বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ কার্য-কারণ সম্পর্ক, কুসংস্কার ও বিজ্ঞানঃ কৌশিক ভট্টাচার্য

কার্য-কারণ সম্পর্ক, কুসংস্কার ও বিজ্ঞান

কৌশিক ভট্টাচার্য


টাউন স্কুলের সাথে মিশন স্কুলের ফুটবল ম্যাচ। মাঠের থেকে একটু দূরে একটা বটগাছের তলায় টাউন স্কুলের ফুটবল টিম মাঠে নামার জন্য তৈরি হচ্ছে। প্লেয়ারদের মুখে চিন্তার ছাপ। অনেক খুঁজেও সারা শহরে কোনও গাধা পাওয়া যাচ্ছে না। খেলার আগে গাধার কান না মললে নাকি টাউন স্কুল মিশন স্কুলকে হারাতে পারে না।
ছোটোদের জন্য লেখা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গাধার কান’ গল্পটি শুরু হচ্ছে এইভাবে। খেলাতে শেষ পর্যন্ত সেবার কী হল—টাউন স্কুল জিতল, নাকি হার —সেসব, আমরা চাই, তোমরা মূল গল্পটি নিজেরা পড়ে জানো। আমাদের আজকের বিষয় এই গল্পটি নিয়ে নয়, বরং টাউন স্কুলের ছাত্রদের এধরনের হাস্যকর চিন্তা নিয়ে। তোমরাই বলো, গাধার কান মলার সাথে ভালো ফুটবল খেলার সম্পর্কটা ঠিক কোথায়? বড়ো বড়ো ফুটবল খেলোয়াড়েরা, যেমন পেলে, মারাদোনা, মেসি, রোনাল্ডো, এরা সকলে কি মাঠে নামার আগে গাধার কান মলে খেলতে নামে? আমাদের সাধারণ যুক্তিবোধ এই নিয়ে কী বলে?
টাউন স্কুলের ছাত্রদের গাধার কান মলতে চাওয়া হল গল্প। বাস্তবে তোমরা দেখবে, হয়তো দেখেওছো যে, তোমাদের পরিচিত অনেকেই টাউন স্কুলের ছাত্রদের মতো এরকম উলটোপালটা ভেবে নিজেদের আর আশেপাশের অন্যান্যদের জীবনকে আরও জটিল করে তুলছে। এদের অনেকেই মনে করেন তেরো সংখ্যাটি নাকি খুব খারাপ সংখ্যা, মইয়ের তলা দিয়ে নাকি কখনও যেতে নেই, একটা শালিক দেখা মানে নাকি তোমার জীবনে খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে, কোথাও বেরোনোর আগে কেউ হাঁচলে নাকি সাথে সাথে না বেরিয়ে একটু অপেক্ষা করতে হয়, রাস্তায় যেতে যেতে যদি দেখো একটা বেড়াল রাস্তা পার হচ্ছে তাহলে নাকি আর না এগিয়ে সেখানেই থেমে যেতে হয়। কত বলব?
উপরে যে উদাহরণগুলো দিলাম সেগুলো হয়তো জীবনে ছোটোখাটো সমস্যা তৈরি করে। জীবন-মরণ সমস্যা তৈরি করে এমন উদাহরণও কিন্তু প্রচুর রয়েছে। গল্প আছে, একবার এক দেশে অশিক্ষিত জংলিদের মধ্যে মহামারী দেখা দেয়। মহামারী থেকে তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন এক ডাক্তার। জংলিদের বিভিন্ন বসতিতে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা শুরু করেন তিনি। বুঝতেই পারছ লোক যেখানে যেখানে বেশি মরছে, সেইসব জায়গাই বেছে নিয়েছিলেন তিনি চিকিৎসার জন্য। কিন্তু জংলিরা ভাবল, ‘আরে! এই লোকটা যেখানে যাচ্ছে সেখানেই লোক মরছে বেশি বেশি করে! নিশ্চয়ই ব্যাটা শয়তান। মার ব্যাটাকে।’ এবার সেই পরোপকারী ডাক্তারের অবস্থাটা একবার চিন্তা করো!
উপরের ঘটনাটা হয়তো গল্প, তবে মনে রাখতে হবে যে এধরনের চিন্তার বশবর্তী হয়েই মধ্যযুগের ইউরোপে অনেক মেয়েকে ডাইনি মনে করে পুড়িয়ে মারা হত। আমাদের দেশে গ্রামের দিকে মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা এখনও ঘটে। এধরনের ধারণার বশবর্তী হয়েই আগেকার দিনে আমাদের দেশে ভাবা হত, মেয়েরা নাকি লেখাপড়া করলে বিধবা হয়। এই বিশ্বাস যে একসময় কত মেয়ের সর্বনাশ করেছে কে জানে! কুসংসস্কারের বন্যা অবশ্য এখনও শেষ হয়নি। ধরো, বিরাট কোহলি কোনও কারণে অল্প রানে আউট হল আর অনুষ্কা শর্মা মাঠে এসেছে খেলা দেখতে। ব্যস! অমনি অনুষ্কা শর্মার উদ্দেশ্যে গালাগালি বর্ষণ করার মতন লোকের সংখ্যা আজকের দিনেও খুব কম নয়।
কিন্তু ঠিক কেন আমরা এরকম উলটোপালটা ভাবি? খুঁটিয়ে লক্ষ করলে বুঝবে যে আমরা আসলে মনে করি যে সময়ের বুকে ঘটে যাওয়া দুটো আলাদা ঘটনার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটা কোনও ঘটনা, যেটা অন্য ঘটনাটার আগে ঘটছে, আমরা মনে করি সেটি এই দ্বিতীয় ঘটনাটার কারণ। সত্যিই কি এরকম ভাবা খুব দোষের? আমাদের জীবনে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী। এই ঘটনাগুলির মধ্যে কিছু ঘটনা সবসময় ঘটে অন্য ঘটনার আগে। আমরা জানি সুইচ টিপলে আলো জ্বলে, সুইচ বন্ধ করলে নেভে। কলের মুখ খুললে জল পড়ে, ওলা বা উবের-এ গাড়ি বুক করলে বাড়িতে গাড়ি আসে। আলো কিন্তু সুইচ টেপার আগে জ্বলে না, জলও কলের মুখ খোলার আগে পড়ে না। এভাবে খুব ছোটোবেলা থেকেই আমরা শিখে যাই যে আলো জ্বালাতে গেলে সুইচ টিপতে হবে বা জলের দরকার পড়লে খুলতে হবে কলটা। আর একটু বড়ো হবার পর আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি যে সুইচ টেপাটাই হল আলো জ্বলে উঠবার কারণ, যেমন জল পড়ার কারণ হল কলটা খোলা। এই কারণগুলো ঘটছে কার্য অর্থাৎ আলো জ্বলার অথবা কল থেকে জল পড়ার আগে। আমরা তাই ভেবে নেই যে কারণ (cause) জিনিসটা সবসময় ঘটে কার্য (effect)-র আগে।
সমস্যাটা হয় যখন আমরা আমাদের এই ভাবনাটাকে উলটে দিই। কার্য জিনিসটা কারণের পরে ঘটতেই পারে, কিন্তু একটা ঘটনা অন্য আরেকটা ঘটনার আগে ঘটছে মানেই কিন্তু প্রথম ঘটনাটা কারণ আর দ্বিতীয়টা কার্য নয়। কোনও ভুল ধারণা বা যুক্তিকে ইংরেজি ভাষাতে ফ্যালাসি (fallacy) বলা হয়। দুটি ঘটনার কার্য-কারণ সম্পর্ক নিয়ে এই ভুল ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে এত বেশি ব্যাপক যে এই ফ্যালাসি বা ভ্রান্ত যুক্তির একটি গালভরা ল্যাটিন নাম রয়েছে। একে বলা হয় post hoc ergo propter hoc (এর পরে ঘটছে, তাই এর জন্য ঘটছে) ভ্রান্ত যুক্তি। এই ভ্রান্ত যুক্তির শিকার আমরা তখন হই যখন আমরা মনে করি যেহেতু  ঘটনা ক ঘটনা খ-এর আগে ঘটেছে, তাই ক হল খ ঘটবার কারণ।
কেন আমরা তাহলে আমাদের জীবনে বারবার এই ভ্রান্ত যুক্তির ফাঁদে পড়ি? আসলে কোন ঘটনাটি কোন ঘটনার আসল কারণ তা সঠিকভাবে বের করা অনেক সময়েই এক জটিল কাজ। মনে করো, তোমার ধারণা তুমি অঙ্ক পরীক্ষার আগে পাশের বাড়ির হুলো বেড়ালটাকে চুমু খেতে পারোনি বলে তোমার পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। এর আগেরবার তুমি পরীক্ষার দিন সকালে হুলোটাকে আদর করতে করতে ওর মাথায় চুমু দিয়েছিলে, তাই একশোতে একশো পেয়েছিলে। অথচ এবার?
ভালো করে যদি ভেবে দেখো তাহলে নিজেই বুঝতে পারবে যে তোমার অঙ্ক পরীক্ষার আগে শুধু হুলোকে চুমু খাওয়া (অথবা না খাওয়া) নয়, আরও অনেক কিছু ঘটেছে বা ঘটেনি। তাহলে সেসব ঘটনা (অথবা, না-ঘটনা) কেন তোমার পরীক্ষায় খারাপ করার কারণ হবে না? প্রথমবার তোমার স্কুলের বাস হয়তো এক মিনিট দেরি করেছিল, দ্বিতীয়বার এক মিনিট আগে পৌঁছেছে। তাহলে কেন আমরা বলব না যে আসলে হুলোকে চুমু নয়, বাস কোন সময়ে স্কুলে পৌঁছচ্ছে তার উপরই তোমার অঙ্ক পরীক্ষার ফল নির্ভর করছে? অথবা এমনও তো হতে পারে যে আগেরবারে তুমি বইয়ের সবগুলো অঙ্ক করেছিলে, এবার করোনি। তাহলে কেন তোমার অঙ্ক করার পরিমাণ রেজাল্টের কারণ নয়?
এবারে দেখা যাক, বিজ্ঞানীরা এই কার্য-কারণ সম্পর্ক নিয়ে কী ভাবেন, ঠিক কেমন করে তাঁরা কোনও সিদ্ধান্তে আসেন। কোনও একটি অঙ্কে অথবা বিজ্ঞানের কোনও গবেষণায়  কোনও কিছুর মান যদি পালটাতে পারে, তবে তাকে চলরাশি (variable) বলা হয়। বিজ্ঞানে সাধারণভাবে যেকোনও চলরাশির মান একটি নয়, আরও অনেক চলরাশির উপর নির্ভর করে। যেমন তোমার ওজন শুধু তোমার উচ্চতার উপর নির্ভর করে নাーতোমার হাড়ের ঘনত্ব, তোমার বয়স, তোমার খাদ্যাভ্যাস, তোমার মা-বাবার উচ্চতা বা ওজন এবং আরও অনেক কিছুর উপরে নির্ভর করতে পারে। এদের মধ্যে কোন চলরাশিটির মানের উপর একজন মানুষের ওজনের মান সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে, অথবা যেকোনও একটি চলরাশির মানের সাথে ওজনের আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কি না সেটা কিন্তু প্রচুর তথ্য বিশ্লেষণ না করে বলা সম্ভব নয়।
একটি ঘটনাও সেরকম অধিকাংশ সময়েই শুধুমাত্র একটি নয়, একাধিক ঘটনাপ্রবাহের ফল হতে পারে। তাই অন্য একটি ঘটনাকে সেই ঘটনার কারণ প্রমাণ করতে গেলে কিন্তু আমাদের অনেক তথ্য জোগাড় করা এবং সেই তথ্যগুলিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যেমন তোমার অঙ্ক পরীক্ষার রেজাল্টের ব্যাপারটাই ধরা যাক। তুমি যদি মনে করো পাশের বাড়ির হুলোকে চুমু খেলে তোমার পরীক্ষা ভালো হবে, শুধুমাত্র তোমার সেই মনে করাকে কিন্তু কোনও বিজ্ঞানী খুব একটা পাত্তা দেবেন না। বিজ্ঞানী প্রথমেই তোমায়  বলবেন, তোমার কাছে এই ব্যাপারে কি কোনও তথ্য (data) রয়েছে? কতগুলো অঙ্ক পরীক্ষার ভিত্তিতে তুমি এরকম সিদ্ধান্তে এসেছ? একটি? দুটি? নাকি আরও অনেক বেশি? অনেক বেশি অঙ্ক পরীক্ষার তথ্য যদি তুমি দিতে না পারো তাহলে প্রথমেই কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তকে তাঁরা অবৈজ্ঞানিক বলে নস্যাৎ করে দেবেন।
এবারে ধরো তোমার কাছে প্রচুর অঙ্ক পরীক্ষার তথ্য রয়েছে। এক্ষেত্রে চারটি আলাদা ভাগে তথ্যগুলিকে ভাগ করা যেতে পারে। (১) কতবার হুলোকে চুমু খেয়ে তোমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে? (২) কতবার হুলোকে চুমু খেয়ে তোমার পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? (৩) কতবার হুলোকে চুমু না খেয়ে তোমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে? (৪) কতবার হুলোকে চুমু না খেয়ে তোমার পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? ধরো, ১-কে তুমি ২ দিয়ে ভাগ করলে, আর ৩-কে ভাগ করলে ৪ দিয়ে? এই দুটি ভাগফল কি খুব কাছাকাছি? যদি কাছাকাছি হয় তাহলে তো হুলোকে চুমু খাও বা না খাও, তোমার পরীক্ষায় ভালো করার পরিমাণ খারাপ করার তুলনায় একইরকম। এই দুটি ভাগফলের যদি অনেক তফাত থাকে, তাহলে অবশ্য বিজ্ঞানী একটু নড়েচড়ে বসবেন। সামান্য হলেও তাঁর মনে হবে দুটি ঘটনার আদৌ কোনও যোগ রয়েছে কি না তা আরও তথ্য জোগাড় করে গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। তখন তিনি অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দেবেন এবং জানতে চাইবেন তোমার কাছে সেই ঘটনাগুলির ব্যাপারে আর কোনও তথ্য আছে কি না। যেমন ধরো, প্রতি অঙ্ক পরীক্ষার আগের তিনদিনে তুমি গড়ে কতগুলো করে অঙ্ক করেছিলে? তোমাকে কি বাড়িতে কেউ পড়িয়েছিল, নাকি তুমি একা একা পড়েছ? স্কুলে সবসময় সব অঙ্ক তুমি ঠিকঠাক করো, নাকি করো না?
বিজ্ঞানীদের এধরনের সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট সাজিয়ে গুছিয়ে তথ্য জোগাড় করতে হয়। যেকোনও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতে কী কী তথ্য কীভাবে জোগাড় করতে হবে তা আগে থাকতে ভালো করে পরিকল্পনা করে রাখা প্রয়োজন। তার কারণ, একটি চলরাশি যেহেতু অন্য অনেক চলরাশির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তাই চলরাশি ক-এর প্রভাব খ-এর উপর মাপতে গেলে গ এবং অন্য আরও সমস্ত চলরাশিকে সমান অবস্থায় রেখে অনেকগুলি পরিমাপ নিতে হয়। যেমন ধরো তুমি কোনও গ্যাসের চাপ, আয়তন আর তাপমাত্রার সম্পর্ক কী সেটা বের করতে চাও। কয়েক শতাব্দী আগে বিজ্ঞানী বয়েল এই কাজটি করে রেখে গেছেন। চাপের সাথে আয়তনের এর সঠিক সম্পর্ক বের করতে গেলে তাপমাত্রাকে এক জায়গাতে রাখা দরকার। কারণ, চাপ আর তাপমাত্রা দুটিই একই সাথে বদলালে আয়তনের পার্থক্য ঠিক কোন চলরাশিটির জন্য হচ্ছে সেটি বোঝা যাবে কী করে? বিজ্ঞানীকে তাই এমনভাবে তথ্য জোগাড় করবার পরিকল্পনা করতে হবে যাতে তাপমাত্রাকে এক জায়গাতে রেখে, চাপের একেকটি মানের জন্য গ্যাসের আয়তন কত হচ্ছে তা অনেকবার করে মাপা যায়।
এবারে ধরো তোমার সমস্যাটি আরও গভীর। তুমি জানতে চাও আয়তন জিনিসটার সাথে শুধু চাপ নয়,  চাপ আর তাপমাত্রার সঠিক সম্পর্কটি কী ধরনের। সেক্ষেত্রে তথ্য জোগাড় করার পদ্ধতিও আরও একটু জটিল হবে। যখন তুমি শুধু আয়তনের সাথে চাপের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছিলে, তখন তাপমাত্রাকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় বেঁধে রেখেছিলে। এখন কিন্তু সেটা আর সম্ভব হবে নয়। এখন তোমাকে তাপমাত্রাকেও নানাভাবে বাড়িয়ে কমিয়ে দেখতে হবে আয়তনের আর চাপের সাথে এর সম্পর্কটি কীরকম। কীভাবে আমরা এই কাজটি করব?
ধরো, প্রথম গবেষণাটির বেলা তুমি তাপমাত্রাকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁধে রেখেছিলে। এই তাপমাত্রাতে চাপকে কমিয়ে বাড়িয়ে তার দশটি আলাদা আলাদা মানের প্রতিটির জন্য তুমি গ্যাসের আয়তন মেপেছ। মনে রাখতে হবে, চাপের প্রতিটি মানের জন্যই আমাদের অনেকবার করে (ধরো, দশবার) আয়তন মাপা দরকার কারণ, আয়তন মাপতে গেলে অনেক সময়ই বিভিন্ন কারণে আমাদের ভুল হতে পারে। প্রথম গবেষণায় তার মানে তুমি মোট একশোটি আলাদা আলাদা দ্বিমাত্রিক চাপ-আয়তন চলরাশির তথ্য সংগ্রহ করেছিলে। এবারে আয়তন-চাপ-তাপমাত্রার সম্পর্কটি কী দেখবার জন্য তাপমাত্রাকেও ধরো আমরা দশটি আলাদা আলাদা মানে নির্দিষ্ট করলাম, যেমন, ১০, ২০, …, ৯০, ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাহলে তাপমাত্রার প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা মানের জন্য আমাকে মোট একশটি দ্বিমাত্রিক চাপ-আয়তন চলরাশির তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একটু অন্যভাবে দেখলে, আমাকে সংগ্রহ করতে হবে আসলে এক হাজারটি ত্রিমাত্রিক আয়তন-চাপ-তাপমাত্রার তথ্য।
এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ কি? কোনও একটি চলরাশির মান যত বেশি সংখ্যক চলরাশির উপর নির্ভর করবে, আমাদের তথ্য সংগ্রহের মাত্রা আর পরিমাণও তার সাথে সাথে তত বাড়বে। ধরো, কোনও গ্যাসের আয়তন যদি চাপ আর তাপমাত্রা ছাড়া আরও একটি কোনও চলরাশির উপর নির্ভর করে, তাহলে কী হবে? ধরা যাক, এই চলরাশিটির নাম হল ক। যদি আমরা অন্যান্য চলরাশির মতন ক-এরও দশটি আলাদা আলাদা মান নির্দিষ্ট করি তাহলে আমাদের সংগ্রহ করতে হবে মোট দশ হাজারটি চতুর্মাত্রিক আয়তন-চাপ-তাপমাত্রা-ক সংক্রান্ত তথ্য। চলরাশির সংখ্যা এক এক করে এভাবে যত বাড়বে, প্রভাবক-সংখ্যা (number of factors) এক এক করে বাড়লেও এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের পরিমাণ বাড়বে আগের পরিমাণের চেয়ে আরও দশ গুণ করে।
কেন আমাদের এত তথ্য জোগাড় করতে হয়? এই নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। এক ছদ্ম-বিজ্ঞানী (pseudoscientist) একবার ঠিক করল যে মদ খাওয়ার সাথে মাতাল হবার কোনও সম্পর্ক আছে কি না সেটা সে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখবে। সোমবার সে খেল হুইস্কি-সোডা, মঙ্গলবার জিন-সোডা, বুধবারে রাম-সোডা আর বৃহস্পতিবারে ভদকা-সোডা। প্রত্যেকবারই সে মাতাল হল এবং এই ‘তথ্য’ থেকে সিদ্ধান্তে এল যে যেহেতু প্রতিবারই সে সোডা খাবার পর মাতাল হয়েছে, অতএব অ্যালকোহল নয়, সোডাই আমাদের আসলে মাতাল করে। এবার ভাবো যে এই ‘বিজ্ঞানী’ যদি মদের সাথে সাথে আমাদের পূর্ববর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী সোডার পরিমাণও বাড়াত কমাত, তাহলে কি সে এরকম উদ্ভট সিদ্ধান্তে আসতে পারত? একটি চলরাশির উপর অন্য চলরাশিদের প্রভাব মাপতে গেলে আমাদের তাই একটি পূর্বপরিকল্পিত নিয়ম অনুসারে অন্য সমস্ত চলরাশিকে বাড়িয়ে কমিয়ে দেখতে হয়।
এভাবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের যেটা সবচেয়ে ভালো দিক সেটা হল এই যে তথ্য সংগ্রহের পরে তা বিশ্লেষণ করা এবং তা থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসা অনেক সহজ হয়ে যায়। বিজ্ঞানের যেকোনও পরীক্ষাতে তথ্য সংগ্রহ যে কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছেন রাশিবিজ্ঞানীরা (statisticians)। তাঁদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিগুলিকে একসাথে রাশিবিজ্ঞানে পরীক্ষার নকশা (design of experiment) বলা হয়। উপরে বর্ণিত এধরনের পদ্ধতিগুলির অন্যতম স্রষ্টা ছিলেন রাশিবিজ্ঞানী রোনাল্ড ফিশার। তাঁর এবং অন্যান্য রাশিবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেই আজও  বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা তাঁদের নিজের নিজের পরীক্ষার জন্য তথ্য সংগ্রহ করেন। যেমন ধরো, একটা সার কতটা ফলন বাড়াতে সক্ষম তা মাপতে গেলে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের আগে থাকতেই এরকম একটি বহুমাত্রিক প্রভাব-নকশা (factorial design) বানিয়ে রাখা প্রয়োজন। বিজ্ঞানের মূল গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহ শুরু করার আগেই এই কাজটি সেরে ফেলতে হয়।
বহুমাত্রিক প্রভাব-নকশার আরেকটি বড়ো প্রয়োগ হলো নতুন কোনও ওষুধের কার্যকারিতা মাপবার বিষয়ে। এধরনের কাজের জন্য কিন্তু প্রচুর আলাদা আলাদা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন। এই পরীক্ষা করা হয় নানাভাবে, ধাপে ধাপে। প্রথমে দেখা হবে ওষুধটি আমাদের শরীরে সৃষ্ট বা শরীরের পক্ষে প্রয়োজনীয় কিছু অণুকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এই কাজ ল্যাবরেটরিতে বসে হয়তো একজন রসায়নবিদ করে দেখালেন। তারপরের ধাপে এগিয়ে এলেন জীববিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন প্রাণীর জীবকোষের উপরে ওষুধটি কী প্রভাব ফেলে তাই নিয়ে চলবে লম্বা গবেষণা। অবশেষে ওষুধটির ফলাফল পরীক্ষা করা হবে মানুষের উপরে। প্রত্যেক ধাপেই বিজ্ঞানীরা বিপুল পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং কোনও সিদ্ধান্তে আসেন সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে। উলটোদিক থেকে দেখলেও কোনও গবেষণা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে করা হয়েছে কি না তা বিচার করবার একটি বড়ো মানদণ্ড হল তথ্য সংগ্রহের এই প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি হয়নি। সেজন্য আজকের দিনে কেউ যদি কোনও তথ্যসংগ্রহ না করে কেবলমাত্র মুখের কথার ভিত্তিতে দাবি রাখে যে গোমূত্র খেলে ক্যান্সার সারে, সেটা শুধু হাস্যকরই নয়, একটা বিরাট বড়ো দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
এতক্ষণ ধরে আমরা বিজ্ঞানের যেকোনও পরীক্ষায় তথ্য সংগ্রহের প্রভাব-নকশার প্রয়োজনীয়তার কথা বললাম। দুটি ঘটনার মধ্যে আদৌ কোনওরকম সম্পর্ক আছে কি না তা বের করতে গেলেও কিন্তু অনেক তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলির বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে  অন্য কোনও চলরাশি বা অন্য কোনও ঘটনা আমাদের ওই দুটি ঘটনাকেই আলাদা করে প্রভাবিত করছে কি না সেটি ভালো করে দেখা দরকার। একটা ছোট্ট উদাহরণের কথা ভাবা যাক। ধরো, আমি আর আমার প্রতিবেশী দু’জনেই অফিসকর্মী। আমাদের দু’জনের অফিসও পাশাপাশি। আমার অফিস ছুটি হয় পাঁচটার সময়, আমি বাড়ি ফিরি সন্ধ্যা ছ’টায়। আমার প্রতিবেশীর অফিস ছুটি হয় ছ’টার সময়, সে বাড়ি ফেরে সন্ধ্যা সাতটায়। এখন ধরো, তুমি একজন বৈজ্ঞানিক। তুমি অনেকদিন ধরে আমাদের দু’জনের বাড়ি ফেরার সময় লক্ষ করছ আর দেখছ যে আমি বাড়ি ফিরি আমার প্রতিবেশীর একঘণ্টা আগে। আমি যেহেতু ফিরছি একঘণ্টা আগে, তার মানে কি এই যে আমার বাড়ি ফেরাটা আমার প্রতিবেশীর বাড়ি ফেরার কারণ? মজা এই যে এই বাড়ি ফেরার ব্যাপারটাকে আবার অন্যভাবে দেখা যেতে পারে। কেউ তো এমনও যুক্তি দিতে পারে যে আসলে আমি আগে বাড়ি ফিরছি না, আগে বাড়ি ফিরছে আমার প্রতিবেশী, আমার চেয়ে তেইশ ঘণ্টা আগে। সে যেহেতু আমার আগে বাড়ি ফিরছে তাহলে ভ্রান্ত যুক্তি অনুযায়ী তার বাড়ি ফেরাটাই আসলে কারণ, আমারটা কার্য! সময়ের উপরে কার্য-কারণ সম্পর্ক বের করাটা অনেক সময়ই এমন ‘ডিম আগে, না হাঁস আগে?’ ধরনের প্রশ্নতে গিয়ে শেষ হয়। দুটি চলরাশি একে অন্যকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যে দুটিই কার্য, আবার দুটিই কারণ।
এই বিশেষ সমস্যাটির ক্ষেত্রে কার্য-কারণ সম্পর্ক বের করবার একটি উপায় হল আমার এবং আমার প্রতিবেশীর অফিস ছুটির সময়দুটি নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রেখে লক্ষ করা কখন আমরা বাড়ি ফিরছি। এই পরীক্ষা করতে পারলে কেউ হয়তো এটা বুঝতে পারবে যে আমার এবং আমার প্রতিবেশী, দু’জনেরই বাড়ি ফেরার সময়টা আসলে নিয়ন্ত্রণ করছে আমাদের অফিস ছুটির সময়। কিন্তু চিন্তার ব্যাপার এই যে বিভিন্ন চলরাশির মানকে এরকমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবে অনেক সময়ই সম্ভব হয় না।
সময়ের বুকে ঘটা দুটি ঘটনার কার্য-কারণ সম্পর্ক বের করা আরও জটিল কারণ অনেক সময় কারণ জিনিসটা ঘটে কাৰ্যর পরে। আশ্চর্য হচ্ছ? জন্মদিনে বন্ধুর জন্য গ্রিটিংস কার্ড কিনেছ নিশ্চয়ই, আর এই কেনাটা অবশ্যই হয়েছে জন্মদিনের আগে? জন্মদিনটাই কি এখানে কারণ নয়? কার্য অর্থাৎ কার্ড কেনা ব্যাপারটি এখানে ঘটে গেছে কারণ ব্যাপারটার আগে। অনেক সময় আমরা কোনও একটা জিনিস ভবিষ্যতে ঘটবে জেনে আগাম প্রস্তুতি (forward looking behavior) নিয়ে রাখি। এই আগাম প্রস্তুতি জিনিসটা কার্য, ভবিষ্যতের ঘটনাটিই হল আসল কারণ।
এধরনের আগাম প্রস্তুতির জন্য কার্য-কারণ সম্পর্কটি জটিল হয়ে যাবার আরও একটি সুন্দর উদাহরণ রয়েছে। আমরা জানি পাখিরা কম্পন জিনিসটা খুব ভালো অনুভব করতে পারে। রেল-লাইনের উপরে যদি পাখিরা বসে থাকে তাহলে অনেক আগে থাকতে ওরা বুঝতে পারে যে ট্রেন আসছে আর সেই মতন উড়ে চলে যায়। তুমি যদি বিজ্ঞানী হিসেবে ওই পাখিদের দিনের পর দিন পর্যবেক্ষণ করো তাহলে দেখবে পাখিরা উড়ে চলে গেল, তারপরে ট্রেন এল। তার মানে কি এই পাখিদের উড়ে যাওয়াটাই ট্রেন আসার কারণ? ব্যাপারটা তো আসলে উলটো। কেমন করে তাহলে আমরা প্রমাণ করব যে ট্রেন আসছে বলেই পাখিরা উড়ে পালাচ্ছে?
কেমন করে প্রমাণ করব তার একটা খুব সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। ধরো, দু’ধরনের পাখি রয়েছে। আমাদের এটা জানা আছে যে একধরনের পাখিরা অন্যধরনের পাখিদের থেকে কম্পন ব্যাপারটা আরও ভালো করে বুঝতে পারে। ধরো, রেল-লাইনও আবার দু’ধরনের। একধরনের রেল-লাইন অন্যধরনের রেল-লাইনের থেকে বেশি জোরে কাঁপে। এবারে ধরো, তুমি এই দু’ধরনের পাখিকে দু’ধরনের রেল-লাইনে ভাগ করে দিলে। সত্যি যদি পাখিরা কম্পন আগে থেকে বুঝতে পেরে উড়ে পালায় তাহলে আমরা কী দেখব? দেখব যে লাইনে কম্পন বেশি হয়, সেই লাইনে কম্পন যে পাখিরা ভালো বোঝে তারা অন্য পাখিদের থেকে আগে উড়ে পালাবে। যদি বাস্তবে আমরা এই ঘটনাটি ঘটতে দেখি তাহলে বলতে পারব কারণ হল ট্রেন আসা আর কার্য হল পাখিদের উড়ে পালানো।
সময়ের বুকে ঘটা দুটি ঘটনার আদৌ কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না সেটা সঠিকভাবে বের করা জটিল হয়ে উঠতে পারে আরও একটি কারণে। একটি চলরাশি অন্য আরেকটি চলরাশিকে সাথে সাথে প্রভাবিত না করে অনেক সময় প্রভাবিত করে দেরিতে। কীভাবে এই ব্যাপারটি কুসংস্কারের সৃষ্টি করতে পারে? একটি উদাহরণের মাধ্যমে সেটা বোঝা যাক।
ধরো, তোমার পেটের রোগ হয়েছে। তুমি ডাক্তারের কাছে গেলে। ডাক্তার তোমাকে পাঁচদিনের ওষুধ দিলেন, কারণ ডাক্তারবাবু তোমাকে পরীক্ষা করে বুঝেছেন যে তোমার রোগটি হয়েছে একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে এবং সেটিকে মারতে, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, পাঁচদিন ধরে দু’বেলা একটি বিশেষ ওষুধ খাওয়া প্রয়োজন। পাঁচদিন ওষুধ খাওয়ার পর, ধরো সেই ব্যাকটেরিয়াগুলির দুর্বল হয়ে মরতে মরতে আরও একদিন সময় লাগবে। এবারে তুমি পাঁচদিন ওষুধ খেয়ে দেখলে যে পুরোপুরি সুস্থ  হলে না। তুমি তখন এক ‘সাধুবাবা’-র শরণ নিলে। বাবা তোমাকে একটি ওষুধ দিলেন। তুমি একদিন সেই ওষুধ খেলে আর ভালো হয়ে গেলে। এরকম কিছু ঘটলে, আমরা যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান ভালো না জানি, তাহলে কি আমরা অনেকেই ভাবব না যে চিকিৎসক নয়, আমাকে আসলে ভালো করেছেন বাবা, তাঁর মন্ত্রপূত ওষুধ দিয়ে? সেই ওষুধ যদি শুধু চিনির ডেলাও হয়, তার উপরে আমার ভক্তি তখন তুঙ্গে উঠবে এবং রাগ হবে চিকিৎসক ও চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর।
এইধরনের উদাহরণ অর্থনীতিতেও বিরল নয়। অর্থনীতিবিদ মাত্রেই জানেন যে টাকা অথবা সুদের পরিমাণ কমিয়ে বাড়িয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ একদিনে সম্ভব হয় না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসতে আসতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগে। ধরো, সরকার আজ থেকে পাঁচ মাস আগে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে যা যা করা উচিত তাই করেছে। কিন্তু যে সরকার এই কাজ করল নির্বাচনে তারা আজ হেরে গেল। নতুন সরকার এল আর একমাস বাদে জিনিসপত্তরের দামও চলে এল নিয়ন্ত্রণে। আমরা কতজন তখন পুরনো সরকারকে সেই কৃতিত্ব দেব? আমরা প্রায় সকলেই কি ভাবব না যে নতুন যারা সরকারে এসেছে তারা কত দক্ষ, তারা কেমন মাত্র একমাসের মধ্যে সব জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলল!
কুসংস্কার যার রয়েছে সে আবার একটি ঘটনার অন্য আরেকটিকে প্রভাবিত করার সময়টিকেই চলরাশি বানিয়ে দিতে পারে। তাতে তার বিস্তর সুবিধে। ‘দেশে বিদেশে’ ভ্রমণকাহিনিটিতে সৈয়দ মুজতবা আলি এরকম একজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন অধ্যাপক প্রফেসর বগদানফের  বর্ণনা দিয়েছেন। ধরো, তুমি মইয়ের তলা দিয়ে গেলে, আর তার তিন বছর পরে তোমার পেয়ারের বেড়াল বমি করল। প্রফেসর বগদানফ নাকি তখন সেই ঘটনাটিকে তোমার মইয়ের তলা দিয়ে যাবার জন্যই ঘটেছে বলে দাবি করবেন। তিন বছর লম্বা সময়। এই সময়ের মধ্যে সকলের জীবনেই কিছু না কিছু খারাপ ঘটতেই পারে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে, তা সে তিন দিনের মাথাতেই  হোক, বা তিন বছরের মাথাতেই হোক—কোনও একটা কিছু খারাপ ঘটলে সেটিকেই মইয়ের তলা দিয়ে যাবার ফল হিসেবে দেখার সুবিধে হল এই যে এতে সবসময়েই প্রমাণ করা যায় যে মইয়ের তলা দিয়ে যাওয়া কারুর জীবনে কত খারাপ কিছু নিয়ে আসতে পারে। তিন বছর যেহেতু লম্বা সময়, এটা আশা করা অন্যায় হবে না যে সেই সময়ের মধ্যে লোকের জীবনে খারাপের মতন ভালো কিছু ঘটনাও ঘটবে। মুজতবা আলি অবশ্য লিখে যাননি যে এই তিন বছরের মধ্যে কারুর জীবনে ভালো কিছু ঘটলে বগদানফ সাহেব তখন কী বলতেন।
এতক্ষণ ধরে এত আলোচনার পর হয়তো এটা আমরা বুঝতে পারলাম যে কার্য-কারণ সম্পর্ক নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে গেলে বহু পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন, আর তার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তথ্য সংগ্রহের। বলা বাহুল্য, কোনও একটি বিশ্বাস কুসংস্কার নাকি কুসংস্কার নয়, সেটি প্রমাণ করতে গেলেও তা এমন পরীক্ষানিরীক্ষা ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমেই করা সম্ভব। কিন্তু সবসময় কি সেটা করা সম্ভব? রোজই যদি এমন অজস্র বিশ্বাস নিয়ে এত গবেষণা করতে হয় বা এত তথ্য সংগ্রহ করতে হয় তাহলে বাকি কাজ আমরা করব কখন? বগদানফ সাহেবের মতন যাঁরা বেছে বেছে খারাপ ঘটনাগুলিকে দেখিয়ে কুসংস্কারের সপক্ষে যুক্তি সাজান তাঁদেরই বা কী বলব?
কোনও তথ্য সংগ্রহ বা তথ্য বিশ্লেষণ না করলেও আমরা কিন্তু খুব সহজে আরেকটা কাজ করতে পারি। সেটি হল, এই বিশ্বাস নিয়ে নানারকমের প্রশ্ন তোলা। দুটি ঘটনা, একটি আরেকটিকে প্রভাবিত করতে পারে ঠিক কীভাবে? একটি ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনার মাঝেও তো অনেক কিছু ঘটে চলেছে। দুটি ঘটনার মাঝের যোগসূত্র স্থাপনকারী এই গল্পটা ঠিক কী?
আমরা যখন সুইচ টিপি, আলো জ্বলে। আলো এমনি এমনি জ্বলে না। সুইচ একটি সেতুর মতন দুটি ছেঁড়া তারকে জুড়ে দেয়। তাই তার মধ্যে দিয়ে কারেন্ট যেতে পারে আলোর উৎস পর্যন্ত। তেমনি জলের কল খুললে জল পড়ে, কারণ পাইপের মধ্যে জল থাকে, কলের মুখের প্যাঁচটি আটকানো অবস্থায় থাকে বলে জলও আটকে থাকে সেই প্যাঁচের উপরে। আমরা কলের মুখ ঘুরলে সেই প্যাঁচ সরে যায়, জল নিচে নামে অভিকর্ষের টানে। এই যে সুইচ টেপা থেকে আলো জ্বলা পর্যন্ত মাঝের ধাপগুলি, অথবা জলের কলের মুখের প্যাঁচ খোলার থেকে জল পড়া পর্যন্ত মাঝের ধাপগুলি, তার প্রতিটি ধাপেই যা যা ঘটছে তা বিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্র বা আমাদের জানা তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
কিন্তু গাধার কান মলে ফুটবল ম্যাচ জেতার ঘটনাদুটি? অথবা হুলোকে চুমু খেয়ে পরীক্ষায় ভালো করার ঘটনাদুটি? এদের মাঝের গল্পগুলি ঠিক কীধরনের? সেই গল্পগুলির প্রতিটি ধাপ কি বিজ্ঞানের সূত্র বা জানা তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? অথবা আদৌ কি কোনও বিশ্বাসযোগ্য গল্প বা  বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ গল্প লুকিয়ে রয়েছে তার মধ্যে? যদি না থাকে তাহলে কিন্তু কোনও তথ্য সংগ্রহ না করেও আমরা বলতে পারি যে এই দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্কটি পরিষ্কার নয়। সময়ের বুকে ঘটা দুটি ঘটনার এই মাঝের ধাপগুলি নিয়ে এই যে গল্পটি এটিকে বলা যেতে পারে যোগসূত্রকারী প্রক্রিয়া (transmission mechanism)। দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে দেখাতে গেলে তা শুধুমাত্র তথ্য দিয়ে হয় না, এই সম্পূর্ণ যোগসূত্রকারী প্রক্রিয়াটির একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিজ্ঞানের তত্ত্ব (theory) এই কাজে আমাদের সাহায্য করে, না করলে অনেক সময় নতুন করে সেই তত্ত্বকে সাজিয়ে নিতে হয়।
এখানেই প্রয়োজন শুধু বিজ্ঞানের বই মুখস্থ করা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতার। দুটি ঘটনার যোগসূত্রকারী প্রক্রিয়াটি যদি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত কিছু সূত্রকে বা কোনও বহু পরীক্ষিত সত্যকে অস্বীকার করে, তাহলে তার একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দরকার। বিজ্ঞানমনস্কতার একটি বড়ো দিক হল তথ্য বা প্রমাণ ছাড়া দুটি ঘটনার সম্পর্ককে মেনে না নেওয়া এবং সেরকম তথ্য বা প্রমাণ হাতের কাছে না থাকলে ওই দুটি ঘটনার যোগসূত্রকে নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে যাওয়া।
তাই কেউ যদি তোমাকে বলে মইয়ের তলা দিয়ে যাওয়া ঠিক নয়, তাতে নাকি খারাপ হয়, তাহলে তোমার তাকে পরপর অনেকগুলো প্রশ্ন করা উচিত। খারাপ ঘটনা মানেটা কী? তোমার কাছে যেটা খারাপ ঘটনা আমার কাছে সেটা খারাপ নাও হতে পারে! ঠিক কী খারাপ ঘটনা ঘটে? কতক্ষণ বা কতদিন পরে এই খারাপ ঘটনা ঘটে? মাঝের এই সময়টাতে ঠিক কী কী ঘটছে বা ঘটতে পারে? তোমার মতন মইয়ের তলা দিয়ে যারা যায়নি তাদের জীবনেও কি এসব ঘটনা ঘটছে না বা ঘটে না? এর আগে এই মইয়ের তলা দিয়ে গেলে ঠিক কী হয় তাই নিয়ে কি কোথাও কোনও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির সঠিক জবাব না পেলে কিন্তু এটি নির্ভয়ে বলা চলে যে ঘটনাদুটির সম্পর্ক রয়েছে কি না সেই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।
ফরাসি মনীষী ভোলতেয়ার একবার বলেছিলেন, কোনও মানুষকে চিনতে হয় তার উত্তর দেওয়া দেখে নয়, তার প্রশ্ন করা দেখে। উত্তর দেবার পাশাপাশি আমরা যদি ঠিক মতন প্রশ্ন করতে শিখি, তাহলে কিন্তু কুসংস্কার আমাদের জীবন আর আগের মতন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই কাজটি করতে গেলে অবশ্য শুধু বুদ্ধি নয়, সাহসও প্রয়োজন। অনেক সময়, যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে, তারা অন্যদের এত প্রশ্ন করা পছন্দ করে না। সাধারণ মানুষ কুসংস্কারে ডুবে থাকলে, ভয়ে থাকলে ক্ষমতাবানদের সুবিধে বৈ অসুবিধে নেই। প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতা তাই এই প্রশ্ন করার একটি দিক। কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর মতন লোকেদের প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসকে আঘাত করার ব্যাপারটাকে সেই যুগের চার্চ ভালোভাবে নেয়নি। জিওদার্ন ব্ৰুনোকে তো পুড়িয়েই মারা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অন্যরা। পৃথিবীতে যে দেশের নাগরিকেরা এই ক্রমাগত প্রশ্ন করার কাজটি সফলভাবে করেছে, বিজ্ঞানে সেই সেই দেশেরাই এগিয়ে গেছে অন্যদের চেয়ে। তাই কুসংস্কারকে আঘাত করতে গেলে বিশেষ করে তা যদি প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, বুকের পাটারও প্রয়োজন রয়েছে।
আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম শরদিন্দুর একটি গল্প দিয়ে। শেষও করছি শরদিন্দুরই অন্য আরেকটি গল্প দিয়ে।
জেনারেল ন্যাপলাকে মনে আছে? সেই ন্যাপলা যে বাংলার মাস্টারমশাই বলাইবাবুকে আচ্ছা করে জব্দ করেছিল। বলাইবাবু সেটা কিন্তু ভোলেননি। ওঁত পেতে উনি বসে ছিলেন ন্যাপলাকে পরীক্ষায় ফেল করানোর জন্য। পরীক্ষার ভয়ে ভীত ন্যাপলা তাই এক বন্ধুর সাথে গেল স্বামী চপেটানন্দর কাছে। এই স্বামীজিটির একটি থাপ্পড় সহ্য করতে পারলেই নাকি সব কার্যসিদ্ধি হয়। কিন্তু ন্যাপলা কি শেষরক্ষা করতে পারল? বলাইবাবু কি মনের সুখে ওকে প্রচুর গোল্লা দিলেন না? বেচারা ন্যাপলা চড়ও হজম করল, পাসও করতে পারল না! ন্যাপলার মতন অবস্থায় আমরা তাহলে কী করব? আমরা কি তাহলে বিপদে পড়লেই  সাধু-সন্ন্যাসী-বাবা-মহারাজদের আশ্রয় নেব? বিপদ মানুষকে অনেক সময় খুব দুর্বল করে তোলে। জলে ডোবা মানুষ যেমন অনেক সময় খড়কুটো আঁকড়ে ধরেও বাঁচতে চায়, মানুষও অনেক সময় বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। একথাও কোনওভাবে অস্বীকার করা যায় না, বিজ্ঞান তা অস্বীকারও করে না যে বিশ্বাস অনেক সময় আমাদের শক্তি যোগায়। শুধুমাত্র বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে মানুষ সেই প্রাচীনকাল থেকে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। বড়ো কোনও ম্যাচের আগে প্লেয়াররা বা যুদ্ধের আগে সৈনিকেরা অনেক সময় নানারকমের কুসংস্কারে ভোগে। চতুর ক্যাপ্টেন বা সেনাপতি নিজে কুসংস্কারাচ্ছন্ন না হলেও কিন্তু এগুলিকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, এই সময়ে তাদের বিশ্বাসে আঘাত করেন না। তার কারণ চতুর ক্যাপ্টেন বা সেনাপতি  জানেন যে একবার যদি ব্যর্থ হবার ভয় আমাদের মনের মধ্যে বাসা বাঁধে, সেই ভয়ই ব্যর্থতার আসল কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশ্বাসের জোর আমাদের ভালো করলেও, সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন এই বিশ্বাসের মাত্রা বেড়ে উঠে সর্বগ্রাসী হয়ে আমাদের সমস্ত যুক্তিবোধকে এক এক করে দূরে সরিয়ে দিতে থাকে।
আমাদের দেশ স্বাধীন দেশ। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক যারা তারা নিজেরাই ঠিক করবে কী তারা করবে আর কী না করবে। তাই তোমরা কী করবে না করবে, নিজেদের জীবনে বিশ্বাস আর যুক্তিবোধকে কতটা করে মূল্য দেবে, বড়ো হয়ে তা ঠিক করবে তোমরা নিজেরাই। শুধু একটা কথা মনে রেখো। একথা সত্যি যে বিজ্ঞান সবকিছু এখনও প্রমাণ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও সবকিছু পারবে না। যত আমরা জানব, অজানার পরিমাণও তত বেড়ে চলবে। বিজ্ঞান এরকম দাবিও করে না যে সে সব জানে বা একদিন সব জানবে। বিজ্ঞান শুধু আস্তে আস্তে নিজেকে উন্নত থেকে উন্নততর করে তোলে। যে ঘটনার ব্যাখ্যা আমরা আজ দিতে পারছি না, কালকের উন্নততর বিজ্ঞান সেই ব্যাখ্যা দেবে এমন ভরসা রাখা তাই অন্যায় নয়।
কী করে বিজ্ঞান এই কাজ করে? হাজার হাজার বিজ্ঞানের গবেষক ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণাগারে প্রতিনিয়ত তারা বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এই গবেষকদের অনেকেই কিন্তু ঋষিতুল্য। এঁরাও সাধক। প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্য সমাধানের জন্য শুধুমাত্র একবুক ভালোবাসা নিয়ে দিনের পর দিন এঁরা তপস্যা করে চলেছেন বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে চলার লক্ষ্যে।
স্বাধীনতার অন্য পিঠ হল দায়িত্ব। কোন সাধকের উপর ভরসা রাখবে তোমরা—ধর্মের সাধক, নাকি বিজ্ঞানের সাধক, সেই স্বাধীনতা যেমন তোমাদের, তোমাদের নিজস্ব সেই পছন্দের সব দায়িত্বও কিন্তু তোমাদেরই।

(এই প্রবন্ধটি লেখক তাঁর আই.এস.আই-এর শিক্ষাগুরু অধ্যাপক নিত্যানন্দ সরকারের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন)

1 comment: