প্রথমাঃ রাজেশ্বরীঃ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


রাজেশ্বরী


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


তোমরা নিশ্চয়ই জানো এক্স রশ্মি, আলো বা রেডিও তরঙ্গ, এরা সবাই হল তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, শুধু তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা আলাদা। মাইক্রোওয়েভও হল একধরনের তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। উইকিপিডিয়া খুললে দেখবে যে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল এক মিলিমিটার থেকে এক মিটারের মধ্যে। শুধু মাইক্রোওয়েভ উনুন নয়, ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে, রাডারে, উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগে, রিমোট সেন্সিংয়ে, রেডিও জ্যোতির্বিদ্যাতেーনানা জায়গায় মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার হয়। তোমরা জানো যে জগদীশচন্দ্র রেডিও গবেষণার পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম। তিনিই পৃথিবীতে প্রথম মাইক্রোওয়েভ সৃষ্টি করেছিলেন, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল এক থেকে পাঁচ মিলিমিটার। মাইক্রোওয়েভ ধরার জন্য তিনি যে যন্ত্র বানিয়েছিলেন, তাকে আমরা আজ বলি হর্ন বা শিঙা অ্যান্টেনা। জগদীশচন্দ্রের ১৮৯৭ সালের সেই গবেষণার কথা পৃথিবীর বিজ্ঞানী মহল ভুলে গিয়েছি। ১৯৩৮ সালে এই অ্যান্টেনা নতুন করে আবিষ্কার হয়।
আধুনিক পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় মাইক্রোওয়েভ এক বিরাট জায়গা অধিকার করে আছে। জগদীশচন্দ্র পরবর্তীকালে উদ্ভিদবিদ্যার গবেষণাতে মন দিয়েছিলেন। তাঁর পরে আমাদের দেশে রেডিও-তরঙ্গ নিয়ে অনেকে গবেষণা করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবার আগে এই কাজের সূচনা করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশির কুমার মিত্র। তাঁর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন, পদ্মভূষণ সম্মানও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সমস্ত গবেষণাতে যে তরঙ্গ ব্যবহার করা হত তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল এক মিটারের থেকে অনেক বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে যোগাযোগের গুরুত্ব বাড়তে থাকে, কিন্তু আমাদের দেশে তখন সেই বিষয়ে কোনও গবেষণা হত না। ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স বা আই.আই.এস.সির কথা অন্যত্র লিখেছি, আমাদের দেশে সেখানেই প্রথম মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণা ও পড়ানোর সূচনা হয়। শুরু করেছিলেন এক দম্পতি, রাজেশ্বরী ও শিশির কুমার চ্যাটার্জী। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে নতুন ল্যাবরেটরি তৈরি করতে তাঁদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আজ তোমাদের রাজেশ্বরীর কথা শোনাব।
তবে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করা রাজেশ্বরীর কাছে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার নন, সেই গৌরব তামিলনাড়ুর এ.ললিতার প্রাপ্য। কেমন করে আঠারো বছর বয়সেই এক কন্যার মা এবং বিধবা ললিতা শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছার জোরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন এবং দেশের প্রথম মহিলা হিসাবে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি নিয়েছিলেন, সেই কাহিনি অন্য কোনও সময় তোমাদের বলব। আজ রাজেশ্বরীর কথা বলি। রাজেশ্বরী মহীশুর অর্থাৎ বর্তমানে কর্ণাটক রাজ্যের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার। তিনি প্রথম মহিলা যিনি মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে বি.এস.সি ও এম.এস.সিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। রাজেশ্বরী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভারতের প্রথম মহিলা ডক্টরেট, আই.আই.এস.সির প্রথম ভারতীয় মহিলা অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। শুধু আই.আই.এস.সি নয়, তাঁর আগে ভারতের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনওটিতেই ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কোনও ভারতীয় মহিলা পড়াননি। তিনি কর্ণাটকের প্রথম মহিলা বিজ্ঞানীও বটে।
রাজেশ্বরীর জন্ম ১৯২২ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্যাঙ্গালোরে। ব্যাঙ্গালোর ছিল দেশীয় রাজ্য মহীশুরের  অন্তর্ভুক্ত। তাঁর বাবা বি.এম. শিবরামাইয়া ছিলেন আইনজীবী, মায়ের নাম ললিতে। রাজেশ্বরী মজা করে বলতেন, রুপোর চামচ মুখে দিয়ে নয়, হাতে একটা বই নিয়েই তিনি জন্মেছিলেন। তাঁদের পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং শিক্ষানুরাগী। সে যুগে ছোটোবেলাতেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার প্রথা ছিল, তাদের পড়াশোনা নিয়ে বিশেষ কেউ মাথা ঘামাত না। কিন্তু রাজেশ্বরীর পরিবার সেদিক থেকে ছিল অনন্য। বিশেষ করে বলতে হয় ঠাকুমা কমলাম্মা দাসাপ্পার কথা। তিনি ছিলেন মহীশুর রাজ্যের তৃতীয় মহিলা গ্র্যাজুয়েট অর্থাৎ স্নাতক। পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি মহিলাদের, বিশেষ করে বাল্যবিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করার কাজ করেছেন। তিনি যে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তার নাম ছিল মহিলা সেবা সমাজ। কমলাম্মা ১৯৩০ সালে মহীশুরের আইনসভায় দুইজন মহিলা প্রতিনিধির একজন হিসাবে মনোনীত হয়েছিলেন। কমলাম্মার বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সেই। স্বামীকে যখন হারান তখন তাঁর বয়স কুড়িও পেরোয়নি। তারপরে তিনি স্কুল কলেজ পাস করেন। কমলাম্মার বাবা তার শিক্ষার ব্যাপারে এতটাই উৎসাহী ছিলেন যে তাঁদের গোটা পরিবার দু’বার থাকার জায়গা পরিবর্তন করে কমলাম্মার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে বাড়ি নিয়েছিল।
বুঝতেই পারছ, এমন পরিবারে রাজেশ্বরী পড়াশোনাতে কতটা উৎসাহ পেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, বাড়িতে কোনও বই পড়াতেই ছোটো বড়ো কারও নিষেধ ছিল না। মেয়েদের বিয়ের কথা কেউ উচ্চারণই করত না। ধরেই নেওয়া হত যে তারা উচ্চশিক্ষা নেবে। কমলাম্মার চেষ্টাতে মহিলা সেবা সমাজে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল স্পেশাল ইংলিশ স্কুল। সেখানে চোদ্দ বছর বয়সেই মেয়েরা ম্যাট্রিক অর্থাৎ ক্লাস টেনের পরীক্ষা দিতে পারত। সেখানেই রাজেশ্বরী পড়াশোনা শুরু করেন। তারপরে লন্ডন মিশন গার্লস স্কুল থেকে পনেরো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করেন।
রাজেশ্বরীর দুটো বিষয় খুব ভালো লাগত, ইতিহাস ও অঙ্ক। কমলাম্মার ইচ্ছা ছিল রাজেশ্বরী ইতিহাস নিয়ে পড়ুক। রাজেশ্বরীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন কানাড়া ভাষার বিখ্যাত সাহিত্যিক বি.এম. শ্রীকান্তিয়া। তিনি কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার কথা বলেন, কারণ বিজ্ঞান নিয়ে পাস করলে চাকরি পাওয়া অনেক সহজ ছিল। আজ চাকরির কথা ভেবে মেয়েদের পড়াশোনার বিষয় ঠিক করাটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সে সময় মেয়েরা চাকরি করবে সেটাই প্রায় অচিন্তনীয় ছিল। তাই রাজেশ্বরীদের পরিবার যে সে যুগের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। রাজেশ্বরী উইমেন্স ইন্টারমিডিয়েট কলেজে গণিত, পদার্থবিদ্যা ও অর্থনীতি নিয়ে পড়া শুরু করেন। দু’বছর পর মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে তৃতীয় হয়ে তিনি পাস করলেন। এরপর গণিত নিয়ে সেন্ট্রাল কলেজে ভর্তি। ১৯৪২ সালে সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। পরের বছর ঐ কলেজ থেকেই এম.এস.সি করেন। দু’বারই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।
রাজেশ্বরীর ইচ্ছা ছিল ইংল্যান্ড বা আমেরিকাতে গিয়ে গণিত নিয়ে গবেষণার। বাদ সেধেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ঘরের কাছে আছে আই.আই.এস.সি, কিন্তু সেখানে গণিত বিভাগ নেই। পদার্থবিজ্ঞানে গণিতের ব্যবহার হয়। আই.আই.এস.সিতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে আছেন ভারতের একমাত্র নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি.ভি. রমন। রাজেশ্বরী তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর অধীনে গবেষণা করতে চাইলেন। রমন প্রথমদিকে ছাত্রীদের গবেষণা না করালেও পরে তাঁর সঙ্গে তিনজন ছাত্রী কাজ করেছে। কিন্তু রমন পদার্থবিদ্যা ছাড়া অন্য বিষয়ের কোনও ছাত্রছাত্রীকে গবেষণা করাতে রাজি হলেন না। কলকাতার গণিতের গবেষণা সে সময় দেশবিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে, কিন্তু রাজেশ্বরীর মনে হল সেই মুহূর্তে একা একা ব্যাঙ্গালোর থেকে সুদূর কলকাতায় যাওয়ার অনুমতি বাড়ি থেকে পাওয়া যাবে না।
রাজেশ্বরী কোনও একটা বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাইলেন যাতে যুদ্ধ শেষ হলে তিনি বিদেশে শিক্ষার সুযোগ নিতে পারেন। আই.আই.এস.সিতে ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজির তিন বছরের সার্টিফিকেট কোর্সে ভর্তির আবেদন করেন তিনি। ওই বিভাগের প্রধান এস.পি. চক্রবর্তী রাজেশ্বরীকে ডেকে বলেন যে এই কোর্সের জন্য তিনি যথেষ্টই যোগ্য, কিন্তু ব্যাঙ্গালোরে কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প সেই সময় ছিল না। তাঁকে ট্রেনিং নিতে কলকাতা বা জামশেদপুর যেতে হবে, যা অল্পবয়সী মহিলার পক্ষে অসুবিধাজনক। পরিবর্তে তিনি প্রস্তাব দেন যে রাজেশ্বরী তাঁর অধীনে গবেষণা শুরু করুন। মাসিক স্কলারশিপ পাবেন চল্লিশ টাকা। ইলেকট্রনিক্সের তখন দ্রুত বিকাশ ঘটছে। সেই বিষয়ে কয়েকটা গবেষণাপত্র যদি প্রকাশ করতে পারেন তাহলে যুদ্ধের পরে বিদেশে ভালো জায়গায় গবেষণার সুযোগ পাবেন। রাজেশ্বরী রাজি হলেন। ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে তিনি কাজ শুরু করলেন। একবছর পরে বৃত্তি বেড়ে হল ষাট টাকা। এই সময় তিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কয়েকটি কোর্স করে নেন। গণিতের মতো বিষয় থেকে এসে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গবেষণা করতে এই কোর্সগুলি রাজেশ্বরীর জীবনে কাজে লেগেছিল। এই সময় তিনি এস.পি. চক্রবর্তীর সঙ্গে দুটি গবেষণাপত্র লেখেন। ১৯৪৬ সালে বিভাগে লেকচারার হিসাবে যোগ দিয়েছিলে শিশির কুমার চ্যাটার্জী, তাঁর সঙ্গেও যৌথভাবে রাজেশ্বরী একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
আই.আই.এস.সিতে তখন কয়েকজন ছাত্রী আছে। তাদের জন্য হস্টেল তৈরি হয়েছে। অন্য ছাত্রীদের সঙ্গে রাজেশ্বরীর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আন্না মানি, রোশন ইরানি, ইন্দিরা গজ্জর, প্রেমাবাই, ভায়োলেট ডি’সুজা ও মরিয়াম জর্জ। আন্না মানি সি.ভি. রমনের কাছে গবেষণা করতেন। তাঁর জীবনের কথা তোমরা এখানে পড়তে পার। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯৪৫ সালে। ভারতের স্বাধীনতা আসন্ন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সেরা ছাত্র ও ছাত্রীরা যাতে কানাডা, ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষালাভ করে ফিরে এসে দেশ গঠনে সাহায্য করতে পারে, সে জন্য এই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৃত্তি চালু করে। বৃত্তির শর্ত অনুযায়ী দেশে ফেরার পরে অন্তত তিন বছর কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হবে। প্রথম বছরের প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন আন্না মানি এবং রোশন ইরানি। পরের বছর ১৯৪৬ সালে রাজেশ্বরী বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হলেন। বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে বাড়ি থেকে কোনও আপত্তি এল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তিনি পড়ার সুযোগ পেলেন।
১৯৪৭ সালের জুন মাসের শেষে মুম্বাই থেকে এস.এস. মেরিন অ্যাডার জাহাজে উঠলেন রাজেশ্বরী। তখন অবশ্য শহরের নাম ছিল বোম্বাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে অনেক আমেরিকান সৈন্য এসেছিল, তারা তখন দেশে ফিরত যাচ্ছিল। সেইরকম একটা সৈন্যবাহী জাহাজেই রাজেশ্বরীর জায়গা হল। কলম্বো, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাংহাই হয়ে জাহাজ পৌঁছল আমেরিকার সানফ্রানসিসকোতে, সময় লেগেছিল এক মাস। যাত্রাটাকে উপভোগ করেছিলেন রাজেশ্বরী। তাঁর মতো আরো বেশ কিছু ভারতীয় ছাত্রছাত্রী একই জাহাজে আমেরিকা যাচ্ছিল। এই সময়েই বাধ্য হয়ে রাজেশ্বরীকে আমিষ খাওয়া শুরু করতে হয়, কারণ নিরামিষ খাবার বলতে জাহাজে (এবং পরে আমেরিকাতে) শুধুই জুটত সিদ্ধ সবজি।
ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি তাঁর ছিল না, তাই মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুতে তাঁকে স্নাতক স্তরের কয়েকটা কোর্স করতে হয়েছিল। সেগুলোতে খুবই ভালো করার পরে তিনি মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ক্লাস শুরু করেন। এই সময়েই তিনি মাইক্রোওয়েভ, অ্যান্টেনা ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করেন যা তাঁর পরবর্তী জীবনে কাজে লাগবে। ১৯৪৯ সালে রাজেশ্বরী মাস্টার অফ সায়েন্স ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন। সরকারি বৃত্তির নিয়ম অনুযায়ী দু’বছর পড়াশোনার পরেও এমন কিছু শিখে আসত হত যা দেশে সরাসরি কাজে লাগানো যাবে। সেই অনুযায়ী রাজেশ্বরী আট মাস ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ব্যুরো অফ স্ট্যান্ডার্ডসে রেডিও তরঙ্গের কম্পাঙ্ক মাপার প্রশিক্ষণ নেন।
ইতিমধ্যে রাজেশ্বরী ডক্টরেট করার জন্য বার্বুর স্কলারশিপের আবেদন করেছিলেন। ১৯১৭ সালে লেভি লুইস বার্বুর মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত এশিয়ার মহিলাদের শিক্ষার জন্য একটা বৃত্তি চালু করেন। শর্ত ছিল পাশ করার পরে তাঁদের নিজেদের দেশে ফিরে গিয়ে কাজ করতে হবে। রাজেশ্বরীর আগেও ভারত থেকে বেশ কয়েকজন এই বৃত্তি পেয়েছিলেন। রাজেশ্বরীর আবেদনও মঞ্জুর হল। রাজেশ্বরী ভারত সরকারের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি সহজেই মিলল। শুধু তাঁকে বলতে হল তিন বছর সরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করার শর্ত তিনি ডক্টরেটের পরে পালন করবেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে উইলিয়াম গোউল্ড ডাউ-এর কাছে গবেষণা করে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি পেলেন রাজেশ্বরী। সেমি-কন্ডাক্টর নির্মিত ট্রানজিস্টারের তখন শৈশব। তখনও ইলেক্ট্রনিক্স মূলত ভ্যাকুয়াম টিউব নির্ভর। সেই টিউব ব্যবহার করে রাজেশ্বরী নতুন ধরনের সার্কিট বানিয়েছিলেন।
এবার দেশে ফেরার পালা। ভারত সরকারই সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল। অবশেষে ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসের গোড়াতে দেশে ফিরলেন রাজেশ্বরী। দেশে ফিরে প্রথম কাজ হল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। পাত্র তাঁর পুরনো পরিচিত শিশির কুমার চ্যাটার্জী যাঁর সঙ্গে তিনি আই.আই.এস.সিতে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। ভারত সরকার রাজেশ্বরীকে জানালেন যে তাঁর নাম রুরকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের লেকচারার হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হরিদ্বারের কাছে রুরকিতেই ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো শুরু হয়। এখন তার নাম রুরকি আই.আই.টি। একই সময়ে আই.আই.এস.সিতেও ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে লেকচারার পদের জন্য বিজ্ঞাপন বেরোয়। রাজেশ্বরী আবেদন করলেন এবং মনোনীত হলেন। ১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি পরে প্রফেসর হয়েছিলেন এবং তাঁর বিভাগের প্রধান হিসাবে অবসর নেন।
আগেই বলেছি রাজেশ্বরী ও শিশির কুমার চ্যাটার্জী দেশে প্রথম মাইক্রোওয়েভ বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সূচনা করেন। আধুনিক ইলেকট্রনিক্স ল্যাবরেটরি বানাতে অনেক অর্থ লাগে, আই.আই.এস.সির পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। চ্যাটার্জী দম্পতি তা বলে দমে যাননি। তাঁরা নিজেরাই প্রয়োজনীয় নানা যন্ত্র বানিয়ে নিতেন। এ ব্যাপারে আমরা রাজেশ্বরীর সঙ্গে তাঁর পুরনো বন্ধু আন্না মানির মিল খুঁজে পাই। স্বাধীনতার ঠিক পরে গবেষণার জন্য অর্থের অভাব ছিল, বিদেশ থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি পাওয়ারও অসুবিধা ছিল। সেই সময়ে যাঁরা কাজ করেছিলেন, তাঁরা অনেকেই নিজেদের গবেষণার যন্ত্রপাতি বানিয়ে নিতেন। আমাদের দেশে এই ঐতিহ্যের শুরু করেছিলেন দেশের প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী সেই জগদীশচন্দ্র। দুঃখের বিষয়ে সেই স্বনির্ভরতার ধারা আমাদের দেশে অনেক জায়গায় শুকিয়ে এসেছে।
সারা জীবনে রাজেশ্বরী একশো কুড়িটি গবেষণাপত্র লিখেছেন, কুড়ি জন ছাত্রছাত্রীকে পি.এইচ.ডি করিয়েছেন এবং মাইক্রোওয়েভ ও অ্যান্টেনা বিষয়ে সাতটি বই লিখেছেন যা দেশবিদেশের বিখ্যাত প্রকাশনা থেকে ছাপা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি বই জগদীশচন্দ্রের প্রতি উৎসর্গ করেছেন তিনি। বিশেষ করে উপগ্রহ ও বিমানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অ্যান্টেনা বিষয়ে তিনি সারা পৃথিবীতে বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সৃষ্ট বহু প্রযুক্তি আজও বিশেষ করে প্রতিরক্ষাতে ব্যবহার করা হয়। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি অনেক সম্মান পেয়েছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় গবেষণাপত্রের জন্য গ্রেট ব্রিটেনের ইন্সটিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের লর্ড মাউন্টব্যাটেন পুরস্কার ও ইন্সটিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ার্সের জে.সি. বোস স্মারক পুরস্কারের কথা। গবেষণাতে উৎকর্ষের স্বীকৃতি স্বরূপ ইন্সটিটিউট অফ ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার্সের রামলাল ওয়াধা পুরস্কারও তিনি পেয়েছিলেন।
ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ খেয়াল রাখতেন নিতেন রাজেশ্বরী। চ্যাটার্জীদের বাড়ি তাঁদের কাছে ছিল অবারিত দ্বার। ছাত্রছাত্রীরাও ক্লাসে তাঁর পড়ানো বিশেষ পছন্দ করত। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তিনজন পরবর্তীকালে তাঁর বিভাগেই অধ্যাপনা করেছেন। এক ছাত্র আর.পি. শেনয় হয়েছিলেন ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড রাডার ডেভেলপমেন্ট এস্টাব্লিশমেন্টের অধিকর্তা। অপর এক ছাত্র কে.জি. নারায়ণন হয়েছিলেন এরোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্টের অধিকর্তা। এই দুটি সংস্থাই ভারতের ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গনাইজেশনের অধীনস্থ। ভারতে রাডার প্রযুক্তির বিকাশের জন্য শেনয় পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছেন।
রাজেশ্বরী ১৯৮৩ সালে আই.আই.এস.সি থেকে অবসর নেন। ১৯৯৪ সালে স্বামী শিশির কুমারের মৃত্যু হয়। অবসর বা শোকের জন্য তাঁর ব্যস্ততাতে ছেদ পড়েনি। গবেষণা ও বই লেখার কাজ করে গেছেন। তার বাইরেও সামাজিকভাবে নানা কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। বিশেষ করে দরিদ্র মহিলাদের উন্নতির জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি দুটি বই লিখেছেন,  ‘আ থাউজ্যান্ড স্ট্রিমসঃ আ পার্সোনাল হিস্ট্রি’ এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকমঃ দ্য হোল ওয়ার্ড ইস বাট ওয়ান ফ্যামিলি’। তাঁর মেয়ে ইন্দিরা চ্যাটার্জী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক।
২০১০ সালের  ৩ সেপ্টেম্বর ব্যাঙ্গালোরে নিজের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।


(ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি প্রকাশিত ‘লীলাবতীস ডটার্স’ বইতে রাজেশ্বরীর স্মৃতিকথা আছে। আরও বিস্তৃত তিনি লিখেছিলেন আই.আই.এস.সি প্রাক্তনী প্রকাশিত ‘ডাউন দ্য মেমরি লেন’ বইতে। আই.আই.এস.সি থেকে প্রকাশিত ‘কানেক্ট’ পত্রিকার মে ২০১৭ সংখ্যায় শ্রীদেবী ভেঙ্কটেশন ও শুভায়ন সাহু আই.আই.এস.সিতে রাজেশ্বরীর জীবন নিয়ে এবং ঐ পত্রিকারই জুন ২০১৮ সংখ্যায় এস. দীপিকা ইন্সটিটিউট ও তার প্রথম যুগের ছাত্রীদের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। ভারতী ভাট ‘কারেন্ট সায়েন্স’ পত্রিকার ডিসেম্বর ২০১০ সংখ্যায় রাজেশ্বরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশ করেছিলেন। অরুণাভ মিশ্রের ‘বিজ্ঞানে দেশসেরা মেয়েরা’ বইতে রাজেশ্বরীর জীবনকথা পাওয়া যাবে। এই সমস্ত লেখা থেকে নানা তথ্য পেয়েছি।)

No comments:

Post a Comment