না-মানুষের পাঁচালিঃ ওদের শীত করে নাঃ তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়




সুমেরু বা উত্তরমেরুর শীতকাল৷ দিগন্ত জুড়ে শুধু বরফ৷ কোথাও কোনও প্রাণীর চিহ্নমাত্র দেখা যায় না৷ সেখানে কোনও কপাল ফেরে আপনি যদি গিয়ে পড়েন, হয়তো দেখতে পাবেন ধপধপে সাদা, ঘরোয়া বেড়ালের সাইজের একটা প্রাণী টিকটিক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঐ ঠাণ্ডায়, বরফের প্রান্তরে৷ প্রাণীগুলোর গড় ওজন সাড়ে তিন কিলোগ্রাম৷ শীতকালে ওখানকার উষ্ণতা শূন্যের ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তলায় পর্যন্ত নেমে যায়, তবুও কোনও বিকার নেই ওদের৷ উত্তরমেরুতে আজ পর্যন্ত যত অভিযাত্রী গেছেন, সবচেয়ে ফাঁকা, সবচেয়ে ঠাণ্ডা সেই জায়গা, কোনও প্রাণীর বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা যেখানে নেই, সেখানে তারা দেখা পেয়েছেন এই প্রাণীটির—সুমেরুর শেয়াল ( Arctic Fox )৷
১৮৫৩ সালে এলিশা কেন্ট উত্তরমেরু অভিযানে গিয়ে এল্লেসমিয়ার দ্বীপের কাছে জাহাজ সমেত বরফে আটকে পড়েন৷ অভিযাত্রীরা অনেক সমস্যায় পড়েছিলেন, যার মধ্যে একটা বড়ো সমস্যা ছিল জাহাজের ভেতর ইঁদুরের উপদ্রব৷ বিভিন্নরকম চেষ্টা করেও এ উপদ্রব থেকে নিজেদের বাঁচানো যাচ্ছিল না৷ সেই দলের একজন যাত্রী, গডফ্রে একটা সুমেরুর শিয়াল ধরতে পেরেছিল৷ তার নাম দেওয়া হয়েছিল জ্যাক৷ তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল জাহাজের ডেকের ভেতর, ফল হয়েছিল চমৎকারের চেয়েও বেশি৷ আধঘণ্টার ভেতর সে যতগুলো ইঁদুর মেরেছিল, জাহাজের বাকি সব যাত্রী মিলে দু’দিনেও ততগুলো মারতে পারেনি৷ আসলে সুমেরুর শিয়ালের একটা স্বাভাবিক খাবার হল ইঁদুর৷
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুমেরুর শেয়াল প্রাকৃতিক অভিযোজনের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ৷ একটা ছোট্ট, ধপধপে সাদা বেড়ালের মতো ফুটফটে প্রাণী৷ ভীষণ ধূর্ত, খুব দ্রুতগতি, বিস্ময়করভাবে বেঁচে থাকতে পারে যেখানে কোনও খাবার নেই সেখানেও৷ যখন উত্তরমেরুতে ভাল্লুকেরা শীতঘুমে চলে গেছে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে, সিলমাছ জলের তলায়, অন্য প্রাণীরা পরিযায়ী হয়ে ছেড়ে গেছে এলাকা, উষ্ণতা শূন্যের অনেক অনেক তলায়, সেই ঠাণ্ডায়, ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে ফাঁকা বরফে মোড়া প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় এরা৷ উত্তরমেরুর প্রায় সব দ্বীপে আছে এরা, আছে কানাডায়, আইসল্যান্ডে, গ্রিনল্যান্ডে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ায়৷ পশ্চিম রাশিয়ার উত্তরে আগ্নেয়গিরির লাভা দিয়ে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটা ছোটো ছোটো দ্বীপ আছে৷ সেসব জায়গায় হাতে গোনা যে কয়েকটা প্রাণী দেখা যায়, তাদের মধ্যে আছে সুমেরুর শেয়াল৷ সাইবেরিয়ার বেশ কিছু অংশ মানুষের তৈরি মানচিত্রে এসেছে এই সেদিন ১৯৩৩ সালে, সেখানে এরা আছে৷ উত্তরমেরুর যেসব জায়গায় বরফ বছরের কখনও পুরোপুরি গলে যায় না আজও, এরা ঘোরাফেরা করে সেখানেও৷
আজ পৃথিবীতে শেয়াল পরিবারের ১৪টি প্রজাতি বাস করে৷ তার মধ্যে এশিয়া, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে পরিচিত লাল শেয়াল, এরা আজ প্রায় ৮৩টি দেশের বাসিন্দা৷ শেয়ালদের ভেতর কিট-শেয়াল আর সুইফট-শেয়াল সুমেরুর শেয়ালদের মতো ছোট্ট প্রাণী, ওজন ২ থেকে ৩ কেজি ৷ বিজ্ঞানীরা জিন পরীক্ষা করে দেখেছেন, শেয়ালদের ভেতর সুমেরুর শেয়াল সবচেয়ে কাছের উত্তর আমেরিকার সুইফট-শেয়ালদের সঙ্গে৷ সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে উত্তরমেরুতে বরফ জমতে শুরু করেছিল৷ তখনই এই সুইফট-শেয়ালদের শুরু হয় সেই ঠাণ্ডার সঙ্গে মানিয়ে নেবার পালা৷ বিজ্ঞানীরা মনে করেন ১.২ কোটি থেকে ৮০ লক্ষ বছর আগে এরা নিজেদের স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল৷ সুমেরুর শেয়াল দিন কাটিয়েছে ডাইনোসরদের সঙ্গে, সাইবেরিয়ার সেই বিখ্যাত বড়ো বড়ো দাঁতওলা শিকারী প্রাণীদের সঙ্গে৷ ডাইনোসরেরা অনেকদিন হল পাততাড়ি গুটিয়েছে পৃথিবী থেকে। এরা কিন্তু আজও রাজত্ব করছে উত্তরমেরুর বরফের প্রান্তরে৷
১৯৪৭ সালে আমেরকার নৌসেনা আলাস্কায় একটা গবেষণাগার তৈরি করেছিল। ওরা জানতে চেষ্টা করেছিল কত কম উষ্ণতায় সুমেরুর শেয়াল বাঁচতে পারে৷ আলাস্কার গবেষণাগারে -৩০˚c থেকে কম উষ্ণতা করার ব্যবস্থা ছিল না। দেখা গেল এতে ওদের কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না৷ দুটো শেয়ালকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওয়াশিংটনে৷ প্রথমে দেখা গেল -৫৮˚c  উষ্ণতায় দু’ঘণ্টা পর্যন্ত ওদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না৷ শেষপর্যন্ত দেখা গল -৭০˚c উষ্ণতায় এদের শীতের অনুভূতি হচ্ছে। প্রথমে থাবা চাটতে শুরু করেছিল, তারপর গুটলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আধঘণ্টা পর কাঁপতে শুরু করেছিল ৷ উষ্ণতা -৮০˚c নামালে দেখা গেল পাঁচ মিনিটের মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে, কিন্তু শরীরের ভেতরের উষ্ণতার তখনও কোনও পার্থক্য দেখা যায়নি৷ বেশি ঠাণ্ডা পড়লে গরম রক্তের প্রাণীরা নিজেদের শরীরের কোষে কোষে বিপাকের কাজ বাড়িয়ে শরীরের তাপ বজায় রাখে৷ কম উষ্ণতায় সুমেরুর শেয়ালদের রকম-সকম দেখে বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছে -১২০˚c উষ্ণতাতেও এরা বেঁচে থাকতে পারবে শরীরের বিপাক বাড়িয়ে নিয়ে৷ বিজ্ঞানীদের ভাষায় সুমেরুর শেয়ালদের বেঁচে থাকার ‘সর্বনিম্ন সংকটপূর্ণ উষ্ণতা’ (lower critical temperature) -৮০˚c, পৃথিবীতে বাস করা সমস্ত প্রাণীর ভেতর সবচেয়ে কম৷
প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় সুমেরুর শেয়াল৷ গরমে এদের গায়ের লোমের রং থাকে বাদামি, শীতকালে সেটা বদলে গিয়ে হয়ে যায় ধপধপে সাদা ৷ শীতে ওপরের বড়ো লোমের তলায় গজিয়ে ওঠে আর এক স্তর ছোটো সাদা লোম৷ পরীক্ষা করে দেখা গেছে এদের লোমের তাপ পরিবহণ ক্ষমতা ভেড়া, ইঁদুর বা মেরু-ভল্লুকদের চেয়ে অনেক কম। এই লোম ওদের শীত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে৷ প্রাণীটার আকারের তুলনায় এদের ঝালরের মতো লেজটা বেশ বড়ো। প্রয়োজনে এটাকে কম্বলের মতো পেতে এরা দিব্যি শুয়ে পড়তে পারে৷ এদের শরীরের উষ্ণতা শীতকালেও ৩০/৩২˚c-এর আশেপাশে থাকে। তবে শীতকালে এদের থাবাগুলোর উষ্ণতা ১˚c হয়ে যায়। ফলে ঠাণ্ডা বরফের তুলনায় উষ্ণতার তফাত থাকে কম, তাপ পরিবহণ হয় কম, ঠাণ্ডা কম লাগে৷ সুমেরুর শেয়ালের সবচেয়ে বড়ো অভিযোজন, এরা শরীরের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম উষ্ণতা বজায় রাখতে পারে প্রয়োজন অনুসারে৷ এটা তারা করে বিভিন্ন অঞ্চলের কোষে আলাদা আলাদা বিপাকের হার বা খাদ্য থেকে তাপ উৎপন্ন করার হার বজায় রেখে৷
উত্তরমেরুতে বেঁচে থাকার একটা বড়ো সমস্যা খাবার৷ এদের সাধারণ খাদ্য একধরনের ইঁদুর, যাকে বলা হয় লেমিং৷ তবে এই ইঁদুরদের সংখ্যা সব বছর সমান থাকে না, কখনও বাড়ে, কখনও কমে৷ লেমিং-এর সংখ্যা বাড়লে শিয়ালদের পরিবারও বড়ো হয়, কম থাকলে ছোটো৷ এদের তুন্দ্রা অঞ্চলে হাঁসেদের ডিম পাড়ার সময় ডিম চুরি করে পুঁতে রাখতে দেখা গেছে৷ পরে ওরা লুকিয়ে রাখা খাবার ঠিক খুঁজে নিতে পারে৷ এরা হাঁসেদের ছানা তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে খায়৷ এরা খুব ভালো ঝাড়ুদার, ভাল্লুকের খেয়ে যাওয়া সিলমাছের অবশেষ দিব্যি খেয়ে হজম করে৷ একবার একদল অভিযাত্রী দেখেছেন, শীতকালে প্রায় দেড় ফুট বরফ খুঁড়ে একটা শেয়াল পৌঁছে গেছে একটা মরা তিমি মাছের শরীরে, যা ওর পক্ষে বেশ বড়ো খাবারের জোগাড়৷
সুমেরুর শেয়ালদের ঘ্রাণ শক্তি খুব তীক্ষ্ণ। কোনও ধরনের খাদ্য, তা সে বরফে চাপা পড়া মরা পাখি বা মরা ইঁদুর হোক না কেন, সহজেই খুঁজে বার করে৷ এছাড়া মানুষের বসতির আশেপাশের ডাস্টবিনে এদের ঘুরতে দেখা গেছে ফেলে দেওয়া খাবার খেতে৷ সব মিলিয়ে মানতেই হবে, যেকোনও পরিবেশে বা অবস্থায় এদের মানিয়ে নেবার ক্ষমতা অসাধারণ৷
এই মানিয়ে নেবার ক্ষমতার প্রকাশ তাদের দেখা যায় সন্তান পালনের সময়ও৷ সুমেরুর গরমে তারা সময় পায় মাত্র নব্বই দিন সন্তান বড়ো করবার জন্যে৷ এদের সন্তানের সংখ্যা নির্ভর করে খাদ্যের জোগানের ওপর। খাবারের জোগান ভালো থাকলে ছানা বেশি হয়, কম থাকলে কম৷ আইসল্যান্ডের উপকূলে খাবারের জোগান স্বাভাবিক, সেখানে এদের তিন থেকে ছ’টা পর্যন্ত ছানা হয়৷ সন্তান পালনের জন্যে এরা মাটির তলায় প্রায় একটা শহর গড়ে তোলে৷ তাতে প্রায় একশোটা ঢোকবার বেরোবার পথ থাকে৷ খুব ছোটো অবস্থায় বাচ্চাগুলো একেবারে ভেতরের দিকে থাকে অন্য শিকারির হাত থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্যে৷ একবার মেরু-অভিযাত্রীদের একটা দল মেরু-ভাল্লুককে শেয়ালের একটা বাসা খুঁড়তে খুঁড়তে হাল ছেড়ে দিতে দেখেছে৷ তবে একটু বড়ো হয়ে যখন ছানাগুলো গর্তের বাইরে আসে তাদের অনেকেই শিকার হয়ে যায়৷ এদের শিকার করে ঈগল, তুষার পেঁচা, ভাল্লুক৷ তবে সুমেরুর শেয়ালদের ছানাদের শিকারে মারা যাওয়ার হার খুবই কম৷ ওদের মৃত্যু বেশি হয় রোগে৷ ওদের আরেক বড়ো শত্রু মানুষ৷ মানুষ সুমেরু-শেয়াল ধরে নিয়ে পোষে, চামড়া ছাড়িয়ে কোটের কলার বানায়৷ এই একটা জায়গায় সুমেরুর শেয়াল সবচেয়ে কম নম্বর পাবে, শেয়াল পরিবারে এরাই সবচেয়ে বেশি ফাঁদে ধরা পড়ে৷
তবে জলাতঙ্ক রোগের মহামারিতে এরা খুব অসহায়৷ সুমেরুর শেয়াল জলাতঙ্ক রোগের জীবাণু বহন করে৷ মহামারি হয় ওদের সুখের সময়, যখন লেমিং ইঁদুর পাওয়া যায় খুব বেশি, শেয়ালের সংখ্যাও বেশি৷ তবে প্রতিবছর কত শেয়াল জলতঙ্ক রোগে মারা গেছে তার পরিষ্কার কোনও পরিসংখ্যান নেই৷

তথ্যসূত্রঃ Arctic Fox: Life at the Top of the World – Garry Hamilton

No comments:

Post a Comment