গল্পঃ মানিককাকু ও পরিত্যক্ত অডিটোরিয়ামঃ শীলা বিশ্বাস


বড়দিন চলে গেল। শীত সবে জাঁকিয়ে পড়েছে। প্রতিবছর আমাদের রোহিণী আবাসনে একটি ক্লাব হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠে। সরস্বতী পুজো হয়ে গেলেই ক্লাবটা ভ্যানিস। ক্লাবের নাম ‘আমরা সবাই’। এই ক্লাবের মেম্বারদের বয়সের কোনও নিম্ন বা ঊর্ধ্বসীমা নেই। সরস্বতী পুজোর চাঁদা দিলেই মেম্বার হওয়া যায়। সবচেয়ে খুদে সদস্য রুমকি, যার বয়স ছয়। সবচেয়ে ধেড়ে সদস্য মানিককাকু। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। আমি, পাপন, বাবলুーসব মিলিয়ে বারো জন সক্রিয় সদস্য। মানিককাকু চাঁদা দেয় না। তবে শোলা দিয়ে সুন্দর করে প্যান্ডেল বানিয়ে দেয়। এসবের জন্য আমরা মানিককাকুকে কোনও টাকাপয়সা দিই না। মানিককাকু যখন প্যান্ডেল বানায় আমরা হাতে হাতে সাহায্য করি। মানিককাকুর আরও একটা গুণ আছে। আমাদের অনেক গল্প বলে শোনায়।
সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমরা সবাই জড়ো হয়েছি, চাঁদার হিসেবপত্র নিয়ে কিছু আলোচনা হবে। আলোচনা শেষে রুমকি বায়না ধরল, “মানিককাকু একটা গল্প শোনাও না।”
মানিককাকু যেন প্রস্তুত হয়েই এসেছিল। নড়েচড়ে পায়ের উপর পা তুলে দুটো হাত দিয়ে একটা হাঁটুকে শক্ত করে ধরে পা নাড়াতে নাড়াতে হেসে বলল, “আগেরবার তোদের একটা ভূতের গল্প বললাম, তোরা কেউ বিশ্বাস করলি না। এবারে একটা সত্যি ভূতের গল্প বলব। তবে আমার বলার মাঝে মাঝে প্রশ্ন করা চলবে না। গল্প শেষ হলে তারপর প্রশ্ন করিস। কী, রাজি? শোন তবেー
আমরা তখন হাওড়ার একটা মফস্বলে থাকতাম। সালটা কত হবে, এই ধর উনিশশো পঁচাশি কি ছিয়াশি। কাছাকাছি একটা রেলস্টেশন ছিল। স্টেশনের ওপারে ছিল সাহেব পাড়া। আর একটা বিদেশি সুতো কলের কারখানা। স্টেশন থেকে এপারে হাঁটাপথে আমাদের আবাসন। আমাদের আবাসনের চারপাশে কোনও বাউন্ডারি ছিল না। চারদিকে ধূ ধূ প্রান্তর। তার মধ্যে একটা বড়ো ঝিল ছিল। আমি তখন ক্লাস ফাইভ। প্রতিদিন ঝিলে সাঁতার কাটতাম। অল্পদিনের মধ্যেই ঝিলের এপার ওপার করতে শিখে গেলাম।
ঝিলের ওপাশে ছিল একটা পরিত্যক্ত অডিটোরিয়াম। মেঠো পথ ধরে সেখানে যেতে লাগে প্রায় ত্রিশ মিনিট। কিন্তু ঝিলের ওপার থেকে কাছেই। যদিও সাহস করে কোনওদিন ওই অডিটোরিয়ামে যাইনি। একদিন সাঁতার দিয়ে ওপারে গিয়ে মনে হল ওই অডিটোরিয়ামের মধ্যে কী আছে দেখা যাক। একচিলতে ফাঁকা জমির উপর লাল ইটের তৈরি পুরনো অডিটোরিয়ামের দিকে এক অজানা আকর্ষণে ভেজা গায়ে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। অডিটোরিয়ামের ভেজানো দরজায় টোকা দিতে না দিতেই সাঁ করে দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন ধবধবে ফর্সা বয়সের ভারে ন্যুব্জ লাঠি হাতে বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলেন বাংলাতেই। আমি নামঠিকানা বলেই দাদুর কাছে জানতে চাইলাম, “এখানে কী হয়?”
দাদু বললেন, “প্রত্যেক পূর্ণিমার রাতে এখানে সিনেমা হয়। সাহেব-মেমরা দেখতে আসে।”
আমি কৌতূহলবশত ভেতরে যেতে চাইলাম। দাদু আমাকে ঢুকতে বাধা দিলেন। বললেন, “সামনের পূর্ণিমায় রাত্রি একটার সময় এসো, তোমাকে সিনেমা দেখাব।”
আমি সেদিনকার মতো সাঁতার দিয়ে ফিরে এলাম। পাড়ার বন্ধুদের সেকথা বলতে কেউ বিশ্বাস করল না। ওখানে এখন কেউ থাকে না বলে সবাই হেসে উড়িয়ে দিল। আমি ওদের কথা বিশ্বাস করিনি।
বাড়ির কাউকে না বলে সিনেমা দেখার লোভে পরের পূর্ণিমাতেই বেরিয়ে পড়লাম। হাতে একটা টর্চ। রাত তখন সাড়ে বারোটা। জগদীশ স্যারের টিউশন ক্লাসে যাওয়ার রাস্তা থেকে এই রাস্তা বাঁদিকে বাঁক নিয়েছে। পরিকল্পনা ছিল বলে দিনের বেলায় ভালো করে দেখে রেখেছি যাতে রাস্তা গুলিয়ে না যায়। মেঠো পথ ধরে পৌঁছে গেলাম। বলা ভালো, অমোঘ এক আকর্ষণ আমাকে টেনে নিয়ে গেল। সুন্দর সাজানো লন পেরিয়ে আমি পৌঁছে গেলাম একেবারে অডিটোরিয়ামের দরজায়। দিনের আলোয় দেখার সঙ্গে মিল নেই। সুন্দর কারুকাজ করা দরজার হাতলে হাত ছোঁয়াতেই দাদু বেরিয়ে এসে আমাকে হাতে গোলাপ দিয়ে স্বাগত জানালেন। একটা চেয়ারে বসালেন। সেখানে দারুণ সুন্দর একটা ঝাড়লন্ঠন ঝুলছে। চারপাশে ফুল দিয়ে সাজানো দেওয়াল। দেওয়ালের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত লাল কার্পেট বিছানো। মাঝখানে অনেকগুলো টেবিল চেয়ার। প্রত্যেক টেবিলে একজোড়া সাহেব-মেম দম্পতি। অডিটোরিয়ামের ছাদের দিক থেকে একটা আলো এসে পড়ছে, আর উলটোদিকে লাগানো একটা পর্দায় ফুটে উঠছে ছবি। সকলেই সেই ছবি দেখছে। আমি ওদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে ছবি দেখে বেশ মজা পাচ্ছি। ইতিমধ্যেই দাদু বলে গেছেন, এখানে টর্চ জ্বালানো যাবে না। আমি টর্চটাকে পেটের মধ্যে জামার তলায় লুকিয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ কী করে নিচে পড়ে যায় জানি না। আমি হাতড়ে টর্চটা তুলতে যেতেই চাপ পড়ে টর্চটা জ্বলে ওঠে। টর্চের আলো পড়তেই দেখি কেউ কোথাও নেই! কতকগুলো ভাঙাচোরা চেয়ার-টেবিল। সিলিংয়ের দিকে আলো পড়তেই দেখি কালো কালো বাদুড় ঝুলে আছে। ওই দেখে আমি, ‘দাদু দাদু’ বলে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসি। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
চোখ খুলে দেখি আমাকে ঘিরে রয়েছে পাড়ার ছেলেরা। মা-বাবা মাথার কাছে। ডাক্তারজেঠু স্টেথো দিয়ে আমার বুকে হার্ট বিট দেখছেন। পরে জেনেছি, আমাকে সকালে উঠে বিছানায় না দেখতে পেয়ে মা বন্ধুদের কাছে খোঁজ করে। ভাগ্যিস আমি বন্ধুদের গল্পটা করেছিলাম। তাই সকলে আন্দাজ করে অডিটোরিয়ামের সামনে থেকে আমাকে উদ্ধার করে।


পাপন, বাবলু আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি যে মানিককাকু আমাদের বানিয়ে বানিয়ে গল্প করে, আর ভাবে আমরা কিছু বুঝতে পারি না। হঠাৎ রুমকি বলে ওঠে, “মানিককাকু, সাহেব-মেমগুলো কি সব ভূত ছিল?”
মানিককাকু বলে উঠল, “বলেছি না আমি গল্প শেষ করার আগে কোনও প্রশ্ন করা যাবে না! গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।” বলেই আবার শুরু করলー
সেবারে বন্ধুরা আমার কথা বিশ্বাস করেনি। এবার বন্ধুরা বিশ্বাস করল ওখানে কিছু একটা আছে। সবাই মিলে ঠিক করলাম পরের পূর্ণিমাতে সকলে মিলে ওখানে যাব। প্রস্তুত হয়েই সেবার গেছিলাম। মানে পাড়ার দাদাদের জানিয়ে গেছিলাম, যদি ফিরতে দেরি হয় ওরা যাতে আমাদের খোঁজ নেয়। আবাসনের চৌকিদার বেশ হাট্টাগোট্টা, লাঠি হাতে তাকেও সঙ্গে নিলাম।
ফাঁকা মাঠ। পূর্ণিমার আলোয় এসে পৌঁছলাম অডিটোরিয়ামের সামনে। আমি এবারে আর ভেতরে গেলাম না বাদুড়ের ভয়ে। পিছনের দিক দিয়ে ছাদে উঠে গেলাম। অন্যান্য বন্ধুরা টর্চ নিয়ে ভেতরে গেল। চৌকিদার বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের পাহারায়। আমি ছাদে উঠে ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম, একটা ছিদ্র আছে। সেখানে থেকে চাঁদের আলো পড়ছে ভেতরে একদম পর্দার উপর। আর কিছু না দেখতে পেয়ে নিচে নেমে এলাম। বন্ধুরাও সব খুঁটিয়ে দেখে এসে বলল, “তুই যা বলছিলি কিছুই তো নেই দেখছি। কোথায় সাহেব-মেম, কোথায় সিনেমা? পর্দায় আলো এসে পড়ছে আর পর্দাটা একটু দুলছে। আর কিছু তো নয়।”
সকলেই হতাশ। আমি তখন বললাম, “দাদুকে খুঁজে পেলেই সব রহস্যের সমাধান হবে।”
সেদিন আমরা সবাই ফিরে এলাম। কিন্তু মনে মনে বললাম,  এর শেষ দেখে ছাড়ব।


আবার রুমকি বলে উঠল, “দাদুর খোঁজ পেলে?”
আমি রুমকির মুখ চেপে বললাম, “এখনও গল্প শেষ হয়নি রে।”
মানিককাকু আবার শুরু করলー
কয়েকমাস পরে আন্তঃপাড়া ফুটবল ম্যাচের জন্য সাহেব পাড়ায় আমাদের ডাক পড়ল রাজার সৌজন্যে। আমদের স্কুলের বন্ধু রাজা ও-পাড়াতেই থাকে। ম্যাচের শেষে ওদের কোয়ার্টারে আমাদের ফ্রেশ হওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। রাজা আমাদের সব গল্প জানত। ও আমাদের ওখানকার এক পুরনো বাসিন্দা মিঃ ডিসুজার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে দেখি মিঃ ডিসুজা শুয়ে আছেন বিছানায়। গায়ে একটা চাদর ঢাকা। রাজা ঢুকতেই উনি মাথাটা তুলে বসার চেষ্টা করছেন। রাজা এগিয়ে গিয়ে ওঁকে সাহায্য করল। টেবিলে রাখা জল রাজা এগিয়ে দিতেই উনি চাদরের ভেতর থেকে হাতটা বের করে জল খেলেন। হাতে পোড়া দাগ খেয়াল করলাম। পরিচয়পর্ব সেরে ওঁকে প্রণাম করতে যাব, উনি বললেন, “এঘরে যীশু আছেন। তাঁকে প্রণাম জানাও, আমাকে নয়।”
আমরা দেওয়ালে যীশুর একটা বড়ো ছবির দিকে মুখ করে প্রণাম জানাতেই উনি মৃদু হেসে বললেন, “ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন।”
দুয়েক কথার পরে অডিটোরিয়ামের ঘটনাটা তাঁকে খুলে বললাম। তিনি সব শুনে বললেন, “এখন থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ওই অডিটোরিয়ামে আগুন লেগে যায়। প্রায় জনাদশেক মানুষ সেদিন মারা যায়। আমিও সেদিন ওখানে উপস্থিত ছিলাম। আমার হাতের এই পোড়া দাগটা দেখছ? এটা সেদিনের সাক্ষ্য বহন  করছে। তারপর থেকে ওখানে কেউ যেত না। তবে ওখানকার কেয়ারটেকার, তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। সে সেখানেই থেকে যায়। ওদিককার খ্রিস্টান সমাজ ওকে কিছু সাহায্য করত বলে শুনেছিলাম। তারপর দীর্ঘদিন ওদিকে যাওয়া হয়নি, বলতে পারো খোঁজখবর বিশেষ নেওয়া হয়নি। আমি নিজেই সেই দুর্ঘটনার রেশ আজও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি। কয়েকমাস আগে আমাদের একটা ফেস্টিভ্যালে ওখানকার চার্চের ফাদার এসেছিলেন। তার মুখে শুনেছি ওই বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকে নাকি কয়েক বছর আগে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে অডিটোরিয়ামের সামনেই সমাধিস্থ করা হয়। তারপর এই এখন তোমাদের মুখে শুনছি।”
সবাই এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল। কারোর মুখেই কোনও কথা নেই। সেদিন আমরা সবাই মিঃ ডিসুজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম।
মানিককাকু আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বল এবার কার কী প্রশ্ন আছে।”
মানিককাকুর গল্প শেষ হতে দেখি রুমকি কখন যেন আমার গায়ের কাছে এসে শক্ত করে আমার হাতটা  ধরে আছে। এরপর কারোর কোনও প্রশ্ন মনে এল না। সবাই একেবারে নিস্তব্ধ। কোনও অবিশ্বাসী চোখ না দেখতে পেয়ে মানিককাকু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ সুজাতা চ্যাটার্জী

4 comments: