গল্পঃ বুড়ির ঘরঃ দেবীস্মিতা দেব


তিন্নির দাদা টুবাইদা, রিমির দাদা তুহিনদা, তারপরে ওই যে আমাদের উলটোদিকের অ্যাপার্টমেন্টের পার্থদা, বাপ্পাদাーওরা প্রতিবছরই বুড়ির ঘর বানায়। ওরা তো বড়ো, তাই ওদেরকে কেউই মানা করে না। আমাদের বেলাতেই শুধু যত রাজ্যের আপত্তি। আমাদেরও তো একটু-আধটু মজা করতে ইচ্ছে করে, নাকি? আমাদেরও প্রত্যেক বছরই ওদের মতো করে বুড়ির ঘর বানাতে ভীষণ ইচ্ছে করে। কিন্তু দাদাদের একথা বললে ওরা ওদের বুড়ির ঘরে আমাদের তো নেয়ই না, বরং মজা করে বলে, ‘তোরা এখনও অনেক ছোটো আছিস। আগে বড়ো হ। তারপর না হয় দেখা যাবে।’
আমরা তাই খুব বুঝতে পেরেছি যে দাদাদের বলে কিছুই হবে না। তার চেয়ে যে করেই হোক আগে আমাদের মা-বাবাদের এ বিষয়ে রাজি করাতে হবে। অনেকদিন ধরেই বুড়ির ঘর তৈরির ব্যাপারে আমরা তাই যে যার মা-বাবাদের কাছে জোর বায়না করতে শুরু করেছি। কিন্তু মা-বাবারা কোনওভাবেই আমাদের একা ছাড়তে রাজি নয়। ওদেরও সেই এক কথা, ‘আগে দাদাদের মতো বড়ো হও, তারপর না হয় দেখা যাবে।’
আর কত বড়ো হব? তাই আমরাও এবারে একেবারে নাছোড়বান্দা। আমাদের রকমসকম দেখে মা-বাবারা আলোচনা করে ঠিক করল যে আমাদেরও এবার বুড়ির ঘর বানাতে দেওয়া হবে। তবে পুরো ব্যাপারটার তত্ত্বাবধানেই থাকবে নিনি আর গাবলুর বাবা আমাদের দীপককাকু। তাই ঠিক হল, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের পাশের মাঠেই তৈরি হবে আমাদের বুড়ির ঘর।
পৌষ-সংক্রান্তির আগের দিন সকাল থেকেই তাই আমাদের বুড়ির ঘর তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। তিন্নি, রিমি, তুতুল, বুবু, গাবলু, নিনি আর আমিーআমরা সবাই কাকুর কথামতো ঠিক সময়ে পৌঁছেও গেলাম মাঠে। দীপককাকুর তত্ত্বাবধানে আমরা জড়ো করতে থাকলাম বুড়ির ঘর তৈরির যাবতীয় সরঞ্জাম। ছোটো ছোটো বাঁশের টুকরো, লাঠি, একটু-আধটু খড় কুড়িয়ে কুড়িয়ে জড়ো করতে লাগলাম যে যার মতো করে। কাকু একটু দূরে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করতে থাকল আমাদের সবার কার্যকলাপ।
কিছুক্ষণ যাবার পর কাকু আমাদের বলল, “ওরে, অনেক লম্বা সাইজের বাঁশ লাগবে রে। আর বুড়ির ঘরের চাল তৈরি করতেও কিন্তু অনেকটা খড় দরকার। বুঝলি?”
কাকুর এমন কথা শুনে আমাদের কাজের উৎসাহে কোথায় যেন একটা বাধা পড়ল। আমরা তখন বিষণ্ণ দৃষ্টিতে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকলাম। কাকু সেটা আন্দাজ করে একটু মুচকি হেসে আমাদের আশ্বস্ত করে বলল, “এক কাজ কর। তোরা সবাই বরং এবার একটু বিশ্রাম কর। এসব নিয়ে আর একদম ভাবিস না। আমি কালকেই তোদের রহমান চাচা আর মফি চাচিকে বলে রেখেছিলাম। ওরা আজকে এগারোটা নাগাদ এসে আমাদেরকে কিছু কাটা বাঁশ আর খড় দিয়ে যাবে। এগারোটা তো বাজতে চলল। ওরা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।”
নিনি তখন অভিমানের সুরে বলল, “বাবা, তাহলে একথাটা তুমি আমাদের আগে বলনি কেন? শুধু-শুধুই আমাদের দিয়ে এতক্ষণ পরিশ্রম করালে।”
কাকু হাসিমুখে বলল, “পরিশ্রম আবার কোথায় করালাম রে? সবসময় মাথায় রাখবি, ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’। তোরা সবাই মিলে এতক্ষণ যে এতসব জিনিস জমা করলি তা তো আর ফেলা যাবে না রে। সবটাই দেখিস, এই ঘর বানানোর কাজে কোনও না কোনওভাবে লেগেই যাবে।”
তুতুল তখন খুব চিন্তিত মুখে বলল, “ঠিক বলছ তো কাকু? সব জিনিসগুলোই কাজে লাগবে তো?”
কাকু বেশ জোর গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ রে বাবা, লাগবে। চিন্তা করিস না। ওই যে দ্যাখ, রহমান আর ওর ছেলে জামাল খড় আর বাঁশ নিয়ে আসছে। ওগুলো সবই ওরা তোদের জন্যই নিয়ে আসছে রে।”
কাকুর কথায় আমরাও তাকিয়ে দেখলাম, ঠিকই মোড়ের মাথায় রহমান চাচা আর জামাল ভাইয়াকে দেখা যাচ্ছে। আর ওরা আমাদের দিকেই আসছে।
“এদিক ওদিক থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আর কতটাই বা খড়-বাঁশ যোগাড় করতে পারতিস তোরা? তারপর একটু পরে রোদ আরও চড়া হলে তখন অত রোদের মধ্যে কাজ করতে গেলে তোরা আবার হাঁফিয়ে উঠবি। তাই আমি ওদেরকে আগে থেকেই এসব আনতে বলে দিয়েছিলাম। তাছাড়া কাল রহমান বলছিল, জামালও নাকি খুব ভালো বেড়া বুনতে শিখে গেছে। তাই ও বলছিল, জামালকেও সাথে নিয়ে আসবে। আর দেখ, আমি তো আছিই। তাই তোরা একদম ভাবিস না।” কাকুর কথাগুলো শুনে আমরা সবাই খুবই শান্তি পেলাম। “আর শোন, আমি ঠিক করে রেখেছি ঘরটা বানানো হয়ে গেলে, আমি ঘরটার ভেতরে তোদের একটা লাইটের ব্যবস্থা করে দেব যাতে তোরা সন্ধে থেকেই বুড়ির ঘরে বসে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারিস। নিজেরা যে ছেলেবেলায় কত বুড়ির ঘর বানিয়েছি…” এই বলে কাকু নিজের মনেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
এদিকে ততক্ষণে রহমান চাচারাও চলে এল।
চাচা এসে কাকুকে এভাবে অন্যমনস্ক অবস্থায় বসে থাকতে দেখে খানিকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “কী অত ভাবতেছেন, দাদাবাবু?”
হঠাৎই চাচার গলা শুনে কাকু ঘোর কাটিয়ে বলল, “আরে এসো রহমান। ওই ওদের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎই আমাদের সময়কার বুড়ির ঘর তৈরির কথা মনে পড়ে গেল।”
চাচা তখন হাসি হাসি মুখ করে মাথা দোলাতে দোলাতে বলল, “হ, বুঝছি। আমিও তো জামালের লগে আমরার সময়ের ওইসব গল্প করতে করতেই আসতে ছিলাম। এই যে দ্যাখেন, সব মালপত্তর লইয়াই আমরা চইল্যা আসছি। আর কুনও চিন্তা নাই দাদাবাবু। কালকের কথামতো, জামালরেও নিয়া আসলাম। হেও বুড়ির ঘর বানাইব শুইন্যা খুউবই খুশি। যা যা দরকার লাগব ওরে কইবেন। ও কইরা দিব।”
কাকু তখন সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, সেই। তোমরা যখন সব জিনিসপত্র নিয়ে চলেই এসেছ তখন আর চিন্তা কীসের? আর জামালও যখন সাহায্য করবে, তাহলে শুধু শুধু বসে না থেকে চলো আমরা বরং এখনই কাজে নেমে পড়ি। তুমিও থাকছ তো?”
চাচা একটু মাথা চুলকে বলল, “নাহ্, আমি ত এখন থাকতে পারমু না। আমারে এখন আসলে একটু গরুর দুধ দুয়াইতে যাইতে হইব। কাম-কাজ সব তাড়াতাড়ি আটাইতে পারলে অবশ্যই একবার এইদিকটা আইস্যা দেইখ্যা যামু।”
কাকু বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে। জামালকে রেখে যাচ্ছ, আর চিন্তা কী? আমরা সবাই মিলে ঠিক পেরে যাব। তবে কাল কিন্তু একদম সকাল সকাল চলে এসো। বুড়ির ঘর পুড়িয়ে, একসাথে পিঠে-টিঠে খেয়ে, তবে যাবে। আর জামাল তো আসবেই। তুমি আর মফি তোমাদের মেয়ে হাসিনাকে নিয়ে চলে এসো। ওরাও তাহলে আনন্দ পাবে।”
“আইচ্ছা দাদাবাবু, আমি তাহলে এখন আসি।” এই বলে রহমান চাচা চলে গেল।
জামাল আর কাকুর কথা শুনে শুনে আমরা সবাই এদিকে ওদের কাজে একমনে সাহায্য করতে লাগলাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেই হঠাৎই আমাদের সামনে মস্তান টাইপের পাঁচ-ছ’জন ছেলে এসে দাঁড়াল। ওদেরকে আমরা আগেও দেখেছি ঠিকই, কিন্তু নামে মানুষে একদমই চিনি না। আগে থেকে বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎই আমাদের কাছে এসে বাঁশ আর খড় চেয়ে বসল। ওরাও নাকি বুড়ির ঘর বানাতে চায়। ওরা যদি ভালো হত, তাহলে কোনও কথাই ছিল না। কিন্তু আমাদের সারা পাড়া ওদেরকে খারাপ ছেলে হিসেবেই চেনে। আমরা সবাই জানি যে ওরা চূড়ান্ত বখাটে আর বাউন্ডুলে টাইপের ছেলে। পড়াশোনা তো করেই না, বরং সুযোগ পেলেই অকারণে শুধু পাড়ার লোকজনকে বিরক্ত করে মজা পায়। কাকুকে সামনে দেখেও বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই ওরা যেভাবে আমাদের কাছে বাঁশ আর খড় চাইতে চলে এল, সেটা দেখে আর ওদের কথা বলার অদ্ভুত ধরন আর ভাবভঙ্গী দেখে আমরা সবাই একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম।
আমাদের ওরকম অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে কাকুই বলল, “এখানে আসলে যেটুকু বাঁশ আর খড় আছে সেটুকু দিয়ে তো একটাই ঘর বানানো সম্ভব, তাই তোমরা অন্য কোনওখান থেকে ব্যবস্থা করে নাও বরং। সেটাই ভালো হবে।”
কাকুর কথা শুনে ওরা সবাই তখন নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে হাসতে ওখান থেকে সরে পড়ল।
এদিকে অনেক খাটাখাটুনির পর বেলা তিনটে নাগাদ আমাদের বুড়ির ঘর বানানো শেষ হল। খুব সুন্দর হল আমাদের বুড়ির ঘরটা দেখতে। ওতে সবাই মিলে একসাথে বসে গল্প করা যায়, মজা করে খেলা যায়, সব মিলিয়ে দারুণ। কাকু ঘরটাতে আবার একটা বাল্ব লাগিয়ে দিয়ে খুব সুন্দর করে ঘরটাতে আলোর ব্যবস্থাও করে দিল। সে যে তখন কী আনন্দ! কী আনন্দ!
সন্ধ্যায় বুড়ির ঘরে আমরা সবাই মিলে একসাথে বসে লুডো খেলতে শুরু করলাম। তখন গাবলুর মা রীনামাসি আমাদের জন্য পাটিসাপটা নিয়ে এল। সেই পাটিসাপটাগুলোর ভেতরেও ক্ষীর, বাইরেও ক্ষীর। দারুণ! সবে আমরা পাটিসাপটাগুলো খেতে আরম্ভ করেছি, এমন সময় তিন্নির মা দীপালিমাসি আবার নিয়ে এল রসে ডোবানো গকুল পিঠে। ওগুলো দেখে রিমি আর বুবু একগাল হেসে বলল, “বাহ্, দারুণ দারুণ! খুব ভালো করেছ মাসিমণি এগুলো এনে। আমাদের আসলে ভীষণ খিদে খিদে পাচ্ছিল।”
আমাদের লুডো খেলাও ততক্ষণে দারুণ জমে গেছে।
দীপালিমাসি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মেলামাইনের ডিশ ভর্তি করে আমার মা আমাদের জন্য নিয়ে এল গরম গরম ফুলকপির শিঙাড়া। আমরা সবাই সেগুলো পেয়ে ভীষণ খুশি হলাম।
সন্ধেটা এভাবেই খুব মজা করে কাটিয়ে রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ আমরা সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে গেলাম। ভাত খাবার পরে সেদিন আমাদের সারারাত জাগবার প্ল্যান হয়েছিল। তবে সেটা বুড়ির ঘরে নয়, বুড়ির ঘর পাহারা দেবার জন্য বুবুদের বাড়িতে। আমাদের সবার মা-বাবারাও আমাদের সাথে ওদের বাড়িতে যাবে। আমরা রাত জেগে সেখানে ডিভিডি দেখব। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ আর ‘অ্যাভেঞ্জারস: ইনফিনিটি ওয়ার’। কী মজা! আর তার সাথে দোতলার জানালা দিয়ে সারারাত ধরে করে যাব আমাদের বুড়ির ঘরের ওপর কড়া নজরদারি।
ভাত খেয়ে আমরা সবাই তাই হাজির হলাম বুবুদের বাড়ি। এবার আমরা বসে গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখছি আর মাঝে মাঝে কেউ না কেউ খাবার ঘরের জানালা দিয়ে একবার করে বুড়ির ঘরটা পাহারা দিয়ে আসছি। গুপী গাইন বাঘা বাইন সবে শুরু হয়েছে, হঠাৎ করে আমরা কী যেন একটা আওয়াজ পেলাম। কী হল, কী হল করতে করতে গিয়ে দেখি, নাহ্, তেমন কিছুই নয়। বুবুদের বেড়াল ‘কচি’ ওদের রান্নাঘরে রাখা একটা খালি কার্টনকে তাক থেকে নিচে ফেলে দিয়ে নিজে ভয় ভয় একটা চেহারা নিয়ে স্ল্যাবের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে কুতকুত করে আমাদেরকে দেখছে। তার মানে ওটা ওই কার্টনটা পড়বারই আওয়াজ ছিল।
রান্নাঘর থেকে খাবার ঘর পেরিয়ে বসার ঘরে আসবার সময় জানালা দিয়ে একবার উঁকি মেরে দেখলাম, বাইরে একটু একটু করে কুয়াশা পড়তে আরম্ভ করেছে। অস্পষ্ট হলেও বুড়ির ঘরটাকে কুয়াশার মধ্যেও মোটামুটি ভালোই দেখা যাচ্ছে। এটা আমাদের তৈরি করা প্রথম ঘর। আমরাও এখন খড় আর বাঁশ দিয়ে ভালোই ঘর বানাতে পারি। মনে মনে ভাবলাম, আমাদের এখন আর কোনও চিন্তা নেই। কোনওদিন বিপদে পড়লে, খড়-বাঁশ দিয়ে এরকম একখানা মাথা গোঁজার ঠাঁই আমরা ঠিক বানিয়ে নিতে পারব। নিজেকে যেন কেমন একটা রাজা রাজা মনে হতে লাগল। ঘর বানাতে এখন আর কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না। আর কী চাই?
আমরা ফিরে এসে আবার গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখতে শুরু করলাম। আর ঠিক করলাম যে, যতক্ষণ না সিনেমাটা শেষ হচ্ছে ততক্ষণ আমরা আর কোনওরকম একটু-আধটু শব্দ শুনলেই সিনেমাটা ছেড়ে উঠে পড়ব না। এবারে তাই একটানা বসে আমরা সিনেমাটা শেষ করলাম। এবার অ্যাভেঞ্জারসটা দেখার আগে টি-ব্রেক চলতে চলতে আমরা সবাই মিলে আলোচনা করতে লাগলাম গুপী গাইন বাঘা বাইন কার কেমন লাগল সেই নিয়ে। তখনই হঠাৎ গাবলু চিৎকার করে উঠল, “আগুন! আগুন!”
হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। গিয়ে দেখলাম, কুয়াশার অস্পষ্টতা কাটিয়ে আগুনের লকলকে শিখার মধ্যে আমাদের বুড়ির ঘরটা অসহায়ভাবে কাতরাচ্ছে। নিজেদের তৈরি ঘরটাকে চোখের সামনে এভাবে একটু একটু করে পুড়তে দেখে একটা গরম দুঃখের বাষ্প বুকের ভেতর থেকে দলা পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। আর আগুনটা এদিকে পোড়া খড় আর বাঁশের ছাইগুলোকে নিয়ে আকাশের দিকে উঠতে লাগল। আগুনের শিখায় সকালের সেই দুষ্টু ছেলেগুলোর বিদ্রূপ আর তাচ্ছিল্যমাখা মুখগুলো খুব স্পষ্টভাবেই আমরা দেখতে পেলাম।
নিজেদের সৃষ্টিকে চোখের সামনে এমনভাবে পুড়তে দেখে আমরা সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কান্নার জল গাল বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়তে লাগল টপটপ।
আমরা ওরকমভাবে ভেঙে পড়ছি দেখে তপনকাকু তখন টুবাইদাকে বলল, “কী রে টুবাই, কিছু বলছিস না যে! দেখতে পাচ্ছিস না যে বোনটা কাঁদছে? তুই তো আগে বলেছিলি, তোরা নাকি এবার বেশ বড়ো করেই বুড়ির ঘর বানিয়েছিস। তো তোদের বানানো ঘরে বোনটাকে আর ওর বন্ধুগুলোকে একটু জায়গা করে দিতে পারবি না বুঝি? দেখ, এমনিতেই তো রাত হয়ে গেছে। তাই থাকার তো আর কোনও ব্যাপারই নেই। ওরা শুধু তোদের সাথে গিয়ে কিছুক্ষণ বুড়ির ঘরটা পোড়ানোটা দেখবে। আর কিছুক্ষণ সবাই মিলে আগুন পোয়াবে। এই আর কী।”
তিন্নি তখন চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “দাদা, নে না রে আমাদেরকে তোদের বুড়ির ঘরে। নে না রে প্লিজ।”
টুবাইদা তখন কী করা উচিত বুঝতে না পেরে বলল, “বাবা, তুমিও যে কী বলো না! এটা কি আমার একার ইচ্ছেয় হবে নাকি? তুহিনকেই জিজ্ঞেস করে দ্যাখো না।”
“কী রে তুহিন, কী শুরু করেছিস তোরা? আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। এটা আবার একটা কথা হল? আজকে তোদের ছোটো ভাইবোনগুলো একটা বিপদে পড়েছে। আর দাদা হয়েও তোরা ওদেরকে একটুও সাহায্য করবি না? আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি।” মৃণালকাকু বেশ রাগত গলায় কথাগুলো বলল।
তুহিনদা সঙ্গে সঙ্গে অবাক হয়ে বলল, “আরে আমার আবার কোনও আপত্তি থাকতে যাবে কেন বাবা? রিমি না চাইতেই আমি যেখানে ওকে আমার সব জিনিসই দিয়ে দিই, আর আজকে সামান্য একটা বুড়ির ঘরের জন্য আমি ওকে কাঁদাব? তুমি এটা ভাবলে কী করে?”
“তাহলে তুই-ই বা এতক্ষণ চুপ করে ছিলি কেন? কিছু বলছিলি না যে!” মৃণালকাকু অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
“আসলে এই অপশনটা আমার মাথাতেই আসেনি বাবা। শুধু আমার কেন, টুবাইয়েরও মাথাতেও নিশ্চয়ই আসেনি।” এই বলেই তুহিনদা টুবাইদার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে টুবাই? তোর মাথাতেও তো আসেনি, বল?”
টুবাইদা শুনে বলল, “আমি তো আরও ভাবলাম কী জানি তোর যদি আবার কোনও আপত্তি থাকে।”
দীপককাকু এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “নে, তাহলে তোদের প্রথমবারের বুড়ির ঘরের ইচ্ছেটা আর ফেলনা যাচ্ছে না।”
কাকুদের কথা শুনে আমরাও বুঝতে পারলাম যে তুহিনদা, টুবাইদা ওরা কালকে ওদের বুড়ির ঘরে আমাদেরও নিচ্ছে। আমরা তাই ভীষণ খুশি হলাম।
কিন্তু টুবাইদা আবার একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “তাহলে তো পার্থদা, বাপ্পাদা ওদেরকেও এই বুড়ির ঘর পোড়ানোর ঘটনাটা সবটাই জানাতে হবে। আর এটাও বলতে হবে যে এরজন্যই কালকে রিমি, তিন্নি, গাবলু ওরা সবাই আমাদের সাথে বুড়ির ঘর পোড়াতে যাবে। সবটা শুনলে ওরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে।”
তুহিনদা তখন বলল, “পার্থদা, বাপ্পাদা ওরা তো এমনিতেই বুড়ির ঘর পাহারা দেবার জন্য জেগেই থাকবে। তাই আগে আগে ওদেরকে বলে রাখলে ওরা বাকিদেরকেও ঠিক বুঝিয়ে দিতে পারবে। তাতে কালকে রিমি ওরা আমাদের সাথে গেলে সেটা নিয়ে নতুন করে কেউ আর কিছু বলবে না।”
তখন রীনামাসি বলল, “পার্থরা যখন সারারাত জেগেই থাকবে, তাহলে তোরা বরং এখনই পার্থ বা বাপ্পা ওদের মধ্যে কাউকে একটা ফোন করে দে। সেটাই ভালো হবে। তাহলে কেউই কালকে এ ব্যাপারটা নিয়ে আর কোনও ঝামেলা করবে না।”
“আর ওরা যদি কোনও ধরনের কোনও আপত্তি করে, তাহলে আমি বরং ওদের সাথে কথা বলে নেব। আর আমি জানি, ওরা তোদের কথাতেই রাজি হয়ে যাবে।” মৃণালকাকুর এই কথায় তুহিনদা আর টুবাইদা দু’জনেই যেন খুব সাহস পেল পার্থদা বা বাপ্পাদাকে ফোন করার ব্যাপারে।
দাদারা তখনই ওদেরকে ফোন করতে চলে গেল।
আমার বাবা আবার এদিকে কালকের সব প্ল্যান শুনে খুব খুশি হয়ে বলল, “আমার কাছেও কিন্তু একটা প্রস্তাব আছে। কালকে আমরা সবাই মিলে বুড়ির ঘর পোড়ানোর পর মজা করে পিঠে-টিঠে খাই, তারপর পরশু দিন মানে রোববার সকালবেলা নাহয় সবাই মিলে একবার চিড়িয়াখানায় ঘুরে আসি। খুব মজা হবে তাহলে। কী বল?”
চিড়িয়াখানায় যাবার এই প্ল্যানটা শুনে আমরা ছোটোরা সবাই আহ্লাদে যেন আটখানা হয়ে গেলাম। গাবলু একগাল হেসে ফিসফিস করে বলল, “ওই খারাপ ছেলেগুলো আমাদের বুড়ির ঘরটা পুড়িয়ে দিয়ে একদিকে ভালোই করেছে বল? ওরা তো বুঝতেই পারছে না যে ওদের ঐ কুবুদ্ধির জন্য আমরা সবাই মিলে ঠিক কতটা মজা করতে চলেছি।”
তিন্নি তখন আস্তে আস্তে বলল, “গাবলু, তুই প্লিজ একটু চুপ কর। শোন, আমরা মনে মনে যতই খুশি হই না কেন, এখন আমাদের একটু দুঃখ দুঃখ মুখ করে থাকাই ভালো। না হলে, বলা তো যায় না, আমাদের এই অতি আনন্দ দেখতে পেয়ে দাদারা যদি আবার আমাদের বুড়ির ঘর পোড়ানোর সময় ওদের সাথে নিয়ে না যায়!”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment