প্রবন্ধঃ মেঘের দেশে সে এক স্কুলঃ অরিন্দম দেবনাথ



পৃথিবীর বহু দেশে অনেক স্কুল আছে যেসব স্কুলে পৌঁছনই পড়ুয়াদের কাছে এক যুদ্ধ জয় করার সামিল। বিপদজনকের থেকেও বিপদজনক সেরকমই এক স্কুলের গল্প শুনিয়েছেন অরিন্দম দেবনাথ 

চায়নার ইয়ান সাইচুন প্রদেশের হানিয়ুন পার্বত্য অঞ্চলের জিও ন্যাশানাল পার্কের মধ্যস্থিত দাদু নদী গিরিখাতের ধারের এক ছোট্ট গ্রাম গুলু। জিও ন্যাশনাল পার্ক, অনেকটা নেপালের ‘সাগরমাতা’ ন্যাশনাল পার্কের মতো। সাগরমাতা ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের উচ্চতম পর্বত এভারেস্ট। অনেক ছোটো ছোটো গ্রাম আছে এই ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে।

অন্যান্য অনেক পাহাড়ি গ্রামের মতোই গুলু গ্রামেরও বহির্জগতের সাথে বিশেষ যোগাযোগ নেই। আশেপাশে কিছু গ্রাম থাকলেও এই বিশাল পার্বত্য উপত্যকার অন্যতম নিয়মিত প্রাইমারি স্কুলটি এই গুলু গ্রামে। ১৯৫১ সাল থেকে চলে আসা এই স্কুলে প্রায় সাতাশ বছর ধরে ভালোবেসে আঁকড়ে পড়ে আছেন মাত্র একজন শিক্ষক শ্যেন কুইযেন। সেই ১৯৯২ সাল থেকে। এঁর বাড়িও স্কুল থেকে আড়াই ঘণ্টার হাঁটাপথ। প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত স্কুলের এই শিক্ষকের বাড়ি ফেরা হয় না সপ্তাহান্ত ছাড়া। স্কুল-অন্ত প্রাণ শিক্ষকের সেই সপ্তাহান্তও হয় বছরে মাত্র কয়েকবার। বর্ষা ও বরফ ঝরার দিনগুলো কাটে চরম অনিশ্চয়তায়। প্রায় বছরভর স্কুল থাকে মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে। কিন্তু এরকম স্কুল তো বিশ্বের বহু দেশে আছে। ভারতবর্ষের হিমালয়ের মাঝে অতি উচ্চতায় সারাবছর মেঘে ঢেকে থাকা স্কুল আছে অনেক। তবে দুনিয়ায় এত স্কুল থাকতে এই স্কুলের কথা কেন বলছি জানতে চাও?
শ্যেন কুইযেন - গুলু এলিমেন্টারি স্কুলের একমাত্র শিক্ষক
২০১৩ সালে একটি চাইনিজ খবরের কাগজে এই স্কুলের কথা ছবি সহ প্রকাশ পাবার পর এই স্কুলের কথা বাইরের দুনিয়ার লোক জানতে পারে। তার আগে ওই অঞ্চলে সাথে বাইরের জগতের একরকম কোনও পরিচয় ছিল না। কাছের বড়ো জনপদে পৌঁছতে হলে কম করে পাঁচ ঘণ্টা পায়ে হাঁটতে হয়। পায়ে হাঁটার রাস্তাও প্রায় ছিল না। কাছের গ্রামগুলো যেখান থেকে ছাত্রছাত্রীরা এই স্কুলে পড়তে আসে তাদের পার হয়ে আসতে হয় অতি বিপদজনক রাস্তা। আর প্রাণ হাতে এই রাস্তায় চলাচলের ছবি হলিউডের যেকোন অ্যাডভেঞ্চার সিনেমাকেও পেছনে ফেলে দেবে। কোথাও কোথাও গুলু গ্রামে যাবার এই রাস্তা গেছে প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে। সে রাস্তাও মাত্র ১৬ ইঞ্চি চওড়া। পাহাড়ের গায়ে পাথরের খাঁজে পা রেখে এগোতে হয় সে রাস্তা ধরে। তুষার ঝরার দিনে বা বর্ষায় সে পথ হয়ে ওঠে ভয়ংকর। পাহাড়ি ছাগল বা তুষার চিতাও সে রাস্তায় স্বচ্ছন্দ নয়। একবার পা ফসকে গেলে ঠাঁই হবে কয়েক হাজার ফুট নিচে নদীর বুকে। গুলুর আশেপাশের গ্রামের শিশুরা প্রতিদিন এই পথ ধরে যাতায়াত করে। আর তাদের পাথরের খাঁজে পা রেখে ঘরে ফেরার পথে তাদের আগলে নিয়ে যান তাদের একমাত্র শিক্ষক।

এই গ্রামে যাবার কোনও পথ ছিল না কিছুদিন আগেও। প্রশাসনের কাছে এরকম বহু গ্রামের খবরও থাকে না যদি না অধিকাংশ সময় সংবাদ মাধ্যম শোরগোল তোলে। চাইনিজ খবরের কাগজের পর অনুরূপ খবর ছবি দিয়ে ছাপল নিউইয়র্ক টাইমস। দুনিয়াসুদ্ধু হুলুস্থুল পড়ে গেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খবরের কাগজে ছাপা হল গুলু এলিমেন্টারি স্কুল ও তার ছাত্র-শিক্ষকের কথা। জানল শুধুমাত্র শিক্ষকের পড়ানোর উৎসাহে কীভাবে বেঁচে আছে একটি স্কুল।
প্রশাসন ২০০৩ সালে ‘লুওমা রোড’ নামে অউসি শহর থেকে এই অঞ্চলে আসার একটি পায়ে চলার রাস্তা তৈরি করেছিল। কিন্তু গাড়ি তো দুরস্থান, সে রাস্তা এত সঙ্কীর্ণ যে কোনওরকমে একটি খচ্চর কিম্বা ঘোড়া চলতে পারে সে পথের অধিকাংশ স্থানে। খাড়াই পায়ে চলা পথের খানিক অন্তর অন্তর একেকটি তীক্ষ্ণ বাঁক। একটু বেসামাল হলেই মৃত্যু এ পথে। ‘লুওমা রোড’ হবার পরে গুলু গ্রামের সাথে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ সামান্য বেড়েছিল। আর এই পথ দিয়েই ওই গ্রামে পৌঁছেছিলেন এক সাংবাদিক।
গুলু গ্রামে যাবার পথ
শুরুর কিছুদিন পর গুলু এলিমেন্টারি স্কুল মুখ থুবড়ে পড়েছিল। শ্যেন কুইযেন এসে যখন যেচে এই স্কুলের দায়ভার নিলেন, তখন দেখলেন স্কুল ছাত্র বসাবার অবস্থায় নেই। একটা মাটি-পাথরের ঘর আছে ঠিকই, কিন্তু তার মাথায় আচ্ছাদন বলে কিছু নেই। অভিভাবকদের বুঝিয়ে প্রতিদিন বিপদজনক রাস্তা পার করিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে হাজির করিয়ে যে শিক্ষা দেবেন তুষারপাত আর বর্ষায়, তাদের বসাবেন কোথায়? গ্রামের হতদরিদ্র লোকজনদের জুটিয়ে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মাটি-পাথর-ডালপালা দিয়ে কোনওরকমে স্কুলের মাথায় চালা দিলেন তিনি। গড়ে  তুললেন তিনটি ঘর। শিশুদের জন্য দেশজ পদ্ধতির শৌচালয় গড়লেন গ্রামবাসীদের নিয়ে। কারণ, তিনি শুনেছেন এই স্কুলে কোনও শৌচালয় না থাকায় যে দুয়েকজন পড়তে আসত তাদের কয়েকজন পাথরের আড়ালে শৌচকর্ম করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে দাঁত-মুখ ভেঙেছে। অনেক কষ্ট করে জোগাড় করলেন পড়াশুনার সরঞ্জাম। দিনের পর দিন ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে ছাত্র ও অঞ্চলের সবার সমীহ আদায় করে শিশুদের ন্যূনতম শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন তিনি। পাহাড়ি ঢালে স্কুলের একপাশে গাছের ডালপালার বেড়া দিয়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিন্ত করলেন। কারণ, অন্যমনস্ক শিশুদের কেউ ঢাল বেয়ে পড়ে গেলে তার ঠাঁই হবে কয়েক হাজার ফুট নিচে বয়ে চলা দাদু নদীর বুকে। স্কুলের বাচ্চাদের খেলাধূলার চর্চা করাতে বাস্কেট বল জোটালেন। কারণ, এতে ফুটবল খেলার মতো বড়ো মাঠ লাগে না। কিন্তু সেই বাস্কেট বলও খেলতে হয় অতি সন্তর্পণে। জোরে বল মারা মানা। একবার বল পাহাড়ি খাদ বেয়ে গড়িয়ে গেলে তা খুঁজে তুলে নিয়ে আসতে লেগে যাবে কম করে একটি গোটা দিন।
চায়নাতে শিক্ষাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাহায্য আসতে শুরু করল জনসাধারণের কাছ থেকে। ধীরে ধীরে স্কুলের দুটো ঘর কংক্রিটের হল। ছাত্রদের জন্য পড়াশুনার সরঞ্জাম, পোশাক-আশাক আসতে শুরু করল খচ্চরের পিঠে চেপে, এমনকি এই স্কুলে পড়ানোর জন্য উচ্চশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক আসতে শুরু করল। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকরা থাকতেন কয়েক মাসের জন্য। আবার আসতেন কেউ।
গ্রামে সৌরশক্তি চালিত বিদ্যুৎ এল। প্রশাসন স্কুলে চিঠি পাঠাল বাচ্চাদের শহরের আবাসিক স্কুলে পাঠানোর জন্য। কয়েকজন গেলেও সবাই যেতে পারল না। কারণ, স্কুলে পড়া ও থাকা খাবার খরচা গুলু স্কুলের জন্য আসা আর্থিক সাহায্য থেকে মিটে গেলেও আনুষঙ্গিক খরচা দরিদ্র গ্রামবাসীরা বহনে অক্ষম। শুধু তাই নয়, অধিকাংশই ভীত ছিলেন বাচ্চাদের বাইরে পাঠাতে।
কিছুদিন পর প্রশাসন আবার স্কুলে চিঠি পাঠাল সব বাচ্চাদের শহরের স্কুলে পাঠানোর জন্য। সাথে এও জানাল এতদিন ধরে স্কুল আঁকড়ে পরে থাকা শিক্ষক শ্যেন কুইযেন গুলু স্কুলের বাচ্চাদের দেখভালের জন্য শহরের স্কুলেই থাকবেন। বাচ্চাদের রাহা খরচের ব্যবস্থা করা হবে। প্রাণে বল পেলেন গুলু গ্রামের বাসিন্দারা। শ্যেন কুইযেন শুধু বাচ্চাদেরই নয়, তাদেরও অভিভাবক। যোগ্য অভিভাকের হাতে শিশুদের ছাড়তে কেউই পিছপা হলেন না। সামান্য শিক্ষিত এক শিক্ষক ইচ্ছাশক্তিতে পালটে দিলেন কতশত শিশুর ভবিষ্যৎ।

শহরের স্কুলে পড়তে যাবার আগে শিশুরা স্কুলের বোর্ডে লিখেছে ‘আমরা তোমায় ভালোবাসি গুলু স্কুল।’

ছবিঃ সিপা প্রেস / রেক্স ফিচার

No comments:

Post a Comment