গল্পঃ সবই মায়াঃ সায়নদীপা পলমল

সায়নদীপা পলমল


প্রথম অধ্যায়


এক


দীর্ঘদিনের অভ্যেসমতো ঘুম ভাঙতেই চোখ বন্ধ অবস্থায় উঠে বসলেন সুপ্রকাশবাবু। এরপর দুই বাহু প্রশস্ত করে একটা লম্বা হাই তুললেন যেমনটা রোজ তোলেন। কিন্তু আজ হাইটা কেমন যেন অন্যরকম লাগল, মনে হল যেন কিছু একটা অনুপস্থিত। তবে সকালের সাধারণ হাইতে যে কী অনুপস্থিত থাকতে পারে সেটাই ভেবে পেলেন না কিছুতেই। যাই হোক, চোখ খুলে চারপাশটা দেখে বেশ তৃপ্তি অনুভব করলেন তিনি। নরম কচি ঘাসের উপর ঘুমোনোর মজাই আলাদা। সেই ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়, বিকেলবেলা বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে গিয়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়তেন, তারপর সকলে মিলে আকাশের দিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকতেন দিনের শেষে বাসার উদ্দেশ্যে উড়ে চলা পাখির ঝাঁককে। গোটা গায়ে লেগে যেত শুকনো ঘাসের টুকরো। সে ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। একটু বড়ো হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সে আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
ঘুমের ঘোরের মধ্যে জেগে ওঠা নস্টালজিক ভাবটা কাটতেই চমকে উঠলেন সুপ্রকাশবাবু। ব্যাপারটা কী হল! তিনি পার্কে এলেন কী করে? আর এখানে ঘুমোচ্ছিলেনই বা কেন! আশেপাশে চোখ বুলিয়ে তাঁর বিস্ময়ের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এটা তো তাঁর বাড়ির সামনের পার্কটা নয়! তবে এটা কোথায়? আর এরকম পার্কে আগে কখনও এসেছেন বলেও মনে পড়ছে না। হতভম্ভ হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে খেয়াল করলেন একটা কমবয়সী ছেলে এদিক পানেই আসছে। তার দিকে ছুটে গেলেন সুপ্রকাশবাবু।
“এই যে বাবা, শুনছ?”
“আমি! আমায় বলছেন?”
“হ্যাঁ বাবা, তোমায় বলছি।”
“ওকে, বলুন।”
“এটা কোন জায়গা বাবা বলতে পারবে একটু?”
ছেলেটা সুপ্রকাশবাবুকে আপাদমস্তক জরিপ করে নিয়ে একগাল হেসে বলল, “বুঝেছি, বুঝেছি।”
“কী বুঝেছ, বাবা?”
“ওহ্‌ প্লিজ, আয়্যাম নট ইওর ড্যাড ব্রো। সো ডোন্ট কল মি বাবা। ইট সাউন্ডস হিলেরিয়াস।”
ছেলেটার কথা বলার ধরন শুনে সুপ্রকাশবাবুর তো চক্ষু চড়কগাছ। একটা হাঁটুর বয়সী ছেলে কিনা তাঁকে বলছে ব্রো! বেয়াদপি তাঁর কোনওকালে বরদাস্ত হয় না, আর এ তো বেয়াদপের চূড়ান্ত একেবারে!
“ব্রো, হুম? ব্রো? বাবা শুনতে আপত্তি, আর নিজের দাদুর বয়সী লোককে ব্রো বলা হচ্ছে! চ্যাংড়া ছোকরা কোথাকার! ইংরেজি বলতে শিখে গেছ কিন্তু ভদ্রতার পাঠটাই শেখা হয়নি, না? হতে যদি আমার ছাত্র, দেখতাম গুরুজনদের কেমন ব্রো বলা! চাবকে সিধে করে দিতাম।” রাগে গরগর করতে থাকেন সুপ্রকাশবাবু। এই জন্য আজকালকার চ্যাংড়া ছোকরাগুলোকে সহ্য হয় না তাঁর।
“ডিয়ার টেকোদাদু, তোমরা ফ্রেন্ডলি হতেই জানো না। ব্রো ইজ জাস্ট আ ফ্রেন্ডলি অ্যাড্রেস, ইউ নো? বাই দা ওয়ে, টাটা, এরকম ইনসাল্টের পর আমি এখানে নো মোর। নিজের হেল্প এবার নিজেই করো। আমি বাই বাই।”
আচ্ছা অসভ্য ছেলে তো! কোনও লজ্জাশরম নেই! তাঁকে বলল কিনা টেকোদাদু! কী সাহস! কেমন লাফাতে লাফাতে চলে যাচ্ছে দেখো, যেন হাঁটছে না, ভাসছে। সে যাক, এমন ছেলেদের সাথে কথা বলা মানে নিজেরই মুড অফ করা। গেছে ভালো হয়েছে। কিন্তু এখন সুপ্রকাশবাবু করবেনটা কী? তিনি তো কিছুই বুঝতে পারছেন না। কিছুতেই চিনতে পারছেন না এই জায়গাটা। অ্যালঝাইমার্স হয়ে যায়নি তো তাঁর! কী সর্বনাশ! ওই যে ওই তো, আরেকজন আসছে। একেই জিজ্ঞেস করা যাক।
“এই যে ভাই, শুনছেন?”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“এটা কোন জায়গা একটু বলবেন?”
এই লোকটাও আপাদমস্তক জরিপ করতে লাগল সুপ্রকাশবাবুকে। তারপর অবিকল সেই লক্কা ছোকরাটার মতো সুর করে বলল, “হেঁ হেঁ, বুঝেছি বুঝেছি।”
“কী বুঝেছেন ভায়া?”
“সব বুঝেছি। তা এলেন কী করে? ক্যানসার?”
“ও হরি! ক্যানসার কেন হতে যাবে!”
“তবে নিশ্চয়ই হার্ট অ্যাটাক?”
“কী?”
“বলছি হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল?”
“আরে না না, তবে মনে হচ্ছে অ্যালঝাইমার্স।”
“ধুর মশাই! অ্যালঝাইমার্সে আবার কেউ মরে নাকি?”
“কে মরেছে?”
“হা হা হা...”
“হাসছেন কেন?”
“আপনি তবে বুঝতেই পারেননি এখনও?”
“কী বুঝব?”
“কিছু না। হয় হয়, এরকম অনেকের হয়। ভয় পাবেন না একদম, আসুন বসুন এখানে। বুঝিয়ে বলছি সব।”
বাধ্য শিশুর মতো সুপ্রকাশবাবু সেই লোকটির সাথে বসে পড়লেন ঘাসের ওপর। আহা, এত নরম ঘাসও যে হতে পারে জানা ছিল না তাঁর। এ যেন ঘাস নয়, মখমল! শরীরটা কেমন যেন লাগছে। একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিক্ষক সুপ্রকাশবাবুর এখন ভয়ংকর রকম অসহায় অবস্থা। ভাবলেন, বয়স কালে আর কী কী না দেখতে হবে!
“আপনার নামটা?”
“আজ্ঞে, সুপ্রকাশ মিত্র।”
“আর আমার নাম ছিল চন্দন বক্সী।”
“ছিল বলছেন কেন?”
“বলছি সব। আগে বলুন তো পারগেটরি বলে কিছুর কথা শুনেছেন?”
“পারগেটরি মানে তো সেই স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি এক জায়গা। যেখানে মৃত্যুর পর কর্ম অনুসারে মানুষের অবস্থান ঠিক হয়, কীসব আগুন-টাগুনের মধ্যে দিয়ে শুদ্ধিকরণ হয় আত্মার...”
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন আপনি। তবে ব্যাপারটা খানিকটা সেরকম হলেও আবার অনেকটাই আলাদা।”
“আরে মশাই, আমি জানতে চাইছি এটা কোন জায়গা আর আপনি কিনা পারগেটরি নিয়ে পড়লেন!”
“হুম। বলছি যে দাদা, আপনাকে যদি বলি যে…”
“আরে কী বলবেন বলুন না মশাই!”
“যদি বলি যে আপনি এই মুহূর্তে পারগেটরিতেই বসে আছেন, আপনি কি বিশ্বাস করবেন?”
“আশ্চর্য তো! কোনও পাগলা গারদের বাগানে এসে পড়লাম নাকি রে বাবা! একটু আগে এক ছোকরা আমাকে ব্রো বলে ডাকছিল আর এখন আপনি বলছেন আমি পারগেটরি তে বসে আছি! আপনার মাথার ঠিক আছে তো মশাই?”
“আহা, রাগ করবেন না সুপুদা। কী বলছিলেন যেন, কোনও ছোকরা আপনাকে ব্রো বলে সম্বোধন করছিল? হুম। আচ্ছা বুঝেছি, তাহলে আপনার নিশ্চয়ই রিমোর সাথে দেখা হয়েছিল। কারণ, ও ছাড়া এমন চ্যাংড়ামো…”
“সুপুদা! আর রিমোটা আবার কে?”
“হ্যাঁ, সুপুদা। দেখুন দাদা, ওই বিশাল বিশাল নাম বলা আমার ধাতে নেই। তাই আপনার নামটা ছোটো করে নিলাম। সুপুদা। কী মিষ্টি লাগছে না শুনতে?”
“কী আর বলি! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“আহা, একটু ধৈর্য ধরুন, সব বুঝতে পারবেন। তা যা বলছিলাম, এই রিমো বুঝলেন তো এই দু’দিন হল ছোকরা এসেছে এখানে। বড্ড অভদ্র। বড্ড বেশি। গুরুজনদের প্রতি কোনও শ্রদ্ধা ভক্তি নেই। ওই জন্যই… ওই জন্যই তো ছেলেটা এই বয়সে মরল। বুঝলেন দাদা, ভোরবেলা চেলা-চামুণ্ডাদের সঙ্গে নিয়ে মশাই বাইক রেস করতে বেরিয়েছিলেন। হাইওয়ে দিয়ে অতিরিক্ত স্পিড তুলে আর সামলাতে না পেরে সোজা একটা বালি ভর্তি ট্রাকের তলায়।”
“বলেন কী? তারপর?”
“তারপর আর কী? সোজা এখানে। পরশু শ্রাদ্ধ হয়ে গেলে যাবে সোজা নরকে। ওর তো অন্য কোথাও যাওয়ার আশা দেখছি না। ডাইরেক্ট নরক।”
“শ্রাদ্ধ! নরক! কী বলছেন এসব? এক্ষুনি তো ছেলেটাকে জলজ্যান্ত দেখলাম।”
“এই যাহ্‌, দেখেছেন তো স্বভাব যায় না ম’লে। আমার গিন্নি এই জন্য আমার ওপর রেগে যেতেন। এককথা বলতে গিয়ে আরেক বলতে লেগে যাই।”
সুপ্রকাশবাবু ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছেন দেখে চন্দন বক্সী একগাল হেসে বলল, “হেঁ হেঁ, সুপুদা রাগ করছেন দেখছি।”
সুপ্রকাশবাবু নিরুত্তর রইলেন।
“সুপুদা, বলছি যে শুনুন না, যে কথাটা বলছি সেটা একটু মন দিয়ে শুনবেন। মানে আজগুবি ইয়ার্কি মনে হবে, কিন্তু এটাই সত্যি। মানে বলতে চাইছি যে…”
“আরে ভাই, এত ভনিতা না করে বলুন না।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলছি। আসলে সুপুদা, ব্যাপারটা হল এই যে আপনি ঠিক আর আপনি নেই। মানে সুপ্রকাশ মিত্র বলে যিনি ছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। দাদা, দাদা আমি জানি এই মুহূর্তে আপনার আমাকে পেটাতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু উত্তেজিত হবেন না প্লিজ। আসলে যা বললাম এটাই সত্যি। শুধু আপনি কেন, আমি, রিমো বা এখানে যাকে যাকে দেখতে পাচ্ছেন তারা কেউই আর বেঁচে নেই।”
“ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে, হ্যাঁ? ইয়ার্কি?”
“এই দেখুন দাদা, আপনি না বড্ড রাগী। আচ্ছা, আপনার কি কিচ্ছুটি মনে পড়ছে না?”
“মনে পড়লে কি আর এতক্ষণ ধরে তোমার ভাট বকা সহ্য করি?”
“দাদা, এবার কিন্তু ইনসাল্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে দেখে নেহাত সিমপ্যাথি হল, তাই ভাবলাম হেল্প করে দিই, আর আপনি কিনা… যাই হোক, আপনার আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তো? ঠিক আছে। আপনি এক কাজ করুন, উঠে দাঁড়ান দেখি। ঘাসের ওপর দিয়ে একটু হাঁটুন। আর হাঁটার সময় নিজের পাদুটো খেয়াল করবেন শুধু। তারপর দেখি কেমন বলেন আমি ভাট বকছি।”
লোকটা নির্ঘাত পাগল। তবে এই বেলা হেঁটে দেখার বাহানায় লোকটার হাত থেকে পালাতে হবে।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। উঠে দাঁড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করলেন সুপ্রকাশবাবু। কিন্তু এ কী! তাঁর পাদুটো মাটিতে পড়ছে না কেন! আর গাঁটের ব্যথাটাই বা কোথায় গেল? একটু আগে রিমোকে দেখে ছুটে যাওয়ার সময় বোধহয় আবেগে খেয়াল করেননি, কিন্তু এবার স্পষ্ট দেখলেন তার পাদুটো মাটি ছুঁচ্ছে না, মাটির থেকে অন্তত ইঞ্চি ছয়েক ওপরে ভেসে আছে।
ওখানেই ধপ করে বসে পড়লেন সুপ্রকাশবাবু। চন্দন বক্সী এগিয়ে এল। এসেই জোরে একটা চিমটি কাটল সুপ্রকাশবাবুর হাতে। সুপ্রকাশবাবু ব্যথায় চিৎকার করতে গিয়ে টের পেলেন, নাহ্‌, ব্যথা তো লাগল না! তবে! এবার চন্দন বক্সী আবার তার সেই ভুবন ভোলানো হাসি হেসে বলল, “কী দাদা, বিশ্বাস হল এবার? এই চন্দন বক্সী মিথ্যে বলে না কখনও।”
“আ-আমার কী হয়েছে? আমি বাড়ি যাব!”
“দাদা বিশ্বাস করুন, আপনি আর বেঁচে নেই। বাড়ি আর যেতে পারবেন না কখনও। আচ্ছা, আপনার এখনও কিছু মনে আসছে না?”
“নাহ্‌।” ডুকরে কেঁদে উঠলেন সুপ্রকাশবাবু। কিন্তু চোখ থেকে জল বেরোল না।
“আহা দাদা, কাঁদবেন না। আপনার কেসটা রেয়ার কিছু নয়, এমনটা হয় কয়েকজনের সাথে। এখানে আসার পর টেম্পোরারি মেমোরি লস হয়। কিছুক্ষণ পর দেখবেন আপনা থেকেই সব মনে পড়ে যাচ্ছে।”
“আমার কিছু ভালো লাগছে না। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
“দুঃখ করবেন না, দাদা। আপনার তো তাও বয়েস হয়েছে। আমাকে দেখুন, ছেলেটা প্রতিষ্ঠিতও হয়নি, তার আগেই… কে জানে কত হুজ্জুতি পোয়াতে হচ্ছে ওদের।” বলতে বলতে কেমন যেন উদাস হয়ে গেল চন্দন বক্সী।
এতক্ষণে লোকটাকে দেখে মায়া হল সুপ্রকাশবাবুর। নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, কীভাবে মারা গেলে তুমি?”
“কাজের সূত্রে উত্তরাখণ্ড গিয়েছিলাম। সেখানেই সলিল সমাধি।”
“সেই বিধ্বংসী বন্যা?”
“একদম ঠিক ধরেছেন। ভেসে গিয়েছিলাম। ছেলে-বউ বাড়িতে ছিল। লাশ খুঁজে পেল না। সৎকারও হয়নি, তাই আটকে আছি এখানে। ওরা বোধহয় এখনও আশায় আছে যে আমি একদিন ফিরব। রোজ কত শত লোক আসে যায়, কিন্তু আমাদের মতো অভাগারা আদি অনন্তকাল ধরে রয়ে যায় যাদের সৎকার হয় না।”
“যাদের সৎকার হয় তারা কোথায় যায়?”
“আমার ঠিক জানা নেই, তবে চিগুদার কাছে যা শুনেছি তাকে সহজ ভাষায় যদি বলি তো সেটা হল, এখান থেকেই নাকি কর্ম অনুযায়ী স্বর্গ বা নরকে যায়। তারপর কী হয় সেটা চিগুদার বলা বারণ আছে তাই বলেননি আমাকে।”
“চিগুদা?”
“চিত্রগুপ্ত।”
“অ্যাঁ! বলো কী? চিত্রগুপ্ত, মানে যমরাজের সঙ্গী চিত্রগুপ্ত?”
“আরে না না। ধুর। ইনি হচ্ছেন এখানটা দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী। ডিভাইন এমপ্লয়ি বলতে পারেন, হেঁ হেঁ…”
“ডিভাইন এমপ্লয়ি?”
“হ্যাঁ, মৃত্যু সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবেন ওঁর কাছে।”
“তাই? আমিও যাব তবে তাঁর কাছে। কীভাবে যাব বলো না ভাই, প্লিজ! আমার যে অনেক কিছু জানবার আছে।”
“আহ্‌ সুপুদা, এরকম অধৈর্য হবেন না। এখন চিগুদার কাছে নিশ্চয়ই লম্বা লাইন। আমি আপনাকে ঠিক তাল বুঝে নিয়ে যাব। চিগুদার সাথে আমার বেশ জানা শোনা আছে, কোনও অসুবিধা হবে না।”
“আচ্ছা। তবে নিয়ে যাবে কিন্তু ভাই, প্লিজ।” বিরস বদনে বললেন সুপ্রকাশবাবু। এতক্ষণ যার ওপর রাগ করছিলেন এখন তাকে ভীষণভাবে ভরসা করে ফেললেন।
“তা বলুন দাদা, কেমন ফিলিং হচ্ছে এখন?”
“ভাই, বলছি যে পারগেটরি তো বইতে পড়েছি এক ভয়ংকর জায়গা, কিন্তু এটা তো…”
“হেঁ হেঁ। এখানটা কত সুন্দর না? সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মহান। তিনি যা করেন তাই সুন্দর হয়। আর দাদা, বইয়ের পাতায় কী আছে? কবি-গল্পকারদের কল্পনা। আসলে পারগেটরি জায়গাটা কেমন বা আসলে জায়গাটা কী সেটা তাঁরা জীবিত অবস্থায় কেমন করে বুঝবেন বলুন দেখি? ওঁদের লেখার সাথে তাই মিল খুঁজতে যাবেন না একদম।”
“হ্যাঁ, কিন্তু ভাই, খ্রিস্ট ধর্মের লোকেরাই তো পারগেটরিতে যায়। আর আমি তো হিন্দু। তাহলে আমি এখানে কেন?”
“আ-হা হা হা… আ-হা হা হা…”
“এমন অট্টহাস্যের কারণ জানতে পারি কি?”
“সরি দাদা, সরি। রাগ করবেন না প্লিজ। আসলে আপনার কথাটা… হি হি… প্লিজ দাদা, গোমড়া মুখ করবেন না।”
“হুম।”
“বলছি যে শোনেননি, মহান কবি বলে গেছেন ‘All the paths of glory lead but to the grave.’ মৃত্যুর পর সব এক। কী রাজা কী প্রজা, কী হিন্দু কী খ্রিস্টান। এসব বিভাজন দাদা অর্থহীন। এখানে আসার পর বুঝলাম আমরা কীভাবে পৃথিবীতে আমাদের জীবনটা কিছু মিথ্যা জিনিসের মধ্যে ব্যয় করে দিই, তারপর যখন হঠাৎ করে একদিন কোনও আগাম আভাস ছাড়াই এখানে পৌঁছে যাই তখন শুধু নিজের ভুলভাবে অতিবাহিত জীবনের কথা ভেবে অনুশোচনা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।”
কেমন যেন উদাস হয়ে গেল চন্দন বক্সী। অনবরত বকবক করে চলা লোকটা হঠাৎ একদম চুপ করে গেল। তাই সুপ্রকাশবাবুকেই নীরবতা ভঙ্গ করতে হল। “ঠিক কথা। কিন্তু ভাই, এটা যদি পারগেটরি হয় তো এখানে তো লোক থুড়ি আত্মা গিজগিজ করার কথা। কিন্তু এত কম লোক কেন এখানে? আর এখানে তো শুধু বাঙালি দেখতে পাচ্ছি। তোমার ঐ চিত্রগুপ্ত, সেও তো ভারতীয়। বিদেশিদের আত্মা কোথায় যায়?”
“এটা কি আর এতটুকু জায়গা ভাবলেন, দাদা! থাকবেন তো ক’টা দিন। তখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাব চারদিকটা। আর এখানের ব্যাপার-স্যাপার আজই এসে বুঝে যাবেন বললে হয়! আমি এতদিনেও সব বুঝতে পারলাম না, আর আপনি তো…”
চন্দন বক্সী হঠাৎ গলা ছেড়ে গান ধরলেন, “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে… আমরা সবাই রাজা… লা লা লা লা…”
বিরক্ত হবেন ভেবেও ঠিক বিরক্ত হতে পারলেন না সুপ্রকাশবাবু। কেমন যেন একটা অন্যরকম অনুভূতি তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।


দুই


“নাম বলতে পেরেছে? নাম জানলে সুবিধা হবে খুঁজতে।”
“বলল তো সুপ্রকাশ মিত্র।”
“দেখি। উম্‌, হ্যাঁ পেয়েছি। কাল সন্ধেবেলায় এসেছেন। হার্ট অ্যাটাকের কেস।”
“হুম, আমার দেখেই মনে হচ্ছিল হার্ট অ্যাটাক কেস হবে। হার্ট অ্যাটাক হলেই সাধারণত এই টেম্পোরারি মেমোরি লসগুলো হয়।”
“বাহ্, দিনকে দিন তুমি তো এক্সপার্ট হয়ে যাচ্ছ দেখছি, চন্দন!”
“হেঁ হেঁ, সবই আপনার কৃপা। কিন্তু চিগুদা, লোকটার মেমোরি কতক্ষণে ফিরবে? বড্ড অস্থির হয়ে উঠছে যে! আমার কথাও বোধহয় পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না, ভাবছে বেঁচে আছে।”
“এ আর নতুন কী কথা! সৎকার হওয়ার আগে পর্যন্ত কেউ পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারে না, ভুলতে পারে না পৃথিবীর কোনও কথাই। তাই তো সেই সময়টুকুর জন্য সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এই সুন্দর উদ্যান বানিয়েছেন। এই জায়গাটা তো পৃথিবীর ছায়ায় তৈরি। মায়াময় জগত এটা, ঠিক পৃথিবীর মতো। সৎকার না হওয়া পর্যন্ত মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থাকার কারণে আত্মা মানতেই পারে না যে সে আর দেহে নেই। তুমিও কি কম ছিলে নাকি হে?”
“আর ওসব কথা মনে করাও কেন চিগুদা! অনেক কষ্টে সামলেছি সব।”
চন্দন বক্সী আর চিত্রগুপ্তের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মানে ওই ভেসে ছিলেন সুপ্রকাশবাবু। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি চিৎকার করে ছুটতে শুরু করলেন। “মেজদা, মেজদা, এই দেখো আমি এসেছি। তুমি কোথায়?”
“উফ্‌, আমার হয়েছে এই জ্বালা। দেখি যাই ব্যাপারখানা কী। কী মনে পড়ল ওঁর, আর এই মেজদাদাই বা কে! আসি চিগুদা। টাটা।”
এই বলে চন্দন বক্সীও ছুটতে শুরু করল সুপ্রকাশবাবুকে ধরার জন্য। চিত্রগুপ্ত সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো একটা শব্দ করলেন শুধু।


তিন


শ্রাদ্ধের কাজ শেষের মুখে। জোরকদমে চলছে মন্ত্রপাঠ। সুপ্রকাশবাবুর দুই ছেলে বসেছে শ্রাদ্ধে। একটু দূরে একটা চেয়ারে বসে আছেন সুনির্মলবাবু। তাঁর দৃষ্টি হোমকুণ্ডের দিকে। কিন্তু একটু ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যাবে তিনি আসলে ওসব কিছুই দেখছেন না। তাঁর মনের দৃষ্টি অন্য কোথাও প্রসারিত।
দিনটা ছিল একত্রিশে মার্চ। নাতি পিচকু হঠাৎ সন্ধ্যাবেলায় এসে আবদার করল, “দাদু, চলো না কাল ছোটদাদুর বাড়ি। ঘুরে আসি দু’দিন। কেউ যেতে চাইছে না। তুমি চলো না, প্লিজ।”
সুনির্মলবাবুরও মনে হল, বহুদিন নিজের ছোটো ভাইটাকে দেখেননি, তাই যাওয়াই যাক।
পরের দিন যাওয়ার পথেই এই ভয়ংকর বুদ্ধিটা তাঁর মাথায় আসে। উফ্‌, কী কুক্ষণেই যে অমন সর্বনাশা খেলায় মাতার শখ হয়েছিল!
পয়লা এপ্রিল, অর্থাৎ অন্যকে বোকা বানানোর দিন। প্ল্যান মাফিক সন্ধে নাগাদ সুপ্রকাশের বাড়ির কাছাকাছি এসে পিচকু ফোন করে সুপ্রকাশবাবুকে জানায়, তার দাদু মানে সুনির্মলবাবু কিছুক্ষণ আগেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছেন। এরপর প্ল্যানের পরের ধাপ অনুযায়ী সুনির্মলবাবু পা টিপে টিপে সুপ্রকাশবাবুর বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ান। দরজা আধ খোলা থাকায় বেশি সুবিধে হয়। সুপ্রকাশবাবু তখন তাঁর প্রিয় আরাম কেদারায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সবে কাঁদতে শুরু করেছেন আর তখনই সুনির্মলবাবু খোনা গলায় বলতে শুরু করেন, “সুপু আয়, আয় আমার কাছে আয়।”
কিন্তু তৎক্ষণাৎই হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে যায়। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারটা মোটেই সুনির্মলবাবুর প্ল্যানের অংশ ছিল না। তবে এটাই বোধহয় ছিল ওপরওয়ালার প্ল্যানের ক্লাইম্যাক্স।
এরপর যা ঘটে তা ভেবে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সুনির্মলবাবু। সুপুকে কাছে ডেকেছিলেন, আর সে ব্যাটা কিনা তাঁকে ফাঁকি দিয়ে তৎক্ষণাৎ কত দূরে চলে গেল! এত ভয় তার যে সোজা হার্ট ফেল করল! কেউ দোষারোপ করেনি সুনির্মলবাবুকে, কিন্তু তিনি নিজেই এখন মরমে মরে যাচ্ছেন। কিছুতেই আর মন বসাতে পারছেন না। ঈশ্বরের কাছে একনাগাড়ে প্রার্থনা করে চলেছেন ভাইয়ের কাছে তাঁকেও টেনে নেওয়ার জন্য।


চার


“ভাই চন্দন, আসছি তাহলে।”
“হ্যাঁ দাদা, সাবধানে যেও।”
“তুমি না থাকলে আমার কী যে হত! আমি তো কিছুই বুঝতে পারতাম না যে কীভাবে মারা গেলাম হঠাৎ করে!”
“সেটা নয় দাদা, ঠিক হয়ে যেত সব।”
“না ভাই, তুমি যাই বলো, তোমার তুলনা হয় না। আমার মতো হতভম্ব বিদেহী আত্মাদের সাহায্যে তুমি যেভাবে এগিয়ে আসো, সত্যি তুমি না থাকলে আমি হয়তো এখনও মেজদাকে খুঁজে যেতাম বোকার মতো।”
“আমারও আর কী কাজ, দাদা? আপনাদের সঙ্গে সময়টা ভালো কাটে, আর কী। নিজের স্বার্থেই করি বলতে পারেন।”
“প্রার্থনা করি তুমিও যেন তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরোতে পার।”
“প্রার্থনা! আর… সবই মায়া। হেঁ হেঁ, এতদিন থাকতে থাকতে এই জায়গাটার প্রতি বেশ মায়া পড়ে গেছে বুঝলেন তো, বেশ আছি। একদিন না একদিন যাব তো ঠিকই।”
“হ্যাঁ। আর ভাই, মনে আছে তো যে কাজটা দিয়েছি তোমাকে? আমি থাকলেই ভালো হত, কিন্তু তাও ঠিক আছে, তুমিই করে দিও বুড়ো দাদার আবদার হিসেবে।”
“হেঁ হেঁ, আপনার দেওয়া কাজ কি আর ভুলতে পারি? নিশ্চিন্তে যান, দাদা। আপনার কাজ ঠিক হয়ে যাবে। ডোন্ট ওয়ারি।”
আরও কয়েকজনের সঙ্গে সুপ্রকাশবাবু আস্তে আস্তে প্রবেশ করলেন সামনে উন্মুক্ত এক কালো গহ্বরে। সবাই প্রবেশ করার পর আস্তে আস্তে গহ্বরটা মিলিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে রইল শুধু চন্দন বক্সী আর চিত্রগুপ্ত।
“তোমাকে কতবার বলি চন্দন, কী দরকার এদের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে মায়া বাড়ানোর? এরা তো কিছুদিন পরই চলে যায়, আর সেখানে গিয়ে ভুলেও যায় তোমার কথা। মানে এখানকার সব কথা। কিন্তু তুমি! শুধু শুধু…”
বাক্যবাগীশ চন্দন বক্সী আজ কোনও কথা বলে না, চুপ করে চেয়ে থাকে মিলিয়ে যাওয়া কালো গহ্বরটার দিকে। প্রত্যেকবারই এরকম হয়, কিন্তু এবার যেন বেশি করে… আসলে সুপ্রকাশবাবুর সাথে তার ঘনিষ্ঠতাটা অনেক বেশি হয়ে গেছিল। আচ্ছা, আত্মাদের কি মন থাকে আদৌ যে চন্দনের মনখারাপ করছে? নাকি এ সবই মায়া? চিত্রগুপ্ত এগিয়ে এসে চন্দন বক্সীর কাঁধে হাত রাখেন। চন্দন ঘুরে তাকায়। বলে, “আমি ঠিক আছি, চিগুদা।”
“ঠিক বলছ?”
“হুম। বলছি যে সুনির্মল মিত্র কবে আসবেন বলছিলে যেন?”
“কে সুনির্মল মিত্র?”
“আরে সুপুদার মেজদা।”
“ওহ্‌, আচ্ছা। ঠিক দিনক্ষণ বলতে পারব না, তবে খুব শিগগির আসবেন নিশ্চয়ই। নয়তো আমার কাছে ওঁর নাম আসত না।”
“আচ্ছা আচ্ছা, ভালো ভালো।”
“কিন্তু তোমার আবার তাঁর সঙ্গে কী দরকার?”
“ও বুঝবে না তুমি। সুপুদা যাওয়ার আগে একটা মিশনের দায়িত্বে দিয়ে গেছেন আমাকে।”
“মিশন! কী মিশন?”
“হেঁ হেঁ, এ যে সে মিশন নয়। এ হল মিশন পারগেটরিও এপ্রিল ফুল। হেঁ হেঁ…”
তার ভুবন ভোলানো হাসি নিয়ে চন্দন বক্সী ভেসে চলল সেখান থেকে। অনেক কাজ তার। কে জানে এই বাগানের কোন কোনায় আবার কোন নতুন দাদা কিংবা ভাই কিংবা কোনও বোনের সাহায্য দরকার।


দ্বিতীয় অধ্যায়


এক


“অবশেষে হাতে পেয়ে গেলে তোমার বহু কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা।”
“রাগ করেছিস আমার ওপর?”
“নাহ্‌, রাগ করতে যাব কেন!”
“তোর মনের উষ্মা মুখের ভাষায় স্পষ্ট।”
“মানে?”
“মানে আবার কী? কতটা রাগ জমে আছে বলে তোর বাবার ডেথ সার্টিফিকেটটাকে বলতে পারলি আমার বহু কাঙ্ক্ষিত জিনিস।”
“না মা, আমায় ভুল বুঝছ তুমি। আঘাত করতে চাইনি তোমায়।”
“ঠিক আছে। জানি তোর মনে ক্ষোভ জমে আছে, কিন্তু আমার আর কী করণীয় বল?”
“মা...”
“হুম?”
“বলছি, বাবা যদি ফিরে আসে?”
“তোর মনে হয় ওঁর ফেরার কোনও আশা আছে?”
“যদি আসে? মা, আমরা তো বাবা আর নেই সেরকম কোনও প্রমাণই পাইনি, তাই না?”
“মানুষটা সাত বছরের ওপর নিখোঁজ। এটা যথেষ্ট প্রমাণ নয় কি? উনি যদি বেঁচেই থাকতেন বাড়ি কি ফিরতেন না এতদিনেও? তাছাড়া কম খোঁজাখুঁজিও তো করা হয়নি।”
“সবই জানি মা, কিন্তু তাও…”
“তোর মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু তুই এখনও ছেলে মানুষ, তাই এসব কথা বলছিস। আমিও একটা সময় অবধি আশা করতাম ফিরবেন মানুষটা। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে শক্ত করে নিয়েছি। এ সমাজ বড়ো নিষ্ঠুর বাবা, সবাই খুবলে খেতে আসে। এই সমাজে টিকে থাকতে হলে মনকে শক্ত করতে হবে আমাদের।”
“জানি।”
“ওঁর ডেথ সার্টিফিকেটটা খুব দরকার ছিল। এবার ওঁর সব টাকাপয়সা তুলতে পারব। যে কোম্পানির কাজে উত্তরাখণ্ড গিয়ে মানুষটা ঐরকম একটা ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে হারিয়ে গেলেন, সেই কোম্পানিই দেখলি তো কোনও সাহায্যই করল না। তুইও আজ তিন বছর পাশ করে বসে আছিস। চাকরির আশায় আর কতদিন থাকবি?”
“তো আমি কী করব?”
“আমি ভাবছিলাম তোর বাবার টাকাপয়সাগুলো পেলে একটা ব্যাবসা শুরু করতে পারবি। সামান্য আঁকার স্কুল চালিয়ে কী কষ্টে যে এই সাত-আট বছর সংসারটা টানছি, তোর পড়া চালিয়েছি, সে আমি জানি আর ঈশ্বর জানেন। কিন্তু আর টানতে পারছি না। শরীরটা বড্ড খারাপ লাগে আজকাল।”
“টাকা পেলে ব্যাবসা শুরু করতে পারি। কালই ব্যাঙ্কে যাব কথা বলতে।”
“হ্যাঁ, সেই ভালো। তবে তার আগে…”
“তার আগে কী?”
“তোর বাবার কাজ তো হয়নি, তাই ভাবছিলাম ওঁর শ্রাদ্ধের জন্য একটা পুজো করব। আত্মা বলে কিছু আছে কি না আমি জানি না, তবে যদি থেকে থাকে তাহলে সৎকার হয়নি বলে ওঁর আত্মা নিশ্চয় কষ্ট পাচ্ছেন। আমি তাই ভাবছি শ্রাদ্ধের আয়োজন করব।”
“বেশ। তবে তাই হোক।”


দুই


“আরে আরে ভাই, দাঁড়ান দাঁড়ান। আপনি এভাবে ছুটছেন কেন? কী হয়েছে আমায় বলুন।”
“আ-আমার ভীষণ পাগল পাগল লাগছে, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি।”
“আহা ভাই, আপনি দাঁড়ান। দাঁড়ান বলছি! হ্যাঁ, এই তো লক্ষ্মী ছেলে। এবার আসুন, এখানে বসুন। বলুন আপনার কী সমস্যা।”
উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকা লোকটা এবার থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর জুলজুল করে দেখতে লাগল অপর ব্যক্তিকে। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি এবার নিজেই এগিয়ে এসে প্রথম জনকে ধরে বসাল মাঠের নরম কচি ঘাসে, নিজেও বসল। “এবার বলুন সমস্যাটা কী।”
“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
“আপনার কি কিছু মনে পড়ছে?”
“আবছা আবছা। একটা উঁচু মতন বিছানায় শুয়ে আছি, পাশে মুখোশ ঢাকা কয়েকজন… হাতে কেমন সব জিনিস, ধারালো…”
“হুম। হসপিটালে ছিলেন?”
“হসপিটাল? কই, না তো! ঠিক মনে পড়ছে না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, একটু শান্ত হয়ে বসুন। তারপর মনে করার চেষ্টা করুন।”
কিছু সময় পর…
“মনে পড়ছে, মনে পড়ছে!”
“বাহ্! বলুন এবার।”
“আমি একটা কারখানায় কাজ করতাম। বন্ধ হয়ে গেল। রোজগার হারালাম।”
“চুপ করে গেলেন কেন? তারপর কী হল বলুন।”
“হ্যাঁ, তারপর হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছিলাম, তখনই দেখা হল ওর সাথে।”
“কার সাথে?”
“নামটা মনে পড়ছে না যে!”
“আচ্ছা, নাম বাদ দিন। বলুন, তার সাথে দেখা হওয়ার পর কী হল।”
“সে বলল একটা কাজ আছে। আমাকে নিয়ে এল একদিন সন্ধেবেলা। একদিন কেন! কালই তো নিয়ে এল। আর তারপরই…”
“কী তারপর?”
“উফ্‌, যন্ত্রণা! জোর করে শুইয়ে দিল। মুখোশ পরা লোক, হাতে ছুরি-কাঁচি… আমার আর মনে পড়ছে না যে!”
“আন্দাজ করতে পারছি কিছুটা। তবে ভালো করে বুঝতে হলে চিগুদাই ভরসা।”
“চিগুদা?”
“হুম, চিত্রগুপ্ত।”
“লোকে এমন নাম কেন যে রাখে! কেমন যেন মৃত্যুর গন্ধ।”
“হা হা হা…”
“হাসছেন কেন আপনি?”
“ভাই, তোমার নাম কী?”
“আমার নাম প্রকাশকুমার দাস।”
“আচ্ছা পিকু ভাই, এখুনি আমি একটা কথা বলব তোমায়, বিশ্বাস করবে কি?”
“কী কথা, দাদা?”
“যদি বলি তুমি আর বেঁচে নেই?”
“ইয়ার্কি করছেন আমার সাথে? এই তো দিব্যি বসে কথা বলছি আপনার সাথে। এত সুন্দর বাগান, নরম কচি ঘাস, আর আপনি বলছেন আমি বেঁচে নেই?”
“হ্যাঁ ভাই, ঠিকই বলেছ। তবে ব্যাপারটা হল গিয়ে সত্যিই তুমি আর বেঁচে নেই। এই যে তুমি আমার সাথে কথা বলছ, কারণ আমিও যে তোমারই মতো। আর বেঁচে নেই আমিও। আর এই জায়গাটা হল… আচ্ছা, পারগেটরি বলে কিছুর কথা শুনেছ?”
“কী? তরী? মানে নৌকা?”
“আহা, তরী নয়, টোরি। পারগেটরি। এটা হল স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি এক জায়গা। কৰি-গল্পকারদের লেখায় খুব পাবে এর কথা। পড়নি কখনও?”
“আমার ওসব পড়াশুনো ভালো লাগে না।”
“এহে, সে কী কথা! যাই হোক, তা পড়লে জানতে পারতে জায়গাটার কথা। যদিও এখানটা ঠিক সাহিত্যে বর্ণিত পারগেটরি নয়, তবুও আমি তোমাদের মতো যারা আসে তাদের বোঝাতে এই নামটাই বলে দিই। তা ভাই, এটা হল এমন একটা জায়গা যেখানে মৃত্যুর পর থেকে সৎকারের আগে অবধি মানুষ এসে থাকে। এরপর সৎকার হয়ে গেলে এখান থেকে বোধহয় স্বর্গ বা নরকে কোথাও একটা যায়, আমিও ঠিক জানি না। আমার এখনও সৎকার হয়নি কিনা। হেঁ হেঁ।”
“প্লিজ দাদা, এসময় এসব ইয়ার্কি করবেন না। আমার ভালো লাগছে না।”
“আহা, রাগ করে না ভাই। এই বাগানটা পৃথিবীর মতোই লাগছে, তাই না? আসলে সবই মায়া, বুঝলে? মৃত্যুর পর পৃথিবী ছেড়ে ডাইরেক্ট এখানে সবাই আসে বলে এই জায়গাটা পৃথিবীর ছায়ায় তৈরি করা হয়েছে।”
“আপনি কি লেখক? গাঁজাখুরি গল্প লেখেন?”
“হুম, বুঝলাম। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। তাহলে আর কী? সবাইকে এসময় যেটা বলি তোমাকেও তাই বলি। বলছি যে উঠে দাঁড়াও, খানিকটা হাঁটাহাঁটি করো আর ওই সময় পায়ের দিকটা খেয়াল করবে।”
“না, হাঁটব না। আপনি কে মশাই যে আপনার কথা শুনব আমি?”
“হক কথা বলছ ভাই। এতক্ষণ হয়ে গেল নিজের পরিচয়টাই দিতে ভুলে গেছি। যাই হোক, এই অধমের নাম হল চন্দন বক্সী।”


তিন


“চিগুদা, এই যে এর ব্যাপার-স্যাপার একটু দেখতে হবে।”
“আবার কাকে নিয়ে পড়লে, ভাই?”
“হেঁ হেঁ, এই যে দাদা এর। বয়সটা কীই বা আর, মনে হচ্ছে কিডনি পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বেঘোরে প্রাণটা দিয়েছে।”
“বুঝলাম। নাম কী?”
“প্রকাশ কুমার দাস।”
“দেখি দেখি, হুম, পেয়েছি। বাহ্ চন্দন, দারুণ!”
“কেন দাদা, আমি আবার কী করলাম?”
“একদম ঠিক বলেছ। তবে শুধু কিডনি নয়, আরও অনেক কলকব্জা বের করে ছেড়েছে।”
“ইস! কীই বা বয়েস! আমি ভাবছিলাম যে... উফ্‌, আমারই হয়েছে যত জ্বালা। যাই, বেচারাকে সান্ত্বনা দিই। যখনই উঠে দাঁড়িয়ে দেখল মাটিতে পা পড়ছে না, ভেসে আছে, তখনই বুঝল যে সেই জগতে আর নেই। আর তখন থেকে ছেলে-বউয়ের কথা ভেবে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছিল। আবার চোখ থেকে জল বেরোচ্ছে না দেখে আরও জোরে কাঁদতে লেগেছে।”
“চন্দন…”
“হ্যাঁ, দাদা।”
“কেন করো এসব? তোমাকে কতবার সাবধান করেছি না যে এদের মায়ায় জড়িও না, ওরা এখান থেকে বেরিয়ে গেল সব ভুলে যায়? কিন্তু তুমি শুধু শুধু কষ্ট পাও প্রত্যেকবার।”
“কী আছে দাদা? ক্ষণিকের কষ্টই তো! একজন যায় আবার নতুন কেউ আসে। এখান থেকে বেরিয়ে গেলেই তো আর এসব কোনও অনুভূতি আমারও থাকবে না।”
“হুম। কিন্তু আমার মনে হয় কী জানো? মৃত্যুর পর মানুষকে এই জায়গায় আনাটাই ঠিক নয়। এ তো পুরো মায়ার সাম্রাজ্য। লোকে বিশ্বাসই করতে পারে না যে সে মারা গেছে। আমার মনে হয় এই জায়গাটা এমন হওয়া উচিত ছিল যেখানে মায়া কাটানো হয়। উলটে এ কিনা...”
“বটে। কিন্তু চিগুদা, সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর  যখন এটা বানিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই কোনও প্রয়োজন আছে এর। উনি কি অকারণে কিছু করতে পারেন?”
“হুম। তুমি তো দেখছি দিন কে দিন বেশ অন্যরকম করে ভাবতে শিখছ।”
“হেঁ হেঁ, সব আপনারই দয়া চিগুদা। এবার তবে যাই আমি?”
“আচ্ছা যাও। সামলাও তোমার নতুন ভাইকে।”
“হেঁ হেঁ। ও হ্যাঁ, বলছি যে সুপুদা আর সোনাদা ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে?”
“একদম। দু’জনে এখন খাটে শুয়ে খেলা করছে।”
“বাহ্, বাহ্! সত্যি ওঁদের সাথে কাটানো সময়টা দারুণ ছিল। ওঁদের মতো আপন আজ অবধি কাউকে মনে হয়নি আমার।”
“হ্যাঁ, জানি। আর তোমার সোনাদা আসার পর যা করেছিলে তাঁর সাথে! উফ্‌, এখনও ভাবলে পেটটা গুলগুল করে হাসি পায়।”
“সবই সুপুদার আইডিয়া ছিল। নিজের মৃত্যুর মিষ্টি করে বদলা নেওয়ার ভারটা দিয়ে গিয়েছিলেন আমার ওপর। উনি বলেছিলেন সোনাদা আসা অবধি যদি আমি এখানে থাকি তো… হেঁ হেঁ,  আমি তো তোমার কাছে আগেই শুনেছিলাম যে সোনাদা শিগগির এখানে আসছেন। কিন্তু সুপুদাকে সেকথা জানাইনি। হয়তো দুঃখ পেতেন।”
“দুঃখ নিশ্চয়ই পেতেন। যতই দাদার মজা করার ছলে ওঁর প্রাণ যাক তাও দাদা তো। মৃত্যুকে কেউ ভালোবাসে না হে। নিজের মৃত্যুর থেকেও বোধহয় মানুষ বেশি ভয় পায় কোনও আপনজনের মৃত্যুকে। মায়া, জীবনের মায়া। মারাত্মক জিনিস। তা ভালোই করেছিলে না জানিয়ে।”
“হেঁ হেঁ। সোনাদা কিন্তু প্রথমদিকে বেজায় ক্ষেপে থাকতেন আমার ওপর।”
“হবেই তো। একেই এখানে প্রথম এসে সবার এক পাগল পাগল অবস্থা হয়। তার ওপর তুমি তোমার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে যদি তাঁকে ওই এপ্রিল ফুল না কী যেন করতে বোঝাও যে তিনি পাগলা গারদে এসেছেন, রাগ তো করবেনই।”
“হেঁ হেঁ। ছেলেপুলেগুলোকে পাগলের অভিনয়ের রিহার্সাল করাতে কম ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল নাকি!”
“তারপর সুনির্মলবাবুকে সত্যি কথাটা বলার পরও কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাননি। ভাবছিলেন পাগলের প্রলাপ সব। তোমার ঐ‘একটু হেঁটে দেখুন পদ্ধতিও তো ফেল মেরেছিল। উনি ধরে নেন ওটা পাগল অবস্থার দৃষ্টি বিভ্রম।”
“তা যা বলেছ, চিগুদা। ওঁকে সত্যিটা বিশ্বাস করাতে আরও কালঘাম ছুটে গেছিল আমার। আচ্ছা, এখন তবে আসি চিগুদা। নতুন ছেলেটা অপেক্ষা করছে।”
“হুম, এসো।”


“কাদের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন চিত্রগুপ্তবাবুকে?”
“আমার দুই মরণতুতো দাদার কথা।”
“কী দাদা!”
“মরণতুতো। মানে মৃত্যুর পর এখানে দাদা পাতিয়েছিলাম তাঁদের। এই যেমন তোমাকে ভাই পাতালাম।”
“আচ্ছা। তা ওঁরা এখন কোথায়?”
“ওঁরা এই তিনদিন হল নতুন জন্ম নিয়েছেন। আগের জন্মে সোনাদা মানে সুনির্মলদা ছিলেন সুপুদা মানে সুপ্রকাশদার মেজদাদা। কিন্তু এবারে দু’জনে যমজ হয়ে জন্মেছেন। তবে সুপুদা পাঁচ মিনিট আগে বেরিয়েছেন। হেঁ হেঁ, এই জন্মে সুপুদা মনে হচ্ছে দাদা হয়ে বেশ দাদাগিরি করবেন সোনাদার ওপর।”
“ওরা কী করে মারা গিয়েছিলেন?”
“সে এক লম্বা গল্প, পরে বলব তোমায়।”
“আচ্ছা।”
“হুম।”
“দাদা, একটা কথা জানতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। এই চিত্রগুপ্তবাবু কি যমরাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিত্রগুপ্ত?”
“হা হা হা... সবাই এসে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। না ভাই, চিগুদা সেই যমরাজের চিত্রগুপ্ত নন। চিগুদা এই পারগেটরির দেখভালের দায়িত্বে আছেন। যমরাজ বলে আদৌ কেউ নেই। বুঝলে?”
“আচ্ছা, উনি কি মানুষ? মানে উনি কি আমাদের মতই মৃত্যুর পর...”
“এহে! এটা একটা ভালো প্রশ্ন করেছ তো ভাই। এই প্রশ্নটা আমার মাথায় আসেনি কোনওদিন। দাঁড়াও, জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে চিগুদাকে।”


চার


“কাল আমি এখান থেকে চলে যাব চন্দনদা, আর আজ কিনা আপনার কোনও পাত্তাই নেই?”
“আহা, রাগ কোরো না ভাই, চিগুদার সাথে একটু মিটিং করছিলাম।”
“মিটিং? কী নিয়ে?”
“বলছি সব। এসো, বসো। ভাই, সত্যি বলতে তোমার মৃত্যুর কারণটা জানার পর থেকে বড্ড ছটফট করছিলাম। শুধু তুমি একা নও, আজ এখানে কতদিন আছি সেই সময়ের হিসেব তো পাই না, তবে আন্দাজ হয় পৃথিবীর হিসেবে হবে অনেক বছর। তো এতদিনে অনেক মানুষকে দেখলাম যাদের অন্যায়ভাবে মৃত্যু হয়েছে অন্যের হাতে, মানে সোজা ভাষায় যাকে বলে খুন।”
“হ্যাঁ দাদা, ভীষণ রাগ হয় জানেন! মনে হয় যদি ওই লোকগুলোকে কোনও শাস্তি দিতে পারতাম নিজের হাতে তাহলে হয়তো জ্বালা জুড়োতো। বেঁচে থাকাকালীন কত শুনতাম, মরে গেলে নাকি ভূত হয়ে দুষ্ট মানুষের ঘাড় মটকানো যায়!”
“ঘাড় মটকানো না ছাই। একবার মরে গেলে হাজার চেষ্টা করলেও নতুন জন্ম নেওয়ার আগে পৃথিবীতে আর যাওয়াই যায় না। জানো ভাই, বড্ড ইচ্ছে হয় একবার যদি দেখতে পেতাম আমার স্ত্রী আর ছেলেটা কেমন আছে! ছেলেটা বড্ড ন্যাওটা ছিল আমার। কী করছে এখন কে জানে! পড়াশুনোটাও শেষ করাতে পারলাম না। তার আগেই…”
“দুঃখ করবেন না, দাদা।”
“দুঃখ করা বহুদিন হল ছেড়ে দিয়েছি। শুধু জানতে ইচ্ছে করে ওরা কেমন আছে, কী করে দিন কাটছে। ছেলেটা চাকরিবাকরি পেল কি না কে জানে। কোম্পানি ওদেরকে কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়েছে কি না তাও জানি না।”
“দাদা, আমার কী মনে হয় জানেন? উত্তরাখণ্ডের সেই বন্যায় ভেসে যাওয়া বহু বেওয়ারিশ লাশকে সরকারি উদ্যোগে দাহ করা হয়েছিল। তো আমার মনে হয় আপনাকেও সেই সময়ই… আর সেই কারণেই বৌদি আর ভাইপো নিশ্চয়ই আপনার সন্ধান পায়নি। তাই শ্রাদ্ধশান্তিও করতে পারেনি, আর আপনি আটকে রয়েছেন এখানে।”
“হুম, তাই হবে হয়তো।”
“ওহো দাদা, আপনি চিগুদার সাথে মিটিংয়ের কথা কী বলছিলেন যেন?”
“এই দেখেছ! আমার এই সমস্যা। এজন্য তোমার বৌদিও খুব রাগ করত। এক কথা বলতে বলতে সেটা ভুলে অন্য কথা বলতে লেগে যাই।”
“হি হি।”
“হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম ভাই, তোমার মতো আরও যারা অন্যায়ের শিকার, তাদেরও ইচ্ছে করে খুনিকে নিজের হাতে কিছু শাস্তি দিতে। কিন্তু এখানে সেরকম কোনও ব্যবস্থাই নেই। চিগুদার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুষ্ট লোকগুলো শাস্তি পায় মরার পর এখান থেকে নরক বা ওই জাতীয় কোনও একটা জায়গায় গিয়ে, আর যাদের ওপর তারা অন্যায় করেছে সেই মানুষগুলো তো মনে হয় জানতেও পারে না যে তাদের অপরাধী শাস্তি পাচ্ছে। তাই চিগুদার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম যে যদি উপরওয়ালাদের সাথে কথা বলে এই নিয়ে কিছু একটা করতে পারেন, মানে যদি এমন কোনও ব্যবস্থা চালু করা যায় যে এখানে থাকাকালীন তোমার মতো অন্যায়ভাবে মৃত ব্যক্তি নিজেই কোনওভাবে নিজেদের অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, বা অন্তত জানতে পারে যে তার অপরাধীর কী শাস্তি হচ্ছে। তাহলে খুব ভালো হয়, তাই না?”
“একদম ঠিক কথা বলেছেন, দাদা। তা চিগুদা আশ্বাস দিলেন কিছু?”
“দুঃখের কথা কী আর বলি ভাই, ধমকে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন যত আজগুবি চিন্তা নাকি এসব। কিন্তু আমার মনে হয়, এই জায়গাটার একটু রিমডেলিং দরকার।”
“আচ্ছা আপনি তো অনেক দিন আছেন এখানে, আপনি পারেন না ওপর মহলে যোগাযোগ করতে?”
“অনেক দিন থাকলে কী হবে ভাই, কোনও ক্ষমতা আছে আমার! আমি তো তোমাদেরই মতো একজন। তাও যদি সুযোগ পাই কিছু একটা নিশ্চয়ই করব।”
“সত্যি বলছেন, দাদা?”
“একদম।”


পাঁচ


“আরে আরে চিগুদা, ব্যাপারটা কী? এত আনন্দ কীসের?”
“ভাই, যা বলব সেটা শুনলে তুমিও আনন্দে নেচে উঠবে।”
“আচ্ছা! তাই নাকি?”
“হ্যাঁ ভাই, হ্যাঁ।”
“কী সেটা?”
“আজকে কী হবে জানো?”
“জানি তো, প্রকাশ আজ এখান থেকে চলে যাবে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু প্রকাশের সাথে আরও কেউ আজ যাবে এখান থেকে।”
“সে আর নতুন কী? আরও যাদের যাদের আজ সৎকারের দিন তারা যাবে, রোজই তো যায়। এতে নতুন কী আছে?”
“হা হা... নতুন আছে বৈকি।”
“কী নতুন?”
“ভায়া, তুমি কি জানো তোমার শ্রাদ্ধ চলছে এখন?”
“কী বললেন!”
“হ্যাঁ ভাই, ঠিকই বলছি। তোমার শ্রাদ্ধ চলছে, এবার শেষমেশ তুমি মুক্তি পাবে এই মায়া জগত থেকে।”
“আ-আপনি সত্যি বলছেন? আমি মুক্তি পাব!”
“একদম সত্যি বলছি, ভাই। অবশেষে তোমার স্ত্রী আর ছেলে আজ তোমার কাজ করছে।”
“উফ্‌! কী বলব ভেবেই পাচ্ছি না, চিগুদা। ও ভাই প্রকাশ, শুনছিস? আজ আমিও এখান থেকে যাব তোর সঙ্গে। অবশেষে… উফ্‌, কী আনন্দ!”


চিত্রগুপ্ত আজ একলা দাঁড়িয়ে। বহুদিন হল একলা দাঁড়ানোর অভ্যেস ছাড়া হয়ে গেছে। সেই যবে থেকে চন্দন এসেছে, সেই তবে থেকে রোজ মৃত আত্মাদের এই স্তর থেকে অন্য স্তরে পাঠানোর সময় চিত্রগুপ্তের সঙ্গে থাকে চন্দন। ও ঠিক জুটিয়ে নিত কোনও ভাই, দাদা, ভাগনা, বোন, মাসিমা আরও কত কী। যেসব আত্মারা বুঝতেই পারত না তাদের মৃত্যু হয়েছে, এখানে এসে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরত, তাদের উদ্ধারকর্তা হয়ে ছিল চন্দন বক্সী। সবার সুখদুঃখ ভাগ করে নিত যে ক’টা দিন তারা এখানে থাকত। আর বিনিময়ে কী পেত? শুধু কষ্ট। মায়া শুধু কষ্ট বাড়ায়, আর কিচ্ছু না। তবে এবার সেই দিন শেষ। আজ অবশেষে চন্দনও মুক্তি পাবে। আচ্ছা, চিত্রগুপ্ত নিজে কি জড়ায়নি মায়ার বাঁধনে? এখানে কারুর চোখ থেকে জল পড়ে না তাই হয়তো চিত্রগুপ্তের ভেতরের উথালপাতাল বাইরের কেউ টের পায় না। কিন্তু সে নিজে বেশ উপলব্ধি করে, চন্দন বক্সী লোকটা কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে তাঁকে জড়িয়েছে মায়ার বাঁধনে।
কালো গহ্বরটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে, এবার এক এক করে সবাই ঢুকবে। সবার শেষে দাঁড়িয়ে চন্দন আর প্রকাশ। চন্দন বক্সী শেষবারের মতো বিদায় জানায় চিত্রগুপ্তকে। প্রকাশ ঢুকে যায় গহ্বরে। চন্দনও পা রাখতে যায় আর তখনই…
“এ আমি কোথায়! এটা কোন জায়গা! হেল্প হেল্প, প্লিজ হেল্প...”
চন্দনের পাটা থমকে যায়। চিত্রগুপ্ত বলেন, “যাও চন্দন, দেরি কোরো না, তাড়াতাড়ি যাও। নয়তো গহ্বর বন্ধ হয়ে যাবে।”
ভেতর থেকে প্রকাশ চিৎকার করে, “শিগগির এসো, চন্দনদা!”
চন্দন বক্সী পাটা সরিয়ে নেয়। চিত্রগুপ্ত আঁতকে ওঠেন। “এ কী করছ চন্দন! যাও, নয়তো আর কখনও এখান থেকে বেরোতে পারবে না।”
চন্দন বক্সী বোধহয় শুনতে পায় না কথাগুলো, দৌড় লাগায় সে। পৌঁছে যায় নবাগতা মেয়েটার কাছে। “বোন শান্ত হও, শান্ত হও বলছি। আমি তোমায় সাহায্য করব। বলো কী হয়েছে।”
“সত্যি বলছেন দাদা? আপনি সাহায্য করবেন আমায়?”
“হ্যাঁ, বোন। এসো, এখানটায় বসো।”
গহ্বরটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। চিত্রগুপ্ত আবার সেই দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভঙ্গিতে চোখদুটো বন্ধ করে ফেলেন। এই ভয়টাই তিনি পাচ্ছিলেন।
হঠাৎই একটা উজ্জ্বল সাদা আলোতে ভরে যায় চারদিক। কোথা থেকে যেন একটা গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “চন্দন বক্সী, তুমি সত্যিই অসাধারণ। নিজের জন্য না ভেবে এতদিন ধরে অন্যকে সাহায্য করে গেছ, এমনকি আজও তাই করলে। নিজের মুক্তির তোয়াক্কা না করেই তুমি ছুটে এলে অন্যকে সাহায্য করতে। আমরা তোমাকে চিত্রগুপ্তের সঙ্গে এখানকার দায়িত্ব দিতে চাই। তুমি যদি সে দায়িত্ব গ্রহণ করো তাহলে কিন্তু পৃথিবীর হিসেব অনুযায়ী আগামী হাজার বছর আর মুক্তি পাবে না। আর যদি দায়িত্ব না নিতে চাও, তবে আমরা তোমার জন্য আবার গহ্বর উন্মুক্ত করে দেব, তুমি পরের স্তরে যেতে পারবে। এবার বলো, কী চাও তুমি।”
চিন্তায় পড়ে যায় চন্দন বক্সী। ভাবতে থাকে কী করা যায়। তবে ওই কয়েক মুহূর্তই চিন্তা, তারপরই তার সেই বিখ্যাত ভুবন ভোলানো হাসি নিয়ে বলে, “আমি থাকব এখানে। ওদের দরকার আমাকে, আমি থাকব।”
“তোমার কাছে এমনই জবাব প্রত্যাশা করেছিলাম। আজ থেকে তবে তোমার নতুন নাম হল মিত্রগুপ্ত।”
“মিত্রগুপ্ত? বাহ্, বেশ নাম তো।”
সাদা আলোটা মুহূর্তে মিলিয়ে যায়, আর সেই নতুন আসা মেয়েটারও কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। চন্দন বক্সী থুড়ি সদ্য প্রমোশন-প্রাপ্ত মিত্রগুপ্ত ছুটে আসে চিত্রগুপ্তের কাছে। “চিগুদা, এবার থেকে তুমি আমায় মিতু ভাই বলে ডেকো, কেমন?”
“আচ্ছা, তাই ডাকব।”
“হেঁ হেঁ, তুমি সকালে আমায় সাহায্য করলে না তো? এখন দেখো, আমিও পেয়েছি ক্ষমতা ওপর মহলে যোগাযোগ করার। এবার আমি নিজেই পারব আমার দাবি জানিয়ে ওখানে আপিল করতে। তুমি দেখো, আমি ঠিক এই জায়গাটার রিমডেলিং করেই ছাড়ব।”
“হুম।”
“বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার! হুঁ হুঁ, যখন সিস্টেমটা চালু হবে তখন দেখবে তোমার মিতু ভাই কী করতে পারে। আচ্ছা, এখন আমি আসি,  হ্যাঁ? নতুন কেউ এল কি না দেখি।”
চন্দন বক্সী মানে মিত্রগুপ্ত চলে যায়। তার চলে যাওয়া পথ পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন চিত্রগুপ্ত। সত্যি, এই মায়া জিনিসটা ভীষণ মারাত্মক। একবার যাকে ধরে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। এবার হাজার বছর ব্যাটা থাকবে এইখানেই। আচ্ছা, চিত্রগুপ্তের নিজের কতবছর হল যেন? পাঁচশো ছাড়িয়ে যাবে কি!


_____

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment