে ঢুকে পড়ে আর সবজে আলো দপদপ করে ওঠে। চিংড়ি তখন স্পষ্ট যেন দেখতে পায় সেই আদিম মানুষেরা গুহায় ছবি আঁকছে। ওই তো বর্শা নিয়ে হরিণের পেছনে ছুটে গেল একজন, গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো হিংস্র হলুদ চোখ শিকারিকে দেখছে, গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে
সত্যি বলতে কী, পড়াশোনায় চিংড়ি মোটেই খারাপ নয়। স্কুলে স্যাররা তাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। পরীক্ষায় প্রথম তিনজনের মধ্যে চিংড়ি থাকেই প্রতিবার। তবে ইতিহাস ওর প্রিয় বিষয়। বাবা অবশ্য বলে, সে সারাক্ষণ হাবিজাবি ভাবে আর আজগুবি সব কল্পনা করে বলেই ইতিহাস ভালো লাগে তার। দ্যুত! এরকম হয় নাকি আবার? অবশ্য বাবাও নাকি খুব ভালো ছাত্র ছিল, সুবীরকাকুর কাছে শুনেছে সে। দারুণ ভালো ছিল ইংরেজি আর অঙ্কে। তারপর সেই যে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে ঠাকুমা, দাদু, আর তার ছোট্ট এক পিসি ছিল, সবাই মরে গেল, তারপরেই বাবার আর পড়াশোনা করা হল না। কলকাতায় কাজ করত কোথায় যেন। তারপর মার সঙ্গে বাবার বিয়ে হয়েছিল। মাকে অবশ্য মনে নেই চিংড়ির। সে যখন খুব ছোটো তখন মার কী একটা খুব কঠিন অসুখ হওয়ায় মাও মরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে। তারপর থেকে বাবাও কেমন হয়ে গেছে। যখন হাঁটুর উপর ধুতি তুলে রং-ওঠা একটা ফতুয়া পরে মাথা নিচু করে চা বানায়, তখন মনেই হয় না এই মানুষটা মুখে মুখে সিঁড়িভাঙা অঙ্কগুলো করে দিতে পারে। খুব মায়া হয় তখন চিংড়ির বাবাকে দেখে। বড়ো হয়ে সে নিজে চা বানাবে বাবার জন্য আর বাবাকে একটা বড়ো হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে রাখবে। ওই জয়ন্তদের বাড়িতে যেমন আছে, সেরকম নরম গদি দেওয়া চেয়ার।
সেসব কথা থাক। আপাতত কাল ভূগোল পরীক্ষা, সেই নিয়ে হিমশিম অবস্থা। ইতিহাস মুড়ে রেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভূগোল বই খুলতে হয়। পৃথিবীটা কমলালেবুর মতন না ন্যাসপাতির মতো, তা জেনে কোন কচুপোড়া হবে শুনি! ন্যাসপাতি হলেই বরং ভালো হত। ঘোষবাবুদের  বাগানে তিনটে গাছ আছে, চুরি করে খায় তারা বন্ধুরা। একটু বিটনুন দিলে যা লাগে না, উফ! জিভের জলটা সুড়ুত করে গিলে নিল চিংড়ি। ঘোষবাবুদের মালি অবশ্য একবার টের পেয়ে লাঠি তুলে তাড়া করেছিল, কিন্তু তবুও ন্যাসপাতি তো খেয়েছে। কমলালেবু একবারই খেয়েছিল। গেল শীতে একদিন স্কুল থেকে সবাইকে একটা করে দিয়েছিল। বেশ টক। খাওয়ার চিন্তা জোর করে মাথা থেকে তাড়াতে একটা মশাকে হাতের তালুর ওপর বসে মনের সুখে রক্ত খেতে দেখেও মারল না চিংড়ি। আহা, খাক। ওরও হয়তো তার মতই খালি পেট, আর তাছাড়া মশার কামড়ের চুলকানিতে খাওয়ার ভাবনা বিদায় নেবে একটুখানি হলেও।
টুংটাং করে কী একটা বাজাচ্ছিল কে যেন। আর ঘরময় একটা কেমন গন্ধ, ছাই ছাই, পোড়া পোড়া। অনেকগুলো জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন যেন, সবুজ আভা ঘরময়। মোমবাতিটা জ্বলছে না নাকি! অবাক লাগে চিংড়ির। নাকি ও স্বপ্ন দেখছে? তাই তো! মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ভূগোলের ভূ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। মোমটা কখন নিভে গেছে কে জানে। সামনে দোকানঘরে বাবা নেই বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাবা কেটলিতে চা তৈরি করে রেখে বাড়ি যায় রান্না করতে। সেই সময় কেউ এলে চিংড়িই চা ঢেলে দেয়। কিন্তু আজ তো কেউ নেই। তবে আওয়াজ একটা হচ্ছে। টুংটাং। না, বিস্কুটের বয়াম খোলার আওয়াজ। একটুখানি সিঁটিয়ে যায় চিংড়ি ভয়ে। কে রে বাবা!
পরক্ষণেই মনে হল, এ নির্ঘাত বিল্টুর কাজ। বিল্টুর সঙ্গে বাজি ধরেছিল কালকেই যে ভূত বলে কিছু নেই। নিশ্চয়ই ব্যাটা ভয় দেখাতে এসেছে মওকা পেয়ে। এটা মাথায় আসতেই লাফ দিয়ে দোকানঘরে ঢুকেই ব্যোমকে যায় চিংড়ি। কেউ কোত্থাও নেই। বালবের জোর যেন আরও কমে এসেছে। আশ্বিন মাসের শেষ, গাঁ-গঞ্জে এই সময় ভালোই কুয়াশা পড়তে শুরু করে, তবে আজকে যেন সামনেটা একটু বেশিই ধোঁয়াটে। পাতলা একটা ছাইরঙা আস্তরণ দোকানটাকে যেন আলাদা করে দিয়েছে বাইরের দুনিয়ার থেকে। হালকা শীতও করছে। নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে চিংড়ি।
ঠিক তখনই খেয়াল হয় একটা পাঁচ টাকার বিস্কুটের প্যাকেট আধখোলা হয়ে পড়ে আছে উনুনের পাশে। মাথাটা গরম হয়ে যায় টং করে। হাজার খিদে পেলেও চিংড়ি নিজে কখনও দোকানের জিনিস ছোঁয় না। বাবা বলেছে, এগুলো বদভ্যাস। আর এখন কে না কে এসে প্যাকেট খুলে এরকম ছড়িয়ে রেখেছে!
আর বাবার পাঁচটা টাকা তো নষ্ট হল। এটা ভাবামাত্রই সব ভয় চলে গেল চিংড়ির। রীতিমতন হুঙ্কার দিতে চেষ্টা করে সে। “কে রে বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছিস?”
কিন্তু চিংড়ির বয়স যেহেতু মাত্র দশ, সেহেতু হুঙ্কারটা তেমন জুতসই হয় না। কেউ উত্তরও দেয় না।
এমন সময় হঠাৎ দোকানের বালবটা নিভে যায়। এ অবশ্য রোজকার ব্যাপার। সাড়ে সাতটা বাজলেই চন্দ্রকাকু নিজের চালের দোকান বন্ধ করে আর লাইট চলে যায় চিংড়িদের দোকানে।
চিংড়ি ভয় পায় না। কিন্তু অন্য কে একটা যেন হাউমাউ করে ওঠে আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গেই।
“কে রে, কে রে…” বলতে বলতেই চিংড়ি টের পায় একটা ঠাণ্ডা মতন হালকা কিছু তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে। সে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই কে যেন সরু কান্না কান্না গলায় বলতে থাকে, “ও রে বাবা গো, অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয়! লাইট জ্বালাও শিগগির।”
হাঁ হয়ে যায় চিংড়ি। কে এটা!
“কে তুই? এত ঠাণ্ডা কেন তোর গা? এখনও তো শীত পড়েইনি।”
“আমি রবি। আর আমার গা তো এরকম ঠাণ্ডাই হবে। আমাদের সবার এরকম। আসলে রক্ত নেই তো, তাই।”
“রক্ত নেই মানে? ও, তোর বুঝি ডেঙ্গু হয়েছিল? এই তো কিছুদিন আগে সোনালিদিদির ডেঙ্গু হয়েছিল, তখনও হাসপাতালে ডাক্তার বলেছিল রক্ত নেই।”
“দুৎ! ডেঙ্গু না, আমার জন্ডিস হয়েছিল।”
“জন্ডিস হলেও রক্ত থাকে না? বলিস কী! আচ্ছা, তুই-ই তাহলে বিস্কুট খাচ্ছিলি। শরীর খারাপ যখন, খেয়ে নে বিস্কুটগুলো, আমি না হয় বাবাকে বলব আমি খেয়ে ফেলেছি।”
কিন্তু বিস্কুট খাওয়ার বদলে হঠাৎ ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কান্না জুড়ে দেয় রবি। নাক থেকে সর্দি টানার মতন আওয়াজ হতে থাকে।
“কাঁদছিস কেন? এ কী রে বাবা! বললাম তো কাউকে বলব না। খেয়ে নে তুই বিস্কুট।”
“আমি তো খেতে পারি না-আ-আ-আ... কিছহু খেহেতে পারি না আ-আ-আ…”
বলে কী ছেলেটা! খাইয়ে দিতে হবে নাকি? সে তো কত ছোটোবেলা থেকে নিজে নিজে খায়।
“খেতে পারিস না মানে! ইয়ার্কি হচ্ছে!”
এতক্ষণ অন্ধকারে থেকে চোখ সয়ে গেছিল। প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে আন্দাজে রবির মুখে ঢোকাতে যেতেই চিংড়ি বুঝতে পারে তার হাত কালো ছায়াটা ভেদ করে শূন্যে দুলছে।
সেই সময় রবি আরও জোরে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে, “ও দাদা গো, ও চিংড়িদা, তোমার পায়ে পড়ি, আলো জ্বালাও, আমার খুব ভয় করছে।”
ছোটো হলেও চিংড়ি একা একা থাকে কিনা। আর ওকে বাবা বলেছে যে ভূত বলে কিছু হয় না, তাই চিংড়ি অজ্ঞান হতে হতেও হল না। গুটি গুটি পায়ে পেছনের খুপরিতে ঢুকে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালতেই দেখে একটা চিমসে মতো কালো ছায়া দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। মোম দেখেই ছায়াটা যেন ফ্যাক করে একটা হাসির আওয়াজ করল মনে হল।
“তুমি আমায় দেখে ভয় পাওনি তো, চিংড়িদা?”
“ক্কে...ক্কেন? ভয়ের কী আছে? তুই তো রবি।”
“সবাই ভয় পেয়ে যায় তো। কেউ আমার দুঃখ বোঝে না। ভূত হয়ে গেছি বলে কি আমার ডাংগুলি খেলতে ইচ্ছে করে না, বলো? টিভিতে কার্টুন দেখতেও তো ইচ্ছে করে। আর সেদিন তোমাদের পাড়ার বিল্টুদের বাড়িতে কষা মাংস হচ্ছিল, তা আমি একটু চারপাশ ঘুরে গন্ধ শুঁকছিলাম, খেতে তো আর পারব না। তা ওদের বাড়ির কুকুরটা কী চিল্লান চিল্লাতে শুরু করল! শেষে পালিয়ে বাঁচি।”
“খেতে পারবি না কেন?”
“তুমি কি বুদ্ধু নাকি! খাব কী করে? আমার তো শরীরটাই নেই। খেতে খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু খেতে পারি না।” আবার প্রায় কান্না শুরু করে রবি।
“আচ্ছা, থাক থাক। খেতে পারিস না, কিন্তু গন্ধ পাস, আহা রে।”
চিংড়ি ভূত না হয়েও হাড়ে হাড়ে জানে এরকম হলে কী কষ্টটাই না হয়।
এমন সময় বাইরে হঠাৎ বাবার গলা পাওয়া যায়। “চিংড়ি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাবা? চল চল, আটটা বেজে গেল, দোকান বন্ধ করি।”
মুহূর্তের মধ্যে রবি উধাও হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে চিংড়ি যখন গরম ভাত, ডাল আর আলুসেদ্ধ খাচ্ছে, তখন টের পায় বারান্দার একটা কোণের অন্ধকার যেন একটু ঘন হল। বাতাসে কার যেন ফিসফিসানি ভেসে আসে।
“কাঁচালঙ্কাটা ভালো করে আরেকটু ডলে দাও তো। আহা-হা, দারুণ গন্ধ।”
চিংড়ির আবারও কেমন মনে হয়, বেঁচে থাকাটা ভীষণ সুন্দর একটা ব্যাপার।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

No comments:

Post a Comment