চলো যাইঃ গ্লেনমেরির কাছে অচিন দার্জিলিংঃ অরুণাভ দাস



মার্চ মাসের মাঝামাঝি শিলিগুড়ি থেকে অচিন পথে পাড়ি দিয়েছি। গন্তব্য তাকদা চা-বাগান। কিন্তু অর্কিড কালচার সেন্টারের জন্য যে তাকদা বিখ্যাত, এটা সে জায়গা নয়। যদিও দুটোই দার্জিলিং জেলায়। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার চেনা রাস্তায় কার্শিয়াং হয়ে অনেকবারই তো গিয়েছি। আজ সেবক রোড ধরে রম্ভি পর্যন্ত। তারপর বাঁদিকে মংপু যাওয়ার রাস্তায় পাক খেয়ে ওপরদিকে উঠে যাওয়া। মাঝখানে বাঙালির ঠাকুরবাড়ি মংপুতে একটু থামা। এখানেই তো সিঙ্কোনা ফ্যাক্টরির পাশে কোয়ার্টারে মৈত্রেয়ীদেবী ও তাঁর স্বামী ডাঃ মনোমোহন সেনের আতিথ্য নিয়ে একাধিকবার দীর্ঘ সময় যাপন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই স্মৃতিচিহ্ন দেখতে অনেকেই আসেন। প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ কবির জন্মদিনে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্র, হোমিওপ্যাথি চর্চার আয়োজন ইত্যাদি এক ঝলকে দেখে নিয়ে আবার রওনা পাহাড়ি পথে। এই রাস্তা মিশেছে ঘুম ও জোড়বাংলো থেকে লামাহাট্টার দিকে মানে, দার্জিলিং থেকে সিকিম যাওয়ার ব্যস্ত রাস্তায়। কিন্তু মংপু থেকে ‘তিন মাইল’ নামে ওই মোড়ের মাথা পর্যন্ত অতি শুনশান। সবুজের জলসাঘরে প্রকৃতির মায়ার আঁচল পাতা। চলার নেশা যেন পেয়ে বসে। দু’পাশে প্রাচীন অরণ্য। ওপরে নিচে আলো-ছায়ার মায়াময় জাফরি। অপ্রচলিত পথে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির ভিড় থাকে না বলে আরও মজা। মন গেয়ে ওঠে, ‘এলেম নতুন দেশে।’

মংপু ছাড়ার ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পরে পৌঁছে যাই তিন মাইল মোড়ের মাথায়। এই রাস্তা এখানেই শেষ। নতুন পথে বাঁদিকে সামান্য গেলেই জোড়বাংলো, সেখান থেকে দার্জিলিং ১৫ মিনিট। আপনাদের গাড়ি ঘুরবে ডানে, লামাহাট্টা ও পেশক চা-বাগান হয়ে তিস্তাবাজারের দিকে। কিন্তু ওগুলির কোনওটাতেই আজ যেতে হবে না। ডাকছে অচিন ঠিকানা।
লামাহাট্টা প্রবেশের ঠিক আগে তাকদা চাবাগানের রাস্তা বাঁদিকে নেমে গিয়েছে। একটা বাঁক ঘুরতেই বাগিচার চোখ-জুড়নো সবুজ সাম্রাজ্য। যতদূর চোখ যায়, পটে আঁকা ছবির মতো দৃশ্যাবলি। গাড়ি থামিয়ে ঘুরে বেড়ানো, মনে মনে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ানো প্রকৃতির কোলে। অফুরান সবুজ ছুঁয়ে ফটো সেশন ভালোই জমল। ছায়াময় শেড-ট্রির ওপরে নীলাকাশ দিগন্ত ছুঁয়েছে। ধোঁয়া ধোঁয়া পাহাড়ের মাথায় একটি শহরের আভাস। ওটাই দার্জিলিং। আরেকটু চলার পর চা-বাগান কর্মীদের পাড়া। চা-বাগিচার পটভূমিকায় ছবির মতো সুন্দর। পথপাশের চা-দোকানে বসে ক’মিনিট কাটাই, তারপর এক দৌড়ে গ্লেনমেরি হোম-স্টে। এটাই তাকদা বাগানের সীমানায় একমাত্র অতিথি নিবাস। ভাঙাচোরা রাস্তা আরও নিচে গ্লেনবার্ন চা-বাগানে নেমে গিয়েছে। সেখানে ব্রিটিশ আমলের নানা স্থাপত্য ও প্রকৃতির রূপ দেখতে যেতেই পারেন। গ্লেনবার্নে টি ট্যুরিজমের বিকাশ ঘটানো হয়েছে, কিন্তু খরচ সাধারণ লোকের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গ্লেনমেরি হোম-স্টে কম সুন্দর নয়। ফুলের জলসার মধ্যে একতলা তিনটি কটেজের সমাহার। দুটিতে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা। অন্যটিতে ডাইনিং হল। পারিবারিক পরিমণ্ডলে অন্যরকম দিন যাপনের রঙিন আয়োজন। কটেজগুলি আধুনিক ও সুন্দরভাবে সাজানো। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণের জায়গা ব্যালকনি। সামনেই দার্জিলিং শহর। সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে সাড়ে সাত হাজার ফুটে কংক্রিটের জঙ্গল দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই আবার মন মেরামতের এলাহি ব্যবস্থা করে রেখেছে পরমা প্রকৃতি। সামনে ও আশেপাশে নানারকম ফলের বাগান। ঝোপে ঝোপে নানা রঙের ফুল। হালকা শীতের আমেজ নিয়ে গ্রামের পথে ও বাগানে ঘুরে বাকি দিনটা মহা মজায় কেটে যাবে। গ্লেনমেরির আরেক আকর্ষণ ঢালাও খাওয়াদাওয়া। আর কোনও হোম-স্টেতে আমার অন্তত এখানকার মতো বৈচিত্র‍্যময় খাদ্যগ্রহণের অভিজ্ঞতা হয়নি। বাড়ির লোকেরা পরম যত্নে রান্না ও পরিবেশন করেন। এই আন্তরিকতা ভ্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

শীতের সন্ধ্যা ব্যালকনিতে বসে দার্জিলিং শহরের আলো দেখে কেটে যায়। ডানদিকে অপেক্ষাকৃত নিচু একটা পাহাড়ের ঢালে শহরের মতোই হাজার আলোর ঝলকানি। ওটা দক্ষিণ সিকিমের জেলা সদর নামচি। সন্ধে নামার পরেই ঘুমিয়ে পড়ে তাকদা চা-বাগান। কাছের আলোগুলো নিভে গেলে দার্জিলিংয়ের আলো আরও জ্বলজ্বল করে ওঠে। বারান্দায় আড্ডা চলে দীর্ঘক্ষণ।
পরদিন নিচের পাহাড়ে আলো ফোটার আগেই শীত-পোশাক জড়িয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। দার্জিলিংয়ের পর্যটকরা যে দৃশ্য দেখার জন্য রাত থাকতে গাড়ি চড়ে টাইগার হিল যান, সেটা এখান থেকে দেখা যায় অনায়াসে। তার জন্য অবশ্য আকাশ মেঘহীন থাকা চাই। ডানদিকের দিগন্তে, যেদিকে নামচি শহর, ক্রমশ আলো পড়বে বরফ-রাজ্যের দেয়ালে৷ নতুন দিনের কমলা আলোয় উদ্ভাসিত হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, জানু, পাণ্ডিম ইত্যাদি শৃঙ্গের বরফ-শরীর। চিরনতুন এক তুলনাহীন রঙ বদলের খেলা। পুরোপুরি দিনের আলো ফুটে ওঠা পর্যন্ত নড়া যায় না ব্যালকনির ওপাশ থেকে। ক্রমে নতুন আলোয় ঝলমল করে ওঠে দার্জিলিং শহরের বাড়িঘর। দূরে সহজে চিনে নিতে পারি নামচি শহরের অন্যতম আকর্ষণ সমদ্রুপসে পাহাড়ের ওপরে গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তি। ফেরার পথে আর একবার ঘুরে নেওয়া তাকদা চা-বাগানের সবুজ সাম্রাজ্যে আলো-ছায়াময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা-নিকেতন।


দরকারি তথ্যঃ শিলিগুড়ি থেকে তাকদা চাবাগানের গ্লেনমেরি হোম-স্টে প্রায় ৬৫ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া সুবিধাজনক। দার্জিলিং থেকে কমবেশি ৩০ কিমি। এখান থেকে সহজে গ্লেনবার্ন চা-বাগান ও লামাহাট্টা বেড়িয়ে আসা যায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায়। একমাত্র থাকার জায়গা গ্লেনমেরি হোম-স্টে।

ছবিঃ লেখক

1 comment: